কওমি সনদের স্বীকৃতি ও কমিশনের খসড়া

আপডেট: অক্টোবর ২১,২০১৬ ‌ | ক্যাটাগরি: বিবিধ

কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি নিয়ে দেশের কওমি অঙ্গনে এখন চলছে দ্বিমুখী বিতর্ক। যারা স্বীকৃতির বিপক্ষে আছেন তারা মূলত স্বীকৃতির বিপক্ষে নন; বরং তারাও স্বীকৃতি চান। তবে তাদের কেউ কেউ এ সরকারের থেকে স্বীকৃতি নিতে অনিচ্ছুক। যারা এই দাবির পক্ষে সোচ্চার, তাদের অধিকাংশই বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক দলের নেতা। তাই তারা এ সরকারকে এ মহৎ কাজের সুযোগটি দিতে ইচ্ছুক নন। আর কেউ কেউ বর্তমান কমিশনকে পছন্দ করছেন না। নিজেদের অথবা নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের দিয়ে কমিশন গঠন করা হলে তারা স্বীকৃতি নিতে সম্মত হবেন।

বিপক্ষের এ বিরোধিতার মধ্য দিয়েই সরকার গঠিত কওমি শিক্ষা কমিশন ১৫ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে একটি খসড়া আইন প্রকাশ করেছে এবং সংশ্লিষ্টদের মতামত চেয়েছে। কওমি অঙ্গনের যারাই স্বীকৃতির বিরোধিতা করছেন তারা কওমি ধারার স্বকীয়তা রক্ষার অজুহাতকে নিজেদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। স্বকীয়তা রক্ষার জন্য মাদ্রাসা পরিচালনার অবাধ স্বাধীনতা তারা দাবি করছেন। তারা কওমি মহলকে এ কথা বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে, কমিশনের খসড়া আইন মতে ‘কওমি শিক্ষা কর্তৃপক্ষ’ গঠিত হলে সরকার নিজের মর্জিমতো রাজনৈতিক স্বার্থে চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ দেবে, অব্যাহতি দেবে। এতে কওমি মাদ্রাসার স্বকীয়তা নষ্ট হবে। কওমি মাদ্রাসাগুলো দলীয় সরকারে স্বেচ্ছাচারী হাতের ক্রীড়নকে পরিণত হবে। অথচ প্রকাশিত খসড়া আইন পড়লে দেখা যায়, বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। বরং এ আইন সংসদে পাস হলে সরকার কওমি মাদ্রাসার ওপর কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এ আইন কওমি মাদ্রাসার স্বকীয়তাকে মজবুত সুরক্ষা দেবে। নিশ্চিন্তে বলা যায়, এ আইন বলবৎ থাকা অবস্থায় যদি কোনোদিন কওমি মাদ্রাসাগুলো তাদের স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে, তবে তা হবে একান্তই তাদের নিজেদের কারণে, নিজেদের হাতে। শিক্ষার্থীদের সনদ প্রদানের উদ্দেশ্যে ওই খসড়া আইনের ৩(১) উপধারায় ‘বাংলাদেশ কওমি শিক্ষা কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে। ৩(২) উপধারায় বলা হয়েছে, ‘কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হইবে।’ এ উপধারা থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এ কর্তৃপক্ষ সরকারের অধীন আজ্ঞাবহ কোনো সংস্থা হবে না। বরং এ আইন তাকে আপন কাজে, আপন পরিধির ভেতর সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিচ্ছে। এমনকি ওই আইনের ৫ ও ৬ নম্বর ধারা থেকে পরিষ্কার বুঝে আসে কর্তৃপক্ষ গঠনে বা বিলুপ্তিতে বা কাউকে অব্যাহতি প্রদানে সরকারের কোনো হাত থাকবে না। কেননা, ওই খসড়া আইনের বক্তব্য মতে কর্তৃপক্ষের মোট সদস্য হবে ১৬ জন। তার মধ্যে ৫টি কওমি বোর্ডের প্রধানরা পদাধিকারবলে কর্তৃপক্ষের সদস্য হবেন। একজন সদস্য হবেন মহিলা মাদ্রাসাগুলোর প্রতিনিধি। কর্তৃপক্ষের সচিব নিয়োগ দেবে কর্তৃপক্ষ নিজেই। চেয়ারম্যান এবং অবশিষ্ট ৮ জন সদস্য সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। কিন্তু এ আইন বলবৎ থাকা অবস্থায় সরকার নিয়োগ দিলেও নিয়োগের পাত্র সরকার মনোনীত করতে পারবে না। ব্যক্তি বাছাইয়ে সরকারের কোনো হাত থাকবে না। কেননা, ওই আইনের ৬(১) উপধারাতে বলা হয়েছে, ‘চেয়ারম্যান এবং ৫(খ)-এ উলি্লখিত সদস্যগণ অনুমোদিত বোর্ডসমূহের সুপারিশের আলোকে নিয়োগপ্রাপ্ত হইবেন।’ আইনের আলোকে দেখা যাচ্ছে, চেয়ারম্যান কে হবেন, সদস্য কে কে হবেন তা সরকার নির্ধারণ করবে না। নির্ধারণ করবে কওমি মাদ্রাসাগুলোর আঞ্চলিক বোর্ডগুলো। যেগুলো গঠন ও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে কওমি মাদ্রাসাগুলো। আইনের ৬ নম্বর ধারাতে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অব্যাহতি প্রদানের যেসব নিয়ম বলা হয়েছে, তাতে সরকারের কোনো হাত রাখা হয়নি। বরং ৬(৪) উপধারাতে আছে- ‘চেয়ারম্যান অথবা কোন সদস্যের প্রতি কর্তৃপক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য অনাস্থা প্রকাশ করিলে সরকার তাহাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করিতে পারিবে।’ এখানেও কাউকে বাদ দেওয়ার মূল চাবিকাঠি সরকারের হাতে রাখা হয়নি। বরং কওমিদের নিজেদের হাতেই রাখা হয়েছে। কোনো কারণে চেয়ারম্যান অনুপস্থিত থাকলে অথবা অপসারিত হলে কাউকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার ক্ষমতাও এ আইনে সরকারের হাতে দেওয়া হয়নি। ৬(৬) উপধারাতে আছে, ‘চেয়ারম্যান পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে তিনি তাঁহার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হইলে, শূন্য পদে নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত কিংবা চেয়ারম্যান পুনরায় স্বীয় দায়িত্ব পালনে সমর্থ না হওয়া পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে মনোনীত কোন সিনিয়র সদস্য চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করিবেন।’ ওই আইনের আলোকে প্রাথমিক, নিম্ন মাধ্যমিক, এসএসসি এবং এইচএসসি স্তরের তদারকি ও সনদ প্রদানের ক্ষমতা আঞ্চলিক কওমি বোর্ডগুলোর দায়িত্বে রাখা হয়েছে। স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর স্তরের তদারকি ও সনদ প্রদানের দায়িত্ব কওমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে। ওই আইন সংসদে পাস হলে বর্তমান কওমি বোর্ডগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। ছাত্র-শিক্ষকদের প্রদেয় বিভিন্ন ফি, অনুদানগুলোর সদ্ব্যবহার নিশ্চিত হবে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, গত চার বছর ধরে বেফাকের (ঢাকার কওমি শিক্ষা বোর্ড) আয়-ব্যয়ের নিজস্ব অডিট হয়নি। কর্মকর্তারা কেন অডিট করানোর সৎসাহস দেখাতে পারেননি তা নিয়ে কওমি অঙ্গনে যথেষ্ট কানাঘুষা চলছে। গত কয়েক বছরে দু’জন কর্মকর্তা প্রায় অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে উধাও হয়েছেন। কিন্তু বেফাক দায়সারাগোছের মামলা করলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপে যায়নি। এখানেও কওমি ছাত্র-শিক্ষকদের মনে প্রশ্ন জাগে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার এ যুগে কর্মকর্তার হাতে নগদ এত বড় অঙ্কের টাকা কেন থাকল। তবে কি দায়িত্বশীলদের সহযোগিতা আছে, নাকি অফিস ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত নিম্নমানের। এগুলো যুগের পর যুগ ধরে চলতে পারে না। সরকারগঠিত কমিশনের প্রণীত খসড়া আইন পড়লে মনে হয়, কওমি মাদ্রাসাগুলো যা চেয়েছে এখানে তার চেয়েও অনেক বেশি দেওয়া আছে। আইনে এত সহজ করে কথাগুলো উল্লেখ থাকার পরও যারা সরকারি নিয়ন্ত্রণের ও সরকারি হস্তক্ষেপের আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন, স্বকীয়তা নষ্টের ভয় দেখাচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ্যের সততা নিয়ে কওমি মাদ্রাসার সচেতন ছাত্র-শিক্ষকদের মনে যথেষ্ট সন্দেহ সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা চাই সব বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হোক। শিক্ষাঙ্গন থাকুন রাজনীতিমুক্ত।

লেখকবৃন্দ: মাওলানা আশরাফ আলী, মুফতি অহিদুল আলম, মাওলানা আজিজুর রহমান, মুফতি আহমাদ আলী মুফতি এমদাদুল্লাহ, হাফেজ ফয়জুল্লাহ ও মুফতি মাহফূযুল হক।

কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও পরিচালক

সুত্রঃ দৈনিক শিক্ষা

ক্যাটাগরি

সাম্প্রতিক তথ্যসমূহ