অন্যান্য শ্রেণি ও বিষয়

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রস্তুতি: সাধারণ জ্ঞান

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ

নয়মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বাঙ্গালীর গৌরবের মাধ্যমে এর সূচনা হলেও এর পথ পরিক্রমা শুরু হয় ৭০ এ নির্বাচন থেকে। ৭১ সালের ২ মার্চ প্রথম পতাকা উত্তোলন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের ঐতিহাসিক ভাষন থেকে ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চ লাইট বা বাংগালীর জন্য কালো রাত্রির মধ্য দিয়ে শুরু এই যুদ্ধ ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর আত্ম সমর্পনের মাধ্যমে শেষ হয়।

মুজিবনগর সরকার ও প্রবাসি সচিবালয়

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার বা মুজিবনগর সরকার গঠিত হয় ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১০ই এপ্রিল তারিখে। ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল এই সরকারের মন্ত্রীপরিষদের সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশের জনগণের প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু হলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য মুক্তিবাহিনী সংগঠন ও সমন্বয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায় এবং এই যুদ্ধে প্রত্যক্ষ সহায়তাকারী রাষ্ট্র ভারতের সরকার ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক রক্ষায় এই সরকারের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এই সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধ প্রবল যুদ্ধে রূপ নেয় এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বিজয় অর্জন ত্বরান্বিত হয়।

বিস্তারিত


মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য প্রাপ্ত খেতাব

বীরত্বসূচক খেতাব  বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অসম সাহসিকতা প্রদর্শন এবং আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাদের প্রদত্ত খেতাব। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের বীরত্ব ও সাহসিকতাপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিদান এবং তাদের মধ্যে আত্মত্যাগের প্রেরণা সৃষ্টির লক্ষে বীরত্বসূচক খেতাব প্রদানের একটি প্রস্তাব মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি  এম এ জি ওসমানী মে মাসের প্রথমদিকে মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিপরিষদে উপস্থাপন করেন। ১৬ মে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে বীরত্বসূচক খেতাবের প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়। এ পরিকল্পে চার পর্যায়ের খেতাব প্রদানের বিধান ছিল:

(ক) সর্বোচ্চ পদ, (খ) উচ্চ পদ, (গ) প্রশংসনীয় পদ, (ঘ) বীরত্বসূচক প্রশংসাপত্র।

খেতাব প্রাপ্তির জন্য মর্যাদার ক্রমানুসারে নিম্নোক্ত যোগ্যতা অর্জন করতে হতো:

সর্বোচ্চ পদ  অত্যন্ত প্রতিকূল অবস্থার মোকাবেলায় মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বীরত্বপূর্ণ কাজ, যে কাজ না করলে শত্রু বাংলাদেশ বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করতে পারত। উপরন্তু ঐ বীরত্বপূর্ণ কাজের ফলে শত্রুর ব্যাপক ক্ষতি সাধনের মাধ্যমে যুদ্ধের গতি প্রকৃতিকে সপক্ষে প্রভাবিত করেছে।

উচ্চ পদ  পূর্ব বর্ণিত খেতাবের মত যোগ্যতা অর্জন করতে হবে, তবে তা অপেক্ষাকৃত কম মাত্রায়।

প্রশংসনীয় পদ  পূর্ব বর্ণিত খেতাবের মত যোগ্যতা অর্জন করতে হবে, তবে তা অপেক্ষাকৃত আরও কম মাত্রায়।

বীরত্বসূচক প্রশংসাপত্র  উপরিউক্ত তিন প্রকার খেতাবের যোগ্যতা অর্জন করে না অথচ বীরত্বপূর্ণ কাজের  জন্য  প্রশংসাপত্র প্রদান করা বিধেয়।

খেতাব প্রদানের ক্ষেত্রে বীরত্বপূর্ণ কাজের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সর্বোচ্চ পদের জন্য তিনজন সাক্ষী, উচ্চ পদের জন্য দুই জন সাক্ষী, প্রশংসনীয় পদের জন্য একজন সাক্ষীর প্রয়োজন হতো। বীরত্বসূচক প্রশংসাপত্রের জন্য কোনও সাক্ষীর প্রয়োজন হতো না।

বীরত্বসূচক খেতাবের সঙ্গে এককালীন আর্থিক পুরস্কার প্রদান করা হতো। সর্বোচ্চ পদের জন্য দশ হাজার টাকা (বর্তমানে এক লক্ষ টাকা), উচ্চ পদের জন্য পাঁচ হাজার টাকা (বর্তমানে পঞ্চাশ হাজার টাকা), প্রশংসনীয় পদের জন্য দুই হাজার টাকা (বর্তমানে বিশ হাজার টাকা)। বীরত্বসূচক প্রশংসাপত্রের জন্য কোনো আর্থিক পুরস্কারের বিধান ছিল না। বর্তমানে দশ হাজার টাকা প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে। এখন খেতাব প্রাপ্তদের মাসিক ভাতাও প্রদান করা হয়।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সভায় বীরত্বসূচক খেতাবের নতুন নামকরণ হয়:

সর্বোচ্চ পদমর্যাদার খেতাব                                   বীরশ্রেষ্ঠ

উচ্চ পদমর্যাদার খেতাব                                      বীর উত্তম

প্রশংসনীয় পদমর্যাদার খেতাব                               বীর বিক্রম

বীরত্বসূচক প্রশংসাপত্রের খেতাব                           বীর প্রতীক

১৯৭২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ৪৩ জন মুক্তিযোদ্ধাকে বীরত্বসূচক খেতাবের জন্য নির্বাচন করা হয়। ১৯৭৩ সালের ২৬ মার্চ পূর্বের ৪৩ জনসহ মোট ৫৪৬ জন মুক্তিযোদ্ধা খেতাবের জন্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ইউনিট, সেক্টর, ব্রিগেড থেকে পাওয়া খেতাবের জন্য সুপারিশসমূহ এয়ার ভাইস মার্শাল এ. কে খন্দকারের নেতৃত্বে্ একটি কমিটি দ্বারা নিরীক্ষা করা হয়। এরপর ১৯৭৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খেতাব তালিকায় স্বাক্ষর করেন।

১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর পূর্বে নির্বাচিত সকল মুক্তিযোদ্ধার নামসহ মোট ৬৭৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিম্নোক্ত খেতাব প্রদান করা হয়:

বীরশ্রেষ্ঠ                                                               - ৭ জন

বীর উত্তম                                                            - ৬৮ জন

বীর বিক্রম                                                            - ১৭৫ জন

বীর প্রতীক                                                            - ৪২৬ জন

১৯৯২ সালের ১৫ ডিসেম্বর জাতীয়ভাবে বীরত্বসূচক খেতাব প্রাপ্তদের পদক ও রিবন প্রদান করা হয়। ২০০১ সালের ৭ মার্চ খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক পুরস্কার এবং সনদপত্র প্রদান করা হয়।

বাহিনীভিত্তিক খেতাবপ্রাপ্তদের সংখ্যা নিম্নরূপ:

সেনাবাহিনী                   -                            ২৮৮ জন

নৌবাহিনী                     -                              ২৪  জন

বিমান বাহিনী                 -                              ২১  জন

বাংলাদেশ রাইফেল্স        -                             ১৪৯ জন

পুলিশ                         -                                 ৫ জন

মুজাহিদ/ আনসার            -                               ১৪ জন

গণবাহিনী                       -                             ১৭৫ জন

খেতাবপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন দু’জন মহিলা। পাঁচজন অবাঙালিও বীরত্বসূচক খেতাব পান, যাদের মধ্যে একজন বিদেশী।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বীরত্বসূচক খেতাব সামরিক বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্যও প্রযোজ্য আছে। স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও অন্যান্য স্থানে পরিচালিত অপারেশনে সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ রাইফেল্সের ১২৬ জন বীরত্বসূচক খেতাব পেয়েছেন। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্তরা সমাজে উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন।

বিস্তারিত


বিভিন্ন দেশ কতৃ্ক বাংলাদেশের স্বীকৃতি

মুক্তিযুদ্ধ কালে সর্বপ্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে ভারত ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে।


মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক সাহিত্য ও চলচিত্র

 

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনী চিত্র সমূহ:

 

নাম

পরিচালক

সন

ওরা এগারজন

চাষী নজরুল ইসলাম

১৯৭২

সংগ্রাম

চাষী নজরুল ইসলাম

১৯৭৪

রক্তাক্ত বাংলা

মমতাজ আলী

১৯৭২

বাঘা বাঙালি

আনন্দ

১৯৭২

অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী

সুভাষ দত্ত

১৯৭২

জয়বাংলা

ফখরুল আলম

১৯৭২

আমার জন্মভূমি

আলমগীর কুমকুম

১৯৭৩

ধীরে বহে মেঘনা

আলমগীর কবির

১৯৭৩

আবার তোরা মানুষ হ

খান আতাউর রহমান

১৯৭৩

বাংলার ২৪ বছর

মোহাম্মদ আলী

১৯৭৪

কারহাসি কে হাসে

আনন্দ

১৯৭৪

সূর্য সংগ্রাম

আবদুস সামাদ

১৯৭৪

আলোর মিছিল

নারায়ণ ঘোষ মিতা

১৯৭৪

মেঘের অনেক রঙ

হারুনুর রশিদ

১৯৭৬

রুপালি সৈকত

আলমগীর কবির

১৯৭৯

নদীর নাম মধুমতি

তানভীর মোকাম্মেল

১৯৭৯

কলমিলতা

শহীদুল হক খান    

১৯৮১

বাধনহারা

এ জে মিন্টু

১৯৮১

চিৎকার

মতিন রহমান

১৯৮২

আগুনের পরশমনি

হুমায়ূন আহমেদ

১৯৯৪

হাঙ্গর নদী গ্রেনেড

চাষী নজরুল ইসলাম

১৯৯৭

মাটির ময়না

তারেক মাসুদ

২০০২

শ্যামল ছায়া

হুমায়ূন আহমেদ

২০০৪

জয়যাত্রা

তৌকির আহমেদ

২০০৪

ধ্রুবতারা

চাষী নজরুর ইসলাম

২০০৬

মেহেরজান

রুবাইয়াত হোসেন

২০১০

আমার বন্ধু রাশেদ

মোরশেদুল ইসলাম

২০১১

গেরিলা

নাসিরউদ্দিন ইউসুফ

২০১১

ও আমার দেশের মাটি

অনন্ত হীরা

 

এইতো প্রেম

সোহেল আরমান

 

আত্মদান    

শাজাহান চৌধুরী

 

 

 

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্য চিত্র সমূহ:

 

নাম

পরিচালক

সন

স্টপ জেনোসাইড

জহির রায়হান

১৯৭১

এ স্টেট ইজ বর্ন

জহির রায়হান

১৯৭২

ডেটলাইন বাংলাদেশ

ব্রেন টাগ

১৯৭১

দ্যা লিবারেশন ফাইটার্স

আলমগীর কবির    

১৯৭১

নাইন মান্থ টু ফ্রিডম

এস সুকুদেব

১৯৭২

স্মৃতি একাত্তর

তানভীর মোকাম্মেল

১৯৯১

মুক্তির গান

তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ    

১৯৯৫

মুক্তির গান

তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ    

১৯৯৯

জয়যাত্রা

তৌকির আহমেদ

২০০৪

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে

আলমগীর কবির

 

ইনোসেন্ট মিলিয়নস

বাবুল চৌধুরী

 

রিফিউজি ৭১

বিনয় রাই

 

দ্যা কান্ট্রি মেড ফর বাংলাদেশ

রবার্ট রজার্স

 

মেজর খালেদস ওয়ার

ভারিয়া কেউল

 

আদভানি, জয় বাংলা

নাগিসা ওশিমা

 

লুট অ্যান্ড লাস্ট

কাউল

 

১৯৭১

তানভীর মোকাম্মেল

 

 

 

মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক স্বর্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র সমূহ:

 

নাম

পরিচালক

সন

হুলিয়া

তানভীর মোকাম্মেল

১৯৮৪

আগামী

মোরশেদুল ইসলাম

১৯৮৪

ধূসর যাত্রা

আবু সায়ীদ

১৯৮৯

সূচনা

মোরশেদুল ইসলাম

 

আবর্তন

আবু সাইয়িদ

 

প্রত্যাবর্তন

মোস্তফা কামাল

 

দূরন্ত

খান আখতার হোসেন

 

স্মৃতি ৭১

তানভির মোকাম্মেল

 

চাক্কি

এনায়েত করিম বাবুল

 

বখাটে

হাবিবুল ইসরাম হাবিব

 

একাত্তরের যীশু

নাসিরুদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু

১৯৯৪

নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ

মাসুদ পথিক

 


মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর ও রণকৌশল

মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন (সেক্টর) ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার সামরিক কৌশল হিসেবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সমগ্র ভৌগোলিক এলাকাকে ১১টি সেক্টর বা রণাঙ্গনে ভাগ করা হয়। প্রতি সেক্টরে একজন সেক্টর কমান্ডার (অধিনায়ক) নিয়োগ করা হয়। যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার জন্য প্রতিটি সেক্টরকে কয়েকটি সাব-সেক্টরে বিভক্ত করা হয় এবং প্রতিটি সাব-সেক্টরে একজন করে কমান্ডার নিয়োজিত হন।

১নং সেক্টর  চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা এবং নোয়াখালি জেলার মুহুরী নদীর পূর্বাংশের সমগ্র এলাকা নিয়ে গঠিত। এ সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল হরিনাতে। সেক্টর প্রধান ছিলেন প্রথমে মেজর জিয়াউর রহমান এবং পরে মেজর রফিকুল ইসলাম। এই সেক্টরের পাঁচটি সাব-সেক্টর (কমান্ডারদের নামসহ) হচ্ছে: ঋষিমুখ (ক্যাপ্টেন শামসুল ইসলাম); শ্রীনগর (ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান এবং পরে ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান); মনুঘাট (ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান); তবলছড়ি (সুবেদার আলী হোসেন); এবং ডিমাগিরী (জনৈক সুবেদার)। এই সেক্টরে প্রায় দশ হাজার মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করেন। এদের মধ্যে ছিলেন ই.পি.আর, পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রায় দুই হাজার নিয়মিত সৈন্য এবং গণবাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় আট হাজার। এই বাহিনীর গেরিলাদের ১৩৭টি গ্রুপে দেশের অভ্যন্তরে পাঠানো হয়।

২ নং সেক্টর  ঢাকা, কুমিল্লা, ফরিদপুর এবং নোয়াখালি জেলার অংশ নিয়ে গঠিত। এ সেক্টরের বাহিনী গঠিত হয় ৪- ইস্টবেঙ্গল এবং কুমিল্লা ও নোয়াখালির ইপিআর বাহিনী নিয়ে। আগরতলার ২০ মাইল দক্ষিণে মেলাঘরে ছিল এ সেক্টরের সদরদপ্তর। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন প্রথমে মেজর খালেদ মোশাররফ এবং পরে মেজর এ.টি.এম হায়দার। এই সেক্টরের অধীনে প্রায় ৩৫ হাজারের মতো গেরিলা যুদ্ধ করেছে। নিয়মিত বাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ হাজার। এই সেক্টরের ছয়টি সাব-সেক্টর (কমান্ডারদের নামসহ) হচ্ছে: গঙ্গাসাগর, আখাউড়া ও কসবা (মাহবুব এবং পরে লেফটেন্যান্ট ফারুক ও লেফটেন্যান্ট হুমায়ুন কবীর); মন্দভাব (ক্যাপ্টেন গাফফার); শালদানদী (আবদুস সালেক চৌধুরী); মতিনগর (লেফটেন্যান্ট দিদারুল আলম); নির্ভয়পুর (ক্যাপ্টেন আকবর এবং পরে লেফটেন্যান্ট মাহ্বুব); এবং রাজনগর (ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম এবং পরে ক্যাপ্টেন শহীদ ও লেফটেন্যান্ট ইমামুজ্জামান)। এই সেক্টরের বাহিনীর অভিযানের ফলে কুমিল্লা ও ফেনীর মধ্যবর্তী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে পাক-বাহিনী সম্পূর্ণ বিতাড়িত হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিককালে এই এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকারে থাকে। এই সেক্টরের বাহিনীর অভিযানের অন্যতম প্রধান সাফল্য হলো বেলোনিয়া সূচিবুূ্যহ প্রতিরক্ষা। ১ নং ও ২ নং সেক্টরের বাহিনীর যৌথ অভিযানের ফলে ২১ জুন পর্যন্ত বেলোনিয়া সূচিব্যুহের প্রবেশপথ সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। ২ নম্বর সেক্টরের কয়েকটি নিয়মিত কোম্পানি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অভিযান পরিচালনা করে। এই কোম্পানিগুলো ছিল সুবেদার লুৎফর রহমানের অধীনে বেগমগঞ্জ এলাকায় অভিযানরত নোয়াখালী কোম্পানি, সুবেদার জহিরুল আলম খানের অধীনে চাঁদপুর মতলব এলাকায় অভিযানরত চাঁদপুর কোম্পানি, ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরীর অধীনে ঢাকার মানিকগঞ্জ-মুন্সিগঞ্জ এলাকায় অভিযানরত এক বিশাল বাহিনী, এবং ক্যাপ্টেন শওকতের অধীনে ফরিদপুরে অভিযানরত এক বাহিনী। শহরাঞ্চলের গেরিলারা ঢাকা শহরে কয়েকটি সফল অভিযান পরিচালনা করে।

৩ নং সেক্টর  উত্তরে চূড়ামনকাঠি (শ্রীমঙ্গলের নিকট) থেকে সিলেট এবং দক্ষিণে ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার সিঙ্গারবিল পর্যন্ত এলাকা নিয়ে গঠিত হয়। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর কে.এম শফিউল্লাহ এবং পরে মেজর এ.এন.এম নূরুজ্জামান। দুই ইস্ট বেঙ্গল এবং সিলেট ও ময়মনসিংহের ইপিআর বাহিনী সমন্বয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়। সেক্টরের সদর দফতর ছিল হেজামারা। এই সেক্টরের অধীনে ১৯টি গেরিলা ঘাঁটি গড়ে উঠেছিল। নভেম্বর মাস পর্যন্ত গেরিলার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ত্রিশ হাজার। তারা কুমিল্লা-সিলেট সড়কে কয়েকটি সেতু বিধ্বস্ত করে পাক বাহিনীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তাদের সবচেয়ে সফল আক্রমণ ছিল শায়েস্তাগঞ্জের নিকটে ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী মাইনের সাহায্যে একটি রেলগাড়ি বিধ্বস্ত করা। এই সেক্টরের দশটি সাব-সেক্টর (কমান্ডারদের নামসহ) হচ্ছে: আশ্রমবাড়ি (ক্যাপ্টেন আজিজ এবং পরে ক্যাপ্টেন এজাজ); বাঘাইবাড়ি (ক্যাপ্টেন আজিজ এবং পরে ক্যাপ্টেন এজাজ); হাতকাটা (ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান); সিমলা (ক্যাপ্টেন মতিন); পঞ্চবটী (ক্যাপ্টেন নাসিম); মনতলা (ক্যাপ্টেন এম.এস.এ ভূঁইয়া); বিজয়নগর (এম.এস.এ ভূঁইয়া); কালাছড়া (লেফটেন্যান্ট মজুমদার); কলকলিয়া (লেফটেন্যান্ট গোলাম হেলাল মোরশেদ); এবং বামুটিয়া (লেফটেন্যান্ট সাঈদ)।

৪নং সেক্টর  উত্তরে সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমা থেকে দক্ষিণে কানাইঘাট থানা পর্যন্ত ১০০ মাইল বিস্তৃত সীমান্ত এলাকা নিয়ে গঠিত। সিলেটের ইপিআর বাহিনীর সৈন্যদের সঙ্গে ছাত্র মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে এ সেক্টর গঠিত হয়। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত এবং পরে ক্যাপ্টেন এ রব। হেডকোয়ার্টার ছিল প্রথমে করিমগঞ্জ এবং পরে আসামের মাসিমপুরে। সেক্টরে গেরিলার সংখ্যা ছিল প্রায় ৯ হাজার এবং নিয়মিত বাহিনী ছিল প্রায় ৪ হাজার। এই সেক্টরের ছয়টি সাব-সেক্টর (কমান্ডারদের নামসহ) হচ্ছে: জালালপুর (মাসুদুর রব শাদী); বড়পুঞ্জী (ক্যাপ্টেন এ. রব); আমলাসিদ (লেফটেন্যান্ট জহির); কুকিতল (ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কাদের এবং পরে ক্যাপ্টেন শরিফুল হক); কৈলাশ শহর (লেফটেন্যান্ট উয়াকিউজ্জামান); এবং কমলপুর (ক্যাপ্টেন এনাম)।

৫ নং সেক্টর  সিলেট জেলার দুর্গাপুর থেকে ডাউকি (তামাবিল) এবং জেলার পূর্বসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা নিয়ে গঠিত। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর মীর শওকত আলী। হেড কোয়ার্টার ছিল বাঁশতলাতে। আটশত নিয়মিত সৈন্য এবং পাঁচ হাজার গেরিলা সৈন্য সমন্বয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়। সুনামগঞ্জ ও ছাতকের অধিকাংশ জলাভূমি ছিল এই সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। এই সেক্টরের ছয়টি সাব-সেক্টর (কমান্ডারদের নামসহ) হচ্ছে: মুক্তাপুর (সুবেদার নাজির হোসেন এবং সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ফারুক); ডাউকি (সুবেদার মেজর বি.আর চৌধুরী); শেলা (ক্যাপ্টেন হেলাল; সহযোগী কমান্ডার লেফটেন্যান্ট মাহবুবর রহমান এবং লেফটেন্যান্ট আবদুর রউফ); ভোলাগঞ্জ (লেফটেন্যান্ট তাহেরউদ্দিন আখুঞ্জী; সহযোগী কমান্ডার লেফটেন্যান্ট এস.এম খালেদ); বালাট (সুবেদার গনি এবং পরে ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন ও এনামুল হক চৌধুরী); এবং বড়ছড়া (ক্যাপ্টেন মুসলিম উদ্দিন)। এই সেক্টরের বাহিনী সিলেট, তামাবিল ও সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে বেশ কিছুসংখ্যক সেতু বিধ্বস্ত করে। এই সেক্টরের সর্বাধিক সফল অপারেশন ছিল ছাতক আক্রমণ।

৬ নং সেক্টর  সমগ্র রংপুর জেলা এবং দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁও মহকুমা নিয়ে গঠিত। প্রধানত রংপুর ও দিনাজপুরের ইপিআর বাহিনী নিয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন উইং কমান্ডার এম খাদেমুল বাশার। সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল পাটগ্রামের নিকটবর্তী বুড়ীমারিতে। এটিই ছিল একমাত্র সেক্টর যার হেড কোয়ার্টার ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। সেক্টরের সৈন্যসংখ্যা ছিল ৭০০ এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত সৈন্য সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১১ হাজার। এদের মধ্যে ছিল ২০০০ নিয়মিত সৈন্য এবং ৯০০০ গণবাহিনী। এই সেক্টরের পাঁচটি সাব-সেক্টর (কমান্ডারদের নামসহ) হচ্ছে: ভজনপুর (ক্যাপ্টেন নজরুল এবং পরে স্কোয়াড্রন লীডার সদরউদ্দিন ও ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার); পাটগ্রাম (প্রথমে কয়েকজন ই.পি.আর জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার কমান্ড করেন। পরে ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান এই সাব-সেক্টরের দায়িত্ব নেন); সাহেবগঞ্জ (ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন); মোগলহাট (ক্যাপ্টেন দেলওয়ার); এবং চিলাহাটি (ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ইকবাল)। এই সেক্টরের বাহিনী রংপুর জেলার উত্তরাংশ নিজেদের দখলে রাখে।

৭ নং সেক্টর  রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া এবং দিনাজপুর জেলার দক্ষিণাংশ নিয়ে গঠিত হয়। ইপিআর সৈন্যদের নিয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়। এই বাহিনী ক্যাপ্টেন গিয়াস ও ক্যাপ্টেন রশিদের নেতৃত্বে রাজশাহীতে প্রাথমিক অভিযান পরিচালনা করে। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর নাজমুল হক এবং পরে সুবেদার মেজর এ. রব ও মেজর কাজী নূরুজ্জামান। এই সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল বালুরঘাটের নিকটবর্তী তরঙ্গপুরে। ২৫০০ নিয়মিত সৈন্য ও ১২৫০০ গেরিলা সৈন্য সমন্বয়ে প্রায় ১৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধা এই সেক্টরে যুদ্ধ করে। এই সেক্টরের আটটি সাব-সেক্টর (কমান্ডারদের নামসহ) হচ্ছে: মালন (প্রথমে কয়েকজন জুনিয়র অফিসার এবং পরে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর); তপন (মেজর নজমুল হক এবং পরে কয়েকজন জুনিয়র ই.পি.আর অফিসার); মেহেদীপুর (সুবেদার ইলিয়াস এবং পরে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর); হামজাপুর (ক্যাপ্টেন ইদ্রিস); আঙ্গিনাবাদ (একজন গণবাহিনীর সদস্য); শেখপাড়া (ক্যাপ্টেন রশীদ); ঠোকরাবাড়ি (সুবেদার মোয়াজ্জেম); এবং লালগোলা (ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী)। এই সেক্টরের বাহিনী জুন মাসে মহেশকান্দা ও পরাগপুর এবং আগস্ট মাসে মোহনপুর থানা আক্রমণ করে বিপুল সংখ্যক শত্রুসৈন্য বিধ্বস্ত করে। হামজাপুর সাব-সেক্টরের কমান্ডার ক্যাপ্টেন ইদ্রিস তাঁর বাহিনী নিয়ে কয়েকটি পাকিস্তানী বাহিনীর উপর অতর্কিত আক্রমণ চালান এবং পার্বতীপুরের নিকটে একটি ট্রেন বিধ্বস্ত করেন।

৮ নং সেক্টর  এপ্রিল মাসে এই সেক্টরের অপারেশনাল এলাকা ছিল কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর ও পটুয়াখালী জেলা। মে মাসের শেষে অপারেশন এলাকা সঙ্কুচিত করে কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনা জেলা, সাতক্ষীরা মহকুমা এবং ফরিদপুরের উত্তরাংশ নিয়ে এই সেক্টর পুনর্গঠিত হয়। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী এবং পরে মেজর এম.এ মঞ্জুর। এই সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল কল্যানীতে। সেক্টরের সৈন্যদের মধ্যে ৩০০০ ছিল নিয়মিত বাহিনী এবং ২৫০০০ গেরিলা সৈন্য।  নিয়মিত বাহিনী কয়েকটি এলাকায় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে এবং গেরিলা বাহিনী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কয়েকটি ঘাঁটি গড়ে তোলে। এই সেক্টরের সৈন্যরা যুদ্ধে এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করে। নিয়মিত বাহিনী বাংলাদেশের ৭-৮ মাইল অভ্যন্তরভাগে ঢুকে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে এবং এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যাতে পাকবাহিনী তাদের উপর আক্রমণ পরিচালনায় উদ্বুদ্ধ হয়। এই ব্যবস্থায় মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণকারী পাকবাহিনীর বহুসংখ্যক সৈন্য বিধ্বস্ত করে। এই সেক্টরের সাতটি সাব-সেক্টর (কমান্ডারদের নামসহ) হচ্ছে: বয়রা (ক্যাপ্টেন খোন্দকার নজমুল হুদা); হাকিমপুর (ক্যাপ্টেন শফিক উল্লাহ); ভোমরা (ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন এবং পরে ক্যাপ্টেন শাহাবুদ্দীন); লালবাজার (ক্যাপ্টেন এ.আর আযম চৌধুরী); বানপুর (ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজুর রহমান); বেনাপোল (ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম এবং পরে ক্যাপ্টেন তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী); শিকারপুর (ক্যাপ্টেন তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী এবং পরে লেফটেন্যান্ট জাহাঙ্গীর)।

৯ নং সেক্টর  বরিশাল ও পটুয়াখালি জেলা এবং খুলনা ও ফরিদপুর জেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত। এই সেক্টরের হেড কোয়ার্টার ছিল বশিরহাটের নিকটবর্তী টাকিতে। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর এম.এ জলিল এবং পরে মেজর এম.এ মঞ্জুর ও মেজর জয়নাল আবেদীন। এই সেক্টরে প্রায় বিশ হাজার মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করে। এই সেক্টরকে টাকি, হিঙ্গলগঞ্জ ও শমসেরনগর তিনটি সাব-সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। এই সেক্টরে নিয়মিত বাহিনীও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আক্রমণ পরিচালনা করে। ক্যাপ্টেন শাহজাহান ওমরের নেতৃত্বে এক বিশাল গেরিলা বাহিনী বরিশালে অভিযান করে। পটুয়াখালীতে একটি স্থায়ী ঘাটি থেকে ক্যাপ্টেন মেহদী আলী ইমাম আক্রমণ পরিচালনা করেন। লেফটেন্যান্ট জিয়া সুন্দরবন এলাকায় এক বিশাল বাহিনী পরিচালনা করেন। ক্যাপ্টেন হুদা নিয়মিত বাহিনীর এক বিশাল অংশ নিয়ে সীমান্ত এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি জুন মাসে শত্রুর উকশা সীমান্ত ঘাটি দখল করেন এবং বরাবর তা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে থাকে। এই সেক্টরের বাহিনী দেভাতা ও শ্যামনগর থানা আক্রমণ করে দখল করে নেয়। নৌ-প্রহরার মাধ্যমে বরিশাল-পটুয়াখালীর নদী এলাকায় প্রাধান্য বিস্তার করা হয়। ডিসেম্বরে মাসে চূড়ান্ত আক্রমণের পূর্বে এই সেক্টরকে ৮ নং সেক্টরের সঙ্গে একীভূত করা হয় এবং এর দায়িত্ব অর্পিত হয় মেজর মঞ্জুরের উপর।

১০ নং সেক্টর  নৌ-কমান্ডো বাহিনী নিয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়। এই বাহিনী গঠনের উদ্যোক্তা ছিলেন ফ্রান্সে প্রশিক্ষণরত পাকিস্তান নৌবাহিনীর আট জন বাঙালি নৌ-কর্মকর্তা। এঁরা ছিলেন গাজী মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ (চীফ পেটি অফিসার), সৈয়দ মোশাররফ হোসেন (পেটি অফিসার), আমিন উল্লাহ শেখ (পেটি অফিসার), আহসান উল্লাহ (এম.ই-১), এ.ডব্লিউ.চৌধুরী (আর.ও-১), বদিউল আলম (এম.ই-১), এ.আর মিয়া (ই.এন-১) এবং আবেদুর রহমান (স্টুয়ার্ড-১)। এই আটজন বাঙালি নাবিককে ভারতীয় নৌবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় দিল্লির পার্শ্ববর্তী যমুনা নদীতে বিশেষ নৌ-প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এর পর পাকিস্তান নৌবাহিনীর কিছুসংখ্যক নৌ-সেনা এদের সঙ্গে এসে যোগ দেন। বিভিন্ন সেক্টর থেকে এমন ১৫০ জন ছাত্র ভলান্টিয়ারকে বাছাই করা হয় যারা দক্ষ সাতারু হিসেবে পরিচিত এবং তাদের প্রশিক্ষণের জন্য এই ক্যাম্পে পাঠানো হয়। তাদের বোমা নিক্ষেপ এবং জাহাজ ধ্বংসের জন্য লিম্পেট মাইন ব্যবহারের কৌশল শিক্ষা দেয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে এদের চারটি দল চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, দাউদকান্দি ও মংলা বন্দরে পাঠানো হয়। এদের দায়িত্ব ছিল উপকূলে নোঙ্গর করা জাহাজ ধ্বংস করা। পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে (১৪ আগস্ট) এই চারটি দল একযোগে আক্রমণ চালিয়ে বেশ কিছুসংখ্যক পাকিস্তানি জাহাজ ধ্বংস করে। এ ডব্লিউ চৌধুরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়োজিত দলটি পাকিস্তানি কার্গো জাহাজ এমডি ওহ্রমাজ্দ ও এমভি আল-আববাস সহ সাতটি জাহাজ ধ্বংস করে। এর পর অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে দেশের সকল বন্দরে অনুরূপ আরো কয়েকটি অপারেশন চালানো হয় এবং বেশ কিছুসংখ্যক সমুদ্রগামী ও উপকূলীয় জাহাজ বন্দরে ডুবিয়ে দেয়া হয়। পরে ভারতীয় কমান্ডার এম.এন সুমন্ত এ বাহিনীর নেতৃত্ব দেন।

১১ নং সেক্টর  টাঙ্গাইল জেলা এবং কিশোরগঞ্জ মহকুমা ব্যতীত সমগ্র ময়মনসিংহ জেলা নিয়ে গঠিত। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর এম. আবু তাহের। মেজর তাহের যুদ্ধে গুরুতর আহত হলে স্কোয়াড্রন লীডার হামিদুল্লাহকে সেক্টরের দায়িত্ব দেয়া হয়। মহেন্দ্রগঞ্জ ছিল সেক্টরের হেডকোয়ার্টার। এই সেক্টরে প্রায় ২৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করেছে। এই সেক্টরের আটটি সাব-সেক্টর (কমান্ডারদের নামসহ) হচ্ছে: মাইনকারচর (স্কোয়াড্রন লীডার হামিদুল্লাহ); মহেন্দ্রগঞ্জ (লেফটেন্যান্ট মিজান); পুরখাসিয়া (লেফটেন্যান্ট হাশেম); ঢালু (লেফটেন্যান্ট তাহের আহমদ এবং পরে লেফটেন্যান্ট কামাল); রংরা (মতিউর রহমান); শিববাড়ি (ই.পি.আর-এর কয়েকজন জুনিয়র অফিসার); বাগমারা (ই.পি.আর-এর কয়েকজন জুনিয়র অফিসার); এবং মহেশখোলা (জনৈক ই.পি.আর সদস্য)।  এই সেক্টরে ব্যাপক গেরিলা অপারেশন পরিচালিত হয়। নিয়মিত বাহিনী সীমান্ত এলাকায় মুক্ত অঞ্চল দখল করে রাখে। সুবেদার আফতাব যুদ্ধের সারা নয় মাস ধরে রাহুমনিতে মুক্ত এলাকা দখলে রাখেন। এই সেক্টরে মহিলারাও পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে। তাছাড়া টাঙ্গাইলের মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী তার জেলায় ১৬০০০ গেরিলা যোদ্ধা সংগঠিত করেন এবং সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সফল অভিযান পরিচালনা করেন।

বিস্তারিত


মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ঘটনাবলী

৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় এবং ঐ বছর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের মধ্য দিয়ে এর পরিসমাপ্তি ঘটে। এই সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম ছিল বহুবিধ ঘটনা, বিরূপ পরিস্থিতি, অসম আর্থিক বণ্টন ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের বঞ্চনাসহ গুরুতর বিষয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের ক্রমাবনতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর থেকেই পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে যেসব ইস্যুতে সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তার মধ্যে ছিল ভূমি সংস্কার, রাষ্ট্রভাষা, অর্থনীতি ও প্রশাসনের ক্ষেত্রে দুই প্রদেশের মধ্যে বৈষম্য, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং এতদ্সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়।

১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের ১৬৭টিতেই আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে এবং আওয়ামী লীগ নেতা  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের একক প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনিই হন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সংখাগরিষ্ঠ দলের নেতা। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্ব সংখাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগ ও তার নেতা শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ শেখ মুজিব যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, তাতেই পাকিস্তানী সামরিক জান্তার নিকট তাঁর মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ইতোমধ্যে সমস্যা নিরসনের জন্য শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়া খানের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। আলোচনা ব্যর্থ হয় এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা বাঙালি হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি সৈন্য এবং আধা সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে জনগণের মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে।

২৫ মার্চ দিবাগত মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বাঙালিদের উপর অপারেশন চালানোর নির্দেশ দেয়া হয়। ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামক ঐ পরিকল্পনা অনুযায়ী দুটি সদরদপ্তর স্থাপন করা হয়। মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর তত্ত্বাবধানে প্রথম সদরদপ্তরটি গঠিত হয়। এখানে ৫৭তম বিগ্রেডের বিগ্রেডিয়ার আরবাবকে শুধু ঢাকা নগরী ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় এবং মেজর জেনারেল খাদিম রাজাকে প্রদেশের অবশিষ্টাংশে অপারেশনের দায়িত্ব দেয়া হয়। অপারেশনের সার্বিক দায়িত্বে থাকেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান।

ছাত্ররা এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক কর্মীরা ক্যান্টনমেন্টের বাইরে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি সৈন্যদের অভিযান ঠেকাতে রাস্তায় প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করা হয়। ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তানি সৈন্যরা ওয়ারলেস বসানো জিপ ও ট্রাকে করে ঢাকার রাস্তায় নেমে পড়ে। তাদের প্রথম সাঁজোয়া বহরটি ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে এক কিলোমিটারের মধ্যে ফার্মগেট এলাকায় ব্যরিকেডের মুখে পড়ে। রাস্তার এপাশ-ওপাশ জুড়ে ফেলে রাখা হয়েছিল বিশালাকৃতির গাছের গুঁড়ি। অকেজো পুরোনো গাড়ি ও অচল ষ্টীম রোলারও ব্যরিকেডের কাজে ব্যবহার করা হয়। কয়েকশ লোক প্রায় ১৫ মিনিট ধরে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দেয়। তবে সেনাদের গুলি দ্রুতই তাদের নিস্তদ্ধ করে দেয়, সেনাবহর শহরময় ছড়িয়ে শুরু করে  গণহত্যা।

পাকিস্তানি সৈন্যরা রাস্তায়-ফুটপাতে যাকেই দেখতে পায় তাকেই হত্যা করে, সামনে পড়া সবকিছু ধ্বংসের হুমকি দেয়। বাছবিচার না করে শহরের মানুষ ও সরকারি-বেসরকারি সব ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত করে চষে বেড়ায় সৈন্যদের ট্যাঙ্ক। কামান ও বন্দুকের গোলায় ধ্বংস করে বহু আবাসিক এলাকা, আগুন ধরিয়ে দেয় বাড়িঘরে। সৈন্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ঢুকে অনেক ছাত্রকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককেও ঐ রাতে হত্যা করে। পুরনো ঢাকার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে তারা হামলা চালায়, অসংখ্য মানুষ হত্যা করে, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয় ও লুটপাট করে, মহিলাদের ধর্ষণ করে।

নিরস্ত্র জনগণের উপর এই হামলা ও নির্বিচার গণহত্যা অভিযান বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে প্রচারিত হয়। ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তানি সৈন্যরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই দেশের সকল এলাকায় স্বাধীনতার জন্য স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থান গড়ে ওঠে। এই অভ্যুত্থানে অংশ নেয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবী নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষ। পাকবাহিনীর আক্রমণ ও গণহত্যা মোকাবেলার জন্য গড়ে তোলা প্রতিরোধ প্রাথমিক পর্যায়ে স্বল্পস্থায়ী হয়। শত্রু সেনারা সংখ্যায় অনেক ও তারা ছিল অনেক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত, তাই মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যায়। শীঘ্রই দেশের বিভিন্ন অংশে বিচ্ছিন্ন মুক্তিসংগ্রামীদের একটি একক কমান্ডের অধীনে আনা হয়।

এপ্রিল মাসের ৪ তারিখে মুক্তিবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চা বাগানে পরিবৃত আধা-পাহাড়ি এলাকা তেলিয়াপাড়ায় অবস্থিত দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলের সদরদপ্তরে একত্রিত হন। কর্নেল এম.এ.জি ওসমানী, লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুর রব, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সালাহ উদ্দিন মোহাম্মদ রেজা, মেজর কাজী নুরুজ্জামান, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর নুরুল ইসলাম, মেজর শাফাত জামিল, মেজর মইনুল হোসেন চৌধুরী প্রমুখ সেনা কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত হন। এ সভায় চারজন সিনিয়র কমান্ডারকে অপারেশনের দায়িত্ব দেয়া হয়। মেজর সফিউল্লাহকে সিলেট-ব্রাহ্মণবাড়ীয়া অঞ্চলের অধিনায়কের দায়িত্ব দেয়া হয়। কুমিল্লা-নোয়াখালি অঞ্চলের অধিনায়কের দায়িত্ব পান মেজর খালেদ মোশাররফ। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মেজর জিয়াউর রহমান এবং কুষ্টিয়া-যশোর অঞ্চলের অধিনায়ক হন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী। এ সভাতেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বাহিনী সম্পর্কিত সাংগঠনিক ধারণা এবং কমান্ড কাঠামোর রূপরেখা প্রণীত হয়। কর্নেল এম.এ.জি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর সর্বময় নেতৃত্ব দেয়া হয়।

১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার তথা মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। পরদিনই তাজউদ্দিন আহমদ আরও তিনজন আঞ্চলিক অধিনায়কের নাম ঘোষণা করেন। ক্যাপ্টেন নওয়াজিশ রংপুর অঞ্চলের, মেজর নাজমুল হক দিনাজপুর-রাজশাহী-পাবনা অঞ্চলের এবং মেজর এম.এ জলিল বরিশাল-পটুয়াখালি অঞ্চলের অধিনায়কত্ব লাভ করেন। প্রতিটি অঞ্চলকে একেকটি সেক্টর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১০ থেকে ১৭ জুলাই অনুষ্ঠিত সেক্টর কমান্ডারদের এক সম্মেলনে অপারেশন চালানোর সুবিধার্থে সমগ্র বাংলাদেশকে এগারোটি সেক্টর ও বিভিন্ন সাব-সেক্টরে বিভক্ত করা হয়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ২৭ মার্চ বাঙালিদের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি তাঁর সরকারের পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করেন। ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী (বিএসএফ) অত্যাচরিত ও ভীতসন্ত্রস্ত বাঙালিদের নিরাপদ আশ্রয় প্রদানের লক্ষ্যে বাঙলাদেশ-ভারত সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেয়।

পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা রাজ্যের সরকারগুলো সীমান্ত বরাবর শরণার্থী শিবির স্থাপন করে। এ শিবিরগুলো থেকে তাৎক্ষণিকভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের বাছাই করা হতো। পাকিস্তানি সৈন্যদের কবল থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করার অদম্য বাসনায় ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক ও রাজনৈতিক কর্মীরা মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করে যুদ্ধের কৌশল, অস্ত্র চালনা ও বিস্ফোরক সম্পর্কে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের বিভিন্ন সেক্টরে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিয়োজিত করা হয়। কলকাতার ৮ নং থিয়েটার রোডে বাংলাদেশ বাহিনীর সদরদপ্তর স্থাপিত হয়। ১২ এপ্রিল থেকে এই সদরদপ্তর কার্যক্রম শুরু করে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম.এ রব এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে খন্দকারকে যথাক্রমে চীফ অব স্টাফ এবং ডেপুটি চীফ অব স্টাফ নিয়োগ করা হয়।

পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি আরও অনেক বাহিনী সংগঠিত হয়। এ সকল বাহিনীর মধ্যে টাঙ্গাইলের কাদের বাহিনী, সিরাজগঞ্জের লতিফ মির্জা বাহিনী, ঝিনাইদহের আকবর হোসেন বাহিনী, ফরিদপুরের হেমায়েত বাহিনী, বরিশালের কুদ্দুস মোল্লা বাহিনী ও গফুর বাহিনী এবং ময়মনসিংহের আফসার বাহিনী ও আফতাব বাহিনী উল্লেখযোগ্য। এ সকল বাহিনী স্থানীয়ভাবে সংগঠিত হয়ে নিজেদের শক্তিতে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ শিকদার বরিশালে তাঁর বাহিনীকে সংগঠিত করেন। ভারতের সেনাবাহিনীর গেরিলা যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল ওবানের সক্রিয় সহযোগিতায় মুজিব বাহিনী নামে আরেকটি বাহিনী গঠিত হয়। মুজিববাহিনীর সদস্যদের দেরাদুনে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ছাত্রলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণি, তোফায়েল আহমদ, আবদুর রাজ্জাক এবং সিরাজুল আলম খান ছিলেন এই বাহিনীর সংগঠক।

মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত ও অনিয়মিত দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল। অনিয়মিত বাহিনী গণবাহিনী নামে পরিচিত ছিল। নিয়মিত বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের সৈন্যরা। ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণের পর বিভিন্ন সেক্টরে গণবাহিনীতে নিয়োগ করা হতো। গণবাহিনীর সদস্যদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে শত্রুর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য পাঠানো হয়। নিয়মিত বাহিনীর সদস্যরা সশস্ত্রবাহিনীর প্রথাগত যুদ্ধে নিয়োজিত ছিলেন। ‘জেড ফোর্স’ নামে পরিচিত নিয়মিত বাহিনীর প্রথম ব্রিগেডটি জুলাই মাসে গঠিত হয়। এই ব্রিগেডের কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমানের নামের ইংরেজি আদ্যক্ষর ‘জেড’ অনুসারে ব্রিগেডটির নামকরণ করা হয়। ব্রিগেডটি ১ম, ৩য় ও ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়ে গঠিত হয়। ‘এস ফোর্স’ নামে পরিচিত দ্বিতীয় নিয়মিত ব্রিগেডটি দ্বিতীয় ও একাদশ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের নিয়ে অক্টোবরে গঠিত হয়। এ ব্রিগেডের অধিনায়ক ছিলেন সফিউল্লাহ। খালেদ মোশাররফের অধিনায়কত্বে ‘কে ফোর্স’ গঠিত হয় ৪র্থ, ৯ম ও ১০ম ইস্ট বেঙ্গলের সদস্যদের নিয়ে।

নাগাল্যান্ডের দিমাপুরে ২৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ বিমানবাহিনী গঠিত হয়। এর সংগঠক ছিলেন এয়ার কমোডর এ.কে খন্দকার। স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বদরুল আলম, ক্যাপ্টেন খালেক, সাত্তার, শাহাবুদ্দিন, মুকিত, আকরাম, শরফুদ্দিন এবং ৬৭ জন বিমানসেনা নিয়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যাত্রা শুরু হয়। তাদের সম্বল ছিল মাত্র কয়েকটি ডাকোটা, অটার টাইপ বিমান এবং অ্যালুভেট হেলিকপ্টার। অনুরূপভাবে, পাকিস্তান নৌবাহিনী থেকে বেরিয়ে আসা নৌসেনাদের নিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী গঠিত হয়। ১৯৭১ সালের ৯ নভেম্বর প্রথম নৌবহর ‘বঙ্গবন্ধু নৌবহর’ উদ্বোধন করা হয়।

এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল মাত্র ৬টি ছোট নৌযান। নিয়মিত ব্রিগেড, সেক্টর ট্রুপ ও গেরিলা বাহিনী, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনী নিয়ে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী সুসংগঠিত ছিল।

মুক্তিবাহিনী শুরুতে প্রতিরোধমূলক অনেকগুলো যুদ্ধে শত্রুর বিরুদ্ধে সফলভাবে লড়াই করে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে তাদের সাময়িক পশ্চাদপসরণ করতে হয়। মুক্তিবাহিনী অবশ্য পরে সংগঠিত হয়ে উন্নততর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একাত্তরের এপ্রিল-মে মাসের পর থেকে নব উদ্দীপনায় যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীন এ যুদ্ধকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে উল্লেখ করে পাকিস্তানকে কৌশলগত সমর্থন দেয়। পক্ষান্তরে, ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তাদের মিত্র দেশসমূহ এবং জাপান ও পশ্চিমের অনেক দেশের সাধারণ জনগণ বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেয়। চীন-যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান অক্ষের বিরুদ্ধে কৌশলগত সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট ভারত সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে একটি মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষর করে। এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়।

এদিকে মুক্তিবাহিনীর সদরদপ্তরে পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কৌশল পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা হয়। চিরাচরিত রণকৌশল পাকিস্তানি সৈন্যদের পরাজিত করার পক্ষে অনুকূল হবে না ভেবে সারাদেশে সর্বাত্মক গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেমতে সেক্টর কমান্ডারদের দেশের অভ্যন্তর থেকে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট করে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে নিয়োগের নির্দেশ দেয়া হয়।

১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ড গঠিত হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কম্যান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা যৌথ বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হন। অবশ্য ৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় অমৃতসর, শ্রীনগর ও কাশ্মীর উপত্যকায় পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বোমা বর্ষণের পর থেকেই মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ড কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করে। তখনই ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর উপর নির্দেশ আসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে প্রত্যাঘাত করার। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ক্রমশ অগ্রসর হতে থাকে। ফলে পাকিস্তানি সৈন্যদের পরাজয় ও আত্মসমর্পণ অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হওয়ার প্রাক্কালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন এতে ভেটো প্রয়োগ করায় এই প্রচেষ্টা নস্যাৎ হয়ে যায়।

ভারতীয় সৈন্য এবং এগারো নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা ১৪ ডিসেম্বর ঢাকার টঙ্গীর কাছে পৌঁছে। ১৬ ডিসেম্বর সকালে তারা সাভারে অবস্থান নেয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩৬ নম্বর ডিভিশনের অধিনায়ক মেজর জেনারেল জমশেদ ঢাকা নগরীর সন্নিকটে মীরপুর সেতুর কাছে ভারতীয় অধিনায়ক মেজর জেনারেল নাগরাকে অভ্যর্থনা জানান। সকাল দশটায় মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সৈন্যরা ঢাকায় প্রবেশ করে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চীফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জ্যাকব পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খসড়া দলিল নিয়ে অপরাহ্ণ এক ঘটিকায় ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা এক হেলিকপ্টার বহরে তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে বিকাল চারটায় ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছেন। মুক্তিবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেন ডেপুটি চীফ অব স্টাফ গ্রুপ-ক্যাপ্টেন এ.কে খন্দকার। পরাজিত পাকিস্তানি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ.এ.কে নিয়াজী লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরাকে আত্মসমর্পণসূচক অভ্যর্থনা জানান। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকাল পাঁচটা এক মিনিটে রমনা রেসকোর্সে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যৌথ কম্যান্ডের পক্ষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এবং পাকিস্তান বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কম্যান্ডের পক্ষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজী পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন। 

বিস্তারিত


যুদ্ধকালীন মুদ্রা ও ডাকটিকিট

স্বধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন অর্থাৎ ১৯৭১ সালের জুলাই মাসের ২৯ তারিখ বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। এ সময় ৮টি ডাকটিকিট প্রকাশের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের ডাকটিকিট ছাপানো শুরু করে। ডাকটিকিট গুলো প্রকাশিত হয় লন্ডনের ফরম্যাট ইন্টারন্যাশ্নাল সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস থেকে।

সে সময় মুদ্রিত ডাকটিকিট গুলোর মূল্যমান ছিল ১০পয়সা, ২০পয়সা, ৫০পয়সা, ১.০০রূপী, ২.০০রূপী, ৩.০০রূপী, ৫.০০রূপী, ১০.০০রূপীর। এই ডাকটিকিট গুলোর নকশা প্রনয়ন করেন বিমান মল্লিক।

বিস্তারিত


কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছিল, তখন জর্জ হ্যারিসন তার বন্ধু রবি শংকর এর পরামর্শে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেন প্রাঙ্গনে দুটি দাতব্য সঙ্গীতানুষ্ঠান(কনসার্ট) এর আয়োজন করেন।

অনুষ্ঠানটি তে জর্জ হ্যারিসন, রবি শংকর ছাড়াও গান পরিবেশন করেন বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, অপ্র বিটল্‌ রিঙ্গো স্টার সহ আরও অনেকে। কনসার্টে জর্জ হ্যারিসন তার নিজের লেখা বাংলাদেশ গান পরিবেশন করেন। কনসার্টের টিকেট, সিডি ও ডিভিডি হতে প্রাপ্ত অর্থ ইউনিসেফের ফান্ডে জমা করা হয়।

বিস্তারিত


মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ইংরেজি নাম Ministry of Liberation War Affairs। বর্তমান মন্ত্রী  আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠিত হয় কত সালে ২০০১ সালের ২৩ অক্টোবর।


বাংলাদেশের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ

বীর শ্রেষ্ঠ বীরত্বের জন্য প্রদত্ত বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক পদক। যুদ্ধক্ষেত্রে অতুলনীয় সাহস ও আত্মত্যাগের নিদর্শন স্থাপনকারী যোদ্ধার স্বীকৃতিস্বরূপ এই পদক দেয়া হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ সাতজন মুক্তিযোদ্ধাকে এই পদক দেয়া হয়েছে ।

ক্রম নাম সেক্টর পদবী
০১ মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর বাংলাদেশ সেনা বাহিনী ক্যাপ্টেন
০২ হামিদুর রহমান বাংলাদেশ সেনা বাহিনী সিপাহী
০৩ মোস্তফা কামাল বাংলাদেশ সেনা বাহিনী সিপাহী
০৪ মোহাম্মদ রুহুল আমিন বাংলাদেশ নৌ বাহিনী ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার
০৫ মতিউর রহমান বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট
০৬ মুন্সি আব্দুর রউফ বাংলাদেশ রাইফেলস ল্যান্স নায়েক
০৭ নূর মোহাম্মদ শেখ বাংলাদেশ রাইফেলস ল্যান্স নায়েক

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থ

বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্যের প্রকাশনায় একটি বড় প্রভাব বিস্তার করেছে।বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও স্বাধীনতা-পূর্ব আন্দোলনসমূহ। বিভিন্ন গল্প-উপন্যাস, প্রতিবেদনে স্বাধীনতা-পূর্ব ও যুদ্ধকালীন বাংলাদেশ, যুদ্ধাবস্থায় শরণার্থী, যুদ্ধে বিদেশী ও প্রবাসী বাংলাদেশীদের সহায়তা, কর্মকাণ্ড প্রভৃতি বিধৃত হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত প্রকাশিত বইগুলোর তালিকা দেখতে এখানে Click করুন।


মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্থাপত্য ও ভাস্কর্য সমূহ

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্থাপত্য ও ভাস্কর্য সমূহ:

স্থাপত্য ও ভাস্কর্য         

স্থান

স্থপতি

জাতীয় স্মৃতিসৌধ

সাভার                

সৈয়দ মঈনুল হোসেন

জাগ্রত চৌরঙ্গী

গাজীপুর চৌরাস্তা

আবদুর রাজ্জাক

বিজয়োল্লাস   

আনোয়ার পাশা ভবন 

শামীম শিকদার

বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ  

মিরপুর, ঢাকা 

মোস্তফা হারুন কুদ্দুস

স্বাধীনতা

বঙ্গবন্ধু, এভিনিউ, ঢাকা

হামিদুজ্জামান খান

মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ 

মেহেরপুর    

তানভীর কবীর

স্বোপার্জিত স্বাধীনতা   

টিএসসি সড়ক দ্বীপ, ঢাবি

শামীম শিকদার

জয়বাংলা জয় তারুণ্য 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়   

আলাউদ্দিন বুলবুল

অপরাজেয় বাংলা               

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়   

আবদুল্লাহ খালেদ

সংশপ্তক          

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

হামিদুজ্জামান খান

মুক্ত বাংলা        

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়  

রশিদ আহমেদ

সাবাস বাংলাদেশ         

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়      

নিতুন কুন্ডু

স্মারক ভাস্কর্য           

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়       

মর্তুজা বশীর

চেতনা-৭১              

পুলিশ লাইন, কুষ্টিয়া       

মোহাম্মদ ইউসুফ

রক্তসোপান             

রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাস      

গাজীপুর

বিজয় ৭১              

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়  

খন্দকার বদরুল ইসলাম

কিংবদন্তী               

মিরপুর, ঢাকা      

হামিদুজ্জামান খান

৭১ এর গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের

প্রস্তুতি  জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ভাস্কর রাসা

দুর্জয় ভৈরব  

ভৈরব, কিশোরগঞ্জ

 

রক্তগৌরব        

বদরগঞ্জ, রংপুর

 

বীরের প্রত্যাবর্তন    

বাড্ডা, গুলশান           

সুদীপ্ত

স্মরণ            

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়  

সৈয়দ সাইফুল কবির


সংবিধান

সংবিধান কোন রাষ্ট্রের মূল ও সর্বোচ্চ আইন এর প্রধান কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান অঙ্গ তথা শাসন বিভাগ। আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার সুষম বন্টন করা। সংবিধান সাধারনত দুধরনের হয়- লিখিত সংবিধান ও অলিখিত সংবিধান। অলিখিত সংবিধানের উদাহরন যুক্তরাজ্য, স্পেন, নিউজিল্যান্ড সৌদিআরব প্রভৃতি দেশ অপরদিকে ভারত, বাংলাদেশ প্রভৃতি দেশের সংবিধান লিখিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংবিধান ভারতের ও সবচেয়ে ছোট সংবিধান যুক্তরাষ্ট্রের।

গনপরিষদ গঠন ও কার্যক্রম

সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে ১৯৭২ সালের ১১ই এপ্রিল ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। তাঁরা হলেন:

ড. কামাল হোসেন (ঢাকা-৯, জাতীয় পরিষদ), মো. লুৎফর রহমান (রংপুর-৪, জাতীয় পরিষদ), অধ্যাপক আবু সাইয়িদ (পাবনা-৫, জাতীয় পরিষদ), এম আবদুর রহিম (দিনাজপুর-৭, প্রাদেশিক পরিষদ), এম আমীর-উল ইসলাম (কুষ্টিয়া-১, জাতীয় পরিষদ), মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম মনজুর (বাকেরগঞ্জ-৩, জাতীয় পরিষদ), আবদুল মুনতাকীম চৌধুরী (সিলেট-৫, জাতীয় পরিষদ), ডা. ক্ষিতীশ চন্দ্র (বাকেরগঞ্জ-১৫, প্রাদেশিক পরিষদ), সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত (সিলেট-২, প্রাদেশিক পরিষদ), সৈয়দ নজরুল ইসলাম (ময়মনসিংহ-১৭, জাতীয় পরিষদ), তাজউদ্দীন আহমদ (ঢাকা-৫, জাতীয় পরিষদ), খন্দকার মোশতাক আহমেদ (কুমিল্লা-৮, জাতীয় পরিষদ), এ এইচ এম কামরুজ্জামান (রাজশাহী-৬, জাতীয় পরিষদ), আবদুল মমিন তালুকদার (পাবনা-৩, জাতীয় পরিষদ), আবদুর রউফ (রংপুর-১১, ডোমার, জাতীয় পরিষদ), মোহাম্মদ বায়তুল্লাহ (রাজশাহী-৩, জাতীয় পরিষদ), বাদল রশীদ, বার অ্যাট ল, খন্দকার আবদুল হাফিজ (যশোর-৭, জাতীয় পরিষদ), শওকত আলী খান (টাঙ্গাইল-২, জাতীয় পরিষদ), মো. হুমায়ুন খালিদ, আছাদুজ্জামান খান (যশোর-১০, প্রাদেশিক পরিষদ), এ কে মোশাররফ হোসেন আখন্দ (ময়মনসিংহ-৬, জাতীয় পরিষদ), আবদুল মমিন, শামসুদ্দিন মোল্লা (ফরিদপুর-৪, জাতীয় পরিষদ), শেখ আবদুর রহমান (খুলনা-২, প্রাদেশিক পরিষদ), ফকির সাহাব উদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক খোরশেদ আলম (কুমিল্ল্না-৫, জাতীয় পরিষদ), অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক (কুমিল্লা-৪, জাতীয় পরিষদ), দেওয়ান আবু আব্বাছ (কুমিল্লা-৫, জাতীয় পরিষদ), হাফেজ হাবিবুর রহমান (কুমিল্লা-১২, জাতীয় পরিষদ), আবদুর রশিদ, নুরুল ইসলাম চৌধুরী (চট্টগ্রাম-৬, জাতীয় পরিষদ), মোহাম্মদ খালেদ (চট্টগ্রাম-৫, জাতীয় পরিষদ) ও বেগম রাজিয়া বানু (নারী আসন, জাতীয় পরিষদ)।

একই বছরের ১৭ই এপ্রিল থেকে ৩রা অক্টোবর পর্যন্ত এই কমিটি বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করে। জনগণের মতামত সংগ্রহের জন্য মতামত আহবান করা হয়। সংগ্রহীত মতামত থেকে ৯৮টি সুপারিশ গ্রহণ করা হয়। ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন খসড়া সংবিধান বিল আকারে উত্থাপন করেন।

১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ (বিজয় দিবস) থেকে কার্যকর হয়।

বিস্তারিত


সংবিধানের বিধানের ধারা ও বিষয়বস্তু

সংবিধানের বিভাগ, বিষয় ও অনুচ্ছেদে

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫৩টি ধারা ও ১১ টি ভাগ রয়েছে।যথা:

প্রথম ভাগ : প্রজাতন্ত্র
অনুচ্ছেদ
১. প্রজাতন্ত্র, ২. প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় সীমানা, ২-ক, রাষ্ট্রধর্ম, ৩. রাষ্ট্র ভাষা, ৪. জাতীয় সঙ্গীত, পতাকা ও প্রতীক, ৫. রাজধানী, ৬. নাগরিকত্ব, ৭. সংবিধানের প্রধান্য।

দ্বিতীয় ভাগ : রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনিতি
৮. মূলনীতিসমূহ, ৯. স্থানীয় শাসন-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের উন্নয়ন, ১০. জাতীয় জীবনে মহিলাদের অংশগ্রহণ, ১১. গণতন্ত্র ও মানবাধিকার, ১২. [বিলুপ্ত], ১৩. মালিকানার নীতি, ১৪. কৃষক ও শ্রমিকের মুক্তি, ১৫. মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা, ১৬. গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষিবিপ্লব, ১৭. অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা, ১৮. জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা, ১৯. সুযোগের সমতা, ২০. অধিকার ও কর্তব্যরূপে কর্ম, ২১. নাগরিক ও সরকারী কর্মচারীদের কর্তব্য, ২২. নির্বাহী বিভাগ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ, ২৩. জাতীয় সংস্কৃতি, ২৪. জাতীয স্মৃতি নিদর্শন প্রভূতি, ২৫. আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও সংহতির উন্নয়ন

তৃতীয় ভাগ : মৌলিক অধিকার
২৬. মৌলিক অধিকারের সহিত অসামাজ্ঞস্য আইন বাতিল, ২৭. আইনের দৃষ্টিতে সমতা, ২৮. ধর্ম প্রভৃতি কারণের বৈষম্য, ২৯. সরকারী নিয়োগ লাভে সুযোগের সমতা, ৩০. বিদেশী খেতাব প্রভৃতি গ্রহণ নিষিদ্ধকরণ, ৩১. আইনের আম্রয় লাভের অধিকার, ৩২. জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকার-রক্ষণ, ৩৩. গ্রেপ্তার ও আটক সম্পর্কে রক্ষাকবচ, ৩৪. জবরদস্তি-শ্রম নিষিদ্ধকরন, ৩৫. বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে রক্ষন, ৩৬. চলাফেরার স্বাধীনতার, ৩৭. সমাবেশের স্বাধীনতা, ৩৮. সংগঠনের স্বাধীনতা, ৩৯. চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক স্বাধীনতা, ৪০. পেশা বা বৃত্তির-স্বাধীনতা, ৪১. ধর্মীয় স্বাধীনতা, ৪২. সম্পত্তির অধিকার, ৪৩. গৃহ ও যোগাযোগের রক্ষন, ৪৪. মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ, ৪৫. শৃঙ্খলামূলক আইনের ক্ষেত্রে অধিকারের পরিবর্তন, ৪৬. দায়মুক্তি-বিধানের ক্ষমতা, ৪৭. কতিপয় আইনের হেফাজত, ৪৭ক. সংবিধানের কতিপয় বিধানের অপ্রযোজ্যতা

চতুর্থ ভাগ : নির্বাহী বিভাগ
১ম পরিচ্ছেদ-রাষ্ট্রপতি
৪৮. রাষ্ট্রপতি, ৪৯. ক্ষমা প্রদর্শনের অধিকার, ৫০. রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ, ৫১. রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি, ৫২. রাষ্ট্রপতির অভিশংসন, ৫৩. অসামর্থের কারনে রাষ্ট্রপতির অপসারন, ৫৪. অনুপস্থিতি প্রভূতির কালে রাষ্ট্রপতি পদে স্পীকার।
২য় পরিচ্ছেদ-প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভা
৫৫. মন্ত্রীসভা, ৫৬. মন্ত্রিগণ, ৫৭. প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদ, ৫৮. অন্যান্য মন্ত্রীর পদের মেয়াদ
তৃতীয় পরিচ্ছেদ-স্থানীয় শাসন
৫৯. স্থানীয় শাসন, ৬০ স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা
৪র্থ পরিচ্ছেদ-প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ
৬১. সর্বাধিনায়কতা, ৬২. প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগে ভর্তি প্রভূতি, ৬৩. যুদ্ধ
৫ম পরিচ্ছেদ-অ্যাটর্নি জেনারেল
৬৪. অ্যাটর্নি জেনারেল

পঞ্চম ভাগ : আইনসভা
১ম পরিচ্ছেদ-সংসদ
৬৫. সংসদ-প্রতিষ্ঠা, ৬৬. সংসদে নির্বাচিত হইবার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা, ৬৭. সদস্যদের আসন শূন্য হওয়া, ৬৮. সংসদ সদস্যদের পারিশ্রমিক প্রভূতি, ৬৯. শপথ গ্রহণের পূর্বে আসন গ্রহণ বা ভোটদান করিলে সদস্যের অর্থদণ্ড, ৭০. পদত্যাগ ইত্যাদি কারনে আসন শূন্য হওয়া, ৭১. দ্বৈত-সদস্যতায় বাধা, ৭২. সংসদের অধিবেশন, ৭৩. সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও বাণী, ৭৩ক. সংসদ সম্পর্কে মন্ত্রীগণের অধিকার, ৭৪. স্পিকার ও ডেপুটি স্পকিার, ৭৫. কার্যপ্রণালী-বিধি, কোরাম প্রভূতি, ৭৬. সংসদের স্থায়ী কমিটিসমূহ, ৭৭. ন্যায়পাল, ৭৮. সংসদ ও সস্যদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি, ৭৯. সংসদ-সচিবালয়
২য় পরিচ্ছেদ-আইন প্রণয়ন ও অর্থ সংক্রান্ত পদ্ধতি
৮০. আইন প্রণয়-পদ্ধতি, ৮১. অর্থবিল, ৮২. আর্থিক ব্যবস্থাবলী সুপারিশ, ৮৩. সংসদের আইন ব্যতীত করারোপে বাধা, ৮৪. সংযুক্ত তহবিল ও প্রজাতন্ত্রের সহকারী হিসাব, ৮৫. সরকারী অর্থের নিয়ন্ত্রন, ৮৬. প্রজাতন্ত্রের সরকারী হিাসাবে প্রদেয় অর্থ, ৮৭. বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি, ৮৮. সংযুক্ত তহবিলের উপর দায়, ৮৯. বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি সম্পর্কে পদ্ধতি, ৯০. নির্দিষ্টকরণ আইন, ৯১. সম্পূরক ও অতিরিক্ত মঞ্জুরী, ৯২. হিসাব, ঋণ প্রভূতির ভোট, ৯৩. [বিলুপ্ত]
৩য় পরিচ্ছেদ-অধ্যাদেশ প্রণয়ন-ক্ষমতা
৯৩. অধ্যাদেশ প্রণয়ন ক্ষমতা

(ষষ্ঠ ভাগ : বিচার বিভাগ) ১ম পরিচ্ছেদ-সুপ্রীম কোর্ট
৯৪. সুপ্রীম কোর্ট প্রতিষ্ঠা, ৯৫. বিচারক নিয়োগ, ৯৬. বিচারকদের পদের মেয়াদ, ৯৭. অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, ৯৮. সুপ্রীম কোর্টের অতিরিক্ত বিচারকগণ, ৯৯. বিচারকগণের অক্ষমতা, ১০০. সুপ্রীম কোর্টের আসন (১০) হাইকোর্ট বিভাগের এখতিয়ার, ১০২. কতিপয় আদেশ ও নির্দেশ প্রভূতি দানের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতা, ১০৩. আপিল বিভাগের এখতিয়ার, ১০৪. আপীল বিভার্গে পরোয়ানা জারী ও নির্বাহ, ১০৫. আপিল বিভাগ কর্তৃক রায় বা আদেশ পুনর্বিবেচনা, ১০৬. সুপ্রীম কোর্টের উপদেষ্টামূলক এখতিয়ার, ১০৭. সুপ্রীম কোর্টের বিধিপ্রণয়ন-ক্ষমতা, ১০৮. কোর্ট অর রেকর্ড রূপে সুপ্রীম কোর্ট, ১০৯. আদালত সমূহের উপর তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রন, ১১০. অধস্তন আদালত হইতে হাইকোর্ট বিভাগের মামলা স্থানান্তর, ১১১. সুপ্রীম কোর্টের রায়ের বাধ্যতামূলক কার্যকারিতা, ১১২. সুপ্রীম কোর্টের সহায়তা, ১১৩. সুপ্রীম কোর্টের কর্মচারীগণ
২য় পরিচ্ছেদ-অধস্তন
১১৪. অধ:স্তন আদালতসমূহ প্রতিষ্ঠা, ১১৫. অধ:স্তন আদারতে নিয়োগ, ১১৬. অধ:স্তন আদালতসমূহের নিয়ন্ত্রন ও শৃঙ্খলা, ১১৬ক. বিচার বিভাগীয় কর্মচারীগণ বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন
৩য় পরিচ্ছেদ-প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল
১১৭. প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালসমুহ
ষষ্ঠ ভাগ : জাতীয় কল-[বিলুপ্ত]

সপ্তম ভাগ : নির্বাচন
১১৮. নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠা, ১১৯. নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব, ১২০. নির্বাচন কমিশনের কর্মচারগিণ, ১২১. প্রতি এলাকার জন্য একটি মাত্র ভোটার তালিকা, ১২২. ভোটার-তালিকায় নামভুক্তি যোগ্যতা, ১২৩. নির্বাচন-অনুষ্ঠানের সময়, ১২৪. নির্বাচন সম্পর্কে সংসদের বিধান প্রণয়নের ক্ষমতা, ১২৫. নির্বাচনী আইন ও আইনের বৈধতা, ১২৬. নির্বাচন কমিশনকে নির্বাহী কর্তৃপক্ষের সহায়তাদান।

অষ্টম ভাগ : মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক
১২৭. মহাহিসাব নিরীক্ষক পদের প্রতিষ্ঠা, ১২৮. মহা হিসাব নিরীক্ষকের দায়িত্ব, ১২৯. মহা হিসাব নিরীক্ষকের কর্মের মেয়াদ, ১৩০. অস্থায়ী মহা হিসাব নিরীক্ষক, ১৩১. প্রজাতন্ত্রের হিসাব রক্ষার আকার ও পদ্ধতি, ১৩২. সংসদে মহা হিসাব নিরীক্ষকের রিপোর্ট উপস্থাপন

নবম ভাগ : বাংলাদেশের কর্মবিভাগ
১ম পরিচ্ছেদ- কর্মবিভাগ
১৩৩. নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলী, ১৩৪. কর্মের মেয়াদ, ১৩৫. অসামরিক সরকারী কর্মচারীদের প্রভূতি, ১৩৬. কর্মবিভাগ পুনর্গঠন
২য় পরিচ্ছেদ-সরকারী কর্মকমিশন
১৩৭. কমিশন প্রতিষ্ঠা, ১৩৮. সদস্য নিয়োগ, ১৩৯. পদের মেয়াদ, ১৪০. কমিশনের দাযিত্ব, ১৪১. বার্ষিক রিপোর্ট

দশম ভাগ : সংবিধান সংশোধন
১৪২. সংবিধানের বিধান সংশোধনের ক্ষমতা।

একাদশ ভাগ : বিবিধ
১৪৩ প্রজাতন্ত্রের সম্পত্তি, ১৪৪. সম্পত্তি ও কারবার প্রভূতি সম্পর্কে নির্বাহী কর্তৃত্ব, ১৪৫. চুক্তি ও দলিল, ১৪৫ক. আন্তর্জাতিক চুক্তি, ১৪৬. বাংলাদেশের নামে মামলা, ১৪৭. কতিপয় পদাধিকারীর পারিশ্রমিক প্রভূতি, ১৪৮. পদের শপথ, ১৪৯. প্রচলিত আইনের হেফাজত, ১৫০. ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলী, ১৫১. রহিতকরণ, ১৫২. ব্যাখ্যা, ১৫৩. প্রবর্তন, উল্লেখ, নির্ভরযোগ্য পাঠ

বিস্তারিত


বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা

আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া [জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের} মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভেৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি, আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহিদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল- [জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার] সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মুলনীতি হইবে। আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মেৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে;

আমরা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করিতেছি যে, আমরা যাতে স্বাধীন সত্তায় সমৃদ্ধি লাভ করিতে পারি এবং মানবজাতির প্রগতিশীল আশা-আকাঙ্খার সহিত সঙ্গতি রক্ষা করিয়া আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে পূর্ণ ভূমিকা পালন করিতে পারি, সেইজন্য বাংলাদেশের জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি স্বরুপ এই সংবিধানের প্রাধান্য অক্ষুন্ন রাখা এবং এর রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তাবিধান আমাদের পবিত্র কর্তব্য;

এতদ্বারা আমাদের এই গণপরিষদে, অদ্য তের শত ঊনআশি বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসের আঠার তারিখ, মোতাবেক উনিশ শত বাহাত্তর খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসের চার তারিখে, আমরা এই সংবিধান রচনা ও বিধিবদ্ধ করিয়া সমবেতভাবে প্রহণ করিলাম।

 


 


বাংলাদেশের সংবিধানের বৈশিষ্ট্য

১. লিখিত দলিল: বাংলাদেশের সংবিধান একটি লিখিত দলিল। এর ১৫৩টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এটি ১১টি ভাগে বিভক্ত। এর একটি প্রস্তাবনাসহ চারটি তফসিল রয়েছে।

২. দুষ্পরিবর্তনীয়: বাংলাদেশের সংবিধান দুষ্পরিবর্তনীয়। কারণ, এর কোনো নিয়ম পরিবর্তন বা সংশোধন করতে জাতীয় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতির প্রয়োজন হয়।

৩. রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি: জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এসব মূলনীতির দ্বারা অনুপ্রাণিত ও প্রভাবিত হয়ে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে।

৪. মৌলিক অধিকার: সংবিধান হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরা কী কী অধিকার ভোগ করতে পারব তা সংবিধানে উল্লেখ থাকায় এগুলোর গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে।

৫. সর্বজনীন ভোটাধিকার: বাংলাদেশের সংবিধানের সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, পেশা নির্বিশেষে ১৮ বছর বয়সের এ দেশের সকল নাগরিক ভোটাধিকার লাভ করেছে।

৬. প্রজাতান্ত্রিক: সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি প্রজাতন্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানে সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। জনগণের পক্ষে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ ক্ষমতা পরিচালনা করবেন।

৭. সংসদীয় সরকার: বাংলাদেশের সংবিধানে সংসদীয়শাসিত সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার হাতে শাসনকার্য পরিচালনার ভার অর্পণ করা হয়। মন্ত্রি পরিষদ তার কাজের জন্য আইনসভার নিকট দায়ী থাকে।

৮. এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র: বাংলাদেশ এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র। এখানে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মতো কোনো অঙ্গরাজ্য বা প্রাদেশিক সরকার নেই। জাতীয় পর্যায়ে একটিমাত্র কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা সমগ্র দেশ পরিচালিত হয়।

৯. আইনসভা: বাংলাদেশের আইনসভা এক কক্ষবিশিষ্ট। এটি সার্বভেৌম আইন প্রণয়নকারী সংস্থা। এর নাম জাতীয় সংসদ। বর্তমানের জাতীয় সংসদ ৩৫০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত। সংসদের মেয়াদ ৫ বছর।

১০. সর্বোচ্চ আইন: বাংলাদেশে্র সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। কারণ বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে দেশের প্রচলিত কোনো আইনের সংঘাত সৃষ্টি হলে সে ক্ষেত্রে সংবিধান প্রাধান্য পাবে। অর্থাৎ যদি কোনো আইন সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্যহীন হয়, তাহলে ঐ আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততোখানি বাতিল হয়ে যাবে।

 


বাংলাদেশের সংবিধান সংক্রান্ত সাধারন তথ্য

বাংলাদেশের সংবিধান কেবল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইনই নয়;- সংবিধানে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের মূল চরিত্র বর্ণিত রয়েছে। এতে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখা বিধৃত আছে। দেশটি হবে প্রজাতান্ত্রিক, গণতন্ত্র হবে এদেশের প্রশাসনিক ভিত্তি, জনগণ হবে সকল ক্ষমতার উৎস এবং বিচার বিভাগ হবে স্বাধীন। জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস হলেও দেশ আইন দ্বারা পরিচালিত হবে। সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা -কে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

বিস্তারিত


সংবিধানের সংশোধনী

সংবিধান সংশোধনী

সংশোধনী

বিষয়

উত্থাপক

উত্থাপন

গৃহীত

রাষ্ট্রপতির অনুমোদন

১ নং

যুদ্ধাপরাধীসহ অন্যান্য গনবিরোধীদের বিচারের বিধান

মনোরঞ্জন ধর

১২ জুলাই, ১৯৭৩

১৫ জুলাই, ১৯৭৩

১৫ জুলাই, ১৯৭৩

২ নং

অভ্যন্তরীন বা বহিরাক্রমণ গোলযোগে দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক জীবন বিপন্ন হলে সে অবস্থায় ‘জরুরী অবস্থা’ ঘোষণার বিধান

মনোরঞ্জন ধর

১৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩

২০ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩

২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩

৩ নং

সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী বেড়ুবাড়িকে ভারতের নিকট হস্তান্তরের বিধান

মনোরঞ্জন ধর

২১ নভেম্বর, ১৯৭৪

২৩ নভেম্বর, ১৯৭৪

২৭ নভেম্বর, ১৯৭৪

৪ নং

সংসদীয় শাসন পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন পদ্ধতি চালু করণ এবং বহুদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে একদলীয় রাজনীতি প্রবর্তন

মনোরঞ্জন ধর

২০ জানুয়ারি, ১৯৭৫

২৫ জানুয়ারি, ১৯৭৫

২৫ জানুয়ারি, ১৯৭৫

৫ নং

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সামরিক অভ্যুন্থানের পর হতে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক সরকারের যাবতীয় কর্মকান্ডের, ফরমানের ও প্রবিধানের বৈধতা দান

শাহ আজিজুর রহমান

১ জুলাই, ১৯৮১

৫ এপ্রিল ১৯৭৯

৬ এপ্রিল ১৯৭৯

৬ নং

উপরাষ্ট্রপতি পদ হতে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের বিধান নিশ্চিতকরণ

শাহ আজিজুর রহমান

১ জুলাই, ১৯৮১

৮ জুলাই, ১৯৮১

৯ জুলাই, ১৯৮১

৭ নং

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তারিখের ফরমান ও উক্ত ফরমান দ্বারা ঘোষিত সামরিক আইন বলবৎ থাকাকালীন সময়ে প্রনীত সকল ফরমান, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের আদেশ, নির্দেশ, অধ্যাদেশসহ অন্যান্য আইন অনুমোদন

এ,.কে.এম. নুরুল ইসলাম

১০ নভেম্বর, ১৯৮৬

১০ নভেম্বর, ১৯৮৬

১১ নভেম্বর, ১৯৮৬

৮ নং

রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে স্বীকৃতি দান এবং ঢাকার বাইরে ছয়টি জেলায় হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ

১১ মে, ১৯৮৮

৭ জুন, ১৯৮৮

৯ জুন, ১৯৮৮

৯ নং

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সঙ্গে একই সময়ে উপরাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা, রাষ্ট্রপতি পদে কোন ব্যক্তি দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ রাখা

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ

৬ জুলাই, ১৯৮৯

১০ জুলাই, ১৯৮৯

১১ জুলাই, ১৯৮৯

১০ নং

প্রেসিডেন্ট কার্যকালের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে ১৮০ দিনের মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ব্যাপারে সংবিধানের বাংলা ভাষ্য সংশোধন ও সংসদে মহিলাদের ৩০টি আসন আরও ১০ বছরের জন্য সংরক্ষণ

হাবিবুল ইসলাম

১০ জুন, ১৯৯০

১২ জুন, ১৯৯০

২৩ জুন, ১৯৯০

১১ নং

অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের স্বপদে ফিরে যাবার বিধান

মীর্জা গোলাম হাফিজ

২ জুলাই, ১৯৯১

৬ আগস্ট, ১৯৯১

১০ আগস্ট, ১৯৯১

১২ নং

সংসদীয় পদ্ধতির সরকার পুর্নপ্রবর্তন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুন: প্রবর্তন

বেগম খালেদা জিয়া

২ জুলাই, ১৯৯১

৬ আগস্ট, ১৯৯১

১৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৯১

১৩ নং

অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন

ব্যরিস্টর জমির উদ্দীন সরকার

২১ মার্চ, ১৯৯৬

২৭ মার্চ, ১৯৯৬

২৮ মার্চ, ১৯৯৬

১৪ নং

ক. ৪৫টি সংরক্ষিত মহিলা আসন আগাম ১০ বছরের জন্য সংরক্ষণ ৬৫ নং অনুচ্ছেদ মোতাবেক

খ. নির্বাচনের পর নবনির্বচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ করাতে স্পিকার ব্যর্থ হলে প্রধান র্বিাচন কমিশনার শপথ বাক্য পাঠ করাবেন ১৪৪ নং অনুচ্ছেদ মোতাবেক

গ. সুপ্রিম কোর্টের বিটারপতিদের বয়স ৬৫ থেকে ৬৭ বছর (সংবিধানের ৯৬ নং অনুচ্ছেদ সংশোধন করে)

ঘ. পিএসসির চেয়ারম্যান ও অন্যান্য সদস্যদের বয়স ৬২ থেকে ৬৫ তে উন্নীত করন হয় (সংবিধানের ১৩৯ নং অনুচ্ছেদ সংশোধন করে)

ঙ. মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে ৫ বছর বা তার বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হওয়া যেটি আগে পূর্ণ হবে সেই কাল পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল। (সংবধানের ১২৯ নং অনুচ্ছেদ সংশোধন করে)।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ

১৭ মার্চ, ২০০৪

১৬ মে, ২০০৪

১৭ মে, ২০০৪

১৫ নং

ক. তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল

খ. ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি পুনর্বহাল

গ. রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচন

ঙ. রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও বিসমিল্লাহ বহাল, অন্যান্য ধর্মের সমমর্যাদা

চ. আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস বাদ

ছ. সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫ থেকে ৫০ ও উন্নীতকরণ

জ. জাতির পিতার, ৭ মার্চের ভাষণ, স্বাধীনতার ঘোষণা ও ঘোষণাপত্র যুক্তরণ।

শফিক আহমেদ

২৫ জুন ২০১১

৩০ জুন ২০১১

৩ জুলাই ২০১১

১৬ নং

ক. সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের উপর হস্তান্তরকরণ।

খ. এই বিধানের অধীন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, নির্বাচন কমিশনারগণ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান এর অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদে উপর হস্তান্তরকরণ।

ব্যারিস্টার আনিসুল হক

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

 

 

 

সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত সংবিধানের সংশোধনী

সংশোধনী

রিটকারী ও তারিখ

হাইকোর্ট বিভাগের রায়

আপিল বিভাগের রায়

পঞ্চম

রিটকারী মাকসুদুল আলম; ২০০০

অবৈধ ঘোষণা; ২৯ আগস্ট, ২০০৫

অবৈধ ঘোষণা; ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১০

সপ্তম

সিদ্দিক আহমেদ; ২৪ জানুয়ারি ২০১০

অবৈধ ঘোষণা; ২৬ আগস্ট ২০১০

অবৈধ ঘোষনা; ১৬ মে, ২০১১

এয়োদশ

এ সলিউল্লাহ, আব্দুল মান্নান খান ও রুহুল কুদ্দুস বাবর; অক্টোবর, ২০০৯

বৈধ ঘোষণা, ৮ আগষ্ট, ২০০৪

অবৈধ ঘোষণা; ১০ মে, ২০১১

এছাড়াও আনোয়ার হোসেন চৌধুরির রিটে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী আইন, ১৯৮৮- এর মাধ্যমে অনুচ্ছেদ ১০০ সংশোধন করে রাজধানীর বাইরে হাইকোর্ট বিভাগের একাধিক স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন যা এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী বলে হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে।


বাংলার ইতিহাস(মধ্যযুগ)

বাংলায় মধ্যযুগ শুরু হয় মুসলিম শাসনের সূচনা হতে।ইংরেজ শাসনের সূচনায় এর সমাপ্তি হয়।

ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ

বাংলায় স্বাধীন সুলতানী আমল শুরু হয় ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের আমল থেকে। তিনি ছিলেন বাংলার প্রথমস্বাধীন সুলতান। বাংলা ছিল দিল্লীর তুঘলক সুলতান শাসিত অঞ্চল। এটি ছিল তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত সোনার গাঁও (শাসক বাহরাম খান)। সাতগাঁও (শাসক ইয়াজউদ্দিন ইয়াহিয়া) ও লখনৌতি (শাসক কদর খান)।

১৩৩৮ সালে সোনারগায়ের শাসনকর্তা বাহরাম খানের মৃত্যুর পর তার প্রধান সিলাহদার (বর্মরক্ষক) ফখরা স্বাধীনতা ঘোষণা করে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ নাম নিয়ে সোনারগাঁয়ের সিংহাসনে আরোহণ করেন। এসময় লখনৌতিতে কদর খানকে হত্যা করে সেনাপতি আলী মুবারক, সুলতান আলাউদ্দিন আল শাহ নামধারণ করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং তার রাজধানী লখনৌতি থেকে ফিরুজাবাদে (পান্ডুয়া) স্থানান্তরিত করেন।

 ফখরুদ্দিনের স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে  বাংলায় স্বাধীন সুলতানী আমলের সূচনা হয়। ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ দিল্লীর হস্তক্ষেপের বাইরে স্বাধীনভাবে বাংলার একাংশ শাসন করেন। তিনি ১৩৪৯ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তার ১১ বছরের শাসনামলের উল্লেখযোগ্য  দিক হল চট্টগ্রাম  অঞ্চলে মুসলিম শাসন বিস্তার।

 


ইলিয়াস শাহী বংশ

হাজী ইলিয়াস ১৩৪২ সালে লখনৌতির শাসনকর্তা আলাউদ্দিন আলী শাহকে হত্যা করে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ নাম ধারণ করে লখনৌতির সিংহাসন আরোহণ করেন। তিনি ১৩৪৫ সালে সাতগাও দখল করেন। এরপর তিনি ত্রিপুরা, নেপাল, উড়িষ্যা, বারানসীজয় করেন। ১৩৫২ সালে ইখতিয়ারউদ্দন গাজী শাহকে পরাজিত করে সোনারগাঁও দখল করে সমগ্র বাংলার স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এ ভূখন্ডের নাম করণ করেন মূলক-ই-বাঙ্গালাহ এবং নিজেকে শাহ-ই- বাঙ্গালাহ হিসেবে ঘোষনা করেন। তিনি প্রথম স্বাধীন নরপতি যিনি বাঙালি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপিত করেন। তার সময়ে সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল পরিচিত হয়ে ওঠে বাঙ্গালাহ নামে। বাঙ্গালাহ শব্দটির প্রচলন করেন ইলিয়াস শাহ। তিনি রাজধানী গেৌড় (লখনৌতি) হতে পান্ডুয়ায় ্থানান্তরিত করেন। ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ বাংলার স্বাধীনতা সূচনা করলেও প্রকৃত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেন শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ।

দিল্লীর সুলতান ফিরোজশাহ  তুঘলক ১৩৫৩ সালে বাংলা আক্রমণ করলে ইলিয়াস শাহ দুর্গম একডালা দুর্গে আশ্রয় প্রহণ করেন। দিল্লী বাহিনী একডালা দুর্গ জয় করতে না পেরে সন্ধি করে দিল্লী ফিরে যান তিনি ত্রিপুরার রাজা রত্ম-ফাকে মানিক্য উপাধি দেন এবং সেই থেকে ত্রিপুরার রাজাগণ মাণিক্য উপাধি ধারণ করে আসছে।

ইলিয়াস শাহের পুত্র সিকান্দার শাহ মালদহের বড় পান্ডুয়ার বিখ্যাত আদিনা মসজিদ নির্মাণ করেন ১৩৫৮ সালে। গৌড়ের কোতওয়ালী দরজা তার অমরকীর্তি। সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের রাজত্বকালে প্রথম বাঙালি মুসলমান কবি শাহমুহ্ম্মদ সগীর ইউসুফ জোলেখা’ কাব্য রচনা করেন। সুলতান গিয়াসউদ্দিন পারস্যের বিখ্যাত কবি হাফিজের সাথে পত্র বিনিময় করতেন। তিনি হাফিজকে বাংলায় আগমণের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তার আমলে বিখ্যাত মুসলিম সাধক শেখ নূরুদ্দীন কুতব-উল আলম ইসলাম প্রচার করেন। এ সময়ে মাহুয়ান নামক চীনা পর্যটক বাংলা সফর করেন। বর্তমানে সোনারগাঁয়ে গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের মাজার রয়েছ্

ইলিয়াস শাহী বংশের দ্বিতীয় শাখার প্রতিষ্ঠাতা নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহের সময় প্রখ্যাত ইসলাম প্রচারক খান জাহান আলী খুলনা ও যশোর অঞ্চল দখল করে বাগেরহাট ষাট গম্বুজ মসজিদ (মোট গম্বুজ ৮১ টি) নির্মাণ করেন। তার সময়ের পাঁচ খিলান বিশিষ্ট পাথরের পুল, কোতয়ালী দরওয়াজা এবং দুর্গের প্রাচীর এখনও টিকে আছে।

 


হোসেন শাহী বংশ

আলাউদ্দিন হুসেন শাহঃ

সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ হলেন বাংলার সুলতানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ (১৪৯৩-১৫১৯)। তার সময়ে সেনাপতি পরাগল খানের উৎসাহে কবীন্দ্র পরমেশ্বর মহাভারতের একাংশ বাংলায় অনুবাদ করেন। পরাগল খানের পুত্র ছুটি খানের পৃষ্ঠপোষকতায় শ্রীকর নন্দী মহাভারতের একাংশ বাংলায় অনুবাদ করেন। সুলতান হুসেন শাহের সময়ে কবি মালাধর বসু ও বিজয় গুপ্ত তার রাজসভা অলংকৃত করেন্ মালাধর বসুকে সুলতান গুণরাজ খান উপাধি দান, করেন। সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের হিন্দু প্রজাগণ তাকে নৃপতি তিলক ও জগত ভুষণ উপাধিতে ভূষিত করেন। তাকে বাদশাহ আকবরের সাথে তুলনা করা হয়। বৈষ্ণব ধর্মের প্রচারক শ্রী চৈতন্যদেব তার নিকট খুব সন্মান লাভ করেন। তিনি গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদ নির্মাণ করেন। তার সময়ে বাংলার রাজধানী ছিল গৌড়ের একডালা।

নুসরত শাহঃ

আলাউদ্দিন হুসেন শাহের পুত্র নুসরত শাহ ( ১৫১৯-১৫৩২) গৌড়ের বড় সোনা মসজিদ ( বার দুয়ারী মসজিদ) এবং কদম রসুল মসজিদ নির্মণ করেন। ১৫২৯ সালে সম্রাট বাবর নুসরত শাহের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলে নুসরত শাহ পরাজিত হন এবং বাবরের সাথে সন্ধি করেন। তার সময়ে কবি শ্রীধর "বিদ্যাসুন্দর" কাব্য রচনা করেন।

১৫৩৮ সালে শের খান সুলতান মাহমুদ শাহকে পরাজিত করে গৌড় দখল করলে বাংলার দু’শ বছরের স্বাধীন সুলতানী শাসনের অবসান ঘটে।


মুঘল আমল

জহীরুদ্দীন মুহম্মদ বাবরঃ

১৪৮৩ সালে বাবর মধ্য এশিয়ার ফারগানায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ;ছিলেন ফারগানার যুবরাজ। পিতার মৃত্যু হলে মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি পিতৃসিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন্ জ্ঞাতিশত্রুদের আক্রমণে সিংহাসনচ্যুত ও ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে তিনি পূর্বদিকে গমন করেন এবং ১৫০৪ সালে কাবুল দখল করে নিজেকে বাদশাহ ঘোষণা করেন। দিল্লীর শাসনকর্তা ইব্রাহীম লোদীর জ্ঞাতিশত্রু পাঞ্জাবের শাসনকর্তা দৌলত খান লোদী বাবরকে ভারতবর্ষ আক্রমনের আহবান জানালে বাবর বিনা বাধায় ১৫২৫ সালে পাঞ্জাব দখল করেন। ১৫২৬ সালের ২১ এপ্রিল বাবর দিল্লীর অদূরে পানিপথের প্রান্তরে ইব্রাহীম লোদীর মুখোমুখি হন। এ যুদ্ধে বাবর ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম কামানের ব্যবহার করেন। ইব্রাহীম লোদী পরাজিত ও নিহত হলে বাবর দিল্লী অধিকার করেন এবং নিজেকে সমগ্র হিন্দুস্তানের বাদশাহ হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি ভারতে মুঘল সাম্যাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। ১৫২৭ সালে রাজপুত রানা সংগ্রাম সিংহকে পরাজিত করে দিল্লীতে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত প্রতিষ্ঠা কনে। ১৫৩০ সালে বাবর মারা যান। তিনি ‘তুযুক-ই-বাবর’ নামে আত্মজীবনী রচনা করেছিলেন যা ফারসি ভাষায় রচিত।

হুমায়ূনঃ

বাবরের মৃত্যুর পর জ্যেষ্ঠপুত্র হুমায়ূন সিংহাসনে আরোহণ করে ছোট-খাট বিদ্রোহ দমন করেন। চুনার অধিপতি শেরখান পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে বাংলা আক্রমণ করলে হুমায়ূন শের খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গমন করেন। ১৫৩৯ সালে চৌসা এবং ১৫৪০ সালে কনৌজের যুদ্ধে হুমায়ূন শেরখানের নিকট পরাজিত হলে দিল্লী হুমায়ুনের হাতছাড়া হয়ে যায়।শেরখান নিজেকে সম্রাট হিসেবে ঘোষনা করেন। ১৫৫৫ সালে পুনরায় হুমায়ূন দিল্লী দখল করেন। একবছর পর দুর্গের পাঠাগারের সিড়ি থেকে পড়ে গিয়ে তিনি আহত হন এবং তিনদিন পর মারা যান। হুমায়ূন বাংলার নাম দেন জান্নাতুল সুবাহ বা জান্নাতাবাদ।

 

আকবরঃ

আকবরের পিতা হলেন হুমায়ুন এবং পিতামহ বাবর। মাত্র তের বছর বয়সে ১৫৫৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আকবর দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন। এ সময় পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে রাজপুত বীর হিমুর মুখোমুখি হন ( ১৫৫৬ সালে)। যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে আকবর হাতছাড়া হয়ে যাওয়া দিল্লি পুনরুদ্ধার করেন এবং মুঘল সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব রক্ষা করেন। তার  সময়ে মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বাপেক্ষা বিস্তার ঘটে। তিনি রাজপুত ও  হিন্দুদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য অমুসলিমদের উপর ধার্যকৃত সামরিক কর’জিজিয়া  কর’ রহিত করেন এবং রাজপুত কন্যা যোধাবাইকে বিবাহ করেন। ১৫৭৬ সালে দাউদ খান কররানীকে পরাজিত করে আকবর বাংলার কিয়দংশ দখল করেন। পরবর্তীতে সেনাপতি মানসিংহকে প্রেরণ করলেও আকবরের সময়ে সমগ্র বাংলা মুঘল দের শাসনাধীনে আনীত হয়নি। তিনি বাংলার কৃষকদের নিকট হতে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সাল প্রতিষ্ঠা করেন। হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে সম্মিলনের জন্য ১৫৮২ সালে তিনি ‘দীন-ই-ইলাহী; নামে একটি নতুন ধর্ম প্রচলন করেন। সম্রাট আকবর অমৃতস্বরের স্বর্ণমন্দির নির্মাণ করেন। তিনি বুলন্দ দরোয়াজা নির্মাণ করেন। বীরবল, ফৈজী, টোডরমল, তানসেন প্রভৃতি গুণী ব্যক্তি তার রাজসভা অলংকৃত করেন। টোডরমল ছিলেন রাজস্বমন্ত্রী ও সংস্কারক। আকবরের সভার গায়ক তানসেনের উপাধি ছিল বুলবুল-ই-হিন্দ। আবুল ফজল রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আইন-ই-আকবরী’।  ১৬০৫ সালে আকবর পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার সমাধি ভারতের সেকেন্দ্রায় অবস্থিত।

শাহজাহানঃ

তিনি মুঘল বংশের পঞ্চম শাসক। তার সময়ে ভারতবর্ষে স্থাপত্য শিল্পের বিকাশ ঘটে। তাকে Prince of Builders বলা হয়। তিনি আগ্রায় যমুনা নদীর তীরে তাজমহল নির্মাণ করেন। ১৬৩১ সালে তাজমহলের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। স্ত্রী মমতাজ মহল চতুর্দশ সন্তান জন্মদানকালে  শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করলে পত্নীপ্রেমের নিদর্শন হিসেবে তিনি এটি নির্মাণ করেন। এর প্রধান স্থপতি ছিলেন ইস্তাম্বুলের অধিবাসী ওস্তাদ ঈসা। বলদেব দাস ছিলেন তাজমহল নির্মাণকার্যে নিযুক্ত বাঙালি স্থপিতি। দিল্লীর লালকেল্লা  দিওয়ানে আম, দিওয়ানে খাস তার অমর কীর্তি।

বিখ্যাত ‘ময়ূর সিংহাসন ও সম্রাটের অমর কীর্তি। শিল্পী বেবাদল খাঁ আট বছরের পরিশ্রমের মনোরম এ সিংহাসন নির্মান করেন। সম্রাটের মুকুটে কোহিনুর হীরা শোভা পেত। ১৭৩৯ সালে পারস্যের সম্রাট নাদির শাহ দুর্বল মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহ এর আমলে এ হীরা পারস্যে নিয়ে যায়। এটি বর্তমানে ইংল্যান্ডের রানীর রাজপ্রাসাদে শোভা পাচ্ছে। এ সময় সম্রাটের অনুমতিক্রমে ইংরেজরা বাংলায় ‘পিপিলাই’ নামক স্থানে প্রথম সরাসরি বাণিজ্য কুঠি বা বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে। সম্রাট শাহজাহানের চার পুত্র হল-দারা, সুজা, আওরঙ্গজেব ও মুরাদ।

আরঙ্গজেবঃ

মুঘল পতনঃ


বাংলায় সুবেদারী আমল

ইসলাম খানঃ

১৬০৮-১৬১৩ বাংলায় নিযুক্ত ১ম সুবেদার। ঢাকাকে ১৬১০ সালে প্রথম রাজধানীর মর্যাদা দেন। বারো ভূঁইয়াদের দমন করেন। ধোলাই খাল খনন করেন। নৌকা বাইচ প্রচলন করেন।

শাহজাদা মুহম্মদ সুজা (১৬৩৮-১৬৬০) ঃ

সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় পুত্র শাহজাদা সুজার শাসনামল ছিল বাংলার জন্য স্বর্ণযুগ। ১৬৪২ সালে ঊড়িষ্যা প্রদেশকে সুজার অধীনে দেয়া হয়। তিনি বড় কাটরা, ধানমন্ডি ঈদগাহ মাঠ নির্মাণ করেন। জনৈক ইংরেজ চিকিৎসকের চিকিৎসায় তার কন্যা আরোগ্য লাভ করলে তিনি ১৬৫১ সালে ইংরেজদের বার্ষিক মাত্র তিন হাজার টাকার বিনিময়ে বাংলায় বণিজ্য করার সুযোগ দেন। ১৬৩৮ সালে তিনি বাংলার রাজধানী ঢাকা হতে রাজমহলে স্থানান্তরিত করেন। সম্রাট শাহজাহানের পর আওরঙ্গজেব সিংহাসনে আরোহণ করলে তিনি সেনাপতি মীর জুমলার হাতে পরাজিত হন এবং আরাকানে পালিয়ে যান।

মীর জুমলা (১৬৬০-৬৩)

১৬৬০ সালে তিনি বাংলার রাজধানী রাজমহল হতে ঢাকায় স্থানান্তরিত করেন। তিনি ঢাকার উত্তর দিকে সীমানা বর্ধিত করেন এবং ঢাকা গেইট, (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দোয়েল চত্বর সংলগ্ন স্থানে) নির্মাণ করেন। ১৬৬৩ সালে তিনি আসাম অভিযান পরিচালনা করে আসামের বেশির ভাগ অংশ মুঘলদের সাম্রাজ্যভুক্ত করেন এবং ফেরার পথে ঢাকা হতে কয়েক মাইল দূরে খিজিরপুরে প্রাণত্যাগ করেন।

শায়েস্তা খান ( ১৬৬৩-’৭৮, ৭৯-’৮৮)

মীর জুমলার মৃত্যুর পর আওরঙ্গজেব তার মামা শায়েস্তাখানকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন। শায়েস্তা খানের আমলকে বাংলায় স্থাপত্য শিল্পের স্বর্ণযুগ বলা হয়। এ সময়ে স্থাপত্য শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল। তিনি পর্তুগীজ ও মগ জলদস্যুদের তাড়িয়ে চট্টগ্রাম দখল করেন এবং নাম রাখেন ‘ইসলামাবাদ’। এ সময় চট্টগ্রাম প্রথমবারের মত পূর্ণভাবে বাংলার সাথে যুক্ত হয়। তিনি দক্ষিন বাংলা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষদের মগ ও জলদস্যুদের অত্যাচার থেকে রক্ষা করেন। তিনি চকবাজার এলাকায় ছোট কাটরা নির্মাণ করেন। তার উৎসাহে মীর মুরাদ ‘হোসেনী দালান’ নির্মাণ করেন। তার সময়ে টাকায় ৮ মন চাউল বিক্রি হত।

১৬৭৮ সালে ৮৪ বছর বয়সে তিনি বাংলা ত্যাগ করলে প্রথমে ফিদাই খান ও পরে শাহজাদা মুহম্মদ আযম বাংলার সুবাদার হয়। শাহজাদা আযম ঢাকায় একটি দুর্গ নির্মানের পরিকল্পনা করে সীমানা দেয়াল স্থাপন কারেন এবং নামকরণ করেন ‘কেল্লা আওরঙ্গবাদ’। এক বছরের মাথায় শাহজাদা আযম বাংলা ত্যাগ করলে শায়েস্তা খান পুনরায় বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হয়। তিনি দুর্গের অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন করেন। এ সময় তার কন্যা ‘ইরান দূখত’ (পরী বিবি) মারা গেলে তিনি দুর্গকে অপয়া ভেবে নির্মাণ কাজ স্থগিত করেন। পরবর্তীতে ইব্রাহীম খান বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হলে ১৬৯০ সালে দুর্গের কাজ সমাপ্ত হয়। এটিই বর্তমান কালের লালবাগের কেল্লা।


বার ভূঁইয়া

‘বার ভূঁইয়া’ ছিল পাঠান ও হিন্দু জমিদারদের পরিচিতিমূলক শব্দ। বার ভুঁইয়া কথাটা প্রসিদ্ধি লাভ করলেও ভূঁইয়াদের সংখ্যার বার অপেক্ষা বেশি ছিল (‘বার’ শব্দটি অনির্দিষ্ট অর্থেও ব্যবহৃত হতো)। এবং তাদের কেহ কেহ হিন্দু ছিলেন। ভুঁইয়াদের মধ্যে সোনারগাঁয়ের ঈসা খা ছিলেন শ্রেষ্ঠ ও শক্তিশালী নরপতি। ১৫৭৬ সালে দাউদ খান কররানীকে পরাজিত করলেও বাংলার সামান্য অংশ মুঘলদের অধিকারে আসে। বাংলার বিশাল অংশ ভুঁইয়াদের দখলে ছিল। তারা আকবরের শাসন মেনে নেয়নি। মুঘলগন সমগ্র বাংলা দখলের প্রচেষ্টায় যুদ্ধ করে এবং তাদের সামনে প্রধান বাধা হিসেবে আসে ঈসা খাঁ। তিনি মুঘল আমলে সোনারগাঁয়ে রাজধানী স্থাপন করেন। ঈসা খাঁ মুঘল সুবাদার শাহবাজ খানকে যুদ্ধে পরাজিত করেন। পরে সম্রাট আকবর সেনাপতি মানসিংহকে সুবাদার নিযুক্ত করলেও তিনি তাকে পরাজিত করতে পারেননি।

১৫৯৯ সালে ঈশা খাঁ প্রাণত্যাগ করলে তার পুত্র মুসা খাঁ সোনারগাঁয়ের প্রভু হলেন। ১৬০২ সালে রাজা মানসিংহ এক নৌযুদ্ধে মুসা খাঁকে পরাজিত করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬০৮ সালে শেখ আলাউদ্দিন ইসলাম খান চিশতীকে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন। ১৬০৯ সালে তিনি সোনাগাঁয়ের মুসা খাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাকে পরাজিত ও বিতাড়িত করেন। ফলে সোনারগাঁয়ের পতন হয়। ১৬১০ সালে ইসলাম খান বাংলার রাজধানী বিহারের রাজমহল হতে ঢাকায় স্থানান্তর করেন এবাং নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর। ১৬১২ সালে ময়মনসিংহের খাজা ওসমানকে পরাজয়ের মাধ্যমে ইসলাম খান সমগ্র বাংলা মুঘল শাসনাধীনে আনেন।

 


বাংলার নবাবী আমল

নবাব মুর্শিদকুলি খান (১৭১৭-১৭২৭)

তিনি ব্রাম্মনের গৃহে জন্মগ্রহণ করেন। হাজী শফী নামক এক ব্যক্তি তাকে ক্রয় করে নাম দেন মুহম্মদ হাদী। তিনি হলেন বাংলার প্রথম নবাব। তার আমল থেকে বাংলার নবাবী আমল শুরূ হয়। প্রথমে তিনি হায়দ্রাবাদের দেওয়ান ছিলেন। ১৭০০ সালে তিনি বাংলার দেওয়ানী লাভ করেন। তিনি ১৭২০ সালে মুর্শিদকুলি খান উপাধি পান। ১৭১৭ সালে তিনি বাংলার স্থায়ী সুবাদার নিযুক্ত হন এবং বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মকসুদাবাদে স্থানান্তরিত করে নাম রাখেন ‘মুর্শিদাবাদ’। তার শাসনামল থেকে বাংলায় নাবাবী শাসন শুরু হয়।

তার কোন পুত্রসন্তান না থাকায় মৃত্যুর পর জামাতা সুজাউদ্দিন বাংলার নবাব হন। নিজ স্ত্রীর (মুর্শিদ কুলী খার কন্যার) বিরোধিতার মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও অমাত্যদের সমর্থনে তিনি নবাবী লাভ করেন। সুজাউদ্দিন এদেশে সুশাসনের জন্য বিখ্যাত। সুজাউদ্দিনের সময়ে এদশে টাকায় আট মণ চাউল পাওয়া যেত। সুজাউদ্দীনের পুত্র সরফরাজ খানের রাজত্বকালে ১৭৪০ সালে বিহারের শাসনকর্তা আলীবর্দী খান বাংলা দখল করেন।

নবাব আলীবর্দী খান (১৭৪০-’৫৬)

বাংলার নবাব সরফরাজ খানের অযোগ্যতার সুযোগে তিনি বাংলা দখল করেন তিনি প্রথম স্বাধীন নবাব। দিল্লীর দুর্বলতার সুযোগে তিনি স্বাধীনভাবে নবাবী পরিচালনা করেন। তিনি মারাঠা বর্গীদের আক্রমণ হতে বাংলার জনগণকে রক্ষা করেন। ১৭৫৬ সালের এপ্রিল মাসে তিনি মারা গেলে তার দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন।

নবাব সিরাজউদ্দৌলাঃ

সিরাজউদ্দৌলা ১৭৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম যইনুদ্দীন এবং মাতার নাম আমিনা। মাতামহ নবাবের মৃত্যু হলে মাত্র তেইশ বছর বয়সে ১৭৫৬ সালে তিনি সিংহাসন লাভ করেন। ১৭৫৬ সালের জুন মাসে তিনি ইংরেজদের কাসিমবাজার দুর্গ অধিকার করেন। একই মাসে তিনি কলকাতা জয় করে নাম  রাখেন ‘আলীনগর’। ১৭৫৬ সালের অক্টোবরে ‘মনিহারী যু্দ্ধে’ শওকত জংকে পরাজিত ও নিহত করে তিনি পূর্ণিয়া অধিকার করেন। ১৭৫৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী তিনি ইংরেজদের সাথে ‘আলীনগরের সন্ধি’ করেন। দেশী অমাত্য ও নবাব বিরোধীদের ষড়যন্ত্রে এবং মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে নবাব পরাজিত হন। পলায়নকালে পাটনার পথে রাজমহলের নিকট ধৃত হয়ে মুর্শিদাবাদে আনীত হন। ২ জুলাই, ১৭৫৭ মীরজাফরের পুত্র মীরনের নির্দেশে সিরাজউদ্দৌলা তার এক সময়ের আশ্রিত মোহাম্মদী বেগের হাতে নিহত হন। তিনি মাত্র এক বছর আড়াঁই মাস বাংলার নবাব ছিলেন। তিনি বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব। পলাশীর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলায় ইংরেজ শাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয় এবং এটি ভারতের ইতিহাসে নতুন যুগের সুচনা করে। একই সাথে বাংলায় মধ্যযুগের শাসনের সমাপ্তি হয়। তবে ইংরেজদের বাংলার শাসনভার গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত মধ্যযুগের রেশ আরো কিছুদিন টিকে ছিল।

মীরজাফর ,মীরকাসিমঃ

 


উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের সূচনা

অষ্টম শতকের শুরু থেকে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন টিকে ছিলো ৷

ভারতে ইসলামের শাসন শুরু হয় ৭১২ সালে মোহাম্মদ বিন কাসিম দ্বারা সিন্ধু দখলের মাধ্যমে ৷ ৭১২ সালে দামেস্কের খালিফা আল-ওয়ালিদের আশির্বাদপুষ্ট ও বাগদাদের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের দ্বারা পারিচালিত হয়ে কাসিম ভারতে ইসলামের বিজয় ও শাসনের অভিষেক ঘটান ৷

বিস্তারিত


শেরশাহ্

শেরশাহ  ভারতবর্ষের সম্রাট (১৫৪০-১৫৪৫) ও শূর রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। শেরশাহ ছিলেন বিহারের অন্তর্গত সাসারামের জায়গিরদার হাসান খান শূরের পুত্র। ১৪৭২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম। তাঁর প্রকৃত নাম ফরিদ। অল্প বয়সে গৃহ ত্যাগ করে তিনি বিহারের সুলতান বাহার খান লোহানীর অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন। তাঁর সাহস ও বীরত্বের জন্য বাহার খান তাঁকে ‘শের খান’ খেতাবে ভূষিত করেন। বাহার খানের মৃত্যুর পর তাঁর নাবালক পুত্র জালাল খানের অভিভাবক হিসেবে শের খান কার্যত বিহারের সর্বময় কর্তৃত্ব লাভ করেন। বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে সামরিক সুবিধাজনক স্থানে অবস্থিত চুনার দুর্গ তাঁর অধিকারে আসে। তাঁর ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে জালাল খানের অপরাপর অমাত্যবর্গ শের খানের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠেন। এঁদের দুরভিসন্ধিতে প্ররোচিত হয়ে জালাল খান শের খানের আধিপত্য থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহের সাহায্য প্রার্থনা করেন। কিন্তু শের খান ১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দে সুরজগড়ের যুদ্ধে মাহমুদ শাহ ও জালাল খানের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেন। এই বিজয়ের ফলে বিহারের ওপর তাঁর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে শের খান বাংলা আক্রমণ করে সুলতান মাহমুদ শাহকে পরাজিত করেন। কিন্তু মুগল সম্রাট হুমায়ুন বাংলা অভিমুখে অগ্রসর হলে শের খান বাংলা ত্যাগ করেন। ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দে চৌসার যুদ্ধে (বক্সারের নিকটে) হুমায়ুনকে পরাভূত করে তিনি ‘শাহ’ উপাধি গ্রহণ করেন এবং বাংলা পুনর্দখল করে খিজির খানকে এর শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। পরবর্তী বছর পুনরায় হুমায়ুনকে পরাজিত ও ভারতবর্ষ থেকে বিতাড়িত করে তিনি দিল্লির সিংহাসন অধিকার করেন।

মাত্র পাঁচ বছরের স্বল্পকালীন শাসনে শেরশাহ সাম্রাজ্যে শান্তি শৃঙ্খলা বিধান করে প্রশাসনকে পুনর্বিন্যাস করেন। তিনি তাঁর সাম্রাজ্যকে ৪৭টি সরকারে এবং প্রতিটি সরকারকে কয়েকটি পরগণায় বিভক্ত করেন। এই প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বাংলায় ১৯টি  সরকার ছিল। প্রতিটি সরকারে ‘শিকদার-ই-শিকদারান’ (মুখ্য শিকদার) ও ‘মুন্সিফ-ই-মুন্সিফান’ (মুখ্য মুন্সিফ) খেতাবধারী দুজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিয়োগ করা হতো। এঁরা শিকদার, আমিন, মুন্সিফ, কারকুন, পাটোয়ারী, চৌধুরী ও মুকাদ্দাম প্রমুখ পরগণা কর্মকর্তাদের কার্যাবলী তদারক করতেন। যথাযথভাবে ভূমি জরিপ করে উৎপাদিত ফসলের এক-চতুর্থাংশ রাজস্ব ধার্য করা হতো এবং এই রাজস্ব নগদ অর্থে অথবা ফসলের অংশ দ্বারা পরিশোধ করতে হতো।

তিনিই সর্বপ্রথম ‘পাট্টা’ (ভূমি স্বত্বের দলিল) ও ‘কবুলিয়াত’ (চুক্তি দলিল) প্রথা চালু করে জমির উপর প্রজার (রায়তের) মালিকানা সুনিশ্চিত করেন এবং কৃষিকার্যে উৎসাহ দানের জন্য কৃষকদের ঋণ দানের ব্যবস্থা করেন।

শেরশাহ মুদ্রা ব্যবস্থার সংস্কার সাধন এবং হয়রানিমূলক কর রহিত করে ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতি বিধান করেন। সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকার সঙ্গে রাজধানী আগ্রার চমৎকার সংযোগ-সড়ক নির্মাণ করে এবং এই সড়কের ধারে নির্দিষ্ট দূরত্বে সরাইখানা, মসজিদ ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করে তিনি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করেন। তাঁর নির্মিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ছিল সড়ক-ই-আযম (মহাসড়ক)। তিন হাজার মাইল দীর্ঘ এই মহাসড়ক সোনারগাঁও থেকে আগ্রা, দিল্লি ও লাহোর হয়ে মুলতান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং এর দুপাশে ছিল ছায়াদানকারী বৃক্ষশ্রেণি। উপনিবেশিক আমলে এই সড়ক গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড নামে পরিচিতি লাভ করে।

রাজধানী থেকে সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এবং বাইরে থেকে রাজধানীতে সহজে ও দ্রুত সরকারি নির্দেশ ও সংবাদ আদান প্রদানের জন্য যাত্রাপথে পর্যায়ক্রমে সংবাদ-বাহকের ঘোড়া বদল করার এক অভিনব পদ্ধতি তিনি চালু করেন। পথের পাশের সরাইখানাগুলি সংবাদবাহী ঘোড়া বদলের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহূত হতো।

সুলতান পুলিশ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস করেন। গ্রাম-প্রধানদের তিনি দায়িত্ব দেন স্ব স্ব এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা বিধানের এবং মুহতাসিবদের সহায়তায় তিনি মদ্যপান ও ব্যভিচারের মতো অপরাধ দমন করেন। তিনি একটি শক্তিশালী স্থায়ী সেনাবাহিনী ও দক্ষ গুপ্তচর দল পোষণ করতেন।

ন্যায় বিচারের প্রতি ছিল তাঁর প্রবল অনুরাগ। সুলতান ছিলেন দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় মামলায় সর্বোচ্চ বিচারক। তাঁর পরবর্তী অধস্তন বিচারক ছিলেন কাজী-উল-কুজ্জাত। পরগণাগুলিতে কাজী ফৌজদারি মামলার  বিচার করতেন, আর দেওয়ানি মামলার বিচারক ছিলেন আমিন। হিন্দুদের দেওয়ানি মামলার বিচার করতেন পঞ্চায়েতগণ।

সুলতানের জনহিতকর কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত ছিল দাতব্য প্রতিষ্ঠানে মুক্ত হস্তে অর্থদান, দরিদ্রদের জন্য লঙ্গরখানা স্থাপন, মাদ্রাসা, মসজিদ, গুরুত্বপূর্ণ ইমারত, বাগবাগিচা, হাসপাতাল ও সরাইখানা নির্মাণ। সাসারামে নিজের অনুপম সমাধিসৌধ, নির্মাতা হিসেবে তাঁর উন্নত রুচির পরিচায়ক। শেরশাহ ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। তিনি গোঁড়া বা ধর্মান্ধ ছিলেন না। হিন্দুদের প্রতি তিনি ছিলেন খুবই সহনশীল। তাঁর মধ্যে একজন সমরনেতা, একজন বিচক্ষণ নৃপতি এবং একজন যোগ্য ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কের গুণাবলীর সমন্বয় ঘটেছিল।

বিস্তারিত


বাংলার ইতিহাস(প্রাচীন কাল)

তথ্যের স্বল্পতার কারণে প্রাক-মুসলিম যুগের বাংলার ইতিহাস পুনর্গঠন করা শ্রমসাধ্য ও কষ্টকর। এ অসুবিধা আরও বেশি করে অনুভূত হয় প্রাচীনকালের ইতিহাস রচনায়- অর্থাৎ প্রাচীনতমকাল থেকে খ্রিস্টীয় চার শতকে বাংলায় গুপ্ত শাসন প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত।

এ সময়ের ইতিহাসের উপাদানের জন্য নির্ভর করতে হয় বৈদিক, মহাকাব্যিক ও পৌরাণিক সাহিত্যের অপর্যাপ্ত তথ্য ও প্রাপ্তিসাধ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশনাদির ওপর। গুপ্তযুগ থেকে পরবর্তী সময়ের জন্য আমরা প্রস্তরাদিতে উৎকীর্ণ লিপি ও সাহিত্যাকারে লিখিত তথ্যাদি পাই। এসব তথ্যে বাংলা অঞ্চলের ইতিহাসের উপাদান পাওয়া যায়।

বিস্তারিত

 

বাঙালি জাতির উদ্ভব

বাঙালি জাতির মূল কাঠামো সৃষ্টির কাল প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মুসলমান অধিকারের পূর্বপর্যন্ত বিস্তৃত। সমগ্র বাঙালি জনগোষ্ঠীকে দু ভাগে করা যায়-প্রাক আর্য বা অনার্য নরগোষ্ঠী এবং আর্য নরগোষ্ঠী। আর্যপূর্ব জনগোষ্ঠী মূলত চার শাখায় বিভক্ত-নেগ্রিটো, অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও ভোটচীনীয় অস্ট্রো এশিয়াটিক বা অস্ট্রিক গোষ্ঠী থেকে বাঙালি জাতির প্রধান অংশ গড়ে উঠেছে বলে ধারনা করা হয়। এদের নিষাদ জাতি নামে অভিহিঁত করা হয়।

প্রায় পাঁচ-ছয় হাজার বছর পূর্বে ইন্দোচীন থেকে বাংলায় প্রবেশ করে অস্ট্রিক জাতি নেগ্রিটোদের পরাজিত করে। অস্ট্রিক জাতির সম কালে বা কিছু পরে দ্রাবিড় জাতি খাইবার গিরিপথ দিয়ে আসে এবং সভ্যতায় উন্নততর বলে তারা অস্ট্রিক জাতির উপর প্রভাব বিস্তার করে। অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় জাতির সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছে আর্যপূর্ব বাঙালি জাতি। অর্থাৎ বাংলার প্রাচীন জাতি অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় নরগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত। এদের ভাষা ছিল অস্ট্রিক ভাষা। নৃতাত্ত্বিকভাবে এরা আদি অস্ট্রোলয়েড নরগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।

প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে উত্তর-পূর্বাঞ্চল দিয়ে মঙ্গোলীয়দের আগমন ঘটে। বাংলাদেশে বসবাসকারী উপজাতীয়দের বড় অংশ মঙ্গোলয়েড।

খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে আফগানিস্তানের খাইবার গিরিপথ দিয়ে ককেশীয় অঞ্চলের (ইউরাল পর্বতের দক্ষিণের তৃণভূমি অঞ্চল-বর্তমান মধ্যএশিয়া, ইরান) স্তেতকায় আর্যগোষ্ঠী ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। উপমহাদেশে আগমনের অন্তত চৌদ্দশত বছর পরে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে বঙ্গ ভূখন্ডে আর্যদের আগমন ঘটে।

স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আর্যগণ সাফল্য লাভ করে এবং বঙ্গ ভূখন্ড দখল করে নেয়। পরবর্তীতে এরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে যায়। এভাবে আর্য ও অনার্য আদিম অধিবাসীদেগর সংমিশ্রণে এক নতুন মিশ্র জাতির উদ্ভব ঘটে। খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে সেমীয় গোত্রের আরবীয়গণ ধর্মপ্রচার ও বাণিজ্যের মাধ্যমে বাঙালি জাতির সঙ্গে মিশ্রিত হয়। কাজেই বর্তমান বাঙালি জাতি অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, আর্য, মঙ্গোলীয়, সেমীয়, নিগ্রো ইত্যাদি বিভিন্ন জাতির রক্তধারায় এক বিচিত্র জনগোষ্ঠী  গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে এর সাথে ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীও মিশে যায়।

 


উপমহাদেশীয় সভ্যতা

উয়ারী বটেশ্বরঃ

উয়ারী বটেশ্বর নামক প্রত্নস্থলটি নরসিংদী জেলায় বেলাব উপজেলায় অবস্থিত। এটি কয়রা নদীর তরে অবস্থিত। ধারণা করা হয় এই প্রত্নাবশেষ ৪৫০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের।

ময়নামতিঃ

ময়নামতি বাংলাদেশের কুমিল্লায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক স্থান। ময়নামতি প্রত্নস্থল হলো লালমাই অঞ্চলের প্রাচীনতম সভ্যতার নিদর্শন। বর্তমানে ময়নামতি অঞ্চলে যে ধ্বংসস্তুপ দেখা যায় তা প্রকৃত পক্ষে একটি প্রাচীন নগরী ও বৌদ্ধ সভ্যতার অবশিষ্টাংশ। প্রত্নতাত্বিকদের মতে ইহা ‘জয়বর্মান্তবসাক’ নামক একটি প্রাচীন নগরীর অংশ বিশেষ। ধারণা করা হয় ময়নামতির ধ্বংসস্তূপে প্রাপ্ত নিদর্শনসমূহ অষ্টম শতাব্দীর।

সিন্ধু সভ্যতাঃ

সিন্ধু সভ্যতা ছিল ব্রোঞ্জ যুগীয় সভ্যতা। এই সভ্যতা ১৬০০-১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পূর্ণ বিকাশ লাভ করে। প্রথম দিকে এই সভ্যতা পাঞ্জাব অঞ্চলের সিন্ধু অববাহিকায় বিকাশ লাভ করে। বর্তমান পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রায় সম্পূর্ণ অংশ, ভারতের পশ্চিমদিকের রাজ্যগুলো, আফগানিস্তানের দক্ষিন-পূর্ব অংশ এবং ইরানের বেলুচিস্তান এই সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত ছিল। রাখাল দাস বন্দোপাধ্যায়, দয়ারাম সাহানী, স্যার জন মার্শাল, এইচ ম্যাকাল প্রমুখ ব্যাক্তিগণ পাকিস্তানের করাচি এবং লাহোরের মধ্যে সিন্ধু সভ্যতা আবিস্কার করেন।


পরিব্রাজক

ইবন বতুতাঃ

মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৩৩ খ্রিস্টাব্দে মুহম্মদ বিন তুঘলকের শাসনামলে ভারতবর্ষে আগমন করেন। ৮ বছর তিনি মুহম্মদ বিন তুঘলকের অধীনে কাজী পদে চাকরি করেন। তিনি ১৩৪৫ সালে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের শাসনামলে বাংলায় আগমন করেন তার মতে, চতুর্দশ শহতকে পূর্ববঙ্গে দ্রব্যমূণল্য যত কম ছিল দুনিয়ার অন্য কোথাও তিনি তেমন দেখেননি। এ সময়ে ফকির-দরবেশগণ বিনাভাড়ায় নৌকা ভ্রমণ করতেন এবং প্রয়োজন মত অর্থ পেতেন। তিনি বাংলাকে দোযখপুর নিয়ামত বা ধনসম্পদ পূর্ণ নরক বলেছেন। তার রচিত বইয়ের নাম কিতাবুল রেহালা। ইবনে বতুতার বর্ণনায় শ্রীহট্ট (সিলেট), সুনুরকাও (সোনারগাও) সাত-আল গাও (চট্টগ্রাম), সুরুনদ্বীপ প্রভৃতি স্থানের বর্ণনা রয়েছে।

মা-হুয়ানঃ

ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের রাজত্বকালে মা-হুয়ান নামক একজন চীনা পর্যটক বাংলাদেশে আগমন করেন। তার বিবরণ হতে জানা যায়, এদেশের সূক্ষ বস্ত্র ও রেশম শিল্প বিখ্যাত ছিল। গাছের ছাল হতে মসৃণ কাগজ তৈরি হতো। লোকেরা রৌপ্য মুদ্রা দ্বারা কেনাবেচা করত।

হিউয়েন সাংঃ

চীন দেশীয় বৌদ্ধ পন্ডিত হিউয়েন সাং সম্রাট হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে উপমহাদেশে আসেন। তিনি ৬৩০ থেকে ৬৪৪ সাল পর্যন্ত উপমহাদেশে অবস্থান করেন। তিনি হর্ষবর্ধনের রাজধানী পাটলীপুত্রের দক্ষিণে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমান পাটনা শহরের অদূরে বড়গাঁও নামক স্থানে) পাঁচ বছর অধ্যয়ন ও পুঁথি নকল করেন। বাঙালি পন্ডিত শীলভদ্র ছিলেন তখন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ। এটি ছিল তৎকালে বৌদ্ধদের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্র।

ফা-হিয়েনঃ

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালে (৩৮০-৪১৪ খ্রিস্টাব্দ) চীনা পর্যটক ফা-হিয়েন বৌদ্ধ ধর্মের মূল গ্রন্থের সন্ধানে ও তীর্থ দর্শনে ভারতবর্ষে আসেন। তিনি তৎকালীন সমাজের অবস্থা ও গুপ্ত শাসনের বিভিন্ন দিক লিপিবদ্ধ করেন। তিনি বাংলার প্রথম চৈনিক পরিব্রাজক।

মেগাস্থিনিসঃ

আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলুকাস খ্রিস্টপূর্ব ৩০২ অব্দে মেগাস্থিনিস নামক একজন গ্রিক দুতকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজসভায় প্রেরণ করেন। মেগাস্থিনিসের বিবরণই প্রাচীন ভারতের অন্যতম প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত। তিনি তার’ ইন্ডিকা’ গ্রন্থে ভাতবর্ষের তৎকালীন পরিক্ষিতির বিবরণ দেন।

 


আর্যপূর্ব যুগে বাংলা

বঙ্গদেশে জনবসতির প্রাথমিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে প্রত্ন-প্রস্তর যুগ, নব্য প্রস্তর যুগ এবং তাম্র যুগের কিছু অস্ত্রশস্ত্র এখানে পাওয়া গিয়েছে। পন্ডিতেরা অনুমান করেন যে, খ্রিষ্টের জন্মের প্রায় দেড় হাজার বছর আগে এখানে এক সুসভ্য জাতির বাস ছিল। এরা ধান চাষ করত, সম্বর ও নীলগাই শিকার করত এবং শূকর পালন করত। এরা পাথর ও তামা ব্যবহার করত এবং ইট-পাথরের ভিতের উপর প্রশস্ত ঘর তৈরি করত। প্রাচীন পুন্ড্র ও বঙ্গ জাতি আর্যপূর্ব যুগের মানুষ ছিল বলে ধারনা করা হয়। আর্য-পূর্ব যুগে বাংলার অধিবাসীরা সভ্যতায় যথেষ্ট উন্নত ছিল। বাংলায় কৃষিকাজ, নৌকা নির্মাণ, বয়নশিল্প, ধাতুশিল্প প্রভৃতি আর্যপূর্ব যুগের লোকেরাই প্রচলন করে কুমার, কামার, সূত্রধর, তাম্রকার, স্বর্ণকার, মণিকার, কাঁসারী, শাখারী ইত্যাদি পেশাদারদের কারিগরী কাজে এরা সুদক্ষ ছিল।


আর্য জাতি

যারা আর্য ভাষা অর্থাৎ ল্যাটিন, গ্রিক, জার্মান, ফরাসি ভাষায় কথা বলত তারা আর্য জাতি। এদের বসবাস ছিল ইউরাল পর্বতের দক্ষিণের তৃণভূমি অঞ্চলে। এদের প্রাচীন সাহিত্যিক ধর্মীয় গ্রন্থ হলো ঋকবেদ। খ্রিস্টাপূর্ব ১৫০০ অব্দে আফগানিস্তানের খাইবার গিরিপথ দিয়ে আর্যগণ ভারতবর্ষে প্রভেশ করে। ভারতবর্ষে প্রবেশের চৌদ্দশত বছর পর খ্রিস্টপূর্ব ১০০ অব্দে আর্যগণ বাংলায় প্রবেশ করে। এ সময় বঙ্গদেশ অস্ট্রিক জাতির প্রভাবাধীন ছিল। ধারণা করা হয় যে, মৌর্যযুগ হতে গুপ্ত বংশের শাসনামল পর্যন্ত প্রায় আটশত বছর বঙ্গদেশে আর্যীকরণ ঘটেছিল।

* আর্যপূর্ব বঙ্গ জনগোষ্ঠী ছিল অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় জাতির মিশ্রণ।

* আর্যদের আগমনের পরে বঙ্গদেশে আসে ভোটচীনীয় জাতি। এরা হলো গারো, কোচ, চাকমা ত্রিপুরা প্রভৃতি।


আর্য যুগে বাংলা

খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকে যুদ্ধযাত্রা, বাণিজ্য ও ধর্মপ্রচার উপলক্ষে আর্যরা ক্রমশ অধিক সংখ্যায় এদেশে এসে বসবাস আরম্ভ করে। আর্যরা এদেশে আসার ফলে এই অঞ্চলের আদিবাসীদের উপর আর্যদের ভাষা, ধর্ম, সামাজিক প্রথা ও সভ্যতার অন্যান্য ক্ষেত্রে দারুণ প্রভাব পড়তে থাকে। ক্রমে বাংলায় বৈদিক, পৌরাণিক, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম প্রচারিত হয় এবং বর্ণভেদ ও জাতিভেদ প্রথা অনুসারে সমাজ গঠিত হয়। আর্য ভাষার প্রভাবে বাংলায় আদি ভাষাগুলো লুপ্ত হয় এবং কালক্রমে বহুযুগ পরে বাংলা ভাষার উৎপত্তি ঘটে। তা সত্ত্বেও বাংলার আদি ভাষা, ধর্ম ও আচার-অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি, বরং সংমিশ্রিত আকারে বিকাশ লাভ করেছে।


মহাবীর আলেকজান্ডার

গ্রিস অঞ্চলের ম্যসিডনের রাজা ছিলেন মহাবীর আলেকজান্ডার। তার প্রাচ্যদেশীয় নাম সিকান্দার শাহ বা বাদশা সিকান্দার। তার শিক্ষক ছিলেন বিখ্যাত গ্রীক পন্ডিত এরিস্টটল। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৫ অব্দে পিতার মৃত্যুর পর তিনি ম্যাসিডনের সিংহাসনে আরহন করেন। দিগ্বিজয়ী বীর হিসেবে তিনি পূর্বদিকে রাজ্য জয় এবং ভারতবর্ষে সাম্রাজ্য বিস্তারে সচেষ্ট হন। ৩২৭ অব্দে সিন্ধু নদের পশ্চিমাঞ্চল জয়লাভের পর তার সেনাবাহিনী পূর্বদিকে আর অগ্রসর হয়নি। বিজিত অঞ্চলের শাসনভার সেনাপতি সেলুকাসের হস্তে ন্যস্ত করে তিনি ম্যাসিডনে ফিরে যাবার পথে ৩২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্যাবিলনের নিকটে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রাণত্যাগ করেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র তেত্রিশ বছর। আলেকজান্ডারের শাসনামল থেকে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের তথ্য পাওয়া যায়।


গঙ্গারিডই

আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণকালে বাংলায় গঙ্গারিডই নামে এক শক্তিশালী ও সমৃদ্ধিশালী রাজ্য ছিল। পন্ডিতদের ধারণা, গঙ্গা নদীর যে দুইটি ধারা এখন ভাগীরথী ও পদ্মা নামে পরিচিত, এর মধ্যবর্তী অঞ্চলে গঙ্গারিডই জাতির লোক বাস করত। এদের রাজা খুব পরাক্রমশালী ছিল। এ রাজ্যের রাজধানী ছিল ‘বঙ্গ’ নামে একটি বন্দর নগর। এখান থেকে সূক্ষ সুতী কাপড় সুদুর পশ্চিমা দেশে রফতানি হতো। গ্রিক ঐতিহাসিক ডিওডোরাস গঙ্গারিডই রাজ্যকে দক্ষিন এশীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে সমৃদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন। অনেকে মনে করেন যে, গঙ্গারিডই রাজ্যটি আসলে বঙ্গ রাজ্যই ছিল, গঙ্গারিডই ছিল শুধু এর নামান্তর।


গুপ্তযুগ

গুপ্তবংশের প্রথম রাজা ছিলেন শ্রীগুপ্ত। শ্রীগুপ্তের পৌত্র চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ৩২০ সালে মগধের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার রাজধানী ছিল পাটলীপুত্র। তিনি মগধ হতে এলাহাবাদ পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেন।

চন্দ্রগুপ্তের পুত্র সমুদ্রগুপ্ত (৩২০-৩৭৫) ছিলেন বিচক্ষণ কুটনীতিবিদ ও কুশলী যোদ্ধা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, শক্তিমান মাত্রই যুদ্ধ করবে এবং শত্রু নিপাত করবে, অন্যথায় সে একদিন বিপন্ন হবে। সমগ্র পাক-ভারতকে একরাষ্ট্রের পরিণত করার তীব্র আকাঙ্খা এবং এ লক্ষে রাজ্যজয়ের কারণে তাকে "প্রাচীন ভারতের নেপোলিয়ান" আখ্যা দেয়া হয়। তিনি মগধ রাজ্যকে উত্তরে হিমালয়, দক্ষিণে নর্মদা নদী এবংপশ্চিমে চম্বল নদী পর্যন্ত বিস্তৃত করেন।

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (৩৮০-৪১৪) উপমহাদেশ থেকে শক শাসন বিলোপ করেন। মহাকবি কালিদাস ছিলেন তার সভাকবি। তিনি বিক্রমাদিত্য উপাধি গ্রহণ করেন এবং বিক্রমাব্দ নামক সাল গণনা প্রবর্তন করেন। তিনি মালব, গুজরাট  সৌরাষ্ট্র জয় করেন। তার সময়ে গুপ্ত সাম্রাজ্য উন্নতির শিখরে পৌছে। তার সামরিক শক্তির সাফল্য তাকে ইতিহাসে অমরত্ব দান করেছে। তার আমলে চীনা পর্যটক ফা-হিয়েন ভারতবর্ষে আগমন করেন।

স্কন্দগুপ্ত (৪৫৫-৪৬৭) হুনদের আক্রমণ প্রতিহত করে সাম্রাজ্যের অখন্ডতা রক্ষা করেন। তিনি ছিলেন গুপ্ত বংশের সর্বশেষ শক্তিশালী নরপতি। গুপ্ত বংশের শেষ শাসক ছিলেন বুধগুপ্ত (৪৭৭-৪৯৬) । তিনি ছিলেন দুর্বল শাসক এবং তার সময়ে মধ্য এশিয়ার দুর্ধষ্য যাযাবর হুনদের আক্রমণে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।


রাজা শশাঙ্ক

গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর বঙ্গদেশ দুটি স্বাধীন অংশে বিভক্ত হয়-প্রাচীন বঙ্গরাজ্য ও গৌড়।দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলার দক্ষিণাঞ্চল ছিল বঙ্গ রাজ্য এবং বাংলার পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চল জুড়ে ছিল গৌড়। সপ্তম শতকে গৌড় বলতে বাংলাকে বুঝাতো।গৌড় রাজ্যে প্রথম স্বাধীন সার্বভৌম রাজা শশাঙ্ক।তিনি প্রথম বাঙ্গালী রাজা। তিনি হলেন প্রাচীন বাংলার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ নরপতি। সপ্তমশতাব্দীর প্রথম ভাগে রাজা শশাঙ্ক গৌড় রাজ্য শাসন করেন। তিনি ছিলেন গৌড়ের স্বাধীন সুলতান তার রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদের নিকটবর্তী ‘কর্ণসুবর্ণ’। এটি বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলার রাঙ্গামাটি অঞ্চল। তার রাজ্যসীমা ছিল উত্তরে পুন্ড্রবর্ধন, দক্ষিণে উড়িষ্যার গঞ্জাম জেলা,পশ্চিমে বারানসী এবং পূর্বে ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গ শশাঙ্কের রাজ্য ছিল না।রাজ্য বিস্তারের মাধ্যমে পূর্ব ভারতের সম্রাট হন এবং মহারাজাধিরাজ উপাধি গ্রহণ করেন।৬৩৭ সালে রাজা শশাঙ্ক মারা যান। কথিত, গয়ায় বোধিবৃক্ষ ছেদন করায় শশাঙ্কের গায়ে ক্ষতরোগ হলে তিনি মারা যান। কূটনীতি ও সামরিক দক্ষতার মাধ্যমে শশাঙ্ক গৌড়ের চিরশত্রু মৌখরী রাজবংশের উচ্ছেদ রাজ্য  তিনি সাধন করেন। তিনি প্রবল পরাক্রমশালী সম্রাট হর্ষবর্ধনের মোকাবেলায় নিজ ক্ষমতা ও মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে সমর্থ হন। তিনি বাংলার প্রথম রাজা যিনি বাংলার বাইরে উত্তর ভারতে বাংলার আধিপত্য ও গৌরব বিস্তারে সমর্থন হন তিনি প্রজাহিতৈষী শাসক ছিলেন। তবে বিখ্যাত চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং হিন্দু ধর্মের অনুসারী রাজা শশাঙ্ককে বৌদ্ধ ধর্মের নিগ্রহকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

 


হর্ষবর্ধন

৬০৬ সালে রাজ্যবর্ধন শশাঙ্কের হাতে নিহত হলে হর্ষবর্ধন সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার সিংহাসন আরোহণকে স্মরনীয় করে রাখার জন্য তিনি ‘হর্ষাব্দ’ নামক সাল গণনার প্রচলন করেন।

সিংহাসন আরোহণ করেই তিনি ভগ্নি রাজ্যশ্রীকে উদ্ধারে ব্রতী হন এবং মিত্র কামরূপের রাজা ভাস্করবর্মনের বাহিনীসহ গৌড়রাজ্য আক্রমণ করেন। তীব্র আক্রমণের আশংকায় শশাঙ্ক সম্মুখযুদ্ধ এড়াতে বন্দী রাজ্যশ্রীকে মুক্তি দিয়ে পূর্বদিকে সরে যান। ভগ্নি উদ্ধার করে হর্ষবর্ধন থানেশ্বরে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে শশাঙ্কের মৃত্যুর পর হর্ষবর্ধন গৌড় রাজ্য দখল করেন। প্রথম জীবনে হর্ষবর্ধন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলেও পরবর্তীতে ‘মহাযানী বৌদ্ধ’ ধর্ম গ্রহণ করেন। বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে এক বৌদ্ধ মহাসম্মেলনের আয়োজন করে তিনি খ্যাতি লাভ করেন। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং তার রাজত্বকালে ৬৩০-৬৪৪ সাল পর্যন্ত ভারতবর্ষ সফর করেন এবং তার শাসনের বিভিন্ন দিক লিপিবদ্ধ করেন।


মাৎস্যন্যায়

শশাঙ্কের মৃত্যুর পরবর্তী একশত বছর অর্থাৎ সপ্তম-অষ্টম শতকের অরাজকতা ও আইনশৃঙ্খলাহীন রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা হল মাৎস্যন্যায়। এ সময় বড় কোন সাম্রাজ্য বা শক্তিশালী রাজা ছিল না। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য প্রতিনিয়ত যুদ্ধে লিপ্ত থাকত। বড় মাছ যেমন ছোট মাছকে গ্রাস করে, সবল রাজ্য এখানে দুর্বল রাজ্যকে গ্রাস করত বলে এ অবস্থাকে মাৎস্যন্যায় বলা হয়। এই শোচনীয় অবস্থা দুর করার জন্য তৎকালীন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ গোপাল নামে একজন ব্যক্তিকে নেতা নির্বাচন করেন।


পাল বংশ(৭৫৬-১১৬১)

গোপাল (৭৫৬-৭৮১) ছিলেন পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন উত্তরবঙ্গের একজন শক্তিশালী নেতা। রাজ্যের কলহ ও অরাজকতা দূর করার জন্য অমাত্যগণ ও সামন্ত শ্রেণী গোপালকে রাজা নির্বাচন করেন। তিনি বাংলায় প্রথম বংশানুক্রমিক শাস শুরু করেন। । ক্ষত্রিয় বংশে জন্মগ্রহণকারী গোপাল প্রায় সমগ্র বাংলায় প্রভুত্ব স্থাপন করেন। বাংলার প্রথম দীর্ঘস্থায়ী রাজবংশ হল পাল বংশ। এ বংশের রাজাগণ প্রায় চার শত বছর রাজত্ব করেন।

ধর্মপাল  (৭৮১-৮২১) ছিলেন পাল বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট বা নরপতি। তিনি বাংলা থেকে পাঞ্চাবের জলন্ধর পর্যন্ত সমগ্র উত্তর ভারতে রাজ্য বিস্তার করেন। পাহাড়পুরের বিখ্যাত বৌদ্ধবিহার সোমপুর বিহার তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এছাড়া মগধের বিখ্যাত বিক্রমশীলা বিহারও (বর্তমান ভাগলপুরে) তিনি প্রতিষ্ঠা করেন।

মহীপাল (৯৮৮-১০৩৮) বেনারস ও নালন্দার ধর্মমন্দির, দিনাজপুরের মহীপাল দিঘি. ফেনীর মহীপাল দিঘি খনন করেন।ফেনীতে এখনও মহীপাল স্টেশন নামে বাস স্টেশন আছে।

রামপালের সময়ে (১০৭৭-১১২০) তার মন্ত্রী ও সভাকবি সন্ধ্যাকর নন্দী বিখ্যাত ‘রামচরিত কাব্য’ রচনা করেন। গোবিন্দপাল ছিলেন (১১৫৫-১১৬১) পাল বংশের শেষ রাজা।

 

 


সেন বংশ

সেন রাজাদের পূর্বপুরুষগণ ছিলেন দাক্ষিনাত্যের কর্ণাটক অঞ্চলের অধিবাসী। সামন্তসেন কর্ণাটক দেশে অনেক যুদ্ধে খ্যাতিমান হয়ে বৃদ্ধ বয়সে রাঢ় অঞ্চলে এসে বসতি প্রতিষ্ঠা করেন। সামন্ত সেনের পুত্র হেমন্ত সেন রাড় অঞ্চলে সেনরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তার পুত্র বিজয় সেন (১০৯৮-১১৬০) রাজ্যকে সাম্রাজ্যে পরিণত করেন। বিজয় সেন বাংলাকে সর্বপ্রথম একক শাসনাধীনে আনয়ন করেন। তিনি ত্রিবেণীর নিকট স্বীয় নামানুসারে ‘বিজয়পুর’ নামে রাজধানী স্থাপন করেন। তার দ্বিতীয় রাজধানী ছিল  বিক্রমপুর (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলা )।

বিজয় সেনের পুত্র বল্লাল সেন ছিলেন বিদ্বান ও বিদ্যোৎসাহী। সম্ভবত তার হাতে শেষ পাল সম্রাট গোবিন্দপাল ১১৬২ সালে পরাজিত হয় এবং পাল সাম্রাজ্রের বিলুপ্তি ঘটে। তিনি ‘দানসাগর’ নামক স্মৃতিময় গ্রন্থ এবং ‘অদ্ভুত সাগর’ নামক জ্যৌতিষ গ্রন্থ রচনা করেন। বাংলায় ব্রাম্মণ,বৈশ্য, কায়স্থ প্রভৃতি জাতির মধ্যে তিনি কৌলিন্য প্রথার প্রচলন করেন।

সেন বংশের শেষ রাজা লক্ষন সেন পিতার মৃত্যুর পর সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ছিলেন বাংলার শেষ হিন্দু রাজা।  ১২০৪ সালে বখতিয়ার খলজী লক্ষণ সেনকে অতর্কিত আক্রমণ করলে তিনি পূর্ববঙ্গে পলায়ন করেন। এখানে আরো কিছুকাল রাজত্বের পর ১২০৬ সালে তিনি প্রাণত্যাগ করেন।

 


প্রাচীন বাংলার জনপদ

প্রাচীন যুগে বাংলা অখন্ড কোন রাজ্য ছিল না। ভিন্ন ভিন্ন নামে খন্ডে খন্ডে বিভিন্ন জনপদে বিভক্ত ছিল সমগ্র বাংলা। প্রাচীন জনপদগুলোর সীমা ও বিস্তৃতি সঠিকভাবে নির্ণয় করা কঠিন্ বিভিন্ন সময়ে ও রাজন্যবর্গের শাসনামলে এর সীমা ও পরিধির পরিবর্তন ঘটেছে। তাই প্রাচীন বাংলার কোন সুনির্দিষ্ট সীমারেখা ছিল না।

গৌড়ঃ

বাংলার উত্তরাংশ এবং উত্তরবঙ্গে ছিল গৌড় রাজ্য। সপ্তম শতকে রাজা শশাঙ্ক বিহার ও উড়িষ্যা পর্যন্ত গৌড় রাজ্যের সীমা বর্ধিত করেন। প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোকে শশাংক গৌড় নামে একত্রিত করেন। মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ণ (বর্তমান রাঙ্গামাটি অঞ্চল) ছিল শশাঙ্কের সময়ে গৌড় রাজ্যের রাজধানী। আমাদের বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সন্নিকটের এলাকা গৌড় রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।  বাংলার উত্তর-পশ্চিমাংশ,বিহার ও উড়িষ্যা অঞ্চলের রাজধানীও ছিল গৌড় নগরী।

বঙ্গঃ

ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ ও পটুয়াখালীর নিম্ন জলাভুমি এবং পশ্চিমের উচ্চভূমি যশোর, কুষ্টিয়া, নদীয়া, শান্তিপুর ও ঢাকার বিক্রমপুর সংলগ্ন অঞ্চল ছিল বঙ্গ জনপদের অন্তর্গত। সুতরাং বৃহত্তর ঢাকা প্রাচীনকালে বঙ্গ জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পুরানো শিলালিপিতে বিক্রমপুর ও নাব্য নামে দুটি অংশের উল্লেখ রয়েছে। প্রাচীন বঙ্গ ছিল একটি শক্তিশালী রাজ্য।

* ঋগ্বেদের (প্রচীন বৈদিক সাহিত্য) ঐতরেয় আরণ্যক-এ বঙ্গ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া রামায়ণ ও মহাভারতে এবং কালিদাসের রঘুবংশ –এ বঙ্গ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।

* সমগ্র বাংলা বঙ্গ নামে ঐক্যবদ্ধ হয় পাঠান আমলে।

সমতটঃ

হিউয়েন সাং এর বিবরণ অনুযায়ী সমতট ছিল বঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ-পূর্বাংশের একটি নতুন রাজ্য। মেঘনা নদীর মোহনাসহ বর্তমান কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চল সমতটের অন্তর্ভুক্ত। কুমিল্লা জেলার বড় কামতা এ রাজ্যের রাজধানী ছিল বলে জানা যায়।

রাঢ়ঃ

রাঢ় বাংলার একটি প্রাচীন জনপদ।ভাগীরথী নদীর পম্চিম তীর হতে গঙ্গা নদীর দক্ষিণাঞ্চল রাঢ় অঞ্চলের অন্তর্গত। অজয় নদী রাঢ় অঞ্চলকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। রাঢ়ের দক্ষিণে মেদেনীপুর জেলায় ‘তাম্রলিপি’ ও ‘দন্ডভুক্তি’ নামে দুটি ছোট বিভাগ ছিল। তৎকালে তাম্রলিপি ছিল একটি বিখ্যাত নৌবন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র।

পুন্ড্রঃ

বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার অবস্থানভুমিকে কেন্দ্র করে পুন্ড্র জনপদ গড়ে ওঠে। এটি বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন জনপদ। পুন্ড্রবর্ধন বা পুন্ড্রনগর ছিল প্রাচীন পুন্ড্র রাজ্যের রাজধানী। এর অবস্থান বর্তমান বগুড়ার মহাস্থানগড়। সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে প্রাচীন পুন্ড্র রাজ্যের স্বাধীন সত্ত্ব বিলুপ্ত হয়।

* ‘পৌন্দ্রিক’ শব্দের অর্থ আখ বা চিনি। এ শব্দ থেকে ‘পুন্ড্রবর্ধন’ নামের উৎপত্তি।

* পাল রাজারা উত্তরবঙ্গকে তাদের পিতৃভূমি মনে করত। সে কারণে এর নামকরণ করেছিল বারিন্দ্রী। এ বারিন্দ্রী থেকে বরেন্দ্র শব্দের উৎপত্তি। রাজশাহী বিভাগের উত্তর –পশ্চিমাংশ তথা রংপুরের সামান্য এলাকা ব্যতীত উত্তরবঙ্গের বিস্তৃত অঞ্চলে বরেন্দ্রভূমি গড়ে উঠে। বর্তমান করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরের লালমাটি সমৃদ্ধ অঞ্চলই বরেন্দ্র ভূমি নামে পরিচিত। রামায়ণে গঙ্গা ও করতোয়া নদীর পশ্চিমাংশের মধ্যবর্তী অংশকে বরেন্দ্রীমন্ডল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

হরিকেলঃ

হরিকেল হলো ভারতবর্ষের পূর্বপ্রান্তের অঞ্চল। ত্রিপুরার শৈলশ্রেণীর সমান্তরাল অঞ্চল সিলেট হতে চট্টগ্রাম পর্যন্ত হরিকেল বিস্তৃত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্ষিত দুইটি শিলালিপিতে হরিকেল সিলেটের সঙ্গে সমার্থক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।


মৌর্য যুগ

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (৩২৪-২৯৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)ঃ

হিমালয়ের পাদদেশে ‘মৌর্য’ নামক ক্ষত্রিয় বংশে চন্দ্রগুপ্ত জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে পিতৃহীন চন্দ্রগুপ্তের মাতা তাকে নিয়ে তক্ষশীলায় বসবাস করতেন। এ সময় তক্ষশীলার বিখ্যাত পন্ডিত চাণক্যের আনুকূল্যে চন্দ্র গুপ্ত প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করেন। গ্রীক মহাবীর আলেকজান্ডার ৩২৭ অব্দে পাঞ্চাব জয় করলে চন্দ্রগুপ্ত গ্রীক শিবিরে থেকে রণকৌশল শিক্ষা লাভ করেন। চন্দ্রগুপ্তের নির্ভীক আচরণে সম্রাট আলেকজান্ডার রুষ্ট হয়ে প্রাণদন্ডের আদেশ দিলে দ্রুত পালিয়ে চন্দ্রগুপ্ত আত্মরক্ষা করেন। কুটনীতিবিশারদ চাণক্য মগধরাজ ধননন্দ কর্তৃক অপমানিত হয়ে প্রতিশোধের সুযোগ খুজতে থাকেন। চন্দ্রপুপ্ত গ্রিক শিবির হতে পলায়নের পর চাণক্যের সহায়তায় সমর শক্তি গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন। চাণক্যের সহায়তায় চন্দ্রগুপ্ত খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৪ অব্দে মগধরাজ ধননন্দকে পরাজিত করে মগধের সিংহাসনে আরোহণ করেন। বাংলার উত্তরাংশ, বিহার ও উড়িষ্যার অংশবিশেষ নিয়ে ছিল মগধ। আলেকজান্ডারের ভারতবর্ষ ত্যাগের পর গ্রিক সেনাপতি সেলুকাসকে পরাজিত করে চন্দ্রগুপ্ত বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তার রাজধানী ছিল পাটলীপুত্র। চন্দ্রগুপ্তের সময়ে গ্রিক পরিব্রাজক মেগাস্থিনিস ভারতবর্ষে আগমন করে ভারতের শাসনপ্রকৃতি, ভৌগোলিক বিবরণ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা প্রভৃতি তার বিখ্যাত গ্রন্থ ইন্ডিকা’তে লিপিবদ্ধ করেন। এই ইন্ডিকা গ্রন্থ বর্তমানে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে পরিগণিত।

সম্রাট অশোক(খ্রিষ্টপুর্ব ২৬৯-২৩২ অব্দ)ঃ

সম্রাট অশোক ছিলেন প্রাচীন ভারতের শ্রেষ্ঠ সম্রাট। কথিক আছে যে, মৌর্য বংশের এই সম্রাট তার নিরানব্বই জন ভ্রাতাদের মধ্যে অধিকাংশকে পরাজিত করে এবং কোন ভ্রাতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে সিংহাসন দখল করেন এজন্য তাকে চন্ডাশোক বলা হয়। তার শাসনমলে প্রাচীন পুন্ড্র রাজ্যের স্বাধীনতা সত্ত্ব বিলোপ হয়। মৌর্য সাম্রাজ্য বাংলায় উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। সম্রাট অশোক সিংহাসনে আরোহণের অষ্টম বছরে কলিঙ্গ যুদ্ধে জয়ী হন। এ যুদ্ধে প্রায় এক লক্ষ লোক নিহত হয়। যুদ্ধের বিভীষিকা ও রক্তপাত দেখে  তিনি অহিংস বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন্ তিনি ব্রাক্ষীলিপির পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং এ লিপিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেন। আমাদের বাংলা লিপির উৎপত্তি এ ব্রাক্ষীলিপি থেকে। মৌর্যযুগ প্রাচীন ভারতের স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিত। মৌর্য শাসনের অবসান: মৌর্য বংশের দশম রাজা কে হত্যা করে তা সেনাপতি পুষ্যমিত্র খ্রিষ্টপূর্ব ১৮৭ অব্দে মৌর্য শাসনের অবসান ঘটান।


বাংলাদেশের গনমাধ্যম

গণমাধ্যম (ইংরেজিতেঃ Mass media) হচ্ছে সংগৃহীত সকল ধরণের মাধ্যম, যা প্রযুক্তিগতভাবে গণযোগাযোগ কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সম্প্রচার মাধ্যম যা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া নামে পরিচিত, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে তাদের তথ্যাবলী প্রেরণ করে।

টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, রেডিও বা বেতার, সিডি, ডিভিডি এবং অন্যান্য সুবিধাজনক ছোট ও সহায়ক যন্ত্রপাতি যেমনঃ ক্যামেরা বা ভিডিওচিত্রের সাহায্যে ধারণ করা হয়। পাশাপাশি মুদ্রিত মাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্র, সাময়িকী, ব্রোশিওর, নিউজলেটার, বই, লিফলেট, পাম্পলেটে বাহ্য বিষয়বস্তু তুলে ধরা হয়। এতে ফটোগ্রাফী বা স্থিরচিত্রও দৃশ্যমান উপস্থাপনায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে। টেলিভিশন কেন্দ্রে অথবা পাবলিশিং কোম্পানী গণমাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত হয়ে সংগঠনরূপে আধুনিক প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার করে থাকে।

মোবাইল বা সেল ফোন, কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটকেও অনেক সময় নতুন-যুগের গণমাধ্যম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ইন্টারনেট স্বীয় ক্ষমতাবলে ইতোমধ্যেই অন্যতম গণমাধ্যম হিসেবে ব্যাপক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এ মাধ্যমে অনেক প্রকার সেবা - বিশেষ করে ই-মেইল, ওয়েব সাইট, ব্লগিং, ইন্টারনেট এবং টেলিভিশনের প্রচারকার্য পরিচালনা করছে। এ কারণে অনেক গণমাধ্যমের পদচারণা ওয়েব সাইটে দেখা যায়। টেলিভিশন বিজ্ঞাপনচিত্রকে ওয়েবসাইটে সংযুক্ত করা হয়েছে কিংবা খেলাধূলাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রীড়াপ্রেমী দর্শকদেরকে তাদের ওয়েবসাইট দেখতে উদ্বুদ্ধকরণে ঠিকানা প্রকাশ করে।

বাইরের মাধ্যম হিসেবে বিলবোর্ড, সাইন, প্লাকার্ডকে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ভবনের ভিতরে ও বাইরে যেখানে অধিক দোকান-পাট/বাসের ব্যস্তমূখর পরিবেশে উপস্থাপন করা হয়। জনসভা এবং বিশেষ ঘটনায় সমবেত ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানও গণমাধ্যমের একটি ধরণ।

বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকা

উপমহাদেশে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে দিগ্দর্শন নামে বাংলা ভাষায় প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। এই মাসিক পত্রিকাটি প্রকাশ করে শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন। একই বছর মে মাসে শ্রীরামপুরের খ্রিস্টান মিশনারিরা আরেকটি বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশ করে। এটি ছিল জন ক্লার্ক মার্শম্যান সম্পাদিত সাপ্তাহিক সমাচার দর্পণ। এটি প্রায় ২০ বছর চালু ছিল। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দেই বাঙালি মালিকানায় প্রথম সংবাদপত্র বাঙ্গাল গেজেটি প্রকাশিত হয়, প্রকাশক ছিলেন গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য্য, কারো কারো মতে গঙ্গাধর ভট্টাচার্য্য। মাঝে মধ্যে এতে ইংরেজি ও হিন্দিতে কিছু নিবন্ধ মুদ্রিত হলেও সাধারণভাবে এর ভাষা ছিল বাংলা। হরচন্দ্র রায় ছিলেন বাঙ্গাল গেজেটি-র সম্পাদনাকার্যে গঙ্গাকিশোরের অন্যতম সহযোগী। ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দের ১ মে জেমস সিল্ক বাকিংহাম সম্পাদিত ক্যালকাটা জার্নাল অর্ধ-সাপ্তাহিক থেকে দৈনিক-এ রূপান্তরিত হয়। ক্যালকাটা জার্নালই ছিল উপমহাদেশের প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের মুহূর্তে বাংলাদেশে দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা ছিল ১০। স্বাধীনতার পরপর কয়েকটি পত্রিকার পরিচালনার ভার সরকারকে বহন করতে হয়েছিল। পাকিস্তান প্রেস ট্রাস্টের পত্রিকা দৈনিক পাকিস্তান (দৈনিক বাংলা) ও দ্য মর্নিং নিউজ এবং মালিকের অনুপস্থিতিতে দ্য পাকিস্তান অবজারভার (দ্য বাংলাদেশ অবজারভার), পূর্বদেশ এবং চিত্রালী সংবাদপত্র ব্যবস্থাপনা বোর্ডের মাধ্যমে তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত হতো। ১৯৭৪ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইন জারির মাধ্যমে সংবাদপত্রের নিয়ন্ত্রণে সরকারকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়। ১৯৭২ সালে সংবাদনির্ভর সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন বিচিত্রা-র প্রকাশনা শুরু হয় দৈনিক বাংলা প্রকাশনী থেকে। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সংবাদপত্রে নিয়োজিত কর্মচারী-কর্মকর্তাদের জন্য আইন প্রণীত হয়। ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন সরকারিভাবে প্রকাশিত চারটি পত্রিকা ছাড়া সরকার অন্যসব পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ ঘোষণা করে। পত্রিকা চারটি ছিল দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, দ্য বাংলাদেশ অবজারভার ও দ্য বাংলাদেশ টাইমস।

১৯৭৫ সালের পর থেকে পুরানো পত্রিকাগুলি একে একে আবার প্রকাশিত হতে থাকে। প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত সংবাদপত্র ছিল নিয়ন্ত্রিত। সরকারের সমালোচনামূলক খবর ছাপানোর অভিযোগে এ সময় প্রায় ৫০টি দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৮৪ সালে যায় যায় দিন নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। পাঠক জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকে এ পত্রিকাটি সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রকাশনাকে মেকআপ ও পরিবেশনার ভঙ্গিসহ বিভিন্ন দিক দিয়ে প্রভাবিত করেছে।

 ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পর বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিশেষ ক্ষমতা আইন-এর ১৬, ১৭, এবং ১৮নং ধারা অবলুপ্ত করে সেন্সরশিপ ও প্রকাশনা নিষিদ্ধ সংক্রান্ত কালো আইনের বিলুপ্তি ঘটায়। এছাড়া এ সময় প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন অ্যাক্ট-এরও সংশোধনী আনা হয়। বিশ শতকের নববইয়ের দশকে বিভিন্ন মতের রেকর্ড সংখ্যক পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল ১৯৯৭ সালে সরকারি মালিকানাধীন দৈনিক বাংলা, দ্য বাংলাদেশ টাইমস এবং সাপ্তাহিক বিচিত্রা-র প্রকাশনা বন্ধ করে দিয়ে টাইমস-বাংলা ট্রাস্টকে অবলুপ্ত ঘোষণা করা।

বাংলাদেশে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকাগুলির মধ্যে ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রধান সকল পত্রিকা নিয়মিত সাইজের, আর দেশের বিভিন্ন জেলা শহর থেকে প্রকাশিত অধিকাংশ পত্রিকাই ট্যাবলয়েড আকারের। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকেই ডেস্কটপ পাবলিকেশন প্রযুক্তি বিকশিত হতে থাকে। দৈনিক পত্রিকাগুলি সাধারণত ছাপা হয় অফসেট মেশিনে। ১৯৯৫ সাল থেকে সংবাদপত্রে রঙিন ছবি মুদ্রণও চালু হয়েছে।

নববইয়ের দশকের বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য দৈনিক পত্রিকার মধ্যে ছিল ইত্তেফাক, জনকণ্ঠ, ইনকিলাব, আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ, বাংলাবাজার পত্রিকা, মুক্তকণ্ঠ, প্রথম আলো, সংবাদ, মানবজমিন, সংগ্রাম, দ্য বাংলাদেশ অবজার্ভার, দ্য ডেইলি স্টার, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ইন্ডিপেন্ডেন্ট এবং নিউ নেশন। ২০০০-এর দশকে সংবাদপত্র জগতে উল্লেখযোগ্য নতুন সংযোজন ছিল: যুগান্তর, সমকাল, যায়যায়দিন, আমারদেশ, নয়াদিগন্ত, কালেরকণ্ঠ, দি নিউজ টুডে, নিউ এজ এবং আমাদের সময়। বিভিন্ন জেলা শহর থেকে প্রকাশিত দৈনিকসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত আজাদী ও পূর্বকোণ, বগুড়া থেকে করতোয়া, খুলনা থেকে পূর্বাঞ্চল এবং সিলেট থেকে যুগভেরী।

স্বাধীনতার পর যে সকল সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছে তাদের মধ্যে বিচিত্রা ও যায় যায় দিন ছাড়া উল্লেখযোগ্য হলো হলিডে, রোববার, সচিত্র সন্ধানী, পূর্ণিমা, ঢাকা কুরিয়ার, খবরের কাগজ, আগামী, সাপ্তাহিক ২০০০, সাপ্তাহিক এখন, সাপ্তাহিক প্রতিচিত্র, শীর্ষকাগজ ও শৈলী। মহিলা পাঠকের পত্রিকা সাপ্তাহিক বেগম পাকিস্তান আমল থেকেই প্রকাশিত হচ্ছে। বেগম-এর অনুপ্রেরণায় ১৯৮৭ সাল থেকে প্রকাশিত হয়ে আসছে পাক্ষিক অনন্যা।

সাংবাদিকতার প্রধান স্রোতের বাইরে বিশেষ বিষয়ের পত্রিকা প্রকাশের ধারা স্বাধীনতার পর থেকে গড়ে উঠেছে। এ ধারার উল্লেখযোগ্য বিষয়সমূহ হলো চলচ্চিত্র, বিনোদন, ক্রীড়া, সাহিত্য, ব্যবসাবাণিজ্য, প্রযুক্তি, উন্নয়ন, সমাজ, অর্থনীতি, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, অপরাধ ও কার্টুন।

বিস্তারিত


ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র

বাংলাদেশে ৪ টি ভূ উপগ্রহ কেন্দ্র রয়েছে। প্রথম উপগ্রহটি বেতবুনিয়ায় ও সর্বশেষটি সিলেটে অবস্থিত।


টেলিভিশন

* বাংলাদেশে টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হয়েছিল ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর। ঢাকা শহরে ডিআইটি (বর্তমানে রাজউক) ভবন থেকে মাত্র তিনশ ওয়াট ট্রান্সমিটারের সাহয্যে ঢাকা ও এর আশপাশের দশ মাইল এলাকার জন্য প্রতিদিন তিন ঘন্টার অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হতো।

* স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে টেলিভিশনকে জাতীয়করণ করা হয়। পূর্বে এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতষ্ঠিান ছিল।

* ১৯৭৫ সালের ৬ মার্চ ডিআইটি থেকে রামপুরায় স্থানান্তর করা হয়।

* ১ ডিসেম্বর ১৯৮০ সাল হতে টেলিভিশনে রঙিন অনুষ্ঠান সম্প্রচার চালু হয়।

* ১৯৬৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি টেলিভিশনে প্রথমবারের মতো নাটক ‘একতলা ও দোতলা’ প্রচারিত হয।

* একতলা ও দোতলা হাস্যরসাত্মক নাটকটির রচয়িতা ছিলেন মুনীর চৌধুরী ও পরিচালক মনিরুল আলম। এতে অভিনয় করেন লিলি চৌধুরী, ফেরদেৌস আরা, ডলি ইব্রাহিম, খন্দাকার রাফিকুল হক ও রামেন্দু মজুমদার।

* ১১ এপ্রিল ২০০৪ হতে বাংলাদেশ টেলিভিশন স্যাটেলাইট সম্প্রচার শুরু হকে। এই চ্যানেলের নাম ‘বিটিভি ওয়ার্ল্ড’। পূর্ব দিকে জাপান সাগর হতে পশ্চিমে সাইপ্রাস, মিশর, দক্ষিণে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া থেকে উত্তরে রাশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের দর্শক বিটিভি ওয়ার্ল্ড দেখতে পারেন।

* বিটিভি রজত জয়ন্তী উৎসব পালন করে ২৫ ডিসেম্বর, ১৯৮৯ সালে।

* চট্টগ্রাম টিভি স্টেশন চালূ হয় ১৯ ডিসেম্বর ‘৯৬।

* বিটিভির প্রথম সঙ্গীতশিল্পী হলেন ফেরদৌসী রহমান।

* বাংলাদেশ টেলিভিশনে বিবিসি’র অনুষ্ঠান সম্প্রচার আরম্ভ হয় ১ এপ্রিল, ১৯৯৩

* রামপুরা টিভি ভবনের নকশা করেন-পিটার সেরসিং এবং মাহবুবুল হক।

* বাংলাদেশ সরকারের পূণাঙ্গ টিভি কেন্দ্র ২টি- ঢাকা ও চট্টগ্রাম।

* বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপকেন্দ্র ১৪টি।

* বাংলাদেশে টেলিভিশনের প্যাকেজ প্রোগ্রাাম প্রথম গৃহীত হয় ১৯৯৪ সালে।

* বাংলাদেশে প্রথম বেসরকারি টেলিভিশন-এটিএন বাংলা।

* বর্তমানে বাংলাদেশে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সংখ্যা- ৪১টি।

* বাংলাদেশের বেসরকারি টিভিসমুহ:

এটিএন বাংলা, একুশে টিভি, চ্যানেল আই, এনটিভি, আরটিভি, বাংলাভিশন, বৈশাখী টেলিভিশন, দেশটিভি, চ্যানেল ওয়ান, মাই টিভি, এটিএন নিউজ, মাছরাঙা, ইন্ডিপেন্ডেন্ট, সময়, সংসদ বাংলাদেশ, বিজয়, মোহনা টিভি, চ্যানেল নাইন, জিটিভি, চ্যানেল ২৪, চ্যানেল ৭১, এশিয়ান টিভি, এস,এ টি , চ্যানেল—৫২ প্রভৃতি।

 

 


বেতার

* বাংলাদেশ ভূখন্ডে প্রথম রেডিও সম্প্রচার শুরু হয়েছিল ১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর (পুরান ঢাকায়)।

* স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছিল চট্টগ্রামের কালুরঘাট।

* স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র কলকাতায় স্থাপিত হয়েছিল ২৫ মে ১৯৭১।

* স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রকে বাংলাদেশ বেতার নামকরণ করা হয় ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১।

* ১৯৭৫-১৯৯৬ বাংলাদেশ বেতারের নাম ছিল রেডিও বাংলাদেশ।

* বাংলাদেশ বেতারের- এর সদর দপ্তর ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত।

* রেডিও বাংলাদেশ থেকে অনুষ্ঠান প্রচার করা হয় বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, আরবি, হিন্দি ও নেপালি ভাষায়।

* বাংলাদেশ বেতারের-এর স্টেশনের সংখ্যা ১২টি । সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ স্টেশন হলো কুমিল্লা বেতার কেন্দ্র।

* বাংলাদেশ বিতারের প্রচারিত প্রথম নাটক বুদ্ধদেব বসুর ‘কাঠঠোকরা’ উদ্ধোধনি দিনে।

বেসরকারি রেডিও

* বাংলাদেশে প্রথম বেসরকারি রেডিও  - রেডিও মেট্টোওয়েভ (১৯৯৬-২০০৬)।

* বাংলাদেশে প্রথম সংবাদভিত্তিক বেসরকারি রেডিও-এবিসি রেডিও (প্রতিষ্ঠা-০৯ জানুয়ারি ২০০৯)

* বাংলাদেশের বেসরকারি বেতার এফ এম ভিত্তিক ( Frequency Module )।

* চলমান রেডিও সমুহ (১২টি)

ক. রেডিও আমার – ১১ ডিসে. ২০০৭ হতে।

খ. রেডিও টুডে- অক্টোবর, ২০০৬ হতে।

গ. রেডিও ফূর্তি-১১ ডিসে. ২০০৭ হতে।

ঘ. এবিসি রেডিও- ০৯ জানুয়ারি ২০০৯ হতে।

ঙ. পিপলস রেডিও

চ. ঢাকা এফএম

ছ. রেডিও স্বাধীন

জ. সিটি এফএম

ঝ. এশিয়ান রেডিও

ঞ. রেডিও ভূমি

ট. টিউন এফএম

ঠ. রেডিও ৭১

 


বাংলাদেশের পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্হা

পরিবহণ  বলতে বোঝায় স্থল, জল ও আকাশ পথে মানুষ ও মালামাল স্থানান্তর। বাংলাদেশ মূলত নদীমাতৃক দেশ বলে বাংলার পরিবহণের ইতিহাস মূলত নৌপরিবহণেরই ইতিহাস। সড়ক ব্যবস্থার অভাবে এক সময় যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে নৌপথের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি এবং নৌপথে সহজে এক জায়গা থেকে অন্যত্র মালামাল আনা-নেওয়া হতো। সমগ্র পৃথিবী থেকে, বিশেষ করে আরব দেশসমূহ, তুরস্ক, পর্তুগাল, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডের নাবিকরা অতীতে নৌপথে ভারতবর্ষে আসতেন।

উপমহাদেশে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্রিটিশদের অবদান অনেক এবং তারাই ১৮৬২ সালে সর্বপ্রথম বাংলাদেশে রেলপথ স্থাপন ও রেলগাড়ি চালু করে। তবে ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার পূর্বাঞ্চলের প্রতি খুব একটা মনোযোগ দেওয়া হয় নি। পাকিস্তান সরকারও পূর্ব পাকিস্তানের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের দিকে তেমন একটা দৃষ্টিপাত করে নি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় যোগাযোগ অবকাঠামো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার তিন দশকের মধ্যে মূলত বৈদেশিক সাহায্যে তথা বিদেশের অর্থ ও কারিগরি সহযোগিতায় বাংলাদেশের পরিবহণ খাত দ্রুত বিকশিত হয়।

বিস্তারিত

বাংলাদেশের ডাক বিভাগ

* ডাকটিকেট:

স্বাধীনতার পর প্রথম ডাকটিকেট (২০ পয়সা) প্রকাশিত হয় ২১ ফেব্রুয়ারি ৭২। এর ডিজাইনার ছিলেন রিপ্টি চিন্টনিশ। এতে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের ছবি ছিল। ইন্ডিয়া সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে এ ডাকটিকেট ছাপা হয়েছিল।

১৯৭১ সালের ২৯ জুলাই মুজিবনগর সরকার ৮টি ডাকটিকেট প্রকাশ করে.এগুলো ডিজাইন করেছিলেন বিমান মর্ল্লিক। এগুলো ইংল্যান্ডের ফরম্যাট ইন্টারন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস থেকে ছাপানো হয়েছিল।

 


টেলিযোগাযোগ

* বাংলাদেশে প্রথম ডিজিটাল টেলিফোন ব্যবস্থা চালু হয় ৪ জানুয়ারি ’৯০ রংপুরের মিঠাপুকুরে।

* Wi-MAX এর পূর্ণরূপ হল- Worldwide Interoperability for Microwave Access. এটি উচ্চ ক্ষমতার ইন্টানেট ব্রডব্যান্ড প্রযুক্তি সেবা। বাংলাদেশে এ প্রযুক্তি চালু হয় ২১ জুলাই, ২০০৯।

* ঢাকায় প্রথম সেলুলার টেলিফোন চালু হয় ৮ আগস্ট, ১৯৯৩।

* বাংলাদেশে কার্ডফোন চালু হয় ৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৯২ সালে।

* বাংলাদেশ টিএন্ডটি চারটি অঞ্চলে বিভক্ত। এগুলো হলো- ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুরনা।

* ২০০৮ সালের ১ জুলাই “বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন বোর্ড (বিটিটিবি)-কে “বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)”-এ পরিণত করা হয়।

* টেলিযোগাযোগ আইন’ জাতীয় সংসদে পাশ করা হয় ২০০১ সালে।

* বাংলাদেশে প্রথম ‘ডিজিটাল টেলেক্স এক্সচেঞ্জ’ স্থাপিত হয় ১৯৮১ সালে ঢাকায়।

* ঢাকায় ১৯৮৩ সালে একটি স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল আন্তর্জাতিক ট্রাঙ্ক এক্সচেঞ্জ (আইটএক্স) স্থাপিত হয়।

* সিলেটের নতুন উপগ্রহ ভূকেন্দ্রটি স্থাপন করেছে ব্রিটিশ টেলিকম।

* বাংলাদেশের ইন্টানেট কান্ট্রি কোড- .bd (১৯৯৯ –এ চালু হয়)।

* বিটিটিবি কর্তৃক দেশের ৬৪টি জেলা শহরে এবং ১৬৪টি উপজেলা শহরে ইন্টানেট ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

* ইসরাইল সাথে বাংলাদেশের কোন টেলিযোগাযোগ সম্পর্কে নাই

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন

টেলিযোগাযোগ আই, ২০০১ এর মাধ্যমে ৩১ জানুয়ারি ২০০২ তারিখে স্বাধীন ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বাংলাদশে টেলিযোগােযাগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বা Bangladesh Telecommunication Regulatory Commission (BTRC)সঠন করা হয়।

টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা

বেসরকারি সেলুলার মোবাইল অপারেটর: ৫টি

সরকারি সেলুলার মোবাইল অপারেটর : ১টি (টেলিটক)

বেসরকারি ফিক্সড ফোন অপারেটর: ৫টি

টেলিযোগাযোগ সংক্রান্ত কয়েকটি শব্দ সংক্ষেপ:

* BTTB: Bangladesh Telephone & Telegraph Board. [Now performs commercial operations]

* BTCL: Banglsdesh Telecommunication Company Limited

* BTRC: Bangladesh Telecommunication Regulatory Commission.

* VOIP: Voice Over Internet Protocol.

* VSAT: Very Small Aperture Terminal. (Satellite signal processing parabolic dish antenna.)

* DDN: Digital Data Network.

* BSCCL: Banglsdesh Submarine Cable Company Limited.

* GSM: Global System for Mobile Communication.

* ISD: International Subscriber Dialling.

* MMS: Multimedia Message Service.

* NWD: Nation Wide Dialling.

* PIN: Personal Identification Number

* PUC: Personal Unblocking Code.

* SMS: Short Message Service.

* SIM: Subscriber Identity Module.

 


বাংলাদেশে মোবাইল ফোন

১৯৯৩ সালে সিটিসেল কোম্পানির মাধ্যমে বাংলাদেশ মোবাইল ফোনের জগতে প্রবেশ করে। এ বছর সরকার সিটিসেল কোম্পানিকে লাইসেন্স প্রদান করে। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত মোবাইল ফোন ছিল সাধারণ মানুষ বা মধ্যবিত্তের কাছে স্বপ্নের মতো। পরে ১৯৯৬ সালে সরকার গ্রামীন ফোন, একটেল এবং সেবা-এ তিনটি কোম্পানিকে মোবাইল ফোনের লাইসেন্স দেয়ায় প্রতিযোগিতা শুরু হয় মোবাইল কোম্পানিগুলোর মধ্যে। মোবাইল ফোন মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে আসে। পরবর্তীতে টেলিটক এবং এয়ারটেল মোবাইল ফোন বাজারে ছেড়েছে।

 

 


রেলযোগাযোগ

উপমহাদেশে সর্বপ্রথম রেলপথ চালু হয় ১৮৫৩ সালে। ১৮৬২ সালে বাংলাদেশে প্রথম রেললাইন প্রতিষ্ঠিত হয় দর্শনা হতে কুষ্টিয়া পর্যন্ত। স্বাধীনতার পর ১৯৮৬ সালে রেল দপ্তর আন্ত:নগর ট্রেন সার্ভিস চালু করেছে। রেলপথের মিটারগেজের পাত দুইটির মধ্যকার দূরত্ব ১ মিটার বা ৩৯.৩৭ ইঞ্চি বা ৩.২৮ ফুট। ব্রডগেজের পাত দুইটির মধ্যকার দুরত্ব ১.৭৭ মিটার বা ৫.৮ ফুট বা ৬৯.৫৭ ইঞ্চি।

বাংলাদেশের মোট রেলপথের দৈর্ঘ্য ২৮৭৭ কিমি। এর মধ্যে মিটারগেজ ১৮৪৩ কিমি, ব্রডগেজ ৬৫৯ কিমি। দেশের বৃহত্তম রেলস্টেশন কমলাপুর রেল স্টেশন। দেশের দীর্ঘতম একক রেলসেতু হার্ডিঞ্জ ব্রীজ পদ্মা নদীর উপর ১৯১৫ সালে নির্মিত হয় । যমুনা সেতুতে রেল চালু হওয়ায় এটি এখন দেশের দীর্ঘতম রেলসেতু। এর মাধ্যমে টাঙ্গাইলকে রেল নেটওয়ার্কে আনা হয়।


নৌযোগাযোগ

বাংলাদেশে সারাবছর নৌচলাচল উপযোগী পথ প্রায় ৫২০০ কিলোমিটার।

শুষ্ক মৌসুমে এর পরিমাণ দাড়ায় ৩৮০০ কিলোমিটার। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ পরিবহন সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৫৮ সালে। নৌপথে মালপত্র পরিবহন ও যাতায়াত তুলনামূলক ভাবে সস্তা।

* বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন: ১৯৭২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আনুষ্টানিকভাবে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন যাত্রা শুরু করে। এ প্রথম জাহাজ হল ‘ বাংলার দুত।


বিমানযোগাযোগ

বাংলাদেশ বিমান সংস্থা গঠিত হয় ৪ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে। ৪ মার্চ, ১৯৭২ বিমানের প্রথম আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হয়। এর প্রতীক হল বলাকা। দেশের প্রধানতম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ‘জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর’ চালু হয় ১৯৮০ সালে, এর নতুন নামকরণ করা হয় হযরত শাহজালাল (রহ.) বিমান বন্দর (২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১০)। ৯৫ সালের ১৭ জুলাই এ্যারো বেঙ্গল এয়ারলাইন্স নামক প্রতিষ্ঠানটি প্রথম বেসরকারি খাতে অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচল শুরু করে।

 


সড়ক যোগাযোগ

দেশে মোট যাত্রী পরিবহনের প্রায় ৭০%  এবং পণ্য পরিবহনের প্রায় ৬০% সড়ক পথে পরিচালিত হয।

বাংলাদেশের মোট সড়কের দৈর্ঘ্য ২১.৪৫৪ কিমি। দেশে জাতীয় মহাসড়ক ৩৫৩৮ কিমি, আঞ্চলিক মহাসড়ক ৪২৭৮ কিমি. বিভিন্ন প্রকার সংযোগ সড়ক ১৩৬৩৮ কিমি।

সড়কপথে ঢাকার সঙ্গে অন্যান্য অঞ্চলের দুরত্ব

স্থান              দুরত্ব                       স্থান              দূরত্ব

চট্টগ্রাম           ২৯৫ কি. মি.             রাজশাহী      ২৫৮ কি.মি.

খুলনা              ২৭০ কি.মি.             ময়মনসিংহ    ১২১ কি.মি.

কক্সবাজার       ৩৮৮ কি.মি.             সিলেট           ২৪৩ কি.মি

বরিশাল           ২৪৯ কি.মি.              রংপুর             ৩০৯ কি.মি.

দিনাজপুর         ৩৮৩ কি.মি.             যশোর             ২১২ কি.মি.

টেকনাফ           ৪৭৫ কি.মি.              ফেনী               ১৫১ কি.মি.

সড়কপথ সম্পর্কিত শব্দ সংক্ষেপ:

RHD: Roads & Highways Department.

BRTA: Bangladesh Road Transtort Authority.

BRTC: Bangladesg Road Transport Corporation.

DTCB: Dhaka Transport Co-ordination Board.

 


বাংলাদেশের স্থলবন্দর

স্থলবন্দর  সীমান্তে অবস্থিত আন্তদেশীয় পণ্য ও যাত্রী যাতায়াত এবং বিনিময় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। স্থলবন্দরে শুল্ক, অভিবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা বিধান দপ্তর ছাড়াও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণমূলক দপ্তরসমূহের অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়। এখানে আন্তদেশীয় পণ্য বিনিময় যাত্রী অভিবাসন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ নিমিত্তে পণ্যাগার (ওয়ারহাউজ), যাত্রী ছাউনি, অভ্যর্থনাকেন্দ্র, আমদানি-রপ্তানি দলিলাদি পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থাসহ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো গড়ে ওঠে। স্থলবন্দরে যাতায়াতের নিমিত্তে উভয় দেশের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠা যেমন জরুরি তেমনি আন্তদেশীয় পণ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে বৈধ-অবৈধতা ও আইন সঙ্গতার বিষয়টি যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থা থাকে।

বাংলাদেশের স্থলবন্দরসমূহ বাংলাদেশের সাথে ভারত, নেপাল, ভূটান ও মায়ানমারের স্থল কিংবা নদী দ্বারা সৃষ্ট সীমান্তে অবস্থিত। প্রতিবেশী দেশের অঞ্চল ও পণ্য বিনিময়ে সুযোগ-সুবিধার ভিত্তিতে কিংবা যাত্রী যাতায়াতের গুরুত্বের ভিত্তিতে স্থলবন্দরসমূহে অবকাঠামোগত সুবিধাবলীর ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। বেনাপোল বন্দর দিয়ে অধিক মাত্রায় পণ্য বিনিময় হয়ে থাকে পক্ষান্তরে তামাবিল দিয়ে পণ্যের চাইতে যাত্রী যাতায়াত বেশি হয়। স্থল বন্দরসমূহের অবকাঠামোগত সুবিধা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজনের নিরীক্ষেই গড়ে ওঠে।

বাংলাদেশের স্থল সীমান্তের দৈর্ঘ প্রায় ২৪০০ কিমি যার শতকরা ৯২ ভাগ ভারতের সঙ্গে এবং বাকি ৮ ভাগ মিয়ানমারের সঙ্গে। পুরো সীমান্তে ছোট-বড় ১৮১টি শুল্ক স্টেশন আছে যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন। এই শুল্ক স্টেশনসমূহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত ও নির্বাচিত স্টেশনসমূহে স্থলবন্দর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার দায়িত্ব দিয়ে ২০০১ সালের ২১ নং আইনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে  বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ (বাস্থবক)। এ যাবত ১৩টি স্থলবন্দর নিজস্ব কিংবা বিওটি ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বাস্থবককে।

প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে একটি বাণিজ্যবান্ধব সম্পর্ক বিকাশের লক্ষ্যে, স্থলবন্দরসমূহে অধিকতর সেবাধর্মীতা এবং সহজতর পরিচালনা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অত্যাধুনিক ও যুগোপযোগী প্রযুক্তিক সুবিধার সমন্বয় ঘটানোর মাধ্যমে আন্তদেশীয় বাণিজ্যে একটি অনুকূল ভারসাম্য অবস্থান তৈরির মিশন ও ভিশন রয়েছে বাস্থবকের। বাস্থবকের প্রধান কার্যাবলীর মধ্যে রয়েছে স্থলবন্দর পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও সংরক্ষণের নীতি প্রণয়ন, স্থলবন্দরে পণ্য গ্রহণ, সংরক্ষণ ও প্রদানের জন্য অপারেটর নিয়োগ, সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে স্থলবন্দর ব্যবহারকারীদের নিকট থেকে আদায়যোগ্য কর, টোল, রেইট ও ফিমের তফসীল প্রণয়ন এবং স্থলবন্দর প্রতিষ্ঠা ও ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যপূরণকল্পে কারো সঙ্গে কোনো চুক্তি সম্পাদন। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৬টি স্থলবন্দর রয়েছে।

বিস্তারিত


বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দর

সমুদ্রবন্দর  জাহাজে পণ্যদ্রব্য ভরাট এবং খালাসের জন্য সমুদ্র তীরবর্তী স্থাপনা। পৃথিবীর ৮০% লোক সমুদ্র তীরবর্তী (১০০ মাইলের ভিতর) অঞ্চলে বসবাস করে। সমুদ্র তীরবর্তী দেশগুলির অর্থনীতির জন্য সমুদ্রবন্দরের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রাচীনকাল থেকে সমুদ্র তীরবর্তী দেশগুলিতে গড়ে উঠেছে সমুদ্রবন্দর।

বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর গুরুত্বপূর্ণ আমদানি-রপ্তানি অবকাঠামো। দেশের সিংহভাগ (৯০%) আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সম্পাদিত হয় এ দু’বন্দরের মাধ্যমে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরকে দেশের লাইফ লাইন বলা হয়ে থাকে। এ বন্দরের মাধ্যমে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির তিন-চতুর্থাংশ সম্পাদিত হয়। বাকিটুকু হয় মংলা ও কয়েকটি স্থল বন্দরের মাধ্যমে।

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্য দেশগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর এ গুরুত্বকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। একটা সময় ছিল যখন চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবহার করে আশেপাশের দেশের লোকজন তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করত। আশির দশকেও নেপালের ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে চট্টগ্রাম বন্দরকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ব্যবহার করত। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর ক্রমাগতভাবে চাপ বেড়ে যাওয়া এবং একই সঙ্গে প্রাকৃতিকভাবে কর্ণফুলি নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বন্দর ব্যবহারকারীদের আগ্রহ কমে যায়।

বিস্তারিত


বাংলার ইতিহাস(আধুনিক যুগ)

বাংলায় ইউরোপিওদের আগমন

জলপথ আবিষ্কার

১৪৯৮ সালে পর্তুগীজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামা উত্তমাশা অন্তরীপের পথ ঘুরে ভারতের কালিকট বন্দরে আগমন করেন। তার এই সফরে পথপ্রদর্শক হিসেবে বার্থোলোমিউ ডিয়াজ উত্তমাশা অন্তরীপ পর্যন্ত আসেন। ভাস্কো-দা-গামার ভারতবর্ষে আগমনের পর হতে বিভিন্ন ইউরোপীয় বণিকগোষ্ঠীর আগমন ঘটে এবং উপমহাদেশের ইতিহাসে বৈপ্লবিক সম্ভাবনাপূর্ণ নবযুগের সূচনা হয়।

উপমহাদেশে ইউরোপীয়দের আগমন

পর্তুগীজদের আগমনঃ

১৫১০ সালে সর্বপপ্রথম পর্তুগীজরা (পর্তুগালের অধিবাসী) ভারতবর্ষে আগমন করেন। বাংলাদেশে পর্তুগীজগণ ফিরিঙ্গি নামে পরিচিত। ১৫১৪ সালে তারা কোচিনে কুঠি স্থাপন করে। ১৫১৬ সালে তারা বাংলায় আগমন করে। ১৫১৭ সালে তারা বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে চট্টগ্রাম ও সপ্তগ্রামে। সুলতান মাহমুদ শাহ তাদের এ অনুমতি দেন। ভারতের প্রথম পর্তুগীজ ভাইসরয় ছিলেন ফ্রান্সিককো ডি আলমিডা। তারা বাংলার সুলতান মাহমুদ শাহের পক্ষে শেরশাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়। শেরশাহ পরবর্তীতে পর্তুগীজদের বাংলা থেকে তাড়িয়ে দেয়।

প্রায় একশত বছর উপমহাদেশের বিভিন্ন অংশে তাদের বানিজ্য একচেটিয়া ছিল। তারা কালিকট, গোয়া, দমন, দিউ, হুগলী, চট্টগ্রাম প্রভৃতি স্থানে বাণিজ্যকুঠি ও উপনিবেশ স্থাপন করে। তারা ভারতবর্ষে লোকদের উপর অত্যাচার করত, ডাকাতি করত এবং বলপূর্বক লোকদের খ্রিস্টানধর্মে দীক্ষিত করত। এ জন্য মুঘল সম্রাট তাদের অধিকাংশ কুঠি নষ্ট করে দেয়। নিপীড়নমুলক কার্যকলাপের জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমর্থন না পাওয়ায় এবং অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকদের সাথে বানিজ্য প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ভারতবর্ষে তাদের ব্যবসায়িক অস্তিত্ব ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়। পর্তুগীজ জলদস্যুদের বলা হয় ‘হার্মাদ’, শব্দটি পর্তুগীজ ভাষা থেকে আগত।

ইংরেজদের আগমনঃ

১৬০০ সালে ২১৭ জন অংশীদার নিয়ে ইংরেজদের ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ গঠিত হয়। এই কোম্পানি রানী এলিজাবেথের নিকট হতে ভারতে বাণিজ্য করার অধিকার লাভ করে। ১৬০৮ সালে ক্যাপ্টেন হকিন্স বাণিজ্যকুঠি স্থাপনের প্রার্থনা নিয়ে ইংল্যান্ডের রাজা জেমসের পত্র সহকারে মুঘল সম্রাট জাহায়্গীরের দরবারে আগমন করেন।

১৬১২ সালে তারা প্রথমে সুরাটে কুঠি নির্মাণ করে এবং ১৬১৬ সালে তারা মসলিপট্টমে বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপন করে। সম্রাট শাহজাহান ১৬৩৩ সালে ইংরেজদের বঙ্গদেশে কুঠি নির্মাণের অনুমতি দেয়। ইংরেজরা “পিপিলাই” নামক গ্রামে বাণিজ্য কুঠি নির্মাণ করে।

১৬৫০ সালে ইংরেজ বাণিজ্যপোত হুগলী বন্দরে প্রবেশ করে। ১৬৫৮ সালে কাসিম বাজার কুঠি নির্মিত হয়। ১৬৬১ সালে ইংরেজরা বাংলার সুবাদারের অনুমতি নিয়ে হুগলীতে কুঠি নির্মাণ করে।

১৬৯০ সালে জব চার্নক ভাগীরথি নদীর তীরে কলকাতা, সুতানুটি ও গোবিন্দপুর নামে তিনটি গ্রাম ক্রয় করে। ইংরেজরা এখানে একটি দুর্গ নির্মাণ করে এবং ১৬৯৮ সালে তাদের রাজা উইলিয়ামের নামানুসারে এর নাম রাখে ‘ফোর্ট উইলিয়াম’ দুর্গ। এই ফোর্ট উইলিয়ামকে কেন্দ্র করে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সূত্রপাত হয়। ১৭১৭ সালে সম্রাট ফররুখ শিয়ার মাত্র তিন হাজার টাকার বিনিময়ে মুঘল স্রামাজ্যে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতি দেয়। এটি ব্রিটিশদের শক্তিসঞ্চয়ে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

ওলন্দাজদের আগমনঃ

ইউরোপের নেদারল্যান্ড দেশের লোকেরা ওলন্দাজ বা ডাচ নামে পরিচিত। ১৬০২ সালে তারা’ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ গঠন করে। তারা মাদ্রাজের ও পশ্চিমবঙ্গে কুঠি নির্মাণ করে। দেশীয় কোন রাজন্যবর্গ বা সামন্তনেতার উল্লেখযোগ্য অনুগ্রহ লাভে ব্যর্থ  হয় ওলন্দাজগণ। ফলে বণিজ্যের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিপক্ষ বণিকগোষ্ঠী হতে পিছিয়ে পড়ে। ইংরেজগণ তাদের অধীকৃত স্থানগুলো দখল করে নিলে তারা এই উপমহাদেশ হতে সরে পড়ে।

দিনেমারগণের আগমনঃ

ইউরোপের ডেনমার্ক দেশের অধিবাসীদের দিনেমার বলা হয়। দিনেমারগণ ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে ‘দিনেমার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী গঠন করে। ১৬৭৬ সালে তারা কলকাতার শ্রীরামপুরে তাদের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে। এ শ্রীরামপুর মিশন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। অন্যান্য ইউরোপীয়দের সাথে বাণিজ্যে সুবিধা না করতে পারায় তারা ১৮৪৫ সালে ইংরেজদের নিকট কুঠি বিক্রয় করে উপমহাদেশ ছেড়ে চলে যায়।

ফরাসিদের আগমনঃ

১৬৬৪ সালে ফরাসি বণিকগণ ‘ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ গঠন করে উপমহাদেশে বাণিজ্য করতে আসে। ১৬৭৩ সালে মাদ্রাজের পন্ডিচেরীতে তারা ঘাটি স্থাপন করে। বাংলায় তারা চন্দননগরে কুঠি স্থাপন করে। তারা বাণিজ্যে ইংরেজদের সাথে প্রবল প্রতিদ্বন্দিতা গড়ে তোলে এবং উপমহাদেশে সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্ন দেখে। উপমহাদেশীয় অনেক রাজন্যবর্গের সমর্থন ও সহায়তা লাভ করা সত্ত্বেও ফরাসিগণ ইংরেজদের মোকাবেলায় দূরদর্শিতা দেখাতে ব্যর্থ হয়। ইংরেজরা ক্রমান্বয়ে উপমহাদেশের রাজনৈতিক আধিপত্য কুক্ষিগত করে ফরাসি বানিজ্য ও সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। ১৭৫৬ সালে চতুর্থ কর্ণাটকের যুদ্ধে ফরাসিদের পরাজিত করে ইংরেজরা একক প্রভাব বিস্তার করে। ১৭৬০ সালে ‘বন্দীবাসের যুদ্ধে’ ইংরেজ সেনাপতি আয়ারকুটের কাছে ফরাসি গভর্নর কাউন্ট লালী পরাজিত হলে ফরাসীদের ভারতবর্ষে সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্ন ভেস্তে যায়। এর ফলে ভারতবর্ষে ফরাসিরা সাম্রাজ্য স্হাপনের চিন্তা পরিত্যাগ করে উপমহাদেশ ত্যাগ করে।

 


উপমহাদেশে বিভিন্ন বিদ্রোহ ও সংগ্রাম(সিপাহী বিদ্রোহ)

পাক-ভারত উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয় ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের মাধ্যমে। বিদ্রোহের মূল সূচনা হয় ২৯ মার্চ ১৮৫৭ ব্যারাকপুর থেকে।

 

বিদ্রোহের কারণ

* ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাম্রাজ্যবাদ নীতি; লর্ড ডালহৌসির স্বত্ব বিলোপ নীতি; মুসলিম ও হিন্দু রাজ্যের বিলোপ, দেশীয় রাজন্যবর্গের উপাধি লোপ ও বৃ্ত্তিলোপ, ভারতীয়দের উচ্চ রাজপদ থেকে বিতাড়ন; সম্রাট বাহাদুর শাহকে পৈত্রিক রাজপ্রাসাদ হতে অপসারণ প্রভৃতি কারণে জনগণের মধ্যে অসন্তোষের তীব্র প্রকাশ ঘটে এবং প্রতিকারের প্রত্যাশায় বিপ্লবের সূচনা ঘটে।

* চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত; সূর্যাস্ত আইন; সরকার কর্তৃক লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত প্রভৃতি কারণে বহু ভূ-সামন্ত, কৃষক ও বণিক ভূমি হারিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কোম্পানির কর্মচারীদের সীমাহীন নির্যাতন ও জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের কারনে মানুষ অসন্তুষ্ট হয়। ফলে সর্বত্র মানুষের মনে ক্ষেভ দানা বাধে এবং এর বহি:প্রকাশ ঘটে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে।

* এনফিল্ড বন্দুকের কার্তুজ দাঁত দিয়ে কাটতে  হয়। ১৮৫৬ সালে এনফিল্ড বন্দুকের ব্যবহার শুরু হয়। গুজব রটে যে, কার্তুজে গরুর ও শুয়োরের চর্বি দেয়া থাকে। এ থেকে হিন্দু ও মুসলিম সৈনিকদের মনে ধারণা তৈরি হয় তদের ধর্ম বিনষ্ট করার জন্য ইংরেজ সরকার এ কার্তুজ চালু করেছে। এর ফলে সিপাহীদের মধ্যে আন্দোলনের উত্তেজনা দেখা যায়।

ঘটনাপ্রবাহ

* ২৯ মার্চ- ১৮৫৭ ব্যারাকপুরের সেনা ছাউনিতে ‘মঙ্গল পান্ডে’ বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং শহিদ হন। সিপাহী বিদ্রোহে তিনি প্রথম শহিদ হন।

* মে- ১৮৫৭ মিরাটের সেনা ছাউনিতে বিদ্রোহ দেখা দেয়।

* মে- ১৮৫৭ সিপাহীরা দিল্লী দখল করে শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে স্বাধীন ভারতের বাদশাহ, বলে ঘোষনা করেন।

* বিদ্রোহীদের প্রধান সেনাপতি ছিলেন পেশোয়া বাজিরাওয়ের পোষ্যপুত্র ধন্ধুপন্থ (নানা সাহেব)। এছাড়া আহমদুল্লাহ , লক্ষীবাঈ, তাতিয়া টোপী. হাফিজ রহমত খা প্রমুখ নেতৃবৃন্দ যুদ্ধে নেতৃত্ব দান করেন।

* ব্রিটিশ সেনানায়ক মেজর হাডসন দিল্লী দখল করে সম্রাট বাহাদুর শাহকে গ্রেফতার করে রেঙ্গুনে নির্বাসন দেন। (সেখানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং তার কবর রেঙ্গুনে অবস্থিত)।

* ১৮৫৮ সালের ৭ জুলাই ইংরেজরা শান্তি ঘোষণা করে।

* সিপাহী বিদ্রোহীকালীন ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল ছিলেন লর্ড ক্যানিং।


উপমহাদেশে বিভিন্ন বিদ্রোহ ও সংগ্রাম(ফকির আন্দোলন)

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পনির শাসনকালে প্রথম বিদ্রোহ করেন ফকির সন্ন্যাসীরা। তারা ১৭৫৭ সাল থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত বাংলার বিভিন্ন  স্থানে বিদ্রোহ করেছিলেন। ফকির আন্দোলনের নেতা ছিলেন মজনু শাহ ও ভবানী পাঠক। মজনু শাহের নেতৃত্বে ইংরেজগণ উত্তর বঙ্গের বিভিন্ন অংশে বিদ্রোহ কর্মকান্ড পরিচালনা করতেন। মজনু শাহের মৃত্যুর পর উপযুক্ত নেতার অভাবে এ আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে।


উপমহাদেশে বিভিন্ন বিদ্রোহ ও সংগ্রাম(নীল বিদ্রোহ)

অস্টাদশ শতকে ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের কারণে বস্ত্রশিল্পে নীলের চাহিদা রেড়ে যায়। ১৮৩৩ সালের সনদ আইনের ফলে ব্রিটেন থেকে দলে দলে ইংরেজ বনিকেরা বাংলায় আসে এবং নীল চাষ শুরু করে। তবে চাষীদের ন্যায্য মূল্য না দেয়ায় চাষীরা নীলচাষে সম্মত হয় না। নীল চাষীদের উপর নির্মম শোষণ ও অত্যাচার চাষীরা নত শিরে মেনে নিলেও কোথাও কোথাও নীল চাষীদের পক্ষে বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ হয় চাষীরা সংঘবদ্ধভাবে নীল চাষে অসম্মতি জানায় এবং আন্দোলন সশস্ত্র রুপ নেয়।  ১৮৫৯ -৬০ সালে উত্তরবঙ্গ এবং ফরিদপুর-যশোর অঞ্চলে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়লে বিদ্রোহ দমনে ইংরেজ সরকার নীল কমিশন গঠন করে। কমিশন নীলচাষীদের পক্ষে আইন পাস করে-চাষীদের বলপূর্বক নীলচাষে বাধ্য করা যাবে না প্রত্যয় উল্লিখিত ছিল। এর ফলে ১৮৬০ সালে নীল বিদ্রোহের অবসান হয়। বাংলার নীল বিদ্রোহ ছিল ইংরেজদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম সংঘবদ্ধ বিদ্রোহাত্মক আন্দোলন। রাজনৈতিক সচেতনতার ও বাঙালী জাতীয়তাদের বীজ উপ্ত করেছিল এই নীল বিদ্রোহ। নীলকরদের অত্যাচার নিপীড়ন ও শোষণের কাহিনী তুলে ধরেছেন কথা শিল্পী দীনবন্ধু মিত্র ১৮৬০ সালে তার নীলদর্পণ নাটকে।


উপমহাদেশে বিভিন্ন বিদ্রোহ ও সংগ্রাম(তিতুমীর এর বিদ্রোহ ( ১৭৮২-১৮৩১))

তিতুমীরের প্রকৃত নাম মীর নিসার আলী। তিনি বাঁশের কেল্লা খ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী। তিনি চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাতের চাঁদপুর গ্রামে ১৭৮২ সালে জন্মগ্রাহণ করেন। ১৮২২ সালে মক্কায় হজ করতে গেলে তথায় মৌলানা সৈয়দ আহমদ বেলেলভীর সাথে তার সাক্ষাৎ হয় এবং তিনি ওয়াহাবী আন্দোলন (ধর্ম ও সমাজসংস্কার) শুরু করেন। ‘ওয়াহাবী’ শব্দের অর্থ ‘নবজাগরণ’। তার আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ছিল চব্বিশ পরগনা ও নদীয়া জেলা।

১৮৩০ সালে সৈয়দ আহমদ বেলেলভী শিখদের পরাজিত করে পেশোয়ার জয় করলে উজ্জীবিত তিতুমীর প্রকাশ্যে ইংরেজদের বিরুদ্দে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি চব্বিশ পরগনা, নদীয় ও ফরিদপুরের অংশ নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষনা করেন। ইংরেজ সরকার দুইবার তার বিরুদ্ধে পুলিশ বাহিনী পাঠালে  তিনি তাদের পরাস্ত করেন। ১৮৩১ সালের ২৩ অক্টোবর তিনি নারিকেলবাড়িয়ায় ‘বাঁশের কেল্লা’তৈরি করেন। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক ১৮৩১ সালে কর্নেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে তার বিরুদ্ধে সেনাবহিনী প্রেরণ করলে তিনি এবং তার বহু অনুচর যু্ধ্দে শহীদ হন (১৯ নভেম্বর ১৮৩১)। তার প্রধান সেনাপতি গোলাম মাসুদকে ইংরেজরা ফাঁসি দেয়।


উপমহাদেশে বিভিন্ন বিদ্রোহ ও সংগ্রাম(ফরায়েজী আন্দোলন)

ফরিদপুরের (বর্তমান মাদারীপুর) অধিবাসী শরীয়তুল্লাহ বাল্যকাল থেকে ছিলেন ধর্মভীরু। পবিত্র হজ ব্রত পালনের পর দেশে এসে তিনি জনগণকে ধর্মীয় চেতনায় উদ্ধুদ্ধ করতে প্রয়াসী হন। তার পরিচালিত ধর্মীয় আন্দোলনই ‘ফরায়েজী’ আন্দোলন নামে পরিচিত এবং তিনি ছিলেন এ আন্দোলনের উদ্দ্যোক্তা। তিনি মুসলমানদের ‘ফরজ’ বা অবশ্যই পালনীয় কর্মের উপর জোর দেন। এ থেকেই ‘ফরায়েজী’ শব্দের উৎপত্তি। ফরায়েজী আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র ছিল ফরিদপুর।

হাজী শরীয়তুল্লাহ অনৈসলামিক কর্মকান্ডে সহায়তা করতে নিষেধ করেন বিশেষত শ্রাদ্ধ, পৈতা, রথ, দুর্গাপূজা ইত্যাদির জন্য কর প্রদানে নিষেধ করেন। এ কারণে হিন্দু জমিদারগণ মুসলমাদের দাড়ির উপর কর বসায়। তিনি মুসলমানদের অনৈসলামিক কর্মগুলোকে শীরক ও বেদাত-এই দুই ভাগে বিভক্ত করেন।পীর পূজা, কবর পূজা, সেজদা ইত্যাদিকে শীরক এবং জারিগান, মহরমের মাতম প্রভৃতিকে বিদাত বলে উল্লেখ করেন। তিনি এদেশকে দারুল হরব বা বিধর্মীর রাজ্য বলে অভিহিত করেন।

দুদু মিয়া ( ১৮১৯-১৮৬২)

হাজী শরীয়তুল্লাহর একমাত্র ছেলে দুদু মিয়া পিতার মৃত্যুর পর ফরায়েজী আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। পিতা মত শান্ত, ধীর-স্থির প্রকৃতির লোক তিনি ছিলেন না। অত্যান্ত সাহসী দুদু মিয়া মুসলমানদের উপর জমিদার ও ব্রিটিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতেন। তেজস্বী ও অসাধারন কর্মী দুদু মিয়া দৃঢ় হস্তে জমিদারদের অত্যাচার প্রতিরোধ করতে থাকলে জমিদাররা শংকিত হন্  ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লবে বিদ্রোহীদের সমর্থন করায় তিনি গ্রেফতার হন এবং ১৮৬০ সালে মুক্তি পান। জমি থেকে খাজনা আদায় আল্লাহর আইনের পরিপন্থ-এটি তার বিখ্যাত উক্তি। ফরায়েজী গণ পূর্ববঙ্গে তাদের আন্দোলন পরিচালনা করেন। ১৯৬২ সালে তিনি মারা যান। এর মধ্য দিয়ে ফরায়েজী আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে।


উপমহাদেশে বিভিন্ন বিদ্রোহ ও সংগ্রাম(স্বদেশী আন্দোলন)

বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে ১৯০৫ সালের অক্টোবর মাস হতে বয়কট ও স্বদেশী কর্মপন্থা নিয়ে যে আন্দোলন গড়ে উঠে তাই স্বদেশি আন্দোলন নামে পরিচিত। আন্দোলন প্রথমদিকে প্রতিবাদ, বয়কট, বর্জনে সীমাবদ্ধ থাকলেও শেষদিকে এটি সশস্ত্র আন্দোলনে রূপ নেয়। ঢাকার অনুশীলন সমিতি ও কলকাতার যুগান্তর পার্টি, ছিল বৈপ্লবিক আন্দোলনের দুই প্রধান শক্তিশালী সংগঠন। স্বদেশী আন্দোলনের নেতা ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, পুলিন বিহারী দে, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, মতিলাল ঘোষ , কৃষ্ণকুমার মিত্র প্রমুখ।

স্বদেশি আন্দোলনে উদ্দীপনা সৃষ্টির জন্য কবি ও সাহিত্যিকগণ পত্র-পত্রিকার বহুসংখ্যক দেশাত্মবোধক রচনা প্রকাশ করেন। এদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও রজনী কান্ত সেনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের ‘রাখী বন্ধন’ এবং চারণ কবি মুকুন্দ দাস বাংলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে ‘পরো না রেশমী চুড়ি, বঙ্গনারী, কভু হাতে পারো না’ জনগণের মধ্যে স্বদেশি আন্দোলনের পক্ষে তীব্র আবেগ সৃষ্টি করেন।

স্বদেশী সশস্ত্র আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল মাস্টারদা সূর্যসেনের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন্ ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল তিনি সদলবলে অস্ত্রাগার লুট করেন। ব্রিটিশ সরকারের হাতে সূর্যসেন ধরা পড়ে এবং ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি সূর্যসেনের ফাঁসি হয়।

 


বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস(বঙ্গভঙ্গ)

ব্রিটিশ শাসনাধীনে সবচেয়ে বড় প্রদেশ ছিল বাংলা। বাংলাকে ঘিরে ভারতীয় রাজনীতি পরিচালিত হত। ফলে বাংলার অধিকাংশ অঞ্চলে রাজনীতি সচেতনতা গড়ে ওঠে। বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেকেই ব্রিটিশদের কর্তৃত্ব মানতে চাইতো না এবং সুযোগ পেলেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতো। এ কারণে বাংলার বিভিন্ন অংশে প্রশাসনিক শিথিলতা পরিলক্ষিত হয়। বৃহৎ বাংলা প্রদেশ একজন গভর্নরের অধীনে সুশাসন পরিচালনা দূরুহ-এ যুক্তিতে ব্রিটিশগণ বাংলা প্রদেশকে বিভক্ত করার পরিকল্পনা করে। ১৮৯৯ সালে লর্ড কার্জন বড়লাট নিযুক্ত হন। তিনি ১৯০০ সালে বঙ্গবিভাগের ঘোষণা দেন এবং ১৯০১ সালে মি. ফ্রেজারকে বাংলা প্রেসিডেন্সির লেফটেন্যান্ট গভর্নর নিযুক্ত করেন।

৫ জুলাই, ১৯০৫ সরকারিভাবে বঙ্গবিভাগ ঘোষণা দেয়া হয় এবং ১৬ অক্টোবর, ১৯০৫ এটি কার্যকর হয়।  বাংলাদেশ, আসাম, পার্বত্য ত্রিপুরা এবং দার্জিলিংকে নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠিত হয় যার নাম হয় পূর্ববঙ্গ ও আসাম এবং রাজধানী হয় ঢাকা। মি. বামফিল্ড ফুলারকে নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। এদেশে ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ্ ঢাকাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে ও ব্যবসা বানিজ্য উত্তরোত্তর বৃ্দ্ধি পেতে থাকে।

কলকাতার হিন্দুদের এটি পছন্দ না হওয়ায় হিন্দুরা বঙ্গবিভাগের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে এবং বিলেতি দ্রব্য বর্জনের ডাক দেয়। এতে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বাণিজ্যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে ১২ ডিসেম্বর ১৯১১ রাজা পঞ্চম জর্জ দিল্লী দরবারে বজ্ঙ্গবিভাগ রদের ঘোষণা দেন। বঙ্গভঙ্গ রদের সুপারিশ করেন তৎকালীন ভাইসরয়  হার্ডিঞ্জ (দ্বিতীয়)। ২০ জানুয়ারি, ১৯১২ তা কর্যকর হয়। বঙ্গবিভাগ রদের পর বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর হন লর্ড কারমাইকেল।


বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস(ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস)

ব্রিটিশদের সাথে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং শাসনকার্যে ব্রিটিশদের সহায়তার লক্ষ্যে ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস গঠিত হয়।  ২৮ ডিসেম্বর ১৮৮৫ বোম্বেতে বাঙ্গালি ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র ব্যানার্জীর সভাপতিত্বে এর প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠেত হয়। মূলত ব্রিটিশদের আগ্রহে শিক্ষিত ভারতীয়দের সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে কংগ্রেস গড়ে ওঠে। কংগ্রেসের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এর সভাপতি হবেন ভারতীয়, কিন্তু সেক্রেটারী জেনারেল হবেন ব্রিটিশ নাগরিক। প্রতিষ্ঠাকালীন এর সেক্রেটারী পদ গ্রহণ করেন অবসরপ্রাপ্ত সিভিলিয়ান অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম। তাকে কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতার সম্মান দেয়া হয়। তিনি পরবর্তী ২০ বছর সেক্রেটারী জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। ভারতীয়গণ কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা দাদাভাই নওরেজী ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারতীয় সদস্য মনোনীত হন।


বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস(মুসলিম লীগ)

১৯০৫ সালে বঙ্গবিভাগ হলে হিন্দুরা এর বিরোধিতা করে। তৎকালীন বংগ্রেস বঙ্গবিভাগকে ‘বঙ্গভঙ্গ’ বলে প্রচার করে এবং একে বংঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদন বলে মন্তব্য করে। পাশাপাশি তারা বঙ্গবিভাগ রদের জন্য প্রচন্ড আন্দোলন শুরু জরে। মুসলমানগণ বঙ্গবিভাগের সমর্থনে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা নেয় । ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার শাহবাগে ইডেন গার্ডেনে মুসলিম নেতাদের এক অধিবেশন হয়। এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন নবাব ভিকারুল মুলক। সভায় ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহ মুসলমানদের জন্য প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন নিখিল ভারত মুসলিম লীগ গঠনের প্রস্তাব দিলে উপস্থিত মুসলিম নেতৃবৃন্দ এটি সমর্থন করেন। এভাবে মুসলিম লীগ গঠিত হয়। ১৯০৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর করাচীতে মুসলিম লীগের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৪১ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হককে মুসলিম লীগ থেকে বহিস্কার করেন।


বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস(নাথান কমিশন (১৯১২))

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নাথান কমিশন গঠিত হয়। সদস্য সংখ্যা ছিল ১৩ জন। উল্লেখযোগ্য সদস্য আব্দুল লতিফ, স্যার সলিমুল্লাহ প্রমুখ।


বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস(মর্লি মিন্টো সংস্কার আইন)

মুসলমান পৃথক নির্বাচনের দাবি করলে বড়লাট লর্ড মিন্টো ভারতীয়দের হাতে কিছু প্রশাসনিক দায়িত্ব ছেড়ে দেবার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। ফলে মর্লির প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯০৯ সালে যে নতুন আইন গৃহীত হয় তা মর্লি মিন্টো সংস্কার আইন নামে পরিচিত। এ সংস্কার আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভা গঠন।


বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস(লখনৌ চুক্তি (১৯১৬))

১৯১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ একই সাথে লখনৌ শহরের নিজ নিজ দলীয় সম্মেলন আহ্বান করেন। এ লখনৌ সম্মেলনে উভয় দলের নেতারা ঐতিহাসিক চুক্তি প্রণয়ন করেন। লখনৌ চুক্তি ছিল মূলত হিন্দু ও মুসলমানদের সম্প্রীতি ও সমঝোতার এক মূল্যবান দলিল। বাংলার তরুণ নেতা এ কে ফজলুল হক এ চুক্তি স্বাক্ষর করেন।


বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস(ভারত শাসন আইন-১৯১৯)

মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস দায়িত্বশীল শাসন কায়েমের উপর জোর দিলে ১৯১৯ সালে মন্টেগু-চেমসফোর্ড ভারত শাসন সংস্কার আইন প্রণয়ন করেন। এই আইনের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো-

১। দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইন পরিষদ তৈরি

২। প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসন ও যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা

৩। শাসন পরিষদ গঠন ও ক্ষমতা বন্টন

৪। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন

এই আইনের মাধ্যমে ইংল্যান্ডে ‘ভারতীয় হাই কমিশনার’ পদ সৃষ্টি করা হয়।

 


বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস(বেঙ্গল প্যাক্ট (১৯২৩))

১৯২০-২৪ সালে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যবদ্ধ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশীয় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং ব্রিটিশ শাসন ও দমন নীতির জন্য এ আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে বাংলা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের পথ পুনরায় উম্মোচন করে কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাও বাধাগ্রস্ত হয়।


বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস(দ্বিজাতিতত্ত্ব)

দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। দ্বিজাতিতত্ত্ব ঘোষিত হয় ১৯৩৯ সালে। ভারতবর্ষ বিভক্তির সময় সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলমানদের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ধর্মভিত্তিক ভারতবর্ষ বিভক্তির প্রস্তাবই হল দ্বিজাতিতত্ত্ব। এই তত্ত্বের মূলকথা হিন্দু-মুসলিম আলাদা জাতি। উল্লেখ্য যে, লাহোর প্রস্তাবের উথ্থাপক শেরে বাংলা একে ফজলুল হক জিন্নাহর ‘দ্বি-জাতি তত্ত্বে’ বিশ্বাসী ছিলেন না। লাহোর প্রস্তাবের কোথাও ‘দ্বি-জাতি-তত্ত্ব’ শব্দটিও নেই।


বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস(লাহোর প্রস্তাব)

২৩ মার্চ, ১৯৪০ লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের জনসভায় শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক বিখ্যাত লাহোর প্রস্তাব উন্থাপন করেন। ভারতে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলসমুহ নিয়ে “স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ” গঠনের প্রস্তাবই ছিল লাহোর প্রস্তাবের মূল বক্তব্য। লাহোর প্রস্তাবে উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমে ও পূর্বে একাধিক রাষ্ট্রের কথা বলা হলেও ১৯৪৬ সালে মি. জিন্নাহ লাহোর প্রস্তাব পরিবর্তন করে পশ্চিমাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চল নিয়ে একটি রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেন।

লাহোরের এ সভায় ফজলুল হককে প্রথমবারের মত শেরে বাংলা বলে সম্বোধন করা হয়। এই সভায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তার দ্বিজাতি তত্ত্ব তুলে ধরেন। ১৯৩৯ সালে মুহম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, হিন্দু ও মুসলিম দুটি জাতি। এটি দ্বিজাতিতত্ত্ব নামে পরিচিত। উল্লেখ্য, ১৯৩৭ সালে লখনৌতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ফজলুল হককে ‘শেরে বাংলা’ উপাধি দেয়া হয়।


বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস(ভারত বিভাগ ও স্বাধীনতা

১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার পর কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে সমঝোতার পথ রুদ্ধ হলে ১৯৪৭ সালের ৩ জুন সর্বশেষ বড়লাট লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারত বিভাগের নীতি ঘোষণা করেন।  ১৯৪৭ সালে ১৮ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ‘ভারত স্বাধীনতা আইন’ পাশ হয়। এসময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্ররী ছিলেন ক্লিমেন্ট এটলী।

১৪ আগস্ট করাচীতে পাকিস্তানের হাতে এবং ১৫ আগস্ট দিল্লীতে ভারতীয়দের হাতে আনুষ্ঠনিক ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়। এভাবে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি স্বাধীন ও সার্বভেৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয় এবং ভারতবর্ষে দীর্ঘস্থায়ী ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে।

স্বাধীনতা লাভের পর ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেলের পদ অলংকৃত করেন লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

 

 


পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ(পাকিস্তানের স্বাধীনতা)

১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগ নেতৃবুন্দ লাহোর প্রস্তাব সংশোধন করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দুটি এলাকা নিয়ে একটি রাস্ট্র গঠনের পরিকল্পনা করে। দেশবিভাগের সময় আসাম হতে সিলেট জেলাকে পূর্ববঙ্গের সাথে যুক্ত করা হয় এবং ত্রিপুরা রাজ্যের সাথে আসামের সংযোগ সাধনের জন্য সিলেট জেলার করিমগঞ্জ মহকুমার বেশিরভাগ অংশ ভারতকে দেয়া হয়।

১৯৪৭: পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভ

জুলাই: ইন্ডিপেন্ডেন্ট অ্যাক্ট’ পাস। এর মাধ্যমে ১৪ আগষ্ট পকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে।

আগষ্ট ১৪: পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল

মধ্যরাতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল পদ গ্রহণ করেন লিয়াকত আলী খান পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। পূর্ববাংলার প্রথম গভর্নর ও মুখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন যথাক্রমে এ.কে. ফজলুল হক ও খাজা নাজিমউদ্দীন। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান ২৪ বছর একত্রে ছিল।


পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ(১৯৪৯: আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন)

জুন ২৩: নারায়ণগঞ্জে এক শ্রমিক সম্মেলনে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ. প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্ব বাংলায় এটিই ছিল প্রথম মুসলিম লীগ বিরোধী দল। এর প্রতিষ্ঠাতা পরিষদ নিম্নরূপ ছিল:

সভাপতিঃ                   মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী

সহ-সভাপতিঃ             আবুল মনসুর আহমেদ

                                  আতাউর রহমান খান

                                  আব্দুস সারাম খান

সাধারণ সম্পাদকঃ       শামসুল হক

যুগ্ম সম্পাদকঃ             শেখ মুজিবুর রহমান

                                 রফিকুল আহসান

                                 খন্দকার মোশতাক আহমেদ

পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালের ২৪ অক্টোবর ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ নিয়ে নামকরণ করা হয় ‘আওয়ামী লীগ’। এর মাধ্যমে সংগঠনটিকে অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবে গড়ে তোলা হয়।


পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ(পূর্ববঙ্গে জমিদারী উচ্ছেদ)

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান আমলে ১৯৪৮ সালের ৩১ মার্চ আইনসভায় পূর্ববঙ্গ জমিদারি দখল ও প্রজাস্বত্ত্ব আইন-উপস্থাপিত হয়। অনেক তর্কবিতর্কের পর ১৯৫০ সালের ডিসেম্বরে আইনসভায় গৃহীত জমিদারী দখল উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে জমিদারী প্রথার উচ্ছেদ করা হয়। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক জমিদারী প্রথা রদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর পূর্বে ১৮৮৫ সালে বংঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন পাস হলে জমিদারদের উৎপীড়ন থেকে প্রজাদের অধিকার বহুলাংশে সুরক্ষিত ও নিশ্চিত হয়।


পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ(১৯৫৪ সালের নির্বাচন )

প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের পরিষদের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল ভোটাধিচক্রে জয়লাভ করে এবং মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ২৩৭ আসনের মধ্যে ২২৩টি আসন রাভ করে। অন্যদিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষিত ৭২ আসনের মধ্যে ১৩টি আসন লাভ করে।

এপ্রিল ৩: শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে প্রাদেশিক মন্ত্রীসভা গঠন।

মে ৩০ : প্রাদেশিক মন্ত্রীসভা বরখাস্ত হয়।


বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস( পাকিস্তানে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ১৯৫৬ সাল)

মার্চ ২৩: পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রনীত । সংখ্যাসাম্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র রচিত হয়। এ শাসনতন্ত্রের মাধ্যমে পাকিস্তান ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র’ নাম ধারণ করে। এর ফলে দুই প্রদেশের নামকরণ হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান’ এবং ‘পশ্চিম পাকিস্তান’। ইস্কান্দার মীর্জা পাকিস্তান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন।

মার্চ  ২৪ : শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর নিযুক্ত।

 


পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ(পাকিস্তানে সামরিক শাসন ১৯৫৮ সাল)

অক্টোবর ৭: ইস্কান্দার মীর্জা দেশে সামরিক আইন জারি করেন এবং আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক শাসক নিয়োগ করেন। অক্টোবর ২৭: জেনারেল আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখল।

১৯৬০: মার্চ ২৩: আইয়ুব খান সামরিক শাসন প্রত্যাহার করেন।


পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ(ভাষা আন্দোলন)

* জুলাই-৪৭ আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব করেন।

* ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পত্রিকার মাধ্যমে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের ভাষা বাংলাকে স্বীকৃতি দানের যুক্তি তুলে ধরেন।

রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আন্দোলন পরিচালনার জন্য সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত সংগছন ‘তমদ্দুন মজলিশ’। ২ সেপ্টেম্বর ’৪৭ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে এটি গঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারীদের নিয়ে। ১৫ সেপ্টেম্বর ’৪৭ তমদ্দুন মজলিশের পক্ষ থেকে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ শীর্ষক একটি সংকলন পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়।

নভেম্বর- ১৯৪৭ করাচীতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে ‘উর্দু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ করার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব গৃহীত হয়।

ভাষা আন্দোলনের একজন পথ প্রদর্শক হিসেবে খ্যাত ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৮ পাকিস্তান গণ পরিষদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে জাতীয় পরিষদ সদস্য কুমিল্লার (বিবাড়ীয়ার) ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উন্থাপন করেন। কিন্তু তার প্রস্তাব প্রত্রাখ্যাত হয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি ৪৮ গণপরিষদে বাংলাভাষায় বক্তব্য প্রদানের জন্য এবং ধারাবিবরণীতে বাংলা ভাষা ব্যবহারের অনুমতি প্রার্থনায় প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান বিরোধিতা করেন।

২১ মার্চ, ১৯৪৮ গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার রেডকোর্স ময়দানের জনসভায় উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা করেন।  ২৪ মার্চ ‘ ৪৮ কার্জন হলে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মি. জিন্নাহ পুনরায় এই ঘোষণা দিলে উপস্থিত ছাত্রগণ ক্ষোভে ফেটে পড়ে।

২ মার্চ, ১৯৪৮ জনাব শামসুল আলমকে আহবায়ক করে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। ১১ মার্চ, ৪৯ ছাত্র ফেডারেশনের বামপন্থী যুব কর্মীগণ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন দিবস পালন করে। ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ১১ মার্চ তারিখ ভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়।

ভাষা আন্দোলনের সংগঠনসমূহ:

১. তমুদ্দুন মজলিস

-গঠিত হয় ২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭; নেতৃত্বে গঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কাশেম। এ সংগঠন ভাষা আন্দোলন বিষয়ক পুস্তিকা ‘ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু (প্রকাশকাল ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭)। ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ পুস্তিকার লেখক- ৩ জন: ১. অধ্যাপক আবুল কাশেম, ২. ড. কাজী মোতাহার হোসেন, ৩. আবুল মনসুর আহমেদ।

২. রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম

-গঠিত হয় ১লা অক্টোবর, ১৯৪৭। আহ্বায়ক ছিলেন, এএসএম নুরুল হক ভূইয়া

৩. রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ (দ্বিতীয়বার)

-গঠিত হয় ২ মার্চ ১৯৪৮। আহ্বায়ক ছিলেন শামসুল আলম। এ সংগঠনের সাথে খাজা নাজিমুদ্দীনের ৮ দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

৪. পূর্ব বাংলা ভাষা কমিটি

-গঠিত হয় ৯মার্চ ১৯৪৯। সভাপতি মাওলানা আকরাম খাঁ।

৫. বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ বা কমিটি

-গঠিত হয় ১১ মার্চ ১৯৫০। আহ্বায়ক আব্দুল মতিন।

৬. সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ

-গঠিত হয় ৩১ জানুয়ারি, ১৯৫২। আহ্বায়ক কাজী গোলাম মাহবুব।

 

৫২ এর ভাষা আন্দোলনের সময় পাকিস্তানের প্রদানমন্ত্রী ছিলেন খাজা নাজিমুদ্দীন এবং পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নুরুল আমিন। ২৭ জানুয়ারি ’৫২ খাজা নাজিমুদ্দীন কর্তৃক পল্টন ময়দানে পুনরায় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর কথা ঘোষণা করা হয়। ৩১ জানুয়ারি, ১৯৫২ মওলানা ভাসানীকে আহবায়ক করে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদ’ গঠিত হয়। কমিটি তাদের প্রথম বৈঠকে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ভাষা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্বান্ত গ্রহণ করে। কারণ ঐদিন পণপরিষদের অধিবেশন ছিল।

২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি (বাংলা মেডিকেল কলেজের সামনে) গাজীউল হকের সভাপতিত্বে ছাত্রনেতাগণ মিটিং করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আবদুস সামাদ আজাদ চারজন মিঠিলের প্রস্তাব করে। প্রথম  মিছিলের নেতৃত্ব দেন হাবিবুর রহমান শেলী। দ্বিতীয় মিছিলের নেতৃত্ব দেন আবদুস সামাদ আজাদ। মিছিল জনসমুদ্রে পরিণত হলে পুলিশের গুলিতে মোট ৮ জন শহীদ হয়। এ আন্দোলন এক নতুন জাতীয় চেতনার জন্ম দিয়েছে।

একুশে ফেব্রুয়ারিতে যারা শহীদ হন তারা হলেন-

      নাম                                                                                      পরিচিতি

১. আবুল বরকত                                                                 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র

২. আবদুর জব্বার                                                               ময়মনসিংহের দরিদ্র কৃষক সন্তান

৩. রফিকউদ্দিন আহমেদ                                                      মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজের ছাত্র, ঢাকার       

                                                                                         বাদামতলী কমার্শিয়াল প্রেসের মালিকের পুত্র

৪. আবদুস সালাম                                                                শুল্ক বিভাগের পিয়ন

৫. অহিউল্লাহ                                                                       শিশু শ্রমিক

৬. আবদুর আউয়াল                                                              বালক (অনেকের মতে রিকসা চালক)

৭. অজ্ঞাত বালক                                                                  (অধিকাংশের মতে আখতারুজ্জামান বা

                                                                                           আবদুর রহীম)

৮. শফিউর রহমান                                                                 হাইকোর্টের কর্মচারী (হৃদয়ে আমার

                                                                                            ফেব্রুয়ারি, ডাকসু সংগ্রহশালার মতে তিনি

                                                                                           বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ক্লাসের ছাত্র এবং

                                                                                           হাইকোর্টের কর্মচারী ছিলেন।

 


পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ(ছয় দফা আন্দোলন-১৯৬৬)

১৯৫৬ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় পূর্ববাংলার নিরাপত্তাহীনতার অনুভুতি বাংলার জনগণকে কিছুটা অবাক করে। ফলে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের জন্য বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়। মূলত ১৯৪৭ সালের পরবর্তী সময়কালে পূর্ববাংলার প্রতি সামাজিক, ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের ভিত প্রতিষ্ঠার জন্যই শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা প্রণয়ন করেন।

ছয় দফা

১. পাকিস্তানের সংবিধান হবে যুক্তরাষ্ট্রীয় এবং সরকার ব্যবস্থা হবে সংসদীয় যাতে আইন সভার বিষয়সমূহ প্রদেশগুলোর হাতে ন্যস্ত থাকে।

২. যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের হাতে কেবল দুটি বিষয় থাকবে। দেশরক্ষা এবং পররাষ্ট্র। অবশিষ্ট বিষয়গুলো প্রাদেশিক সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকবে।

৩. দেশের দুই অংশের দুটি পৃথক অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা প্রচলিত থাকবে অথবা উভয় অংশে রিজার্ভ ব্যাংকসহ একটি মুদ্রা থাকবে।

৪. কর ও শুল্ক ধার্য করবার দায়িত্ব অঙ্গরাজ্যগুলোর উপর ন্যস্ত থাকবে।

৫. প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের বহির্বাণিজ্যের জন্য পৃথক হিসাব রক্ষা করতে হবে।

৬. প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের অধীনে আঞ্চলিক সেনাবহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী থাকবে।

 


পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ(আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা)

শেখ মুজিবের সম্মতিতে ১৯৬৮ সালে অনুষ্ঠিত এক গোপন সভায় সিদ্ধান্ত হয়, চট্টগ্রাম ইস্ট বেঙ্গল আগরতলা রেজিমেন্ট আক্রমণের মাধ্যমে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বর্ষপুর্তি উৎসবে আগত সেনাপ্রধানসহ বিশিষ্ট অতিথিদের জিম্মি করে স্বাধীনতাকামীগণ বাংলার ক্ষমতা দখল করবেন এবং শেষ মুজিব জেল থেকে বেরিয়ে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। সম্ভাব্য পাকিস্তানি হামলা মোকাবেলার জন্য এবং পাকিস্তানি আক্রমণকে কমপক্ষে তিনদিন ঠেকিয়ে রাখার জন্য ভারতের সহযোগিতা কামনা করা হয়। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের পক্ষে জনাব আলী রেজা এবং ভারতের পক্ষে ব্রিগেডিয়ার মেনন ও মেজর মিশ্র আগরতলায় এ বৈঠকে মিলিত হয়। এটাই আগরতলা ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা ।আগরতলা মামলা দায়ের করা হয় ঢাকায়।এ মামলার আসামী ছিল ৩৫ জন , প্রধান আসামী শেখ মুজিবুর রহমান। ২২ ফেব্রুয়ারি, ৬৯ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হয়।


পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ(গনঅভ্যুন্থান (১৯৬৮-৬৯))

পাকিস্তানি গোয়েন্দারা পরিকল্পনাকারীদের একজন আমির হোসেন মিয়ার মাধ্যমে পরিকল্পনার কথা জেনে  শেখ মুজিবকে প্রধান আসামী করে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের করা হয়। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ছিলেন বিচারপতি এস এ রব। ৫ জানুয়ারি’ ৬৯ বিচারকার্য শুরু হয়। মামলার শিরোনাম ছিল ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য।

বিদেশি আইনজীবীদের পরামর্শক্রমে আওয়ামী লীগ সারা দেশে গণআন্দোলন গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ৫ জানুয়ারি ’৬৯ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং ১১ দফা কর্মসূটি ঘোষিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০ জানুয়ারি ’৬৯ কিশোর মতিউর (ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউশনের ছাত্র) গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ’৬৯ সার্জেন্ট জহুরুল হককে সামরিক হাজতে বন্দী থাকা অবস্থায় হত্যা করা হয়। ১৮ ফেব্রুয়ারি ’৬৯ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে জনৈক সামরিক অফিসার কর্তৃক নিহত হন। ১৬ ফেব্রূয়ারি মাওলানা ভাসানী গণআন্দোলনে একাত্ম হন। শেখ মুজিবকে মুক্ত করার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। দেশব্যাপী শুরু হয় প্রচন্ড গণআন্দোলন।

ভয়াবহ অবস্থার প্রেক্ষিতে ২২ ফেব্রুয়ারি ’৬৯ পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নেয় এবং ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবকে মুক্তি দেয়া হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি ’৬৯ ছাত্র-জনতা শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। ২৪ মার্চ ’৬৯ আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন। ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ ’৬৯ ক্ষমতা গ্রহন করেন।


পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ(১৯৭০ এর নির্বাচন)

মার্চ-’৬৯ আইয়ুব সরকারের পতন হলে ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা দখল করেন। সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে পরিচালিত আন্দোলনের ফলে তিনি নির্বাচন দিতে সম্মত হন। এ লক্ষ্যে লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার গ্রহণ করা হয়। ৭ ডিসেম্বর, ১৯৭০ জাতীয় পরিষদ এবং ১৭ জানুয়ারি, ’৭১ প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হয়।জাতীয় পরিষদে মোট আসন ৩১৩ টি। এর মধ্যে ৩০০টি নির্বাচিত আসন এবং ১৩টি সংরক্ষিত মহিলা আসন। আসন বন্টিত হয়েছিল জনসংখ্যার ভিত্তিতে।

পূর্ব পাকিস্তান                    

নির্বাচিত আসন                   ১৬২টি

মহিলা আসন                          ৭টি

মোট                                  ১৬৯টি

পশ্চিম পাকিস্তান

নির্বাচিত আসন                   ১৩৮টি

মহিলা আসন                           ৬টি

মোট                                    ১৪৪টি

নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ নির্বাচিত ১৬০ টি  এবং সংরক্ষিত মহিলা ৭টি সহ মোট ১৬৭টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পাকিস্তান পিপলস পার্টি নির্বাচিত ৮৪টি এবং সংরক্ষিত মহিলা ৪টি সহ মোট ৮৮টি আসন লাভ করে।

প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ৩০০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৮৮ টি আসন পেয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে।

নির্বাচনে বিপুল বিজয় সত্ত্বেও পাকিস্তানী শাসকেরা মুজিবের হাতে ক্ষমতা বুঝিয়ে দেয়ার টালবাহানা শুরু করে। ভুট্টো মাত্র ৮৪টি আসন পেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং শেখ মুজিবকে পূর্ব পাকিস্তানের  প্রধানমন্ত্রী করার দাবি তুলে রাজনৈতিক অঙ্গনে সমস্যা গাড় করালেন। ফলে ১ মার্চ, ’৭১ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলেন ইয়াহিয়া খান। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছাত্রনেতা আ.স.ম আবদুর রব বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা প্রথম উত্তোলন করেন।

 


পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ( ৭ মার্চের ভাষণ)

৭ মার্চ, ১৯৭১ আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকা গৃহীত হয়। রেসকোর্স ময়দানের এ ভাষণে শেখ মুজিব ১৮ মিনিট ভাষণ দিয়েছিলেন। ভাষনে তিনি ৪টি দাবির কথা উল্লেখ করেনএবং প্রচ্ছন্নভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন। দাবি চারটি হল: সামরিক শাসন প্রত্যাহার, গণ প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর, সেনাবাহিনীর গণহত্যার তদন্ত এবং সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া।

এ ভাষণ রেডিও টিভিতে সম্প্রচার হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। এ ভাষণ স্বাধীনতা আন্দোলন বেগবান করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ৭ মার্চের ভাষণ ছিল মূলত স্বাধীনতা সংগ্রাম তথা মুক্তি সংগ্রামের ঘোষণা। এ ভাষণে তিনি ঘোষণা করেন- এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।


পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ( অসহযোগ আন্দোলন)

বঙ্গবন্ধু তার ৭ মার্চের ভাষনে নির্বাচিত দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশ পরিচালনার ঘোষণা দেন। জনগনের প্রতি পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সর্বাত্ম অসহযোগিতার নির্দেশ দিয়ে তিনি তার ভাষণে কোর্ট-কাচারি, অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করার ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, যে পর্যন্ত আমার এদেশের মুক্তি না হচ্ছে ততদিন খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো। ২৫ মে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের পূর্বশর্ত হিসেবে যে চারটি দাবি তিনি ঘোষণা করেন পাকিস্তান সরকার এ দাবিগুলো মেনে না নেয়া পর্যন্ত তিনি অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন। পাকিস্তান সরকার এ দাবিগুলো মেনে নেয়নি, ফলে বাঙালির আন্দোলন বেগবান হয়ে ওঠে।


দ্বৈত শাসন

দ্বৈত শাসন [Implication of Diarchy in Bengal]: ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে লর্ড ক্লাইভ মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করার পর কোম্পানির পক্ষে লর্ড ক্লাইভ বাংলার নবাব নজম-উদ্-দৌলাকে কাঙ্ক্ষিত ৫৩ লক্ষ টাকা দেবার বিনিময়ে রাজস্ব আদায় এবং দেওয়ানি মামলার ভার গ্রহন করলেন । দেশ শাসনের দায়িত্ব আগের মতোই নবাবের হাতে রইলো । এই ব্যবস্থা ইতিহাসে দ্বৈতশাসন নামে পরিচিত । এই ব্যবস্থায় বাংলার নবাব সামান্য বৃত্তিভোগী কর্মচারীতে পরিণত হলেন । আর প্রচুর অর্থনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ইংরেজ কোম্পানি এদেশের প্রকৃত প্রভু হয়ে বসলেন । নবাব ও কোম্পানির মধ্যে এই ক্ষমতা ভাগাভাগির ফলে দেশশাসন ও প্রজাসাধারনের মঙ্গল বিধানের দায়িত্ব কেউই পালন করত না । ফলে বাংলায় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগ দেখা দেয় । ক্ষমতাহীন নবাব সেই বিশৃঙ্খলা দমনে ব্যর্থ হন । কোম্পানি নিযুক্ত রাজস্ব বিভাগের দুই সহকারী রেজা খাঁসিতাব রায়ের শোষণ ও অত্যাচারে প্রজাদের দুর্দশার অন্ত ছিল না । পরিণতিতে ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে বা ১১৭৬ বঙ্গাব্দে বাংলায় ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় । এটি ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত ।

যে সমস্ত কারণে ব্রিটিশরা ভারতের শাসনব্যবস্থার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী ছিলেন:-

১) বাংলায় দ্বৈতশাসনের ফলে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগ দেখা দিলে, দায়িত্বজ্ঞানহীন শাসনব্যবস্থা, শোষণ ও অত্যাচার প্রভৃতির কথা ইংল্যান্ডে প্রচারিত হলে ইংল্যান্ডের ব্রিটিশ সমাজে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাজেকর্মে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয় ।

২) বাংলার ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের বিভীষিকাময় খবরে ইংল্যান্ডের শাসকবর্গ বিচলিত হয়ে পড়েন এবং উপলব্ধি করেন যে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তখন আর নিছক একটি বাণিজ্যক প্রতিষ্ঠান নয়, তখন তা একটি সাম্রাজ্য পরিচালনা করে, যা আরও সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করা দরকার ।

৩) ইংল্যান্ডের শাসকবর্গের কাছে আরও খবর এসে পৌছায় যে, দ্বৈতশাসন বাংলার বিশৃঙ্খল শাসনব্যবস্থাকে আরও বিশৃঙ্খল এবং দূর্নীতিগ্রস্থ করে তুলেছে । কারণ কোম্পানির ‘নায়েব-দেওয়ান’ ও কর্মচারীরা কোম্পানির স্বার্থরক্ষার পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থরক্ষাতেই ব্যস্ত থাকেন ।

৪) পলাশির যুদ্ধে ইংরেজদের জয়লাভের পর থেকেই কোম্পানির কর্মচারীরা দুর্নীতি, ঘুষ, ভেট এবং ব্যক্তিগত বাণিজ্যসহ নানান অবৈধ উপায়ে লক্ষ লক্ষ টাকা রোজগার করে দেশে ফিরে গিয়ে মহা আড়ম্বরের সঙ্গে বাস করতে থাকেন । ভারত থেকে আগত এইসব কর্মচারীদের দেখে ব্রিটিশরা ভারতের শাসনব্যবস্থার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হয়ে পড়েন, এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের নিয়ন্ত্রনে এনে এই সব অসৎ কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণ করার সু্যোগ খুঁজতে থাকেন । ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অনেক সদস্য নৈতিকতার প্রশ্ন তুলে বলেন যে, ‘কোম্পানির কার্যকলাপ ব্রিটিশ জাতির নামে কলঙ্ক লেপন করেছে, সুতরাং এখনই কিছু করা প্রয়োজন’ ।

৫) বাংলা তথা ভারত থেকে বিপুল পরিমাণে সম্পদ লুট করেও কোম্পানির আর্থিক অবস্থার বিশেষ কোনও উন্নতি হয়নি, বরং তাদের আর্থিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটতে থাকে । এই অবস্থায় কোম্পানিকে ‘ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ড’ লোন দিতে অস্বীকার করে । কোম্পানি ব্রিটিশ সরকারের কাছে ১০ লক্ষ পাউন্ড ঋণের আবেদন জানায় । তাদের ঋণ দেওয়া যুক্তিযুক্ত হবে কিনা তা খতিয়ে দেখবার জন্য ব্রিটিশ সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে । তখন বাংলায় কোম্পানির শাসনের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে । এই কমিশনের রিপোর্ট থেকে ইংল্যান্ডের লোক জানতে পারে যে, কোম্পানি তথা বাংলার দুর্দশা বৃদ্ধির জন্য দায়ী ছিল কোম্পানির নায়েব-দেওয়ান ও অন্যান্য কর্মচারীদের সীমাহীন লাভের আকাঙ্খা ।

এই অবস্থায়ঃ-

১) ব্রিটিশরা ভারতের শানব্যবস্থার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে ।

২) বাংলার দৈত্ব শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ।

ব্রিটিশ জনগণের এই কোম্পানিবিরোধী মনভাবের ফলশ্রুতি হিসাবে:-

১) ১৭৭২ সালে বাংলায় দ্বৈতশাসনের অবসান ঘটানো হয়,

২) ১৭৭৩ সালের রেগুলেটিং আইন এবং ১৭৮৪ সালের পিট -এর ভারত শাসন আইন প্রণয়ন করে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এবং কোম্পানির কর্মচারীদের দুর্নীতি দমনে উদ্যোগ নেয় ।


সমাজ সংস্কার, সামাজিক উন্নয়ন এবং অন্যান্য

সমাজ সংস্কার, সামাজিক উন্নয়ন এবং অন্যান্য


বাংলায় ইংরেজ শাসন

লর্ড ক্লাইভ (১৭৬৫-১৭৬৭)

বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পর লর্ড ক্লাইভ বাংলার প্রকৃত প্রভু হয়ে বসেন। বক্সারের যু্দ্ধে মীর কাসিম পরাজয়ের পর লর্ড ক্লাইভ বাংলার গভর্ন র নিযুক্ত হন। তিনি ভারতবর্ষে ইংরেজ সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন।

গভর্নর কার্টিয়ার (১৭৬৯-১৭৭২)

১৭৬৯ সালে কর্টিয়ার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কর্তৃক বাংলার গভর্নর নিযুক্ত হন। এ সময়ে সমগ্র বাংলায় দ্বৈত শাসনের প্রভাব পড়তে থাকে। দ্বৈত শাসনের প্রভাবে জনগণ ব্যাপক অর্থকষ্টের সম্মুখীন হয়।

ছিয়াত্তরের মন্বন্তর

১১৭৬ সালে অনাবৃষ্টি ও খরার কারণে খাদ্যসংকট দেখা দেয়। পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে বাংলা ১১৭৬ সালে (ইংরেজি ১৭৬৯-১৭৭০) বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়। ইতিহাসে এই দুর্ভিক্ষ ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে খ্যাত। ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে’ ইংরেজদের হিসেব অনুযায়ী বাংলার এক-তৃতীয়াংশ লোক প্রাণ হারায় এবং রাজস্ব আদায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। ব্রিটিশদের রাজস্ব আদায় না হওয়ায় দ্বৈত শাসনব্যবস্থা প্রশ্নের সম্মুখীন হয় এবং এ ব্যবস্থা বাতিলের সপক্ষে মতামত দৃঢ় হয়।

 

ওয়ারেন হেস্টিংস (১৭৭২-’৭৪- ’৭৪-’৮৪)

১৭৭২ সলে তিনি বাংলার গভর্নর নিযুক্ত হন। কোম্পনির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি প্রথমেই দ্বৈত শাসনব্যবস্থা বিলুপ্ত করেন।

রাজস্ব বোর্ড গঠনঃ

কোম্পানির রাজস্ব আদায়ে গতি সৃষ্টি এবং রাজস্ব উদ্ধৃত্ত দেখানোর জন্য তিনি রাজস্ব বোর্ড গঠন করেন। উপমহাদেশে তিনি প্রথম রাজস্ব বোর্ড গঠন করেন। তিনি মুঘল সম্রাটের কর্তৃত্ব অস্বীকার করে মুঘল সম্রাট কে বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকা কর প্রদান বন্ধ করে দেন। তিনি বাংলার নবারের বৃ্ত্তি অর্ধেক করে দেন। প্রজাসাধারণের উপর জুলুম-নির্যাতনের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় জোরদার করেন এবং ১৭৭৪ সালের মধ্যে কোম্পানির রাজস্ব উদ্ধৃত্ত দেখাতে সক্ষম হলেন।

রেগুলেটিং অ্যাক্ট-১৭৭৩ঃ

দ্বৈত শাসনের নানা কুফল এবং নির্যাতন ও নিপীড়নের কারণে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য রেগুলেটিং অ্যাক্ট-১৭৭৩ (নিয়ামক আইন-১৭৭৩)পাস করে এবং গভর্নর পদকে গভর্নর জেনারেল পদে উন্নীত করে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ওয়ারেন হেস্টিংসকে ১৭৭৪ সালে গভর্নর জেনারেল পদে উন্নীত করেন।

পাঁচশালা বন্দোবস্তঃ

ভূমি রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে জমিদার শ্রেনী সৃষ্টির উদ্ধেশ্যে তিনি পাঁচশালা ভূমি বন্দোবস্ত প্রথা চালূ করেন। তিনি মারাঠা, নিযাম ও হায়দার আলীর শক্তির বিরুদ্ধে ইংরেজদের শক্তি সমুন্নত রাখেন।

ভারত শাসন আইন-১৭৮৪ঃ

ওয়ারেন হেস্টিং-এ শাসনামলে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট রেগুলেটিং অ্যাক্টের দোষত্রুটি দূর করে ১৭৮৪ সালে ভারত শাসন আইন পাস করে। আইনটি প্রণয়নকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন উইলিয়াম পিট।

 

লর্ড কর্নওয়ালিশ (১৭৮৬-১৭৯৩)

১৭৮৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী লর্ড কর্নওয়ালিশকে বাংলার গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত করেন। তিনি মারাঠা, নিযাম ও টিপু সুলতানের শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে সফল হন।

দশশালা পরিকল্পনা ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথাঃ

রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং স্থায়ী অনুরক্ত শ্রেনী সৃষ্টির মানসে তিনি ১৭৮৯ সালে দশশালা ভূমি বন্দোবস্ত প্রথা চালু করেন। ১৭৯৩ সালের ২২ মার্চ তিনি দশশালা বন্দোবস্তকে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ ঘোষণা করেন। নিয়মিত খাজনা আদায়ে জন্য তিনি ‘সূযাস্ত আইন’ বলবৎ করেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থায় কোম্পনির রাজস্ব একটি নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের পূর্বে দিতে অসমর্থ হলে কোম্পানী জমিদারি নিলামে বিক্রি করতো। এটি সূর্যাস্ত আইন।

ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসঃ

তিনি সরকারি কর্মচারীদের জন্য যে বিধিবিধান চালু করেন পরবর্তীকালে তা ‘ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস’ নামে প্রচলিত হয়।

লর্ড ওয়েলেসলী (১৭৯৮-১৮০৫)

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারে উগ্র প্রচেষ্টার জন্য

তিনি সবিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ছিলেন প্রথম সাম্রাজ্যবাদী বড়লাট।

অধীনতামূলক মিত্রতা নীতিঃ

‘অধীনতামূলক মিত্রতা’ নীতি প্রবর্তন করে তিনি হায়দ্রাবাদের নিযাম ও পেশোয়া দ্বিতীয় বাজীরাওকে বশীভূত করেন। অধীনতামূলক নীতির মাধ্যমে তিনি তাঞ্জোর, সুরাট, কর্নাটক,ও অযোধ্যার স্বাধীনতা হরণ করেন।

টিপু সুলতানের সংগ্রামঃ

লর্ড ওয়েলেসলীর অধীনতামূলক মিত্রতার আহবান প্রত্যাখ্যান করেন মহীশূরের বীর টিপু সুলতান। ইংরেজগণ ১৭৯৯ সালে চতুর্থ মহীশূর যুদ্ধের মাধ্যমে টিপু সুলতানের পতন ঘটান। এ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন লর্ড ওয়েলেসলীর ভ্রাতা আর্থার ওয়েলেসলি। টিপু বীরের ন্যায় যুদ্ধ করে নিহত হন। এভাবে বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি বিনষ্ট করে তিনি ব্রিটিশকে উপমহাদেশে প্রধান শক্তিতে পরিণত করেন।

লর্ড হোস্টিং (১৮১৩-১৮২৩)

প্রায় দশ বছর তিনি বাংলার গভর্নর জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে বিভিন্ন গোত্র ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে খন্ডযুদ্ধে লিপ্ত হয়। তার শাসনামলে ভিন্ন আঞ্চলিক ও দেশীয় শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তিনি ২০টি দুর্গ দখল করেন। তিনি মারাঠা শক্তি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সীমা বৃদ্ধি করেন। এ সময়ে রাজা রামমোহন রায় কলকাতায় হিন্দু কলেজ, প্রতিষ্ঠা করেন।

 

লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক (১৮২৮-১৮৩৫)

তিনি বড়লাট হয়ে এসে ভারতে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করেন। বেন্টিঙ্ক এর শাসনামল উপমহাদেশে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষা সংস্কারের জন্য বিখ্যাত। সংস্কারের অংশ হিসেবে তিনি ভারতীয়দের জন্য ‘সাব জজ’ ও ‘মুন্সেফ’ পদ সৃষ্টি করেন। রাজা রামমোহন ও দ্বারকানাথ ঠাকুরের সহয়তায় ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর তিনি ‘সতীদাহ প্রথা’ বাতিল করেন। ১৮৩৩ সালে বড়লাটের পদবী ‘বাংলার গভর্নর জেনারেল’ এর পরিবর্তে ‘ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেল’ করা হয়। ১৮৩৫ সালে তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। একই সালে তিনি ‘ম্যাকলে শিক্ষানীতি’ প্রণয়ন করেন; যদিও পরবর্তীকালে এটিকে কেরানী তৈরির প্রজেক্ট হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। তার শাসনামলে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট স্পষ্টভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকার্যে হস্তক্ষেপ করে।

 

লর্ড হেনরি হার্ডিঞ্জ (১৮৪৪-১৮৪৮)

ভারতবর্ষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিশেষত রেল যোগাযোগে তিনি ব্যাপক অবদান রাখেন। মূলত রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য ব্রিটিশরা ভারতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটায়। তিনি শিখদের যুদ্ধে পরাজিত করেন এবং এক কোটি টাকা জরিমানা আদায়ের জন্য গোলাপ সিং নামে এক ব্যব্ক্তির নিকট ৭৫ লক্ষ টাকায় জম্মু ও কাশ্মীর বিক্রয় করেন। সেই থেকে ভারত বিভাগ পর্যন্ত জম্মু ও কাশ্মীরে ব্রিটিশ শাসনাধীন বিশেষ শাসিত অঞ্চলের মর্যাদা ভোগ করছিল।

লর্ড ডালহৌসী (১৮৪৮-১৮৫৬)

সাম্রাজ্যবাদী গভর্নর হিসেবে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন।

স্বত্ব বিলোপ নীতিঃ

তিনি স্বত্ব বিলোপ নীতির কঠোর প্রয়োগ করেন। এর মাধ্যমে তিনি সাতারা, ঝাসি, নাগপুর, সম্বলপুর রাজ্য ব্রিটিশদের অদীনে আনেন। তার উগ্র সাম্রাজ্যবাদী নীতির কারণে দেশীয় বিভিন্ন গোত্র ও আঞ্চলিক শক্তি ইংরেজদের উচ্ছেদ করার সংকল্প করতে থাকেন যা পরবর্তীতে সিপাহী বিপ্লবের দিকে ভারতবর্ষকে ঠেলে দেয়।

রেল যোগাযোগ চালুঃ

১৮৫৩ সালে তিনি উপমহাদেশে রেল যোগাযোগ চালু করেন।

ডাক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠাঃ

তিনি টেলিগ্রাফ ও ডাকটিকিটের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন স্থানে চিঠিপত্র আদানপ্রদানের ব্যবস্থা করেন।

বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়নঃ

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সহায়তায় ১৮৫৪ সালে তিনি বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়ন করেন। ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই বিধবা বিবাহ আইন পাস হয়।

লর্ড ক্যানিং (১৮৫৬,’৫৭-৬২)

তিনি শেষ গভর্নর জেনারেল। এসময় ইংরেজদের দাসত্ব হতে মুক্তিলাভের জন্য বিখ্যাত সিপাহী বিপ্লব, (১৮৫৭ সাল) সংঘটিত হয়। সিপাহী বিপ্লব দমনের পর ব্রিটিশ সরকার ভরতের শাসনভার মহারানী ভিক্টোরিয়ার হাতে অর্পন করেন। এর মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে।

কাগজের মুদ্রা চালুঃ

তার শাসনামলে উপমহাদেশে কাগজের মুদ্রা চালু হয়। এটি উপমহাদেশে উল্লেখযোগ্য মুদ্রা সংস্কার। এছাড়া পুলিশী ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণে তার উল্লেখযোগ্র ভূমিকা রয়েছে।

 

লর্ড মেয়ো (১৮৬৯-’৭২)

১৮৭২ সালে ভারতবর্ষে প্রথম আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হয়। লর্ড মেয়ো আদমশুমারি ছাড়াও কৃষি ও বাণিজ্য বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন।

লর্ড রিপন (১৮৮০-’৮৪)

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রদানঃ

তিনি ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট বাতিল করে দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করেন।

হান্টার কমিশন গঠনঃ

১৮৮২ সালে তিনি হান্টার কমিশন গঠন করেন এবং কমিশনের সুপারিশক্রমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করেন।

ইলবার্ট বিলঃ

তিনি ‘ইলবার্ট বিল’ এর মাধ্যমে ভারতীয় বিচারকদের দ্বারা ইউরোপীয় অপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করেন। তবে ব্রিটিশ নাগরিকগণ এ বিলের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

৮ ঘন্টা কাজের নিয়মঃ

১৮৮১ সালে ফ্যাক্টরি আইন প্রবর্তনের মাধ্যমে শ্রমিকদের ৮ ঘন্টা কাজের নিয়ম নিশ্চিত করেন। এর মাধ্যমে সমাজের নিম্নস্তরে তার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।

মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট আইন প্রণয়নঃ

লর্ড রিপনের সেরা কীর্তি বেঙ্গল মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট আইন প্রণয়ন। এর মাধ্যমে তিনি স্থানীয় সরকার কাঠামো তৈরী করেন। অর্থাৎ স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন।

লর্ড কার্জন (১৮৯৯-’০৫)

তিনি কলকাতায় বৃহত্তম লাইব্রেরী ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করেন। তার সময়ের উল্লেখযোগ্য প্রশাসনিক সংস্কার হল বঙ্গভঙ্গ। তিনি ভারতবর্ষে প্রত্মতত্ত্ববিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। বঙ্গবিভাগ করায় তিনি হিন্দুদের নিকট অজনপ্রিয় হয়ে পড়েন।

লর্ড হার্ডিঞ্জ (১৯১০-১৯১৬)

বঙ্গভঙ্গ রদে সুপারিশঃ

তিনি বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য সুপারিশ করেন। তার সময়ে ১১ ডিসেম্বর’ ১৯১১ তে বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষিত হয় এবং ২০ জানুয়ারি ১৯১২-তে কার্যকর হয়।

রাজধানী স্থানান্তরঃ

তিনি ১৯১২ সালে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লী স্থানান্তরিত করেন।

তিনি রেল যোগাযোগের ভূমিকা পালন করেন। পূর্ব বঙ্গের প্রধান রেলসেতু হার্ডিঞ্জ ব্রীজ তার নামানুসারে হয়।

লর্ড মাউন্টব্যাটেন (১৯৪৭)

ব্রিটিশ ভারতের শেষ বড়লাট হলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। ব্রিটেনের পার্লামেন্টে ভারত শাসন আইন পাস হলে তিনি ভারত ও পাকিস্তানের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এর মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হিসেবে জন্মলাভ করে।

 


উপমহাদেশে বিভিন্ন বিদ্রোহ ও সংগ্রাম (তেভাগা আন্দোলন)

তেভাগা আন্দোলন কৃষি উৎপাদনের দুই-তৃতীয়াংশের দাবিতে সংগঠিত বর্গাচাষিদের আন্দোলন। তেভাগা শব্দের আভিধানিক অর্থ ফসলের তিন অংশ। প্রচলিত অর্থে ভাগচাষি তাদের ভাগচাষের অধিকারস্বরূপ উৎপাদনের সমান অংশ বা দুই ভাগের এক ভাগ পাওয়ার অধিকারী। ভূমি নিয়ন্ত্রণের শর্তাদি অনুযায়ী শস্য ভাগাভাগির বিভিন্ন পদ্ধতি বর্গা, আধি, ভাগি ইত্যাদি নামে পরিচিত।

১৯৪৬-৪৭ সালে ভূমিমালিক এবং ভাগচাষিদের মধ্যে উৎপাদিত শস্য সমান দুই ভাগ করার পদ্ধতির বিরুদ্ধে বর্গাদাররা প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৪৬ সালে আমন ধান উৎপাদনের সময়কালে বাংলার উত্তর এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের জেলাসমূহের কিছুসংখ্যক ভাগচাষি এবং তাদের সমর্থক নিজেদের উৎপাদিত ফসল কাটতে নিজেরাই মাঠে নামে, এমনকি নিজেদের খলানে তা ভানতে নিয়ে যায়।

দুটি কারণে এটি বিদ্রোহ হিসেবে চিহ্নিত। প্রথমত, তারা দাবি করে যে, অর্ধেক ভাগাভাগির পদ্ধতি অন্যায়। উৎপাদনে যাবতীয় শ্রম এবং অন্যান্য বিনিয়োগ করে বর্গাচাষি; উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পুঁজি বিনিয়োগ, শ্রম এবং অবকাঠামোতে ভূমি মালিকের অংশগ্রহণ থাকে অতি নগণ্য। এ কারণে, মালিকরা পাবেন ফসলের অর্ধেক নয়, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। দ্বিতীয়ত, বর্গাচাষিরা দাবি করেন যে উৎপাদিত শস্যের সংগ্রহ মালিকদের খলানে রাখা এবং সেখান থেকে সমান সমান খড় ভাগাভাগি করার নিয়ম আর মান্য করা হবে না, সংগৃহীত ফসল থাকবে বর্গচাষিদের বাড়িতে এবং ভূমিমালিক খড়ের কোনো ভাগ পাবেন না।

মূলত তেভাগা আন্দোলন সংগঠিত করেন বাংলার প্রাদেশিক কৃষকসভার কম্যুনিস্ট কর্মীরা। তাদের নেতৃত্বে বর্গাচাষিরা ভূমিমালিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়। খুব দ্রুত নিচের স্তরে এর নেতৃত্ব গড়ে ওঠে। এ তেভাগা আন্দোলন বাংলার ১৯টি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনটি তীব্র আকার ধারণ করে দিনাজপুর, রংপুর, জলপাইগুড়ি, খুলনা, ময়মনসিংহ, যশোর এবং চবিবশ পরগনা জেলায়। ভূমি মালিকরা ভাগচাষিদের এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করে। তারা পুলিশ দিয়ে আন্দোলনকারীদের অনেককে গ্রেফতার করে এবং তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে। কিন্তু জমিদারদের দমন-পীড়ন আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে পারে নি। অপ্রতিরোধ্য ভাগচাষিরা পরবর্তীকালে তাদের লক্ষ্য অর্জনের স্বার্থে জমিদারি প্রথা বিলোপের ক্ষেত্রে একটি নতুন শ্লোগান যোগ করে। বর্গাচাষিদের সমর্থনে পরিচালিত তেভাগা আন্দোলনে এ শ্লোগানের সূত্রে খাজনার হার কমে আসার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়।

তেভাগা আন্দোলনের অগ্রবর্তী ধাপ হিসেবে কৃষকরা কোনো কোনো এলাকাকে তেভাগা এলাকা বা ভূস্বামী মুক্ত ভূমি হিসেবে ঘোষণা করে এবং তেভাগা কমিটি স্থানীয়ভাবে সেসব এলাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তেভাগা আন্দোলনের চাপে অনেক ভূস্বামী তেভাগা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করে নেন এবং তাদের সাথে আপস করেন।

যশোর, দিনাজপুর এবং জলপাইগুড়ি তেভাগা এলাকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে সম্প্রসারিত তেভাগা এলাকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় মেদিনীপুর এবং চবিবশ পরগনা। এ সকল ঘটনায় সরকার প্রাথমিকভাবে ১৯৪৭ সালে বিধানসভায় একটি বিল উত্থাপনে প্রণোদিত হয়। বিলটি কৃষকদের মধ্যে বিরাজমান অসমুতষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে বর্গা প্রথা সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু সমকালীন অন্যান্য রাজনৈতিক ঘটনা সরকারকে বর্গা আইন অনুমোদনে অসুবিধায় ফেলে। দেশবিভাগ এবং নতুন সরকারের অঙ্গীকার এ আন্দোলনকে সাময়িকভাবে স্থবির করে দেয়।

তেভাগা আন্দোলন সফল হওয়ার ফলে শতকরা ৪০ ভাগ বর্গাচাষি ভূমিমালিকদের কাছ থেকে স্বেচ্ছায় তেভাগা প্রাপ্ত হন। এ আন্দোলন আবওয়াবএর নামে বলপূর্বক অর্থ আদায় বন্ধত বা সীমিত করে। তবে পূর্ববাংলার জেলাসমূহে আন্দোলনটির সফল্য ছিল সীমিত। ১৯৪৮-৫০ সালের দিকে তেভাগা আন্দোলনে আরেক দফা সংগঠিত হয়। সরকার এ আন্দোলন ভারতীয় দালালদের আন্দোলন বলে চিহ্নিত করে। সাধারণ মানুষও তা বিশ্বাস করে এ আন্দোলনে অংশগ্রহণ থেকে নিজেদের বিরত রাখে। তবে আন্দোলনটি নিশ্চিতভাবেই পূর্ববঙ্গ জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ প্রণয়নে প্রভাব বিস্তার করেছিল।

বিস্তারিত


উপমহাদেশে বিভিন্ন বিদ্রোহ ও সংগ্রাম (চাকমা বিদ্রোহ)

ইংরেজদের দেওয়ানি রাজস্ব দিতে প্রথম অস্বীকৃতি জানায় পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা জনগোষ্ঠী। ১৭৭২ সাল থেকে ১৭৯৮ সাল পর্যন্ত তারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত থাকে। অবশেষে ইংরেজরা তাদের সেনাবাহিনী দিয়ে প্রতিরোধ করে। তারপর দুর্জন সিংহের নেতৃত্বে চেয়ার বিদ্রোহ হয় ১৭৯৯ সালে, তাও সেনাবাহিনীর সাহায্যে দমন করা হয়।

বিস্তারিত


উপমহাদেশে বিভিন্ন বিদ্রোহ ও সংগ্রাম (সত্যাগ্রহ আন্দোলন)

গান্ধীজি রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে একটি জাতীয় প্রতিবাদ আন্দোলনের সূচনা করেন। সকল অফিস ও কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। ভারতীয়দের সরকারি স্কুল, পুলিশ বিভাগ, সেনাবাহিনী ও সরকারি চাকুরি ত্যাগে উৎসাহিত করা হতে থাকে। আইনজ্ঞরা সরকারি আদালত বর্জন করেন। গণ-পরিবহণ, ব্রিটিশ দ্রব্যসামগ্রী বিশেষত কাপড় বর্জিত হয়।

বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিনচন্দ্র পাল, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, অ্যানি বেসান্ত প্রমুখ বরিষ্ঠ নেতা এই আন্দোলনের বিরোধিতা করেন। সারা ভারত মুসলিম লীগ এর সমালোচনাও করেন। কিন্তু দেশের তরুণ জাতীয়তাবাদীগণ এই আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে গান্ধীজিকে সমর্থন করেন। তাঁর পরিকল্পনা গ্রহণ করে কংগ্রেস এবং মৌলানা আজাদ, মুখতার আহমেদ আনসারি, হাকিম আজমল খান, আব্বাস তয়েবজি, মৌলানা মহম্মদ আলি ও মৌলানা শওকত আলি প্রমুখ মুসলিম নেতা তাঁকে সমর্থন করেন।

১৯১৯ ও ১৯২০ সালে গান্ধীজি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন – এমনকি সারা ভারত হোমরুল লিগ যেখানে একদা জিন্নাহ্, তিলক ও বেসান্তের মতো নেতানেত্রীর কর্তৃত্ব বজায় ছিল, সেখানেও তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন।

বিস্তারিত


উপমহাদেশে বিভিন্ন বিদ্রোহ ও সংগ্রাম (অহিংস আন্দোলন)

অসহযোগ আন্দোলন মহাত্মা গান্ধী ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পরিচালিত ভারতব্যাপী অহিংস গণ-আইন অমান্য আন্দোলনগুলির মধ্যে সর্বপ্রথম। ১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলা এই আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে “গান্ধী যুগ”-এর সূত্রপাত ঘটায়।

বিস্তারিত


উপমহাদেশে বিভিন্ন বিদ্রোহ ও সংগ্রাম (খিলাফত আন্দোলন)

খিলাফত আন্দোলন (১৯১৯-১৯২৪) ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রভাবে উদ্ভূত একটি প্যান-ইসলামি আন্দোলন। ওসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ (১৮৭৬-১৯০৯) প্যান-ইসলামি কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। নিজ দেশে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন নিমূল করার লক্ষ্যে এবং বিদেশী শক্তির আক্রমণ থেকে তাঁর ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যকে রক্ষা করে বিশ্ব-মুসলিম সম্প্রদায়ের ‘সুলতান-খলিফা’ মর্যাদায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে তিনি এ আন্দোলনের সূচনা করেন। উনিশ শতকের শেষের দিকে তাঁর দূত জামালুদ্দীন আফগানি প্যান-ইসলামবাদ প্রচারের জন্য ভারত সফর করার পর এ মতবাদের প্রতি কিছু ভারতীয় মুসলমানের মধ্যে অনুকূল সাড়া জাগে।

বিস্তারিত


উপমহাদেশে বিভিন্ন বিদ্রোহ ও সংগ্রাম (আলীগর আন্দোলন)

আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের উত্তর প্রদেশ অঙ্গরাজ্যের আলীগড় শহরে অবস্থিত। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বৃটিশ রাজত্বের সময় ভারতের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটিতে পরিগণিত হয়। তৎকালীন অনেক সনামধন্য মুসলিম চিন্তাবিত ও উর্দূ ভাষার বিখ্যাত কবি ও লেখক এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। এসকল তরুন মুসলিমদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও বিজ্ঞানমনস্ক আলোচনা শুরু হয়।এরূপ কর্মকান্ড গুলো পিছিয়ে পড়া মুসলিমদের উন্নতির জন্য করাহত যা আলীগড় আন্দোলন হিসাবে পরিচিত।


বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস (৩৫ এর ভারত শাসন আইন)

ভারত শাসন আইন ১৯৩৫ ছিল ব্রিটিশ সরকার রাজের পরাধীন ভারতের শেষ সংবিধান। এই আইনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দিক ছিল:

  • এইটি ভারতীয় প্রদেশ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করল এবং ভারত শাসন আইন ১৯১৯ শেষ হল।
  • এইটি ফলে সমস্ত ভারতীয় প্রাদেশিক রাজ্যগুলি ভারত ফেডারেশনের জন্য জোগ দিল।
  • সরাসরি নির্বাচন প্রথম বারের জন্য উপস্থাপন করা হল। ভোট দেবার অধিকার বৃদ্ধি কর হল।
  • সিন্ধ বোম্বে থেকে আলাদা করা হল। উড়িষ্যা বিহার থেকে আলাদা করা হল। বর্মা ভারত থেকে আলাদা করা হল।

 

বিস্তারিত


বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস (৩৭ এর প্রথম প্রাদেশিক নির্বাচন)

নাই


পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ ( পূর্ব বঙ্গের জমিদারি উচ্ছেদ)

জমিদারি প্রথার বিলোপ  বিশ শতকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ, বিক্ষোভের রাজনীতি, প্রথম মুসলিম নির্বাচকমন্ডলী, বিভাজনপন্থি রাজনীতি, কম্যুনিস্ট ভাবধারার অনুপ্রবেশ প্রভৃতি ঘটনা দ্বারা ব্রিটিশ রাজের অনুগত ও রাজনৈতিকভাবে মধ্যপন্থি জমিদার শ্রেণির সামাজিক কর্তৃত্ব গুরুতরভাবে হ্রাস পায়। কৃষক রাজনীতি ছিল সম্পূর্ণরূপে জমিদারি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। অধিকাংশ জমিদার হিন্দু ছিলেন বলে পল্লী অঞ্চলের জনসংখ্যার সিংহভাগ মুসলমান কৃষকসমাজ ছিল প্রবলভাবে জমিদারদের বিরোধী। জমিদার ও রায়ত সম্পর্কের গভীর পরিবর্তন ঘটে, ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী নেতৃস্থানীয় সকল রাজনৈতিক দল অঙ্গীকার করে যে, তারা নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় গেলে জমিদারি প্রথা বিলোপ করা হবে

। সে অনুসারে মুসলিম লীগ ও কৃষক প্রজা পার্টি এর কোয়ালিশন সরকার জমিদারি প্রথা সম্পর্কে রিপোর্ট দানের জন্য একটি কমিশন গঠন করে। ফ্লাউড কমিশন নামে পরিচিত সে কমিশন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাতিলের সুপারিশ করে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি, সাম্প্রদায়িক বিরোধ এবং দেশ বিভাগের রাজনীতির ডামাডোলে সরকার ফ্লাউড কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৯৫০ সালে ইস্ট বেঙ্গল স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যাক্ট-এর অধীনে জমিদারি প্রথার বিলোপ ঘটে।

 বিস্তারিত


পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ ( ১৯৫৪ সালের নির্বাচন )

পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৪ সালের ৮ থেকে ১২ মার্চ। অমুসলমানদের জন্য আসন সংরক্ষণ করে পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থায় পূর্ব বাংলা ব্যবস্থাপক পরিষদের আসন সংখ্যা নির্ধারিত হয় ৩০৯টি। এর মধ্যে ২৩৭টি (৯টি মহিলা আসনসহ) মুসলমান আসন, ৬৯টি হিন্দু আসন (৩টি মহিলা আসনসহ), ২টি বৌদ্ধ আসন এবং ১টি খ্রিস্টান আসন। ১৯৫৩ সালের ১ জানুয়ারি যাদের বয়স ২১ বছর পূর্ণ হয়েছিল তাদেরকে ভোটার করা হয়েছিল। মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১,৯৭,৩৯,০৮৬ জন। আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি এবং নেজামে ইসলাম ২১ দফার ভিত্তিতে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করে। ২১ দফায় উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতিগুলি ছিল বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা, প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসন, শিক্ষা সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইন পরিষদকে কার্যকর করা ইত্যাদি।

নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলমান আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট লাভ করে ২১৫টি আসন, ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি আসন। খেলাফতে রাববানী পার্টি ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা লাভ করে ১২টি আসন। পরে ৭ জন স্বতন্ত্র সদস্য যুক্তফ্রন্টে এবং ১জন মুসলিম লীগে যোগ দেন। মুসলিম লীগের পরাজয়ের পেছনে বহুবিধ কারণ ছিল। ১৯৪৭ এর পর থেকে দলটি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দলের অনেক ত্যাগী নেতা কর্মী দল থেকে বের হয়ে নতুন দল গঠন করেন।

১৯৪৭ থেকে ক্রমান্বয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যে বহুমুখী বৈষম্যের সৃষ্টি হয় তার দায় দায়িত্বও কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারে অধিষ্ঠিত মুসলিম লীগকেই বহন করতে হয়। ১৯৪৭ থেকে ৫৪ পর্যন্ত সময়ে পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটে, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য-সামগ্রীর দাম বৃদ্ধি পায়। সর্বোপরি, বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবির বিরোধিতা করে এবং ১৯৫২ সালের হত্যাকান্ড ঘটিয়ে মুসলিম লীগ বাংলার আপামর জনসাধারণকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে পূর্ব বাংলার জনগণ যুক্তফ্রন্টকে ভোট দিয়ে প্রকারান্তরে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে জোরালো সমর্থন জানিয়েছিল। পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদে মুসলিম লীগের আসন হাতছাড়া হওয়ায় পাকিস্তান গণপরিষদে ওই দলের সদস্য সংখ্যা হ্রাস পায়। এর ফলে কেন্দ্রে কোয়ালিশন সরকার গঠন অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে যুক্তফ্রন্ট প্রাদেশিক সরকার গঠনের সুযোগ পায়। যুক্তফ্রন্ট প্রাপ্ত ২২২টি আসনের মধ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগের আসন সংখ্যা ছিল ১৪২, কৃষক-শ্রমিক পার্টির ৪৮, নেজামে ইসলামের ১৯ এবং গণতন্ত্রী দলের ১৩।

যুক্তফ্রন্ট দলের প্রধান নেতা ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (আওয়ামী মুসলিম লীগ) এবং এ.কে ফজলুল হক (কৃষক-শ্রমিক পার্টি)। নির্বাচনে সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানী অংশ গ্রহণ করেন নি এবং ফজলুল হককে সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানান হয়। শুরুতেই মন্ত্রিপরিষদ গঠন নিয়ে মনোমালিন্য শুরু হয় এবং যুক্তফ্রন্টের শরিক দলগুলির মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট হয়।

অবশেষে ১৫ মে আওয়ামী মুসলিম লীগের সংগে ফজলুল হকের আপোস হয় এবং তিনি এ দলের ৫ জন সদস্যসহ ১৪ সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভা গঠন করেন। কিন্তু এ মন্ত্রিসভার আয়ু ছিল মাত্র ১৪ দিন। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী সাফল্য মুসলিম লীগ সরকার সুনজরে দেখে নি। তারা যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত করার চক্রান্ত করতে থাকে।

বিস্তারিত


বাংলাদেশের শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা

ল্যাটিন শব্দ Educare বা Educatum থেকে Education শব্দটির আবির্ভাব যার অর্থ শিক্ষা।উপমহাদেশে ইংরেজদের আগমনের মধ্য দিয়ে শিক্ষা ক্ষেত্রে আধুনিকতার প্রবেশ ঘটে।

ব্রিটিশ আমলে শিক্ষা: ১৮৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৮২ সালে উইলিয়াম হান্টার কে চেয়ারম্যান করে প্রথম শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। এ কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে জেলা স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিস্তারিত সুপারিশ প্রণয়নের জন্য ১৩ সদস্য বিশিষ্ট ‘নাথান কমিটি’ গঠন করা হয়। ১৯১৯ সালে স্যাডলার কমিশন ঢাকায় একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ পেশ করে। ১৯২০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ্যাক্ট পাশ হয়।

বঙ্গভারত উপমহাদেশে শিক্ষার আনুষ্টানিক সূচনা ঘটে ১৯৩৫ সালে।

১৯৩৯ সালে ফ্রাঙ্ক লিউব্যাকের ‘একজনকে একজন শিখাও’ শ্লোগান জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

১ জুলাই-১৯২১ রমনা এলাকায় প্রায় ৬০০ একর জমির  উপর নির্মিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের পরিত্যক্ত ভবনাদি এবং ঢাকা কলেজের ভবনসমূহের সমন্বয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। স্যার ফিলিপ হার্টস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য নিযুক্ত হন।মাত্র ৮৭৭ জন ছাত্রছাত্রী (১জন ছাত্রী) ও ৬০ জন শিক্ষক নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। সে সময় হল ছিল তিনটি-শহীদুল্লাহ হল (পূর্বতন ঢাকা হল), সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ও জগন্নাথ হল। ১৯৩৪ সালে প্রথম উপমহাদেশীয় এবং মুসলিম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন স্যার এ এফ রহমান। ১৯৪৮ সালে ভিসি নিয়োগ লাভ করেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ড. সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন। বর্তমানে এর হল সংখ্যা ১৯ টি এবং হোস্টেল সংখ্যা ২টি। হোস্টেল হলো নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী ছাত্রীনিবাস এবং আই.বি.এ. হোস্টেল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের বর্তমান আয়তন ২৫৮ একর।


জাতীয় অধ্যাপক

সরকার প্রতি পাঁচ বছর মেয়াদে শিক্ষা ও গবেষণায় অবদানের জন্য বিশিষ্ট একাধিক ব্যক্তিকে জাতীয় অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেন। দু’বার জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ও ড. কাজী মোতাহের হোসেন।

 


বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা

ক. মোট                  ১,০৪,০১৭

খ. সরকারী               ৩৭,৬৭২

গ. বেসরকারী            ৬৪,১৫৫

১. নিবন্ধনকৃত           ২২,১০১

২. নিবন্ধনকৃত নয়      ১৯৪৯

৩. অন্যান্য               ৪০,১০৫

বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা

# সরকার কর্তৃক ১৯৯২ সালের ১ জানুয়ারি হতে এ কর্মসূচির অধীনে প্রাথমিকভাবে ৬৪ টি থানার ১টি স্কুল এবং ৪টি বিভাগীয় শহরের ১টি করে মোট ৬৮টি স্কুলে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হয়েছে।

# ১৯৯৩ সালের ১ জানুয়ারি হতে সারা দেশে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু হয়।


প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়

# শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ গঠিত হয় ১৯৯২ সালে।

# প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগকে ২ জানুয়ারি , ২০০৩ থেকে পূর্ণ মন্ত্রণালয়ে রুপান্তর করা হয়।

প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি প্রদান

# জুন, ২০০২ থেকে সমগ্র বাংলাদেশে “প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃ্ত্তি প্রদান” প্রকল্প শুরু হয়েছে।

খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচি

১৯৯২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দেশে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি চালূ করেছে।এ কর্মসূটিতে খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা প্রকল্প চালু করা হয়। ১৯৯৩ সালের ২৯ জুলাই ফেনীর একটি স্কুলে পরীক্ষামূলক ভাবে এ কর্মসূচি চালু করা হয়। পরবর্তীতে সারাদেশে খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা সর্মসূচি চালু করা হয়।

 


বাংলাদেশে নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা

নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়:                                      ২৮৬৯

মাধ্যমিক বিদ্যালয়:                                         ১৬,৩৩৯

উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়:                                       ১৯৩৬

সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়:                                   ৩০৮

রাজধানীতে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়:                      ২৪

সরকারি কলেজের সংখ্যা:                                       ২৮৮

 

 

 


বাংলাদেশ শিক্ষা বোর্ডসমূহ

নাম                                                                        প্রতিষ্ঠাকাল

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা                      ১৯৪৭

বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা                               ১৯৫৪

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, রাজশাহী                 ১৯৬২         

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, কুমিল্লা                    ১৯৬২

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, যশোর                     ১৯৬২

বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা                                 ১৯৭৮

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রাম                    ১৯৯৫

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, সিলেট                    ২০০০

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, বরিশাল                    ২০০০  

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, দিনাজপুর                ২০০৬

 


বাংলাদেশ ক্যাডেট কলেজ

১৯৫৪ সালে ব্রিটিশ পাবলিক স্কুলের আদর্শে সরকারি অর্থে উপমহাদেশে পাঞ্জাবে সর্বপ্রথম পূর্ণ আবাসিক ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। তদানীন্তন পুর্ব পাকিস্তানে ১৯৫৮  সালে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে ১৮৫ একর জায়গা নিয়ে এ অঞ্চলে প্রথম ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।

* বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর মোমেনশাহী ক্যাডেট কলেজের নাম হয় ‘মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ’। বর্তমানে এটি টাঙ্গাইল জেলার অন্তর্ভূক্ত।

ক্যাডেট কলেজসমূহ (১২টি):

ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ, চট্টগ্রাম                             ১৯৫৮

ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ                                             ১৯৬৩

রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ                                              ১৯৬৪

মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ, টাঙ্গাইল                                   ১৯৬৩

সিলেট ক্যাডেট কলেজ                                                  ১৯৭৮

রংপুর ক্যাডেট কলেজ                                                  ১৯৭৯

বরিশাল ক্যাডেট কলেজ                                               ১৯৮১

পাবনা ক্যাডেট কলেজ                                                 ১৯৮১

ময়মনসিংহ মহিলা ক্যাডেট কলেজ                                  ১৯৮২

কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ                                                ১৯৮৩

ফেনী মহিলা ক্যাডেট কলেজ                                         ২০০৬

জয়পুরহাট মহিলা ক্যাডেট কলেজ                                   ২০০৬

 


গ্রেডিং পদ্ধতি

 

পরীক্ষা পদ্ধতির সর্বশেষ সংস্কার হলো গ্রেডিং পদ্ধতি। ১১ মার্চ, ২০০১ শিক্ষামন্ত্রী কর্তৃক ৬ স্তর বিশিষ্ট গ্রেডিং পদ্ধতি অনুমোদিত হয় এবং এসএসসিতে চালু হয়। জানুয়ারি, ২০০৩ গ্রেডিং পদ্ধতির পুনর্বিন্যাস করে ৭ ধাপের গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করা হয় এবং এফ গ্রেড প্রাপ্তদের কলেজে ভর্তির সুযোগ বন্ধ করা হয়।

গেড এ+        ৮০-১০০        ৫ পয়েন্ট

গ্রেড এ          ৭০-৭৯            ৪ পয়েন্ট

গ্রেড এ-         ৬০-৬৯          ৩.৫ পয়েন্ট

গ্রেড বি          ৫০-৫৯           ৩ পয়েন্ট

গ্রেড সি          ৪০-৪৯            ২ পয়েন্ট

গ্রেড ডি          ৩৩-৩৯          ১ পয়েন্ট

গ্রেড এফ         ০-৩২             ০ পয়েন্ট


বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

নিম্নোক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ নিজস্ব ক্যাম্পাসের পরিবর্তে সারা দেশব্যাপী তাদের অনুমোদিত কলেজসমূহের মাধ্যমে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালিত করে থাকে। দুইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কার্যালয় ঢাকার গাজীপুরে অবস্থিত। ১৯৯২ সালে, বাংলাদেশে সর্বস্তরের শিক্ষাকে দূরশিক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে সকল স্তরের জনগনের কাছে পৌছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং সারাদেশে স্নাতোকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় ডাকনাম প্রতিষ্ঠিত অবস্থান বিভাগ  
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় বাউবি ১৯৯২ গাজীপুর ঢাকা বিভাগ  
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাজাবি ১৯৯২ গাজীপুর ঢাকা বিভাগ  

বিস্তারিত


বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে বর্তমানে ৩২টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। স্বায়ত্ব-শাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত এই সকল বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

ঢাকা বিভাগে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যার মধ্যে ৭টি ঢাকা শহরে, ২টি গাজীপুরে এবং ১টি সাভারে অবস্থিত। চট্টগ্রাম বিভাগে ৬টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যার মধ্যে ৩টি চট্টগ্রামে, ১টি রাঙামাটিতে, ১টি নোয়াখালীতে ও ১টি কুমিল্লায় অবস্থিত। খুলনা বিভাগে ৪টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যার মধ্যে ২টি খুলনায়, ১টি যশোরে এবং ১টি কুষ্টিয়ায় অবস্থিত। রাজশাহী বিভাগে ৪টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যার মধ্যে ২টি রাজশাহীতে, ১টি পাবনায় এবং ১টি সিরাজগঞ্জে অবস্থিত। বরিশাল বিভাগে ২টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যার মধ্যে ১টি বরিশালে এবং ১টি পটুয়াখালীতে অবস্থিত। সিলেট বিভাগে ২টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। রংপুর বিভাগে ২টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যার মধ্যে ১টি রংপুর শহরে এবং ১টি দিনাজপুরে অবস্থিত। ময়মনসিংহ বিভাগে ২টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।

নিম্নে লিস্ট আকারে দেওয়া হল:

বিশ্ববিদ্যালয় ডাকনাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত প্রতিষ্ঠিত অবস্থান বিভাগ বিশেষায়িত  
হাজী মোহাম্দ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হাবিপ্রবি ১৯৯৯ ১৯৭৯ দিনাজপুর রংপুর বিভাগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি  
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সিকৃবি ২০০৬ ১৯৯৫ সিলেট সিলেট বিভাগ কৃষি বিজ্ঞান ও ভেটেরিনারি  
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শেবাকৃবি ২০০১ ১৯৩৮ ঢাকা ঢাকা বিভাগ কৃষি বিজ্ঞান ও ভেটেরিনারি  
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাবিপ্রবি ১৯৯১ ১৯৮৭ সিলেট সিলেট বিভাগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি  
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রাবি ১৯৫৩ ১৯৫৩ রাজশাহী রাজশাহী বিভাগ সাধারণ  
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় রুয়েট ২০০৩ ১৯৬৪ রাজশাহী রাজশাহী বিভাগ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি  
রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় রাবিপ্রবি     রাঙ্গামাটি চট্টগ্রাম বিভাগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি  
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় যবিপ্রবি ২০০৮ ২০০৮ যশোর খুলনা বিভাগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি  
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় মাভাবিপ্রবি ১৯৯৯ ১৯৯৯ টাংগাইল ঢাকা বিভাগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি  
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় বিআরইউ ২০০৮ ২০০৮ রংপুর রংপুর বিভাগ সাধারণ  
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েট ১৯৬২ ১৯৬২ ঢাকা ঢাকা বিভাগ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি  
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাকৃবি ১৯৬১ ১৯৬১ ময়মনসিংহ ময়মনসিংহ বিভাগ কৃষি বিজ্ঞান ও ভেটেরিনারি  
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস বিইউপি ২০০৮ ২০০৮ ঢাকা ঢাকা বিভাগ সাধারণ  
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ববি ২০১১ ২০১১ বরিশাল বরিশাল বিভাগ সাধারণ  
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বশেমুরবিপ্রবি ২০১১ ২০১১ গোপালগঞ্জ ঢাকা বিভাগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি  
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বশেমুকৃবি ১৯৯৮ ১৯৮৩ গাজীপুর ঢাকা বিভাগ কৃষি বিজ্ঞান ও ভেটেরিনারি  
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পাবিপ্রবি ২০০৮ ২০০৮ পাবনা রাজশাহী বিভাগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি  
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পবিপ্রবি ২০০০ ১৯৭২ পটুয়াখালী বরিশাল বিভাগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি  
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নোবিপ্রবি ২০০৬ ২০০৬ নোয়াখালী চট্টগ্রাম বিভাগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি  
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঢাবি ১৯২১ ১৯২১ ঢাকা ঢাকা বিভাগ সাধারণ  
ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ডুয়েট ২০০৩ ১৯৮০ গাজীপুর ঢাকা বিভাগ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি  
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় জাবি ১৯৭০ ১৯৭০ সাভার ঢাকা বিভাগ সাধারণ  
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় কেএনবি ২০০৫ ২০০৫ ময়মনসিংহ ময়মনসিংহ বিভাগ সাধারণ  
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় জবি ২০০৫ ১৮৫৮ ঢাকা ঢাকা বিভাগ সাধারণ  
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিমেল সায়েন্সস বিশ্ববিদ্যালয় চভেএসাবি ২০০৬ ১৯৯৫ চট্টগ্রাম চট্টগ্রাম বিভাগ কৃষি বিজ্ঞান ও ভেটেরিনারি  
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চবি ১৯৬৬ ১৮ নভেম্বর, ১৯৬৬ চট্টগ্রাম চট্টগ্রাম বিভাগ সাধারণ  
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় চুয়েট ২০০৩ ১৯৬৮ চট্টগ্রাম চট্টগ্রাম বিভাগ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি  
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় খুবি ১৯৯১ ১৯৯০ খুলনা খুলনা বিভাগ সাধারণ  
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কুয়েট ২০০৩ ১৯৬৯ খুলনা খুলনা বিভাগ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি  
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কুবি ২০০৬ ২০০৬ কুমিল্লা চট্টগ্রাম বিভাগ সাধারণ  
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ইবি ১৯৮০ ১৯৮০ কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ খুলনা বিভাগ

সাধারণ

বিস্তারিত


আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়

আন্তর্জতিক বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ববিদ্যালয় ডাকনাম প্রতিষ্ঠিত অবস্থান বিভাগ বিশেষায়িত  
ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি আইইউটি ১৯৮১ গাজীপুর ঢাকা বিভাগ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি  
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন এইউডব্লিউ ২০০৮ চট্টগ্রাম চট্টগ্রাম বিভাগ শুধুমাত্র নারীদের জন্য

 

বিস্তারিত


মাদ্রাসা শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠান

১৯৭৫ সালের কুদরত-ই-খুদা কমিটির সুপারিশের আলোকে মাদ্রাসা বোর্ড নিয়ন্ত্রিত আলিয়া মাদ্রাসাসমূহে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও বহুমুখী পাঠ্যসূচি প্রবর্তিত হয়। ১৯৭৮ সালে অনুষ্ঠিত আলিম ও ১৯৮০ সালে অনুষ্ঠিত ফাযিল পরীক্ষায় এ সিলেবাস কার্যকর হয়। উক্ত দু’শ্রেণিতে মাদ্রাসার নির্ধারিত সকল পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও সাধারণ শিক্ষার এইচ.এস.সি এবং এস.এস.সি-এর সম্পূর্ণ কোর্স অর্ন্তভুক্ত করে ফাযিল শ্রেণিকে সাধারণ শিক্ষার এইচ.এস.সি এবং আলিমকে এস.এস.সি-এর মান দেওয়া হয়। এ কমিটি মাদ্রাসায় বিজ্ঞান শাখা চালু করে।

১৯৭৮ সালে প্রফেসর মুস্তফা বিন কাসিমের নেতৃত্বে Senior Madrasah Education System Committee গঠিত হয়। ১৯৭৯ সালের ৪ জুন হতে বোর্ডটি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। জনশিক্ষা পরিচালক প্রফেসর বাকী বিল্লাহ খান এর প্রথম চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।

১৯৮৪ সালে মুস্তফা বিন কাসিমের কমিটির সুপারিশের আলোকে সাধারণ শিক্ষার স্তরের সঙ্গে মাদ্রাসা বোর্ড নিয়ন্ত্রিত আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা স্তরের নিম্নরূপ সামঞ্জস্য করা হয়: ইবতেদায়ী (প্রাথমিক) ৫ বছর, দাখিল (মাধ্যমিক) ৫ বছর, আলিম (উচ্চ মাধ্যমিক) ২ বছর, ফাযিল (ডিগ্রি) ২ বছর এবং কামিল (স্নাতকোত্তর) ২ বছর মোট ১৬ বছর। এ কমিটি কর্তৃক প্রণীত সিলেবাস ১৯৮৫ সালে অনুষ্ঠিত দাখিল ও ১৯৮৭ সালে অনুষ্ঠিত আলিম পরীক্ষায় কার্যকর হয়। উক্ত দু’শ্রেণিতে মাদ্রাসার নির্ধারিত সকল পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও সাধারণ শিক্ষার যথাক্রমে এস.এস.সি এবং এইচ.এস.সি-এর সম্পূর্ণ কোর্স অন্তর্ভুক্ত করে দাখিলকে এস.এস.সি এবং আলিমকে এইচ.এস.সি-এর সমমান দেওয়া হয়। সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে সমন্বিত হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা এখন মাদ্রাসা শিক্ষা শেষে উচ্চতর শিক্ষার জন্য অনুমোদিত যে কোনো কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে। কিন্তু ফাযিল (ডিগ্রি) এবং কামিল (স্নাতকোত্তর) সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে সমন্বিত না হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা শুধু মাদ্রাসা বা স্কুলে চাকুরির ক্ষেত্রে সমমান পায়, অন্য ক্ষেত্রে নয়।

মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কারের ফলে আলিয়া মাদ্রাসার সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯০৭-০৮ সালে এদেশে ইবতেদায়ী হতে কামিল পর্যন্ত মাদ্রাসা ছিল ২,৪৪৪টি। ১৯৪৭ সালে ৩টি সরকারি মাদ্রাসাসহ (দাখিল হতে কামিল পর্যন্ত) আলিয়া মাদ্রাসার সংখ্যা ছিল ৩৭৮টি। ১৯৭১ সালে দাখিল, আলিম, ফাযিল ও কামিল মাদ্রাসার সর্বমোট সংখ্যা ছিল ৫০৭৫টি। ২০০৭ সালে মাদ্রাসার সংখ্যা দাঁড়ায় মোট ৯,৪৯৩টিতে। তন্মধ্যে দাখিল ৬,৭০০টি, আলিম ১,৪০০টি, ফাযিল ১,০৮৬টি এবং কামিল ১৯৮টি।

২০০৬ সালের পূর্ব পর্যন্ত মাদ্রাসা বোর্ড আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষার ইবতেদায়ী (প্রাথমিক) হতে কামিল (স্নাতকোত্তর) পর্যন্ত সকল স্তরের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ করত। বর্তমানে Islamic University (Amendment) Act, 2006 মোতাবেক সাধারণ শিক্ষার সাথে আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা সমন্বিত করার কারণে ফাযিল (ডিগ্রি) ৩ বছর এবং কামিল (স্নাতকোত্তর) ২ বছর মোট ৫ বছরের কোর্স চালু হয়েছে। তাই সিদ্ধান্ত হয় যে, ২০০৬ সালের পর থেকে মাদ্রাসা বোর্ড শুধু দাখিল ও আলিম পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ করবে। উক্ত আইন অনুসারে ১,০৮৬টি ফাযিল (স্নাতক) ও ১৯৮টি কামিল (স্নাতকোত্তর) মাদ্রাসা অর্থাৎ ১,২৮৪টি মাদ্রাসা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত হয়। এতে সাধারণ শিক্ষার সাথে মাদ্রাসা শিক্ষার দীর্ঘ দিনের বিরাজমান পার্থক্য দূরীভূত হয়।

বিস্তারিত


বাংলাদেশের শিক্ষা কমিশন

জাতীয় শিক্ষা কমিশন (১৯৭২)  বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-ই-খুদাকে চেয়ারম্যান করে ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই গঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’। ১৯৭২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর কমিশনের কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। চেয়ারম্যানের নামানুসারে এই কমিশন কুদরত-ই-খুদা কমিশন নামেও পরিচিতি পায়। কমিশন প্রশ্নমালার আকারে শিক্ষিত এলিট শ্রেণীর লোকদের নিকট থেকে মতামত গ্রহণ করে, এবং ঐসব মতামত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই বাছাই করে প্রণীত রিপোর্টে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ করে। কমিশন ১৯৭৪ সালের ৩০ মে সরকারের নিকট রিপোর্ট পেশ করে।

দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের উপর ভিত্তি করে কমিশন তার রিপোর্ট প্রণয়ন করে। এই রিপোর্ট প্রণয়নে সমসাময়িক বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতও বিবেচনায় আনা হয়। কমিশনের রিপোর্টে শিক্ষার সকল স্তরে সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা চালু এবং ভবিষ্যত কর্ম-সংশ্লিষ্ট কারিগরী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এতে শিক্ষার প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে কতিপয় বড় ধরণের পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়।

কমিশনের মতে প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ হবে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত মোট আট বছর এবং মাধ্যমিক শিক্ষার মেয়াদ হবে নবম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত মোট চার বছর। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি চার বছর মেয়াদী সম্মিলিত ডিগ্রি কোর্স এবং এক বছরের মাস্টার্স কোর্স চালু হবে। কমিশন প্রাথমিক স্তরে সর্বজনীন ও অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রবর্তন, প্রচলিত অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা (১ম থেকে ৫ম শ্রেণী) ১৯৮০ সালের মধ্যে বাধ্যতামূলক করণ এবং ১৯৮৩ সাল নাগাদ অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করে। প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়া ছাত্রছাত্রীদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় এনে নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন করে পনের বছর বয়স পর্যন্ত তাদের শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয়।

কমিশন রিপোর্টে মাধ্যমিক স্তরে সমন্বিত বহুমুখী কোর্স চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা হবে যুগপৎ তিন বছর মেয়াদী বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং চার বছর মেয়াদী সাধারণ শিক্ষা। মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষা হবে অধিকাংশ ছাত্রের জন্য প্রান্তিক বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং স্বল্পসংখ্যক ছাত্রের জন্য উচ্চশিক্ষার প্রস্ততিমূলক স্তর। প্রান্তিক বৃত্তিমূলক শিক্ষা মোটামুটি একাদশ শ্রেণী পর্যন্ত এবং সাধারণ শিক্ষা দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এরূপে নবম শ্রেণী থেকে পাঠক্রম দুটি ভাগে বিভক্ত হবে: (ক) বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও (খ) সাধারণ শিক্ষা।

কারিকুলাম, সিলেবাস ও পাঠ্যপুস্তক সম্পর্কে কমিশন প্রাথমিক স্তরের জন্য সমরূপ কারিকুলাম চালুর সুপারিশ করেছে। কমিশন প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের জন্য এডুকেশন্যাল রিসার্চ বোর্ড প্রতিষ্ঠার কথাও বলেছে।

কমিশন উন্নতমানের মূল্যায়ন পদ্ধতির উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার সকল স্তরে ছাত্রদের পড়াশুনার মান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে লেটার গ্রেডিং পদ্ধতি প্রয়োগের সুপারিশ করেছে। সাধারণ ও বৃত্তিমূলক উভয় কোর্সের ছাত্ররা দশম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়নের পর পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে এবং সার্টিফিকেট পাবে।

দশম শ্রেণীর কোর্স সমাপ্তির পর সাধারণ কোর্সের ছাত্ররা একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর জন্য নির্ধারিত বহুমুখী সাধারণ কোর্সের মধ্যে একটি কোর্স নির্বাচন করবে, এবং দ্বাদশ শ্রেণীর কোর্স সমাপ্ত করে তারা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে পারবে। দ্বাদশ শ্রেণীর কোর্স সমাপ্তি শেষে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে এবং উত্তীর্ণ ছাত্ররা সার্টিফিকেট লাভ করবে। বৃত্তিমূলক কোর্সের ছাত্ররা তাদের নবম ও দশম শ্রেণীতে পঠিত কোর্সের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একাদশ শ্রেণীতে এক বছর বিশেষ প্রশিক্ষণ সমাপ্তির পর তাদের বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্পূর্ণ করবে। একাদশ শ্রেণীতে প্রশিক্ষণের পর তারা পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে এবং সার্টিফিকেট পাবে। বৃত্তিমূলক কোর্সের ছাত্ররা দশম শ্রেণীর বৃত্তিমূলক কোর্স সমাপ্তির পর দক্ষ শ্রমিক হিসেবে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে চাইলে তাদের জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামে যোগদানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কোনো ছাত্র দশম বা একাদশ শ্রেণীর কোর্স সমাপ্ত করে সংশ্লিষ্ট বৃত্তিমূলক বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী হলে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাবে।

কমিশন দৃঢ় মত প্রকাশ করেছে যে, মেয়েদের শিক্ষা এমন হতে হবে যা তাদের গার্হস্থ্য জীবনে সহায়ক হয়, এবং তাদের পাঠক্রমের মধ্যে অবশ্যই শিশুপালন, রুগীর সেবা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, খাদ্য ও পুষ্টি প্রভৃতি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কমিশন আরো সুপারিশ করে যে, মেয়েদের ‘তাদের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী পেশায়’ নিয়োজিত হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে, যেমন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, নার্সিং ও টাইপিং।

বিস্তারিত


বাংলাদেশে শিক্ষা ও শিক্ষাকাঠামো

শিক্ষা প্রশাসন  শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার কাজে বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ২টি প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পালন করছে। এ দুটি হলো শিক্ষা মন্ত্রণালয় (MOE) এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ (PMED)। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এমওই ও পিএমইডি-র আওতায় তিন ধরনের সংস্থা আছে। সংস্থাগুলি হচ্ছে অধিদপ্তর, পেশাগত সংস্থা এবং আধা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাসমূহ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৪টি অধিদপ্তর/বিভাগ রয়েছে: ক. মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (DSHE), খ. কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE), গ. পরিদর্শন ও অডিট অধিদপ্তর (DIA), এবং ঘ. ফ্যাসিলিটিজ বিভাগ (FD)। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগের অধীনে দুটি অধিদপ্তর আছে। এগুলি হচ্ছে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (DPE) এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তর (DNFE)। শিক্ষা প্রশাসনের তিনটি পেশাগত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে, ক. জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমী (NAEM), খ. বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) এবং গ. জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমী (NAPE)। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে কয়েকটি আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলি হচ্ছে, ক. জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB), খ. মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড (BISE), গ. কারিগরি শিক্ষা বোর্ড (TEB), ঘ. মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (MEB), ঙ. বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (UGC) এবং চ. বাংলাদেশ কারিগরি ইনস্টিটিউট পরিষদ (BIT)।

ইনস্টিটিউশন বা ক্ষুদ্র পর্যায়ে, ইনস্টিটিউটের ব্যবস্থাপনা কমিটি বা পরিচালনা পর্ষদ এবং ইনস্টিটিউটের প্রধানগণ স্ব স্ব ইনস্টিটিউটের প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

আনুষ্ঠানিক শিক্ষা মোটামুটি ৩টি ধাপে সমাপ্ত হয় প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ। প্রাথমিক শিক্ষা ৫ বছরের (গ্রেড ১ থেকে ৫), মাধ্যমিক শিক্ষা ৭ বছরের (গ্রেড ৬ থেকে ১২) এবং উচ্চ শিক্ষা ২ থেকে ৫ বছরের (গ্রেড ১৩ এবং তদূর্ধ্ব) হয়ে থাকে। মাধ্যমিক ধাপকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়: নিম্ন মাধ্যমিক (গ্রেড ৬ থেকে ৮), মাধ্যমিক (গ্রেড ৯ ও ১০) এবং উচ্চ মাধ্যমিক (গ্রেড ১১ ও ১২)। গ্রেড ১২ শেষ করার পর স্নাতক পর্যায়ে সাধারণ (পাস) ডিগ্রির জন্য ৩ বছর, অনার্স ডিগ্রির জন্য ৪ বছর এবং মাস্টার্স ডিগ্রির জন্য এক বছর সময় লাগে। উচ্চতর ডিগ্রির (এম.এস/ এম.ফিল/ পিএইচ.ডি) জন্য ন্যূনপক্ষে ২ বছর সময় লাগে।

সাধারণ শিক্ষার সমান্তরালে ইসলাম ধর্মীয় বা মাদ্রাসা শিক্ষার একটি ধারা বিদ্যমান। এর ৫টি ধাপ রয়েছে: ৫ বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা (এবতেদায়ি), ৫ বছর মেয়াদি মাধ্যমিক শিক্ষা (দাখিল), ২ বছর মেয়াদি উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা (আলিম), ২ বছর মেয়াদি ব্যাচেলর (পাস) ডিগ্রি (ফাজিল), এবং ২ বছর মেয়াদি মাস্টার্স ডিগ্রি (কামিল)। দাখিল ও আলিম পরীক্ষাসমূহকে সাধারণ শিক্ষার এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি পরীক্ষার সমমানের ধরা হয়। ফাজিল ও কামিলকে এখনও সাধারণ শিক্ষাধারার স্নাতক (পাস) ও মাস্টার ডিগ্রির সমমানের হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় নি। শিক্ষার অন্যান্য ধারাগুলি হচ্ছে: কারিগারি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, প্রকৌশল শিক্ষা, কৃষি শিক্ষা, চিকিৎসা শিক্ষা, আইন শিক্ষা এবং ব্যবসায় শিক্ষা। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার তিনটি পর্যায় রয়েছে: ১. গ্রেড ৮-এর পরে এক থেকে ২ বছরের সার্টিফিকেট পর্যায়; ২. এস.এস.সি পাসের পর ৩ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা পর্যায়, এবং ৩. এইচ.এস.সি পাসের পর ৪ বছরের স্নাতক পর্যায়। প্রকৌশল, কৃষি, চিকিৎসা, ব্যবসায় এবং আইন বিষয়ক শিক্ষাসমূহ এইচ.এস.সি পাসের পর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের।

বিস্তারিত


বাংলাদেশের কৃষি সম্পদ

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ।এদেশের অধিকাংশ মানুষের প্রধান উপজীবিকা কৃষি। শ্রমজীবি মানুষের প্রায় ৪৮.১% (বিবিএস জরিপ ২০১০ অনুযায়ী  ৪৭.৩০ ভাগ) কৃষি উপর নির্ভরশীল। মোট দেশীয় আয়ের ১২.২৭ শতাংশ আসে কৃষি থেকে।

চা

বাংলাদেশ ভূখন্ডে প্রথম চা চাষ আরম্ভ হয় ১৮৪০ সালে চট্টগ্রাম ক্লাব প্রাঙ্গণে। তবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সিলেটের মালনীছড়ায় দেশের প্রথম চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৭ সালে। চা দেশের দ্বিতীয় অর্থকরী ফসল। বর্তমানে দেশে ১৬৬টি চা বাগান রয়েছে। সর্বশেষ চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয় পঞ্চগড় চা চাষের জন্য প্রয়োজন অধিক বৃষ্টিপাত সমৃদ্ধ পাহাড়ি ঢালু অঞ্চল। বাংলাদেশে চা বোর্ড গঠিত হয় ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রামে। বিশ্ববাজারে উৎপাদিত চায়ের মাত্র ২ শতাংশ চা বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। দেশে ৫৩,৮১৯.৩২ হেক্টর জমিতে চা উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৯ কোটি ৫৫ লক্ষ পাউন্ড। বাংলাদেশ বছরে চা রপ্তানি করে আড়াই কোটি কেজির অধিক। রফতানীকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের স্থান ১৫তম, উৎপাদনে দশম। সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় পাকিস্তানে। বাংলাদেশ মোট ৩০ টি দেশে চা রপ্তানি করে। মোট উৎপাদিত চায়ের ৬৫% রপ্তানি করা হয়। দেশে সর্বাধিক চা উৎপন্ন হয় মৌলভীবাজার জেলায়। এ জেলার শ্রীমঙ্গল থানায় বাংলাদেশ চা গবেষণা কেন্দ্র অবস্থিত । চা মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার (১৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৯) দেশে প্রথম উৎপাদিত উন্নতজাতের চা হল বিটি-১২।

চা উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষ দেশ চীন, রপ্তানীতে কেনিয়া। বাংলাদেশ চা উৎপাদনে দশম এবং রপ্তানিতে ১৫তম।


গম

বাংলাদেশে সর্বাধিক গম উৎপন্ন হয় রংপুর জেলায়। তবে গম গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দিনাজপুর জেলার নশিপুরে। দেশে উৎপন্ন উচ্চ ফলনশীল জাতের কয়েকটি গম হলো অঘ্রাণী, আকবর, বরকত, ইনিয়া-৬৬, পাভন-৭৬, আনন্দ, কাঞ্চন, বলাকা, দোয়েল, শতাব্দী প্রভৃতি। দেশে বছরে উৎপন্ন গমের পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন। শতাব্দী গমের ফসল হেক্টর প্রতি ৪.৫৫ মেট্রিক টন।


পাট

পাট উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় (ভারত প্রথম), রপ্তানিতে দ্বিতীয়। এটি বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল। বাংলাদশের মোট আবাদি জমির ৫ শতাংশে পাট চাষ করা হয়। দেশে একর প্রতি পাটের ফলন গড়ে ৬৯৬ কেজি। বর্তমানে দেশের প্রতিবছর প্রায় ৯.৫৩ লক্ষ একর জমিতে চাষ করা হয়। সাধারণত তিন ধরনের পাট উৎপন্ন হয়- হোয়াইট, তোষা ও মেশতা। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৫১ সালে। এ প্রতিষ্ঠান দেশে চারটি উন্নত জাতের পাট উদ্ভাবন করেছে। এগুলো হলো- BKRI তোষা, BJRI-৫, BJRI-৬, কেনাফজাত(শণপাট), এইচ.সি -৯৫। জাতীয় বীজ বোর্ড দেশী-৮ ও তোষা-৬ নামের পাটের দুটি নতুন জাত অবমুক্ত করেন। দেশে সর্বাধিক পাট উৎপন্ন হয় রংপুরে। দেশে পাটের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হলো নারায়ণগঞ্জে।

পাট ও সুতার মিশ্রণে এক ধরনের কাপড় হলো জুটন। এতে পাট ও সুতার অনুপাত ৭০:৩০। জুটনের আবিষ্কারক ড. মোহাম্মদ সিদ্দিকুল্লাহ (১৯৮৯ সালে।)। একটি কাঁচা পাটের গাইটের ওজন সাড়ে চার মণ।

 


ধান

ধান একটি একবীজপত্রী উদ্ভিদ। ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য। বাংলাদেশে আবাদি জমির ৮০ ভাগেই ধানের চাষ করা হয়। বর্তমানে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ। দেশে ধান উৎপাদনের পরিমাণ বার্ষিক ২ কোটি ৫০ লক্ষ টন একর প্রতি ধান উৎপাদনের পরিমাণ ৬৮৭ কেজি। সমগ্র দেশে কম-বেশি ধান উৎপন্ন হয়, তবে সবচেয়ে বেশি ধান উৎপন্ন হয় ময়মনসিংহ জেলায়। বাংলাদেশে ধানের শ্রেনীভেদ হলো ৪টি- আমন, আউশ, বোরো ও ইরি। ধান উৎপাদনে চীন বিশ্বে প্রথম, রপ্তানিতে থাইল্যান্ড বিশ্বে প্রথম।


গবেষনা কেন্দ্র

১৯৭৩ সালে  বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয়। সারা দেশে কৃষি গবেষণার সমন্বয়, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন সহজতর করার জন্য কৃষি গবেষণা পদ্ধতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করার জন্যই বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদের সৃষ্টি। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের ফসল, পশুসম্পদ, মৎস্য ও বনবিদ্যার ওপর গবেষণারত ১০টি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সবগুলিতেই বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদের ভূমিকা সম্প্রসারিত রয়েছে এবং এগুলির সমন্বয়ে বাংলাদেশের জাতীয় কৃষি গবেষণা ব্যবস্থা (National Agricultural Research System/NARS) গঠিত হয়েছে। NARS-এ দেড় হাজারের মতো বিজ্ঞানী কর্মরত আছেন।

বিস্তারিত


অন্যান্য ফসল

নাই


বাংলাদেশের শিল্প

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে শিল্পখাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পসমূহের পুনর্সহাপন ও পুনর্বাসনের ব্যয় হিসাব করা হয়েছিল ২৯১ মিলিয়ন টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের শিল্পসমূহের জন্য খরচ ধরা হয়েছিল ২২৩ মিলিয়ন টাকা। ৭২টি পাটকল (৭৯,২০০ টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন), ৪৪টি বস্ত্রকল (১৩.৪ মিলিয়ন পাউন্ড), ১৫টি চিনি কল (১,৬৯,০০০ টন), ২টি সার কারখানা (৪,৪৬,০০০ টন), একটি ইস্পাত কল (৩,৫০,০০০ টন), একটি ডিজেল ইঞ্জিন ইউনিট (৩,০০০) এবং একটি জাহাজনির্মাণ কারখানা নিয়ে ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পখাতের কার্যক্রম আরম্ভ হয়। অবশ্য রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের কলকারখানাগুলি প্রধানত অব্যবস্থা ও সম্পদ পাচারের ফলে শীঘ্রই লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

সরকারকে অতি তাড়াতাড়ি রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ওপর কর্তৃত্বসংক্রান্ত নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হয় এবং শিল্পসমূহের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রেখেও ব্যক্তিগত বিনিয়োগের অনুমোদনযোগ্য সর্বোচ্চ সীমা বৃদ্ধি করা হয়। এতে অবস্থার তেমন কোন উন্নতি হয় নি। রাষ্ট্রীয় নীতিতে বহু সমন্বয় ও সাময়িক পরিবর্তন আনয়ন করে সরকার অবশেষে ১৯৮২ সালে একটি নতুন শিল্পনীতি প্রণয়ন করে। এই নীতি অনুসরণে ১,০৭৬টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করা হয়। নব্য সম্পদশালীদের অনভিজ্ঞতার কারণে হস্তান্তরিত শিল্পসমূহ রুগ্ন হয়ে পড়লে বিরাষ্ট্রীয়করণ নতুন সমস্যার সৃষ্টি করে। ব্যক্তিমালিকদের অনেকেই শিল্প উন্নয়ন ও চালু রাখার পরিবর্তে সস্তায় প্রাপ্ত সম্পত্তি বিক্রয় করে নগদ অর্থ অর্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে শিল্পরুগ্নতা দেখা দেয় এবং খাদ্য উৎপাদনকারী শিল্পসমূহের ৫০%, বস্ত্র শিল্পসমূহের ৭০%, পাট খাতের শিল্পসমূহের ১০০%, কাগজ ও কাগজ বোর্ড শিল্পসমূহের ৬০%, চামড়া ও রাবার শিল্পসমূহের ৯০%, রসায়ন ও ঔষধ শিল্পসমূহের ৫০%, গ্লাস ও সিরামিক্স শিল্পের ৬৫% এবং প্রকৌশল শিল্পসমূহের ৮০% ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশে সর্বাপেক্ষা অধিকসংখ্যক শিল্প প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। ১৯৮৪ সালে এই শ্রেণির শিল্পের সংখ্যা ছিল ৯,৩২,২০০টি। এর মধ্যে ২০.৭% ছিল তাঁত, ১৫.৪% বাঁশ ও বেতের কাজের কারখানা, ৮.১% কাঠমিস্ত্রির কাজের কারখানা, ৬.১% পাট ও তুলার সুতায় তৈরি দ্রব্য উৎপাদনের কারখানা,  ৩.৪% মৃৎশিল্প, ০.৩% তেলভাঙ্গা কল, ৩.২% কামারের কারখানা, ০.৮% তামা ঢালাই কারখানা এবং অবশিষ্ট অন্যান্য ধরনের শিল্প। বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকায়ই তাঁতিদের বসতি আছে, কিন্তু নরসিংদী, বাবুরহাট, হোমনা, বাঞ্ছারামপুর, বাজিতপুর, টাঙ্গাইল, শাহাজাদপুর এবং যশোর এলাকায় তাদের অধিক সংখ্যায় কেন্দ্রীভূত রূপে দেখা যায়। রেশম শিল্প রাজশাহী ও ভোলাহাটে প্রসার লাভ করেছে। বাংলাদেশে ১৯৮০-র দশকে অন্যান্য যে সকল স্থান কুটির শিল্পের জন্য খ্যাতি অর্জন করেছিল সেগুলির মধ্যে রয়েছে চাঁপাই নবাবগঞ্জ ও ইসলামপুর (তামা ঢালাই), সিলেট (মাদুর ও বেতের আসবাবপত্র), কুমিল্লা (মৃৎশিল্প ও বাঁশের কাজ), কক্সবাজার (সিগার), বরিশাল (নারিকেলের ছোবড়া থেকে উৎপাদিত দ্রব্য) এবং রংপুর (নকশাযুক্ত কার্পেট)।

১৯৮৪ সালে বাংলাদেশে ৬,০০০ তাঁত এবং ১,০২৫,০০০ টাকুবিশিষ্ট ৫৮টি বস্ত্রকল ছিল। এই বস্ত্রকলগুলির বার্ষিক উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১০৬.২ মিলিয়ন পাউন্ড সুতা, ৬৩ মিলিয়ন মিটার কাপড়। বস্ত্র বাংলাদেশের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত খাতের অন্যতম শিল্প এবং অন্যান্য অধিকাংশ শিল্পখাতের মতোই বস্ত্রখাতকে লোকসানের বোঝা বহন করতে হয়েছে। ১৯৮৪ সালে এই লোকসানের পরিমাণ ছিল ৩৫৩.৪ মিলিয়ন টাকা। এই খাতের অসুবিধাসমূহের মধ্যে রয়েছে দুর্বল ব্যবস্থাপনা, দক্ষ শ্রমিক সৃষ্টির অসুবিধা, কাঁচামাল ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অপর্যাপ্ততা। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশে ২৩,৭০০টি টাকুবিশিষ্ট ৭০টি পাটকল ছিল। ওই বছর এই পাটকলসমূহে ১,৬৮,০০০ জন শ্রমিক এবং ২৭,০০০ জন অন্যান্য কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছিল। এই মিলসমূহে ওই বছর ৫৪৫০০০ টন কাঁচাপাট ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আলোচ্য বছরে এই সকল পাটকলের উৎপাদন ১৯৬৯ সালের ২১,৫০৮টি টাকুবিশিষ্ট ৫৫টি পাটকলের ৫৬১০০০ টন উৎপাদন অপেক্ষা কম ছিল। বাংলাদেশের পাট শিল্পের প্রধান তিনটি কেন্দ্র ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় অবস্থিত। পাটজাত দ্রব্যের পরিবর্তে এখন সস্তা ও অধিক টেকসই প্লাস্টিক দ্রব্য ব্যবহূত হচ্ছে। ভারতের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের পাট শিল্প ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।

১৯৮৫ সালের পূর্বে বাংলাদেশে সালফিউরিক এসিড, রাসায়নিক দ্রব্য, কাগজ, কস্টিক সোডা, গ্লাস, সার, চীনামাটি দ্বারা প্রস্ত্তত বাসনকোসন, সিমেন্ট, ইস্পাত এবং প্রকৌশলের মতো নতুন শিল্পের উন্নয়ন ছিল মন্থর। ১৯৮৫ সালে সালফিউরিক এসিড উৎপাদনের জন্য দেশে মাত্র দুটি কারখানা ছিল এবং তাদের মোট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৫,৯৯৫ মেট্রিক টন, যদিও সাবান, কাগজ, ঢালাই লোহা ও ইস্পাতের মতো শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ এই উপকরণটির উৎপাদন ১৯৭০ সালে ছিল ৬,৪৬৬ মেট্রিক টন। ১৯৮৫ সালে কস্টিক সোডার উৎপাদন ছিল ৬,৭৮৭ মেট্রিক টন, এর প্রায় সবটাই কাগজকলসমূহে ব্যবহার করা হতো। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বালু, লবণ ও চুনাপাথর সহজলভ্য হওয়ায় দেশে কাচ শিল্প উন্নয়নের বেশ সম্ভাবনা রয়েছে। এই শিল্প স্থাপনের জন্য দুটি প্রধান স্থান হচ্ছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের কালুরঘাটে অবস্থিত স্বয়ংক্রিয় গ্লাস ফ্যাক্টরিতে ১৯৮৫ সালে ১২.৯ মিলিয়ন বর্গফুট শিট গ্লাস উৎপাদন করা হয়।

দেশের সার শিল্পে প্রধান কাঁচামাল হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করা হয়। ১৯৮৫ সালে সার কারখানাসমূহের মোট উৎপাদন ছিল ৮,০৮,৬৬০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ৭,৪১,৪৬৩ মেট্রিক টন ছিল ইউরিয়া, ৯,৬৩৪ মেট্রিক টন অ্যামোনিয়াম সালফেট, এবং ৫৭,৫৬৩ মেট্রিক টন ট্রিপল সুপার ফসফেট। ফেঞ্চুগঞ্জ, ঘোড়াশাল ও আশুগঞ্জে তিনটি প্রধান সার কারখানা অবস্থিত ছিল। ১৯৮৫ সালে দেশের মোট সিমেন্ট উৎপাদন ছিল ২,৯২,০০০ মেট্রিক টন এবং দেশের প্রধান সিমেন্ট কারখানাদ্বয় ছাতক ও চট্টগ্রামে অবস্থিত। পাবনার পাকশী এবং চট্টগ্রামের চন্দ্রঘোনায় রয়েছে বাংলাদেশের কাগজ শিল্পের প্রধান কারখানা এবং ১৯৮৫ সালে কাগজের মোট উৎপাদন ছিল প্রায় ৭৫,০০০ মেট্রিক টন। খুলনায় আছে একটি নিউজপ্রিন্ট মিল (১৯৮৫ সালে উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৫৫,০০০ মেট্রিক টন) এবং একটি হার্ড বোর্ড মিল (১৯৮৫ সালে উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ১,৬২১ বর্গমিটার)। ১৯৮৫ সালেই বাংলাদেশে পার্টিকেল বোর্ড ও পারটেক্স উৎপাদনের জন্য কয়েকটি মিল ছিল। ম্যাচ উৎপাদনেও বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। ঢাকা, খুলনা, খেপুপাড়া, চট্টগ্রাম, সিলেট, বগুড়া ও রাজশাহী ম্যাচ উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। ১৯৮৫ সালে ম্যাচের মোট উৎপাদন ছিল ১.৩০ মিলিয়ন গ্রোস বাক্স। একই বছরে বাংলাদেশের ৮টি চিনিকলের উৎপাদন ছিল ৮৭,০০০ টন। দর্শনার (ঈশ্বরদী) চিনিকলে চিনি ছাড়া আরও উৎপন্ন হয় অ্যালকোহল, মেথিলেটেড স্পিরিট এবং রেক্টিফাইড স্পিরিট। বাংলাদেশের লৌহ ও ইস্পাত মিলগুলির অধিকাংশই ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের অধীনে চট্টগ্রাম ও ঢাকাতে কেন্দ্রীভূত। অবশ্য খুলনা, কুষ্টিয়া ও বগুড়াতেও কিছু ইস্পাত ও লোহার কাজের প্রতিষ্ঠান আছে।

১৯৮০-র দশকে বাংলাদেশে জাহাজনির্মাণ শিল্প, মোটরগাড়ি সন্নিবেশ শিল্প, তৈল শোধনাগার, ইনসুলেটর ও চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির কারখানা, টেলিফোন যন্ত্রপাতি তৈরির শিল্প, বৈদ্যুতিক দ্রব্যাদি তৈরির কারখানা, টেলিভিশন সন্নিবেশ কারখানা, সিগারেট কোম্পানি এবং উদ্ভিজ্জ তেল কল বিশেষ স্থান অধিকার করে। এই সময় দেশে তৈরি পোশাক শিল্প ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করে। সরকার পরিকল্পিত উন্নয়নের সাথে মুক্তবাজার অর্থনীতির মিশ্র কৌশল অনুসরণ করে। ১৯৯০-এর দশকে উৎপাদন খাতে যথেষ্ট প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায় এবং ১৯৯৬ সালে দেশের মোট জাতীয় আয়ে এই শিল্পখাতের অংশ ১১%-এ উন্নীত হয়। এই খাতে ১৯৯৭ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৫৭.৮ বিলিয়ন টাকা এবং ১৯৯১ সালে এই বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২২.৫ বিলিয়ন টাকা। দেশের শিল্পসমূহের মোট  বিনিয়োগে সরকারি খাতের অংশ ১৯৯১ সালের ৩৭.০৩% হ্রাস পেয়ে ১৯৯৭ সালে দাঁড়ায় ৮.৬৩%।

বিস্তারিত

বাংলাদেশের EPZ

EPZ হচ্ছে Export Processing Zones. বাংলাদেশের EPZ সমুহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৮টি সরকারি এবং ২টি বেসরকারি EPZ রায়েছে। চট্টগ্রামে বাংলাদেশেল প্রথম EPZ স্থাপন করা হয় ১৯৯৩ সালে। বাংরাদেশের প্রথম বেসরকারি EPZ হচ্ছে KEPZ. এটি চট্টগ্রামে অবস্থিত।

বাংলাদেশের সরকারি EPZ সমুহ।

 

নাম                        অবস্থান                             প্রতিষ্ঠা

চট্টগ্রাম                    হালীশহর, চট্টগ্রাম                ১৯৪৩

ঢাকা                       সাভার, ঢাকা                      ১৯৯৩

মংলা                       মংলা, বাগেরহাট                  ১৯৯৮

ঈশ্বরদী                    পাকশী, পাবনা                     ১৯৯৮

উত্তরা                      সঙ্গলসী সদর, নীলফামারী      ১৯৯৯

কুমিল্লা                     বিমানবন্দর, কুমিল্লা              ২০০০

আদমজী                  নারায়নগঞ্জ                           ২০০৬

কর্ণফুলী                   পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম                      ২০০৬


বাংলাদেশের শিল্পকারখানা

বর্ননা নেই


পাট শিল্প

বাংলাদেশে সর্বপ্রথম পাটকল স্থাপন করা হয় ১৯৫১ সালে ১০০০ তাঁত নিয়ে নারায়নগঞ্জে আদমজীনগরে। বর্তমান বাংলাদেশে বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন (বিজেএমসি) এর নিয়ন্ত্রণাধীন ২৭ টি(১টি বন্ধ ও ২টি নন জুট মিল), বাংলাদেশ জুট মিলস এসোসিয়েশন (বিজেএমএ) এর নিয়ন্ত্রণে ১৪৬ টি (৩৮টি বেসকারিকৃত ও ১০৮ টি নতুন স্থাপিত মিল)এবং বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স এসোসিয়েশন (বিজেএসএ) এর আওতায় ৩৬ টি পাট সুতাকল রায়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে ডিসেম্বর ২০১৪ পর্যন্ত পাটজাত পণ্যের উৎপাদন ২.৯৫ লক্ষ মে. টন যার রপ্তানিমূল্য ১৬১৫৯৫ লক্ষ টাকা।


বস্ত্র শিল্প

দেশে সরকারি কটন স্পিনিং মিলের সংখ্যা ৪২৯ টি। এই ৪২৯ টি মিলের উৎপাদন ক্ষমতা ২১০৬ মিলিয়ন কেজি। এছাড়াও উইভিং মিলের সংখ্যা ৭৮৭ টি এবং এর উৎপাদন ক্ষমতা ২৮০০ মিলিয়ন মিটার; স্পেশালাইজড টেক্সটাইল ও পাওয়ার লুম ইউনিট ৩৮১০০ টি এবং উৎপাদন ক্ষমতা ৬৫০০০ মিলিয়ন মিটার। হস্তচালিত ইউনিটের সংখ্যা ৩১৩২৪৫ টি (উৎপাদন ক্ষমতা ৮৩০ মিলিয়ন মিটার) রয়েছে। এগুলো ছাড়াও সর্বমোট ৩০০০ টি নীটিং., নীট-ডায়িং ইউনিট (১৪০০ টি রপ্তানিমুখী ইউনিটসহ), ২৩৬টি ডায়িং প্রিন্টিং এবং ফিনিশিং ইউনিট (উৎপাদন ক্ষমতা ২৬০০ মিলিয়ন মিটার )।

২০১৪-১৫ অর্থবছরের ডিসেম্বর, ২০১৪ দেশের উৎপাদিত মোট সুতার পরিমাণ ৬০০.৯৪ মিলিয়ন কোজি যার মধ্যে বেসরকারি খাতে উৎপাদনের পরিমাণ ৬০০.০০ মিলিয়ন কেজি। এ সময়ে দেশে মোট কাপড় উৎপাদনের পরিমাণ ৪৩৫৩.০০ মিলিয়ন মিটার যার পুরোটাই বেসরকারি খাতে উৎপাদিত হয়েছে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮১.৫ শতাংশ বস্ত্রপণ্য ও তৈরী পোশাক থেকে আসছে।

বাংলাদেশ বিশ্বের ২০টির বেশি দেশে পোশাক রপ্তানি করে থাকে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক বৃহত্তম বাজার পোশাক রপ্তানি থেকে প্রাপ্ত আয়ের প্রায় ১৮.০ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩২০৪.৭ মিলিয়ন মর্কিন ডলার। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এছাড়াও রয়েছে কানাডা ও মধ্য প্রাচ্যের দেশ সমুহ।

 


কাগজ শিল্প

বাংলাদেশে সর্বপ্রথম কাগজকল স্থাপন করা হয়  ১৯৫৩ সালে রাঙামাটি জেলার চন্দ্রঘোনায় কর্ণফূলী কাগজকল। এটি বিসিআইসি নিয়ন্ত্রিত একমাত্র কাগজকল। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ কাগজকল খুলনা নিউজপ্রিন্ট ৩০ নভেম্বর ২০০২ বন্ধ হওয়ার পর কর্ণফুলী কাগজকল বর্তমানে বাংলাদেশের বৃহত্তম কাগজকল। বাংলাদেশে বর্তমানে ৭টি কাগজকল ও ৪টি হার্ডবোর্ড মিল চালু আছে। সিলেট মন্ড ও কাগজকল স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত একমাত্র কাগজকল।

 


ইস্পাত ও প্রকৌশল শিল্প

বর্ননা নেই


সার শিল্প

১৯৬১ সালে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম সার কারখানা স্থাপন করা হয় সিলেটে, ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা। দেশের বৃহত্তম সার কারখানা জামালপুরের যমুনা সার কারখানা চালু হয় ২৬ ডিসেম্বর, ১৯৯১। এটি দেশে গুটি ইউরিয়া তৈরির একমাত্র সার কারখানা।এর বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৫ লক্ষ ৬১ হাজার মে.টন।

বাংলাদেশে সরকার ও জাপানের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত বেসরকারি খাতে বাংলাদেশের একক বৃহত্তম সার কারখানা কর্ণফুলী সার কারখানা।এটি চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত।


চিনি শিল্প

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন ১৫টি চিনিকল রয়েছে। যার বার্ষিক গড় উৎপাদন ক্ষমতা ২.১০ লক্ষ মে. টন। ফলে বেসরকারি খাতে স্থাপিত ৫/৬টি সুগার রিফাইনারিতে উৎপাদিত চিনি ও আমদানিকৃত চিনি দিয়ে ঘাটতি পূরণ করা হয়।


জাহাজ শিল্প

জাহাজ নির্মাণ শিল্প  বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শিল্পখাত। নদীমাতৃক বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমুদ্র জলসীমার আয়তন ৯০০০ বর্গ কিমি এবং এর মধ্যে ৭২০ কিমি দীর্ঘ সমুদ্র জলসীমা। দেশের প্রায় ৭০০ ছোট-বড় নদীর ২৪ হাজার কিমি দীর্ঘ নদীপথ অভ্যন্তরীণ জলসীমা হিসেবে নৌপরিবহণের কাজে ব্যবহূত হয়। বর্তমানে প্রায় ছোট-বড় দশ হাজার অভ্যন্তরীণ ও সমুদ্র উপকূলীয় জাহাজ সারা দেশজুড়ে পণ্য ও যাত্রী পরিবহণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে। এসব জাহাজ দেশের শতকরা ৯০ শতাংশ তৈলজাত দ্রব্য, ৭০ শতাংশ মালামাল এবং ৩৫ শতাংশ যাত্রী বহন করে থাকে। এই শিল্প খাতে এখন দেড় লক্ষাধিক দক্ষ ও অর্ধদক্ষ শ্রমিক বর্তমানে কাজ করছে এবং প্রায় ২০ লাখ মানুষ নানাভাবে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সাথে জড়িত। দেশের সকল আভ্যন্তরীণ এবং উপকূলীয় জাহাজ বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ কারখানায় (শিপইয়ার্ডে) নির্মিত হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ সাফল্যের সাথে ডেনমার্কে প্রথম সমুদ্রগামী জাহাজ রপ্তানি করেছে। এ জন্য বাংলাদেশ ভারত, চীন এবং ভিয়েতনামের মত বৃহৎ জাহাজ নির্মাণকারী দেশের সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে সাফল্য দেখিয়েছে। বাংলাদেশের অনেক জাহাজ নির্মাণ কারখানা এখন দশ হাজার টন ধারণ ক্ষমতার জাহাজ নির্মাণে সক্ষম।

বিস্তারিত


সিমেন্ট শিল্প

বাংলাদেশে বর্তমানে ৬৩ টি রেজিস্টার্ড সিমেন্ট কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি উৎপাদনের পর্যায়ে পৌছেছে। দেশে চাহিদার তুলনায় এখন অধিক সিমেন্ট উৎপাদিত হচ্ছ্ দেশের বৃহত্তম সিমেন্ট কারখানা হল লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, ছাতক, সুনামগঞ্জ।

 

 


ওষুধ শিল্প

ঔষধ শিল্প  উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন ঔষধ শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ১৯৮২ সালে ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ প্রণয়নের পর থেকে এই শিল্পের উন্নয়ন গতিলাভ করেছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ঔষধ রপ্তানি হচ্ছে। তাছাড়া এই শিল্প দেশের প্রয়োজনীয় চাহিদার শতকরা ৯৭ ভাগ সরবরাহ করছে। শীর্ষস্থানীয় ঔষধ কোম্পানিগুলি রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ক্রমশই বৃদ্ধি করছে।

দেশি ও বিদেশি কোম্পানি মিলে বাংলাদেশে বর্তমানে ২৫২টি সরকার অনুমোদিত ঔষধ কোম্পানি রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের ঔষধ ব্যবসার শতকরা ৭৫ ভাগেরও বেশি দেশিয় কোম্পানিগুলি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তবে ঔষধ প্রস্ত্ততিতে মুখ্য ভূমিকা রাখে এমন ২০টি কোম্পানির মধ্যে ৬টিই হচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানি। এই বহুজাতিক কোম্পানিগুলি মূলত উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন সকল জীবন রক্ষাকারি ঔষধসমূহ আমদানির পাশাপাশি গবেষণায় উদ্ভাবিত নতুন নতুন উপাদানও এদেশে বাজারজাত  করে আসছে। সাধারনত বহুজাতিক ও বড় বড় দেশিয় কোম্পানীগুলি উত্তম উৎপাদন ব্যাবস্থা ও সঠিক মাননিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অনুসরণ করে তাদের ঔষধ প্রস্ত্তত করে থাকে। ঔষধ-প্রসাশন সংক্রান্ত আইনের মূল ভিত্তি হচ্ছে ১৯৪০ সালের ড্রাগ এ্যাক্ট এবং এ আইনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি বিধিবিধান। আগে ইউনানি, আর্য়ূবেদি, হোমিওপ্যাথি ও বায়োকেমিক ঔষধ এই নীতির বাইরে থাকলেও,  বর্তমানে এর অধীনে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গরিব ও আদিবাসি মানুষ প্রাচীন এই চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। হিসাব মতে বর্তমানে ২৬৮ ইউনানি, ২০১ আর্য়ূবেদি, ৯টি হারবাল ও ৭৯টি হোমিওপ্যাথি ও বায়োকেমিক ঔষধ প্রস্ত্ততকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বর্তমানে তারা আনুমানিক ২০০ কোটি টাকার মত ঔষধ বাংলাদেশে উৎপাদন করছে।

পাকিস্তান আমলে অধিকাংশ বহুজাতিক কোম্পানিগুলির কারখানা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। স্বাভাবিক কারণেই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর ঔষধশিল্পের ভিত্তি ছিল খুবই দুর্বল। স্বাধীনতার পর কয়েক বছর পর্যন্ত স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বরাদ্দ ছিল খুবই কম। ফলে জীবন রক্ষাকারী প্রয়োজনীয় অধিকাংশ ঔষধ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যায়। ১৯৮২ সালে ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় ঔষধ বাজারজাতকরণ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ঔষধ সরবরাহ বৃদ্ধি করা হয়। প্রতিযোগিতামূলক বাজারের মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় ঔষধের মূল্য তুলনামূলকভাবে কম এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার নাগালে রাখা সম্ভব হয়। ১৯৮১ সালে দেশে লাইসেন্সকৃত ঔষধ কারখানার সংখ্যা ছিল ১৬৬টি, তবে বাংলাদেশে ঔষধ উৎপাদনে তখন ৮টি বহুজাতিক কোম্পানির আধিপত্য বজায় ছিল এবং তারা এককভাবে শতকরা ৭৫ ভাগ ঔষধ সরবরাহ করত। সেসময় ২৫টি মাঝারি আকারের দেশিয় ঔষধ কোম্পানি শতকরা ১৫ ভাগ এবং ১৩৩টি কোম্পানি বাকি ১০ ভাগ ঔষধ তৈরি করত। এই সকল কোম্পানি বার্ষিক ৬০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানিকৃত কাঁচামাল থেকে স্থানীয়ভাবে ঔষধ তৈরি করত। দেশে ১৬৬টি স্থানীয় ঔষধ কোম্পানি থাকা সত্ত্বেও প্রতিবছর ৩০ কোটি টাকা মূল্যের তৈরি ঔষধ বিদেশ থেকে আমদানি করা হত। ১৯৮২ সালের ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ-এর ফলে অপ্রয়োজনীয় ঔষধ তৈরির কাঁচামাল এবং দেশে উৎপাদিত হয়না এমন জীবন রক্ষাকারী ঔষধ আমদানি করা হয়। এর ফলে স্থানীয়ভাবে তৈরি ঔষধের মূল্য ১৯৮১ সালের  হিসেবে ১১০ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৯৯ সালে ১,৬৯০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। বর্তমানে ঔষধের মোট চাহিদার শতকরা ৯৭ ভাগ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ঔষধ দ্বারা মেটানো হচ্ছে। দেশিয় কোম্পানিগুলি ঔষধের বাজারে বর্তমানে তাদের শেয়ার শতকরা ২৫ ভাগ থেকে ৭৫ ভাগে উন্নীত করেছে।

দেশিয় ও বহুজাতিক কোম্পানি মিলে বর্তমানে ১০৮১টি জেনেরিকের অধীনে আনুমানিক ১৯,৮৩০টি বিভিন্ন ব্রান্ডের ঔষধ তৈরি করছে। বর্তমানে দেশে ২০০০টি লাইসেন্সধারী  পাইকারি ঔষধ বিক্রেতা ও আনুমানিক ৮০,০০০টি খুচরা বিক্রেতা রয়েছে, যারা ঔষধ প্রদান ও বণ্টনে নিয়োজিত। দেশে  উৎপাদিত ঔষধের মধ্যে সংক্রমণ প্রতিরোধক ওষুধের স্থান প্রথম এবং এর পরই রয়েছে অ্যান্টাসিড জাতীয় ও আলসার নিরাময়ক ঔষধের স্থান। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ঔষধের মধ্যে রয়েছে প্রদাহ প্রশমনকারি ঔষধ, ভিটামিন, স্নায়ুবিক রোগ ও শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে সংশ্লিষ্ট রোগের ঔষধ। সাম্প্রতিককালে দেশিয় ঔষধ কোম্পানিগুলি ওষুধের কার্যকারি মৌলিক উপাদানসমূহ উৎপাদনে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে। বর্তমানে দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলি যৌথ প্রযুক্তি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে ঔষধের কাঁচামাল তৈরিতে এগিয়ে আসছে। এরকম ২১টি কোম্পানি যার মধ্যে আনুমানিক ৪১টির মত ওষুধের কার্যকরী মৌলিক উপাদান তৈরি ও বাজারজাত করছে। এসব উৎপাদনকৃত উপাদানগুলির মধ্যে রয়েছে প্যারাসিটামল, অ্যাম্পিসিলিন ট্রাই-হাইড্রেট, ক্লোক্সাসিলিন সোডিয়াম, ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম হাইড্রোক্সাইড ড্রাই্ড্ জেল, ডেক্সট্রোজ মোনোহাইড্রেট্, হার্ড জিলেটিন ক্যাপসুল সেল, ক্লোরোকুইন ফস্ফেট, প্রোপ্রানোলোল হাইড্রোক্লোরাইড, বেনজোইল মেট্রোনিডাজল, সিপ্রোফ্লোক্সাসিন হাইড্রোক্লোরাইড্, সেফরাডিন্, পাইরেন্টাইল ও পামোয়েট ইত্যাদি। তবে সংশ্লেষণের মাধ্যমে ঔষধের মৌলিক উপাদান তৈরির ক্ষেত্রে পদ্ধতির একেবারে শেষ ধাপটিতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। দেশিয় উৎপাদনে যোগান দিতে আরো অনেক ঔষধের মৌলিক উপাদান প্রস্ত্ততকারি শিল্পের প্রয়োজন রয়েছে। ৩০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে মুন্সিগঞ্জে ওষুধের কাঁচামাল তৈরির যে শিল্প পার্ক অনুমোদন হয়েছে তা প্রতিষ্ঠিত হলে ঔষধশিল্পে আরো গতিশীলতা আসবে।

বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মত যোগ্যতা ও সম্ভাবনা বাংলাদেশ ঔষধ শিল্পের রয়েছে। গুনগতমান নিশ্চিতকরণের কঠিন পদ্ধতিগুলি মেনে চলার কারণেই এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সাহায্য করছে। বাংলাদেশের বেশীর ভাগ ঔষধ শিল্পই জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরোপিত উত্তম উৎপাদন ব্যাবস্থা মেনে চলে। যদি অনুন্নয়নশীল দেশ হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার অধীনে জেনেরিক, পেটেন্ট ও এ সম্পর্কিত বিষয়ের ওপর দেওয়া ছাড় আগামী ২০১৬ সাল পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে বিশ্বের রপ্তানি বাজারে ভারত, চীন, ব্রাজিল, তুরষ্কের মত দেশগুলির সাথে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে পারবে।

খাবার ও ঔষধ প্রস্ত্ততিতে মান নিশ্চিতকরণে বিশ্বের সর্বত্রই উত্তম উৎপাদন ব্যাবস্থার আধুনিক পদ্ধতি মেনে চলতে সবাই একমত। বাংলাদেশ এখন ক্যাপসুল, সিরাপ ও ট্যাবলেট ছাড়াও উন্নত প্রযুক্তির বিশেষ ঔষধ যেমন  হাইড্রোফ্লুরোঅ্যালকেন ইনহেলার, সাপোসিটোরিস্, এস্টেরয়েডস্, ক্যান্সারের ঔষধ, ইমিউনোসাপ্প্রেসেন্ট, নাকে প্রযোগকৃত স্প্রে, ছোট ও বড় আয়তনের শিরায় প্রয়োগকৃত ইনজেকশনও রপ্তানি করছে। পরবর্তী পদক্ষেপ হিসাবে বাংলাদেশের এই শিল্প স্থানীয় ওষুধের চাহিদা মেটাতে বদ্ধপরিকর। তাই তারা বাংলাদেশের লাখো মানুষের জন্য মান সম্পন্ন ঔষধ প্রস্ত্তত করছে। প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ এই খাত দেশের মোট চাহিদার শতকরা ৯৭ ভাগ পূরণ করছে।

যৌথ পরিচালনায় প্রস্ত্ততকৃত ঔষধের পরিমাণ অনেক এবং সম্প্রতি ইউনিসেফ-এর অনুমোদনে অনেক কোম্পনি এভাবেই প্রস্ত্ততকৃত ঔষধ দেশে ও বিদেশে সরবরাহ করছে। বিশ্বের যেকোন দেশে ব্যবহার উপযোগী ঔষধ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয় শর্ত হিসেবে আধুনিক উত্তম উৎপাদন ব্যাবস্থা পরিপূর্ণভাবে মেনে চলার সুবিধা কোম্পানিগুলো তৈরি করেছে। উন্নত দেশগুলিতে বাংলাদেশে প্রস্ত্ততকৃত ঔষধ রপ্তানির জন্য বিশ্বখ্যাত অনেক প্রতিষ্ঠান ঔষধ প্রসাশন অধিদপ্তরের অনুমোদন লাভ করেছে। প্রতিযোগতামূলক মূল্য ও গুণগত মান বজায় রেখে বহিঃবিশ্বে রপ্তানির জন্য তাদেরকে এই অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এরকম কিছু কোম্পানি বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ন্ত্রক। মাননিয়ন্ত্রণ কঠোরভাবে মেনে চলায় সকল দেশিয় কোম্পানিগুলি আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ সংস্থাসমূহের অনুমোদন লাভে সমর্থ হচ্ছে এবং ঔষধ রপ্তানি করার যোগ্যতা অর্জন করেছে।

দেশিয় চাহিদার শতকরা ৯৭ ভাগ মেটানোর পর বাংলাদেশের ঔষধ বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৫, ৫০০ কোটি টাকার ঔষধ দেশে তৈরি হচ্ছে। ২০০৪ সালে ওষুধের রপ্তানি মূল্য ছিল ৮.২ মিলিয়ন ডলার যা ২০০৭ সালে ২৮.৩ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। সাম্প্রতিককালে রপ্তানির পরিমাণ মূল্য আরো বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ইউরোপ আমেরিকাসহ রপ্তানিযোগ্য দেশের সংখ্যা ৩৭ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৭২ এ পৌঁছেছে। বর্তমানে আমেরিকা, ভারত, চীন, তাইওয়ান, হংকং, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশসমূহ, সিংঙ্গাপুর, মালায়েশিয়া, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, থাইলান্ড, বার্মা, ভূটান, নেপাল, ইয়েমেন, ভিয়েতনাম, কাম্পুচিয়া, লাওস, মেক্সিকো, কলোম্বিয়া, ইকুয়াডোর, রাশিয়া, উজবেকিস্তান, তানজানিয়া, কেনিয়া, তিউনেশিয়া ও মালদ্বীপে  বাংলাদেশের ঔষধ রপ্তানি হচ্ছে।

ঔষধের গুণগত মাননিয়ন্ত্রণে প্রাথমিক দায়িত্ব প্রস্ত্ততকারি প্রতিষ্ঠানের ওপরই বর্তায়। তবে সরকার পরিচালিত ঔষধ পরীক্ষণ পরীক্ষাগার ও ঔষধ প্রসাশন অধিদপ্তর যৌথভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ঔষধ প্রসাশন অধিদপ্তরের অধীনে ঢাকায় জনস্বাস্থ্য ইনিস্টিটিউট-এ একটি ও চট্টগ্রামে একটি করে মোট দুইটি সরকারি ঔষধ পরীক্ষণ পরীক্ষাগার রয়েছে। ঔষধ প্রসাশন বাংলাদেশে ঔষধ বিপণনের ক্ষেত্রে রেজিষ্ট্রেশন, ঔষধের কারখানা পরিদর্শন ও লাইসেন্স প্রদানের জন্য দায়িত্বশীল থাকে। বর্তমান ব্যাবস্থাপনায় স্বল্পসংখ্যক লোকবল নিয়ে এত বড় কর্মযোগ্য পরিচালনা করা ঔষধ প্রসাশন অধিদপ্তর-এর জন্য সত্যিই কঠিন। বাংলাদেশের ঔষধ শিল্পের সুষ্ঠু উন্নয়নে জাতীয় ঔষধনীতি ও ঔষধনিয়ন্ত্রণ নীতির সুফল পেতে এখনও অনেক দেরি।  সরকারি ঔষধ পরীক্ষণ পরীক্ষাগারের সীমিত ক্ষমতার কারণে স্থানীয়ভাবে প্রস্ত্ততকৃত সকল ঔষধের মান সমানভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়না। স্বত্বাধিকার আইনের কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকায় বাংলাদেশের ঔষধ শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। গবেষণালব্ধ নতুন মৌলিক উপাদানের বাজারজাত করণের রেজিস্টেশন পদ্ধতি অনেক ধীরগতিতে হয়। তাছাড়া এখানকার স্বত্বাধিকার প্রতিরোধ আইন প্রতিবন্ধকতামূলক। তবে, বর্তমানে সরকার শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক বিভাগে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ করে স্বত্বাধিকার ও এ সম্পর্কিত বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এতে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে। নির্ধারিত মূল্য নিরূপণ পদ্ধতি বাংলাদেশের ঔষধের দাম কমের মধ্যে রাখলেও, তা দিয়ে কোম্পানিগুলি তাদের বিপনণ ও বণ্টনজনিত খরচ মেটাতে পারেনা। এই নির্ধারিত মূল্য নিরূপণ পদ্ধতির কারণে কিছু কিছু কোম্পানি আধুনিক উত্তম উৎপাদন ব্যাবস্থা ও সর্বোচ্চ মান নির্ণয়ের জন্য যে খরচ সেখানে বিনিয়োগ করতে উৎসাহ বোধ করে না। কোম্পানিগুলি বায়োইকুইভ্যালেন্সি পরীক্ষণ ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়েলের মাধ্যমে ঔষধের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য যে খরচ করছে, সেই খরচসহ ঔষধের মূল্য নির্ধারণের জন্য ঔষধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের বিবেচনা করা উচিত। এটা ঔষধ কোম্পানিগুলিকে তাদের গুণগতমান নিয়ন্ত্রণের সকল পদ্ধতি সঠিকভাবে মেনে চলতে উৎসাহিত করবে।

বাংলাদেশে জেনেরিক ওষুধের বিরাট বাজার রয়েছে এবং দেশিয় কোম্পানিগুলির মধ্যে স্কয়ার ও বেক্সিমকো বহিঃর্বিশ্বে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে। এত উৎপাদন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দেশিয় কোম্পানিগুলিতে প্রকৃত গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যাবস্থা না থাকায় ঔষধের বাজারে একসময় স্থবিরতা দেখা দিতে পারে। খুব কম সংখ্যক কোম্পানির ঔষধ সম্পর্কিত গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প কারখানার মধ্যে যৌথভাবে কোনো গবেষণাই এখানে হয় না। ভবিষ্যৎ উন্ন্য়নের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প কারখানার মধ্যে এধরনের গবেষণা খুবই প্রয়োজন। তবে ২০০৫ সালের ঔষধনীতি বাংলাদেশের ঔষধ শিল্পের উন্নয়নের জন্য একটা বড় পদক্ষেপ বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে।

বিস্তারিত


দিয়াশলাই শিল্প

দিয়াশলাই তৈরি হচ্ছে অন্যতম প্রাচীন এবং সবচেয়ে বেশি সম্প্রসারিত কাঠশিল্প। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং খুলনায় মোট পাঁচটি বৃহৎ শিল্প ইউনিট রয়েছে, যেখানে বাজারের শতকরা ৯৫ ভাগ দিয়াশলাই উৎপাদিত হয়। বাকি ৫% উৎপাদিত হয় ১৮টি মধ্যম এবং দুশ ছোট কারখানায়। এসব ছোট কারখানা ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, কুমিল্লা, বগুড়া এবং সিলেটে অবস্থিত। সম্প্রতি পেট্রোলিয়াম লাইটারের ক্রমবর্ধমান প্রচলনের ফলে দিয়াশলাইয়ের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। এসব কারখানায় ব্যবহূত নরম কাঠের মধ্যে রয়েছে শিমুল, সিভিট, গেওয়া, কদম, পিটালি, কড়ই, পশুর এবং ছাতিম। মোট কাঁচামালের চাহিদা হচ্ছে প্রায় ৯০ হাজার ঘনমিটার।

বিস্তারিত


লবন শিল্প

লবণ শিল্প  লবণ বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে উৎপন্ন হয়। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে সমুদ্রের লোনা পানি দ্বারা ডিসেম্বর হতে মধ্য মে পর্যন্ত দীর্ঘকাল যাবৎ লবণ উৎপাদিত হয়ে আসছে। বর্তমানে খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলেও লবণ উৎপাদন শুরু হয়েছে। আগেকার মানুষ সমুদ্রের পানি কাঠের চুলায় জ্বাল দিয়ে বা রোদে শুকিয়ে (সৌর পদ্ধতিতে) লবণ উৎপাদন করতো যা নিকট অতীত পর্যন্ত চালু ছিল।

২০০০-২০০১ মৌসুম হতে নতুন পদ্ধতিতে (পলিথিন পদ্ধতি) লবণ উৎপাদন শুরু হয়েছে। সনাতন পদ্ধতিতে একর প্রতি লবণের উৎপাদন ছিল ১৭.২৫ মেট্রিক টন এবং নতুন পদ্ধতিতে প্রতি একরে লবণ উৎপাদিত হয় প্রায় ২১ মেট্রিক টন। নতুন পদ্ধতিতে সনাতন পদ্ধতির তুলনায় ৩৫% অধিক ও আন্তর্জাতিক মানের লবণ উৎপাদিত হয়, যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব।

বিস্তারিত


সিগারেট শিল্প

১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন পরিচালিত এক জরিপকর্ম অনুসারে দেশে ১,৩৩০টি বিড়ি প্রস্ত্ততকারী কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠান ছিল। এই শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলির মোট স্থায়ী বিনিয়োগ ছিল ১৫.৩০৩ মিলিয়ন টাকা এবং এগুলি ৫,০৭৫ জন শ্রমিকের চাকরির সংস্থান করেছিল, যার মধ্যে ৩,৩১৬ জন ছিল শ্রমিক পরিবারের সদস্য এবং ১,৬৯৯ জন ছিল ভাড়া করা লোক। এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যবহূত কাঁচামালের মূল্য ৩৯.১৩৯ মিলিয়ন টাকা এবং কাঁচামালকে শিল্পে রূপান্তরের ব্যয় ৪৯.৪৮৩ মিলিয়ন টাকা।

বাংলাদেশের বিড়িশিল্পে রয়েছে এমন এক অনন্যতা যা স্থানীয় শিল্প-উদ্যোক্তাদের বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা এবং বিনিয়োগে অকপটতার পরিচয় দেয়; এই শিল্পে নিয়োজিত লোকেরা ব্যবস্থাপক বা শ্রমিক হিসেবে শ্রমদানের অভ্যাস, নিয়মানুবর্তিতা ও দেশীয় দক্ষতার জন্য স্বীকৃতি পেতে পারে।

এই শিল্পে সাফল্যের উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হলো ফকিরচাঁদ বিড়ি ফ্যাক্টরি, ভান্ডারি বিড়ি ফ্যাক্টরি, আবুল বিড়ি ফ্যাক্টরি এবং আকিজ বিড়ি ফ্যাক্টরি। উন্নতমানের বিড়ি তৈরিতে ব্যবহূত টেন্ডু পাতার আমদানি বন্ধের ফলে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে আজিজ বিড়ি ফ্যাক্টরির মালিক শেখ আজিজের স্বকীয় প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। কাগজে মোড়া বিড়ি চালু হওয়ার কারণে বিড়িশিল্পে যে পরিবর্তন ঘটেছে সে আলোকে তিনি স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণ দেন। আজিজ গ্রুপ ও শেখ আজিজের আদর্শ অনুসরণে আরও অনেকে তাদের বিড়ি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিকে সিগারেট উৎপাদনকারী কারখানায় রূপান্তর করে।

বিস্তারিত


বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ

বাংলাদেশের আইনসভার নাম জাতীয় সংসদ। এককক্ষবিশিষ্ট আমাদের জাতীয় সংসদের ইংরেজি নাম House of the Nation। জাতীয় সংসদের প্রতীক হচ্ছে শাপলা। ১৯৬২ সালে আইয়ুব খান জাতীয় সংসদ ভবনের ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন করেন। ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় সংসদ ভবন উদ্ভোধন করা হয় ১৯৮২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় মন্ত্রিসভার অভিভাবক হিসেবে কাজ করে জাতীয় সংসদ। এশিয়ার অন্যতম স্থাপত্য শৈলীয় এক অনবদ্য নিদর্শন আমাদের মহান জাতীয় সংসদ ভবন।

জাতীয় সংসদ ভবন

জাতীয় সংসদ ভবন  রাজধানী ঢাকার শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত। এ অসাধারণ স্থাপত্যের জন্য জাতি গর্বিত। পিরামিডের সময় থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ব্যাপ্ত স্থাপত্যসমূহের যদি একটি বাছাই তালিকা করা হয় তবে তাঁর মাঝেও বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন উপরের সারিতেই স্থান পাবে। বলা যায়, এটি আধুনিক যুগের স্থাপত্য রীতির সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন এবং এর মাধ্যমে সূচিত হয় আধুনিকোত্তর যুগের স্থাপত্য রীতির। এ অসাধারণ ভবনটি আমেরিকার স্থাপতি  লুই আই কান-এর সৃষ্টিশীল ও কাব্যিক প্রকাশের নিদর্শন।

১৯০১ সালে এস্তোনিয়ার এক ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণকারী লুই কান তাঁর পিতা-মাতার সাথে আমেরিকায় অভিবাসিত হন। পেনসিলভেনিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে স্থাপত্যে গ্রাজুয়েশন শেষ করে ফিলাডেলফিয়ায় তিনি তাঁর কর্ম জীবন শুরু করেন। একই সাথে তিনি ইউনিভার্সিটিতেও শিক্ষকতা করতেন। ফিলাডেলফিয়ার রিচার্ড মেডিক্যাল ল্যাবরেটরি নকশার মাধ্যমে তিনি প্রথম খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কর্মের মধ্যে ফিলিপস এক্সটার অ্যাকাডেমি লাইব্রেরি, ব্রায়েন ময়ার ডরমিটরি, ইয়েল আর্ট গ্যালারি, শালক্ ইনস্টিটিউট, কিম্বল আর্ট মিউজিয়াম, ভারতে আহমেদাবাদ ম্যানেজমেন্ট সেন্টার, নেপালে ফ্যামিলি প্লানিং সেন্টার ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তাঁর সবচেয়ে বড় ও সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্স। লুই আই কান-এর মৃত্যুর পর তাঁর সহকারী হেনরী উইলকট কমপ্লেক্সটির পরিবর্তিত নকশা সম্পাদন করেন। হেনরী এম. প্যামব্যাম এর কাঠামোটি ডিজাইন করেন। ভবনটি সৃষ্টিশীলতা ও কারিগরি মিশেলের এক  বিস্ময়।

১৯৫৯ সালে প্রথম ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্সটির পরিকল্পনা গৃহীত হয়। তৎকালীন সামরিক সরকার পাকিস্তানের প্রস্তাবিত দ্বিতীয় রাজধানী শেরে বাংলা নগরে পাকিস্তানের দ্বিতীয় সংসদ ভবন র্নিমাণের পরিকল্পনা থেকে বর্তমান সংসদ ভবনটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তখনকার খ্যাতনামা স্থাপতি লুই কান ভবন কমপ্লেক্সটির নকশা প্রণয়নের জন্য প্রাথমিক ভাবে নির্বাচিত হন। তাঁকে সরাসরি কাজে নিযুক্ত না করে ভবনের প্রাথমিক নকশা প্রদানের জন্য বলা হয় এবং ১৯৬২ সালের মার্চ মাসে তিনি আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পান। ১৯৬১ সালে বর্তমান মানিক মিয়া এভিনিউ-এর উত্তর পার্শ্বে ২০৮ একর জমি দ্বিতীয় রাজধানী প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা হয় এবং ১৯৬২ সালে মূল নকশা প্রস্ত্তত হয়। ১৯৬৪ সালে ১৫ মিলিয়ন ডলারের অনুমিত ব্যয় ধরে কমপ্লেক্সটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। সমস্ত সুবিধাদিসহ ৩২ মিলিয়ন ডলারের পরিবর্তিত ব্যয়ে কমপ্লেক্সটির নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯৮২ সালে। কমপ্লেক্সটির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে মূল সংসদ ভবন, সংসদ সদস্য, মিনিস্টার ও সেক্রেটারিদের হোস্টেল, অথিতি ভবন ও কমিউনিটি বিল্ডিং। রাস্তা, হাটার পথ, বাগান ও লেক দ্বারা এ সমস্ত কিছুই আকষর্ণীয় করে তোলা হয়েছে।

সুপ্রিম কোট, মসজিদ ও প্রেসিডেন্টের বাসভবনের ক্ষেত্রে মূল মাস্টারপ্ল্যানে পরিবর্তন সাধিত হয়। এ ভবনগুলি যতটা কম আকর্ষণীয় করা যায় সেদিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এগুলি প্রধান সংসদ ভবন এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্মিত ভবনগুলির মধ্যে প্রেসিডেন্টের বাসভবন (বর্তমানে গণভবন ও প্রধান মন্ত্রীর সরকারি বাসভবন) ছিল একটি। ১৯৬৪ সালে সংসদ ভবনের নকশা সম্পন্ন হয় এবং এর পরপরই  নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নির্মাণাধীন প্রধান অবকাঠামোটির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সরকার ভবনের মূল নকশায় কোনো রকম পরিবর্তন না এনে নির্মাণ সম্পন্ন করার কৃতিত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

জাতীয় সংসদ ভবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য এর বিশালত্বের মাঝে নিহিত। মার্বেল পাথর সংযুক্ত বিপুল কংক্রিটের বহির্দেয়ালের মাঝে মাঝে রয়েছে নিখুঁত জ্যামিতিক আকৃতির প্রবশদ্বার। বৃত্তাকার ও আয়তাকার কংক্রিটের সমাহার ভবনটিকে দিয়েছে এক বিশেষ স্থাপত্যিক সৌকর্য যা এর মহান উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভবনের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে হলো সংসদের প্রধান হল, যেখানে সংসদ সদস্যগণ পার্লামেন্টে বসেন। সমকেন্দ্রিক নকশার মূল হলরুমকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অংশগুলি গড়ে উঠেছে। ছাদ দিয়ে প্রবেশ করা আলোর মালা সাত তলা উঁচু গোলাকার মূল হলরুমটি এমনভাবে বেষ্টিত ঠিক যেন দেবীর মঞ্চকে ঘিরে উম্মুক্ত গোলাকার পথ। মূল ভবনের চারবাহু বরাবর চার কোণে অন্যান্য কাজের জন্য রয়েছে চারটি একই ধরনের অফিস ব্লক। যোগাযোগের জন্য রয়েছে বিভিন্ন প্রকার সিড়ির ব্যবস্থা। বর্গাকার নকশার হলেও এটি নিপুণ ভাবে অষ্টভুজের মধ্য স্থাপিত হয়েছে। নয়তলা বিশিষ্ট হলেও অনুভূমিক যোগাযোগ রয়েছে মাত্র তিনটি তলায়। মাটির উপরে কাঠামোটির উচ্চতা ৪৯.৬৮ মিটার।

মূল ভবন কমপ্লেক্সটির নয়টি স্বতন্ত্র বিভাগে বিভক্ত। এর মধ্য আটটি ৩৩.৫৩ মিটার এবং কেন্দ্রীয় অষ্টভুজাকার ব্লকটি ৪৭.২৪ মিটার উঁচু। কেন্দ্রীয় ব্লকটি ৩৫৪ আসন ধারণক্ষম অ্যাসেম্বলি কক্ষ নিয়ে গঠিত। সমগ্র কমপ্লেক্সটির আয়তন (floor area) হলো মূল ভবনে ৭৪,৪৫৯.২০ বর্গমিটার, দক্ষিণ প্লাজায় ২০,৭১৭.৩৮ বর্গমিটার এবং উত্তর প্লাজায় ৬,০৩৮.৭০ বর্গমিটার। দক্ষিণ প্লাজার মূল প্রবেশ পথটি একটি প্রশস্ত সিঁড়ির আকারে ধীরে ধীরে ৬.২৫ মিটার উচ্চতায় উঠে গেছে। এর বেসমেন্টে রয়েছে পার্কিং এলাকা, তত্ত্বাবধায়ক এজেন্সির অফিস ও মূল ভবনের সুবিধাদি প্রদানের জন্য স্থাপিত বিভিন্ন ব্যবস্থা। একটি কৃত্রিম লেক ভবনের চার পাশের প্রাচীর ঘিরে আছে এবং এটি উত্তর ও দক্ষিণ প্লাজাকেও সংযুক্ত করেছে। সমস্ত ভবনটাকে মনে হয় যেন পানির উপরে ভেসে উঠেছে। র্পালামেন্ট ভবনে প্রবেশের জন্য রয়েছে দক্ষিণের গ্র্যান্ড প্লাজা ও উত্তরে সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত বাগান ও ইউক্যালিপটাসের সারি শোভিত প্রেসিডেন্সিয়াল স্কয়ার। উত্তর প্রবেশ পথের দিকে রয়েছে একটি এ্যাম্পি থিয়েটার যেখানে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। উত্তর প্লাজা পেরিয়ে ক্রিসেন্ট লেকের পাশে রয়েছে একটি রাস্তা।

ভবনের কোথাও কোনো কলাম নেই। শূন্য স্থানের অংশ হিসেবে ফাঁপা কলাম রয়েছে ঠিকই কিন্তু তা শুধুই কাঠামো নকশায় ভারসাম্য রক্ষার্থে ব্যবহূত হয়েছে। এটি অনেকটাই বিশাল কংক্রিটকে খোদাই করে পরিণত করা হয়েছে একটি অসাধারণ কার্যকর ভাস্কর্যে। নির্মাণ মসলা হিসেবে কংক্রিট ব্যবহূত হয়েছে এবং ভেতরে ও বাইরের অংশে ব্যবহূত হয়েছে ঢালাই কংক্রিট। যে দক্ষতার সাথে আলোকে প্রয়োগ করা হয়েছে তাই হলো কান-এর নকশার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ছাদ দিয়ে প্রবেশকৃত আলো বিভিন্ন জায়গাকে যেভাবে আলোকিত করেছে তাতে মনে হয় আলোকচ্ছটা ঝরে পড়ছে স্বর্গ থেকে।

জাতীয় সংসদ ভবনের নকশায় সূর্যের আলো এবং বৃষ্টির প্রতিরোধকে বিবেচনা করা হয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে। অন্যদিকে বাতাসের বাধাহীন চলাচলকে সম্ভব করেছে বহিস্থ ফাসাদের বিশাল জ্যামিতিক ত্রিভুজ, আয়তক্ষেত্র, সম্পূর্ণ বৃত্ত ও বৃত্তাংশ এবং সমতল খিলানসমূহ। ভবন কাঠামোটি একটি অসাধারণ সৌধ হিসেবে দৃষ্টিগোচর হয়। এখানে বাইরের দিকে গতাণুগতিকভাবে জানালা স্থাপন পদ্ধতিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে এবং মূল দেওয়ালে ফাঁক সৃষ্টি করে বিশাল স্থাপত্যের অসুবিধাকে দূর করা হয়েছে। স্থাপত্যিক শৈলীতে ভবনটি ঢাকার আধুনিক ভবনসমূহ থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।

এ ভবনের প্রধান সমালোচনার বিষয় এর অত্যধিক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়। ৫৮,৩২৭.৫৯ বর্গমিটার (পার্লামেন্ট ভবন ৩.৪৪ একর; উত্তর প্লাজা ১.৪৬ একর; দক্ষিণ প্লাজা ৪.৯৮ একর এবং আবাসিক ভবন, হোস্টেল, বাগান, রাস্তা, লেক ইত্যাদি) এলাকার এ ভবন কমপ্লেক্সটির সর্বমোট নির্মাণ ব্যয় ১২৮ কোটি টাকা। ভবন কমপ্লেক্সে ৫০টি সোপান, ৩৪০টি শৌচাগার, ১৬৩৫টি দরজা, ৩৩৫টি জানালা, ৩০০টি পার্টিশন দেওয়াল, ৩,৩৩০.৫৭ বর্গমিটার কাঁচের শাটার, ৫,৪৩৪.৮৩ বর্গমিটার কাঠের শাটার, ৩,৭৩৮ ঘন মিটার কাঠের প্যানেল রয়েছে। ভবনের বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় সাড়ে ৫ কোটি টাকা। ভবনের সর্বোচ্চ তলাটি বা লেবেল ১০ ব্যবহার্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতির জন্য ব্যবহত হয়।

১৯৮২ সালের প্রথম দিকে ভবনটির কাজ সম্পন্ন হয় এবং একই বছর ২৮ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট জাস্টিস আব্দুস সাত্তার এটির উদ্বোধন করেন। ১৯৮২ সালের ১৫ ফের্রুয়ারি এ ভবনে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

পৃথিবীর প্রায় সকল স্থাপত্য বিষয়ক পত্র-পত্রিকায় বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন আলোচিত হয়েছে এবং এটি আগা খান স্থাপত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। পুরস্কার প্রদানের সময় প্রকাশিত সম্মাননা পত্রে বিধৃত উক্তি এ প্রকল্পের একটি প্রকৃষ্ট মূল্যায়ন করে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘অসাধারণ সামর্থতায় স্থাপত্যিক গুরুত্বসহ অবয়ব ও সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ এ ভবনটি জুরি র্বোড কর্তৃক প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এ বলে যে, এ গরিব দেশটির নিকট শেরে বাংলা নগরে স্থাপিত এর প্রয়োজন কতটুকু।

তারপরও ভবনটির নকশা এবং নির্মাণ পরিকল্পনা ... প্রকাশ করে যে কালক্রমে এটি ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েছে, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রতীক হয়ে এটি দাড়িয়ে আছে এবং বিভিন্ন কল্যাণকর উপায়ে দেশটিকে অনুপ্রেরণা যুগিয়ে চলেছে। স্থাপত্যকে ছাড়িয়েও ভবনটি এর বিভিন্ন পার্ক এবং জলাশয়ের মধ্য দিয়ে আশপাশের এলাকাকে সম্পৃক্ত করেছে ... স্থপতি ঢাকার স্থানীয় নির্মাণ শৈলীকে নতুন করে রূপদান করেছেন। এর ফল হলো এমন একটি ভবন যা নমুনা, সুষমা ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে সর্বজনীন হয়েও আর কোথাও এর বিকাশ সম্ভব ছিল না।

বিস্তারিত


জাতীয় সংসদ নির্বাচন

বাংলাদেশে এ যাবত দশটি সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯১, ১৯৯৬ (১৫ ফেব্রুয়ারি), ১৯৯৬ (১২ জুন), ২০০১, ২০০৮ এবং ২০১৪ সালে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

বিস্তারিত


জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও চীপ হুইপ

স্পীকার সংসদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। জাতীয় সংসদের বৈঠকে স্পীকার সভাপতিত্ব করেন। কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ-সদস্যদের মধ্য থেকে একজন স্পীকার ও একজন ডেপুটি স্পীকার নির্বাচন করা হয়।  স্পীকারের প্রধান দায়িত্ব সংসদে নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং এর  মর্যাদা সংরক্ষণ করা। স্পীকারকে নিরপেক্ষ হতে হয় এবং সংসদে সংখ্যালঘিষ্ঠ দলের সদস্যদের অধিকার সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করতে হয়। সংসদের অধিবেশন চলাকালে স্পীকারের সিদ্ধান্ত ও রুলিং অবশ্য পালনীয়। সংসদে শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে স্পীকার যেকোন সদস্যকে বহিষ্কার করতে পারেন। স্পীকার সংসদের কার্যপ্রণালী নিয়ন্ত্রণ করেন। সংসদ-সদস্যদের স্পীকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হয়। বাংলাদেশের সংবিধানে বর্ণিত আছে, রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতি বা তাঁর অসামর্থ্যের ক্ষেত্রে স্পীকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন (৫৪ অনুচ্ছেদ)। স্পীকারের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পীকার সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া সকল কাজে তিনি স্পীকারকে সহায়তা করে থাকেন। সংসদের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত প্রস্তাব দ্বারা স্পীকারকে তাঁর পদ থেকে অপসারণ করা  যায়। স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকারের পদ শূণ্য হলে সংসদ অধিবেশনরত থাকলে সাত দিনের মধ্যে কিংবা অধিবেশন না থাকলে পরবর্তী প্রথম বৈঠকে উক্ত পদ পূরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার তাঁদের উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যমত স্ব স্ব পদে বহাল রয়েছেন বলে গণ্য হন। সংসদ-সদস্যদের শপথ গ্রহণ এবং স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকার নির্বাচনের পরবর্তী পর্যায়ে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।

বিস্তারিত


জাতীয় সংসদ পরিচালনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্ব:

রাষ্ট্রপতি: জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহবান, মূলতবি, স্তগিত ও ভেঙ্গে দেয়ার এখতেয়ার রাখেন।

স্পিকার: জাতীয় সংসদ/আইনসভার সভাপতি। নিয়মিত ভাবে অধিবেশন বিল উন্থাপন ও আলোচনার সুযোগ করে দেয়া। প্রয়োজনে কাস্টিং ভোট প্রদান ক্ষমতা রয়েছে। সংসদীয় কার্য উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি।

ডেপুটি স্পিকার: স্পিকারকে অধিবেশন পরিচালনায় সহযোগিতা করা। স্পিকারের অনুপস্থিতিতে জাতীয় সংসদের সভাপতিত্ব করা।

সংসদীয় স্থায়ী লাইব্রেরি কমিটির সভাপতি।

হুইপ: জাতীয় সংসদের সর্বাত্মক বিধি অনুযায়ী শৃংখলা রক্ষা করা এবং দলীয় ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন রাখা।

প্রধানমন্ত্রী: জাতীয় সংসদের নেতা।

জাতীয় সংসদের নেতা/বিরোধী দলীয় নেতা


জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটি

সংসদীয় কমিটি  আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত প্রস্তাব মূল্যায়ন এবং সরকারের নির্বাহী বিভাগের কর্মকান্ড সমীক্ষার উদ্দেশ্যে সংসদ-সদস্যদের নিয়ে গঠিত কমিটি। পৃথিবীর অধিকাংশ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়ই এ ধরনের সংসদীয় কমিটি রয়েছে। এ কমিটিগুলো  জাতীয় সংসদ সদস্যদের কার্যত কর্মব্যস্ত রাখে; নিজেদের তারা সংসদের কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন এবং নীতি প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ব্যাপারেও তারা সজাগ থাকেন।

বাংলাদেশের সংবিধানে সংসদীয় কমিটি গঠনের বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদকে সরকারি অর্থ কমিটি এবং বিশেষ অধিকার কমিটিসহ বেশ কিছু সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। এসব কমিটির কাজ হচ্ছে আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত প্রস্তাব পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিল বিবেচনা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সম্পর্কে তদন্ত পরিচালনা এবং সঠিকভাবে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের বিষয় পর্যালোচনা করা। সংসদ কর্তৃক প্রণীত কার্যপ্রণালী বিধিমালা দ্বারাই এসব কমিটির প্রায়োগিক দায়দায়িত্ব, সামগ্রিক কর্মতৎপরতা এবং কার্যপরিধি নির্দেশিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। এসব কমিটির আওতায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উপ-কমিটি গঠনেরও বিধান রয়েছে। সংসদে স্থায়ী কমিটিগুলো হলো মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটি, অর্থ ও হিসাব নিরীক্ষা কমিটি এবং অপরাপর স্থায়ী ধরনের কমিটি। তবে বাছাই কমিটি ও বিশেষ বিষয় সম্পর্কিত কমিটিগুলো এদের থেকে আলাদা।

স্থায়ী কমিটির সদস্যগণ সংসদ কর্তৃক নিযুক্ত হতে পারেন অথবা স্বয়ং স্পিকার তাদের মনোনয়ন দিতে পারেন। অর্থবিষয়ক কমিটি এবং বিশেষ অধিকার কমিটি, সরকারি আশ্বাস সংক্রান্ত কমিটি, কার্যপ্রণালী বিধিমালা কমিটি ও বেসরকারি সদস্য বিল সংক্রান্ত কমিটিসহ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত বিভিন্ন কমিটির সদস্যদের সংসদ নিয়োগ দিয়ে থাকে। অন্যদিকে পিটিশন ও লাইব্রেরি সম্পর্কিত কমিটিসহ হাউজ কমিটি ও কার্য উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা স্পিকার কর্তৃক মনোনীত হন। কমিটিগুলির বৈঠক, তাদের আলোচনা ও শুনানি কার্যক্রম পৃথকভাবে অনুষ্ঠিত হয়। সাংবিধানিকভাবেই সংসদ ইচ্ছা করলে আইন করে কোন সংসদীয় কমিটি বা কমিটিসমূহের উপর এমন ক্ষমতা ন্যস্ত করতে পারে, যে ক্ষমতাবলে সে কমিটি বা কমিটিসমূহ নির্দিষ্ট কোন ঘটনা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় প্রমাণাদি হাজির করতে বা সাক্ষীদের সশরীরে উপস্থিত হতে বাধ্য করতে পারে। সংসদীয় কমিটিগুলোর বৈঠকের কোরাম গঠনের জন্য কমিটির এক-তৃতীয়াংশ সদস্যের উপস্থিতি প্রয়োজন। বৈঠকের আলোচ্যসূচির উপর কমিটির উপস্থিত অধিকাংশ সদস্যই সাধারণত বক্তব্য রাখেন। বৈঠকে কোনো বিষয় নিয়ে ভোটাভুটির ক্ষেত্রে পক্ষ ও বিপক্ষের ভোট সমান হলে বৈঠকের সভাপতি যেকোন পক্ষে তার কাস্টিং ভোট প্রদান করতে পারেন। কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাদের প্রতিবেদন তৈরি করে এবং অধিবেশন চলাকালে সংসদে তা উপস্থাপন করে।

স্থায়ী কমিটিগুলো দৈনন্দিন সংসদীয় কার্যক্রমসহ সংসদ-সদস্যদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা, নির্বাহী সরকারের অর্থ পরিচালন নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকান্ড পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সুনির্দিষ্ট কোন বিষয় বা ঘটনার উপর নিরীক্ষা চালানোর মতো বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। অন্যদিকে কেবলমাত্র প্রস্তাবিত বিলসমূহের উপর কাজ করার জন্যই এডহক ভিত্তিতে বাছাই কমিটি নিয়োগ করা হয়। নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে সেগুলোর উপর রিপোর্ট প্রদানের জন্যই অস্থায়ী ভিত্তিতে বিশেষ কমিটিগুলো গঠন করা হয়। মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলো নির্বাহী সরকারের বিভিন্ন কর্মকান্ড পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকে। এছাড়া অধিবেশন চলাকালে বিভিন্ন সময়ে সংসদ যেসব বিল বা বিষয় তাদের বরাবরে পাঠায়, তারা সেগুলোও পর্যালোচনা করে। প্রশাসনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য প্রতিমাসে এই কমিটিগুলোর অন্তত একবার বৈঠকে মিলিত হওয়ার কথা।

অর্থ ও হিসাব নিরীক্ষা কমিটি সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনার উপর নজরদারির দায়িত্ব পালনের জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত। এভাবেই একজন সংসদ-সদস্যের সভাপতিত্বে সরকারি হিসাব কমিটি সরকারের বিভিন্ন সংস্থার বার্ষিক হিসাবপত্রের উপর নিরীক্ষাকার্য সম্পাদন করে। অনুরূপভাবে সরকারের এসব সংস্থার আর্থিক ব্যয় ব্যবস্থাপনা যথাযথ কর্তৃপক্ষের দেওয়া অনুমোদন অনুযায়ী সঠিকভাবে পরিচালিত হয়েছে কিনা বা কোথাও কোনো অনিয়ম হয়েছে কিনা তাও এ কমিটি নির্দেশ করে। তাছাড়া এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুপারিশ এবং প্রতিকারের ব্যবস্থাও কমিটির পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয়। ব্যয় প্রাক্কলন কমিটি সারা বছর ধরে সরকারের বার্ষিক ব্যয়ের হিসাব পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সরকার পরিচালনায় আর্থিক ব্যয় সংকোচন ও দক্ষতার বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাবপত্র এবং রিপোর্ট সরকারি অঙ্গীকার সংক্রান্ত কমিটি কর্তৃক পর্যালোচিত হয়। এ পর্যালোচনায় কমিটি সরকারি দপ্তরসমূহের হিসাবপত্র এবং সরকারের প্রচলিত নীতিমালার মধ্যকার ব্যবধানের চিত্রটি তুলে ধরে। অন্যান্য স্থায়ী কমিটি যেসব বিষয়ের সঙ্গে জড়িত, তার মধ্যে রয়েছে সংসদ-সদস্যদের অধিকার ও রেয়াতের বিষয়, আর্জিতে প্রদত্ত সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, সরকারি বিল উপস্থাপনে সময় বরাদ্দের বিষয়, বেসরকারি সদস্য বিল, সংসদ ভবনের অভ্যন্তরে কর্মকান্ড পরিচালনার নিয়মকানুন ও রীতিনীতি, পাঠাগার সুবিধার সম্প্রসারণ এবং সংসদ-সদস্যদের জন্য আবাসিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা।

সংসদীয় কমিটি ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চালানো হয়। স্থায়ী কমিটি বৈঠকে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে নিজেদের সম্পাদিত কর্মকান্ডের ব্যাখ্যা প্রদান এবং ক্ষেত্রবিশেষে সংশ্লিষ্ট কমিটির সামনে প্রয়োজনীয় তথ্য পেশ করে থাকেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে প্রশাসনের কর্মকান্ডের উপর নিরীক্ষা চালাতে গিয়ে জনপ্রতিনিধিগণ রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব চিত্র সম্পর্কে নিজেদের ওয়াকেবহাল রাখার সুযোগ পান। হিসাব ও সরকারি ব্যয়ের বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে গিয়ে আর্থিক কমিটিগুলো সরকারের আর্থিক ক্ষমতা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে কিনা তা নিরূপণ করে। একই সঙ্গে অনুমোদিত রীতিনীতি অনুযায়ী সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছে কিনা তাও যাচাই করে।

জাতীয় সংসদ বরাবরই এর কমিটি কাঠামো বিন্যাস করে আসছে। প্রথম সংসদের অধীনে ১৪টি কমিটি গঠিত হয়েছিল। দ্বিতীয় সংসদে কমিটির সংখ্যা ছিল ৫১, স্বল্প মেয়াদী তৃতীয় সংসদে ৬ এবং চতুর্থ সংসদে ৪৮ টি। সময়ের পরিবর্তন ও রাষ্ট্রীয় কার্যপরিধি বৃদ্ধির কারণে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সংখ্যা পঞ্চম সংসদের অধীনে ৫৩ এবং সপ্তম সংসদে ৪৮-এ দাঁড়ায়। একই সঙ্গে উপ-কমিটির সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। সপ্তম সংসদ গঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর প্রধান ছিলেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রিগণ। সপ্তম সংসদের পঞ্চম অধিবেশনেই কার্যপ্রণালী বিধিতে একটি সংশোধনী গৃহীত হয়। এ সংশোধনী অনুযায়ী স্থায়ী কমিটির সবগুলোতেই মন্ত্রীদের পরিবর্তে সংসদ-সদস্যদের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। নির্বাহী বিভাগের কাছ থেকে কার্যকরভাবে জবাবদিহিতা আদায়ে কমিটিগুলোকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যেই এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অষ্টম সংসদে স্ট্যান্ডিং কমিটির সংখ্যা ছিল ৪৮ এবং ২০০৬ সালের জুলাই পর্যন্ত এ সংসদে ১৩১ টি উপ-কমিটি গঠন করে। এসব কমিটি ও উপ-কমিটি অক্টোবর ২০০১ থেকে জুলাই ২০০৬ পর্যন্ত সময়ে যথাক্রমে ১১৫৭ এবং ৪২১ টি সভায় মিলিত হয়। উক্ত সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রনালয় সম্পর্কিত কমিটি ১২ টি প্রতিবেদন পেশ করে। ২৫ জানুয়ারি ২০০৯ তারিখে নবম জাতীয় সংসদ প্রতিষ্ঠার পর সংসদে দলীয় প্রতিনিধিত্বের অনুপাতে সংসদের সমন্বয়ে ৪৮ টি কমিটি গঠন করা হয় এবং এসব কমিটির  দুটির প্রধান হিসেবে বিরোধী দলীয় সাংসদ রয়েছেন।

অবশ্য, বাংলাদেশের সংসদীয় কমিটিগুলো এখন পর্যন্ত বিল পরীক্ষন, নির্বাহীর কার্যক্রমের তদারকী এবং সরকারের আচরণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের দক্ষ হাতিয়ার হিসেবে গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি প্রধান সমস্যা দৃশ্যমান হয়েছে, যেমন, অনিয়মিত কমিটি সভা, অপর্যাপ্ত উপস্থিত, সংসদের কার্যপ্রনালী বিধির সুষ্ঠু প্রয়োগের অভাব, কমিটি সদস্যদের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি, বিচার বিভাগীয় বিষয়ে নির্বাহী নিয়ন্ত্রন, কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নির্বাহীদের অনীহা, লজিস্টিক সহায়তার স্বল্পতা, ইত্যাদি। সংসদীয় কমিটিগুলোর অর্থপূর্ণ কর্মকান্ড নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় দক্ষতা নির্মান, কমিটি কাঠামোতে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা এবং কমিটি প্রক্রিয়ায় জনমত ও সিভিল সমাজের সংশ্লিষ্টতা বিশেষভাবে জরুরী।

বিস্তারিত


বাংলাদেশের গণভোট

বাংলাদেশে তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। দু’বার অনুষ্ঠিত হয় প্রশাসনিক গণভোট এবং একবার অনুষ্ঠিত হয় সাংবিধানিক গণভোট।


উপজেলা নির্বাচন

উপজেলার আওতাধীন ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার (যদি থাকে) চেয়ারম্যানগণ উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে থাকেন।ইউনিয়ন/পৌরসভার মোট সদস্যসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ মহিলা আসনের জন্য বরাদ্দ থাকে এবং ইউনিয়ন/পৌরসভার মহিলা সদস্যগণ নিজেদের মধ্য থেকে এই সদস্য নির্বাচন করেন।


বাংলাদেশের ভোটার তালিকা

ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯  বিদ্যমান তথ্য অনুযায়ী ভোটার তালিকা অধ্যাদেশ ১৯৮২ সালে জারী করা হয় (১৯৮২ সালের ৬১ নং অধ্যাদেশ)। এই অধ্যাদেশের ভিত্তিতে ২০০৬ সালের সংসদীয় নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্ত্তত করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ৯,০১,৩০,০০০। ২০০১ সালের এ তালিকায় মোট ভোটার সংখ্যা ৭,০৪,৬০,০০০ ছিল। এ ধরনের বিপুল ব্যবধান জনসংখ্যা হার বৃদ্ধির সাথে মোটেও সংগতিপূর্ণ ছিল না। সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হার ছিল ১.৪৬ শতাংশ। মিডিয়া ও নাগরিক সমাজ এ কারণে ২০০৬ সালে প্রণীত ভোটার তালিকাকে অবিশ্বাস্য মর্মে আখ্যায়িত করে।

এর ফলে কম্পিউটারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও বছরওয়ারী এ তালিকা হালনাগাদ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। তালিকাভুক্ত প্রতি ভোটারের ছবিও সংরক্ষণ করার প্রস্তাব আসে। এ লক্ষ্যে ছবিসহ ভোটার শনাক্তকরণ কার্ডের প্রথা চালু করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এ প্রসংগে সরকার একটি অধ্যাদেশ (অধ্যাদেশ নং ১৮, ২০০৭) জারী করে। পুনর্গঠিত নির্বাচন কমিশন কম্পিউটারে ধারণকৃত ছবিসহ তথ্যভিত্তিক ভোটার তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু করে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এ অধ্যাদেশটি রহিত করে সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করে। মুখবন্ধে বিদ্যমান ভোটার তালিকা আইন সংশোধন ও আধুনিকীকরণের আইন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ২০০৯ সালের ২৪ জানুয়ারি এ আইন জনসাধারণের অবগতির জন্য গেজেটে প্রকাশিত হয় (আইন ৬, ২০০৯)।

২০০৭ সালের ভোটার তালিকা আইন রহিত করা ছাড়াও ১৯৮২ সালের অনুরূপ অধ্যাদেশ রহিত করা হয়। তবে উক্ত আইনদ্বয়ের অধীনে কৃত কার্যাবলিকে বৈধ ঘোষণা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল উদ্ভূত কোনো আইনি জটিলতা এড়ানো।

আইনটি কারিগরী বান্ধব ভোটার তালিকা প্রণয়ন, কম্পিউটারের মাধ্যমে ভোটার নিবন্ধন প্রক্রি্য়া এবং ভবিষ্যতে তা হালনাগাদ করার অধিকার কমিশনকে প্রদান করে। ইতিপূর্বে ভোটার তালিকা হালনাগাদের বিধান ছিল নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্ধারিত তারিখের মধ্যবর্তী সময়ে ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা। নতুন আইনে এ প্রথার আমূল পরিবর্তন হয়। বিদ্যমান আইনের বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত পদ্ধতিতে বছরের যেকোন সময় তালিকা হালনাগাদ করা যায়।

আইনটির অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো কম্পিউটারে ধারণকৃত তালিকার বিষয়াবলি প্রতি বছর জানুয়ারি ২ তারিখ থেকে ৩১ তারিখ পর্যন্ত সংশোধন করা যাবে। এ প্রক্রি্য়ায়  আইনে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুযায়ী যোগ্য ভোটারকে তালিকায় অন্তর্ভূক্ত এবং অযোগ্য ভোটারের নাম বিয়োজন করা যায়। ভোটারদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার মাপকাঠি আইনে নির্দিষ্ট করে বলা আছে। আইনের বিধানে আরও রয়েছে যেকোন ভোটারের সাধারণ বসতবাড়ি সংক্রা্ন্ত ঠিকানার রদবদলের তথ্য হালনাগাদ করা।

ভোটার তালিকার বৈধতার বিষয়েও আইনে বিধান রয়েছে। এক, ভোটার তালিকা নির্ধারিত পদ্ধতিতে হালনাগাদ না করা হলে তালিকার বৈধ্যতা বা ধারাবাহিকতা ক্ষুন্ন হবে না। দুই, তালিকার বৈধতার বিষয়ে আরও বলা হয় যে, তালিকায় ভুল ত্রুটি বা অযোগ্য ভোটারের অন্তর্ভুক্তি সত্ত্বেও এর বৈধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রে আইনটি কমিশনের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে যেকোন সংস্থা থেকে কমিশন বাধ্যতামূলকভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। কমিশন আইনের অধীনে বিধান প্রণয়ন করবে এবং তালিকার বৈধতা সম্পর্কে আদালতে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না। অন্যান্য বিধানের মধ্যে রয়েছে মিথ্যা তথ্য প্রদান এবং তালিকা প্রণয়নে বাধা সৃষ্টির জন্য শাস্তি। এ ছাড়া একটি বিশেষ বিধানও আইনে বিদ্যমান। কোনো অনিবার্য কারণে কোনো নির্বাচনী এলাকায় বা ক্ষেত্রমত ভোটার এলাকায় তালিকা প্রস্তুতকার্য সম্পন্ন করা সম্ভব না হলে, কমিশন গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা ঐ নির্বাচনী বা ভোটার এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থায় ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

বিস্তারিত


বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ- সাধারণ তথ্য

জাতীয় সংসদ  গণপ্রজাতন্ত্রী  বাংলাদেশের এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা। দেশের সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে আইন প্রণয়ন ক্ষমতা এ সংসদের ওপর ন্যস্ত। প্রতি নির্বাচনী এলাকা থেকে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ৩০০ সদস্য সমন্বয়ে জাতীয় সংসদ গঠিত।

জাতীয় সংসদের মেয়াদ ৫ বছর। এ মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর স্বাভাবিক নিয়মে সংসদ বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু সংসদের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে রাষ্ট্রপতি বিশেষ পরিস্থিতিতে যে কোনো সময় সংসদ ভেঙে দিতে পারেন। দেশে যুদ্ধ দেখা দিলে সংসদের মেয়াদ অনধিক এক বছর বর্ধিত করা যেতে পারে। তবে যুদ্ধ সমাপ্ত হলে এ বর্ধিত মেয়াদ ছয় মাসের বেশি হতে পারে না। যুদ্ধাবস্থায় কিংবা সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্বে জরুরি প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি পুনরায় সংসদের অধিবেশন আহবান করতে পারেন। তবে রাষ্ট্রপতির এ সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে হতে হবে।

সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ ৩০০টি একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকায় বিভক্ত। জাতীয় সংসদের ৩০০ জন সদস্যের প্রত্যেকে এক একটি নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী যে কোনো নির্বাচনী এলাকা থেকে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে মহিলাদের জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিধান রয়েছে।

১৯৭২ সালে প্রণীত আদি সংবিধানে জাতীয় সংসদে মহিলাদের জন্য অতিরিক্ত ১৫ টি আসন ১০ বছর মেয়াদে সংরক্ষিত ছিল। ৩০০ সাধারণ আসনে নির্বাচিত সদস্যদের দ্বারা সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্যগণ নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা বাড়িয়ে ৩০ জন এবং  সংরক্ষণের সময়সীমা ১৫ বছর করা হয়। এ সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পর ১৯৮৮ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদে মহিলাদের জন্য কোনো সংরক্ষিত আসন ছিল না।

১৯৯০ সালে সংবিধানের দশম সংশোধনীর মাধ্যমে মহিলাদের জন্য  পরবর্তী ১০ বছর মেয়াদে ৩০টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়। মহিলাদের এই  সংরক্ষিত  আসনের মেয়াদ ২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হয়। এরপর ২০০৪ সালের ১৭ মে গৃহীত সংবিধান (চতুর্দশ সংশোধন) আইন ২০০৪ অনুযায়ী সংসদে মহিলা সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত আসনের মেয়াদ বৃদ্ধি করে এ সংখ্যা ৪৫-এ উন্নীত করা হয়। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে (২০১১) মহিলা আসন সংখ্যা ৫০ করা হয়। তবে সাধারণ আসনেও মহিলাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিধান প্রচলিত আছে।

বিস্তারিত


বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থা

বাংলাদেশ সরকার (ইংরেজি: Government of Bangladesh) বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক পরিচালিত হয়, যিনি অন্যান্য সকল মন্ত্রীগণকে বাছাই করেন। প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য প্রধান উচ্চপদস্থ মন্ত্রীগণ সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণ কমিটির সদস্যপদ লাভ করেন, যা মন্ত্রীসভা নামে পরিচিত।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হলেন শেখ হাসিনা, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী, যিনি ২৯শে ডিসেম্বর ২০০৮ এর সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ের ফলাফলস্বরূপ ২০০৯-এর ৬ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার দ্বারা পরিচালিত হয় এবং এবং এর ১৪ দলীয় মহাজোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্য পদলাভের মাধ্যমে বিজয় লাভ করে এবং সাংখ্যিকভাবে ২৯৯ টি আসনের মাঝে ২৩০ টি আসন এই দলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

১৯৭১ এ অস্থায়ী সরকার গঠন এবং অস্থায়ী সংবিধান প্রণয়নের পর থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থা কমপক্ষে পাঁচবার পরিবর্তিত হয়েছ। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ব্যবস্থা সংসদীয় পদ্ধতির। এই পদ্ধতিতে প্রধানমন্ত্রীর হাতে সরকারের প্রধান ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে। বহুদলীয় গণতন্ত্র পদ্ধতিতে এখানে জনগণের সরাসরি ভোটে জাতীয় সংসদের সদস্যরা নির্বাচিত হন। নির্বাহী (executive) ক্ষমতা সরকারের হাতে ন্যস্ত। আইন প্রণয়ন করা হয় জাতীয় সংসদে। বাংলাদেশের সংবিধান ১৯৭২ সালে প্রণীত হয়, এবং এখন পর্যন্ত এতে ১৬টি সংশোধনী যোগ করা।

রাষ্ট্রপতি-রাষ্ট্রপ্রধান

সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি হচ্ছে রাষ্ট্রপ্রধান। দেশের যাবতীয় কাজ তার নামেই সম্পাদিত হয়। বাংলাদেশে এ যাবৎ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন ১৭ জন। এই ১৭ জনের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ২ বার, বিচারপতি আব্দুস সাত্তার ও বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ ২ বার, মো: আব্দুল হামিদ ২ বার করে। একাধারে দীর্ঘসময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এই ১৭ জন ব্যক্তিত্ব মোট ২১ বার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। এদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান, প্রথম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রথম সাংবিধানিক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী)


প্রধানমন্ত্রী-প্রজাতন্ত্রের প্রধান নির্বাহী

সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রী সংসদের মধ্যমনি; সংসদ নেতা। বাংলাদেশে এ যাবৎ সর্বমোট ১০ জন ব্যক্তিত্ব ১৪ বার প্রধানমন্ত্রিীর পদ অলংকৃত করেন। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমেদ। ৩টি সংসদের প্রধানমন্ত্রীল দায়িত্ব পালন করেন বেগম খালেদা জিয়া। বর্তমান ১৪ তম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী পদাধিকারবলে যেক্ষেত্রে প্রধান

১. জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ নির্বাহী কমিটি

২. জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ

৩. জাতীয় প্রশাসন পুনর্গঠন/সংস্কার/বাস্তবায়ন কমিটি

৪. বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ গভর্নিং বোর্ড

৫. বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ড

৬. জাতীয় পরিবেশ কমিটি

৭. রপ্তানি সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি

৮. জাতীয় পর্যটন পরিষদ

৯. জাতীয় মহিলা ও শিশু উন্নয়ন পরিষদ

১০. জাতীয় পল্লী উন্নয়ন কাউন্সিল

১১. জাতীয় শিল্প উন্নয়ন পরিষদ

১২. জাতীয় ভূমি ব্যবহার কমিটি

 


নির্বাচন কমিশন

নির্বাচন কমিশন  একটি স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা। জাতীয় ও স্থানীয় সরকার পর্যায়ের সকল নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা, নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ, ভোটার তালিকা তৈরি, ভোটগ্রহণ তত্ত্বাবধান, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা এবং নির্বাচনী অভিযোগ-মোকদ্দমা মীমাংসার লক্ষ্যে নির্বাচনী ট্রাইবুনাল গঠন করা নির্বাচন কমিশনের কাজ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের সপ্তম ভাগে নির্বাচন কমিশনের গঠন-কাঠামো, ক্ষমতা ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা আছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৮ এর আওতায় বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন স্থাপনের বিধান প্রণীত হয়েছে এবং এতে বলা হয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে এবং রাষ্ট্রপতি সময়ে সময়ে যেরূপ নির্দেশ করবেন সেরূপ সংখ্যক অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারগনকে নিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন থাকবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানবলি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগদান করবেন। একাধিক নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠিত হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এর সভাপতি রূপে কাজ করবেন। সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে কোনো নির্বাচন কমিশনারের পদের মেয়াদ তাঁর কার্যভার গ্রহনের তারিখ হতে পাঁচ বছর কাল হবে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এমন কোনো ব্যক্তি প্রজাতন্ত্রের কাজে নিয়োগলাভের যোগ্য হবেন না। অন্য কোনো নির্বাচন কমিশনার অনুরূপ পদে কর্মাবসানের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার রূপে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন, তবে অন্য কোনোভাবে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না।  বর্তমানে নির্বাচন কমিশন প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ তিন সদস্য সমন্বয়ে গঠিত।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৮(৪), অনুচ্ছেদ ১২৬ এবং গনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এর অনুচ্ছেদ  ৪ এ নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা এবং দায়িত্ব বর্ণিত হয়েছে। সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ বলে নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবে এবং কেবল সংবিধান ও আইনের অধীন হবে।  নির্বাচন কমিশনের উপর অর্পিত দায়িত্ব ও কতর্ব্য পালনে প্রয়োজনে কমিশন এর সভাপতিকে বা এর যেকোন সদস্যকে বা এর কোনো কর্মচারীকে আইনের অধীনে থেকে কমিশনের পক্ষে ক্ষমতা অনুশীলনের অনুমতি প্রদান করতে পারবে। অনুচ্ছেদ  ১২৬ এবং গনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এর অনুচ্ছেদ  ৪ ও ৫ এর ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য। নির্বাচন কমিশনের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালনের জন্য যেরূপ কর্মচারী প্রয়োজন হবে, নির্বাচনের কাজে সহায়তার লক্ষ্যে সেরূপ কর্মচারী নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।

স্বাধীন সংস্থা হিসেবে নির্বাচন কমিশন প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি, সংসদ ও স্থানীয় সরকার পর্যায়ে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করতে সাংবিধানিকভাবে শপথের দ্বারা দায়বদ্ধ।

নির্বাচন কমিশন সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সর্ম্পক ও যোগাযোগ রক্ষা করে। নির্বাচনী তফসিল, নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও নির্বাচনের সামগ্রিক আয়োজনের ব্যাপারে সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভোটার নিবন্ধন, ভোটার তালিকা তৈরি ও হালনাগাদ করা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়েও নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে নির্বাচন কমিশন আলাপ আলোচনা করে।

বিস্তারিত


বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনকে(Bangladesh Public Service Commission) সংক্ষেপে বিপিএসসি (BPSC) বলা হয়ে থাকে।


স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)

সময়ের অধিক আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হচ্ছে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন। ১২ মে ২০০৩ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের পরিকল্পনা নেয়া হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ সালে জাতীয় সংসদে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন পাশ হয়। এই আইন দুর্নীতি দমন ব্যুরো বিলুপ্ত করে ২১ নভেম্বর ২০০৪ সালে গঠিত হয় স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।


জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন

জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন (Judicial Service Commission) হচ্ছে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ন্যায় একটি স্বাধীন, স্বতন্ত্র ও সাংবিধানিক সংস্থা। এই সংস্থা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা কবচের প্রথম পদক্ষেপ। রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মধ্য দিয়ে ১০ মে ২০০৭ এই কমিশন গঠিত হলেও ১ জুলাই ২০০৭ কার্যকর হয়।

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশন

সর্বশেষ পঞ্চম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গঠিত হয় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশন। ১৬ মার্চ ২০০৮ সালে উপদেষ্টা পরিষদ এক অধ্যাদেশ জারী করে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশন গঠন করেন।

* এই কমিশনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করার লক্ষ্যে ও কমিশন গঠিত হয়।

* এই কমিশনের প্রধান দায়িত্ব: সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নিকট নাম প্রস্তাব করা।

* সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশনের সদস্য: ৯ জন।


মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক

মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক  রাষ্ট্রীয় তহবিলের ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনায় সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত ও রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগকৃত শীর্ষ নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক। বাংলাদেশের সংবিধানের ১২৭(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ১৯৭৩ সালের ১১ মে প্রথম মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক পদে নিয়োগ দেয়া হয়।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর পাকিস্তানের মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের অধীনস্থ ‘অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল, পূর্ব পাকিস্তান’ পদকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বিভাগের একটি আদেশ দ্বারা ‘অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল, বাংলাদেশ’ পদে রূপান্তর করা হয়।

সংবিধানের ১২৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশের মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সংক্ষেপে মহা হিসাবনিরীক্ষক) পদের চাকুরির বয়সসীমা ৬০ (ষাট) বছর। সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারক যেরূপ পদ্ধতি ও কারণে অপসারিত হতে পারেন, সেরূপ পদ্ধতি ও কারণ ব্যতীত তাকে অপসারণ করা যায় না। রাষ্ট্রপতি বরাবরে পদত্যাগপত্র পেশ করে তিনি পদত্যাগ করতে পারেন। তবে কর্মের মেয়াদ পূর্তি, পদত্যাগ বা অপসারণজনিত যেকোন কারণে কর্মাবসানের পর প্রজাতন্ত্রের অন্য কোনো পদে তিনি নিযুক্ত হতে পারেন না।

কোনো সময়ে মহা হিসাবনিরীক্ষকের পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অক্ষম, রাষ্ট্রপতির নিকট সন্তোষজনকভাবে এরূপ প্রতীয়মান হলে সংবিধানের ১২৭ অনুচ্ছেদের অধীনে নতুন কোনো নিয়োগদান না করা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১৩০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অন্য কোনো ব্যক্তিকে অস্থায়ী মহা হিসাবনিরীক্ষক পদে নিয়োগ দান করতে পারেন। সাংবিধানিক পদধারী হিসেবে মহা হিসাবনিরীক্ষকের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধাদি মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (পারিশ্রমিক ও বিশেষ অধিকার) অধ্যাদেশ ১৯৭৬-এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২৭(২) অনুযায়ী এবং সংসদ কর্তৃক প্রণীত যেকোন আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে মহা হিসাবনিরীক্ষকের কর্মের শর্তাবলি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্ধারিত হয়। অধিকন্তু মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (অতিরিক্ত কর্ম) আইন ১৯৭৪ এবং একই সঙ্গে মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (অতিরিক্ত কর্ম) সংশোধনী আইন ১৯৭৫-এর মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবরক্ষণ ও যাবতীয় নিরীক্ষাকার্য পরিচালনাসহ সকল বিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের হিসাব নিরীক্ষাকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে মহা হিসাবনিরীক্ষকের কার্যাবলি, দায়িত্ব ও ক্ষমতা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছে।

মহা হিসাবনিরীক্ষক তার অধীনস্থ বাংলাদেশ অডিট ডিপার্টমেন্টের মোট ৯টি পৃথক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ অডিট অধিদপ্তরের মাধ্যমে হিসাব নিরীক্ষাকার্য সম্পন্ন করেন। এসব অধিদপ্তর হলো: বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর; স্থানীয় ও রাজস্ব অডিট অধিদপ্তর; পূর্ত অডিট অধিদপ্তর; প্রতিরক্ষা অডিট অধিদপ্তর; রেলওয়ে অডিট অধিদপ্তর; ডাক, তার ও টেলিফোন অডিট অধিদপ্তর; বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তর; দূতাবাস অডিট অধিদপ্তর এবং সিভিল অডিট অধিদপ্তর। প্রজাতন্ত্রের হিসাবরক্ষণ সম্পর্কিত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান হিসাবরক্ষণ কাঠামো মহা হিসাবনিরীক্ষকের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় পরিচালিত হয়। এগুলি হলো মহা হিসাবরক্ষক, বেসামরিক হিসাবরক্ষণ তথা প্রজাতন্ত্রের হিসাবরক্ষণে মূল সমন্বয়ক হিসাব; কন্ট্রোলার জেনারেল, ডিফেন্স ফাইন্যান্স বা প্রতিরক্ষা বিভাগের হিসাবরক্ষণ এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অর্থ), বাংলাদেশ রেলপথ বিভাগের হিসাবরক্ষণ।

সংবিধানের ১৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের হিসাব সম্পর্কিত মহা হিসাবনিরীক্ষকের বার্ষিক রিপোর্টসমূহ যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির নিকট দাখিল করার পর রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করেন। সংবিধানের ১২৮(৪) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে নিরীক্ষা ও হিসাব সম্পর্কিত কার্য পরিচালনায় মহা হিসাবনিরীক্ষকের কর্মের স্বাধীনতা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে। তবে প্রশাসনিক বিষয়াবলি, যেমন বাজেট বরাদ্দ প্রাপ্তি ও কর্মী ব্যবস্থাপনায় তিনি সরকারের নির্বাহী বিভাগ তথা প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় হিসাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের উপর নির্ভরশীল।

বিস্তারিত


কর ন্যায়পাল

রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সর্বাত্মক স্বচ্ছতা আনয়ন, কর আদায়ে নিয়োজিত ব্যক্তিদের দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং এতদসংক্রান্ত ব্যাপারে জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে কর ন্যায়পাল পদ সৃষ্টি করা হয়।


ন্যায়পাল

বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৭৭ নং অনুচ্ছেদে তিনটি ধারায় ন্যায়পাল পদ সৃষ্টির বিধান রয়েছে। ১৯৮০ সালে সাংবিধানিক বিধিবদ্ধতায় ‘ন্যায়পাল আইন’ জাতীয় সংসদে পাশ হয়। সুইডিশ শব্দ Ombudsman থেকে বাংলায় ন্যায়পাল শব্দটির উদ্ভব। পৃথিবীর প্রথম ১৮০৯ সালে সুইডেনে ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, আর্জেন্টিনা, স্পেন, কলম্বিয়া ও ইংল্যান্ডে বিভিন্ন নামে ন্যায়পাল রয়েছে।


বাংলাদেশের মন্ত্রণালয়

সচিবালয়ের অধীন একটি প্রশাসনিক ইউনিট হল মন্ত্রণালয় যার নির্বাহী মন্ত্রী এবং প্রশাসনিক প্রধান সচিব।

একনজরে মন্ত্রণালয়ের সাংগঠনিক কাঠামো

পদ                                                                    পদ                       

 মন্ত্রী                                                          সচিব

প্রতিমন্ত্রী                                                     অতিরিক্ত সচিব         

উপমন্ত্রী (যদি থাকে)                                       যুগ্ম সচিব

                                                                    উপ সচিব

                                                                সিনিয়র সহকারী সচিব/সহকারী সচিব

বাংলাদেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ বিভাগ

মন্ত্রণালয়/বিভাগ  সচিবালয়ের কার্য নির্বাহের জন্য বাংলাদেশ সচিবালয়ের অংশ হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে গঠিত প্রশাসনিক ইউনিট। ১৯৯৬ সালের কার্যবিধিতে সুনির্দিষ্ট সরকারি কার্য সম্পাদনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ও সরকার কর্তৃক ঘোষিত কোন স্বয়ংসম্পূর্ণ  প্রশাসনিক ইউনিটকে বিভাগ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। বিভাগ বা কতিপয় বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত মন্ত্রককে মন্ত্রণালয় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। সরকারের কার্যাবলি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে বণ্টন করা হয়। সরকারি কার্যবণ্টনের দায়িত্ব কেবিনেট বিভাগের ওপর ন্যস্ত। প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অধীনে রয়েছে অধিদপ্তর, অধীনস্থ দপ্তর এবং কতিপয় আধা সরকারি সংস্থা। মন্ত্রণালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কার্য-কাঠামোর বিশদ বর্ণনা নিম্নরূপ:

সচিবের অব্যবহিত অধস্তনরূপে কর্মরত একজন অতিরিক্ত সচিব বা যুগ্মসচিব সাধারণত মন্ত্রণালয়ের একটি উইং-এর প্রধান থাকেন। মন্ত্রণালয়/বিভাগের ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির সুনির্দিষ্ট কার্য সম্পাদনের জন্য গঠিত স্বয়ংসম্পূর্ণ উপ-বিভাগকে উইং বলা হয়। উইংয়ের নিম্নস্তর হচ্ছে শাখা। কতগুলি উপশাখার সমন্বয়ে শাখা গঠিত এবং এর প্রধান থাকেন উপসচিব বা সমপদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। শাখার অধীনে থাকে উপশাখা। উপশাখা হচ্ছে সহকারী সচিব বা ঊর্ধ্বতন সহকারী সচিবের অধীনে ন্যস্ত মন্ত্রণালয়/বিভাগের মৌলিক কার্যনির্বাহী ইউনিট।

সচিব হচ্ছেন মন্ত্রণালয়/বিভাগের প্রশাসনিক প্রধান। তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগের প্রশাসন পরিচালনা, শৃঙ্খলা বিধান এবং এর ওপর অর্পিত কার্যাবলি যথাযথভাবে সম্পাদনের দায়িত্বে নিয়োজিত। তিনি মন্ত্রণালয়/বিভাগ, অধিদপ্তর ও অধীনস্থ দপ্তরগুলোতে বিধিবিধানসমূহ যথাযথভাবে অনুসৃত হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণের দায়িত্বও পালন করেন। মন্ত্রণালয়ের/বিভাগের কার্যক্রম সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে অবহিত করার দায়িত্বও সচিবের। একজন সচিব সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও অধীনস্থ দপ্তরসহ মন্ত্রণালয়/বিভাগের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মন্ত্রণালয়/বিভাগ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাপর সংস্থার জন্য বরাদ্দকৃত তহবিল ঐসময়ে প্রচলিত বিধি/আইন অনুসারে ব্যয় করা হচ্ছে কিনা তাও তাকে নিশ্চিত করতে হয়।

কার্যবিধির আওতায় মন্ত্রণালয়/বিভাগের ভূমিকা হলো: (ক) নীতি নির্ধারণ, (খ) পরিকল্পনা প্রণয়ন, (গ) পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মূল্যায়ন, (ঘ) আইন প্রণয়নের উদ্যোগ, (ঙ) সংসদে দায়িত্ব সম্পাদনে মন্ত্রীকে সহায়তা করা, (চ) উচ্চ পর্যায়ের কর্মচারী ব্যবস্থাপনা অর্থাৎ সংবিধিবদ্ধ সরকারি সংস্থার সদস্য/পরিচালক পদমর্যাদার নিচে নয় এবং অধিদপ্তর ও অধীনস্থ দপ্তরসমূহের ক্ষেত্রে জাতীয় বেতন স্কেল ৫-এর নিচে নয় এধরনের কর্মচারীদের বিষয় এবং (ছ) সময়ে সময়ে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক নির্ধারিত অপরাপর বিষয়/বিষয়সমূহ।

কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে নীতি প্রণয়ন মন্ত্রণালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কোন বিষয়ে নীতি প্রণয়নের কাজ একাধিক মন্ত্রণালয়ে  অর্পিত হলে সেক্ষেত্রে আন্তঃমন্ত্রণালয় পরামর্শ বাধ্যতামূলক। আন্তঃমন্ত্রণালয় পরামর্শের পর প্রণীত নীতির খসড়া অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় পেশ করা হয়। পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রত্যেক মন্ত্রণালয় উন্নয়ন প্রকল্প তৈরি করে। সাধারণত এই প্রকল্প দু ধরনের হয়, বৈদেশিক সাহায্যভিত্তিক প্রকল্প এবং সম্পূর্ণভাবে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প। এসব প্রকল্পের অনুকূলে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন নিতে হয়। এ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় পরিকল্পনা কমিশনের প্রাক্-পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়। অনুমোদিত প্রকল্পগুলো মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। এধরণের প্রত্যেকটি প্রকল্পের মূল্যায়ন ও তদারকি কার্য সম্পন্ন হয় মন্ত্রণালয়ের মাসিক বৈঠকে অগ্রগতি পর্যালোচনার মাধ্যমে। দক্ষতার সঙ্গে সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ নির্বাহী কমিটি ও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এন.ই.সি) নিকট জবাবদিহি করতে হয়।

কোনো আইন প্রণয়ন করতে হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রথম ঐ আইনের প্রস্তাব পেশ করে, আন্তঃমন্ত্রণালয় পরামর্শের ব্যবস্থা করে এবং পরে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়ে পাঠায়। আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতের ভিত্তিতে খসড়া প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় পেশ করা হয়। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর আইন মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটিকে আইনের ছকে বিন্যাস করে সংসদে পেশের উপযোগী করে এবং এটিকে সংসদের সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। স্থায়ী কমিটির মতামতের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত আইনের চূড়ান্ত খসড়াটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় সংসদে পেশ করা হয়।

মন্ত্রণালয়ের অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে জাতীয় সংসদে তার দায়িত্ব সম্পাদনে মন্ত্রীকে সহায়তা করা। মন্ত্রীকে এ ধরণের সহায়তা করার দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত, প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যাবলি দেখাশুনার জন্য একটি করে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি আছে। সংসদে বিভিন্ন দলের নির্বাচিত সদস্যদের সমন্বয়ে এ কমিটি গঠিত। মন্ত্রীও এ কমিটির একজন সদস্য। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের কাজ হলো কমিটিতে উত্থাপিত বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনায় মন্ত্রী ও কমিটির অন্যান্য সদস্যদের সহায়তা করা। দ্বিতীয়ত, সংসদ অধিবেশনকালে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে সংসদ-সদস্যরা প্রশ্ন উত্থাপন করেন। সংসদে এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট  মন্ত্রণালয় মন্ত্রীকে উপাত্ত ও অন্যান্য সম্পূরক তথ্য সরবরাহ করে।

শীর্ষ পর্যায়ে কর্মচারী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ ও শৃঙ্খলা বিধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়সহ কোনো কোনো শ্রেণীর কর্মকর্তার পদায়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। এসকল বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়, সংস্থাপন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সময়ে সময়ে জারিকৃত বিধি ও নির্দেশনা অনুসারে মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।

সাধারণত বড় মন্ত্রণালয়ের একাধিক বিভাগ থাকে। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে রয়েছে ৩টি করে বিভাগ। প্রত্যেকটি বিভাগের জন্য রয়েছেন পৃথক পৃথক সচিব এবং এঁরা একই মন্ত্রীর অধীনে কাজ করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন প্রতিমন্ত্রীও মন্ত্রণালয়ের কোনো বিভাগের প্রধান হতে পারেন। অনুরূপভাবে একজন প্রতিমন্ত্রী একাধিক বিভাগসহ একটি মন্ত্রণালয়ের প্রধানও থাকতে পারেন। মন্ত্রীর অধীনেও কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী থাকতে পারেন।

মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী কে মন্ত্রণালয়ের প্রধান হবেন সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোন বিধান নেই। এটি নির্ভর করে প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনার উপর; কারণ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিয়োগের একক দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর। তিনি মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনেরও চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ। প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনা মতে দায়িত্ব বণ্টন পরিবর্তিত হতে পারে। আবার একীভূত বা পৃথকীকরণের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়কে পুনর্গঠিত করার বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল।

বিস্তারিত


স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা

ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ধারণা থেকে স্থানীয় সরকারের ধারণাটি এসেছে। গণতান্ত্রিক ধারায় কল্যাণকামী রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হলো জনগণের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। আর এ কাজটিকে সহায়তা করার জন্য এবং সরকারের সেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌছে দেবার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনের সম্প্রসারণ হতেই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উদ্ভব। দেশে স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণে সংবিধানের ৯, ৫৯, ৬০ নং অনুচ্ছেদে এ বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। বাংলাদেশে স্থানীয় শাসন অর্ডিন্যান্স জারি করা হয় ১৯৭৬ সালে।উপমহাদেশে স্থানীয় সরকার কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করেন ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭২ সালে।

বাংলাদেশে রহমত আলী কমিশন স্থানীয় সরকারের চারটি স্তরের সুপারিশ করে। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম সরকার সহ ৪ স্তর বিশিষ্ট স্থানীয় শাসনের পর্যায়ভুক্ত করা হয়। ১২ আগষ্ট ২০০২ সালে গঠিত এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৩ সালে সংসদে পাশ হওয়া গ্রাম সরকার বর্তমানে ৬ এপ্রিল ২০০৯ সালে গ্রাম সরকার (রহিতকরণ) বিল এর মাধ্যমে বাতিল হয়ে যায়।

 

জেলা প্রশাসন

জেলা বিভিন্ন দেশের ক্ষুদ্র প্রশাসনিক ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর যা স্থানীয় প্রশাসন দ্বারা চালিত হয় বিভিন্ন দেশে জেলা বিভিন্ন ভাবে বিন্যাস্ত থাকে। সাধারন ভাবে ব্লক বা উপজেলায় জেলা বিভক্ত থাকে।

বর্তমানে বাংলাদেশের ৮টি বিভাগের অন্তর্গত ৬৪টি জেলা রয়েছে। ১৯৭১-এ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাকালে জেলার সংখ্যা ছিল ১৯। প্রতিটি জেলায় বহু সরকারী কর্মকর্তা নিযুক্ত থাকেলেও জেলা প্রশাসক বা ডেপুটি কমিশনার (ডি.সি.)-কে জেলার প্রধান সরকারি প্রতিনিধি গণ্য করা হয়; তিনি জেলার প্রধান রাষ্ট্রাচার কর্মকর্তা এবং মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের কাছে দায়বদ্ধ।

অপরদিকে, জেলার সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রয়েছে "জেলা পরিষদ"। একজন চেয়ারম্যান, পনেরো জন সদস্য ও পাঁচ জন সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্য নিয়ে জেলা পরিষদ গঠিত হয়, যারা প্রাপ্তবয়স্ক ভোটারদের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন।

বিস্তারিত

 


উপজেলা পরিষদ

উপজেলা পরিষদ  জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকার (১৯৮২-১৯৯০) কর্তৃক গঠিত প্রশাসনিক সংস্কার ও পুনর্গঠন কমিটির (সিএআরআর) সুপারিশমালা থেকে উপজেলা পরিষদের ঐতিহাসিক পটভূমি রচিত। বস্ত্ততপক্ষে এই সুপারিশমালা ১৯৫৯ সালের মৌলিক গণতন্ত্র আদেশক্রমে গঠিত থানা উন্নয়ন ও সমন্বয় পরিষদের (টিডিসিসি) অনুবৃত্তিমূলক দলিল। কুমিল্লা জেলায় অবস্থিত বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক আখতার হামিদ খান কুমিল্লা অভিজ্ঞতাভিত্তিক পল্লী উন্নয়নের যে ধারণা গড়ে তোলেন ও প্রচার করেন তার ভিত্তিতে গঠিত হয় টিডিসিসি। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের সামরিক সরকার টিডিসিসি’র ধারণা ও অনুশীলনকে আইনে অন্তর্ভুক্ত করেন। আদি ধারণার মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো থানা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা এবং ইউনিয়ন কাউন্সিল বা বর্তমানে কথিত ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যানের সমন্বয়ে একটি সরকারি বেসরকারি অংশদারিত্ব গড়ে তোলা।

উপজেলা পরিষদ ও অধুনালুপ্ত টিডিসিসি’র মধ্যে মৌলিক পার্থক্য প্রধানত দুটো। প্রথমত টিডিসিসি’র চেয়ারম্যান হতেন তদানীন্তন মহকুমা প্রশাসকরা এবং ভাইস চেয়ারম্যান হতেন সার্কেল অফিসার (উন্নয়ন)। আর থানা পর্যায়ের অফিসাররা এবং সেই থানার আওতাভুক্ত ইউনিয়ন পরিষদগুলোর চেয়ারম্যান হতেন এর সদস্য। টিডিসিসিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আধিপত্য থাকায় এর সমালোচনা করা হতো। আরোও স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, সমালোচনাটা টিডিসিসির রাজনৈতিক চরিত্রের উপর কেন্দ্রীভূত ছিল এই কারণে যে, তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা ছিলেন সেই নির্বাচক মন্ডলীর অংশ যারা প্রেসিডেন্টকে নির্বাচিত করত। আর এভাবেই সামরিক শাসক সেনাবাহিনী প্রধান ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করত। আওয়ামী লীগের মতো প্রধান বিরোধী দলগুলো এবং অন্যান্য গণতন্ত্রকামী দল নির্বাচকমন্ডলীর এই কাঠামোর প্রবল বিরোধিতা করেছিল। তদানীন্তন পাকিস্তানের উভয় অংশে রাজনৈতিক দলগুলোর গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পরিণতিতে শেষ পর্যন্ত ১৯৬৯ সালে এ ব্যবস্থা তুলে দেয়া হয়।

সংবিধানে স্থানীয় সরকার কাঠামোর ব্যবস্থায় নির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়ে স্থানীয় পরিষদের বিষয়াবলি পরিচালনার কথা বিবেচনা করা হয়েছে। সংবিধানে বাংলাদেশের প্রতিটি প্রশাসনিক ইউনিটে স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত পরিষদ গঠনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রশাসনিক ও চাকরি পুনর্বিন্যাস কমিটি (এএমআরসি, ১৯৭২) এমন পদক্ষেপের সুপারিশ করা সত্ত্বেও ১৯৮৪ সালের আগ পর্যন্ত কোনো সরকারই সেই ধারণাটি হূদয়ঙ্গম করে নি। সাংবিধানিক ধারণার সাথে সঙ্গতি রেখেই এএসআরসি সেই ধারণাটি বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছিল।

এএসআরসির এসব সুপারিশ ১৯৮২ সালে সরকারের অনুমোদন লাভ করে এবং ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সুপারিশগুলোর বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। পরবর্তী পর্যায়ে স্থানীয় সরকার (থানা পরিষদ ও থানা পুনর্গঠন) অধ্যাদেশ ১৯৮২ এবং থানা পরিষদকে উপজেলা পরিষদ হিসেবে নতুন নামকরণ করে ১৯৮৩ সালের সংশোধনী আইনের অধীনে এক ব্যক্তি এক ভোট নীতির ভিত্তিতে সরাসরিভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখা হয়। স্থানীয় পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের ভোটাধিকারহীন সদস্য করা হয়। অপরদিকে নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানরা হয়ে দাঁড়ান ভোটাধিকার সম্পন্ন সদস্য। একজন চেয়ারম্যান নির্বাচিত করে উপজেলা পরিষদ গঠনের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালে। উপজেলা পরিষদের কার্যকালের পাঁচ বছর মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ার পর ১৯৯০ সালে একজন চেয়ারম্যান নির্বাচিত করে উপজেলা পরিষদ গঠনের দ্বিতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯০ সালে। জেলার অংশ মহকুমা বলে অভিহিত যুগ পুরাতন প্রশাসনিক ইউনিট এবং এর প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা এসডিওর পদ বিলোপ করা হয় এবং অধিকাংশ মহকুমাকে জেলার মর্যাদায় উন্নীত করা হয়। এর মধ্যে কয়েকটি প্রাক্তন থানার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ব্যবহারিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে উন্নীত জেলা ও উন্নীত থানার নতুন নাম ব্যবহূত হতে থাকে।

উপজেলা ব্যবস্থা চালু হওয়ার অব্যবহিত পূর্বে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোটে বিভক্ত সকল রাজনৈতিক দল এই ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রবল বিরোধিতা করে। এই ইস্যুতে তাদের বিঘোষিত অবস্থান ছিল এই যে, বিষয়টা সাংবিধানিক পরিকল্পনার অংশ এবং সেই কারণে তা নির্বাচিত সরকারের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। তাদের এই অবস্থান আরও জোরদার করে তোলার পিছনে এই যুক্তি কাজ করে যে, কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে কর্মদায়িত্ব ভাগাভাগির ব্যাপারটা এমন এক ইস্যু যার উপর যথাযথভাবে নির্বাচিত জাতীয় সংসদের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যমত গড়ে তোলা প্রয়োজন। এসব যুক্তির পিছনে সকল বিরোধী রাজনৈতিক দলের এই আশঙ্কা ছিল যে, উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্দেশ্য হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে সামরিক সরকারের ভিত গড়ে তোলা। অবশ্য জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকার উপজেলা পরিষদ গঠন করে উপজেলা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়।

জেনারেল এরশাদ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে ১৯৮৯-৯০ সালের গণ-আন্দোলনের পরিণতিতে ১৯৯১ সালে নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসন পুনর্গঠন,(বাতিল) অধ্যাদেশ ১৯৯১ বলে উপজেলা ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়। ব্যবস্থাটি বিলুপ্ত হওয়ার আগেও উপজেলা পরিষদে জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভূমিকা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের মধ্যকার কার্যগত সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছিল।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী এবং আরও গতিশীল করে তোলার লক্ষে ২০০৭ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার যে কমিটি গঠন করে তার সুপারিশ ছিল এই যে, (ক) জাতীয় সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদে যেকোন ধরনের ভূমিকা পালনের বাইরে রাখতে হবে। এই সুপারিশ ১৯৯১ সালের পর বিএনপি সরকার এবং ১৯৯৬ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠিত দুই উপর্যুপরি স্থানীয় সরকার কমিশনের প্রদত্ত সুপারিশের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। পূর্বোল্লেখিত কমিটি (২০০৭) স্থানীয় সরকারের সকল স্তরের কাজকর্ম দেখাশোনার জন্য স্বতন্ত্র আইনগত ক্ষমতা দিয়ে একটি স্থায়ী স্থানীয় সরকার কমিশন গঠনেরও সুপারিশ করেছিল। আইনবলে শেষ পর্যন্ত একটি স্থানীয় সরকার কমিশন হলেও ২০০৯ সালের নির্বাচিত সরকার পরে তা বাতিল করে দেয়।

বিস্তারিত


ইউনিয়ন পরিষদ

ইউনিয়ন পল্লী অঞ্চলের সর্বনিম্ন প্রশাসনিক ইউনিট। গ্রাম চৌকিদারি আইন ১৮৭০ এর অধীনে ১৮৭০ সালে কিছু পল্লী সংস্থা গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলে ইউনিয়নের সৃষ্টি হয়। এ আইনের অধীনে প্রতিটি গ্রামে পাহারা-টহল ব্যবস্থা চালু করার উদ্দেশ্যে কতগুলি গ্রাম নিয়ে একটি করে ইউনিয়ন গঠিত হয়। ইউনিয়ন গঠনের বিস্তারিত দিকনির্দেশনা লিপিবদ্ধ রয়েছে বেঙ্গল চৌকিদারি ম্যানুয়েলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অনুচ্ছেদে। এ প্রক্রিয়ার বিকাশের মধ্য দিয়ে একটি স্থানীয় সরকার ইউনিটের ধারণার সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এর ভূমিকা নিরাপত্তামূলক কর্মকান্ডে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তীকালে এটিই স্থানীয় সরকারের প্রাথমিক ইউনিটের ভিত্তিরূপে গড়ে ওঠে।

বিস্তারিত


বিলুপ্ত প্রাম সরকার

১৯৭৬ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমানের নতুন সরকার স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশ জারি করে। এতে তিন ধরনের গ্রামীণ স্থানীয় সরকার গঠনের বিধান রাখা হয়, যথা, ইউনিয়ন পরিষদ, থানা পরিষদ এবং জেলা পরিষদ। ইউনিয়ন পরিষদের গঠন ও কার্যাবলি বলতে গেলে ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির ২২ নং অধ্যাদেশের অনুরূপই থেকে যায়। তবে ব্যতিক্রম শুধু ভাইস-চেয়ারম্যানের পদের বিলুপ্তি এবং দু’ধরনের অতিরিক্ত ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যের সংযোজন, যেমন দুজন মনোনীত মহিলা সদস্য এবং দুজন মনোনীত কৃষক সদস্য। ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদকাল পাঁচ বছর নির্ধারিত ছিল।পরবর্তীকালে এটি বিলুপ্ত ঘোষনা হয়।

বিস্তারিত


পৌরসভা

পৌরসভা বা মিউনিসিপ্যালিটি বাংলাদেশের শহরাঞ্চলীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থার একটি একক। বাংলাদেশে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর এবং গাজীপুর মহানগরগুলোর ১১টি সিটি কর্পোরেশন ছাড়া ৩২৬টি পৌরসভা আছে।

বিস্তারিত


সিটি করপোরেশন

নির্বাচিত ও মনোনীত সদস্যদের নিয়ে সিটি কর্পোরেশন গঠিত হয়। সিটি কর্পোরেশনের সদস্যদেরকে মেয়র, কাউন্সিলর, প্রশাসকি প্রভৃতি বলা হয়। সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচিত প্রধানকে মেয়র বলা হয়। মেয়রকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করেন এলাকা-ভিত্তিক নির্বাচিত কাউন্সিলরগণ। বাংলাদেশের নির্বাচন আইন দ্বারা অযোগ্য নয় এরূপ ব্যক্তি মেয়র ও সদস্য হতে পারেন। বর্তমান আইনানুসারে সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ বা কার্যকাল ৫ বছর।

বিস্তারিত


বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

বাহিনী

সদরদপ্তর

একাডেমি

স্লোগান/প্রতীক

সেনাবাহিনী

কুর্মিটোলা, ঢাকা সেনানিবাস

ভাটিয়ারী, চট্টগ্রাম

প্রতীক- ক্রস চিহ্নিত দুটি তরবারী এবং ওপরে কৌনিক অবস্থায় জাতীয় ফুল শাপলা।

স্লোগান- সমরে আমরা শান্তিতে আমরা সর্বত্র আমরা দেশের তরে।

বিমানবাহিনী

কুর্মিটোলা, ঢাকা সেনানিবাস

এয়ারফোর্স ট্রেনিং সেন্টার, যশোর

প্রতীক- উড়ন্ত ঈগল ও এর ওপরে দু’পাশে দুটি করে মোট ৪টি তারকা।

স্লোগান- বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত।

নৌবাহিনী

বনানী, ঢাকা

জলদিয়া, চট্টগ্রাম

প্রতীক- কাছিবেষ্টিত নোঙ্গর ও এর ওপর শাপলা।

স্লোগান- শান্তিতে সংগ্রামে সমুদ্র দুর্জয়।

পুলিশ

গুলিস্তান, ঢাকা

সারদা, রাজশাহী

প্রতীক- দুপাশে ধানের শীষবেষ্টিত মাঝে শাপলা ও নিচে বাংলায় লেখা পুলিশ।

স্লোগান- শান্তি, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা প্রগতি।

বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশ

পিলখানা, ঢাকা

 

প্রতীক- বিশেষ বেজমেন্ট আবদ্ধ ক্রস রাইফেলের ওপর শাপলা।

স্লোগান- সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী।

আনসার

খিলগাও, ঢাকা

শফিপুর, গাজীপুর

প্রতীক-

স্লোগান- শান্তি, শৃঙ্খলা, উন্নয়ন ও নিরাপত্তায় সর্বত্র আমরা।

 

 

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর শ্রেনী বিন্যাস কমিশনপ্রাপ্ত অফিসারদের শ্রেনীবিন্যাস:-

সেনাবাহিনী   

বিমান বাহিনী

নৌ-বাহিনী

সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট

পাইলট অফিসার

এ্যাকটিং সাব-লেফটেন্যান্ট

লেফটেন্যান্ট  

ফ্লাইং অফিসার

সাব-লেফটেন্যান্ট

ক্যাপ্টেন     

ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট

লেফটেন্যান্ট

মেজর

স্কোয়াড্রন লিডার

লেফটেন্যান্ট কমান্ডর

লেফটেন্যান্ট কর্নেল

উইং কমান্ডর

কমান্ডার

কর্নেল      

গ্রুপ ক্যাপটেন

ক্যাপটেন

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল

এয়ার কমান্ডার

কমোডর

মেজর জেনারেল

এয়ার ভাইস কমোডর

রিয়াল এডমিরাল

লেফটেন্যান্ট জেনারেল

এয়ার ভাইস মার্শাল

ভাইস এডমিরাল

জেনারেল    

এয়ার মার্শাল

এডমিরাল

ফিল্ড মার্শাল  

মার্শাল অব দি এয়ার ফোর্স

এডমিরাল অব দি ফ্লিট

 

বাংলাদেশের সেনা প্রধানগণের নাম, সময়কাল ও পদবিসমূহঃ

নাম

সময়কাল

পদবি

এম এ জি ওসমানী

১৯৭১-১৯৭২

জেনারেল

এম এ রব        

১৯৭১-১৯৭২             

কর্নেল

কে এম শফিউল্লাহ   

এপ্রিল, ১৯৭২- আগষ্ট, ১৯৭৫ মে.

জেনারেল

জিয়াউর রহমান

আগস্ট, ১৯৭৫ – নভেম্বর, ১৯৭৫

মে. জেনারেল

খালেদ মোশারফ     

৩ নভেম্বর, ১৯৭৫ – ৭ নভেম্বর ১৯৭৫

ব্রিগেডিয়ার

জিয়াউর রহমান

৭ নভেম্বর, ১৯৭৫-ডিসেম্বর, ১৯৭৮

মে. জেনারেল

এইচ. এম. এরশাদ        

ডিসেম্বর, ১৯৭৮-অক্টোবর, ১৯৮৬

লে. জেনারেল

আতিকুর রহামন    

১ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৬- নভেম্বর, ১৯৯০

লে. জেনারেল

নূর উদ্দিন খান     

নভেম্বর, ১৯৯০-১৯৯৪

লে. জেনারেল

আবু সালেহ মুহাম্মদ নাসিম

১৯৯৪-১৯৯৬

লে. জেনারেল

মাহবুবুর রহমান     

১৯৯৬-২৪ ডিসেম্বর, ১৯৯৭

লে. জেনারেল

মুস্তাফিজুর রহমান

২৪ ডিসেম্বর ১৯৯৭- ২৪ ডিসেম্বর, ২০০০

লে. জেনারেল

হারুন উর-রশিদ    

২৪ ডিসেম্বর, ২০০০-১৬ জুন, ২০০২

লে. জেনারেল

হাসান মশহুদ চৌধুরী

১৬ জুন, ২০০২ – ১৫ জুন, ২০০৯

লে. জেনারেল

মউন উ আহমেদ    

১৫ জুন, ২০০৬ – ১৫ জুন, ২০০৯

জেনারেল

মোহাম্মদ আব্দুল মুবীন চৌধুরী

১৫ জুন, ২০০৯-২৫ জুন, ২০১২

জেনারেল

ইকবাল করিম ভূইয়া       

২৫ জুন, ২০১২ -২৫ জুন, ২০১৫

জেনারেল

আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক

২৫ জুন, ২০১৫-বর্তমান

জেনারেল


বাংলাদেশ বিমানবাহিনী

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধানগণ নাম, পদবী ও মেয়াদকাল -

নাম       

সময়কাল         

পদবী

আবদুর করিম খন্দকার     

৮.০৪.১৯৭২-১৫.১০.১৯৭৫

এয়ার ভাইস মার্শাল

মোহাম্মদ গোলাম তোয়ার  

১৬.১০.১৯৭৫-৩০.০৪.১৯৭৬

এয়ার ভাইস মার্শাল

মোহাম্মদ খাদেমুল বাশার    

০১.০৫.১৯৭৬-০৮.১০.১৯৭৬

এয়ার ভাইস মার্শাল

আবদুর গফুর মাহমুদ     

০৫.০৯.১৯৭৬-০৮.১০.১৯৭৭

এয়ার ভাইস মার্শাল

সদরুদ্দিন              

০৯.১০.১৯৭৬-২২.০৭.১৯৮৭

এয়ার ভাইস মার্শাল

সুলতান মাহমুদ               

২৩.০৭.১৯৮১-২২.০৭.১৯৮৭

এয়ার ভাইস মার্শাল

মমতাজ উদ্দিন আহমেদ          

২৩.০৭.১৯৮৭-০৪.০৬.১৯৯১

এয়ার ভাইস মার্শাল

আলতাফ হোসেন চৌধুরী    

০৪.০৬.১৯৯১-০৩.০৬.১৯৯৫

এয়ার ভাইস মার্শাল

জামালউদ্দিন আহমেদ       

০৪.০৬.১৯৯৫-০৩.০৬.২০০১

এয়ার ভাইস মার্শাল

রফিকুল ইসলাম               

০৪.০৬.২০০১-০৪.০৪.২০০২

এয়ার ভাইস মার্শাল

ফখরুল আজম           

০৪.০৪.২০০২-০৭.০৪.২০০৭

এয়ার ভাইস মার্শাল

শাহ মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান

০৭.০৪.২০০৭-১২.০৬.২০১২

এয়ার মার্শাল

মোহাম্মদ এনামুল বারী     

১২.০৬.২০১২-১২-০৬.২০১৫

এয়ার মার্শাল

আবু এসরার            

১২.০৬.২০১৫-বর্তমান

এয়ার মার্শাল


বাংলাদেশ নৌবাহিনী

নৌবাহিনীর প্রধানগণের নাম, পদবী ও সময়কাল -

নাম       

সময়কাল         

পদবী

নুরুল হক

৬ নভেম্বর ১৯৭৩   

ক্যাপ্টেন

মোশাররফ হোসেন খান     

৭ নভেম্বর ১৯৭৩-৩ নভেম্বর ১৯৭৯

রিয়ার এডমিরাল

মাহবুব আলী খান   

৪ নভেম্বর ১০৭৯-৬ আগস্ট ১৯৮৪

রিয়ার এডমিরাল

সুলতান আহমেদ     

৬ আগস্ট ১৯৮৪ – ১৪ আগস্ট ১৯৯০

রিয়ার এডমিরাল

আমির আহমেদ মোস্তফা

১৫ আগস্ট ১৯৮৪ - ২ মে ১৯৯১

রিয়ার এডমিরাল

মোহাম্মদ মোহাইমিনুল ইসলাম

৪ জুন ১৯৯১-৩ জুন ১৯৯৫

রিয়ার এডমিরাল

মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম

৩ জুন ১৯৯৫-৩ জুন ১৯৯৯ 

রিয়ার এডমিরাল

আবু তাহের  

৪ জুন ১৯৯৩-৩ জুন ২০০২

রিয়ার এডমিরাল

শাহ ইকবাল মুজতবা

৪ জুন ২০০২-৯ জানুয়ারি ২০০৫

 

এম হাসান আলী খান

১০ জানুয়ারি ২০০৫-৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৭

রিয়ার এডমিরাল

সারওয়ার জাহান নিজাম

১০ ফ্রেব্রুয়ারি ২০০৭-২৮ জানুয়ারি ২০০৯

রিয়ার এডমিরাল

জহির উদ্দিন আহমেদ

২৯ জানুয়ারি ২০০৯-২৭ জানুয়ারি ২০১৩

ভাইস এডমিরাল

মুহাম্মদ ফরিদ হাবিব

২৮ জানুয়ারি ২০১৩-বর্তমান

ভাইস এডমিরাল


বাংলাদেশ পুলিশ

বাংলাদেশ পুলিশের শাখা সমূহ

বাহিনী

প্রধান

স্পেশাল ব্রাঞ্চ (SB)

এডিশনাল আইজি

সিআইড (CID)

এডিশনাল আইজি

মেট্রোপলিটন পুলিশ

কমিশনার

র‌্যাব

মহাপরিচালক

রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি)

ডিআইজি

আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ান

ডিআইজি

পুলিশ ইন্টারন্যাল ওভারসাইট

ডিআইজি

ইমিগ্রেশন পুলিশ

ডিআইজি

সোয়াট

ডিআইজি

বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক

ডিআইজি

হাইওয়ে পুলিশ

ডিআইজি

এসএএফ (আর্মড ফোর্স)

এসপি

 

পুলিশের আইজিবৃন্দের নাম ও কার্যকাল-

নাম                                     কার্যকাল

এম এ খালেক                          ১৬.১২.১৯৭১- ২৩.০৪.৯৭২

এ রহিম                                 ২৩.০৪.১৯৭৩-৩১.১২.১৯৭৩

এ এইচ নুরুই ইসলাম               ৩১.১২.১৯৭৩-২১.১২.১৯৭৫

হুসাইন আহমেদ                          ২১-১২-১৯৭৫-২৬.০৮.১৯৭৮

এ বিএম জি কিবরিয়া                 ২৬.০৮.১৯৭৮- ০৭.০২.৮২

এম এম আর খান                      ০৮.০২.১৯৮২-৩১.০১.১৯৮৪

ই এ চৌধুরী                            ০১.০২.১৯৮২-৩০.১২.১৯৮৫

মো; হাবিবুর রহমান                  ৩০.১২.১৯৮৫-০৯.০১.৮৬

এ আর খোন্দকার                      ০৯.০১.১৯৮৬-২৮.০২.১৯৯০

তৈয়ব উদ্দিন আহমদ                  ২৮.০২.১৯৯০-২৮.০২.১৯৯১

এ এম চৌধুরী                          ২৮.০১.১৯৯১-২০.০৭.১৯৯১

তৈয়ব উদ্দিন আহমদ                  ২০.০৭.১৯৯১-১৬.১০.১৯৯১

এম এনামুল হক                        ১৬.১০.১৯৯১-০৮.০৭.১৯৯২

এ এস এম শাহজাহান                  ০৮.০৭.১৯৯২- ২২.০৪.১৯৯৬

মো: আজিজুর রহমান                 ২২.০৪.১৯৯৬- ১২.১১.১৯৯৭

ইসমাইল হোসেন                        ১৩.১১.১৯৯৭-২৭.০১.১৯৯৮

এ ওয়াই  আই সিদ্দিকী               ২৭.০১.১৯৯৮-০৬.০৬.২০০০

মুহাম্মদ নুরুল হুদা                     ০৭.০৬.২০০০-০৫.১১.২০০১

মোদাব্বির হোসেন চৌধুরী            ০৫.১১.২০০১-২২.০৪.২০০৫

শহিদুল হক                              ২২.০৫.২০০৫-১৫.১২.১০০৪

মো: আশরাফুল হুদা                   ১৫.১২.২০০৪-০৭.০৪.২০০৫

মো: হাদিস উদ্দিন                      ০৭.০৪.২০০৫-০৭.০৫.২০০৫

আবদুল কাইয়ুম                          ০৭.০৫.২০০৫-০৫.০৭.২০০৫

আনোয়ারূল ইকবাল                   ০৬.০৭.২০০৬-০২.১১.২০০৬

মোহাম্মদ খোদা বকস চৌধুরী        ০২.১১.২০০৬-৩১-০১-২০০৭

নুর মোহাম্মদ                           ৩১.০১,২০০৭-৩০-০৮-২০১০

হাসান মাহমুদ খন্দকার                ৩০.০৮.২০১০-৩১.১২.২০১৪

এ.কে এম শহীদুল হক                  ৩১.১২.২০১৪-বর্তমান


র‌্যাব (র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান)

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটলিয়ন (Rapid Action Battalion) বা র‌্যাব (RAB) বাংলাদেশের আভ্যন্তরিক সন্ত্রাস দমনের উদ্দেশ্যে গঠিত চৌকস বাহিনী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ গঠিত হয় এবং একই বছরের ১৪ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ) তাদের কার্যক্রম শুরু করে। বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে র‌্যাব গঠিত হয়। র‌্যাব-এর সদর দপ্তর ঢাকার উত্তরায় অবস্থিত।

বিস্তারিত


সীমান্ত রক্ষী বাহিনী

বাংলাদেশ রাইফেল্স (বিডিআর)  ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল্সের (ইপিআর) স্থলাভিষিক্ত বাহিনী। ইপিআর প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৭ সালে। এই বাহিনী ছিল ১৯২০ সালে গঠিত ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল্সের উত্তরসূরি। ১৯২০ সালের পূর্বে সীমান্ত পাহারার দায়িত্ব ছিল বেঙ্গল সামরিক পুলিশের হাতে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পরেই বাংলাদেশ রাইফেল্স সর্ববৃহৎ বাহিনী। এর ওপর দেশকে অভ্যন্তরীণ আপদ ও বহিরাক্রমণের বিপদ থেকে রক্ষা করার পবিত্র দায়িত্ব অর্পিত। বিডিআর মূলত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের প্রতিহত করার কাজে সীমান্তে নিয়োজিত প্রহরাবাহিনী। এটি আধা-সামরিক বাহিনী হলেও দেশের নিয়মিত সামরিক বাহিনীর চেয়ে এর গুরুত্ব কোন অংশেই কম নয়। সীমান্ত প্রহরা ছাড়াও এই বাহিনীর অন্যান্য দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে সীমান্তবর্তী এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা, চোরাচালান দমন, বেআইনি কর্মকান্ড প্রতিরোধ এবং প্রয়োজনে দেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে শান্তি-শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে সরকারকে সহযোগিতা করা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেল্সের বাঙালি সদস্যরা প্রাথমিক প্রতিরোধ সৃষ্টি করেন এবং এরপর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ রাইফেল্সের নতুন নামকরণ হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

বিস্তারিত


বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি

বাংলাদেশ আনসার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, আইন প্রয়োগ ও সংরক্ষণের জন্য গঠিত একটি বাহিনী। এটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্বারা পরিচালিত হয় ।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়, আনসারের বেশির ভাগ সদস্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনীর গেরিলা সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর, বাংলাদেশ আইন দ্বারা আনসার হবাহিনী আবার পুনর্গঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এর সরকার আনসার বাহিনীর ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়ে আনসার বাহিনীকে জনগণের প্রতিরক্ষা বাহিনী হিসেবে মনোনীত করেন।

বিস্তারিত


বাংলাদেশের স্পেশাল বাহিনী

ডিজিএফআই

প্রতিষ্ঠা: ১৯৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ডিরেক্টরেট অব ইনটেলিজেন্স (ডিজিএফআই) প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে এ প্রতিষ্ঠান ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইনটেলিজেন্স বা ডিজিএফআই-এ রুপান্তরিত হয়।

সদর দপ্তর: দেশের ৬৪ টি জেলায় ডিজিএফআইয়ের দপ্তর রয়েছে। এর সদর দপ্তর ঢাকার কচুক্ষেতে।

প্রধান: ডিজিএফআইয়ের প্রধান মহাপরিচালক। তাকে সহযোগিতা করেন সাতজন পরিচালক।

কাজ: সামরিক নানা উদ্দেশ্য সাধন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় গোয়েন্দাগিরি করা এর কাজ।

 

এনএসআই

ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইনটেলিজেন্স বা এনএসআই হচ্ছে বাংলাদেশের প্রধান বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, যেটি সরাসরি প্রধঅনমন্ত্রীর দপ্তরের কাছে দায়বদ্ধ।

প্রধান: মহাপরিচালক।

নেটওয়ার্ক: বাংলাদেশের সব প্রধান শহরে এ গোয়েন্দা সংস্থার নেটওয়ার্ক রয়েছে।

কাজ: অভ্যন্তরীন গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে সরকারকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহনে সহযোগিতা করাই হচ্ছে এনএসআই’র প্রধান কাজ।

 

স্পেশাল ব্রাঞ্চ

কাজ: পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ অপরাধের তদন্ত, অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দাগিরি ও পাল্টা গোয়েন্দাগিরি করে থাকে। স্পেশাল ব্রাঞ্চ এর বিভিন্ন উইং বা শাখার মাধ্যমে সারা দেশে কাজ করে। যেমন রাজনৈতিক শাখা, ছাত্র ও শ্রমিক শাখা, পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন শাখা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ১৯৬৩ সালে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রধান: পুলিশের একজন অতিরিক্ত ইন্সপেক্টর জেনারেল স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রধান।

সদর দপ্তর: মালিবাগ, ঢাকা।

সিআইডি

কাজ: স্পর্শকাতর অপরাধের তদন্ত করে পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট বা সিআইডি।

প্রধান: একজন অতিরিক্ত ইন্সপেক্টর জেনারেল।


বাংলাদেশ কোস্টগার্ড

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড বাংলাদেশের সমূদ্র উপকূল অঞ্চলে নিয়োজিত একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। এই সংস্থা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিবিধ আইন প্রয়োগের মাধ্যমে উপকূল অঞ্চলের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বিধান এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে। এই আধাসামরিক বাহিনীটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ। এর কর্মকর্তাগণ বাংলাদেশ নৌবাহিনী থেকে স্থানান্তরিত হয়ে আসেন। এর সদরদপ্তর ঢাকায় অবস্থিত। বর্তমানে এই বাহিনীতে ৩,৩৩৯ জন উপকূল রক্ষী এবং ৫৭টি জাহাজ কর্মরত আছেন।

বিস্তারিত


কারা প্রশাসন

কারা প্রশাসন  আদালত কর্তৃক দন্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আটক রাখার সুনির্দিষ্ট স্থান বা কারাগারের প্রশাসনব্যবস্থা। বস্ত্তত ১৮৬৪ সালের আইনের উপর ভিত্তি করে কারা প্রশাসনের সূত্রপাত। ওই বছর বঙ্গীয় সরকার একটি বিস্তারিত জেল কোড প্রণয়ন করে। ইতঃপূর্বে কারা প্রশাসনের কার্যক্রম সময়ে সময়ে জারিকৃত সার্কুলার ও আদেশ বলে পরিচালিত হতো। কার্যত তখন কারাগারের কার্যপ্রণালীর মধ্যে তেমন সঙ্গতি ছিল না। প্রদেশের কারাগার ও অধস্তন কারাগারের তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার জন্য সময়ে সময়ে জারিকৃত বিধিবিধান সমন্বয়ে ১৮৬৪ সালে ‘দি বেঙ্গল জেল কোড’ সংকলিত হয়। সংকলনটির দুটি অংশ ছিল। প্রথম অংশের শিরোনাম ‘দি বেঙ্গল জেল কোড’ এবং দ্বিতীয় অংশের শিরোনাম ‘দি বেঙ্গল সাবসিডিয়ারী জেল কোড’।

১৮৬৪ সালের বেঙ্গল জেল কোড বাংলাদেশে চালু আছে। এ কোডের সঙ্গে অবশ্য যোগ হয়েছে কারাগার আইন ১৮৯৪, কারাবন্দি আইন ১৯০০, কারাবন্দি শনাক্তকরণ আইন ১৯২০ এবং আরও কিছু আইনের বিভিন্ন ধারা। এসব আইনের মূল লক্ষ্য ছিল কারাগারের ব্যবস্থাপনা, কারাবন্দিদের যথাযথভাবে আটক রাখা, তাদের প্রতি আচরণ এবং বন্দিদের মধ্যে শৃঙ্খলা বিধান। দি বেঙ্গল জেল কোডে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, দীউয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮, ফৌজদারি দন্ডবিধি ১৮৯৮, এবং দন্ডবিধি ১৯৬০-এর ধারায় কারাবন্দিদের আটক রাখা, দন্ড কার্যকর করা, কয়েদিদের আপিল, উন্মাদ কয়েদি এবং অনুরূপ বিষয় সম্পর্কিত যে নির্দেশাবলি রয়েছে তাও অনুসরণ করতে হবে।

বাংলাদেশে কারাগার চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত। প্রথম শ্রেণিতে রয়েছে কেন্দ্রীয় কারাগার যেখানে ৬ মাস ও তদুর্ধ্ব মেয়াদের সশ্রম দন্ডপ্রাপ্ত কয়েদি এবং যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের রাখা হয়। দ্বিতীয় শ্রেণিতে রয়েছে জেলা সদর দপ্তরে অবস্থিত জেলা কারাগার যেখানে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার কয়েদিদের রাখা হয়। তৃতীয় শ্রেণিতে রয়েছে অধস্তন কারাগার যেগুলি সাবেক মহকুমা সদরে অবস্থিত ছিল এবং এখানে ফৌজদারি দন্ডপ্রাপ্ত কয়েদিদের রাখা হয়। কিন্তু ১৯৮২ সালে প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে মহকুমা বিলুপ্ত হওয়ার পর বর্তমানে কোনো কোনো উপজেলায় এরূপ অধস্তন কারাগার রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণিতে রয়েছে বিশেষ কারাগার যেখানে বিশেষ শ্রেণির কয়েদিদের আটক রাখা হয়। জেলা কারাগারগুলিকে আবার প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এক বছরে কারাগারে আটক কয়েদিদের গড় সংখ্যার উপর ভিত্তি করে এ শ্রেণিবিভাগ করা হয়।

দেশের সকল কারাগারের নিয়ন্ত্রণ এবং তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা মহা-কারাপরিদর্শকের উপর ন্যস্ত। প্রতিটি কারাগারে তাকে সাহায্য করেন একজন তত্ত্বাবধায়ক, একজন মেডিক্যাল অফিসার (কোনো কোনো কারাগারে তিনি তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করেন), একজন অধস্তন মেডিক্যাল অফিসার, একজন কারাধ্যক্ষ এবং সরকারের প্রয়োজন মতো অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী। এ ছাড়াও একজন অথবা একাধিক উপ-মহাকারাপরিদর্শক থাকেন। সাধারণ তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মহাকারাপরিদর্শকের ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে। জেলের অভ্যন্তরীণ অর্থব্যবস্থা, শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত মহা-পরিদর্শকের নির্দেশ সকল ম্যাজিস্ট্রেট এবং জেল কর্মকর্তাদের মেনে চলতে হয়। এক্ষেত্রে যে কোনো বিচ্যুতি বা লঙ্ঘন তিনি সরকারের গোচরীভূত করেন।

জেলা প্রশাসক জেলা কারাগারের উপর কিছুটা তদারকি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। দি বেঙ্গল জেল কোড অনুযায়ী তিনি প্রয়োজনবোধে কারাগারের পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন। তবে এধরনের পরিস্থিতিতে তার পদক্ষেপের কারণ জানিয়ে সঙ্গে সঙ্গে মহা-কারাপরিদর্শককে অবহিত করতে হয়। তদুপরি জেল ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তত্ত্বাবধায়কের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকলেও তাকে ১৮৯৪ সালের কারাগার আইন বা এর অধীনে প্রণীত বিধির সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন বিষয়ে জেলা প্রশাসকের নির্দেশ মেনে চলতে হয়। জেলা প্রশাসকের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় কারাগারের উপর প্রযোজ্য হতে পারে যদি কারাগারটি তার জেলার আওতাধীন থাকে। তবে জেলা প্রশাসকের ক্ষমতার উপর কিছু নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তিনি কারা তত্ত্বাবধায়কের অধস্তন কোনো কর্মকর্তা বরাবরে পত্র বা নির্দেশ পাঠাতে পারেন না। তার সকল নির্দেশ লিখিত হতে হবে এবং সাধারণত তা কারাগারে রক্ষিত পরিদর্শক বহিতে লিপিবদ্ধ করতে হবে। জেল ব্যবস্থাপনার খুঁটিনাটি বিষয়ে হস্তক্ষেপ করাও জেলা প্রশাসকের কাজ নয়। এ ছাড়া অধস্তন কর্মকর্তা ও কয়েদিদের উপর তত্ত্বাবধায়কের এক্তিয়ার ক্ষুণ্ণ হতে পারে এমন সব কাজ জেলা প্রশাসককে পরিহার করতে বলা হয়েছে। জেল তত্ত্বাবধায়কের পদ শূন্য হলে বা তত্ত্বাবধায়ক ছুটিতে কিংবা সদরের বাইরে থাকলে সেক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক জেল তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব সম্পাদনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। দি বেঙ্গল জেল কোড উনিশ শতকের শেষদিকে প্রণীত হলেও এটি অদ্যাবধি কারা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ রূপরেখার বিস্তৃত ও ব্যাপক দলিলরূপে পরিচিত।

বিস্তারিত

 


বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা

পদ

পূর্ণরুপ

যে সংস্থার গোয়েন্দা

অপরাধ তদন্ত বিভাগ

Criminal Investigation Department (CID)

বাংলাদেশ পুলিশ

র‌্যাব ইন্টেলিজেন্স উইং

RAB Intelligence Wing

র‌্যাব

পুলিশ ইন্টারনাল ওভারসাইট

Police Internal Oversight (PIO)

বাংলাদেশ পুলিশ

ক্রিমিনাল ইন্টেলিজেন্স অ্যানালাইসিস ইউনিট

Criminal Intelligence Analysis Unit

বাংলাদেশ পুলিশ

বিশেষ শাখা

Special Branch (SB)

বাংলাদেশ পুলিশ

ডিরেক্টরেট অব নেভাল ইন্টেলিজিন্স

Directorate of Neval Intelligence

বাংলাদেশ নৌবাহিনী

ডিটেকটিভ অ্যান্ড ক্রিমিনাল ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ

Detective and Criminal Intelligence Branch

ঢাকা মহানগর পুলিশ

ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট

Financial Intelligence Unit

বাংলাদেশ ব্যাংক

প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর

Directorate General of Forces Intelligence

সামরিক বাহিনী

জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা

National Security Intelligence

বাংলাদেশ সরকার

সেন্ট্রাল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট

Central Intelligence Unoth

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

সামরিক গোয়েন্দা শাখা (বিভাগ)

Directorate of Military Intelligence

সামরিক বাহিনী

অফিস অব এয়ার ইন্টেলিজেন্স

Office of Air Intelligence

বাংলাদেশ বিমানবাহিনী

রাইফেলস সিকিউরিটি ইউনিট

Rifles Security Unit (RSU)

বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর)

 

 


বাংলাদেশের বিচার বিভাগ

বিচার বিভাগ বাংলাদেশের বিচার বিভাগ মূলত উচ্চতর বিচার বিভাগ (সুপ্রিম কোর্ট) ও অধস্তন বিচার বিভাগ (নিম্ন আদালতসমূহ) এ দুই শ্রেণিতে বিভক্ত।

সুপ্রিম কোর্ট  সুপ্রিম কোর্ট দেশের সর্বোচ্চ আদালত এবং এটি দুটি বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত, যথা হাইকোর্ট বিভাগ ও আপীল বিভাগ। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ও  প্রত্যেক বিভাগের বিচারপতিদের সমন্বয়ে সুপ্রিম কোর্ট গঠিত। সংবিধানের বিধান সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারকগণ বিচার কার্যক্রম পরিচালনার  ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারকদের নিয়োগ দান করেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মধ্য থেকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের নিয়োগ করা হয়।

হাইকোর্ট বিভাগ বিচারকার্য পর্যালোচনার ক্ষমতার অধিকারী। যেকোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগ প্রজাতন্ত্রের যেকোন কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিসহ যেকোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর সংবিধানে প্রদত্ত যেকোন মৌলিক অধিকার কার্যকর করার নির্দেশনা বা আদেশ জারি করতে পারে। হাইকোর্ট মৌলিক অধিকারসমূহ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যদি দেখতে পায় যে, কোনও আইন মৌলিক অধিকার বা সংবিধানের অন্য যে কোন অংশের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, তাহলে সে আইনের ততটুকু অকার্যকর ঘোষণা করতে পারে যতটুকু অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কোম্পানি, এডমিরালটি, বিবাহ সংক্রান্ত বিষয়, ট্রেডমার্ক ইত্যাদি সংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রেও হাইকোর্টের মৌলিক এখতিয়ার রয়েছে। অধস্তন আদালতে বিচারাধীন কোনও মামলার ক্ষেত্রে যদি সংবিধানের ব্যাখ্যা সম্পর্কিত আইনের প্রশ্ন বা জনগুরুত্বপূর্ণ কোনও বিষয় দেখা দেয়, তাহলে হাইকোর্ট সে মামলা অধস্তন আদালত থেকে প্রত্যাহার করে তার নিষ্পত্তি করতে পারে।

হাইকোর্ট বিভাগের আপিল বিবেচনা ও পর্যালোচনার এখতিয়ার রয়েছে। হাইকোর্ট যদি এ মর্মে প্রত্যয়ন করে যে, হাইকোর্টে প্রদত্ত কোনও রায়, ডিক্রি, আদেশ বা দন্ডাদেশের সঙ্গে বাংলাদেশ সংবিধানের ব্যাখ্যার ব্যাপারে আইনের প্রশ্ন জড়িত, বা হাইকোর্ট কোনও ব্যক্তিকে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা আদালত অবমাননার দায়ে শাস্তি প্রদান করেছে, তাহলে ওই সব রায়, ডিক্রি, আদেশ বা দন্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল দায়ের করা যাবে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগই রেকর্ড আদালত। ১৯২৬ সালের আদালত অবমাননা আইনের অধীনে যেকোন আদালত অবমাননার মামলা তদন্ত করা ও শাস্তি প্রদানের আইনগত এখতিয়ার উভয় বিভাগেরই রয়েছে। আপিল বিভাগের ঘোষিত আইন মেনে চলা হাইকোর্ট বিভাগের জন্য অবশ্য পালনীয় এবং সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের যেকোনটির ঘোষিত আইন মেনে চলা সকল অধস্তন আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক। দেশের সকল নির্বাহী ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টকে সহায়তা দান করবে। জাতীয় সংসদ কর্তৃক প্রণীত যেকোন আইনের অধীনে সুপ্রিম কোর্ট রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগের কর্মকান্ড ও কার্যপ্রণালী পরিচালনার বিধিবিধান তৈরি করে। কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে যেকোন কার্য সম্পাদনের জন্য সুপ্রিম কোর্ট দুই বিভাগের যেকোন একটিকে বা এক বা একাধিক বিচারককে দায়িত্ব দিতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেন প্রধান বিচারপতি বা তাঁর দ্বারা দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্যান্য বিচারক বা কর্মকর্তাগণ। কর্মকর্তা কর্মচারীদের চাকুরির শর্তাবলি নির্ধারণের জন্য সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে সুপ্রিম কোর্টের প্রণীত বিধানাবলির অনুসরণে সুপ্রিম কোর্ট কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগ করে থাকে। সকল অধস্তন আদালত ও আইন দ্বারা গঠিত ট্রাইব্যুনাল তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা থাকে হাইকোর্ট বিভাগের হাতে।

অধস্তন দেওয়ানি বিচার বিভাগ  অধস্তন দেওয়ানি আদালত চারটি শ্রেণীতে বিভক্ত, যথা সহকারি জজের আদালত, সাবজজ আদালত, অতিরিক্ত জজের আদালত এবং জেলা জজের আদালত। প্রত্যেক জেলার বিচার বিভাগের প্রধান হলেন জেলা জজ। পার্বত্য জেলাসমূহে পৃথক কোনও দেওয়ানি আদালত নেই; সেসব জেলায় ম্যাজিস্ট্রেটগণ দেওয়ানি আদালতের কার্য সমাধা করেন। হাইকোর্ট বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীনে প্রতিটি জেলার সকল দেওয়ানি আদালত পরিচালনার দায়িত্ব থাকে জেলা জজের হাতে। জেলা জজ প্রধানত আপিল  মামলা বিচারের এখতিয়ার রাখেন, তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁর মূল মামলার বিচার এখতিয়ারও রয়েছে। অতিরিক্ত জজের বিচার এখতিয়ার জেলা জজের এখতিয়ারের সঙ্গে সমবিস্তৃত ও যৌথ। তিনি জেলা জজ কর্তৃক নির্ধারিত মামলার বিচারকার্য সম্পাদন করেন। সহকারি জজ ও অধস্তন বিচারকদের প্রদত্ত রায়, ডিক্রি ও আদেশের বিরুদ্ধে আপিল পেশ করা হয় জেলা জজের আদালতে। একইভাবে সহকারি জজদের প্রদত্ত রায়, ডিক্রি বা আদেশের বিরুদ্ধে আপিল নিষ্পত্তির জন্য জেলা জেজ সেগুলি অধস্তন আদালতে স্থানান্তর করতে পারেন। অধস্তন আদালতগুলোর হাতেই থাকে মূলত মূল দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তির অবাধ এখতিয়ার।

উত্তরাধিকারী ও উত্তরাধিকার নির্ধারণ, বিবাহ, বর্ণ বা ধর্মীয় রীতিনীতি সম্পর্কিত মামলার নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দেওয়ানি আদালতগুলো মামলার পক্ষ মুসলমান হলে মুসলিম আইন এবং পক্ষ হিন্দু হলে হিন্দু আইনের মাধ্যমে বিচারকার্য সম্পন্ন করে। আইনসভা কর্তৃক প্রণীত কোন বিধিবলে ওই সব আইন পরিবর্তন বা বিলোপ না করা পর্যন্ত তা কার্যকর থাকে।

অর্থ ঋণ আদালত  অর্থ ঋণ আদালত আইন ১৯৯০-এর অধীনে সরকার প্রতিটি জেলায় একটি করে অর্থ ঋণ আদালত স্থাপন করেছে। সরকার সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে এসব আদালতের বিচারক হিসেবে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ করে। ব্যাংক, বিনিয়োগ করপোরেশন, গৃহনির্মাণ অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান, লিজিং কোম্পানিসমূহ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত আইন ১৯৯৩-এর বিধানাবলি অনুসারে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ঋণ সংক্রান্ত সকল মামলা অর্থ ঋণ আদালতে দায়ের করতে হয় এবং শুধুমাত্র এ আদালতই এসব মামলার বিচারকার্য সম্পন্ন করে। অর্থ ঋণ আদালত একটি দেওয়ানি আদালত। দেওয়ানি আদালতের সকল ক্ষমতাই এ আদালতের রয়েছে।

দেউলিয়া আদালত  এ আদালত দেউলিয়া আইন ১৯৯৭-এর অধীনে গঠিত। প্রত্যেক জেলায় জেলা আদালতই হচ্ছে ঐ জেলার দেউলিয়া আদালত। জেলা জজ এ আদালতের প্রধান বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। জেলার সীমানায় দেউলিয়া মামলাগুলি নিষ্পত্তি করার দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পিত। প্রয়োজনবোধে তিনি একজন অতিরিক্ত (জেলা) জজের উপরও অনুরূপ মামলার বিচারকার্যের দায়িত্ব অর্পণ করতে পারেন।

অধস্তন ফৌজদারি ও ম্যাজিস্ট্রেট আদালত  অধস্তন ফৌজদারি আদালত পাঁচটি শ্রেণীতে বিভক্ত, যথা দায়রা আদালত, মহানগর হাকিমের আদালত, প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, দ্বিতীয় শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং তৃতীয় শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। তিনটি পার্বত্য জেলায় দায়রা আদালতের কাজ করেন বিভাগীয় কমিশনার। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে মহানগর পৌর এলাকার জন্য মহানগর দায়রা আদালত গঠন করা হয়।

প্রতিটি থানায় ম্যাজিস্ট্রিয়াল কার্যাদি সম্পাদনের জন্য ন্যূনপক্ষে একজন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত থাকেন। এ কাজের জন্য সরকার সাধারণত তৃতীয় শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে প্রশাসন ক্যাডারের একজন জুনিয়র সিভিল সার্ভেন্টকে নিয়োগ দিয়ে থাকে। অবশ্য সিভিল সার্ভেন্ট নন এমন যেকোন সম্মানিত ব্যক্তির হাতেও সরকার ম্যাজিস্ট্রিয়াল ক্ষমতা অর্পণ করতে পারে। বেতনভুক সিভিল সার্ভেন্ট ম্যাজিস্ট্রেট থেকে পৃথক এ ধরনের ম্যাজিস্ট্রেটদের বলা হয় অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট (জাস্টিস অব দ্য পিস)।

প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল কোনও আইনবলে বা কোনও আইনের দ্বারা সরকার কর্তৃক প্রাপ্ত সম্পত্তি বা সরকারের ব্যবস্থাপনাধীন সম্পত্তি, প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনও ব্যক্তির চাকুরির শর্তাবলি ইত্যাদি সম্পর্কে উদ্ভূত বিষয়াদি নিষ্পত্তির আইনগত এখতিয়ার দিয়ে জাতীয় সংসদ আইনবলে এক বা একাধিক প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে পারে। 

সুপ্রিম কোর্ট

সুপ্রিম কোর্ট  শুধু কলকাতা শহর ও কোম্পানি কর্তুক পরিচালিত কুঠিগুলির জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি বিচারিক আদালত। রেগুলেটিং অ্যাক্ট-এর অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৭৩ সালে। বিচার প্রশাসন সম্পর্কিত সুপ্রিম কোর্ট যা সাধারণভাবে সুপ্রিম কোর্ট বা কলকাতা সুপ্রিম কোর্ট হিসেবে পরিচিত হয়। আরো অতিরিক্তকিছু ব্যবস্থাসহ সুপ্রিম কোর্ট প্রাক্তন মেয়র’স্ কোর্টের স্থলাভিষিক্ত হয়। একজন প্রধান বিচারক ও অন্ততঃপক্ষে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যারিস্টারদের মধ্য থেকে রাজা কর্তৃক নিয়োগ প্রাপ্ত তিনজন সহযোগী বিচারক নিয়ে কোর্টটি গঠিত ছিল। ইংল্যান্ডের  কিংস বেঞ্চের মতোই এ বিচারকদের কর্তৃত্ব ছিল। সুপ্রিম কোর্টে অ্যাটর্নি এবং অ্যাডভোকেটদের অন্তর্ভুক্তি তাদের হাতে ন্যস্ত ছিল। প্রধান বিচারকদের বার্ষিক বেতন ৮০০০ পাউন্ড স্টার্লিং নির্ধারিত ছিল এবং প্রত্যেক সহযোগী বিচারকের  বার্ষিক বেতন ছিল ৬০০০ পাউন্ড স্টার্লিং। সে সময়ের কোম্পানি কর্মচারীদের মতো বাণিজ্যিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ এবং  উপঢৌকন গ্রহণ করা তাদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। ইংরেজ কোর্ট অব চ্যান্সরির মতো সুপ্রিম কোর্টের  দায়িত্ব ছিল কোর্ট অব ইক্যুয়িটি বা ন্যায় বিচারের নিরপেক্ষ কোর্ট হিসেবে কাজ করা।

সুপ্রিম কোর্ট কলকাতা এবং অধীনস্থ ফ্যাক্টরির জন্য ওয়ের (Oyer) ও টারমিনার (Terminer) ছিল। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের কারাদন্ড প্রদানের এখতিয়ারও ছিল। একটি উচ্চ আদালত হিসেবে এটি কোর্ট অব রিকোয়েস্ট, কোর্ট অব কোয়ার্টার সেশনস এবং আদালতের মেজিস্ট্রেটদের তত্ত্বাবধান করার আইনগত অধিকারী ছিল। বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার কোর্ট অব অ্যাডমিরলটি হিসাবে সুপ্রিম কোর্ট এর আওতাধীন গভীর সমুদ্রে সংঘটিত ষড়যন্ত্র, হত্যা, দস্যুতা ইত্যাদির শাস্তি প্রদান করতে পারত। বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যায় বসবাসরত সকল ব্রিটিশ নাগরিক এ কোর্টের আওতাধীন ছিল। কিন্তু রেগুলেটিং অ্যাক্ট এবং রাজকীয় সনদ (Royal Charter) সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ার সম্পর্কে যে ব্যাখ্যা প্রদান করে তা ছিল বেশ অস্পষ্ট। ফলে সুপ্রিম কোর্ট কাজ শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই এর অতিরিক্ত এখতিয়ারের দাবি সম্পর্কে সমালোচনা হয়। নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ইউরোপীয়গণ প্রায়শই এ কোর্টকে ব্যবহার করত। এ ক্ষেত্রে বহুল আলোচিত মহারাজা নন্দ কুমারের আইনি হত্যার বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। রেগুলেটিং অ্যাক্ট স্থানীয়দের এ কোর্টের আওতার বাইরে রাখলেও অনেক জমিদারের বিচার এর মাধ্যমে করা হয়। রাজস্ব বকেয়ার বিষয়টি কোম্পানি কখনও কখনও ঋণগ্রস্ততা বলে গণ্য করে। ইউরোপীয় এবং স্থানীয়দের  মধ্যে ঋণ সম্পর্কিত বিতর্কিত বিষয় সুপ্রিম কোর্টের আওতাধীন ছিল বলে জমিদারগণের  রাজস্ব বকেয়াকে অনেক সময় ঋণ হিসেবে ধরা হতো। কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাসরত স্থানীয়দেরকে সুপ্রিম কোর্টের আওতাধীন করা হয়। কিন্তু কলকাতাবাসী নয় এমন বাঙালিদের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট বিচার পরিচালনা করেছে এমন ঘটনার দৃষ্টান্তও দুর্লভ নয়।

সুপ্রিম কোর্ট এবং গভর্নর জেনারেলের বিরোধ সমসাময়িকদের মাঝে একটি সাধারণ আলোচিত বিষয় ছিল। রেগুলেটিং অ্যাক্ট গভর্নর জেনারেল এবং কাউন্সিলকে বিভিন্ন আইন, অর্ডিন্যান্স এবং নীতিসমূহ প্রণয়নের ক্ষমতা প্রদান করে। ফোর্ট উইলিয়মের বেসামরিক প্রশাসন ও অধীনস্থ ফ্যাক্টরিসমূহে শৃংখলা আনয়ন করা এর উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু শুধু সুপ্রিম কোর্টে রেজিস্ট্রিকৃত আইনসমূহই সুপ্রিম কোর্ট আমলে নিতে পারত। ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যে প্রচলিত আইনসমূহের বিরোধী কোন আইন যাতে গভর্নর জেনারেল প্রণয়ন করতে না পারেন সে দিকে সুপ্রিম কোর্ট দৃষ্টি দিত। আইন প্রণয়নে যেকোন ধরনের বিশ্বাসভঙ্গতার জন্য জরিমানা ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের কাছে ন্যস্ত ছিল। আইন প্রণয়ন ও প্রশাসন সম্পর্কিত বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট এবং গভর্নর জেনারেল ইন কাউন্সিলের বিরোধ একটি নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ এবং অতিরিক্ত অভিভাবকত্বের বিষয়ে কোম্পানি প্রশাসন সব সময়ই সমালোচনামুখর ছিল। অন্যদিকে কোম্পানি প্রশাসনের সমালোচকরা যেমন, মুক্ত ব্যবসায়ী ও ধর্ম প্রচারকগণ সুপ্রিম কোর্টের তৎপরতাকে আবশ্যকীয় বলে প্রশংসা করে। নিজ মাতৃভূমির আইনের শাসন থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেও সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে একটি বণিক নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি এ ক্ষেত্রে তাদের প্রশংসা অর্জন করে।

কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের অনেক কর্মকান্ড বিতর্ক সৃষ্টি করলেও এটি কোম্পানি শাসনের শেষ সময় পর্যন্ত বহাল ছিল। ১৮৫৮ সালে কোম্পানি বিলুপ্ত করা হলে কলকাতা সুপ্রিম কোর্ট তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলে। সুতরাং ১৮৬১ সালের ভারতীয় হাইকোর্ট অ্যাক্টের মাধ্যমে এর বিলুপ্তি ঘটে। এ আইন গভর্নর জেনারেল ইন কাউন্সিলকে সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে কলকাতা, মাদ্রাজ এবং বোম্বেতে হাইকোর্ট স্থাপনের কর্তৃত্ব প্রদান করে। ১৮৬৫ সালে এ হাইকোর্টসমূহ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে সুপ্রিম কোর্টের বিলুপ্তি ঘটে।

বিস্তারিত


বিভিন্ন অধ্যাদেশ/আইন প্রণয়ন

আইন প্রণয়ন  সংসদের মাধ্যমে আইন প্রণয়নের বিষয়টি ১৭৭৩ সাল পর্যন্ত এদেশের মানুষের কাছে অপরিচিত ছিল। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট  ১৭৭৩ সালে গভর্নর জেনারেল-ইন-কাউন্সিলকে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা এবং ১৮৮৩ সাল থেকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের পদ্ধতি অনুসরণ করে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা প্রদান করে। ১৮৬১ সাল থেকে  শুরু করে ১৯৪৭ সালে ভারতে ব্রিটিশ শাসন অবসানের  পূর্ব পর্যন্ত কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক আইন পরিষদ যথাক্রমে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক বিষয়ে আইন প্রণয়ন করে আসছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত শাসনতন্ত্রের অধীনে  নির্বাচিত সংসদ আইন পাশ করত। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র বলবৎ হবার পর আইন প্রণয়নের জন্য ভোটের মাধ্যমে জাতীয় সংসদ নির্বাচিত হয়। প্রায় সব বিল উত্থাপন করে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। খুব অল্পসংখ্যক বেসরকারি সদস্যের বিল সংসদীয় বিধিবিধান অনুযায়ী সংসদের কোনো সদস্য দ্বারা উত্থাপন করা হয়। সাধারণত সংশিষ্ট মন্ত্রণালয় নীতিনির্দেশনা সংক্রান্ত নথিপত্র তৈরি করে এবং একটি প্রাথমিক বিলের খসড়া তৈরি করে সারাংশসহ বিলের খসড়া ক্যাবিনেট মিটিংয়ে অনুমোদনের জন্য ক্যাবিনেট ডিভিশনে প্রেরণ করা হয়। ক্যাবিনেটের অনুমোদনের পর যে মন্ত্রণালয় এ বিল উত্থাপন করেছে সেই মন্ত্রনালয়কে বিলের চুড়ান্ত খসড়া তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং ক্যাবিনেট তা বিবেচনা করে দেখেন। তারপর আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় উদ্যোক্তা মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে হয় একটা চূড়ান্ত খসড়া বিল তৈরি করবে নয়ত খসড়া বিলটি পুঙ্খানুপুঙ্খ খতিয়ে দেখবে। তারপর চূড়ান্ত খসড়া বিল অথবা খতিয়ে দেখা বিল উদ্যোক্তা মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো হয় এবং অনুমোদন প্রাপ্তির পর এটাকে সংসদ সচিবালয়ে পাঠানো হয়। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ড্রাফট বিল পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য ল’কমিশনে পাঠাতে পারে এবং কমিশনের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিলটি কমিশনের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমার্জন করা হয়। এ বিলটি উদ্দ্যোক্তা মন্ত্রণালয়ের নিকট পাঠানোর আগে এ কাজ সম্পন্ন করা হয়। কোনো অর্থ বিল (কর ধার্যের প্রস্তাব, সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় অথবা অন্যান্য আর্থিক বিষয়) রাষ্ট্রপতির অনমোদন ব্যতিরেকে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা যায় না। মহামান্য রাষ্ট্রপতির সুপারিশের পর স্পীকার বিলটিকে সংসদে উপস্থাপনের জন্য তারিখ নির্ধারণ করেন। বিলটি সংসদে উপস্থাপনের পূর্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সংসদ-সদস্যদের ওই বিলের কপি প্রদান করেন। বিল উপস্থাপনকে ফার্স্ট রিডিং বলা হয়। তারপর এ বিলটির উপর বিশদ আলোচনার জন্য আরেকটি তারিখ ধার্য্য করা হয় যাকে বিলের সেকেন্ড রিডিং বলে অভিহিত করা হয়। এ পর্যায়ে বিলের উপর আলোচনা হতে পারে অথবা একটি স্থায়ী কমিটি অথবা বাছাই কমিটির কাছে পাঠানো অথবা জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রচার করা যেতে পারে। কমিটি রিপোর্টসহ বিলটিকে সংসদে পাঠাবে। এরকম রিপোর্টসহ বিলটি বিবেচনার জন্য রাখা হয়। বিলটি গৃহীত হলে স্পীকার ভোটের জন্য সংসদে পেশ করেন। বিলটিতে যদি কোনো সংশোধনী আনার প্রস্তাব করা হয় এবং ভোটে দেওয়া হয় তখন সংশোধিত বিলটি সংসদে বিবেচনার জন্য পেশ করা হয়। সেকেন্ড রিডিংয়ের পর যদি কোনো বিল পাশ হয় তাহলে একে থার্ড রিডিং বলা হয়। কোনো বিল পাশ হতে হলে উপস্থিত সংসদ-সদস্যদের অধিকাংশের ভোটের প্রয়োজন। বিল পাস হওয়ার পর স্পীকার এতে স্বাক্ষর দান করেন। এরপর বিলটি রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর বিলটি জাতীয় সংসদের একটি আইন হিসেবে সরকারি গেজেটে ছাপা হয়।

যখন জাতীয় সংসদের অধিবেশন থাকে না অথবা সংসদ ভেঙে দেয়া হয়, রাষ্ট্রপতির যদি প্রতীয়মান হয় যে এমন একটা অবস্থা বিরাজ করছে যার জন্য তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি কোনো অধ্যাদেশ জারী করতে পারেন যা সরকারি গেজেটে মুদ্রিত হয়। এ অধ্যাদেশের আইনের সমপরিমাণ ক্ষমতা থাকে। কিন্তু এ অধ্যাদেশ শাসনতন্ত্রের পরিপন্থী হতে পারে না। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ত্রিশ দিনের মধ্যে যদি এ অধ্যাদেশ অনুমোদিত না হয় সেক্ষেত্রে ত্রিশ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর অধ্যাদেশের কোনো কার্যকারিতা থাকে না। এধরনের সমাদিষ্ট আইনকে রুল অথবা রেগুলেশন অথবা অর্ডার বলা হয়। এধরনের রুল, রেগুলেশন বা অর্ডার মূল আইন অথবা অধ্যাদেশের পরিপন্থী হতে পারেনা। অনুরূপভাবে জাতীয় সংসদ কর্তৃক পাশকৃত কোনো অধ্যাদেশ অথবা আইন শাসনতন্ত্রের পরিপন্থী হতে পারে না।

সমাদিষ্ট বা উপ-আইনকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়, বিধি, প্রবিধি ও আদেশ। মন্ত্রণালয় কর্তৃক তৈরি সমাদিষ্ট আইনকে রুল বলা হয়। রেগুলেশন তৈরি করে বিধিবদ্ধ স্বায়ত্বশাসিত কর্তৃপক্ষ। প্রশাসনিক সংস্থা এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তৈরি করে অর্ডার। সংশ্লিষ্ট বিভাগ অথবা অপর কর্তৃপক্ষ সমাদিষ্ট আইনের প্রাথমিক খসড়া তৈরি করে। তারপর অনুমোদনের জন্য নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। অনুমোদনের পর খসড়াটি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ড্রাফটিং বিশেষজ্ঞের পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। খসড়াটি চূড়ান্ত হলে যে মন্ত্রণালয় তা পাঠিয়েছিল সেখানে এর পরীক্ষা এবং চুড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। এধরনের অনুমোদনের পর চূড়ান্ত খসড়া রুল বা রেগুলেশন সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়। এধরনের প্রকাশনা ব্যতীত কোনো রুল অথবা রেগুলেশন কার্যকর হতে পারে না।

বিস্তারিত


আইন কমিশন

আইন কমিশন  বাংলাদেশে প্রচলিত আইন পুনর্নিরীক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ পেশ করার উদ্দেশ্যে জাতীয় সংসদে প্রণীত আইনবলে গঠিত একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। এটি আইন পরামর্শক বা খসড়া প্রণয়ন সেল হিসেবে কাজ করার নিমিত্তে সরকারের কোনো শাখা নয়; এর প্রধান কাজ হচ্ছে সকল আইন সর্বদা বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইন সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করা।

বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে বিচারপতি কামালউদ্দিন হোসেনের সভাপতিত্বে আইন সংস্কার কমিশন গঠিত হয়। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় আইন সংস্কার কমিশন গঠিত হয় বিচারপতি আলতাফ হোসেনের সভাপতিত্বে। উক্ত কমিশন অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে দীউয়ানি ও ফৌজদারি আইনের পদ্ধতি পরীক্ষা করে দীউয়ানি ও ফৌজদারি মোকদ্দমায় দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে কতিপয় সংশোধনী সুপারিশ করেন। ১৯৯০ সালে ব্যারিস্টার আসরারুল হোসেনের সভাপতিত্বে অপর একটি আইন কমিশন গঠিত হয়। এ কমিশন ছিল স্বল্পমেয়াদি এবং এটি ১৯০৮ সালের দীউয়ানি কার্যবিধি আইন সম্পর্কে কতিপয় সুপারিশ প্রণয়ন করে।

১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সরকার অপর একটি আইন সংস্কার কমিশন গঠনের প্রস্তাব গ্রহণ করলেও কার্যত ১৯৯৬ সালের মে মাসের পূর্ব পর্যন্ত কোনো কমিশন গঠিত হয় নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পূর্বোক্ত প্রস্তাব মতে ১৯৯৬ সালের ২৫ মে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নইমুদ্দিন আহমেদকে সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নিযুক্ত করে আইন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। ১৯৯৬ সালের ৪ আগস্ট বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ফজলে কাদেরী মোহাম্মদ আবদুল মুনিম নবগঠিত আইন সংস্কার কমিশনের সভাপতি নিযুক্ত হন। স্থায়ী আইন কমিশন প্রতিষ্ঠার লক্ষে ওই বছর ৯ সেপ্টেম্বর আইন কমিশন বিল ১৯৯৬ জাতীয় সংসদে পাশ হয়। ১৯৯৬ সালের আইন কমিশন আইনের বিধান অনুসারে আইন সংস্কার কমিশনকে আইন কমিশনে রূপান্তর করা হয়। আইনটি পাশ হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আমিন-উর-রহমান খান ২২ সেপ্টেম্বর কমিশনের অপর সদস্যরূপে নিয়োগ লাভ করেন।

আইন কমিশন আইনে চেয়ারম্যানসহ অন্যূন তিন জন সদস্য সমন্বয়ে কমিশন গঠনের বিধান রয়েছে। তারা সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হন। চেয়ারম্যান ও সদস্যদের কার্যকালের মেয়াদ নিযুক্তি লাভের তারিখ হতে তিন বছর। গুরুতর অসদাচরণ, শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণ ব্যতীত তাদের অপসারণ করা যায় না। তাদের এক বা একাধিক মেয়াদের জন্য পুনঃনিয়োগ দান করা যায়। তাদের আনুতোষিকসহ চাকুরির অন্যান্য শর্ত ও সুবিধাদি সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হয়। বর্তমানে আইন কমিশন একজন চেয়ারম্যান ও দুজন সদস্য সমন্বয়ে গঠিত।

১৯৯৬ সালের আইন কমিশন আইনে নির্ধারিত আইন কমিশনের উদ্দেশ্য ও কার্যাবলির মধ্যে রয়েছে ১. নির্ধারিত আইনসমূহ পরীক্ষা ও পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে যাচাই করা এবং এদের সময়োপযোগী করার লক্ষে সংশোধন বা প্রতিস্থাপনের সুপারিশ করা; ২. বিচার পদ্ধতির আধুনিকায়নের জন্য সংস্কারের সুপারিশ করা; ৩. বিচারক, আইনজীবী ও আইন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়ন; ৪. আইনের প্রয়োগহীনতা ও অপপ্রয়োগ প্রতিরোধ সম্পর্কিত বিধানের সুপারিশ করা; ৫. ফৌজদারি মোকদ্দমার দ্রুত ও দক্ষ তদন্ত নিশ্চিতকরণে ব্যবস্থাদি সুপারিশ করা; ৬. আদালত প্রশাসন দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা বিষয়ে ব্যবস্থাদির সুপারিশ করা; ৭. নির্বাচনী আইন সংস্কার বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়ন; ৮. বাণিজ্যিক আইনসমূহ যেমন, কপিরাইট, ট্রেডমার্ক, পেটেন্ট, আরবিট্রেশন, চুক্তি, রেজিস্ট্রেশন এবং অনুরূপ অন্যান্য আইনের সংস্কার বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়ন; ৯. নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধসহ তাদের অধিকার সুরক্ষায় উপযুক্ত আইনের সুপারিশ করা; ১০. আইনি সহায়তা কার্যক্রমকে বিস্তৃততর ও কার্যকর করার লক্ষ্যে উপযুক্ত বিধানের সুপারিশ করা; ১১. অসঙ্গতিপূর্ণ, পরস্পরবিরোধী এবং কাল-অনুপযোগী আইনসমূহ চিহ্নিতকরণ এবং তা বাতিলের জন্য সুপারিশ প্রণয়ন; ১২. মৌলিক অধিকারের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ আইনসমূহ চিহ্নিত করা এবং তা রদের সুপারিশ করা; ১৩. সরকার কর্তৃক সাংবিধানিক বা আইনগত বিষয়ে প্রেরিত রেফারেন্স সম্পর্কে সুপারিশ প্রণয়ন এবং ১৪. আইনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণাকার্য পরিচালনা।

কোনো আইন সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়ন সম্পর্কিত বিষয়াবলি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কমিশনের নিকট আসে। এভাবেই রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথকীকরণের উদ্দেশ্যে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব, গণহত্যা সম্পর্কিত অপরাধ নিরোধ ও শাস্তিপ্রদান সম্পর্কিত আইন এবং ১৯৮০ সালের ন্যায়পাল আইন সরকার কর্তৃক আইন কমিশনের নিকট প্রেরিত হয়। অন্যদিকে ট্রেড মার্ক্স অ্যাক্ট, মার্চেন্ডাইস মার্ক্স অ্যাক্ট, কপিরাইট অ্যাক্ট, অ্যাডমিরালটি অ্যাক্ট, পেটেন্ট ও ডিজাইন অ্যাক্ট, ইত্যাদি পুনর্বিবেচনা ও সংশোধনের জন্য কমিশন তার দায়িত্বের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে।

আইন কমিশন প্রতি বছরের শেষে পরবর্তী বছরে সংশোধন ও পর্যালোচনার জন্য গৃহীত হবে এরূপ আইনসমূহের একটি তালিকা প্রণয়ন করে। আইন কমিশন কোনো বিশেষ আইন পুনর্বিবেচনার জন্য গ্রহণ করার পর একজন সদস্যের তত্ত্বাবধানে ও এক বা একাধিক গবেষণা কর্মকর্তার সহযোগিতায় ওই বিষয়ে একটি কর্মপত্র প্রণয়ন করে। প্রণীত কর্মপত্রে আইনটির বিশ্লেষণ, কমিশনের দৃষ্টিতে আইনটির অপূর্ণতা বা অপ্রতুলতা এবং তা দূরীকরণের বা এদের প্রতিস্থাপন বা নতুন আইন প্রণয়নের বিষয়ে কমিশনের সাময়িক সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত থাকে। বিবেচ্য আইনটির সাথে সম্পর্কযুক্ত বা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণির জনগণের মধ্যে কর্মপত্রটি ব্যাপকভাবে প্রচার করে মন্তব্য ও মতামত আহবান করা হয়। কমিশন উক্ত বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ করে তাদের পরামর্শও গ্রহণ করে। প্রাপ্ত সকল মৌখিক ও লিখিত মন্তব্য বিবেচনায় এনে কমিশন চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশমালা প্রণয়ন করে। অতঃপর চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়। আইনটি প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে কিনা তা সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।

১৯৯৯ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত আইন কমিশন নিম্নোক্ত আইনে বিদ্যমান বিধানাবলির পরিবর্তে নতুন আইন  প্রণয়নের সুপারিশ সম্বলিত চূড়ান্ত প্রতিবেদন (প্রস্তাবিত নতুন আইনের খসড়া বিলসহ) সরকারের নিকট পেশ করে: মার্চেন্ডাইস মার্ক্স অ্যাক্ট, ১৮৮৯; কোর্টস অব অ্যাডমিরালটি অ্যাক্ট, ১৮৯১; কপিরাইট আইন, ১৯১৪; আরবিট্রেশন (প্রটোকল অ্যান্ড কনভেনশন) অ্যাক্ট, ১৯৩৭; ট্রেড মার্কস অ্যাক্ট, ১৯৪০; আরবিট্রেশন অ্যাক্ট, ১৯৪০; অর্থঋণ আদালত আইন, ১৯৯০। এগুলি ছাড়াও উপরিউক্ত সময়ে অন্যান্য যে সকল বিষয়ে আইন কমিশন মতামত ও সুপারিশ সরকারের নিকট দাখিল করে সেগুলি হচ্ছে: ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বিল, ১৯৯৬; সংবিধান (সংশোধন) বিল, ১৯৯৬ (বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ বিষয়ে); প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট, ১৯৮২ সংশোধন বিল; গণহত্যা অপরাধ নিরোধ ও শাস্তিদান বিষয়ক কনভেনশনের আলোকে গণহত্যা বিষয়ক আইন প্রণয়ন সম্পর্কিত প্রতিবেদন; নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেল সম্পর্কিত মতামত; ১৮৬০ সালের দন্ডবিধি; ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক দ্রব্য আইন; ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইন; ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশ এবং ১৯৯৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ আইন) আইন; নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণ কনভেনশন বিষয়ে মতামত; শিশু অধিকার কনভেনশন বিষয়ে মতামত; অধস্তন আদালতসমূহে মোকদ্দমার দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণে আশু করণীয় বিষয়ে প্রণীত প্রতিবেদন; দন্ডবিধির ‘দস্যুতা’ ও ‘ডাকাতি’ সংক্রান্ত অপরাধ বিষয়ে মতামত; ১৯০৭ সালের হেগ কনভেনশন বিষয়ে মতামত; ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের ধারা ১০(১) ও ১২(১) বিষয়ে প্রতিবেদন; প্রত্যেক আইনের ইংরেজি পাঠ; ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনে নতুন ধারা ১১৪-ক যুক্তকরণ বিষয়ে প্রতিবেদন; চোরাচালান দমন (গৌণ অপরাধ) আইন, ১৯৯৯ বিষয়ে মতামত; এবং ১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইন সংশোধন বিষয়ে মতামত।

 বিস্তারিত


বাংলাদেশের অর্থ, বানিজ্য ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা

বর্ননা নেই

অর্থনীতি সংক্রান্ত তত্ত্ব ও প্রবক্তা

 

তত্ত্ব                                           প্রবক্তা

খাজনা তত্ত্ব                                  ডেভিড রিকার্ডো

তুলনামূলক খরচ তত্ত্ব                     ডেভিড রিকার্ডো

শ্রম বিভাগ তত্ত্ব                             অ্যাডাম স্মিথ

অর্থনীতি                                     অ্যাডাম স্মিথ

আধুনিক অর্থনীতি                          পল স্যামুয়েলসন

ইউরো মুদ্রা                                  রবার্ট মুন্ডেল

ব্যবস্থাপনা                                   পিটার ড্রকার

আধুনিক ব্যবস্থাপনা                        হেনরি ফেয়ল

লেইসে ফেয়ার নীতি                       অ্যাডাম স্মিথ

সামাজিক চয়ন তত্ত্ব                        অমর্ত্য সেন

জনসংখ্যা তত্ত্ব                              টমাস ম্যালথাস

কাম্য জনসংখ্যা তত্ত্ব                       জন ডাল্টন

মজুরের উদ্ধৃত্ত মূল্য তত্ত্ব                   কার্ল মার্কস

ভোক্তার উদ্ধৃত্ত তত্ত্ব                         মার্শাল

মজুরি তহবিল তত্ত্ব                         জে এস মিল

গ্রেশাম বিধি                                 স্যার টমাস গ্রেশাম

সুদের নগদ পছন্দ ত্তত্ব                     লর্ড কীনস

অর্থের পরিমাণ তত্ত্ব                        আরভিং ফিশার

অভাব সাম্যের তত্ত্ব                         হ্যান্স সিংগার

দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র                           অধ্যাপক নার্কস

বিশ্বগ্রাম                                      মার্শাল ম্যাকলুহান

স্বাভাবিক মুনাফা                            আলফ্রেড মার্শাল

মজুরি নির্ধারণ তত্ত্ব                         ল্যাসলেকে।


অর্থনীতির সাধারন আলোচনা

অর্থনীতি সংক্রান্ত শব্দ ও পূর্ণরুপ:

GDP    -        Gross Domestic Product.

NDP    -        Net Domestic Product.

GNP    -        Gross National Product.

NNP    -        Net National Product.

VAT    -        Value Added Tax.

VGD    -        Vulnerable Group Development.

VGF    -        Vulnerable Group Feeding.

GR      -        Gratutious Telief.

OMS    -        Open Market sale.

EPB    -        Export Promotion Bureau.

BTC    -        Banglsdesg Tariff Commission.

OCI&E-       Office of Chief Controller of Imports and Exports.

BTB    -        Banglsdesh Tea Board.

RJSCF-        Registrar of joint Stock Companies and firms.

ICAB  -          Institute of Charatered Accountants of Bangladesh.

ICMAB-         Institute of Cost and Management Accountants of Bangladesh.

BRTI  -           Bangladesh Foreign Trade Institute.

MTBF  -         Medium Term Budget Framework.

PPP    -           Public-Private Partnership.

TIN    -            Taxpayers Identification Number.

NBR    -         National Board of Revenue.

DCCI  -          Dhaka Chamber of Commerce and Industry.

SEC    -         Securities and Exchange Commission.

DSE    -        Dhaka Stock Exchange.

CSE    -        Chottagong Srock Exchange.

PRSP  -        Poverty Reducation Strategy Papers.

LCG    -        Local Consultant Group.

SPCBL -      Security Printing Corporation (Bangladesh) Ltd.

ODA    -        Official Development Assistance.

ZPG    -        Zero Population Growth.

MDG    -        Millenium Development Goal.

GEP    -        Gurantee Express Post.

GNI    -            Gross Notional Income.

ECNEC-         Executive Commottee of the National Economic Council.

 


বাংলাদেশের অর্থনীতি

বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি মধ্য আয়ের উন্নয়নশীল এবং স্থিতিশীল অর্থনীতি। এই অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে রয়েছে মধ্যম হারের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, পরিব্যাপ্ত দারিদ্র, আয় বণ্টনে অসমতা, শ্রমশক্তির উল্লেখযোগ্য বেকারত্ব, জ্বালানী, খাদ্যশস্য এবং মূলধনী যন্ত্রপাথরি জন্য আমদানী নির্ভরতা, জাতীয় সঞ্চয়ের নিম্নহার, বৈদেশিক সাহায্যের ওপর ক্রমহ্রাসমান নির্ভরতা এবং কৃষি খাতের সংকোচনের সঙ্গে সঙ্গে পরিষেবাখাতের দ্রুত প্রবৃদ্ধি। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অগ্রগতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশের তৈরি পোষাক শিল্প বিশ্বের বৃহত্তম শিল্পের মধ্যে অন্যতম । ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত পাট ও পাটজাত পণ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এসময় পাট রপ্তানি করে দেশটি অধিকাংশ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করত। কিন্তু পলিপ্রোপিলিন পণ্যের আগমনের ফলে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দ থেকেই পাটজাত দ্রব্যের জনপ্রিয়তা ও বাণিজ্য কমতে থাকে।

বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭০-এর দশকে সর্বোচ্চ ৫৭% প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। তবে এ প্রবৃদ্ধি বেশীদিন টেকেনি। ১৯৮০-এর দশকে এ হার ছিলো ২৯% এবং ১৯৯০-এর দশকে ছিলো ২৪%।

বাংলাদেশ বর্ধিত জনসংখ্যার অভিশাপ সত্ত্বেও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এর মূল কারণ হচ্ছে অভ্যন্তরীন উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ধান উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়। বাংলাদেশের চাষাবাদের জমি সাধারণত ধান ও পাট চাষের জন্য ব্যবহৃত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে গমের চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে ধান উৎপাদনের দিক দিয়ে মোটামুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ। তা সত্ত্বেও মোট জনসংখ্যার ১০% থেকে ১৫% অপুষ্টির ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশের কৃষি মূলত অনিশ্চিত মৌসুমী চক্র, এবং নিয়মিত বন্য ও খরার উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। দেশের যোগাযোগ, পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাত সঠিকভাবে গড়ে না ওঠায় দেশটির উন্নতি ব্যহত হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল খনি রয়েছে এবং কয়লা, খনিজ তেল প্রভৃতির ছোটোখাটো খনি রয়েছে। বাংলাদেশের শিল্প-কাঠামো দুর্বল হলেও এখানে অদক্ষ শ্রমিকের সংখ্যা অঢেল এবং মজুরিও সস্তা।

বিস্তারিত


বাংলাদেশের বাজেট

জাতীয় বাজেট দেশের সরকার প্রণীত একটি বার্ষিক দলিল যাতে রাষ্ট্রের সাংবাৎসরিক আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়। বাজেট ইংরেজী শব্দ যার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ "থলে" বা ইংরেজীতে Bag। অতীতে থলেতে ভ'রে এটি আইন সভা বা সংসদে আনা হতো বলে এই দলিলটি 'বাজেট' নামে অভিহিত হয়ে আসছে।

জাতীয় বাজেটের মূল অংশ দুটি । প্রথম অংশ রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত। এই অংশে সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থা ও আদায় সংক্রান্ত প্রস্তবসমূহ বিবৃত থাকে দ্বিতীয় অংশে থাকে সরকারী ব্যয়ের প্রস্তাব সমূহ। প্রতি বৎসর একটি আইনপ্রস্তাব বা "বিল" আকারে জাতীয় বাজেট জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়। একে বলা হয় অর্থ বিল। সংসদ সদস্যরা অনুমোদনের পর এটি আইনে পরিণত হয়। বাংলাদেশে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড রাজস্ব প্রস্তাবসমূহ প্রণয়ন করে এবং অর্থ বিভাগ ব্যয় প্রস্তাবসমূহ প্রণয়ন করে।

বাংলাদেশে প্রতি বৎসর জুন মাসে জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করা হয় এবং অনুমোদনের পর তা পরবর্তী অর্থবৎসরের জন্য কার্যকর হয়। । দেশের অর্থ মন্ত্রী জাতীয় সংসদের অর্থ বিল পেশ করেন।

ফরাসি শব্দ Boudgette থেকে বাজেট শব্দের উৎপত্তি। বলা হয়ে থাকে ১৭৩৩ সালে যুক্তরাজ্যে সর্বপ্রথম বাজেট দেওয়া হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট পেশ করেন তখনকার সময়ের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ (৩০ জুন ১৯৭২)। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাজেট পেশ করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

এক নজরে বাজেট ঘোষণার তারিখ ও ঘোষক

অর্থ বছর ঘোষণার তারিখ মোট আকার (কোটি টাকায়) ঘোষক
১৯৭২-৭৩ ৩০ জুন ১৯৭২ ৭৮৬ তাজউদ্দিন আহমেদ
১৯৭৩-৭৪ ১৪ জুন ১৯৭৩ ৯৯৫ তাজউদ্দিন আহমেদ
১৯৭৪-৭৫ ১৯ জুন ১৯৭৪ ১০৮৪.৩৭ তাজউদ্দিন আহমেদ
১৯৭৫-৭৬ ২৩ জুন ১৯৭৫ ১৫৪৯.১৯ ডক্টর এ আর মল্লিক
১৯৭৬-৭৭ ২৬ জুন ১৯৭৬ ১,৯৮৯.৮৭ জিয়াউর রহমান
১৯৭৭-৭৮ ২৫ জুন ১৯৭৭ ২,১৮৪ জিয়াউর রহমান
১৯৭৮-৭৯ ৩০ জুন ১৯৭৮ ২,৪৯৯ জিয়াউর রহমান
১৯৭৯-৮০ ২ জুন ১৯৭৯ ৩,৩১৭ ড. মীর্জা নুরুল হুদা
১৯৮০-৮১ ৭ জুন ১৯৮০ ৪,১০৮ এম সাইফুর রহমান
১৯৮১-৮২ ৬ জুন ১৯৮১ ৪,৬৭৭ এম সাইফুর রহমান
১৯৮২-৮৩ ৩০ জুন ১৯৮২ ৪,৭৩৮ আবুল মাল আব্দুল মুহিত
১৯৮৩-৮৪ ৩০ জুন ১৯৮৩ ৫,৮৯৬ আবুল মাল আব্দুল মুহিত
১৯৮৪-৮৫ ২৭ জুন ১৯৮৪ ৬,৬৯৯ এম সাইদুজ্জামান
১৯৮৫-৮৬ ৩০ জুন ১৯৮৫ ৭,১৩৮ এম সাইদুজ্জামান
১৯৮৬-৮৭ ২৭ জুন ১৯৮৬ ৮,৫০৪ এম সাইদুজ্জামান
১৯৮৭-৮৮ ১৮ জুন ১৯৮৭ ৮,৫২৭ এম সাইদুজ্জামান
১৯৮৮-৮৯ ১৬ জুন ১৯৮৮ ১০,৫৬৫ এম এ মুনিম
১৯৮৯-৯০ ১৫ জুন ১৯৮৯ ১২,৭০৩ ড. ওয়াহিদুল হক
১৯৯০-৯১ ১৪ জুন ১৯৯০ ১২,৯৬০ এম এ মুনিম
১৯৯১-৯২ ১২ জুন ১৯৯১ ১৫,৫৮৪ এম সাইফুর রহমান
১৯৯২-৯৩ ১৮ জুন ১৯৯২ ১৭,৬০৭ এম সাইফুর রহমান
১৯৯৩-৯৪ ১০ জুন ১৯৯৩ ১৯,০৫০ এম সাইফুর রহমান
১৯৯৪-৯৫ ০৯ জুন ১৯৯৪ ২০,৯৪৮ এম সাইফুর রহমান
১৯৯৫-৯৬ ১৫ জুন ১৯৯৫ ২৩,১৭০ এম সাইফুর রহমান
১৯৯৬-৯৭(অন্তর্বর্তী) ২০ জুন ১৯৯৬ - ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ
১৯৯৬-৯৭(মূল) ২৮ জুলাই ১৯৯৭ ২৪,৬০৩ শাহ এ এম এস কিবরিয়া
১৯৯৭-৯৮ ১২ জুন ১৯৯৭ ২৭,৭৮৬ শাহ এ এম এস কিবরিয়া
১৯৯৮-৯৯ ১১ জুন ১৯৯৮ ২৯,৫৩৭ শাহ এ এম এস কিবরিয়া
১৯৯৯-০০ ১০ জুন ১৯৯৯ ৩৪,৫১২ শাহ এ এম এস কিবরিয়া
২০০০-০১ ৮ জুন ২০০০ ৩৮,৫২৪ শাহ এ এম এস কিবরিয়া
২০০১-০২ ৭ জুন ২০০১ ৪২,৩০৬ শাহ এ এম এস কিবরিয়া
২০০২-০৩ ৬ জুন ২০০২ ৪৪,৮৫৪ এম সাইফুর রহমান
২০০৩-০৪ ১২ জুন ২০০৩ ৫১,৯৮০ এম সাইফুর রহমান
২০০৪-০৫ ১০ জুন ২০০৪ ৫৭,২৪৮ এম সাইফুর রহমান
২০০৫-০৬ ৯ জুন ২০০৫ ৬১,০৫৮ এম সাইফুর রহমান
২০০৬-০৭ ৮ জুন ২০০৬ ৬৯,৭৪০ এম সাইফুর রহমান
২০০৭-০৮ ৭ জুন ২০০৭ ৮৭,১৩৭ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম
২০০৮-০৯ ৯ জুন ২০০৮ ৯৯,৯৬২ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম
২০০৯-১০ ১১ জুন ২০০৯ ১,১৩,১৭০ আবুল মাল আব্দুল মুহিত
২০১০-১১ ১০ জুন ২০১০ ১,৩২,১৭০ আবুল মাল আব্দুল মুহিত
২০১১-১২ ৯ জুন ২০১১ ১,৬৩,৫৮৯ আবুল মাল আব্দুল মুহিত
২০১২-১৩ ৭ জুন ২০১২ ১,৯১,৭৩৮ আবুল মাল আব্দুল মুহিত
২০১৩-১৪ ০৬ জুন ২০১৩ ২,২২,৪৯১ আবুল মাল আব্দুল মুহিত
২০১৪-১৫ ০৫ জুন ২০১৪ ২,৫০,৫০৬ আবুল মাল আব্দুল মুহিত
২০১৫-১৬ ০৪ জুন ২০১৫ ২,৯৫,১০০ আবুল মাল আব্দুল মুহিত
২০১৬-১৭ ০২ জুন ২০১৬ ৩,৪০,৬০৫ আবুল মাল আব্দুল মুহিত

বিস্তারিত


কর ও রাজস্ব

কর: কর হলো সরকারি কর্তৃপক্ষকে এর দ্বারা সরবরাহকৃত দ্রব্য বা সেবার বিনিময়ে প্রদেয় মূল্য।

প্রত্যক্ষ কর (Direct Tax): এই কর শুধু সেই ব্যক্তিকে প্রদান করতে হয় যে আইনগতভাবে উক্ত কর প্রদানে বাধ্য। যেমন- Income Tax (আয়কর)।

পরোক্ষ কর (Income Tax) : এই কর একজনের ওপর ধার্য হলেও তা আংশিক বা পূর্ণভাবে অন্য কোনো ব্যক্তি প্রদান করতে পারে। যেমন- মূল্য সংযোজন কর (VAT)।

Canon of Taxation : একটি ভালো করের বৈশিষ্ট্য বা গুণাবলী কে  Canon of Taxation বলে।

Tax-GDP Ratio : Gross Domestic Product (GDP)-এর যত অংশ Tax থেকে অর্জিত হয় তা-ই Tax GDP Ratio.

আয়কর (Income Tax) : কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর ধার্যকৃত করকে আয় কর (Income Tax) বলে।

ট্যারিফ: ট্যারিফ হচ্ছে আমদানি বা রপ্তানিকৃত পণ্যের শুল্ক। ট্যারিফের ক্ষেত্রে আমদানি বা রপ্তানিকৃত পণ্যের শুল্ক একটি তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে নির্দষ্ট করা থাকে।

খেলাপি কর দাতা (Assessee in Default) : আয়কর প্রদান করতে ব্যর্থ করদাতাকে খেলাপি করদাতা বলা হয়।

এশিয়ান পোভার্টি লাইন: দৈনিক ১ ডলার ৩৫ সেন্ট আয়কে সর্বনিম্ন ধরে এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দারিদ্র্য পরিমাপের মাপকাঠি।

Excise