অন্যান্য শ্রেণি ও বিষয়

বি সি এস প্রিলিমিনারি: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য

শব্দ ও বাক্যে প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ

ব্যাকরণ ভাষাকে সুন্দর, মার্জিত ও শৃংখলাবদ্ধ করতে সাহায্য করে। তাই ব্যাকরণ ঠিক রাখলে ভাষার অপ্রয়োগ হয় না।  ব্যাকরণজ্ঞান থাকলে ভাষার অপপ্রয়োগ সম্পর্কে সচেতন থাকা যায়। বিভিন্ন কারণে ভাষার অপপ্রয়োগ ঘটতে পারে। যেমন : বানান, শব্দ রূপান্তর, শব্দদ্বিত্ব, বচনজাত, নির্দেশক, সন্ধি, সমাস, উপসর্গ, বিভক্তি, প্রত্যয়,চিহ্ন, পক্ষ, কারক, বাচ্য, বাগধারা ইত্যাদি। 

বিশেষ্য ও বিশেণের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

১. অশুদ্ধবাক্য : লোকটা নির্দোষী। শুদ্ধবাক্য : লোকটা নির্দোষ।

সাধু চলিত ভাষারীতির মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

১. তাহার কথা মতো চলা ঠিক নয়। শুদ্ধবাক্য : তার কথা মতো চলা ঠিক নয়।

২. যা বলিব সত্যবলিব। শুদ্ধবাক্য : যাহা বলিব সত্য বলিব/ যা বলব সত্য বলব।

বানানের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

১. পাষান হৃদয়ও ভালোবাসায় গলে যায়। শুদ্ধবাক্য : পাষাণ হৃদয়ও ভালোবাসায় গলে যায়।  

শব্দের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

শব্দের মাধ্যমে ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ ঘটানো হয়। যেমন : 

১. রহিম ছেলেদের মধ্যে কনিষ্ঠতম/তর। 

শুদ্ধবাক্য : রহিম ছেলেদের মধ্যে কনিষ্ঠ।

২. শুনেছি আপনি স্বস্ত্রীক ঢাকায় থাকেন। শুদ্ধবাক্য :

শুনেছি আপনি সস্ত্রীক/স্ত্রীসহ ঢাকায় থাকেন।

৩. বাসের ধাক্কায় তিনি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। 

শুদ্ধবাক্য : বাসের ধাক্কায় তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।

৪. শুধু নিজের না, দেশের উৎকর্ষতা সাধন করা প্রত্যেকেরই উচিত।

শুদ্ধবাক্য : শুধু নিজের না, দেশের উৎকর্ষ/উৎকৃষ্টতা সাধন করা প্রত্যেকেরই উচিত।

৫. সে ক্যান্সারজনিত কারণে মারা গিয়েছে।

শুদ্ধবাক্য : সে ক্যান্সার/ক্যান্সারজনিক রোগে মারা গিয়েছে।

বচনের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

একটি বাক্যে দুবার বা তিনবার বহুচিহ্ন ব্যবহার করে বাক্যের গুণ নষ্ট করে। যেমন: গ্রামগুলো সব, লক্ষ লক্ষ শিশুগুলো সব, সব রাজাকারদের, সকল যুদ্ধাপরাধীদের ইত্যাদি। ‘কিছু’ ব্যবহার হলে পরে বহুবচন হয় না। বচন ঘাটতি বা বাহুল্যের কারণেও বচন ভুল হতে পারে। যেমন:

১. সকল/সমস্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করেছে জনতা।

শুদ্ধবাক্য : সকল/সমস্ত যুদ্ধাপরাধীর/যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করেছে জনতা।

২. লক্ষ লক্ষ জনতারা সব সভায় উপস্থিত হয়েছিল।

শুদ্ধবাক্য : লক্ষ লক্ষ জনতা সভায় উপস্থিত হয়েছিল।

৩. যেসব ছাত্রদের নিয়ে কথা তারা বখাটে।

শুদ্ধবাক্য : যেসব ছাত্রকে নিয়ে কথা তারা বখাটে।

৪ আমরা এমন কিছু মানুষদের চিনি, যারা এখনও দেশের জন্য প্রাণ দেবে।

শুদ্ধবাক্য : আমরা এমন কিছু মানুষকে চিনি যারা এখনও দেশের জন্য প্রাণ দেবে।

৫. কিছু কিছু মানুষ আছে যে অন্যের ভালো দেখতে পারে না।

শুদ্ধবাক্য : কিছু কিছু মানুষ আছে যারা অন্যের ভালো দেখতে পারে না।

নির্দেশকের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

‘টা/টি/খানা/খানি’ ব্যবহার করে শব্দকে নির্দিষ্ট করলে তার আগে ‘এই’ বা ‘ঐ’ ব্যবহার করে ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ ঘটানো হয়। যেমন : 

১. ঐ লোকটি খুব সৎ। শুদ্ধবাক্য : লোকটি খুব সৎ।

২. আমি এই মানুষটিকে চিনি। শুদ্ধবাক্য : আমি এই মানুষকে চিনি।/আমি মানুষটিকে চিনি।

সন্ধির মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

সন্ধি শব্দ গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম তবে সংস্কৃত ও সংস্কৃত শব্দে সন্ধি করতে হয়; সংস্কৃত ও বাংলা শব্দের সন্ধি হয় না। সন্ধির মাধ্যমে ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ ঘটানো হয়। যেমন: 

১. ব্যাপারটি ছিল আপনার জন্য লজ্জাস্কর।

শুদ্ধবাক্য : ব্যাপারটি ছিল আপনার জন্য লজ্জা কর বা লজ্জাজনক।

৩. এবারের ইলেকশান করে আপনে নাকি খুব দুরাবস্থায় আছেন।

শুদ্ধবাক্য : এবারের ইলেকশান করে আপনে নাকি খুব দুরবস্থায় আছেন।

৪. ইত্যাবসারে বৃদ্ধ লোকটির দিন কাটে।

শুদ্ধবাক্য : ইত্যবসারে বৃদ্ধ লোকটির দিন কাটে।

সমাসের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

‘সহ’ অর্থ বুঝালে ‘স্ব’ না বসে ‘স’ বসে। সংস্কৃত শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত শব্দের সমাস হয়। সমাসজাত শব্দ ও ব্যাসবাক্য একই সঙ্গে বসে না। সমাসবদ্ধ শব্দের বানানে শুধু মাঝের ঈ-কার ই-কার হয়। সমাসবদ্ধ না করে ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ ঘটানো হয়। যেমন :

১. ঘি মাখা ভাত ডিম দিয়ে খেতে খুব মজা। শুদ্ধবাক্য : ঘিভাত ডিম দিয়ে খেতে খুব মজা।

২. আগে সিংহচিহ্নিত আসনে বসে রাজা দেশ চালাতেন।

শুদ্ধবাক্য : আগে সিংহাসনে বসেরাজা দেশ চালাতেন।

৩. রীতিকে অতিক্রম না করেও যথারীতি সে বড়লোক।

শুদ্ধবাক্য : রীতিকে অতিক্রম না করেও সে বড়লোক।

বিভক্তির মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

বহুবচনজাতীয় শব্দে ‘কে’ বসে না। যেমন: তাদেরকে, আমাদেরকে, পাগোলগুলোকে। আবার এক শব্দে দুটি বিভক্তি বসলে শব্দের গুণ হারায়। যেমন: বুকেতে, চোখেতে। বস্তুবাচক বা প্রাণিবাচক শব্দের ‘কে, রে’ বসে না। যেমন: ঘড়িকে, কলমকে, ছগলকে, বইকে, পাখিরা, মেঘরা, গানকে, সাপকে, মাছকে। তবুও বিভক্তির মাধ্যমে ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ ঘটানো হয়। যেমন : 

১. ভিক্ষুকদেরকে ভিক্ষা দাও। শুদ্ধবাক্য : ভিক্ষুককে ভিক্ষা দাও। ভিক্ষুকদের ভিক্ষা দাও।

৩. তাদেরকে দিয়ে একাজ করিও না। শুদ্ধবাক্য : তাদের দিয়ে একাজ করিও না।

প্রত্যয়ের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

প্রত্যয় শব্দ গঠন করতে সাহায্য করে, শব্দকে পদে পরিণত করতে সাহায্য করে। প্রত্যয় ব্যবহার না করে অথবা একটি শব্দের দুটি প্রত্যয় ব্যবহার করে শব্দের গুণ নষ্ট করা হয়। যেমন : বুকেতে, দৈন্যতা, সখ্যতা (সখ+য-ফলা+ তা) ইত্যাদি। অতিরিক্ত প্রত্যয় ব্যবহারের মাধ্যমে ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ ঘটানো হয়। যেমন : 

১. দারিদ্র কবি কাজী নজরুল ইসলামকে মহান করেছে।

শুদ্ধবাক্য : দারিদ্র্য কবি কাজী নজরুল ইসলামকে মহান করেছে।

২. বিকার লোক যে কোন সময় ক্ষতি করতে পারে।

শুদ্ধবাক্য : বিকৃত লোক যে কোন সময় ক্ষতি করতে পারে।

উপসর্গের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

অতিরিক্ত উপসর্গ ব্যবহারের মাধ্যমে ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ ঘটানো হয়। যেমন : 

১. ফুল দিয়ে তাঁকে সুস্বাগতম জানানো সবার কর্তব্য।

শুদ্ধবাক্য : ফুল দিয়ে তাঁকে স্বাগতম জানানো সবার কর্তব্য।

২. অক্লান্তিহীনভাবে প্রজন্ম চত্বরে সমায়েত হচ্ছে।

শুদ্ধবাক্য : ক্লান্তিহীনভাবে প্রজন্ম চত্বরে সমায়েত হচ্ছে।

চিহ্নের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

১. সংস্কৃতিতে বিশেষণ ও বিশেষ্য দুটিকেই চিহ্নের আওতায় আনা হয়। যেমন: নর—সুন্দর বালক আর নারী—সুন্দরী বালিকা কিন্তু বাংলাতে বিশেষণকে ঠিক রেখে শুধু বিশেষ্যকে নর বা নারী প্রকাশ করা হয়। 

২. সংস্কৃতিতে দুটি বিশেষ্যকেই চিহ্নের আওতায় আনা হয়। যেমন: মেয়েটি পাগলি, আসমা অস্থিরা কিন্তু বাংলাতে দুটি বিশেষ্যের একটিকে নারিচিহ্নের আওতায় আনা হয়। যেমন: মেয়েটি পাগল, আসমা অস্থিরা ইত্যাদি।

৩. সংস্কৃতিতে ঈ বা ইনি বা নী প্রত্যয়ই একসঙ্গে বসে কিন্তু বাংলায় বসে না। যেমন: অভাগা—অভাগী—অভাগিনী।

৪. সংস্কৃতিতে ক্ষুদ্রার্থবাচক কিছু ক্লীববাচক শব্দকে নর বা নারী বাচক করা যায় যা বাংলাতে সঠিক নয়। যেমন: নাটক—নাটিকা, উপন্যাস—উপন্যাসিকা, পুস্তক—পুস্তিকা।

চিহ্নের ভুল ব্যবহারের মাধ্যমে ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ ঘটানো হয়। যেমন: 

১. রহিমা খুব সুন্দরী। শুদ্ধবাক্য : রহিমা খুব সুন্দর।

২. সেলিনা হোসেন একজন বিদ্বান লেখিকা। শুদ্ধবাক্য : সেলিনা হোসেন একজন বিদ্বান লেখক। /সেলিনা হোসেন একজন বিদুষী লেখিকা।

পক্ষের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

পক্ষের ভুল ব্যবহারের মাধ্যমে ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ ঘটানো হয়। যেমন: 

১. আমি অর্থাৎ হাসান জেনে শুনে ভুল করি না।

শুদ্ধবাক্য : আমি অর্থাৎ হাসান জেনে শুনে ভুল করে না।

২. এ ব্যাপারে আমার অর্থাৎ হাসানের ভুল হবে না।

শুদ্ধবাক্য : এ ব্যাপারে আমার অর্থাৎ হাসানের ভুল হয় না।

কারকের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

বস্তুর প্রাণিবাচক শব্দে ‘কে’ বসে না। ব্যক্তির নামের সঙ্গেও ‘কে’ বসে না।কারকের ভুল ব্যবহারের মাধ্যমে ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ ঘটানো হয়। যেমন: 

১. সাপুড়ে সাপকে খেলায়। শুদ্ধবাক্য : সাপুড়ে সাপ খেলায়।

২. একসময় আমের কাননে মিটিং বসেছিল।

শুদ্ধবাক্য : একসময় আম্রকাননে মিটিং বসেছিল।

/একসময় আমের বাগানে মিটিং বসেছিল।

সমোচ্চারিত শব্দের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

সমোচ্চারিত শব্দের ভুল ব্যবহারের মাধ্যমে ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ ঘটানো হয়। যেমন: 

১. তাড়া আমরাতলায় বসে আমরা খাওয়ার সময় মালির তারা খেয়েছে।

শুদ্ধবাক্য : তারা আমড়াতলায় বসে আমড়া খাওয়ার সময় মালির তাড়া খেয়েছে।

২. সে ভুড়ি ভুড়ি খেয়ে ভুরিটি বাড়িয়েছে। 

শুদ্ধবাক্য : সে ভুরি ভুরি খেয়ে ভুঁড়িটি বাড়িয়েছে।

শব্দদ্বিত্বের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

ফলাফল/ফলে শব্দটি ঠিক ব্যবহার কিন্তু এর প্রতিশব্দ হিসেবে লেখা হয় ফলশ্রুতিতে’ তাহলে শব্দটি হবে ভুল। কারণ ‘ফলশ্রুতি’র ‘শ্রবণ’ কোন বিষয়ের ফল নয়। শব্দদ্বিত্বের ভুল ব্যবহারের মাধ্যমে ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ ঘটানো হয়। যেমন: 

১. ঘামজলে তার শার্ট ভিজে গেছে। শুদ্ধবাক্য : ঘামে তার শার্ট ভিজে গেছে।

২. অশ্রুজলে তার কপল ভিজে গেছে। শুদ্ধবাক্য : অশ্রুতে তার কপল ভিজে গেছে।

৩. ঘরটি ছিমছিমে অন্ধকার। শুদ্ধবাক্য : ঘরটি ঘুটঘুটে অন্ধকার।

ভুল শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

শব্দের পরে আরো শব্দ বসে শব্দেকে সঠিক করে অথবা বেশি শব্দ বসালে বাক্যটি ভুল হয়ে যায়। এভাবে অতিরিক্ত শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ ঘটানো হয়। যেমন: 

১. পরবর্তীতে আপনি আসবেন। শুদ্ধবাক্য : পরবর্তিকালে /পরবর্তী সময়ে আপনি আসবেন।

২. আমি অপমান হয়েছি। শুদ্ধবাক্য : আমি অপমানিত হয়েছি।

৩. সূর্য উদয় হয়নি। শুদ্ধবাক্য : সূর্য উদিত হয়নি।

৪. সত্য প্রমাণ হোক। শুদ্ধবাক্য : সত্য প্রমাণিত হোক।

৬ তার কথার মাধুর্যতা নাই। শুদ্ধবাক্য : তার কথার মাধুর্য/মধুরতা নাই।

৫. রাধা দেখতে খুব সুন্দরী ছিল। শুদ্ধবাক্য : রাধা দেখতে খুব সুন্দর ছিল।

৬. এটি অপক্ক হাতের কাজ। শুদ্ধবাক্য : এটি অপটু হাতের কাজ।

৭. স্বল্পবিদ্যা ভয়ংকরী। শুদ্ধবাক্য : অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী।

৮. অভাবে চরিত্র নষ্ট। শুদ্ধবাক্য : অভাবে স্বভাব নষ্ট।

৯. বিদ্বান মূর্খ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর। শুদ্ধবাক্য : বিদ্বান মূর্খ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।

১০. ছেলেটি শুধুমাত্র /কেবলমাত্র ১০টি টাকার জন্য মারামারি করল।

শুদ্ধবাক্য : ছেলেটি শুধু /মাত্র /কেবল ১০টি টাকার জন্য মারামারি করল।

১১. রবীন্দ্রনাথ ভয়ঙ্কর কবি ছিলেন। শুদ্ধবাক্য : রবীন্দ্রনাথ বিখ্যাত কবি ছিলেন।

বাচ্যের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

বাংলায় ক্রিয়ার+ইত/ষ্ট ইত্যাদি যোগ করে ক্রিয়াকে কর্মবাচ্যের ক্রিয়া করা হয়। বাচ্যের ভুল ব্যবহারের মাধ্যমে ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ ঘটানো হয়। যেমন: 

১. সূর্য পূর্বদিকে উদয় হয়। শুদ্ধবাক্য : সূর্য পূর্বদিকে উদিত হয়।

২. আপনার কি মনে হয় না, বিধি লঙ্ঘন হয়েছে।

শুদ্ধবাক্য : আপনার কি মনে হয় না, বিধি লঙ্ঘিত হয়েছে।

৩. আপনার কাজের জন্য দেশের গৌরব লোপ পেয়েছে।

শুদ্ধবাক্য : আপনার কাজের জন্য দেশের গৌরব লুপ্ত হয়েছে।

এককথায় প্রকাশের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

এককথায় প্রকাশের ভুল ব্যবহারের মাধ্যমে ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ ঘটানো হয়। যেমন: 

১. পারলে চারিদিকে প্রদক্ষিণ করো। শুদ্ধবাক্য : পারলে চারিদিকে ঘোরো।/পারলে প্রদক্ষিণ করো।

১. সে হাতে কলমে ব্যবহারিক শিক্ষা গ্রহণ করেছে।

শুদ্ধবাক্য : সে হাতেকলমে শিক্ষা গ্রহণ করেছে। /সে ব্যবহারিক শিক্ষা গ্রহণ করেছে।

প্রবাদের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

ভুল ব্যবহারের মাধ্যমে ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ ঘটানো হয়। যেমন: 

১. স্বল্প বিদ্যা ভয়ংকরী। শুদ্ধবাক্য : অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী।

২. আমি বাঁচলে বাপের নাম। শুদ্ধবাক্য : আপনি বাঁচলে বাপের নাম।

৩. অনেক সন্ন্যাসিতে গাজন নষ্ট। শুদ্ধবাক্য : অধিক সন্ন্যাসিতে গাজন নষ্ট।

৪. বেশি চালাকের গলায় দড়ি। শুদ্ধবাক্য : অতি চালাকের গলায় দড়ি।

বাগধারার মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

বাগধারার ভুল ব্যবহারের মাধ্যমে ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ ঘটানো হয়। যেমন: 

১. পরীক্ষায় নকল করাও নদী চুরি। শুদ্ধবাক্য : পরীক্ষায় নকল করাও পুকুর চুরি।

২. এমন লেখাপড়া করলে পরীক্ষায় মুরগির ডিম পাবা।

শুদ্ধবাক্য : এমন লেখাপড়া করলে পরীক্ষায় ঘোড়ার ডিম পাবা।

৩. গরুর ঘাস কাটো, পরীক্ষায় ভালো করতে পারলে না।

শুদ্ধবাক্য : ঘোড়ার ঘাস কাটো, পরীক্ষায় ভালো করতে পারলে না।

বানান ও বাক্য শুদ্ধি

কথার শুদ্ধতা বজায় রাখার জন্য যেমন শুদ্ধ উচ্চারণ দরকার হয় তেমনি ভাষার শুদ্ধতা বজায় রাখান জন্য দরকার প্রমিত বানান। এই উদ্দেশ্যে পঞ্চম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বানান প্রশ্নে আওতায় আনা হয়েছে।   

বানন সময়োপযোগী হয়ে থাকে। শব্দের প্রমিত বর্ণ বিশ্লেষণ হলো বানান। সংস্কৃত বর্ণন থেকে বানান এসেছে যার অর্থ শব্দের মধ্যকার বর্ণসমূহের বিশ্লেষণ বা ক্রমিক বর্ণন (বর্ণ+অন)। শব্দের উৎপত্তি, অর্থ ও গঠন অনুসারে শব্দের প্রমিত লিখিত রূপকে বানান বলে। Spelling is the act of naming the letters of words অর্থাৎ বানান হলো শব্দে অবস্থানরত বর্ণের লিখিত নিয়ম। শব্দ বিভিন্ন ভাষা থেকে আসে বলে বানান মনে রাখা কষ্টসাধ্য। বানান একটি পদ্ধতি তাই সর্তকতার সাথে পাঠ করে মনে রাখতে হয়। উচ্চারিত শব্দের লিখিত রূপই বানান তাই শব্দের উচ্চারণ ও লিখিত রূপ এক হয় না। যেমন: অণু/ওনু, কবি/ কোবি, বধূ/বোধু, স্বাগতম/ শাগোতোম, পদ্ম/পোদদো, আত্মা/আততা, সমাস/শমাশ ইত্যাদি। তবে প্রায় নির্দিষ্ট নিয়মের মাধ্যমেই এমনটি হয়ে থাকে। বাংলা বানানের নির্দিষ্ট রূপ দেয়া যায় না বলে বানানকে ‘প্রমিত বানান’ বলা হয়। শব্দের উৎপত্তি, গঠন ও উচ্চারণ অনুসারে সময়োযোগী করে লিখিত বানানকে প্রমিত বানান বলে।

বানান অপ্রমিতের কারণ

সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে বানান লেখাটাই প্রমিত বানান। বিভিন্ন কারণে বানান অপ্রমিত হতে পারে। যেমন :

১. শব্দের উৎপত্তিগত কারণে বানান অপ্রমিত হয়। সংস্কৃত শব্দের বানান যেমন তেমন না তদ্ভব, দেশি, বিদেশি শব্দের বানান। যেমন: বৈশাখী, বোশেখী, সূয্যী, সন্ধ্যে, ঠাণ্ড, ইঞ্জিন, নামায, টিস্যু, গ্যেটে, একাডেমী।

২. শব্দের গঠনগত কারণে বানান অপ্রমিত হয়। যেমন : শ্রেণী, প্রাণীবিদ্যা ইত্যাদি।

৩. বানান বিধানগত কারণে বানান অপ্রমিত হয়। যেমন : প্রমান, লজ্জাস্কর, স্বত্ত্ব।

৪. কার ও ফলা, যুক্তবর্ণ ভুল ব্যবহারের কারণে বানান অপ্রমিত হয়। যেমন : করল—করলো, জ্যোতি—জ্যোতি, বক্ষ-বহ্ম, অপরাহ্ন। 

৫. সমার্থক বা সমোচ্চারিত শব্দ ভুল ব্যবহারের কারণে বানান অপ্রমিত হয়। যেমন : হিরণ—কিরণ—জ্যোতি, অংশ—অংস, অশ্ম—অশ্ব,   

৬. উচ্চারণগত কারণে বানান অপ্রমিত হয়। যেমন : কলোম, করছিলো, কোরবো, রাসূল, সূরা, ইস্যু, টিশ্যু ইত্যাদি।

৭. সমধ্বনি বা বর্ণের ভুল ব্যবহারের কারণে বানান অপ্রমিত হয়। যেমন : অ—ও—য়, আ—য়া, ই—ঈ, উ—ঊ, জ-য, ঙ—ং, ত—ৎ, ত্ত—ত্ত্ব—ত্য—ত্ম, ণ—ন—ঞ, র-ড়-ঢ়, শ—স—ষ ইত্যাদি।

৮. শব্দের উৎপত্তি ও গঠন অনুসারে ‘ই/ঈ/উ/ঊ-কার’, ‘ঙ/ং’, চন্দ্রবিন্দু, বিসর্গ বা য-ফলা হয়ে থাকে। সেহেতু এগুলোর সঠিক ব্যবহার জানা দরকার। শব্দের উৎপত্তি ও গঠন অনুসারে ণত্ব (ণ/ন), ষত্ব (ষ/স/শ), রত্ব (র/ড়/ঢ়), জত্ব (জ/য), তত্ব (ত/ৎ) ইত্যাদি বানান ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

৯. উচ্চারণ অনুসারে বানান লিখলে তা প্রমিত হয় না। যেমন : কলোম, কলোস, করছিলো, কোরবো ইত্যাদি।  

১০. অযাচিত ভুল ব্যবহার করে বানান অপ্রমিত বরা হয় (আ-কার বা ও-কার)। যেমন: ‘আম’ শব্দকে ‘অম’ লেখা। ‘করল’ শব্দকে ‘করলো’ লেখা। 

১১. সঠিক নিয়ম অমান্য করে বানান অপ্রমিত করা হয়। ইন-প্রত্যয়জাত শব্দ ঈ-কার দিয়ে লেখা হয়। যেমন : জ্ঞানী, গুণী, গাভী। ইন-প্রত্যয়জাত শব্দ ই-কার দিয়ে লেখা হয়। যেমন : গ্রন্থি, দায়ি, শ্রেণি।

বানান প্রমিতকরণের উপায়

অনেক ভাষা (অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, আর্য বা বৈদিক, সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত, অপভ্রংশ, দেশি, আঞ্চলিক ও বিদেশি) থেকে আগত শব্দের বানান হতে পারে। আবার শব্দের গঠন ও উচ্চারণগতভাবেও বানান হতে পারে। ভাষা হলো সংস্কারের ফসল।

আঞ্চলিক ভাষা হলো চলিত ভাষার সংস্কার। চলিত ভাষা হলো সাধুভাষার সংস্কার। সাধুভাষা হলো সংস্কৃত ভাষার সংস্কার। সংস্কৃত ভাষার হলো তৎসম ভাষার সংস্কার। তৎসমভাষা হলো বৈদিক ভাষার সংস্কার। এই যে ধারাবাহিক সংস্কার তা বহু বছরের, বহু কালের, বহু শতাব্দীর। সমস্ত বানানকে তিনটি উপায়ে প্রমিত করা যেতে পারে। যেমন :

শব্দের উৎপত্তিগত বানান

সংস্কৃত শব্দ, খণ্ডসংস্কৃত শব্দ, তদ্ভবশব্দ, আঞ্চলিক শব্দ, দেশি শব্দ, প্রাদেশিক শব্দ, বিদেশি শব্দ ও পারিভাষিক শব্দ অনুসারে শব্দের বানান নির্ধারণ হতে পারে। যেমন:

সংস্কৃত শব্দ

সংস্কৃত শব্দের বানান অপরিবর্তিত থাকে। যেমন: গাত্র, কর্ণ, বৃক্ষ, মৎস্য, স্বর্ণ, ক্ষেত্র, করিতেছি, করিতেছিলাম।

খণ্ডসংস্কৃত শব্দ

খণ্ডসংস্কৃত শব্দের বানান পরিবর্তনশীল। যেমন: গতর, গিন্নি, কান, গাছ, মাছ, সোনা, খেত, করছি, করছিলাম।

তদ্ভব শব্দ

তদ্ভব শব্দের বানান পুরোটাই পরিবর্তিত রূপ ধারণ করে। ঈ-কার হয়ে যায় ই-কার। ঊ-কার হয়ে যায় উ-কার। ণ-হয়ে যায় ন। য-ফলা থাকে না। যেমন: বোশেখি, কুমির, সুয্যি/সুজ্জি, সোনা, বরন, কিষান, সন্ধে।

আঞ্চলিক শব্দ

আঞ্চলিক শব্দের বানান পুরোটাই পরিবর্তন হয়। যেমন: হাত>ড্যানা, ষাঁড়>হাড় ইত্যাদি।

দেশি শব্দ : দেশি শব্দের বানান নিজস্ব রূপে থাকে। যেমন: কুলা, চুলা, কুড়ি।

প্রাদেশিক শব্দ

সংস্কৃত বাদে ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের শব্দ বাংলা প্রবেশ করেছে পরিবর্তিত রূপে। প্রাদেশিক শব্দে ঙ/ছ/য/ণ/ষ/ঞ্জ/ঞ্চ/ঈ-কার/ঊ-কার বসে না। যেমন: হিন্দি: কাহিনি (কাহানি), ঠান্ডা (ঠান্ডি)।

বিদেশি শব্দ

বিদেশি শব্দের বানান পুরোটাই পরিবর্তিত রূপ ধারণ করে। ‘আ’ না হয়ে ‘য়া’ হয় তবে ‘কোরআন’সহ কয়েকটি বানানে ‘আ’ লেখা হয়। শব্দের শেষে ‘হ’ বসে না তবে ‘আল্লাহ’ শব্দে বসানো হয়। ‘ঈ-ঊ’ না হয়ে ‘ই/উ’ হয়। ‘ঙ/ছ/ঞ্জ/ঞ্চ/ণ/ণ্ট/ ণ্ড/ষ্ট’ ইত্যাদির পরিবর্তে স/শ/নজ/নচ/ন/ন্ট/ন্ড/স্ট’ হয়। কিন্তু এখনও ‘ঙ/ছ/ঞ্জ/ ঞ্চ/ণ/ণ্ট/ ণ্ড/ষ্ট’ দিয়ে লেখা হচ্ছে। যেমন: চীন, লুঙ্গি, ডেঙ্গু, ঝাণ্ডা, ঠাণ্ডা, লণ্ঠন, মিছরি, পছন্দ, তীর (ধনুক), ইঞ্জিনিয়ার, সেঞ্চুরী, বাঙ্কার, খ্রিষ্টার্ন, যিশু ইত্যাদি। সকল প্রাদেশিক ও বিদেশি শব্দে ঈ-কার না বসে ই-কার বসে। যেমন: শুমারি, আমদানি, খানদানি, খুশকি, খুশি, বন্দি, , জমি, জামদানি, জিন্দাবাদ, জিন্দেগি, দরজি, দাগি, বিরিয়ানি, মুরগি, আবির, আমিন, আসামি, গরিব, কেরানি, দাদি, নানি, চাচি, মাসি, ভাবি, কাহিনি, কোম্পানি, জানুয়ারি। এখনও লেখা হচ্ছে : জঙ্গি, জিঞ্জির, সেঞ্চুরি, চৌধুরী। চীন, লুঙ্গি, ডেঙ্গু, ঝাণ্ডা, ঠাণ্ডা, লণ্ঠন, মিছরি, পছন্দ, তীর (ধনুক), ইঞ্জিনিয়ার, সেঞ্চুরী, বাঙ্কার, খ্রিষ্ট, খ্রিষ্টার্ন, যিশু।

পারিভাষিক শব্দ

রূপ, রস, গন্ধ, কাজ অনুসারে বিশেষ অর্থ প্রকাশের জন্য ইংরেজি শব্দ অনুবাদ করা হয়। এসব শব্দের বানান উৎপত্তিগত ও গঠনগত হতে পারে। যেমন : সিলেবাস—পাঠ্যসূচি, আইন—অ্যাক্ট, অক্সিজেন—অম্ল।

শব্দের গঠনগত বানান

সাধারণত গঠনগত বানান সব সময়ই অপবির্তনশীল। সন্ধি, সমাস, প্রত্যয়, উপসর্গ, বিভক্তি, শব্দদ্বিত্ব, বচন, নির্দেশক, শব্দ রূপান্তর ইত্যাদির অনুসারে বানান নির্ধারণ হতে পারে।  যেমন:

সন্ধি

বর্ণের মিলনে, বর্ণে বিকৃতিতে বা বর্ণ লোপে শব্দের বানান সঠিক করা যায়। যেমন :

*ঈ, ঊ, উৎ—জ্জ/জ্জ্ব, ঃ—র/ষ ইত্যাদি নিয়মে সন্ধিজাত শব্দ হয়। যেমন: রবীন্দ্র (বরি +ইন্দ্র), কটূক্তি (কটু+উক্তি), অহরহ (আহঃ+অহ), আবিষ্কার, পুরস্কার, উৎ+চারণ=উচ্চারণ, অতঃ+ এব= অতএব, উৎ+স্থান=উত্থান, ইতি+ মধ্যে = ইতোমধ্যে।

*নিয়মহীনভাবে সন্ধিজাত শব্দ হতে পারে। যেমন : এক+দশ=একাদশ, গো+অক্ষ= গবাক্ষ ইত্যাদি।

সন্ধি শব্দ গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম তবে সংস্কৃত ও সংস্কৃত শব্দে সন্ধি করতে হয়। সংস্কৃত ও বাংলা শব্দের সন্ধি হয় না। উচ্চারণে সুবিধা করতে গিয়ে শব্দকে অশুদ্ধ করা ঠিক নয়। সন্ধির নিয়মে বাক্য শুদ্ধতা রজায় রাখা যায়। যেমন : অর্থাভাবে—অর্থ অভাবে, লজ্জাস্কর—লজ্জা কর/লজ্জাজনক, দুরাবস্থা—দুরবস্থা, উল্লে¬খিত—উল্লি¬খিত, উপরুক্ত/উপরোক্ত— উপরিউক্ত, সম্বর্ধনা— সংবর্ধনা, কিম্বা—কিংবা, ইতিমধ্যে—ইতোমধ্যে ইত্যাদি।

বর্ণ রূপান্তরিত বানান

ধ্বনি বা বর্ণের পরিবর্তনগুলো লক্ষ করা যায় :

১. স্বরাগম : প্রথম বা মাঝে স্বরে ব্যঞ্জনের আগমন ঘটে। যেমন : স্কুল>ইস্কুল, কর্ম> করম।

২. স্বর সংগতি : স্বরের সংগতি রেখে স্বরের আগমন ঘটে। যেমন : রুপা>রুপো, শিয়াল >শেয়াল।

৩. অপিনিহিতি : মাঝে ই যোগ হয়। যেমন : ডাল>ডাইল, চাইল, কাইল, আইজ ।

৪. অভিশ্রুতি : মাঝে ই যোগ হয়। যেমন : কন্যা>কইন্যা>কনে, আজি> আইজ>আজ।

৫. সম্প্রকর্ষ বা স্বরলোপ : মধ্যধ্বনি লোপ পায়। যেমন : উদ্ধার>উধার, রাত্রি> রাতি।

৬. অন্তর্হতি : মধ্যধ্বনি বাদ যায়। যেমন : ফাল্গুন>ফাগুন, বাহির>বার।

৭. ব্যঞ্জনচ্যুতি : মধ্য বা শেষ ধ্বনি বাদ যায়। যেমন: বড়দাদা>বড়দি, ছোটদি/ ছোটদা।

৮. ধ্বনি বিপর্যয় : মধ্যধ্বনির পরিবর্তন হয়। যেমন : রিকশা>রিশকা, পিশাচ>পিচাশ, সচেতন >সতেচন, লাফ>ফাল।

৯. বিষমীভবন : র ও ল এর বিপর্যয় ঘটে। যেমন : শরীর>শরীল, লাল>নাল।

১০. ব্যঞ্জন বিবৃতি : নতুন ব্যঞ্জনবর্ণ বসে। যেমন : কবাট>কপাট, ধাইমা> দাইমা।

১১. অসমীকরণ : মাঝে আ-কারের আগমন ঘটে। যেমন : টপটপ> টপাটপ।

১২. সমীভবন : শেষে বর্ণ দ্বিত্ব হয়। যেমন : পদ্ম>পদ্দ, গল্প>গপ্প।

১৩. দ্বিত্ব ব্যঞ্জন : মাঝে দ্বিত্ব ব্যঞ্জনবণের্র আগমন ঘটে। যেমন : সকাল>সক্কাল, ছোট> ছোট্ট, কিছু>কিচ্ছু।

১৪. র—লোপ পায়: রেফ, ই-কার ও ‘হ’ উঠে দ্বিত্ববর্ণ বসে। যেমন: তর্ক>তক্ক, গৃহিণী> গিন্নি।

১৫. হ—লোপ পায় : হ-লোপ পেয়ে ই বা য় বসে। যেমন : মহাশয়>মশাই, চাহে> চায়।

১৬. অ—শ্রুতি : মাঝের য় উঠে যায়। যেমন : মায়ের>মার।

১৭. অন্তস্থ-ব শ্রুতি : মাঝের ও উঠে যায়। যেমন : নেওয়া>নেয়া, দেওয়া>দেয়া।

সমাস

সমাস অর্থ সংক্ষেপ বা মিলন। পরস্পর অর্থবোধক দুই বা অধিক শব্দ বা পদের মিলনকে সমাস বলে। পাশাপাশি দুই বা তার অধিক শব্দ বা পদ থাকতে হবে, এসব শব্দ বা পদের মধ্যে অর্থসংগতি থাকতে হবে, এসব শব্দ বা পদের মধ্যে বৃহৎ শব্দ বা পদ তৈরির যোগ্যতা থাকতে হবে, নতুন শব্দ বা পদ গঠন করার ক্ষমতা থাকতে হবে, একাধিক শব্দ বা পদকে সংকোচিত করার ক্ষমতা থাকতে হবে, শব্দ বা পদগুলোর বিভক্তি লোপ পেতে হবে, গঠিত শব্দ একশব্দ অথবা মাঝে হাইফেনযুক্ত হবে। এসব বৈশিষ্ট্য নিয়ে গঠিত হয় সেগুলোই সমাস।

শব্দ সংক্ষেপণের মাধ্যমে বানান সঠিক করা যায়। যেমন :

*বিশেষ্য-বিশেষ্য বা বিশেষণ সমাসের নিয়মে একশব্দ হয়। যেমন : ছেলেমেয়ে, ছাত্রছাত্রী, ভাইবোন, বড়দিদি, বড়ভাই ইত্যাদি।

*আলাদা অথবা হাইফেন অথবা একসাথে লেখা হচ্ছে। যেমন : তাছাড়া, এজন্য, এক্ষেত্রে, সেই, তাই। 

*সমামবদ্ধ কিন্তু ঈ-কার দিয়ে লেখা হচ্ছে। যেমন : কীভাবে, কীসের, কীরূপ, কীজন্য, নারীচিহ্ন, পথিবীব্যাপি, নদীমাতৃক ইত্যাদি।

*সমামবদ্ধ কিন্তু ই-কার দিয়ে লেখা হচ্ছে। যেমন: প্রাণিজগৎ, প্রাণিবিদ্যা, মন্ত্রিসভা ইত্যাদি।

*হাইফেন বা শব্দযোজকচিহ্ন দিয়ে লেখা হচ্ছে। যেমন: নারী-চিহ্ন, পৃথিবী-ব্যাপি, নদী-মাতৃক ইত্যাদি।

সমাসযোগে শব্দ গঠিত হলে এদের বানান তেমন পরিবর্তন না হলেও শুধু মাঝের ঈ-কার ইকারে পরিণত হয়। যেমন: প্রাণিজগৎ, প্রাণিবিদ্যা, নারিচিহ্ন, মন্ত্রিসভা। আবার শব্দযোজকচিহ্ন (হাইফেন) দিন বা না দিয়েও লেখা যায়। যেমন: ছেলে ও মেয়ে/ছেলেমেয়ে, কুসুমের মতো কোমল/ কুসুমকোমল, মন রূপ মাঝি/মনমাঝি, শহিদদের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত মিনার/শহিদমিনার।

*‘স্ব’ অর্থ নিজের আর ‘সহ’ অর্থ সাথে। যেমন : স্বজাতি হলো নিজের জাতি আর সজাতি হলো জাতিসহ।

*দুটি শব্দে বিভক্তি, নির্দেশক, প্রত্যয় (ই/ঈ/ইতা-প্রত্যয় বাদে), সন্ধি, উপসর্গ যোগ করলে বানানের এমন কী বর্ণের কোনো পরিবর্তন হয় না। যেমন : নারীকে, নারীতে, নারীটি, নারীগুলো, নারীগণ।

*বনজ—যা বনে জন্মে সমাসের নিয়ম অনুসারে লেখা যায়। কিন্তু ‘ফলজ’ ভুল ব্যবহার। এটির সঠিক ব্যবহার হলো ‘ফলদায়ী গাছ’।

উপসর্গ

উপসর্গ শব্দের আগে বসিয়ে নতুন শব্দ গঠন করা যায় আবার শব্দের বানানও সঠিক করা যায়। যেমন :

*নিঃ+র হলে ঈ-কার হয়। যেমন : নীরস (নিঃ+রস), নীরব ইত্যাদি।

*নিঃ+অন্যবর্ণ হলে ই-কার বসে। যেমন : নির্গমন (নিঃ+গমন), নির্ভর ইত্যাদি।

*নিঃ+অ/আ থেকে ‘র’ হলে ই-কার হয়: নিরপরাধ (নিঃ+অপরাধ)।

*উপসর্গের পরে হাইফেন/শব্দযোজক বসে না তবুও বসানো হচ্ছে। যেমন : উপশহর, উপ-পরিচালক, সাবটেক্স, সাব-কনট্রাক্ট।

*‘অ’ যদি নাবোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয় তাহলে সেই শব্দের শেষে ‘হীন’ যুক্ত হয় না। যেমন : অসচেতনহীনভাবে, অক্লান্তিহীনভাবে।

*শব্দ ভাঙ্গলে ‘সু’ পাওয়া যায় বলে ‘সুস্বাগত’ না হয়ে হবে ‘স্বাগত’ (সু+আগত)

*দুর/দূর : দুর উপসর্গ। যেমন : দুরন্ত, দুরূহ : দুরূহ (দুর+ঊহ) কঠিন, কষ্টসাধ্য। আর দূর (দূরত্ব)। দুরারোগ্য (দূরারোগ্য নয়)।

যাদের নিজস্ব কোনো অর্থ নাই তবে অন্য শব্দের আগে বসে নতুন শব্দ গঠন করতে পারে। যেমন: আ-গাছা, নি-নিখুঁত, নির-নীরব, প্র-প্রধান, পরা-পরাজয় ইত্যাদি।

বিভক্তি

যাদের নিজস্ব কোনো অর্থ নাই তবে অন্য শব্দের (ধাতু ও নামশব্দ) পরে বসে নতুন শব্দ গঠন করতে পারে। যেমন: করব, গাইছি, বলছি, আমরা, রহিমরা। 

‘এ, য়, তে, কে, র, এর’ ইত্যাদি সঠিকভাবে ব্যবহার করে শব্দের বানান ঠিক করা যায়। যেমন:

*যোজকযুক্ত শব্দের আগে ও পরে দুটি শব্দতেই বিভক্তি বসে। যেমন : দুধে ও ভাতে, স্কুলে ও কলেজে, দুধভাত/দুধেভাতে ।

*‘অ’ হলে বিভক্তি ‘এর’ সবে। যেমন : হাসানের, করিমের ইত্যাদি।

*‘আ’ হলে বিভক্তি ‘র’ বসে। যেমন : হাসিনার, রহিমার ইত্যাদি।

*দুটি বিভক্তি একটি শব্দের বসে না। যেমন : বুকেতে, চোখেতে ইত্যাদি।

*সংস্কৃত শব্দ হলে বিভক্তি বসে না। কিন্তু বাংলা শব্দ হলে বিভক্তি সে। যেমন : মাতৃভূমি—মায়ের ভূমি।

*বিভক্তি, নির্দেশক, বচনযুক্ত বানানে ঈ-কার অপরিবর্তিত থাকে। যেমন : বিজ্ঞানীকে, বিজ্ঞানীটি, বিজ্ঞানীগণ, বিজ্ঞানীরা।

*বহুবচন জাতীয় শব্দে ‘কে’ বসে না। ‘কে’ একজনকে নির্দেশ করে। তাই বহুবচন জাতীয় শব্দের পরে ‘কে’ ব্যবহার বাক্যের গুণ নষ্ট করে। যেমন: তাদেরকে, আমাদেরকে, সব পাগোলগুলোকে, সব অতিথিবৃন্দগণকে।  

*বস্তুবাচক একবচন পদে কোনো বিভক্তি (কে, রে) বসে না। শব্দটি একবচন হলে ‘টি’ আর বহুবচন হলে ‘গুলো’ বসে। যেমন : ঘড়িকে (ঘরিটি), বইকে (বইটি/বইগুলো) ইত্যাদি।

*সংস্কৃতিতে তাহাদিগকে/আমাদিগকে ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাসে বস্তু বা প্রাণিবাচক কর্তায় ‘কে’ বসানো হচ্ছে। যেমন : বইকে পড়া=বইপড়া, গানকে শোনা, সাপকে ধরা, রথকে দেখা, ভয়কে প্রাপ্ত, কাপড়কে কাঁচা, ভাতকে রাঁধা, নথকে নাড়া।

প্রত্যয়

প্রত্যয় শব্দের পরে বসিয়ে নতুন শব্দ গঠন করা যায় আবার শব্দের বানানও সঠিক করা যায়। যেমন :

*লি, আমি, উরি-প্রত্যয়যোগে শব্দের বানানে ই/উ-কার হয়। যেমন : রুপালি, সোনালি, বোকামি, ডুবুরি ইত্যাদি।

*‘অ/আ’ থাকলে ‘আ+ইক’ হয়। যেমন : সমাজ+ইক=সামাজিক, সাহিত্য+ইক =সাহিত্যিক ইত্যাদি।

*অবশ্য+অক=আবশ্যক। ‘আবশ্য+অক+ঈয়=আবশকীয়’ ভুল ব্যবহার।

*‘ই’ থাকলে ‘ঐ+ইক’ হয়। যেমন : ইতিহাস+ইক=ঐতিহাসিক, ইচ্ছা+ইক= ঐচ্ছিক ইত্যাদি।

*য-প্রত্যয় যুক্ত হলে আ/ঐ/ঔ হয়। যেমন : কৃপণ+য=কার্পণ্য, শিথিল+য=শৈথল্য, চেতনা+য= চৈতন্য, সুজন+য=সৌজন্য ইত্যাদি।

*দুটি প্রত্যয় একটি শব্দের বসে না। যেমন : দৈন্যতা (দৈন্য/দীনতা), একত্রিত (এক+ত্র), সখ্যতা (সখ+য+তা) ইত্যাদি।

*ইষ্ঠ-প্রত্যয় যুক্ত হলে তর বা তম-প্রত্যয় যুক্ত হয় না। যেমন : শ্রেষ্ঠতম, শ্রেষ্ঠতর।

*ৎ+ত্ব=ত্ত্ব হয়। যেমন : মহৎ+ত্ব=মহত্ত্ব (মহত্ব হয় না)

*ইনি প্রত্যয় কিন্তু ইণি বসানো হচ্ছে। যেমন : গৃহিণী (গৃহ+ইনি)।         

*ঈ—ইত্ব: কৃতী—কৃতিত্ব, স্থায়ী—স্থায়িত্ব।    

*ঈ—ইতা : উপকার—উপকারী—উপকারিতা, উপযোগ—উপযোগী—উপযোগিতা। 

*ঈ—ইনী : অধিকার—অধিকারী—অধিকারিনী।

*অবশ্য+ক=আবশ্যক+ঈয়=আবশ্যকীয়।

*ইত-প্রত্যয়জাত শব্দ নয় : কলুষিত, আনীত, উন্নীত, গৃহীত।

নির্দেশক

অর্থবোধক শব্দের পরে নির্দেশক যুক্ত করেও আমরা শব্দ বানাতে পারি। শব্দ বা পদের পরে বসে সেই শব্দ বা পদের সংখ্যা বা পরিমাণ নির্দেশনকারীকে নির্দেশক বলে। নির্দেশক ব্যবহারেরও কিছু নিয়ম আছে। যেমন: নির্দেশক শব্দের আগে বা পরে যুক্ত করে শব্দ বানাতে পারি। তবে ‘টা/টি, খানা/খানি’ শব্দের সাথে যুক্ত করে শব্দকে নির্দেষ্ট করলে আবার তার আগে ‘এই’ বা ‘ঐ’ ব্যবহার করা যাবে না। শব্দের পরে গুলো যুক্ত হলে এরপরে আবার কে যুক্ত করা যাবে না।

‘টি/টা/খানা/খানি’ ব্যবহার করে শব্দকে নির্দিষ্ট করলে তার আগে ‘এই, ওই, সেই’ ব্যবহার করা হয় না। যেমন : এই বইটি, এই গ্রন্থটি, এই বইখানি, এই রচনাটি, ওই বইটি, সেই ছেলেটি ইত্যাদি। সমস্ত ধারণাটি—সমস্ত ধারণা বা ধারণাগুলো।

জাতি, বস্তু, সমষ্টি বা গুণবাচক বিশেষ্য পদের সাথে যুক্ত—মানুষটা/টি, বেড়ালটি, গরুগুলো, বাড়িগুলো। সর্বনামপদের সাথে যুক্ত—এইটি/এটি, সেইটি/সেটি, ঐটি, ঐগুলো, ঐসবগুলো, কোনটি, কোনগুলো, যেটি, যেগুলো, অন্যটি, অন্যগুলো।

বিশেষণ পদের সাথে যুক্ত—অনেকটা, অনেকগুলো, কিছুটা, এতটা, এতগুলো, ভালোটা/টি, মন্দটা/টি, সত্যটি, সবুজটি। ঠান্ডটি, রোগাটি, দশটি, অর্ধেকটি, বেশিটি, অল্পটি, অনেকগুলো ইত্যাদি। সংস্কৃত সমষ্টিবাচক একশব্দ হতে পারে আবার আলাদা বসতে পারে। টি/টা, খানা/খানি, টুকু, টুকুন, গোটা, ফালি, খণ্ড, টুকরা, ইত্যাদি শব্দের পরে একসাথে বসে এবং এদের পরে ‘কে’ প্রয়োজনে বসে।

বচন

সংখ্যার ধারণা অর্থাৎ গণনায় এক, অধিক, আস্ত, খণ্ড বা বেশি বুঝাতে বচন লাগে। বিশ্বের অন্যান্য ভাষায় একবচন, দ্বিবচন, বহুবচন আছে কিন্তু বাংলা ও ইংরেজিতে একবচন ও বহুবচন ব্যবহার করা হয়। ইংরেজি বা সংস্কৃতিতে ‘সকল শিক্ষকগণ’ লেখা হলেও বাংলাতে ‘সকল শিক্ষক’ লেখা হয়। একটি বাক্যে দুবার বা তিনবার বহুত্বচিহ্ন ব্যবহার করে বাক্যের গুণ নষ্ট করা হয়। যেমন : গ্রামগুলো সব, লক্ষ লক্ষ শিশুগুলো সব, সব রাজাকারদের, যাবতীয় প্রাণিবৃন্দ, লেখকবৃন্দদেরকে, সকল অতিথিবৃন্দগণদের ইত্যাদি।

‘কিছু/অল্প’ ব্যবহার হলে পরে বহুবচন হয় না। যেমন : কিছু লোকদের, কিছুসংখ্যক, অল্পসংখ্যক, কিছু মানুষদের, অধিক/বেশি পরিমাণ। ‘গণ, বৃন্দ, বর্গ, মণ্ডলি, সব, সকল, সমূহ, অজস্র, নানা, নানান, ঢের, অনেক, বিস্তর, বহু, কুল, গোছা, রাশি, রাজি, মালা, গুচ্ছ, পুঞ্জ, আবলি, জোড়া, ডজন, হালি’ ইত্যাদি বহুবচন শব্দের পরে ‘কে’ বসে না। যেমন : গণকে, সমূহকে।

চিহ্ন/লিঙ্গ

*সংস্কৃতিতে বিশেষণ ও বিশেষ্য দুটিকেই চিহ্নের আওতায় আনা হয়। যেমন : নর—সুন্দর বালক আর নারী—সুন্দরী বালিকা কিন্তু বাংলায় বিশেষণকে নারিবাচক করার দরকার হয় না। যেমন : সুন্দর বালিকা।

*সংস্কৃতিতে দুটি বিশেষ্যকেই চিহ্নের আওতায় আনা হয়। যেমন : ময়েটি পাগলি, আসমা অস্থিরা কিন্তু বাংলায় দুটি বিশেষ্যের একটিকে নারিচিহ্নের আওতায় আনা হয়। যেমন : মেয়েটি পাগল, আসমা অস্থির ইত্যাদি।

*সংস্কৃতিতে ঈ বা ইনি বা নী-প্রত্যয়ই একসাথে বসে কিন্তু বাংলায় বসে না। যেমন: অভাগা—অভাগী—অভাগিনী, ননদিনী, কাঙালিনী ইত্যদি। বাংলায় অভাগী, ননদী, মায়াবী, কাঙালী, গোয়ালী, বাঘিনী হয়। তবে ক্লীববাচক শব্দে নী-প্রত্যয় যুক্ত করে নারিবাচক শব্দ তৈরি করতে হয়। যেমন : মেধাবিনী, দুখিনী, যোগিনী, মায়াবিনী ইত্যাদি।

*সংস্কৃতিতে ক্ষুদ্রার্থবাচক কিছু ক্লীববাচক শব্দকে নর বা নারিবাচক করা যায়। যেমন: নাটক—নাটিকা, উপন্যাস— উপন্যাসিকা, পুস্তক —পুস্তিকা, গীতি—গীতিকা ইত্যাদি।

রূপান্তরিত শব্দ

*বিশেষ্য থেকে বিশেষণ—অভিধান—আভিধানিক, দীন—দৈন্য ইত্যাদি।

*বিশেষ্য থেকে ক্রিয়া—কাজ—কাজ করা, ঘুম—ঘুম পড়ানো/ঘুমানো, পানি>পানি দেয়া ইত্যাদি।

ঙ/ং-এর বানান

*অহম/ভয়ং/শুভম/সম/ম থাকলে ‘ং’ বসে। যেমন: অহংকার, সংগীত, অলংকার, অহংকার, সংকল্প, সংকল্প, সং, রং, ঢং।

*অ ধ্বনির পর ক খ গ ঘ ক্ষ থাকলে ‘ঙ্ক’ বসে। যেমন: অঙ্ক, আকাক্সক্ষা, কঙ্কাল, জলাতঙ্ক, পঙ্কজ, বঙ্গ, শৃঙ্খল।

*বর্তমানে ‘ঙ’ দিয়ে লেখা হয় : আঙুর, আঙুল, আঙিনা, কাঙাল, ঘুঙুর, চোঙা, ঠোঙা, ডিঙি, বাঙালি, ভাঙা, রাঙা, রঙিন, রাঙামাটি, লাঙল , শিঙাড়া, হাঙর ইত্যাদি।

*বর্তমানে ‘ঙ’ দিয়ে লেখা হয় : অঙ্গ, ভঙ্গ, রঙ্গ, সঙ্গ ইত্যাদি।

বিসর্গের বানান

*বিসর্গ বর্জিত ও আশ্রিত শব্দ : মনঃকষ্ট—মনোকষ্ট, পুনঃপ্রকাশ—পুনর্প্রকাশ।

চন্দ্রবিন্দু আশ্রিত শব্দের বানান

সংস্কৃত নাসিক্য উচ্চারিত শব্দের ক্ষেত্রে বাংলা চন্দ্রবিন্দু বসে। এটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কৃতিত্ব। যেমন :

*‘ন/ণ/চ/ম/ং’ ইত্যাদির পরিবর্তে চন্দ্রবিন্দু বসে। যেমন: বংশ>বাঁশ, কণ্টক>কাঁটা, চন্দ্র>চাঁদ, উচ্চ>উঁচু, কম্পন>কাঁপা।

*দেশি ও বিদেশি শব্দেও চন্দ্রবিন্দু বসে। যেমন : ডাঁস, ঢেঁকি, যাঁতা, তাঁবু, পিঁয়াজ, কাঁচি, রেনেসাঁ, পেঁপে, রেস্তরাঁ।

ণ/ন-এর বানান

*ঋ, র, র-ফলা, রেফ থাকলে ণ বসে। যেমন: ঋণ, চরণ, স্বর্ণ।

*প্র, পরি, নির, পর থাকলে ণ বসে। যেমন : প্রণাম, পরিত্রাণ, নির্ণয়, পরিণতি, অপরাহ্ণ।

*ক-বর্গ (ক, খ, গ, ঘ, ঙ) থাকলে ণ বসে। যেমন : রুগ্ণ, প্রাঙ্গন।

*প-বর্গ (প, ফ, ব, ভ, ম) থাকলে ণ বসে। যেমন : কৃপণ, দ্রবণ, শ্রবণ।

* য, য়, হ থাকলে ণ বসে। যেমন : পরায়ণ, রামায়ণ, গ্রহণ,

*ট—ঠ—ড—ঢ—ণ। তাই ট-বর্গে ণ বসে। যেমন : কণ্টক, কণ্ঠ, আণ্ডা, বিষণ্ন।

*ত—থ-দ—ধ-ন। তাই ত-বর্গে ন বসে। যেমন : শান্ত, মন্থন, দন্ত, বন্ধ, অন্ন। 

*বিদেশি শব্দ, তদ্ভব শব্দ, ক্রিয়াশব্দ, ত-বর্গীয় শব্দ ও সাধিত শব্দে ‘ন’ বসে। যেমন : গ্রিন, হর্ন, কান, অন্ত, করেন, নির্গমন।

*নি বা না নাবাচক উপসর্গ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এরা একসাথে বসে। যেমন: নিবাস, নিখোঁজ, নারাজ, নাখোশ, নারাজ।

ষ/স/শ-এর বানান

*উপসর্গ+ই/উ-কার থাকলে ‘ষ’ হয়। যেমন : আবিষ্কর, পরিষ্কার, অনুষঙ্গ, নিষ্কৃতি, নিষ্পন্ন। (ব্যতিক্রম : অনুসরণ, অভিসার, পরিসমাপ্তি)।

* এ নিয়ম বাদে ‘স’ বসে অর্থাৎ অ-কার-এর পরের বর্ণে ‘স’ বসে। যেমন : পুরস্কার, তিরস্কার, নমস্কার, ভাস্কর।

*ঋ/ঋ-কার, রেফ, ট/ঠ থাকলে ‘ষ’ হয়। যেমন : ঋষি, কৃষক, সৃষ্টি, শ্রেষ্ঠ, পৃষ্ঠা।

*‘নিঃ, ‘দুঃ’ অধি/অনু/অভি/পরি/প্রতি/বি/সু-যুক্ত উপসর্গে ‘ষ’ বসে। যেমন : নিষ্ঠুর, অনুষ্ঠান, প্রতিষ্ঠান, সুষ্ঠু।

*‘নিষ’ ও ‘দুষ’-যুক্ত শব্দে ‘ষ’ বসে। যেমন: নিষেধ, নিষ্পন্ন, দুষ্প্রাপ্য, দুষ্কর, দুষ্কৃতি।

*বিশেষ্য হলে ‘শ’ আর বিশেষণ হলে ‘ষ’ হয়। যেমন : আদেশ-আদিষ্ট, আবেশ-আবিষ্ট, নির্দেশ—নির্দিষ্ট, বিনাশ—বিনষ্ট।

*চ-বর্গীয় শব্দে ‘শ’ বসে। যেমন: আশ্চর্য, নিশ্চয়, পশ্চিম।

*সন্ধি বা বিসর্গ সন্ধিতে ‘স’ বসে। যেমন: তিরস্কার, পুরস্কার, ভাস্কর, বৃহস্পতি।

*সাৎ-প্রত্যয়যুক্ত শব্দে ‘স’ বসে। যেমন: ধূলিসাৎ, আকসাৎ।

*ট-বর্গীয় বিদেশি শব্দে ‘স’ বসে। যেমন: আগস্ট, স্টোর, পোস্টার, পেস্ট, স্টার্ন, স্ট্রিট, স্টেডিয়াম, স্টিকার।

*বিদেশি শব্দে সবসময় ‘শ’ (sh/sion/ssion/tion)’ বা ‘স’ (s)ব্যবহৃত হয়। যেমন: মাস্টার, রেজিস্ট্রার, ভিশন, স্টেশন, তামাশা, খুশি।

নামশব্দের বানান

একটি সুন্দর অর্থবোধক নাম ব্যক্তি, স্থান বা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রত্যেকেই পছন্দ করেন। আবার ব্যক্তি নামকরণ নিয়েও লেখকগণ কম মজা করেননি। ছেলেটি অন্ধ কিন্তু তার নাম পদ্মলোচন। মেয়েটি বোবা কিন্তু তার নাম সুভাষিনি। মেয়েটি কুৎসিত কিন্তু তার নাম বিউটি। নামটি যদি অর্থবোধক হয় তাহলে ভুলের কারণে নামটির অর্থ নষ্ট হবে আর সঠিক অর্থ না থাকলে অবশ্যই সেটি ভুল হবে। ‘কিরন’ লিখলে আলো ছড়াবে না—আলো ছড়ানোর জন্য লিখতে হবে ‘কিরণ’। ‘প্রসূন’ মানে ফুল যদি লেখি ‘প্রসুন’ তাহলে নিশ্চই ঠিক হবে না। যদি লেখি ‘মনি’ তাহলে কি হবে ‘মূল্যবান পাথর’?

*সন্ধিজাত নামশব্দ একশব্দ হয়—শরৎচন্দ্র/শরচ্চন্দ্র (শরৎ+চন্দ্র), রবি+ইন্দ্র =রবীন্দ্র।

*সমাসজাত নামশব্দ একশব্দ হয়—মদনমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র, রবিঠাকুর, জসীমউদদীন, সুবলকুমার, চন্দনকৃষ্ণ, কালিদাস, রজনিকান্ত।

*বিদেশি নামশব্দে ঈ-কার/ণ/ৎ/ছ ইত্যদি ব্যবহারের নিয়ম নাই তবু ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন: উদ্দীন, কবীর, জসীম, ছালাম, ঝর্ণা, রহীম, শহীদুল্লাহ, হায়াৎ, হাবীব।

*অনেকেই একই শব্দ বহুরকম বানানে লিখে থাকনে। যেমন: মোহাম্মদ/মোহাম্মাদ/ মুহম্মদ/ মুহম্মাদ /মুহাম্মদ, আহম্মদ/আহম্মাদ/আহমোদ/আহমেদ/আহমদ/আহমাদ, রহমান/রাহমান/রেহমান, মঈনউদ্দিন /মঈনুদ্দীন/মইনুদ্দি/মাইনুদ্দিন, হোমায়ন/হুমায়ুন/হুমায়ূন।

*স্থান বা প্রতিষ্ঠানের বানানের ক্ষেত্রে যে বানান আছে তাই লিখতে হবে তবে নতুন কোনো নাম দিলে খেয়াল রেখে দিতে হবে। যেমন: যাত্রাবাড়ী, রাজবাড়ী, গাজীপুর ইত্যাদি।

*বাংলা একাডেমি ‘ই-কার’ করলেও ভিকারুন নিসা নূন ‘উ-কার’ করবে না কারণ বাংলা ‘নুন’ অর্থ ‘লবণ’।

জাতি ও ভাষা শব্দ

জাতি ও ভাষা শব্দে ই-কার বসে। যেমন: দেশি, বিদেশি, বাংলাদেশি, স্বদেশি, বাঙালি, জাপানি, ইরাকি, আরবি, ফারসি, ইংলিশ, হিন্দি, ইতালি, চিলি। কিন্তু চীন ঈ-কার দিয়ে লেখা হয়।

কিছু জটিল বানান

এমন কিছু সংস্কৃত শব্দ আছে যাদের বানান মনে রাখতে কষ্ট হয়। বানান করে লিখতে গেলে ভুল হয়ে যায়। তাই এদের মুখস্থ রাকা জরুরি। যেমন: অকস্মাৎ, অগ্ন্যৎপাত, অধ্যবসায়, অন্তর্জ্বালা, অমর্ত্য, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, অলঙ্ঘ্য, আকাঙ্ক্ষা, আর্দ্র, উজ্জ্বল, উত্ত্যক্ত, উপর্যুক্ত, উপলব্ধি, ঔদ্ধত্য, কর্তৃত্ব, কাঙ্ক্ষিত, ক্ষুব্ধ, গার্হস্থ, গ্রীষ্ম, ঘূর্ণ্যমান, জলোচ্ছ্বাস, জীবাশ্ম, জ্বর, জ্বলা, জ্যেষ্ঠ, জ্যোৎস্না, জ্যেতাতি, জ্যোতিষ্ক, তত্ত্ব, তত্ত্ববধান, তীক্ষ্ণ, ত্যক্ত, দারিদ্র্য, দৌরাত্ম, দ্বন্দ্ব, দ্বেশ, দ্বৈত, দ্ব্যর্থ, ধ্বংস, ধ্বন্যাত্মক, নিক্বণ, নির্দ্বিধা, ন্যস্ত, ন্যুব্জ, ন্যূন, পক্ক, পংক্তি, পরিস্রাবণ, পার্শ্ব, প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রত্যূষ, প্রার্তভ্রমণ, পুর্ননিমাণ, প্রোজ্জ্বল, বন্ধ্যা, সন্ধ্যা, বিভীষিকা, বৈচিত্র্য, বৈশিষ্ট্য, ব্যক্ত, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র, ব্যগ্র, ব্যয়, ব্যথা, ব্যঞ্জনা, ব্যতিক্রম, ব্যত্যয়, ব্যবহার, ব্যাখ্যা, ব্যুৎপত্তি, ব্রাহ্মণ, ভ্রাতৃত্ব, মুমূর্ষু, শাশ্বত, শিরশ্ছেদ, শ্বশুর, শ্মশান, শ্মশ্রু, শ্লেষ্মা, ষাণ্মাসিক, সত্তা, সত্ত্ব, স্বত্ব, সত্ত্বেও, সন্ন্যাস, সূক্ষ্ম, সৌহার্দ্য, স্বতঃস্ফূর্ত, স্বাচ্ছন্দ্য, স্বাতন্ত্র্য, স্বায়ত্তশাসন, স্বাস্থ্য, স্মরণ, হ্রস্ব, হ্রাস।

মন্দবানান

বর্তমানে এমন কিছু শব্দ কথায় কথায় তৈরি হয়ে যায় যার কোনো নির্দিষ্ট অর্থ নাই। তবে নেগেটিভ অর্থাৎ মন্দ অর্থ ধলে নেয়া হয়। যেমন: গুলমারা, বেল নাই, ইভটিজিং ইত্যাদি।

শব্দের উচ্চারণগত বানান

সংস্কৃত, দেশি, বিদেশি ইত্যাদি শব্দের বানান উচ্চারণ অনুসারে লেখা হয় না। যেমন : স্বাগতম—সোয়াগতম, চকোলেট-চকলেট, এবাদত—ইবাদাত, রসুল—রাসূল, কতো, হতো, করছিলো, কোরবো, আছো, বললো, কোরলো ইত্যাদি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩০ সালে ‘সহজপাঠ প্রথম ভাগ’ গ্রন্থে উচ্চারণ অনুসারে কিছু বানান লিখেছিলেন। যেমন : ছোটো, বড়ো, গোরু, আনো, দেখো, শোনো ইত্যাদি।

কিছু দ্বন্দ্বপ্রধান শব্দের বানান উচ্চারণ অনুসারে লেখা হয়। যেমন :

বিশেষ্য—বিশেষণ : মত—মতো, কাল—কালো, ভালো—ভালো, মাত—মাতো, জাত—জাতো, বার—বারো।

বিশেষণ—ক্রিয়া : আসল—আসলো।

প্রযোজক ক্রিয়া : ক্রিয়ার শেষে যদি ত, ব, ল, বর্ণ থাকে তাহলে এদের সাথে ও-কার বসে না। যেমন: হত, যেত, বলত, বলব, উঠব, বলেছিল, এসেছিল, বলল, চলল, খেলল, উঠল।

ক্রিয়ার শেষে যদি ন থাকে এবং ওটা যদি প্রযোজক ক্রিয়া হয় তাহলে ন-এর সাথে ও-কার বসে। যেমন: উঠান—উঠানো, জাগান—জাগানো, শুয়ান—শুয়ানো।

সংখ্যাবাচক শব্দ : এগারো, বারো, তেরো, চৌদ্দো, পনেরো, ষলো, সতেরো, আঠারো।

প্রশ্নবাচক শব্দ : কেন—কোনো, কোন—কোনো, কি (সম্মতিজ্ঞাপন প্রশ্নে)— কী (বিষয়জ্ঞাপন প্রশ্নে/আবেগ/সন্দেহ/ বিস্ময়/লজ্জা/ঘৃণা)।

অনুজ্ঞাবাচক ক্রিয়াশব্দ : ‘তুই’ সর্বনামের ক্রিয়ায় ও-কার বসে না। আবার ‘তুমি’ সর্বনাম থাকলে উচ্চারণ অনুসারে ও-কার ব্যবহার করা যায়। যেমন : কর—করো—কোরে—করানো, চল—চলো— চালানো, শোন—শোনো—শোনানো, হল—হলো, বল—বলো—বলানো।

‘ত’ বর্ণের উচ্চারণ

১. শব্দের শেষে ‘ত’ থাকলে ও-কার উচ্চারিত হয়। যেমন: কত, শত, নত, মত, খত—ক্ষত, লিখিত, পরীক্ষিত, চলিত, তদ্ধিত, নিয়মিত, পঠিত, জ্ঞাত, রক্ষিত।

২. দ্বন্দ্ব তৈরি করে এমন শব্দে ও-কার দেয়া উচিত। যেন: মত—মতো।

৩. যুক্তবর্ণ হলে দ্বিত্ব হবে। যেমন: আয়ত্ত, সত্ত্ব ইত্যাদি।

৪. খণ্ড ‘ত’ হসন্ত উচ্চারিত হবে। যেমন: ইষৎ, ওৎ, উৎপাত, উৎস ইত্যাদি।

বর্ণ রূপান্তরিত শব্দ

কিছু শব্দ—ইস্কুল, রুপো, শেয়াল, ডাইল, চাইল, ফাগুন, বড়দি, কপাট, গপ্প, সক্কাল, মশাই, দেয়া।

ম-ফলা উচ্চারিত ও অনুচ্চারিত বানান

১. উচ্চারিত: গুল্ম, জন্ম, সম্মান

২. অনুচ্চারিত: স্মরণ, স্মৃতি, সূক্ষ্ম

৩. দ্বিত্ব উচ্চারিত: আত্মা, পদ্ম, গ্রীষ্ম

ষ-ফলা (উচ্চারিত ও অনুচ্চারিত বানান

১. এ্যা উচ্চারিত: ব্যয়, ত্যাগ, ব্যাগ

২. অনুচ্চারিত : জ্যোতি, জ্যেষ্ঠ

৩. দ্বিত্ব উচ্চারিত: পদ্য, জন্য, শস্য

৪. য উচ্চারিত: সাহায্য, সহ্য, সুয্যি

ব-ফলা উচ্চারিত ও অনুচ্চারিত বানান

১. উচ্চারিত : আব্বা, জব্বার

২. অনুচ্চারিত : অন্বয়, ধ্বনি, জ্বালা, দ্বন্দ্ব, সান্ত্বনা,

৩. দ্বিত্ব উচ্চারিত: অশ্ব, বিশ্ব, নিজস্ব

৪. ওভ উচ্চারিত : আহ্বান (আওভান)

৫. উভ উচ্চারিত: জিহ্বা (জিউভা)

হ-যুক্তবর্ণ উচ্চারিত ও অনুচ্চারিত বানান

হ-এর সাথে কোনো বর্ণ যুক্ত হলে হ-এর উচ্চারণ লুপ্ত হয়ে যায়। যেমন: হৃদয় (hrদয়), হ্রদ (hrদ), চিহ্ণ (চিনh), অপরাহ্ণ (অপরানh), ব্রহ্ম (ব্রোমh), ঊহ্য (উজঝো), অহ্লাদ (আhলাদ), আহ্বান (আওভান), জিহ্বা (জিউভা>জিভ) ইত্যাদি।

 

বাক্য শুদ্ধ করতে হলে অশুদ্ধি বানান শুদ্ধ করা দরকার

অশুদ্ধি

শুদ্ধি

অশুদ্ধি

শুদ্ধি

অশুদ্ধি

শুদ্ধি

ইংরেজী

ইংরেজি

চিন

চীন

জোতি

জ্যোতি

গুণবতি

গুণবতী

বুদ্ধিমতি

বুদ্দিমতী

ঘটনাবলী

ঘটনাবলি

প্রাণীবিদ্যা

প্রাণিবিদ্যা

মন্ত্রীসভা

মন্ত্রিসভা

দ্রারিদ্রতা

দ্রারিদ্র

কৃতীত্ব

কৃতিত্ব

সঙ্গীনী

সঙ্গিনী

সখ্যতা

সখ্য

আকাঙ্খা

আকাঙ্ক্ষা

অংক

অঙ্ক

বিভিষিকা

বিভীষিকা

ধুলি

ধূলি

ব্রাক্ষ্মণ

ব্রাহ্মণ

সৌহাদ্য

 

সন্নাসী

সন্ন্যাসী

স্বাচ্ছন্দ

স্বাচ্ছন্দ্য

হৃদপিন্ড

হৃদপিণ্ড

দৌরাত্ম

দৌরাত্ম্য

পংক্তি

পঙক্তি

নিক্কণ

নিক্বণ

দ্বন্দ

দ্বন্দ্ব

জলোচ্ছাস

জলোচ্ছ্বাস

আবিস্কার

আবিষ্কার

পুরষ্কার

পুরস্কার

বুৎপত্তি

ব্যুৎপত্তি

রুক্সিনি

রুক্সিণী

মণিষি

মনীষী

উপযোগীতা

উপযোগিতা

পিপিলিকা

পিপীলিকা

ঐক্যতান

ঐকতান

শুসুষা

শুশ্রুষা

সমিচিন

সমীচীন

মুহুমুহু

মুহুর্মহু

পাষান

পাষাণ

পর্ব্বত

পর্বত

কর্ণার

কর্নার

কার্যতঃ

কার্যত

প্রায়শঃ

প্রায়শ

হ’ল

হলো

দু’জন

দুজন

চেক্

চেক,

রূপালী

রুপালি

সেনালী

সোনালি

বর্ণালী

বর্ণালি

সম্বর্ধনা

সংবর্ধনা

মুমুর্ষু

মুমূর্ষু

সৌহাদ্য

সৌহার্দ্য

ষ্টেশন

স্টেশন

ফটোষ্ট্যাট

ফটোস্ট্যাট

ফটোষ্ট্যাট

ফটোস্ট্যাট

পরিভাষা

পারিভাষা

অভিধানে পরিভাষার অর্থ সংক্ষেপার্থ শব্দ। অর্থাৎ যে শব্দের দ্বারা সংক্ষেপে কোন বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে ব্যক্ত করা যায় তাই পরিভাষা। সাধারণত পরিভাষা বললে এমন শব্দ বা শব্দাবলি বোঝায় যার অর্থ পণ্ডিতগণের সম্মতিতে স্থিরীকৃত হয়েছে এবং যা দর্শন বিজ্ঞানের আলোচনায় প্রয়োগ করলে অর্থবোধে সংশয় ঘটে না। অন্যভাবে বলা যায়, সুনির্দিষ্ট সংক্ষেপার্থ সংশয়মুক্ত শব্দই হলো পরিভাষা। সহজভাবে বললে, বিশেষ ভাষা। ইংরেজি শব্দের স্বাদ, গন্ধ, বৈশিষ্ট্য, চরিত্র, সম্পর্ক, অর্থ ইত্যাদি অনুসারে বাংলা শব্দে রূপ দেয়া হয় তাকে পারিভাষিক শব্দ বলে। যেমন : Oxygen-অম্লজান, Act-আইন, Farm- খামার।

বিশিষ্ট তিন ভাষাবিদের অভিমত

সৈয়দ আলী আহসান: বাংলাদেশের প্রতি প্রকৃতির দিকে এবং বোধগম্যতার দিকে লক্ষ্য রেখে আমাদের পরিভাষা নির্মাণ করতে হবে। যেখানে আরবি ফারসির প্রয়োগ সমীচীন সেখানে আরবি, ফারসি এবং যেখানে সংস্কৃতের প্রয়োজন সেখানে সংস্কৃত-এটাই আমাদের আদর্শ হওয়া উচিত।

সৈয়দ আলী আহসানের পরিভাষা নীতি—যে বিদেশি শব্দগুলোর অতিরিক্ত প্রয়োগে একটি সবল এবং সুষ্ঠুরূপ নিয়েছে সেগুলোর পরিবর্তন না করা। জটিল বৈজ্ঞানিক শব্দ যেগুলোর কোন প্রতিরূপ আমাদের ভাষায় নাই >সেগুলো অবিকৃত রাখা। যেগুলো ব্যাখ্যা চলে এবং ব্যাখ্যা করলেই আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়-একমাত্র সেগুলোরই প্রতিশব্দ নির্মাণ করা।

মুহম্মদ আব্দুল হাই: যতটা সম্ভব বাংলা ভাষার ধর্ম, তার শ্রুতিমাধুর্য এবং ব্যবহারিক প্রয়োজনের দিক লক্ষ্য রেখে সংস্কৃত ও আরবি ভাষার শব্দ মূলের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর অভিমত: বাংলা গদ্যের সাহিত্যিক ব্যবহারের প্রারম্ভ থেকেই পরিভাষার জন্য সংস্কৃতের সাহায্য লওয়া হচ্ছে। আমি মনে করি যে বাংলা ভাষার এই ঐতিহ্যের দিকে লক্ষ্য করে আমরা একদম সংস্কৃত বর্জন করতে পারি না। সেইরূপ রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য করে আরবির ফারসিও আমরা অগ্রাহ্য করতে পারি না।

বাংলা পরিভাষা নির্মাণের ইতিহাস

১৭৭২ সালের ১৫ই আগস্ট প্রতি জেলায় দেওয়ানি বিচারের জন্য মফস্বলে দেওয়ানি আদালত স্থাপিত হয়। ১৭৭৫ সালে স্থাপিত হয় কলকাতায় সুপ্রীম কোর্ট। ১৭৯৭ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আইন প্রণয়ন করেন। ওই আইনের রেগুলেশন খাতে সরকার ইচ্ছামত পরিবর্তন না করতে পারে সে ব্যাপারে নির্দেশ থাকে। প্রতিটি রেগুলেশন মুদ্রিত এবং দেশি ভাষায় অনূদিত হবারও নির্দেশ থাকে। এই আবশ্যিক অনুবাদের মাধ্যমে এদেশে আইনের অনুবাদ শুরু হয়। ফলে ১৭৭৬ সাল থেকে ১৭৯৭-৯৮ সাল পর্যন্ত জেন্টু কোড, অর্ডিন্যান্স অভমনু, এ ডাইজেস্ট অব হিন্দুল (১৭৭৬-১৭৯৮) প্রণয়নে সংস্কৃত থেকে ইংরেজি পরিভাষা নির্মাণের গোড়াপত্তন হয়। বাংলায় পরিভাষা নির্মাণের গোড়াপত্তন হয় ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে। ১৭৮৪ সালে জনাথান ডানকানের ‘হইবার কারণ ধারার নিয়ম বাংলা ভাষায়’র বাংলা হরফে প্রকাশ হবার মধ্য দিয়েই বাংলা পরিভাষার সূচনা হয়। এ ধারা অব্যাহত থাকে ১৮৯৩ সাল পর্যন্ত। ১৮৯৪ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে যা ব্যাপক পরিণতরূপ পায়। বিগত দুইশ বছরে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পাশাপাশি পরিভাষা নির্মাণে অবদান রেখেছেন ফেলিকস কেরি, জনমেক, উইলসন, পীয়ারসন বৃটন প্রমুখ মনীষী থেকে শুরু করে অক্ষয় কুমার দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম চন্দ্র, বিপিনবিহারী দাস, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, যোগেশচন্দ্র, ড. রঘুবীর, বি এন শীল, সুনীতিকুমার, রাজশেখর বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুধীন্দ্রনাথ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশের পরিভাষা

১৯৪৭ সালে পূর্বপাকিস্তান নামকরাষ্ট্র জন্মাবার পর শিশুরাষ্ট্রে ভাষা সংকট দেখা দেয়। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে জিন্নাহর দাম্ভিক ঘোষণা পূর্ববঙ্গবাসীদের মর্মাহত করে। যার পরিণতি ১৯৫২ সালে রক্তাক্ত মহান ভাষা আন্দোলন। অনেক রক্তের বিনিময়ে ১৯৫৬ সালে পশ্চিমা শাসকরা উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। সেদিন পূর্ববঙ্গের বাঙালিরা ভাষার প্রশ্নে ছিল উত্তপ্ত ও উদ্বেলিত। বাংলা অক্ষর, ভাষা ও ব্যাকরণকে সহজ করার জন্য বাঙালিরা ২টি সংস্থার জন্ম দেয়। বাংলা ভাষা পরিকল্পনায় এদুটো প্রতিষ্ঠানই মুখ্য ভূমিকা রাখে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাবোর্ড, টেকস্টবুক বোর্ড তখনও গৌণ। এসব প্রতিষ্ঠান নিজনিজ ক্ষেত্রে প্রয়োজন মতো পরিভাষা প্রণয়নে ভূমিকা রাখে। বাংলা একাডেমি (১৯৫৭) ও বাংলা উন্নয়ন বোর্ড (১৯৬৩)। এদেশে পরিভাষা সম্পর্কিত চিন্তার সূত্রপাত হয়। মুহম্মদ আব্দুল হাই-এর ‘আমাদের পরিভাষা সমস্যায় সংস্কৃতের স্থান’ (১৯৬১) এবং ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ‘আমাদের পরিভাষা সমস্যা’ (১৯৬২) প্রবন্ধ দুটি পরিভাষার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে পরিভাষা প্রণয়নে ৩ জন মনীষীর নাম স্মরণযোগ্য। যেমন : আব্দুল হাই, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও সৈয়দ আলী আহসান।

পরিভাষার বৈশিষ্ট্য

পরিভাষার ৪টি বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

যেমন: সর্বজন স্বীকৃতি, স্বাভাবিকতা, বিশিষ্টার্থ প্রয়োগ, আড়ষ্টত্বহীনতা

পরিভাষা নির্মাণের উপায়

৪টি উপায়ে পরিভাষা নির্মাণ করা যায়। যেমন:

১. পূর্ব ব্যবহৃত শব্দ ও শব্দাংশ জুড়ে। যেমন: উপাচার্য (Vice Chancellor)

২. পূর্ব ব্যবহৃত শব্দের অর্থের পরিবর্তন ঘটিয়ে। যেমন: বর্ণ (রং)>কিন্তু ব্যাকরণে ধ্বনি সংকেত।

৩. অন্য ভাষা থেকে শব্দ ধার করে। যেমন: Green>সবুজ (ফারসি)-এর বাংলা নাই।

৪. সোজাসুজি নতুন শব্দ নির্মাণ করে। যেমন: Circle>চক্র।

পরিভাষা নির্মাণের রীতি

পরিভাষা নির্মাণের ৩টি রীতি রয়েছে। যেমন:

১. ঋণ: ঋণ শব্দ অপরিবর্তিত থাকাই শ্রেয়। যেমন: অতি প্রচলিত ঋণ শব্দ।

২. ঋণ অনুবাদ: পুরনো শব্দ, অপ্রচলিত শব্দ কিংবা অর্ধবিস্মৃত শব্দই এর উৎস।

  যেমন: epenthesis-অপিনিহিত, en = নি, thisis = হিতি, up = উজান।

৩. নির্মাণ>সংস্কৃত, আরবি, ফারসি এর উৎস। যেমন: fact-তথ্য।

পারিভাষিক শব্দের নমুনা

১. রসায়ন

Aberration  — বিচ্যুতি

Absolute   — পরম/ খাঁটি/আসল

Bronze    — তামা

Extraction  — নিষ্কাশন

Hydrogen  — উদজান

Nitrogen   — যবক্ষারজান

Neutron   — নিষ্ক্রিয় কর্মা/ তড়িৎ বিহীন কথা

Oxygen   — অম্লজান

৩. পদার্থ বিদ্যা

Arc            — চাপ

Axis            — অক্ষ

Axis of rotation    — ঘূর্ণাক্ষ

Cell            — সেল

Central force  — কেন্দ্রিক বল

Chance            — দৈব

Inlet       — প্রবেশ পথ

৪. ভূবিদ্যা

Ablation         — ক্ষয়

৫. মৃৎবিজ্ঞান

Buffer elements    — নিরপেক্ষ উৎপাদন

Bulk density      — আকারের ঘনত্ব

Calcium         — ক্যালসিয়াম

Calcium carbonate — খড়িমাটি

Capillary force     — কৈশিক শক্তি

 

৬. তথ্য গণিত

Absolute      — স্বকীয়

Applied statistics — ফলিত বা ব্যবহারিক তথ্য গঠিত

Job evaluation — কার্যের মূল্যায়ন

 

৭. গণিত শাস্ত্র

Eccentr Icity      — রাশি/রাশিমালা

Expression       — সসীম

Fundamental rules   — মূল নিয়ম

Integral number    — পূর্ণসংখ্যা

৮. রাষ্ট্র বিজ্ঞান

Knave          — প্রতারক

Legal           — বৈধ

Nationality       — জাতীয়তা

বর্ণভিত্তিক পারিভাষিক শব্দের নমুনা

A

Absent        — স্থত, গরহাজির

A.C          — খ্রিস্টপূর্ব

A/C          — হিসাব

Academy      — বিদ্যাপীঠ

Act          — আইন

Auxiliary       — সহায়ক

Average       — গড়, গড়পড়তা

B

By-law        — উপধারা, উপবিধি

Back-ground    — পটভূমি

Back-bone      — মেরুদণ্ড

B.C          — খ্রিস্টপূর্ব

Bearer        — বাহক

Bill          — মূল্যপত্র

Blacklist       — দুষ্ট সূচি

Breath        — শ্বাস-প্রশ্বাস

C

Cable         — তার

Coin          — মুদ্রা

Collection      — আদায়, সংগ্রহ

Colony        — উপনিবেশ, সঙ্ঘ

Complemen     — পূরণ, প্রতিপূরণ

Complex       — জটিল, মিশ্র

Compliment     — সৌজন্য

Control Room   — নিয়ন্ত্রণ কক্ষ

Crisis         — সংকট

Criminal Law    — দণ্ডবিধি

Forum        — ভাস্থল, ফোরাম, বিচারালয়

Fund         — তহবিল

Cyclic         — আবর্ত, বৃত্তস্থ

Cyclone       — ঘূর্ণিঝড়

D

Data          — উপাত্ত, তথ্য

Deal          — ব্যবসায়ের চুক্তি

Duplication      — অনুলিপি, অনুবর্তন

Dairy         — দোহশালা

Dead lock      — অচলাবস্থা

Dealer        — পরিবেশক, ব্যাপারি

Duty          — কর্তব্য, কার্য, শুল্ক

Dynamite       — বিস্ফোরক বিশেষ

E

Economic      — মিতব্যয়ী, অর্থনৈতিক

Exhibition      — প্রদর্শনী, মেলা

Expert        — বিশেষজ্ঞ, দক্ষ

Eyewash       — ধোঁকা

Eye evidence   — চাক্ষুষ প্রমাণ

F

Fact          — প্রকৃত ঘটনা, তথ্য

Factor         — কারণ, উৎপাদক, গুণক

Faculty        — অনুষদ, মনোবৃত্তি

Fair Price      — ন্যায্যমূল্য

Farce         — প্রহসন, হাসির নাটক

Farm         — খামার

Fascism       — ফ্যাসিবাদ

Formula       — সূত্র

Fulltime        — পূর্ণকাল

Magnet        — চুম্বক

Machine       — যন্ত্র, কল

Machinetools    — যন্ত্রপাতি

Magazine      — সাময়িকপত্র, বারুদখানা

G

Gazette        — ঘোষণা

Gazetted       — ঘোষিত

Guilty         — অপরাধী

Guide-Book     — নির্দেশিকা, নির্দেশ গ্রন্থ

Guard         — রক্ষী, প্রহরী

H

Hand-Bill      — ইশতেহার, প্রচারপত্র

Hostile        — শত্রুভাবাপন্ন

Hostess        — বাড়িওয়ালা

House Wife     — গৃহিণী/গিন্নি

Hygiene       — স্বাস্থ্যবিদ্যা

 

I

Irrigation       — সেচ

Initial         — প্রারম্ভিক

Introduction     — ভূমিকা

Invigilator       — পরীক্ষা-পরিদর্শক

Invitation       — আমন্ত্রণ, নিমন্ত্রণ

Issue         — প্রেরণ, প্রচার, প্রদান

J

Job          — কাজ, চাকরি, কর্ম

Jail           — কারাগার, জেল

Judge         — বিচারক

Jointventure     — যৌথ প্রচেষ্টা

Journalism      — সাংবাদিকতা

K

Kingdom       — রাজ্য

Knight         — সম্ভ্রান্ত, বংশীয়

Kindness       — দয়া

Keeper        — রক্ষক

Kiln          — ভাটি

Knowledge      — কৌশল, জ্ঞান

L

Liver          — যকৃত

Lawyer        — আইনজ্ঞ

Laboratory      — পরীক্ষাগার

Leisure        — অবকাশ

Landing        — অবরোহণ, অবতরণ

Land Lord      — জমিদার, ভূস্বামী

M

Magistrate      — শাসক

Muscle        — পেশী

Memo         — স্মারক

Urban         — পৌর, শহর

Urine         — প্রস্রাব, মূত্র

Urgent        — জরুরি

Union         — সংযোগ, মিল, সম্মেলন

Urinal         — প্রস্রাবের স্থানে, মূত্রাধার

N

Nation         — জাতি

National       — জাতীয়

Nationality      — জাতীয়তা

Nationalization   — জাতীয়করণ

Notice         — বিজ্ঞপ্তি

O

Oath          — শপথ

Overseer       — উপদর্শক

P

Paid          — পরিশোধিত

Para          — অনুচ্ছেদ

Panel         — নামসূচি

Parliamentary    — সংসদীয়

Parliament      — সংসদ

 

Q

Qualification     — গুণ, যোগ্যতা

Quarter        — চতুর্থাংশ, সিকি; পাদ

Quarterly       — ত্রৈমাসিক

Quotation      — মূল্যজ্ঞাপন, উদ্ধার

R

Receipt        — রসিদ

Revenue       — রাজস্ব

Respiration     — শ্বাস, শ্বসন

Report        — প্রতিবেদন

Ratio         — অনুপাত

Reagent       — বিকারক

S

Salary         — বেতন

Salesman      — বিক্রয়কর্মী

Sanction       — অনুমোদন

Script         — লিপি

Science        — বিজ্ঞান

Secretary General — মহাসচিব

T

Technical       — কারিগরি

Treasurer      — কোষাধ্যক্ষ

Tribal         — উপজাতীয়

 

U

University      — বিশ্ববিদ্যালয়

United Front    — যুক্তফ্রন্ট

Universal       — সার্বিক, সর্বজনীন

Workshop      — কারখানা

Worship       — পূজা, ধর্মকর্ম

Writer         — লেখক, লিপিকার মুরশি

Writing Off     — অবলকন

 

V

Visit          — সফর

Volcano       — আগ্নেয়গিরি

Volunteer      — স্বেচ্ছাসেবক

Voucher       — রশিদ

Voluntary       — স্বেচ্ছাক্রিয়া

Vanity Bag     — প্রসাধন ব্যাগ

Vegetable       — সবজি

Venue        — স্থান

Virus         — জীবাণু

Visa          — প্রবাসাজ্ঞা

Visiting-Card    — সাক্ষাৎপত্র, দর্শনপত্র

 

W

Weather        — আবহাওয়া

X

X-ray         — রঞ্জনরশ্মি

Y

Year          — বৎসর

Year-Book     — বর্ষপঞ্জি

Yearly         — বার্ষিক, বাৎসরিক

Yours Sincerely  — বিশ্বস্ত, ভবদীয়

Yieldto        — নতি স্বীকার করা

 

Z

Zone         — অঞ্চল, বলয়, মণ্ডল

Zoo          — চিড়িয়াখানা

Zeal For       — উৎসাহ

Zealous For    — উৎসাহী

Zest For       — অনুরাগ

সমার্ক ও বিপরীত শব্দ

সমার্থক শব্দ

যেসব শব্দ একই অর্থ প্রকাশ করে তাদের সমার্থক বা একার্থক শব্দ বলে। রচনার মাধুর্য সৃষ্টির জন্য একটা অর্থকেই বিভিন্ন বাক্যে বিভিন্ন শব্দ দ্বারা প্রকাশ করা প্রয়োজন। কবিতায় এর প্রয়োগ বেশি। এখানে কতগুলো সমার্থক শব্দের উদাহরণ দেওয়া হলো।

শব্দে প্রয়োগ

অন্ধকার-আঁধার, তমসা, তিমির   

আকাশ-অম্বর, গগন, নভঃ, ব্যোম

আগুন-অগ্নি, অনল, পাবক, বহ্নি, হুতাশন

ঈশ্বর-আল্লাহ, খোদা, জগদীশ্বর, ধাতা, বিধাতা, ভগবান, সৃষ্টিকর্তা, স্রষ্টা

কান-কর্ণ, শ্রবণ

চুল-অলক, কুন্তল, কেশ, চিকুর

চোখ-অক্ষি, চক্ষু, নয়ন, নেত্র, লোচন

জল-অম্বু, জীবন, নীর, পানি, সলিল

তীর-কূল, তট, সৈকত

দিন-দিবস, দিবা

দেবতা-অমর, দেব, সুর

দেহ-গাত্র, গা, তনু, শরীর

ধন-অর্থ, বিত্ত, বিভব, সম্পদ

পৃথিবী-অবনী, ধরা, ধরণী, ধরিত্রী, বসুন্ধরা, ভূ, মেদিনী

পর্বত-অচল, অদ্রি, গিরি, পাহাড়, ভূধর, শৈল

পিতা-আব্বা, জনক, বাবা

পুত্র-ছেলে, তনয়, নন্দন, সুত

মাতা-গর্ভধারিণী, প্রসূতি, মা, জননী

কোকিল-পরভৃত, পিক

গরু-গো, গাভী, ধেনু

চাঁদ-চন্দ্র, নিশাকর, বিধু, শশধর, শশাঙ্ক, সুধাংশু, হিমাংশু

রাজা-নৃপতি, নরপতি, ভূপতি

সূর্য-আদিত্য, তপন, দিব্যকর, ভাস্কর, ভানু, মার্তণ্ড, রবি, সবিতা

স্বর্গ-দেবলোক, দ্যুলোক, বেহেশত

নদী-তটিনী, স্রোতস্বতী, স্রোতস্বিনী

নারী-অবলা, কামিনী, মহিলা, স্ত্রীলোক, রমণী

মৃত্যু-ইন্তেকাল, ইহলীলা-সংবরণ, ইহলোক ত্যাগ, চিরবিদায়, জান্নাতবাসী হওয়া

    দেহত্যাগ, পঞ্চত্বপ্রাপ্তি, পরলোকগমন, লোকান্তরগমন, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ, স্বর্গলাভ

সাপ-অহি, আশীবিষ, নাগ, ফণী, ভুজঙ্গ, সর্প

সমুদ্র-অর্ণব, জলধি, জলনিধি, পারাবার, বারিধি, রত্নাকর, সাগর, সিন্ধু

হাতি-কর, বাহু, ভুজ, হস্ত

বাক্যে প্রয়োগ

* কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে।

* গগনে উদিল রবি লোহিত বরণ।

* দিবসে আলস্যে নিদ্রা অতি দূষণীয়।

* অবলা সবলা আজ নহে তো দুর্বলা।

* প্রচণ্ড মার্তণ্ড তাপে গলিছে তুষারপিণ্ড।

 

বিপরীতার্থক শব্দ

একটি শব্দের বিপরীত অর্থবাচক শব্দকে বিপরীতার্থক শব্দ বলে।

শব্দের পূর্বে সাধারণত অ, অন, অনা, অপ, অব, দুর, ন, না, নি, নির প্রায়ই না-বাচক বা নিষেধবোধক অর্থ প্রকাশ করে। তাই শব্দের বিরোধার্থক শব্দ তৈরিতে এই উপসর্গগুলো কিছুটা সাহায্য করে। তবে গঠনগত দিক থেকে শব্দের বিপরীতার্থক শব্দগুলো প্রায়ই মূল শব্দের সঙ্গে সম্পর্কশূন্য। যেমন :

শব্দ        বিপরীতার্থক   শব্দ   বিপরীতার্থক    শব্দ        বিপরীতার্থক শব্দ

কাজ       অকাজ         সঞ্চয়     ব্যয়           আকর্ষণ     বিকর্ষণ

উপচয়      অপচয়      উন্নত  অবনত/অনুন্নত   পথ         বিপথ

কৃতজ্ঞ      অকৃতজ্ঞ     কৃতঘ্ন  উৎকর্ষ/অপকর্ষ  বাদী        বিবাদী

কেজো      অকেজো     যশ   অপযশ               যুক্ত       বিযুক্ত

চেতন      অচেতন     সবল  দুর্বল                    সফল       বিফল

চেনা       অচেনা      সুকৃত  দুষ্কৃত                    সুশ্রী       বিশ্রী

জানা       অজানা      সুখ   দুঃখ                      স্মৃতি       বিস্মৃতি

জ্ঞানী       অজ্ঞান      সুলভ  দুর্লভ                   ঠিক       বেঠিক

ধর্ম        অধর্ম       সুশীল  দুঃশীল                   তাল       বেতাল

নশ্বর       অবিনশ্বর    আসল  নকল                  হাল        বেহাল

লক্ষ্মী       অলক্ষ্মী      আস্তিক নাস্তিক               হুঁশ        বেহুঁশ

শান্ত       অশান্ত      লায়েক নালায়েক               অগ্র        পশ্চাৎ

শিষ্ট       অশিষ্ট      খুঁত   নিখুঁত                    অচল       সচল

শুভ       অশুভ      খোঁজ  নিখোঁজ                 অনুকূল      প্রতিকূল

শ্রদ্ধা       অশ্রদ্ধা      বিরত  নিরত                 অন্তর       বাহির

অন্ত        অনন্ত       অন্তরঙ্গ বহিরঙ্গ               অধম       উত্তম

স্থাবর      অস্থাবর     জঙ্গম  আশা/নিরাশা      উৎসাহ      নিরুৎসাহ

অতিবৃষ্টি     অনাবৃষ্টি     অধমর্ণ/উত্তমর্ণ          অল্প        অধিক

অভিজ্ঞ      অনভিজ্ঞ    অর্থ   অনর্থ              দোষী       নির্দোষ

আচার      অনাচার     ধনী   নির্ধন/দরিদ্র       আকুঞ্চন     প্রসারণ

আত্মীয়      অনাত্মীয়     প্রবল  দুর্বল            আগে       পিছে

আদর      অনাদর     রোগ  নীরোগ            আপদ      নিরাপদ

আবশ্যক     অনাবশ্যক    সচেষ্ট  নিশ্চেষ্ট      আপন      পর

আবিল      অনাবিল     সদয়  নির্দয়           আদান      প্রদান

আস্থা       অনাস্থা      সম্বল  নিঃসম্বল          আদি       অন্ত

ইচ্চা       অনিচ্ছা     সরস  নীরস              আবির্ভাব    তিরোভাব

ইষ্ট        অনিষ্ট      সাকার নিরাকার          আমদানি     রপ্তানি

উপস্থিত     অনুপস্থিত    আঁটি  শাঁস            আয়       ব্যয়

অজ্ঞ       বিজ্ঞ       আসল  নকল               উপকার     অপকার

অনুরক্ত     বিরক্ত      ইতর  ভদ্র                মান       অপমান

অনুরাগ     বিরাগ      ইদানীং তদানীং        ইহলোক      পরলোক

ডোবা      ভাসা       লঘু   গুরু                   ইহা        উহা

তিরস্কার     পুরস্কার     লাভ  ক্ষতি/লোকসান মিলন       বিরহ

উচ্চ       নীচ        তেজী  নিস্তেজ

উত্থান      পতন       দাতা  গ্রহীতা              শত্রু       মিত্র

উদয়       অস্ত       দিন   রাত                   শীঘ্র       বিলম্ব

উন্নতি      অবনতি     দীর্ঘ   হ্রস্ব                 সত্য       মিথ্যা

ঊর্ধ্ব       অধ        দুষ্ট   শিষ্ট                   সমষ্টি       ব্যাষ্টি

এলোমেলো    গোছানো     দূর   নিকট          সার্থক      ব্যর্থ

ওঠা       নামা       দেওয়া নেওয়া              সুন্দর       কুৎসিত

ওস্তাদ      সাগরেদ     দেনা  পাওনা             সৃষ্টি       ধ্বংস

কৃত্রিম      স্বাভাবিক    ধনী   নির্ধন/গরিব      স্থির       চঞ্চল

কোমল      কর্কশ       নতুন  পুরাতন          স্মৃতি       বিস্মৃতি

ক্রয়       বিক্রয়      নরম  শক্ত                 স্বকীয়      পরকীয়

ক্ষুদ্র        বৃহৎ       নিদ্রিত জাগ্রত             স্বতন্ত্র       পরতন্ত্র

খাঁটি       ভেজাল      নিন্দা  প্রশংসা            স্বর্গ        নরক

খাতক      মহাজন      বন্ধন  মুক্তি            স্বাধীন      পরাধীন

খুচরা       পাইকারি     বন্ধু   শত্রু              হরণ       পূরণ

খোলা       বন্ধ        বর   বৌ                  হার        জিত

গরিষ্ঠ      লঘিষ্ঠ      বর্ধমান ক্ষীয়মান          হাল্কা       বারি

গুরু       লঘু        বড়   ছোট      

গৃহী        সন্ন্যাসী      বাচাল স্বল্পভাষী            হ্রাস       বৃদ্ধি

গ্রহণ       বর্জন       জীবন  মরণ                জোয়ার     ভাটা

ঘাটতি      বাড়তি      বেহেশত্ দোজখ          মুখ্য       গৌণ

ঘাত       প্রতিঘাত     বোকা  চালাক            টাটকা      বাসি

চোর       সাধু       ব্যর্থ   সার্থক                  মৃদু        প্রবল

চোখা       ভোঁতা      ভয়   সাহস               ঠকা       জেতা

ছাত্র       অছাত্র      ভিতর বাহির             রাজা       প্রজা

জন্ম       মৃত্যু       ভীতু  সহাসী              ঠান্ডা       গরম

জয়        পরাজয়     ভীরু  নির্ভীক           রুগ্ণ       সুদ্ধ

জড়       চেতন      ভূত   ভবিষ্যৎ          জাগরিত     নিদ্রিত

ভোঁতা      ধারাল      উত্তর  দক্ষিণ      পূর্ব        পশ্চিম

 

বাক্যে বিপরীতার্থক শব্দের প্রয়োগ

*যুদ্ধে জয়        - পরাজয় নির্ধারিত হবে।

*ব্যবসায়ে লাভ     - ক্ষতি আছেই।

*জীবনে হাসি      - কান্না পর্যায়ক্রমে আসে।

*সাগরে জোয়ার     - ভাটা পানির হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে।

*হালকা আর ভারি যন্ত্রগুলো ধোয়ামোছা কর।

*‘কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর?’

*এ জগৎ হরণ-পূরণের মেলা।

*খেলায় হার-জিত থাকবেই।

*পরাধীন হয়ে সুখভোগের চেয়ে স্বাধীন হয়ে দুঃখ ভোগ করাও ভালো।

*ছেলেটি বড়ই চঞ্চল কিন্তু মেয়েটি কেমন ধীরস্থির।

*সবলের সদম্ভ অত্যাচার দুর্বল আর কতদিন সইবে?

*সাহস দিয়ে ভয়কে জয় কর।

ধ্বনি ও ধ্বনি পরিবর্তন

ধ্বনি

কোনো ভাষার বাক্প্রবাহকে সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে আমরা কতগুলো মৌলিক ধ্বনি পাই। বাংলা ভাষাতেও কতগুলো মৌলিক ধ্বনি আছে। বাংলা ভাষার মৌলিক ধ্বনিকে প্রধান দুভাগে ভাগ করা হয়। যেমন :

স্বরধ্বনি : যে সকল ধ্বনি উচ্চারণের সময় ফুসফুসতাড়িত বাতাস বেরিয়ে যেতে মুখবিবরের কোথাও কোনো প্রকার বাধা পায় না তাদের বলা হয় স্বরধ্বনি/Vowel sound। যেমন : অ, আ, ই, উ, ঊ ইত্যাদি।

ব্যঞ্জনধ্বনি : যে সকল ধ্বনি উচ্চারণের সময় ফুসফুসতাড়িত বাতাস বেরিয়ে যেতে মুখবিবরের কোথাও না কোথাও কোনো প্রকার বাধা পায় কিংবা ঘর্ষণ লাগে তাদের বলা হয় ব্যঞ্জনধ্বনি/ Consonant sound। যেমন: ক, চ, ট, ত, প ইত্যাদি।

নাসিকা ধ্বনি

ঙ ঞ ণ ন ম-এ পাঁচটি বর্ণ এবং ং ঃ  ঁ যে বর্ণের সঙ্গে লিখিত হয় সে বর্ণে দ্যোতিত ধ্বনি উচ্চারণের সময় ফুসফুস নিঃসৃত বায়ু মুখবিবর ছাড়াও নাসারন্ধ্র দিয়ে বের হয়; অর্থাৎ এগুলোর উচ্চারণে নাসিকার সাহায্যের প্রয়োজন হয়। তাই এগুলোকে বলে অনুনাসিক বা নাসিকা ধ্বনি। আর এগুলোর প্রতীক বা বর্ণকে বলা হয় অনুনাসিক বা নাসিক্য বর্ণ।

২৫টি স্পর্শধ্বনি

বর্ণ

বর্ণের নাম

বর্গীয় বর্ণের নাম

ক খ গ ঘ ঙ

কণ্ঠ্য বর্ণ   

ক বর্গীয় বর্ণ

চ ছ জ ঝ ঞ

তালব্য বর্ণ

চ বর্গীয় বর্ণ

ট ঠ ড ঢ ণ

মূর্ধন্য বর্ণ

ট বর্গীয় বর্ণ

ত থ দ ধ ন

দন্ত্য বর্ণ

ত বর্গীয় বর্ণ

প ফ ব ভ ম

ওষ্ঠ্য বর্ণ

প বর্গীয় বর্ণ

২৫টি ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণ স্থান

উচ্চারণ স্থান

ব্যঞ্জনধ্বনির বর্ণসমূহ

উচ্চারণস্থান অনুযায়ী নাম

জিহবামূল

অগ্রতালু

পশ্চাৎ দন্তমূল

অগ্র দন্তমূল

ওষ্ঠ  

ক খ গ ঘ ঙ

চ ছ জ ঝ শ য ষ

ট ঠ ড ঢ ণ ষ র ড় ঢ়

ত থ দ ধ ন ল স

প ফ ব ভ ম

কণ্ঠ্য বা জিহবামূলীয় বর্ণ

তালব্য বর্ণ

মূর্ধন্য বা পশ্চাৎ দন্তমূলীয় বর্ণ

দন্ত বর্ণ

ওষ্ঠ্য বর্ণ

ধ্বনি পরিবর্তন

ভাষার পরিবর্তন ধ্বনির পরিবর্তনের সাথে সম্পৃক্ত। ধ্বনি পরিবর্তন নানা প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়। যেমন:

১. স্বরাগম

ক) আদি স্বরাগম/Prothesis: উচ্চারণের সুবিধার জন্য বা অন্য কোনো কারণে শব্দের আদিতে স্বরধ্বনি এলে তাকে বলে আদি স্বরাগম। যেমন : স্কুল>ইস্কুল, স্টেশন>ইস্টিশন।

খ) মধ্য স্বরাগম, বিপ্রকর্ষ বা স্বরভক্তি/Anaptyxis : সময় সময় উচ্চারণের সুবিধার জন্য সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির মাঝখানে স্বরধ্বনি আসে। একে বলা হয় মধ্য স্বরাগম বা বিপ্রকর্ষ বা স্বরভক্তি। যেমন:

অ : রত্ন>রতন, ধর্ম>ধরম, স্বপ্ন>স্বপন, হর্ষ>হরষ ইত্যাদি।

ই : প্রীতি>পিরীতি, ক্লিপ>কিলিপ, ফিল্ম>ফিলিম ইত্যাদি।

উ : মুক্তা>মুকুতা, তুর্ক>তুরুক, ভ্রু>ভুরু ইত্যাদি।

এ : গ্রাম>গেরাম, প্রেক>পেরেক, স্রেফ>সেরেফ ইত্যাদি

ও : শ্লোক>শোলোক, মুরগ>মুরোগ>মোরগ ইত্যাদি।

গ) অন্ত্যস্বরাগম/Apothesis : কোনো কোনো সময় শব্দের শেষে অতিরিক্ত স্বরধ্বনি আসে। এরূপ স্বরাগমকে বলা হয় অন্ত্যস্বরাগম। যেমন : দিশ >দিশা, পোখত্ >পোক্ত, বেঞ্চ >বেঞ্চি, সত্য>সত্যি।

২. অপিনিহিতি/ Apenthesis : পরের ই-কার আগে উচ্চারিত হলে কিংবা যুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির আগে ই-কার বা উ-কার উচ্চারিত হলে তাকে অপিনিহিতি বলে। যেমন : আজি>আইজ, সাধু>সাউধ, রাখিয়া>রাইখ্যা, বাক্য>বাইক্য, সত্য>সইত্য, চারি>চাইর, মারি>মাইর।

৩. অসমীকরণ / Dissimilation : একই স্বরের পুনরাবৃত্তি দূর করার জন্য মাঝখানে যখন স্বরধ্বনি যুক্ত হয় তখন তাকে বলে অসমীকরণ। যেমন : ধপ+ধপ>ধপাধপ, টপ+টপ>টপাটপ

৪. স্বরসঙ্গতি Vowel harmony : একটি স্বরধ্বনির প্রভাবে শব্দে অপর স্বরের পরিবর্তন ঘটলে তাকে স্বরসঙ্গতি বলে। যেমন: দেশি>দিশি, বিলাতি>বিলিতি, মুলা>মুলো।

ক. প্রগত / Progressive : আদিস্বর অনুযায়ী অন্ত্যস্বর পরিবর্তিত হলে প্রগত স্বরসঙ্গতি হয়। যেমন: মূল্য>মূলো, শিকা>শিকে, তুলা>তুলো।

খ. পরাগত /Regressive : অন্ত্যস্বরের কারণে আদ্যস্বর পরিবর্তিত হলে পরাগত স্বরসঙ্গতি হয়। যেমন: আখো> আখুয়া> এখো, দেশি, দিশি।

গ. মধ্যগত/Mutual: আদ্যস্তর ও অন্ত্যস্বর অনুযায়ী মধ্যস্বর পরিবর্তিত হলে মধ্যগত স্বরসঙ্গতি হয়। যেমন: বিলাতি>বিলিতি।

ঘ. অন্যোন্য/Reciprocal : আদ্য ও অন্ত্য দুই স্বরই পরস্পর প্রভাবিত হলে অন্যোন্য স্বরসঙ্গতি হয়। যেমন: মোজা> মুজো।

ঙ. চলিত বাংলার স্বরসঙ্গতি : গিলা>গেলা, মিলামিশা> মেলামেশা, মিঠা>মিঠে, ইচ্ছা>ইচ্ছে ইত্যাদি। পূর্বস্বর উ-কার হলে পরবর্তী স্বর ও-কার হয়। যেমন : মুড়া>মুড়ো, চুলা>চুলো ইত্যাদি। বিশেষ নিয়মে : উড়–নি>উড়নি, এখনি>এখুনি হয়।

৫. সম্প্রকর্ষ বা স্বরলোপ : দ্রুত উচ্চারণের জন্য শব্দের আদি, অন্ত্য বা মধ্যবর্তী কোনো স্বরধ্বনির লোপকে বলা হয় সম্প্রকর্ষ। যেমন : বসতি>বসইত, জানালা>জান্লা ইত্যাদি।

ক. আদিস্বরলোপ / Aphesis : যেমন : অরাবু>লাবু>লাউ, উদ্ধার>উধার>ধার।

খ. মধ্যস্বর লোপ / Syncope : অগুরু>অগ্রু, সুবর্ণ>স্বর্ণ।

গ. অন্ত্যস্বর লোপ / Apocope : আশা>আশ, আজি>আজ, চারি>চার (বাংলা), সন্ধ্যা> সঞঝা> সাঁঝ। (স্বরলোপ বস্তুত স্বরাগমের বিপরীত প্রক্রিয়া।)

৬. ধ্বনি বিপর্যয় : শব্দের মধ্যে দুটি ব্যঞ্জনের পরস্পর পরিবর্তন ঘটলে তাকে ধ্বনি বিপর্যয় বলে। যেমন: ইংরেজি বাক্স>বাংলা বাস্ক, জাপানি রিকশা>বাংলা রিস্কা, পিশাচ>পিচাশ, লাফ>ফাল।

৭. সমীভবন/ Assimilation: শব্দমধ্যস্থ দুটি ভিন্ন ধ্বনি একে অপরের প্রভাবে অল্প-বিস্তর সমতা লাভ করে। এ ব্যাপারকে বলা হয় সমীভবন। যেমন : জন্ম>জম্ম, কাঁদনা>কান্না ইত্যাদি।

ক. প্রগত সমীভবন/Progressive: পূর্ব ধ্বনির প্রভাবে পরবর্তী ধ্বনির পরিবর্তন ঘটে।পরবর্তী ধ্বনি পূর্ববর্তী ধ্বনির মতো হয়, একে বলে প্রগত সমীভবন। যেমন: চক্র>চক্ক, পদ্ম>পদ্দ, লগ্ন> লগ্গ।

খ. পরাগত সমীভবন/ Regressive : পরবর্তী ধ্বনির প্রভাবে পূর্ববর্তী ধ্বনির পরিবর্তন হয় একে বলে পরাগত সমীভবন। যেমন : তৎ+জন্য>তজ্জন্য, তৎ+হিত>তদ্ধিত, উৎ+মুখ>উন্মুখ ইত্যাদি।

গ. অন্যোন্য সমীভবন/ Mutual : যখন পরস্পরের প্রভাবে দুটো ধ্বনিই পরিবর্তিত হয় তখন তাকে বলে অন্যোন্য সমীভবন। যেমন : সংস্কৃত সত্য>প্রাকৃত-সচ্চ, সংস্কৃত-বিদ্যা>প্রাকৃত-বিজ্জা ইত্যাদি।

৮. বিষমীভবন/ Dissimilation : দুটো সমবর্ণের একটির পরিবর্তনকে বিষমীভবন বলে। যেমন: শরীর>শরীল, লাল>নাল।

৯. দ্বিত্ব ব্যঞ্জন বা ব্যঞ্জনদ্বিত্বা/Long Consonant : কখনো কখনো জোর দেয়ার জন্য শব্দের অন্তর্গত ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব উচ্চারণ হয়, একে বলে দ্বিত্ব ব্যঞ্জন বা ব্যঞ্জনদ্বিত্বা। যেমন : পাকা>পাক্কা, সকাল>সক্কাল ইত্যাদি।

১০. ব্যঞ্জন বিকৃতি : শব্দ-মধ্যে কোনো কোনো সময় কোনো ব্যঞ্জন পরিবর্তিত হয়ে নতুন ব্যঞ্জনধ্বনি ব্যবহৃত হয়। একে বলে ব্যঞ্জন বিকৃতি। যেমন : কবাট>কপাট, ধোবা>ধোপা, ধাইমা> লাইমা ইত্যাদি।

১১. ব্যঞ্জনচ্যুতি : পাশাপাশি সমউচ্চারণের দুটি ব্যঞ্জনধ্বনি থাকলে তার একটি লোপ পায়। এরূপ লোপকে বলা হয় ধ্বনিচ্যুতি বা ব্যঞ্জনচ্যুতি। যেমন : বউদিদি>বউদি, বড় দাদা>বড়দা ইত্যাদি।

১২. অন্তর্হতি : পদের মধ্যে কোনো ব্যঞ্জনধ্বনি লোপ পেলে তাকে বলে অন্তর্হতি। যেমন : ফাল্গুন> ফাগুন, ফলাহার> ফলার, আলাহিদা>আলাদা ইত্যাদি।

১৩. অভিশ্রুতি/Umlaut : বিপর্যস্ত স্বরধ্বনি পূর্ববর্তী স্বরধ্বনির সাথে মিলে গেলে এবং তদনুসারে পরবর্তী স্বরধ্বনির পরিবর্তন ঘটলে তাকে বলে অভিশ্রুতি। যেমন : করিয়া থেকে অপিনিহিতির ফলে ‘কইরিয়া’ কিংবা বিপর্যয়ের ফলে ‘কইরা’ থেকে অভিশ্রুতিজাত ‘করে’। এরূপ : শুনিয়া>শুনে, বলিয়া>বলে, হাটুয়া>হাউটা>হেটো, মাছুয়া>মেছো ইত্যাদি।

১৪. র-কার লোপ: আধুনিক চলিত বাংলায় অনেক ক্ষেত্রে র-কার লোপ পায় এবং পরবর্তী ব্যঞ্জন দ্বিত্ব হয়। যেমন : তর্ক>তক্ক, করতে>কত্তে, মারল>মাল্ল, করলাম>কল্লাম।

১৫. হ-কার লোপ: আধুনিক চলিত ভাষায় অনেক সময় দুই স্বরের মাঝামাঝি হ-কারের লোপ হয়। যেমন : পুরোহিত>পুরুত, গাহিল>গাইল, চাহে>চায়, সাধু>সাহু>সাউ, আরবি-আল্লাহ>বাংলা-আল্লা, ফারসি : শাহ্>বাংলা-শা ইত্যাদি।

১৬. অ-শ্রুতি ও ব-শ্রুতি / Euphonic glides: শব্দের মধ্যে পাশাপাশি দুটো স্বরধ্বনি থাকলে যদি এ দুটো স্বর মিলে একটি দ্বিস্বর (যৌগিক স্বর) না হয় তবে এ স্বর দুটোর মধ্যে উচ্চারণের সুবিধার জন্য একটি ব্যঞ্জনধ্বনির মতো অন্তঃস্থ ‘য়’ (ণ) বা অন্তঃস্থ ‘ব’ (ড) উচ্চারিত হয়। এই অপ্রধান ব্যঞ্জনধ্বনিটিকে বলা হয় য়-শ্রুতি ও ব-শ্রুতি। যেমন : মা+আমার=মা (য়) আমার> মায়ামার। যা+অ=যা (ও) য়া=যাওয়া। এরূপ : নাওয়া, খাওয়া, দেওয়া ইত্যাদি।

বর্ণ

ধ্বনি নির্দেশক চিহ্নকে বলা বর্ণ/ Letter। বর্ণ দুই প্রকার। যেমন :

স্বরবর্ণ : স্বরধ্বনি দ্যোতক লিখিত সাংকেতিক চিহ্নকে বলা হয় স্বরবর্ণ। যেমন : অ, আ, ই, ঈ, উ, উ ইত্যাদি।

ব্যঞ্জনবর্ণ : ব্যঞ্জনধ্বনি দ্যোতক লিখিত সাংকেতিক চিহ্নকে বলা হয় ব্যঞ্জনবর্ণ। যেমন : ক, খ, গ, ঘ ইত্যাদি।

বর্ণমালা : যে কোনো ভাষায় ব্যবহৃত লিখিত সকল বর্ণকে সেই ভাষার বর্ণমালা/Alphabet বলা হয়। বাংলা বর্ণমালায় মোট ৫০টি বর্ণ রয়েছে। তার মধ্যে স্বরবর্ণ ১১টি এবং ব্যঞ্জনবর্ণ ৩৯টি।

স্বরবর্ণ

অ আ ই ঈ উ ঊ ঋ এ ঐ ও ঔ =১১টি

ব্যঞ্জনবর্ণ

ক খ গ ঘ ঙ (ক-বর্গ) ৫টি

চ ছ জ ঝ ঞ (চ-বর্গ) ৫টি

ট ঠ ড ঢ ণ  (ট-বর্গ) ৫টি

ত থ দ ধ ন  (ত-বর্গ) ৫টি

প ফ ব ভ ম (প-বর্গ) ৫টি

য র ল             ৩টি

শ ষ স হ           ৪টি

ড় ঢ় য় ৎ           ৪টি

ং ঃ  ঁ          ৩টি = ৩৯টি

‘ঐ ঔ’ দুটি দ্বিস্তর বা যুগ্ম স্বরধ্বনির প্রতীক। যেমন: অই (অ+ই/ও+ই), ঔ (অ+উ/ও +উ)

বর্ণমালার সংখ্যা

১. বর্ণমালা (৫০টি) : অ-ঐ, ক-ঁ পর্যন্ত

২. স্বরবর্ণ (১১টি) : অ-ঔ পর্যন্ত

৩. ব্যঞ্জনবর্ণ (৩৯টি) : ক-ঁ পর্যন্ত

৪. বর্গীয় বর্ণ (২৫টি) : ক খ গ ঘ ঙ/চ ছ জ ঝ ঞ/ট ঠ ড ঢ ণ/ত থ দ ধ ন/প ফ ব ভ ম

৫. কার (৯টি) : আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, এ,ঐ, ও, ঔ

৬. ফলা (৬টি) : ন-ফলা, ম-ফলা, ব-ফলা, য-ফলা, র-ফলা, ল-ফলা

৭. অল্পপ্রাণ স্বরবর্ণ (৫টি) : অ ই  উ  এ  ও   

৮. মহাপ্রাণ স্বরবর্ণ (৫টি) : আ  ঈ   ঊ  ঐ  ঔ

৯. অল্পপ্রাণ ব্যঞ্জনবর্ণ (২৪টি) : ক গ ঙ/চ জ ঞ/ট ড ণ/ত দ ন/প ব ম/য র ল শ/ষ স ড় য়/ঃ

১০. মহাপ্রাণ ব্যঞ্জনবর্ণ (১১টি) : খ ঘ/ছ ঝ/ঠ ঢ/থ ধ/ফ ভ ঢ়

১১. পূর্ণমাত্রা স্বরবর্ণ (৬টি) : অ  আ  /ই  ঈ  /উ  ঊ                    

১২. মাত্রাহীন স্বরবর্ণ (৪টি) : এ  ঐ  ও  ঔ

১৩. মৌলিক স্বরবর্ণ (৮টি) : অ আ /ই ঈ /উ ঊ /এ ও    

১৪. মৌলিক স্বরবর্ণ (২টি) : ঐ (অ/ও+ই), ঔ (অ/ও+উ)

১৫. পূর্ণমাত্রার ব্যঞ্জনবর্ণ (২৬টি) : ক ঘ/চ ছ জ ঝ /ট ঠ ড ঢ/ত দ ন/ফ ব ভ ম/য র ল ষ/স হ ড় ঢ় য়

১৬. অর্ধমাত্রার ব্যঞ্জনবর্ণ (৭টি) : খ গ  ণ থ ধ প  শ

১৭. মাত্রাহীন ব্যঞ্জনবর্ণ (৬টি) : ঙ ঞ  ঃ   ঁ ৎ ং

১৮. আশ্রিত বর্ণ (৩টি) : ং, ঃ, ঁ

১৯. নাসিক্য বর্ণ/অনুনাসিক (৭টি) : ঙ, ঞ, ণ, ন, ম, ঃ  ঁ

২০. দ্বিস্বর/যৌগিক স্বর (২৫টি) : অই, অউ, অয়, অও, আই, আউ, আয়, আও, ইই, ইউ, ইয়ে, ইও, উই, উয়া, এয়া, এই, এও, ওও

২১. যৌগিক স্বরজ্ঞাপক বর্ণ (২টি) : ঐ ঔ

২২. স্পর্শ ব্যঞ্জন (২৫টি) : ক-ম পর্যন্ত

২৩. উষ্মধ্বনি/শিশধ্বনি (৪টি) : শ, ষ, স, হ

কার (স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপ)

স্বরবর্ণের এবং কতগুলো ব্যঞ্জনবর্ণের দুটি রূপ রয়েছে। স্বরবর্ণ যখন নিরপেক্ষ বা স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হয় অর্থাৎ কোনো বর্ণের সঙ্গে যুক্ত হয় না তখন এর পূর্ণরূপ লেখা হয়। একে বলা হয় প্রাথমিক বা পূর্ণরূপ। যেমন : অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, এ, ঐ, ও, ঔ।

এই রূপ বা form শব্দের আদি, মধ্য, অন্ত-যে কোনো অবস্থানে বসতে পারে। স্বরধ্বনি যখন ব্যঞ্জনধ্বনির সাথে যুক্ত হয়ে উচ্চারিত হয় তখন সে স্বরধ্বনিটির বর্ণ সংক্ষিপ্ত আকারে ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যবহৃত হয়। স্বরবর্ণের এই সংক্ষিপ্ত রূপকে বলা হয় সংক্ষিপ্ত স্বর বা ‘কার’। নামানুসারে এদের নামকরণ করা হয়। যেমন :

অ-এর সংক্ষিপ্ত রূপ/ ‘কার’ নাই।

আ-কার-া 

ই-কার-ি

ঈ-কার-ী

উ-কার-ু

ঊ-কার-ূ

ঋ-কার-ৃ

এ-কার-ে

ঐ-কার-ৈ

ও-কার-ো

ঔ-কার-ৌ

ফলা (স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপ)

স্বরবর্ণ যেমন ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে যুক্ত হলে আকৃতির পরিবর্তন হয়, তেমনি কোনো কোনো ব্যঞ্জনবর্ণও কোনো কোনো স্বর কিংবা অন্য ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে যুক্ত হলে আকৃতির পরিবর্তন হয় এবং কখনো কখনো সংক্ষিপ্তও হয়। যেমন : মা, ম্র ইত্যাদি। স্বরবর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপকে যেমন ‘কার’ বলা হয় তেমনি ব্যঞ্জনবর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপকে বলা হয় ‘ফলা’। এভাবে যে ব্যঞ্জনটি যুক্ত হয় তার নাম অনুসারে ফলার নামকরণ করা হয়। যেমন : ম-এ য-ফলা=ম্য, ম-এ র-ফলা=ম্র, ম-এ ল-ফলা=ম্ল, ম-এ ব-ফলা=স্ব র-ফলা ব্যঞ্জনবর্ণের পরে হলে লিখতে হয় নিচে। ‘ম্র’, আবার ‘র’ যদি ম-এর আগে উচ্চারিত হয়। যেমন : ম-এ রেফ ‘র্ম’ তবে লেখা হয় ওপরে ব্যঞ্জনটিতে মাথায় রেফ (র্) দিয়ে। ‘ফলা’ যুক্ত হলে যেমন তেমনি ‘কার’ যুক্ত হলেও বর্ণের আকৃতি পরিবর্তন ঘটে। যেমন : হ-এ উ-কার-হু, গ-এ উ-কার=গু, শ-এ উ-কার=শু, স-এ উ-কার-সু, র-এ উ-কার= রু, র-এ ঊ-কার=রূ, হ-এ ঋ-কার=হৃ।

পরাশ্রয়ী বর্ণ

ং ঃ  ঁ-তিনটি বর্ণ স্বাধীনভাবে স্বতন্ত্র বর্ণ হিসেবে ভাষায় ব্যবহৃত হয় না। এ বর্ণে দ্যোতিত ধ্বনি অন্য ধ্বনির সঙ্গে মিলিত হয়ে একত্রে উচ্চারিত হয়। তাই এদের বলা হয় পরাশ্রয়ী বর্ণ।

যুক্তবর্ণ

দুই বা ততোধিক ব্যঞ্জনবর্ণ অথবা ব্যঞ্জনচিহ্ন একত্রে যুক্ত হয়ে অর্থবোধক ধ্বনি সৃষ্টি করলে যুক্তবর্র্ণ হয়। অ-এর হসোচ্চারণ নিতেই ব্যঞ্জন ও ব্যঞ্জনের অর্থপূর্ণ যুক্ত অবস্থানকে যুক্তবর্ণ বলে। অন্যভাবে বলা যায়, মুক্ত উচ্চারণ হতে মুক্তি পেতে বর্ণের যুক্ত অবস্থাকে যুক্তবর্ণ বলে। উচ্চারণ বিভ্রাট থেকে মুক্তি পেতেও বর্ণকে যুক্ত করা হয়। যেমন:

অস্বচ্ছ যুক্তবর্ণ

যেসব যুক্তবর্ণ না ভাংলে বুঝা যায় না যে তারা কোন বর্ণ তাদের অস্বচ্ছ যুক্তবর্ণ বলে। দুটি বা তিনটি বর্ণ যুক্ত হতে পারে। গত কয়েক বছর ধরে এনসিটিবি যেরূপে যুক্তবর্ণ ব্যবহার করছে সেরূপ রাখা হয়েছে।

১. ক্ষ/খিও (ক+ষ): ক্ষত, লক্ষ, বক্ষ, শিক্ষিত, পরীক্ষা।

২. ঙ্ক্ষ (ঙ+ক+ষ): আকাঙ্ক্ষা, কাঙ্ক্ষিত।

৩. ক্ষ্ণ (ক+ষ+ণ): তীক্ষ্ণ, সুতীক্ষ্ণ।

৪. ক্ষ্ম (ক+ষ+ম): যক্ষ্মা, সূক্ষ্ম, লক্ষ্মী, লক্ষ্মণ।

৫. হ্ম (হ+ম): ব্রহ্ম, ব্রাহ্ম, ব্রাহ্মবাড়িয়া।

৬. ত্ত /ত্ত্ব (ত+ত/ত+ত+ব): উত্তর, সত্তর, মহত্ত্ব, তত্ত্ব।

৭. ত্থ (ত+থ): উত্থান, উত্থাপন।

৮. হ্ন (হ+ন): মধ্যাহ্ন, আহ্নিক।

৯. হ্ণ (হ+ণ): অপরাহ্ণ, পূর্বাহ্ণ।

১০. ট্ট (ট+ট): অট্টহাসি, চট্টগ্রাম

১১. জ্ঞ (জ+ঞ): জ্ঞান, বিজ্ঞ, বিজ্ঞান, অজ্ঞ, অজ্ঞান, অভিজ্ঞতা, প্রতিজ্ঞা।

১২. ঞ্জ (ঞ+জ): ব্যঞ্জন, অঞ্জন, গুঞ্জন, গঞ্জ, সরঞ্জাম, খঞ্জন, আশুগঞ্জ, অঞ্জন।

১৩. ঞ্চ (ঞ্চ+চ): পঞ্চম, সঞ্চয়, অঞ্চল, বঞ্চনা, চঞ্চু, সঞ্চিত।

১৪. ষ্ণ (ষ+ণ): তৃষ্ণা, সহিষ্ণু, কৃষ্ণ, বিষ্ণু।

১৫. ত্র /ত্র (ত+র-ফলা): ছাত্র, ছাত্রী, ছত্রাক, বেত্রাঘাত।

১৬. ভ্র /ভ্র (ভ+র-ফলা): ভ্রমন, ভ্রমণ।

স্বচ্ছ যুক্তবর্ণ বা ফলাবর্ণ

যেসব যুক্তবর্ণ না ভাংলেও বুঝা যায় যে তারা কোন বর্ণ তাদের স্বচ্ছ যুক্তবর্ণ বা ফলাবর্ণ বলে। আ-কারযুক্ত বর্ণের উচ্চারণ সবমসয় ও-কারন্ত হয়।

১. ক্ক—অক্কা, ধাক্কা, মক্কা

২. ক্ত—ওক্ত, ভক্ত, শক্ত

৩. ক্ট—অক্টোবর, অক্টপাস

৪. ক্ব—ক্বচিৎ, পক্ব

৫. ক্স—বক্স, কক্সবাজার, অক্সিজেন

৬. ক্ল—অক্লান্ত, ক্লান্ত

৭. গ্ন—অগ্নি, মগ্ন, ভগ্ন

৮. গ্ধ—দগ্ধ, মুগ্ধ, স্নিগ্ধ

৯. গ্ল— গ্লানি, গ্লাস,

১০. ঘ্ন—কৃতঘ্ন, বিঘ্ন

১১. ঙ্ক—অঙ্ক, অঙ্কুর, অঙ্কন। বিদেশি শব্দে ঙ না বসে ং বসে।

১২. ঙ্খ—শঙ্খ, শৃঙ্খলা

১৩. ঙ্গ—অঙ্গ, সঙ্গ, বঙ্গ, মঙ্গল

১৪. ঙ্ঘ—সঙ্ঘ, লঙ্ঘন

১৫. চ্চ—উচ্চ, উচ্চারণ, উচ্চারিত

১৬. চ্ছ—কচ্ছপ, সচ্ছল  স্বচ্ছ।

১৭. চ্ছ্ব—উচ্ছ্বল, জলোচ্ছ্বাস।

১৮. জ্জ—সজ্জা, মজ্জা, লজ্জা

১৯. জ্ব —জ্বর, জ্বলন্ত, জ্বালা

২০. জ্জ্ব—উজ্জ্বল, সমুজ্জ্বল

২১. জ্ঝ—কুজ্ঝটিকা

২২. ঞ্ছ—লাঞ্ছনা, বাঞ্ছা

২৩. ঞ্ঝ—ঝঞ্ঝাট

২৪. ড্ড—আড্ডা, বাড্ডা, উড্ডীন

২৫. ণ্ট—কণ্টক, ঘণ্টা, বণ্টন। বিদেশি শব্দে ণ্ট না বসে ন্ট বসে।

২৬. ণ্ন—অক্ষুণ্ন, ক্ষুণ্ন, বিষণ্ন। বিদেশি শব্দে ণ না বসে ন বসে।

২৭. ণ্ঠ—আকুণ্ঠ, কণ্ঠ

২৮. ণ্ড—দণ্ড, খণ্ড, পণ্ড। প্রাদেশিক ও বিদেশি শব্দে ন্ড বসে। যেমন: ঠান্ডা, ঝান্ডা, জন্ডিস

২৯. ত্ন—রত্ন, যত্ন

৩০. ত্ব—ত্বড়িৎ, চত্বর, দ্বিত্ব

৩১. ত্ম—আত্মা, মহাত্মা, আত্মীয়

৩২. থ্ব—পৃথ্বী

৩৩. দ্দ—উদ্দাম, সাদ্দাম, উদ্দীপনা

৩৪. দ্ভ—অদ্ভুত, উদ্ভাবন, উদ্ভিদ

৩৫. দ্ব—দ্বিত্ব, দ্বাদশ, দ্বিপ

৩৬. দ্ম—পদ্ম, ছদ্ম

৩৭. ন্ন—অন্ন, নবান্ন, কান্না, রান্না

৩৮. ন্ত—অনন্ত, দন্ত, শান্ত

৩৯. ন্থ—গ্রন্থ, মন্থর, গ্রন্থাগার

৪০. ন্দ—সুন্দর, ছন্দ, বিন্দু, মন্দ

৪১. ন্দ্ব—দ্বন্দ্ব   

৪২. ন্ড—এন্ড, বন্ড, ঝান্ডা, ঠান্ডা, জন্ডিস (প্রদেশি ও বিদেশি শব্দ)

৪৩. ন্ঠ—লন্ঠন (বিদেশি শব্দ)   

৪৪. ন্ধ—অন্ধ, ^ন্ধ, বন্ধু

৪৫. ন্ব—অন্বয়, সমন্বয়

৪৬. ন্ম—জন্ম, জন্মান্ধ

৪৭. ন্স—মুন্সি, চান্স

৪৮. প্প—পাপ্পু, থাপ্পর, খপ্পর

৪৯. প্ট—চ্যাপ্টা, কিপ্টা

৫০. প্ন—স্বপ্ন, স্বপ্নময়

৫১. প্ল—প্লট, প্লেট, প্লেটো

৫২. প্স—অপ্সরা, অপ্সরী

৫৩. ফ্ল—ফ্লাই, ফ্লাস, ফ্লাইওভার

৫৪. ব্জ—কব্জা, কব্জি, শব্জি

৫৫. ব্দ—অব্দ, জব্দ, শব্দ

৫৬. ব্ধ—আনব্ধ

৫৭. ব্ব—আব্বা, জব্বার

৫৮. ব্ল—ব্লক, ব্ল্যাক

৫৯. ম্ম—আম্মা, সম্মান

৬০. ম্প—বাম্পার, সম্পাদক

৬১. ম্ফ—লম্ফ, ঝম্ফ

৬২. ম্ব—কম্বল, সম্বল, জাম্বু,  লম্বা

৬৩. ম্ভ—সম্ভব, অসম্ভব

৬৪. ম্ন—নিম্ন, চিম্নি

৬৫. ম্ল—অম্ল, ম্লান

৬৬. ম্প্র—সম্প্রসারণ

৬.৭. ম্ভ্র—সম্ভ্রম, সম্ভ্রান্ত

৬৮. ল্ক—উল্কা, মিল্ক, শুল্ক

৬৯. ল্গ—বল্গা

৭০. ল্প—অল্প, স্বল্প, গল্প

৭১. ল্ট—উল্টা, মাল্টা, পাল্টাপাল্টি

৭২. ল্ব—বাল্ব

৭৩. ল্ম—গুল্ম, বাল্মীকি

৭৪. ল্ল—মাল্লা, হল্লা, পল্লব, পল্লি

৭৫. শ্চ——নিশ্চয়, পশ্চাৎ

৭৬. শ্ন—প্রশ্ন, প্রশ্নমালা

৭৭. শ্ম—অশ্ম, রশ্মি, শ্মশান

৭৮. শ্ল—শ্লথ, শ্লোক, শ্লোগান

৭৯. শ্ব—শ্বশুর, শ্বসন, বিশ্ব

৮১. ষ্ট—চেষ্টা, পুষ্টি, মিষ্টি। বিদেশি শব্দে ষ্ট না বসে স্ট বসে।

৮২. ষ্ঠ—মুষ্ঠি, গুষ্ঠি, নিষ্ঠা, পৃষ্ঠা

৮৩. ষ্প—পুষ্প, বাষ্প, নিষ্পাপ

৮৪. ষ্ফ—নিষ্ফল, নিষ্ফলা

৮০. ষ্ক—শুষ্ক, আবিষ্কার, পরিষ্কার

৮৫. ষ্ম—উষ্ম, ভষ্ম, গ্রীষ্ম

৮৬. স্ক—পুরস্কার, স্কুল, বয়স্ক

৮৭. স্খ—স্খলন

৮৮. স্ট—স্টক, স্টেশন, স্টোর, স্টার (বিদেশি শব্দ)

৮৯. স্ত—অস্ত, বাস্তব, রাস্তা

৯০. স্থ—স্থান, সংস্থান, সংস্থাপন

৯১. স্ন—স্নান, স্নাতক, স্নেহ

৯২. স্প—স্পর্শ, স্পষ্ট, ইস্পাত

৯৩. স্ফ—বিস্ফোরণ, অস্ফুটন, স্ফুরণ

৯৪. স্ম—স্মরণ, স্মৃতি, বিস্মৃতি, বিস্ময়

৯৫. স্ব—স্বাধীন, স্বজন, স্বয়ং

৯৬. হ্ব—আহ্বান (আওভান), জিহ্বা (জিউভা)

৯৭. হ্ল—আহ্লাদ, আহ্লাদি

স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণের প্রকরণ

স্বররচিহ্ন বা স্বরকারগত প্রকরণ       

১. আ-কার : আম, জাম 

২. ই-কার : ইট, চিনি, কবি 

৩. ঈ-কার : ঈগল, ছাত্রী, জননী 

৪. উ-কার : উট, কুকুর, কুসুম 

৫. ঊ-কার : ঊষা, সূর্য, কূজন

৬.. এ-কার : একুশ, ছেলে, মেয়ে 

৭. ঐ-কার : ঐরাবত, কৈ, খৈ 

৮.. ও-কার : ওজন, চোখ, ঢোল

৯. ঔ-কার : ঔষধ, নৌকা, মৌ/মউ

১০. ঋ-কার  : কৃষক, গৃহ, মৃত, ঘৃণা   

ব্যঞ্জনচিহ্ন বা ফলা ও রেফগত প্রকরণ

১. ন-ফলা : চিহ্ন, অপরাহ্ণ, রত্ন, কৃষ্ণ

২. ব-ফলা : বিশ্ব, নিঃস্ব, নিতম্ব

৩. ম-ফলা : পদ্ম, আত্মা

৪. র-ফলা : ক্রয়, ভ্রমণ, গৃহ, কৃষক। র-রেফ : কর্ম, ধর্ম  

৫. য-ফলা : সহ্য, পদ্য

৬. ল-ফলা : ক্লান্ত, অম্লান, উল্লাস

স্ববর্ণের স্বরগত প্রকরণ

১. অল্পপ্রাণ (৫টি)  : অ  ই  উ  এ  ও   

২. মহাপ্রাণ (৫টি)  : আ ঈ  ঊ ঐ ঔ 

ব্যঞ্জনবর্ণের স্বরগত প্রকরণ

১. অল্পপ্রাণ (২৪টি): ক গ ঙ/চ জ ঞ /ট ড ণ/ত দ ন/প ব ম/য র ল শ/ষ স ড় য় ঃ।

২. মহাপ্রাণ (১১টি): খ ঘ/ছ ঝ/ঠ ঢ/থ ধ/ফ ভ ঢ়।

মাত্রা

বর্ণ        বর্ণসংখ্যা     স্বরবর্ণ      ব্যঞ্জনবর্ণ

পূর্ণমাত্রা      ৩২        ৬         ২৬

অর্ধমাত্র      ৮         ১         ৭

মাত্রাহীন          ১০        ৪         ৬

স্ববর্ণের মাত্রাগত প্রকরণ       

১. পূর্ণমাত্রা (৬টি) : অ  আ  /ই ঈ  /উ  ঊ

২. মাত্রাহীন (৪টি): এ  ঐ  ও  ঔ

ব্যঞ্জনবর্ণের মাত্রাগত প্রকরণ

১. পূর্ণমাত্রা (২৬টি): ক ঘ/চ ছ জ ঝ/ট ঠ ড ঢ/ত দ ন/ফ ব ভ ম/য র ল ষ/স হ ড় ঢ় য়

২. অর্ধমাত্র (৮টি): খ গ ণ থ ধ  প ঋ শ

৩. মাত্রাহিন (৪টি): ঙ  ঞ  ঃ   ঁ

স্ববর্ণের গঠনগত স্বরবর্ণের প্রকরণ

১. মৌলিক (৭টি) : অ, আ, ই, উ, এ, ও, অ্যা    

২. যৌলিক (২ট) : ঐ (অ+ই/ও+ই), ঔ (অ+উ/ও+উ)

ব্যঞ্জনবর্ণের নাসিক্যবর্ণ (৩টি)

ন/ণ/ঞ, ঙ/ং, ম

শব্দ ও শব্দ শুদ্ধি

অর্থপূর্ণ ধ্বনি সমষ্টিই শব্দ। বাংলা ভাষার অভিধানে যেসব শব্দ আছে অথবা যেসব শব্দ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে, মুখে ব্যবহার করে বা লিখে মনের ভাব প্রকাশ করে সেসব সঞ্চিত শব্দই শব্দভাণ্ডার নামে পরিচিত। যে ভাষার শব্দভাণ্ডার যত উন্নত সেই ভাষা তত সমৃদ্ধ। বাংলা শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধির মূলে রয়েছে আমাদের উত্তরাধিকার থেকে পাওয়া শব্দ। যেগুলো অনেকটা পুরোনো শব্দ। ঋণকরা শব্দ এবং বিভিন্ন নিয়মের মাধ্যমে তৈরিকৃত শব্দ।

বাংলা ভাষা গোড়াপত্তনের যুগে স্বল্প সংখ্যক শব্দ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও নানা ভাষার সংস্পর্শে এসে এর শব্দসম্ভার বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে তুর্কি আগমন ও মুসলিম শাসন পত্তনের সুযোগে ক্রমে প্রচুর আরবি ও ফারসি শব্দ বাংলা ভাষার নিজস্ব সম্পদে পরিণত হয়েছে। এরপর এলো ইংরেজ। ইংরেজ শাসনামলেও তাদের নিজস্ব সাহিত্য এবং সংস্কৃতির বহু শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশ লাভ করে। বাংলা ভাষা ঐ সব ভাষার শব্দগুলো আপন করে নিয়েছে।

বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে শব্দের শ্রেণিবিভাগ হতে পারে।

গঠন অনুসারে শব্দ দুই প্রকার। যেমন :

মৌলিক শব্দ

যেসব শব্দ বিশ্লেষণ করা যায় না বা ভেঙে আলাদা করা যায় না তাদের মৌলিক শব্দ বলে। মৌলিক শব্দগুলোই হলো ভাষার মূল উপকরণ। যেমন : গোলাপ, নাক, লাল, তিন।

সাধিত শব্দ

যেসব শব্দ বিশ্লেষণ করা হলে আলাদা অর্থবোধক শব্দ পাওয়া যায় তাদের সাধিত শব্দ বলে। সাধারণত একাধিক শব্দের সমাস হয়ে কিংবা প্রত্যয় বা উপসর্গ যোগ হয়ে সাধিত শব্দ গঠিত হয়ে থাকে। যেমন :চাঁদমুখ (চাঁদের মতো মুখ), নীলাকাশ (নীল যে আকাশ), ডুবুরি (ডুব্+উরি), চলন্ত (চল্+অন্ত), প্রশাসন (প্র+শাসন), গরমিল (গর+মিল)

অর্থ অনুসারে শব্দ তিন প্রকার। যেমন :

যৌগিক শব্দ (অর্থগত)

যেসব শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ও ব্যবহারিক অর্থ একই রকম তাদের যৌগিক শব্দ বলে। যেমন :

গায়ক=গৈ+ণক (অক)-অর্থ : গান করে যে, কর্তব্য =কৃ+তব্য-অর্থ : যা করা উচিত

বাবুয়ানা=বাবু+আনা-অর্থ : বাবুর ভাব, মধুর=মধু+র-অর্থ : মধুর মতো মিষ্টি গুণযুক্ত

দৌহিত্র=দুহিতা+ষ্ণ্য-অর্থ : কন্যার পুত্র, নাতি, চিকামারা= চিকা+মারা-অর্থ। দেওয়ালের লিখন= দেয়াললিখন।

রূঢ়ি শব্দ (অর্থগত)

যে শব্দ প্রত্যয় বা উপসর্গযোগে মূল শব্দের অর্থের অনুগামী না হয়ে অন্য কোনো বিশিষ্ট অর্থ জ্ঞাপন করে তাকে রূঢ়ি শব্দ বলে। যেমন : হস্তী=হস্ত+ইন, অর্থ-হস্ত আছে যার কিন্তু হস্তী বলতে একটি পশুকে বোঝায়। গবেষণা (গো+এষণা) অর্থ-গরু খোঁজা কিন্তু বর্তমান অর্থ ব্যাপক অধ্যয়ন ও পর্যালোচনা। এরূপ : বাঁশি-বাঁশ দিয়ে তৈরি যে কোনো বস্তু নয়, শব্দটি সুরের বিশেষ বাদ্যযন্ত্র, বিশেষ অর্থে প্রযুক্ত হয়।তৈল-শুধু তিলজাত স্নেহ পদার্থ নয়, শব্দটি যে কোনো উদ্ভিজ্জ পদার্থজাত স্নেহ পদার্থকে বোঝায়। যেমন : বাদাম-তেল। প্রবীণ-শব্দটির অর্থ হওয়া উচিত ছিল প্রকৃষ্ট রূপে বীণা বাজাতে পারেন যিনি। কিন্তু শব্দটি ‘অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বয়স্ক ব্যক্তি’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। সন্দেশ-শব্দ ও প্রত্যয়গত অর্থে ‘সংবাদ’। কিন্তু রূঢ়ি অর্থে ‘মিষ্টান্ন বিশেষ’।

যোগরূঢ় শব্দ (অর্থগত)

সমাস নিষ্পন্ন যে সকল শব্দ সম্পূর্ণভাবে সমস্যমান পদসমূহের অনুগামী না হয়ে কোনো বিশিষ্ট অর্থ গ্রহণ করে, তাদের যোগরূঢ় শব্দ বলে। যেমন : পঙ্কজ-পঙ্কে জন্মে যা (উপপদ তৎপুরুষ সমাস)। শৈবাল, শালুক, পদ্মফুল প্রভৃতি নানাবিধ উদ্ভিদ পঙ্কে জন্মে থাকে। কিন্তু ‘পঙ্কজ’ শব্দটি একমাত্র ‘পদ্মফুল’ অর্থেই ব্যবহৃত হয়। তাই পঙ্কজ একটি যোগরূঢ় শব্দ। রাজপুত-‘রাজার পুত্র’ অর্থ পরিত্রাগ করে যোগরূঢ় শব্দ হিসেবে অর্থ হয়েছে ‘জাতিবিশেষ’। মহাযাত্রা-মহাসমারোহে যাত্রা অর্থ পরিত্যাগ করে একমাত্র ‘সমুদ্র’ অর্থেই ব্যবহৃত হয়।

উৎসমূলক অনুসারে শব্দ পাঁচ প্রকার। যেমন :

তৎসম/সংস্কৃত শব্দ

যেসব শব্দ সংস্কৃত ভাষা থেকে সোজাসুজি বা হুবহু বাংলায় এসেছে এবং যাদের রূপ অপরিবর্তিত রয়েছে সেসব শব্দকে বলা হয় তৎসম শব্দ। তৎসম একটি পারিভাষিক শব্দ। এর অর্থ [তৎ (তার)+সম (সমান)]=তার সমান অর্থাৎ সংস্কৃত। যেমন : চন্দ্র, সূর্য নক্ষত্র, ভবন, ধর্ম, পাত্র, মনুষ্য ইত্যাদি।

অধরতৎসম শব্দ

বাংলা ভাষায় যেসব সংস্কৃত শব্দ কিঞ্চিৎ বা সামান্য পরিবর্তিত আকারে বাংলা ভাষায় এসেছে সেসব শব্দকে অধরতৎসম শব্দ বলে। তৎসম মানে সংস্কৃত। আর অধরতৎসম মানে আধা সংস্কৃত। যেমন : জোছনা, ছেরাদ্দ, গিন্নি, বোষ্টম, কুচ্ছিত। এগুলো যথাক্রমে সংস্কৃত জ্যোৎস্না, শ্রাদ্ধ, গৃহিণী, বৈঞ্চব, কুৎসিত শব্দ থেকে আগত।

তদ্ভব শব্দ

যেসব শব্দ সংস্কৃত ভাষা থেকে সম্পূর্ণ পরিবর্তিত আকারে বাংলা ভাষায় এসেছে সেসব শব্দকে তদ্ভব শব্দ বলে। অন্যভাবে বলা যায়, যেসব শব্দের মূল সংস্কৃত ভাষায় পাওয়া যায় কিন্তু ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন ধারায় প্রাকৃতের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে আধুনিক বাংলা ভাষায় স্থান করে নিয়েছে সেসব শব্দকে বলা হয় তদ্ভব শব্দ। তদ্ভব একটি পারিভাষিক শব্দ। এর অর্থ, ‘তৎ’ (তার) থেকে ‘ভব’ (উৎপন্ন)। যেমন : সংস্কৃত-হস্ত, প্রাকৃত-হথ, তদ্ভব-হাত। সংস্কৃত-চর্মকার, প্রাকৃত-চম্মআর, তদ্ভব-চামার ইত্যাদি। এই সব তদ্ভবশব্দকে খাঁটি বাংলা শব্দও বলা হয়।

তদ্ভব শব্দ <সংস্কৃত শব্দ

অপরূপ < অপূর্ব

অমিয় < অমৃত

অলখ < অলক্ষে

আঁখি < অক্ষি

আঁচল < অঞ্চল

আজ < অদ্য

আঁটি < অস্থি

আদিখ্যেতা < আধিক্যতা

আন্ধার < অন্ধকার

আপন < আত্মপন

আমড়া < আম্রাতক

আমি < অস্মাভি

আরশি < আদর্শিকা

আলতা < অলক্তক

আশি < অশীতি

আঁশ < অংশু

আষ < আমিষ

আস্তাবল <stable

আনারস <Ananos

আলমারি < Armario

এগার < একাদশ

কনে < কন্যা

কলা < কদলি

কাঁথা < কন্থা

কাঁদন < ক্রন্দন

কানু < কৃষ্ণ

কাম < কর্ম

কামার < কর্মকার

কাহন < কার্যাপন   

তদ্ভব শব্দ <সংস্কৃত শব্দ

কুমার < কুম্ভকার

কুঁড়ি < কোরক/কমডল

কেয়া < কেতকী

খই < খদিকা

খাজা < খাদ্য

খুদ < খুদ্র

খেয়া < ক্ষেপ

গরজে < গর্জে

গা < গাত্র

গাঁ < গ্রাম

গাং < গঙ্গা

গাজন < গর্জন

গামছা < গামোছা

গারদ < Guard

ঘর < গৃহ

ঘরনি < গৃহিণী

চাকা < চক্র

চৌকা < চতুঙ্ক

ছা < শাবক

ঝি < দুহিতা

ঠোঁট < তুণ্ড

দুয়ার < দ্বার

দেরাজ < Drawer

নতুন < নূতন

নিশ্চুপ < নিশ্চল+চুপ

পরশে < স্পর্শে

পরান < প্রাণ

পাখা < পক্ষ

বাঁদর < বানর

তদ্ভব শব্দ <সংস্কৃত শব্দ

বুক < বক্ষ

বুনো < বন্য

বোঁটা < বৃন্ত

ভাত < ভত্ত

ভালো < ভদ্রক

মাইরি < mary

মাছ < মৎস্য

মাঝ < মধ্য

মাটি < মৃত্তিকা

মাথা < মস্তক

মেজো < মধ্যক

রাখাল <রক্ষপাল

লাট < Lord

শিউলি < শেফালিকা

সঁপা < সমর্পণ

সরগ < স্বর্গ

সাঁই < স্বামী

সাত < সপ্ত

সাপ< সর্প

সায়র < সাগর

সিঙ্গারা < শৃঙ্গটাক

সিঁথি < সিমন্তিকা

সুন্দর < সুনর

সেয়ানা < সজ্ঞান

সোনা < স্বর্ণ

সোহাগ < সৌভাগ্য

হাঁটা < হণ্টন

হালকা < লঘুক

গেন্ডারিয়া <Grand Area

দেশি শব্দ

যেসব শব্দ বাংলাদেশের কোল, মুণ্ডা প্রভৃতি আদিম অধিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতির কিছু কিছু উপাদান বাংলায় রক্ষিত রয়েছে সেসব শব্দকে দেশি শব্দ বলে। অনেক সময় এসব শব্দের মূল নির্ধারণ করা যায় না কিন্তু কোন ভাষা থেকে এসেছে তার হদিস মেলে। যেমন : কুড়ি (বিশ)-কোলভাষা, পেট (উদর)-তামিল ভাষা, চুলা (উনন)-মুন্ডারী ভাষা।

এরূপ: কুলা, গঞ্জ, চোঙ্গা, টোপর, ডাব, ডাগর, ঢেঁকি ইত্যাদি আরও বহু দেশি শব্দ বাংলায় ব্যবহৃত হয়।

বিদেশি শব্দ

যেসব শব্দ রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সংস্কৃতিগত ও বাণিজ্যিক কারণে বাংলাদেশে আগত বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের বহুশব্দ বাংলায় স্থান করে নিয়েছে সেসব শব্দকে বিদেশি শব্দ বলে। এদের মধ্যে আরবি, ফারসি ও ইংরেজি শব্দই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সে কালের সমাজ জীবনের প্রয়োজনীয় উপকরণরূপে বিদেশি শব্দ এ দেশের ভাষায় গৃহীত হয়েছে। এছাড়া রয়েছে পর্তুগিজ, ফরাসি, ওলন্দাজ, তুর্কি প্রভৃতি দেশ। এসব ভাষারও কিছু শব্দ একইভাবে বাংলা ভাষায় এসে গেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারত, মায়ানমার/বার্মা, মালয়, চীন, জাপান প্রভৃতি দেশেরও কিছু শব্দ আমাদের ভাষায় প্রচলিত রয়েছে।

আরবি শব্দ

বাংলায় ব্যবহৃত আরবি শব্দগুলো দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন :

ধর্মসংক্রান্ত শব্দ : আল্লাহ, ইসলাম, ঈমান, ওজু, কোরবানি, কুরআন, কিয়ামত, গোসল, জান্নাত, জাহান্নাম, তওবা, তসবি, জাকাত, হজ, হাদিস, হারাম, হালাল ইত্যাদি।

প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক শব্দ : আদালত, আলেম, ইনসান, ঈদ, উকিল, ওজর, এজলাস, এলেম, কানুন, কলম, কিতাব, কেচ্ছা, খারিজ, গায়েব, দোয়াত, নগদ, বাকি, মহকুমা, মুন্সেফ, মোক্তার, রায় ইত্যাদি

ফারসি শব্দ

বাংলা ভাষায় আগত ফারসি শব্দগুলো তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন :

ধর্মসংক্রান্ত  শব্দ : খোদা, গুনাহ, দোজখ, নামাজ, পয়গম্বর, ফেরেশতা, বেহেশত, রোজা ইত্যাদি।

প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক শব্দ: কারখানা, চশমা, জবানবন্দি, তারিখ, তোশক, দফতর, দরবার, দোকান, দস্তখত, দৌলত, নালিশ, বাদশাহ, বান্দা, বেগম, মেথর, রসদ ইত্যাদি।

বিবিধ শব্দ : আদমি, আমদানি, জানোয়ার, জিন্দা, নমুনা, বদমাশ, রফতানি, হাঙ্গামা ইত্যাদি।

ইংরেজি শব্দ

ইংরেজি শব্দ দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন :

অনেকটা ইংরেজি উচ্চারণে : ইউনিভার্সিটি, ইউনিয়ন, কলেজ, টিন, নভেল, নোট, পাউডার, পেন্সিল, ব্যাগ, ফুটবল, মাস্টার, লাইব্রেরি, স্কুল ইত্যাদি।

পরিবর্তিত উচ্চারণে : আফিম/Opium, অফিস/Office, ইস্কুল/School, বাক্স/বাকশ/Box, হাসপাতাল /Hospital, বোতল /Bottle ইত্যাদি।

ইংরেজি ছাড়া অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষার শব্দ

পর্তুগিজ : আনারস, আলপিন, আলমারি, গির্জা, গুদাম, চাবি, পাউরুটি, পাদ্রি, বালতি

ফরাসি  : কার্তুজ, কুপন, ডিপো, রেস্তোরাঁ

ওলন্দাজ : ইস্কাপন, টেক্কা, তুরুপ, রুইতন, হরতন

গুজরাটি : খদ্দর, হরতাল

পাঞ্জাবি : চাহিদা, শিখ

তুর্কি : চাকর, চাকু, তোপ, দারোগা

চিনা : চা, চিনি

মায়ানমার/বার্মিজ : ফুঙ্গি, লুংগি

জাপানি : রিকশা, হারিকিরি

                                                       শব্দ শুদ্ধি

অত্র/যত্র/তত্র

সংস্কৃত ‘অত্র/যত্র/তত্র’ থেকে বাংলা ‘এখানে-সেখানে-সেখানে’।

অশুদ্ধ ব্যবহার: অত্র : এ/এই/সে/সেই। যত্র : যে/যেই।

অনুগত/বাধ্যগত

অর্থ: অনুগত অর্থ বাধ্য, অধীন বা আশ্রিত।

অশুদ্ধ ব্যবহার : ‘বাধ্যগত’ তাই কারো অধীনে লিখতে ‘অনুগত’ লিখতে হবে।

অনুপস্থিত/অবর্তমান

যিনি বর্তমানে (আজ/কাল) উপস্থিত নাই তিনি অনুপস্থিত। আর যিনি মারা গিয়েছেন তিনি অবর্তমান (মৃতব্যক্তি)। তাই জীবিত ব্যক্তি কোথায়ও অনুপস্থিত থাকলে ‘অবর্তমান’ লেখা যাবে না। 

অচেনা/অজ্ঞাত

যা চেনা নয় তাই অচেনা (অজানা, অপরিচিত)। যা জ্ঞাত নয় তাই অজ্ঞাত (জাÍ, বংশ পরিচয়, স্বভাব, চরিত্র, সম্পূর্ণ পরিচয়, গোপন)। যেমন : লাশটি অজ্ঞাত না হয়ে হবে ‘লাশটি অচেনা ব্যক্তির বা অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির’ আর ‘মৃত্যুর বিষয়টি অজ্ঞাত’। 

আশঙ্কা (খারাপ) /সম্ভাবনা (ভালো)

বন্যার আশঙ্কা থাকলে পলিমাটির সম্ভানা থাকে।

মারাত্মক (খারাপ)/দারুণ (ভালো)

মারাত্মক অসভ্য ছেলে দারুণ মেধাবী ধোবী হতে পারে।

ই/আর/ও

শব্দে জোর দিতে ‘ই’/‘ও’ বসে। যেমন: তুমিই কাল আসবে। তুমি কালই আসবে। তুমি কাল আসবেই। আমিও যাব। আবার ই-দিয়ে আবার অনুরোধ বোঝায়। যেমন : যখন এসেছ তখন একদিন থাকই না।

ইতিপূর্বে /ইতোমধ্যে

ইতিপূর্বে, ইতঃপূর্বে, ইতিবৃত্ত, ইতিরাজ, ইতিহাস, ইতোমধ্যে (ইতি+মধ্যে)।

উপরোক্ত/উপরিউক্ত/উপর্যুক্ত

উপরোক্ত বা উপরুক্ত ভুল ব্যবহার। উপরিউক্ত-এর সন্ধি হলো উপর্যুক্ত। এদের অর্থ উপরে যা বলা হয়েছে। পূর্বোক্ত বা প্রাগুক্ত বা উপরিউল্লিখিত লেখা যায়। 

উল্লেখিত/উল্লিখিত

উল্লেখিত ব্যবহার ভুল আর উল্লিখিত ব্যবহার শুদ্ধ।

উপর/ওপর

ইংরেজি অন, আপ, অ্যাবাব অর্থাৎ উচ্চতা বুঝাতে ‘উপর’ ব্যবহার করা যায়। যেমন : জমির উপর পানি জমে আছে। টেবিলের উপর বইটি রাখো। আর উচ্চতা না বুঝিয়ে বিষয় বা অন্যকিছু বোঝাতে ‘ওপর’ ব্যবহার করা যায়। যেমন : স্বাধীনতার ওপর সকলেরই আস্থা রয়েছে। তার ওপর আমার বিশ্বাস রয়েছে। একমাত্র পানি সেচের ওপরেই ভালো ফসল আশা করা যায়।

উদ্দেশ/উদ্দেশ্য

সন্ধান, খোঁজ, যাত্র, অ্যাড্র্রেস, প্রতি, দিকে প্রকাশ করতে উদ্দেশ ব্যবহার করা হয়। যেমন : শেষপর্যন্ত তার উদ্দেশ পওয়া গেল না। আজ তারা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছে। আশায়, মতলব, প্রয়োজন, লক্ষ্য (উদ্দেশের বিষয়) প্রকাশ করতে উদ্দেশ্য ব্যবহার করা হয়। যেমন : শেষপর্যন্ত তার উদ্দেশ্য বোঝা গেল। জনমত আদায়ের উদ্দেশ্যেই মন্ত্রিগণ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন।

উচ্ছল/উজ্জ্বল

উচ্ছল (উৎ+ছল) আর উজ্জ্বল (উৎ+জ্বল- ব্যবহারে সতর্ক হওয়া দরকার। অনেকেই ভুলে উচ্ছলে ব-ফলা ব্যবহার করেন যা অশুদ্ধ।

এই পৃথিবী/পৃথিবী

পৃথিবী কী এই বা ওই হয়। পৃথিবী তো একটিই তাই এই বা ওই না লিখে সরাসরি পৃথিবী লিখলেই চলে।

একুশ/একুশে

একুশ টাকা আর একুশে ফেব্রুয়ারি এক নয়। ‘সংখ্যা’ বোঝাতে ‘একুশ’ লেখা হয় আর ‘ভাষাদিবস’ বোঝাতে ‘একুশে’ লেখা হয়। 

ও/আর/এবং

শব্দ ও শব্দ যুক্ত করতে ‘ও/আর’ বসে। বাক্য ও বাক্য যুক্ত করতে ‘এবং/আর’ বসে। আবার শব্দাংশ যুক্ত করতেও এবং লাগে। রহিম ও/আর করিম। রহিম স্কুলে যায় এবং লেখাপড়া করে। দুধ ও ভাত এবং মাছ ও মাংশ তার প্রিয় খাবার।

কত/কতক/বহু (বিশেষণ)

দুটি শব্দই সংখ্যা/পরিমাণবাচক অর্থাৎ বহুত্ববাচক শব্দ। তবে সর্তকতার সাথে ব্যভহার করা দরকার। কত টাকা তার দরকার? কত কথা বলে রে! মাঝে মাঝে কত বিচিত্র শব্দ কানে আসে। কতক=কিছু বা খানিকটা। কিছু পরিমাণ ব্যবহার ভুল। কতক মানুষ আছে শুধু শুধু কথা প্যাঁচায়। আর কত দূর যেতে হবে? বহু দূর যেতে হবে। কত/বহু মানুষ অকারণে মারা যাচ্ছে।

কনিষ্ঠ/সর্বকনিষ্ঠ

কনিষ্ঠ অর্থ সবার ছোট আর সর্বকনিষ্ঠ অর্থ বয়সে সবচেয়ে ছোট। অশুদ্ধ : ছেলেটি তার সর্বকনিষ্ঠতম সন্তান। 

কিছু/কিছু পরিমাণ

কিছু/বিপুল/বহু/বেশি/অনেক-পরিমাণ/সংখ্যকজ্ঞাপক শব্দ তাই এদের পরে পরিমাণ ব্যবহার করা করা দরকার হয় না। কিছু পরিমাণ মাল তাকে দাও। কিছু সংখ্যক লোক এই ব্যাপারে সতর্ক। 

কারণ/হেতু

নানাবিধ প্রাকৃতিক কারণ হেতু (কারণে) এই অঞ্চলের জনবসতি অতি বিরল।

কারণ/জনিত

ভুল-ক্যান্সার জনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। শুদ্ধ-ক্যান্সারে তার মৃত্যু হয়েছে। ক্যান্সারের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। তার মৃত্যু কারণ ক্যান্সার। ক্যান্সারজনিত রোগে তার মৃত্যু হয়েছে।

গিয়ে/যেয়ে

‘গিয়ে’র স্থলে ‘যেয়ে’ ব্যবহার ভুল। অনেকে ‘যায়’ থেকে ‘যেয়ে’ ব্যবহার করেন যা ভুল। আমি বাসায় গিয়ে তোমাকে ফোন দেব।

তর/তম

বিশেষণের তুলনা দুয়ের মধ্যে উৎকর্ষ বা অপকর্ষ বুঝাতে ‘তর’ আর বহুর মধ্যে উৎকর্ষ বা অপকর্ষ বুঝাতে ‘তম’ বসে। এরা বিশেষ্যবাচক শব্দে বসে না। যেমন: বৃহৎ-বৃহত্তর/বৃহত্তম, দীর্ঘ-দীর্ঘতর/দীর্ঘতম। কিন্তু সংস্কৃত শব্দে ‘য়ান/ষ্ঠ’ বসলে ‘তর/তম’ বসে না। যেমন : শ্রেষ্ঠতর/শ্রেষ্ঠতম।

নিচ/নীচ

ইংরেজি আন্ডার বা বিলো অর্থে ‘নিচ’ ব্যবহার করা হয়। নিম্নশ্রেণি/জাত, খারাপ, হীন, ইতর, নিকৃষ্ট অর্থে ‘নীচ’ ব্যবহার করা হয়।

প্রচার/সম্প্রচার

প্রচার অল্প পরিসরে ঘোষণা বা বিজ্ঞপ্তি সম্প্রচার ব্যাপক পরিসরে রেডি বা টিভিতে ঘোষণা বা বিজ্ঞপ্তি।

প্রমুখ/প্রভৃতি/ইত্যাদি

বহু ব্যক্তি উলে¬খ করলে ‘প্রমুখ’ হয়। বহু বস্তু/বিষয়  উল্লেখ করলে ‘প্রভৃতি/ ইত্যাদি’ ব্যবহার করা হয়। যেমন : আম, জাম, কাঁঠাল ইত্যাদি/প্রভৃতি ফল শরীরের জন্য উপকারী। সুকুমার রায়, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকুমার বড়ুয়া প্রমুখ বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত ছড়াকার।   

ফলে/বলে/সত্ত্বেও

‘ফলে’ অর্থ সমাধানে-অসুস্থার ফলে তার রেজাল্ট খারাপ হয়েছে। ‘বলে’ অর্থ সেজন্য/সে কারণে/সেহেতু-তুমি আসনি বলে আমি চলে গিয়েছি। ‘সত্ত্বেও’ অর্থ কোনো কিছু হলেও বা ঘটলেও। কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও সে কাজটি করেছে।

ফলশ্রুতি/ফলশ্রুতিতে/ফলে

ফলশ্রুতি অর্থ পুণ্যকাহিনি শ্রবণে যে ফল পাওয়া যায়। কিন্তু ‘ফলে’ প্রকাশ করতে ‘ফলশ্রুতিতে’ ব্যবহার ভুল।

ফলাফল /গুণাগুণ

ফল আর অফল নিয়ে ফলাফল। গুণ ও অগুণ নিয়ে গুণাগুণ। তাই সচেতনভাবে লেখা দরকার। কোথায় গুণ আর অগুণ রয়েছে তা খেয়াল করে লেখা দরকার। দুটি গুণাগুণ বুঝিয়ে দাও-দুটি গুণ বুঝিয়ে দাও। স্যার শিক্ষার্থীদের ফলাফল দিয়ে দেন। হাসান পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করেছে-হাসান পরীক্ষায় ভালো ফল করেছে।

বন্দি/বন্দী/বন্ধী

বন্দি অর্থ কয়েদি বা আটক। বন্দী অর্থ যিনি বন্দনা করেন। বন্ধ অর্থ বাধা /রোধ/ সংযোগ/অবকাশ/ছুটি/স্থগিত। এর সাথে ইন+প্রত্যয় যুক্ত হলে বন্ধী হয়। কিন্তু এটি কোনো সময় শব্দের আগে না বসে পরে বসে। যেমন : প্রতিবন্ধী।

বাধা/বাঁধা

বাধা অর্থ রুদ্ধ, প্রতিবন্ধকতা, অন্তরায়, বিঘœ, নিষেধ, অমান্য আর বাঁধা অর্থ বাঁধ, বন্ধন, বাঁধন, গিট দেয়া, বন্দি করা। যেমন : সকল বাধা পেরিয়ে আজ তারা চিরসম্পর্কে বাঁধা পড়ে গেল।

ভূগোল/ভুবন

ভূ+গোল অর্থ পৃথিবী গোল। আর ‘ভুবন’ অর্থ পৃথিবী। তাই ‘ভূ’ আর ‘ভু’ এক নয়।

ভারি/ভারী

ভারি অর্থ খুব আর ভারী অর্থ ওজন/ভার।

ভাবে/ভাবে

ভাব-জন্ম, সত্তা, ভক্তি, অভিপ্রায়, মনের অবস্থা, মর্ম, ধরন, প্রেম ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়। ভাব-এর সাথে এ-বিভক্তি/প্রত্যয় যোগে পদ হয়। আর ‘ভাবে’ শব্দের পরের যুক্ত হয়ে অর্থ প্রকাশ করে। যেমন : ভাবের মধ্যে কোনো জড়তা না রেখে খোলাখুলিভাবে ভাব প্রকাশ করো।  

মুখ্য/মুর্খ

মুখ্য হলো প্রধান আর মুর্খ হলো নির্বোধ।

মুখপত্র/মুখপাত্র

মুখপত্রটি (কাগজ) প্রকাশ হওয়ার পর জানতে পারলাম তিনি বাংলাদেশের মুখপাত্র (ব্যক্তিপ্রধান) হিসেবে সেখানে ভাষণ দেবেন।

যা-তা, যত-তত

জটিল বাক্যে কর্তার পরে জটিলচিহ্ন (যা-তা, যত-তত) বসে। যেমন: যে যত পড়ালেখা করে সে তত ভালো রেজাল্ট করে না।

রুপা/রূপ

রৌপপ্য থেকে রুপা বাংলা লেখা হয়। রূপ থেকে না তবে ভুল করে লেখা হয়-রূপা, রূপো, রূপালি/লী।

লক্ষ/লক্ষ্য

লক্ষ-সংখ্যা, লক্ষ-দেখা/অবলোকন (পরে ক্রিয়া থাকবে),লক্ষ্য-উদ্দেশ্য।

সমূহ/সমূহ

সমূহ বহুত্ব সংখ্যাবচক শব্দ যা বিশেষ্যের আগে বসলে আলাদা আর পরে বসলে একসাথে বসে। তার থেকে ভালো কাজ পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তার কাজসমূহ দেখে মনে হচ্ছে সে জিনিয়াস। 

সঙ্গে/সাথে

দুটিই সংস্কৃত সহিত শব্দ থেকে উৎপত্তি হয়েছে। তবে পাঠ্যবইতে ‘সঙ্গে’ ব্যবহার করা হয়েছে।

সপক্ষে/স্বপক্ষে

সপক্ষে : নিজের পক্ষ সমর্থনকারী। পক্ষ অবলম্বনকারী। যেমন : তিনি সবসময় তার সপক্ষে। তার সপক্ষে। স্বপক্ষে : আত্মপক্ষ, স্বদল, নেজর দল, বন্ধুপক্ষ।

সাক্ষর/স্বাক্ষর

সাক্ষর (স+অক্ষর) : ‘স’ অর্থ সহ/সহিত (সস্ত্রী), সমান (সজাতি), সত্তা/সম্ভাবনা/বিদ্যমান (সজীব), অত্যন্ত (সঘন), স্বার্থে (সঠিক, সক্ষম), সক্ষম, অক্ষরযুক্ত, অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন, অল্পশিক্ষিত, শিক্ষাপ্রাপ্ত, শিক্ষিত। অবদান-তিনি বাংলা সাহিত্যে সাক্ষর রেখেছেন। সাক্ষরতা জ্ঞান অর্জন করা দরকার-বাক্যটি ভুল ব্যবহার।

স্বাক্ষর (স্ব+অক্ষর) : ‘স্ব’ অর্থ আত্ম, সয়ং, নিজ, স্ব স্ব। আত্মীয় (স্বজন), নিজের (স্বগৃহ), নিজের সবকিছু (সর্বস্ব), নামসই, দস্তক্ষত। তিনি খাতায় স্বাক্ষর দিয়েছেন।

সপক্ষ/স্বপক্ষ

নিজ পক্ষ সমর্থনকারী, পক্ষালম্বী। যেমন : তিনি সবসময় তার সপক্ষে। সপক্ষপাখি (ডানাআলা পাখি)। স্বপক্ষ অর্থ আত্মপক্ষ, স্বদল, নিজের দল। মিত্রপক্ষ, বন্ধুপক্ষ।

সর্বপরি (মোট) /সর্বোপরি (সকলের ওপরে, সর্বোচ্চ, অধিকন্তু)

সর্বপরি দশ টাকা দাও। সর্বোপরি ব্যাপারটা ভালো না। 

সন/সাল

বাংলা লিখতে সন আর ইংরেজি লিখতে সাল লেখা হয়। যেমন  তিনি ১৪১২ সনে জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি ১৯৭০ সালে জন্মগ্রহণ করেছেন।

সুদ্ধ/শুদ্ধ

সুদ্ধ হলো সকল বা সব আর শুদ্ধ হলো ভালো বা মঙ্গল।

স্বাগত/সুস্বাগত

সুন্দরের সাথে আগতই স্বাগত। তাই সুস্বাগত (সু+সু+আগত) লেখা ঠিক নয়।

সনদ/সনদপত্র

সনদ নিজেই পত্র তাই আবার পত্র লেখার দরকার হয় না।

সাতপাঁচ/সাতসকাল

‘সাত’ সংখ্যা হলেও সংখ্যার অতিরিক্ত অর্থ প্রকাশ করে বলে এটি বাগধারা হয়। যেমন: সাতসকালে (খুব সকাল) উঠেই সে সাতপাঁচ (অন্য কোনো কিছু) না ভেবে দৌড়াতে থাকে।  

স্ব আর স

সহ অর্থ বুঝালে ‘স্ব’ না বসে ‘স’ বসে। ভাইসহ/সভাই। স্বজাতি হলো নিজের জাতি আর সজাতি হলো জাতিসহ।

স্বচ্ছ/সচ্ছল

স্বচ্ছ (পরিষ্কার/টলটলে) আর সচ্ছল (সঙ্গতিপূর্ণ) এক অর্থে ব্যবহৃত হয় না তাই এ দুটি ব্যবহারে সতর্ক হওয়া দরকার। মাছ স্বচ্ছ পানিতেই সচ্ছল জীবনযাপন করে।

সময়জ্ঞাপক শব্দ (পরবর্তীতে/আগামীতে/ইদানীংকাল)

সময় বোঝাতে বাংলায় কিছু সময়জ্ঞাপক শব্দ ব্যবহার করা হয়। এগুলো কখনও বিভক্তির সাথে যুক্ত হয়ে একা বসে আবার কখন অন্য সময় যুক্ত হয়ে বসে। তবে কিছু সময়জ্ঞাপক শব্দ আছে যাদের সাথে ‘তে’ যুক্ত করে ব্যবহার করা হয় যা ঠিক নয়। যেমন : পরবর্তীতে, আগামীতে। কিছু শব্দ সরাসরি সময় প্রকাশ করে। যেমন : সকালে, বিকালে, সন্ধ্যায়, দিনে, রাতে। এদের সাথে আবার ‘বেলা’ও যোগ করা যায়। যেমন : সকালবেলা। পূর্বাহ্ণ অর্থ প্রভাত বা সকাল, অপরাহ্ণ বা পরাহ্ণ অর্থ বিকাল অর্থাৎ দুপুর থেকে সূর্য ডুবার আগপর্যন্ত, মধ্যাহ্ন থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। পরবর্তী অর্থ পরে অবস্থীত। তাই এর সাথে ‘তে’ যুক্ত হয়ে ঠিক সময় প্রকাশ পায় না। তাই পরবর্তীতে শব্দটি ভুল। পরবর্তী সময়/দিন/কাল/বছর বোঝাতে পরবর্তীতে ব্যবহার করা ঠিক নয়।

গত/বিগত : শেষ হয়েছে এমন বা অতীত (গতকাল), প্রাপ্ত (পুঁথিগত), নিহিত (বংশগত), অনুমত (প্রথাগত)। উপসর্গ ‘বি’ যোগে কালশব্দ যেমন কাল/বছর/দিন বসে না। যেমন : গতকাল, বিগতপ্রাণ। গত বছর তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। বিগত বছরগুলো ছিল আমার জন্য আশীর্বাদ। গত/বিগত চার বছর পূর্বে তিনি মৃত্যুবরণ করেন-এই বাক্যে গত/বিগত লেখার প্রয়োজন নাই।

‘ইদানীংকাল/সম্প্রতিকাল’ শব্দটি অনেকেই ব্যবহার করে থাকেন যা ঠিক নয়। ইদানীং শব্দের সাথে অন্যকোনো সময়জ্ঞাপক শব্দ বসে না। ইদানীং অর্থ আজকাল বা সম্প্রতি।

সম্প্রতি/অতিসম্প্রতি : সম্প্রতি অর্থ অধুনা, ইদানীং, এইমাত্র, সবে, সবেমাত্র, আজকাল। সম্প্রতি নিজেই ‘অতিমাত্র’ সেখানে ‘অতিসম্প্রতি’ ব্যবহরার অশুদ্ধ।

সমসময়/সমসাময়িক : সমসময় অর্থ ‘একই সময় বা কাল’ যা বিশেষ্য। এর সাথে ইক-প্রত্যয় যুক্ত করে বিশেষণ ‘একই সময়ের বা কলের’ করা হয়। তাই দুটিই শুদ্ধ। তবে সমসাময়িক সময়ের বা সমসাময়িক কালের ব্যবহার অশুদ্ধ।

হচ্ছে/হলো

হচ্ছে আর হলো ব্যবহারে সতর্ক হওয়া দরকার। হচ্ছে কথ্য ব্যবহার। আবার ঘটমান বর্তমান কাল বোঝায়। আর হলো হয়েছিল বোঝায়। আবার অর্থ অর্থে বোঝায়। শুধু তাই না বানানের ক্ষেত্রেও এর বহু ব্যবহার লক্ষ করা যায়। যেমন : হল-হলন্ত, হল-লাঙল, হল-কামরা/কক্ষ, হল-দ্রবীকরণ, হলহল-ঢলঢলে।  

জল হলো পানির প্রতিশব্দ।

হিসাব/হিসেব

হিসাব গণণা করণ আর হিসেব গণণা বাদে অন্য বিষয় বোঝাতে হিসেব ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন : কত টাকা খরচ হয়েছে হিসাব দাও। সে বেহিসাবি। স্বাধীনতা কত দামি তার হিসেব নাই। মায়েল ভালোবাসা হিসেব করা যাবে না।

হতে/থেকে

সংস্কৃত হইতে থেকে উৎপত্তি হয়েছে হতে। যদি ‘থেকে, অবধি, ফলে’ অর্থ প্রকাশ করে তাহলে হতে বা থেকে দুটির একটি ব্যবহার করা যায়। কিন্তু চেয়ে (তুলনা), সময় (মাঝে মাঝে, সময়ে সময়ে, পর পর)-অর্থে ব্যবহার করতে শুধু ‘থেকে’ ব্যভহার করতে হবে। যেমন : বাড়ি হতে যে ছেলিটি বের হয়েছে সে সবার থেকে ছোট।

পদ

দুঃসাহসী অভিযাত্রীরা মানুষের চিরন্তন কল্পনার রাজ্য চাঁদের দেশে পৌঁছেছেন এবং মঙ্গলগ্রহেও যাওয়ার জন্য তাঁরা প্রস্তুত হচ্ছেন। উপরের বাক্যটিতে ‘রা’ (অভিযাত্রী+রা), ‘এর’ (মানুষ+এর), ‘র’ (কল্পনা+র), ‘এ’ (মঙ্গলগ্রহ+এ) প্রভৃতি চিহ্নগুলো বিভক্তি বলা হয়। বাক্যে ব্যবহৃত প্রত্যেকটি শব্দই এক একটি পদ। আলোচ্য বাক্যটিতে রয়েছে-

১. বিশেষ্য পদ : অভিযাত্রী, মানুষ, কল্পনা, রাজা, দেশ, মঙ্গলগ্রহ

২. সর্বনাম পদ : তাঁরা

৩. বিশেষণ পদ: দুঃসাহসী, চিরন্তন, প্রস্তুত

৪. ক্রিয়া পদ : পৌঁছেছেন, হচ্ছেন, যাওয়ার (অসমাপিকা ক্রিয়া)

৫. অব্যয় পদ : এবং, জন্য

পদ প্রকরণ

পদ প্রধানত দুই প্রকার। যেমন : সব্যয় পদ ও অব্যয় পদ

সব্যয় পদ চার প্রকার। যেমন : ১. বিশেষ্য  ২. সর্বনাম   ৩. বিশেষণ   ৪. ক্রিয়া

পদ মোট পাঁচ প্রকার। যেমন :  ১. বিশেষ্য ২. সর্বনাম   ৩. বিশেষণ   ৪. ক্রিয়া ৫. অব্যয়

বিশেষ্য পদের সংজ্ঞা ও প্রকরণ

কোনো কিছুর নামকে বিশেষ্য পদ বলে। বাক্যের মধ্যে ব্যবহৃত যে সমস্ত পদ দ্বারা কোনো ব্যক্তি, জাতি, সমষ্টি, বস্তু, স্থান, কাল, বার, কর্ম বা গুণের নাম বোঝানো হয় তাদের বিশেষ্য পদ বলে।

বিশেষ্য পদ ছয় প্রকার। যেমন : ১. নামবাচক বা সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্য ২. জাতিবাচক বিশেষ্য

৩. বস্তুবাচক বা দ্রব্যবাচক বিশেষ্য   ৪. সমষ্টিবাচক বিশেষ্য  ৫. ভাববাচক বিশেষ্য 

৬. গুণবাচক বিশেষ্য

নামবাচক বা সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্য

যে পদ দ্বারা কোনো ব্যক্তি, ভৌগোলিক স্থান, গ্রন্থ ইত্যাদির নাম বা সংজ্ঞা প্রকাশ পায় তাকে নামবাচক বা সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্য বলে। যেমন :

ক) ব্যক্তির নাম: নজরুল, ওমর, আনিস, মাইকেল

খ) ভৌগোলিক স্থানের : ঢাকা, দিল্লি, লন্ডন, মক্কা

গ) ভৌগোলিক সংজ্ঞা : (নদী, পর্বত, সমুদ্র ইত্যাদি)-মেঘনা, হিমায়ল, আরব সাগর

ঘ) গ্রন্থের নাম : গীতাঞ্জলি, অগ্নিবীণা, দেশে-বিদেশে, বিশ্বনবি

জাতিবাচক বিশেষ্য

যে পদ দ্বারা কোনো একজাতীয় প্রাণী বা পদার্থের সাধারণ নাম বোঝায় তাকে জাতিবাচক বিশেষ্য বলে। যেমন : মানুষ, গরু, পাখি, গাছ, পর্বত, নদী, ইংরেজ।

বস্তুবাচক বা দ্রব্যবাচক বিশেষ্য

যে পদে কোনো উপাদানবাচক পদার্থের নাম বোঝায় তাকে বস্তুবাচক বা দ্রব্যবাচক বিশেষ্য বলে। এই জাতীয় বস্তুর সংখ্যা ও পরিমাণ নির্ণয় করা যায়। যেমন : বই, খাতা, কলম, থালা, বাটি, মাটি, চাল, চিনি, লবণ, পানি।

সমষ্টিবাচক বিশেষ্য

যে পদে বেশকিছু সংখ্যক ব্যক্তি বা প্রাণীর সমষ্টি বোঝায় তাই সমষ্টিবাচক বিশেষ্য যেমন : সভা, জনতা, সমিতি, পঞ্চায়েত, মাহফিল, ঝাঁক, বহর, দল।

ভাববাচক বিশেষ্য

যে বিশেষ্য পদে কোনো ক্রিয়ার ভাব বা কাজের ভাব প্রকাশিত হয় তাকে ভাববাচক বিশেষ্য বলে। যেমন : গমন (যাওয়ার ভাব বা কাজ), দর্শন (দেখার কাজ), ভোজন (খাওয়ার কাজ), শয়ন (শোয়ার কাজ), দেখা, শোনা।

গুণবাচক বিশেষ্য

যে বিশেষ্য দ্বারা কোনো বস্তুর দোষ বা গুণের নাম বোঝায় তাই গুণবাচক বিশেষ্য। যেমন :

মধুর মিষ্টত্বের গুণ-মধুরতা    তরল দ্রব্যের গুণ-তারল্য   তিক্ত দ্রব্যের দোষ বা গুণ-তিক্ততা    তরুণের গুণ-তারুণ্য

এরূপ : সৌরভ, স্বাস্থ্য, যৌবন, সুখ, দুঃখ।

সর্বনাম পদের সংজ্ঞা ও প্রকরণ

বিশেষ্যের পরিবর্তে যে পদ ব্যবহৃত হয় তাকে সর্বনাম পদ বলে। সর্বনাম সাধারণত ইতোপূর্বে ব্যবহৃত বিশেষ্যের প্রতিনিধি স্থানীয় শব্দ। যেমন : হস্তী প্রাণিজগতের সর্ববৃহৎ প্রাণী। তার শরীরটি যেন বিরাট এক মাংসের স্তুপ। দ্বিতীয় বাক্যে ‘তার’ শব্দটি প্রথম বাক্যের ‘হস্তী’ বিশেষ্য পদটির প্রতিনিধি স্থানীয় শব্দরূপে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই, ‘তার’ শব্দটি সর্বনাম পদ। বিশেষ্য পদ অনুক্ত থাকলেও ক্ষেত্রবিশেষে বিশেষ্য পদের পরিবর্তে সর্বনাম পদ ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন :

ক) যারা দেশের ডাকে সাড়া দিতে পারে তারাই তো সত্যিকারের দেশপ্রেমিক।

খ) ধান ভানতে যারা শিবের গীত গায় তারা স্থির লক্ষে পৌঁছেতে পারে না।

বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত সর্বনামকে ১০ ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন :

১. ব্যক্তিবাচক বা পুরুষবাচক : আমি, আমরা, তুমি, তোমরা, সে, তারা, তাহারা, তিনি, তাঁরা, এ, এরা, ও, ওরা

২. আত্মবাচক : স্বয়ং, নিজে, খোদ, আপনি

৩. সামীপ্যবাচক: এ, এই, এরা, ইহারা, ইনি

৪. দূরত্ববাচক : ঐ, ঐসব ইত্যাদি

৫. সাকুল্যবাচক : সব, সকল, সমুদয়, তাবৎ

৬. প্রশ্নবাচক : কে, কি, কী, কোন, কাহার, কার, কিসে

৭. অনির্দিষ্টতাজ্ঞাপক : কোন, কেহ, কেউ, কিছু

৮. ব্যতিহারিক : আপনা আপনি, নিজে নিজে, আপসে, পরস্পর

৯. সংযোগজ্ঞাপক : যে, যিনি, যাঁরা, যারা, যাহারা

১০. অন্যাদিবাচক : অন্য, অপর, পর

সর্বনামের পুরুষের সংজ্ঞা ও প্রকরণ

‘পুরুষ’ একটি পারিভাষিক শব্দ। বিশেষ্য, সর্বনাম ও ক্রিয়ারই পুরুষ আছে। বিশেষণ ও অব্যয়ের পুরুষ নাই। যে কাজ করে অর্থাৎ কর্তাই পুরুষ।

ব্যাকরণে পুরুষ তিন প্রকার। যেমন :

১. উত্তম পুরুষ     : স্বয়ং বক্তাই উত্তম পুরুষ। আমি, আমরা, আমাকে, আমাদের ইত্যাদি সর্বনাম শব্দ উত্তম পুরুষ।

২. মধ্যম পুরুষ: প্রত্যক্ষভাবে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি বা শ্রোতাই মধ্যম পুরুষ। তুমি, তোমরা, তোমাকে, তোমাদের, তোমাদিগকে, আপনি, আপনারা, আপনার, আপনাদের প্রভৃতি সর্বনাম শব্দ মধ্যম পুরুষ।

৩. নাম পুরুষ : অনুপস্থিত অথবা পরোভাবে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি, বস্তু বা প্রাণীই নাম পুরুষ। সে, তারা, তাহারা, তাদের, তাহাকে, তিনি, তাঁকে, তাঁরা, তাঁদের প্রভৃতি নাম পুরুষ। সমস্ত বিশেষ্য শব্দই নাম পুরুষ।

ব্যক্তিবাচক সর্বনামের রূপ

১. সাধারণ রূপ

উত্তম পুরুষ   : আমি, আমরা, আমাকে, আমাদিগকে, আমার, আমাদের, কবিতায় : মোর, মোরা

মধ্যম পুরুষ : তুমি, তোমরা, তোমাকে, তোমাদিগকে, তোমার, তোমাদের

নাম পুরুষ   : সে, তারা, তাহারা, তাকে, তাহাকে

২. সম্ভ্রমাত্মক রূপ

মধ্যম পুরুষ  : আপনি, আপনারা, আপনাকে, আপনার, আপনাদের

নাম পুরুষ   : তিনি, তাঁরা, তাঁহারা, তাঁদের, তাঁহাদের, তাঁহাদিগকে, তাঁদেরকে, তাঁহাকে, তাঁকে, ইনি, এঁর, এঁরা, ইহাদের, এঁদের, ইহাকে এঁকে, উনি, ওঁর, ওঁরা, ওঁদের

৩. তুচ্ছার্থক বা ঘনিষ্ঠতাজ্ঞাপক রূপ

নাম পুরুষ   : ইহা, ইহারা, এই, এ, এরা, উহা, উহারা, ও, ওরা, ওদের

সর্বনামের বিভক্তিগ্রাহী রূপ

বাংলা সর্বনামসমূহ কর্তৃকারক ভিন্ন অন্যান্য কারকে বিভক্তিযুক্ত হওয়ার পূর্বে একটি বিশেষ রূপ পরিগ্রহ করে। সর্বনামের এ রূপটিকে বিভক্তিগ্রাহী রূপ বলা হয়। কর্তৃকারকে সর্বনামের মূল রূপটিই ব্যবহৃত হয় এবং একে প্রথমা বিভক্তিযুক্ত একবচন ধরা হয়। যেমন :

কর্তৃকারকে প্রথমার একবচন   অন্যান্য কারকে বিভক্তিগ্রাহী রূপ

সাধারণ      সম্ভ্রমাত্মক    তুচ্ছার্থক     সম্ভ্রমাত্মক    তুচ্ছার্থক

আমি               

তুমি       আপনি      তুই        আপনা      তোমা, তো

সে        তিনি                 তাঁহা, তাঁ    তাহা, তা

যে        যিনি                 যাঁহা, যাঁ    যাহা, যা

          ইনি        এ         ইহা, এ      ইহা, এ

          উনি       উহা        ওঁ        ও

কে, কি, কী            কে, কি, কী           কা

সর্বনামের বিশিষ্ট প্রয়োগ

১. বিনয় প্রকাশ: বিনয় প্রকাশে উত্তম পুরুষের একবচনে দীন, অধম, বান্দা, সেবক, দাস প্রভৃতি শব্দ ব্যবহৃত হয়। যেমন : ‘আজ্ঞা কর দাসে, শাস্তি নরাধমে’। ‘দীনের আরজ’।

২. ছন্দবদ্ধ কবিতা : ছন্দবদ্ধ কবিতায় সাধারণত ‘আমার’ স্থানে মম, ‘আমাদের’ স্থানে ‘মোদের’ এবং ‘আমরা’ স্থানে ‘মোরা’ ব্যবহৃত হয়। যেমন : কে বুঝিবে ব্যথা মম। মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি। বাংলা ভাষা’। ক্ষুদ্র শিশু মোরা, করি তোমারি বন্দনা।

৩. উপাস্যের প্রতি ভক্তি : উপাস্যের প্রতি সাধারণত ‘আপনি’ স্থানে ‘তুমি’ প্রযুক্ত হয়। যেমন : (উপাস্যের প্রতি ভক্ত) প্রভু, তুমি রক্ষা কর এ দীন সেবকে।

৪. অভিনন্দনপত্র: অভিনন্দনপত্র রচনায়ও অনেক সময় সম্মানিত ব্যক্তিকে ‘তুমি’ সম্বোধন করা হয়।

তুমি : ঘনিষ্ঠজন, আপনজন বা সমবয়স্ক সাথীদের প্রতি ব্যবহার্য।

তুই : তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত হয় এবং ঘনিষ্ঠতা বোঝাতেও আমরা তাই ব্যবহার করি।

সর্বনামে বিশেষ দ্রষ্টব্য/জ্ঞাতব্য

১. চলিত ভাষা : চলিত ভাষায় যেসব স্থানে সর্বনাম বসে সেসব হলো:

ক) তুচ্চার্থে : তাহা স্থানে তা, যাহা স্থানে যা, কাহা স্থানে কা, ইহা স্থানে এ, উহা স্থানে ও

খ) সম্ভ্রমার্থে (এগুলোর সাথে একটি চন্দ্রবিন্দু সংযোজিত হয়) :

  তাহা+দের=তাহাদের(সাধু)>তাদের(চলিত),(সম্ভ্রমার্থে)তাঁহা+দের=তাঁহাদের(সাধু)>তাঁদের(চলিত)

২. করণ কারক : করণ কারকে অনুসর্গ ব্যবহারের পূর্বে মূল সর্বনাম শব্দের সঙ্গে র, এর বা কে বিভক্তি যোগ করে নিতে হয়। যেমন : তাহাকে দিয়া, তাকে দিয়ে, তাহার দ্বারা, তার দ্বারা           আমাকে দিয়ে

৩. ষষ্ঠী বিভক্তি : ষষ্ঠী বিভক্তি অর্থে ঈয়-প্রত্যয়যুক্ত সর্বনামজাত বিশেষণ শুধু তৎসম সর্বনামের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। যেমন: মৎ+ঈয় =  মদীয়, ভবৎ+ঈয় =  ভবদীয়, তৎ+ঈয় = তদীয়

৪. ষষ্ঠী বিভক্তি : ‘কী’ সর্বনামটি কোনো কোনো কারকে ‘কিসে’ বা ‘কিসের’ (ষষ্ঠী বিভক্তিযুক্ত) রূপ গ্রহণ করে। যেমন: কী+দ্বারা = কিসের দ্বারা, কী+থেকে = কিসে থেকে কিসের থেকে

বিশেষণ পদের সংজ্ঞা

যে পদ বিশেষ্য, সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের দোষ, গুণ, অবস্থা, সংখ্যা, পরিমাণ ইত্যাদি প্রকাশ করে তাকে বিশেষণ পদ বলে। যমন : চলন্ত গাড়ি : বিশেষ্যের বিশেষণ। করূণাময় তুমি : সর্বনামের বিশেষণ। দ্রুত চল : ক্রিয়া বিশেষণ

বিশেষণ পদের প্রকরণ

বিশেষণ দুই ভাগে বিভক্ত। যেমন :

১. নাম বিশেষণ: যে বিশেষণ পদ কোনো বিশেষ্য বা সর্বনাম পদকে বিশেষিত করে তাকে নাম বিশেষণ বলে।

২. ভাববিশেষণ : যে পদ বিশেষ্য ও সর্বনাম ভিন্ন অন্য পদকে  বিশেষিত করে তাই ভাব বিশেষণ।

নাম বিশেষণ

যে বিশেষণ পদ কোনো বিশেষ্য বা সর্বনাম পদকে বিশেষিত করে তাকে নাম বিশেষণ বলে। যেমন:

বিশেষ্যের বিশেষণ    : সুস্থ সবল দেহকে কে না ভালোবাসে?

সর্বনামের বিশেষণ    : সে রূপবান ও গুণবান।

নাম বিশেষণকে কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন :

ক) রূপবাচক      : নীল আকাশ, সবুজ মাঠ, কালো মেঘ

খ) গুণবাচক      : চৌকস লোক, দক্ষ কারিগর, ঠান্ডা হাওয়া

গ) অবস্থাবাচক     : তাজা মাছ, রোগা ছেলে, খোঁড়া পা

ঘ) সংখ্যাবাচক : হাজার লোক, দশ দশা, শ টাকা

ঙ) ক্রমবাচক      : দশম শ্রেণি, সত্তর পৃষ্ঠা, প্রথমা  কন্যা

চ) পরিমাণবাচক    : বিঘাটেক জমি, পাঁচ শতাংশ ভুমি, হাজার টনী জাহাজ, এক কেজি চাল, দুকিলোমিটার রাস্তা

ছ) অংশবাচক      : অর্ধেক সম্পত্তি, ষোল আনা দখল, সিকি পথ

জ) উপাদানবাচক    : বেলে মাটি, মেটে কলসি, পাথুরে মুর্তি

ঝ) প্রশ্নবাচক      : কতদূর পথ? কেমন অবস্থা?

ঞ) নির্দিষ্টতাজ্ঞাপক  : এই লোক, সেই ছেলে, ছাব্বিশে মার্চ

ভাববিশেষণ

যে পদ বিশেষ্য ও সর্বনাম ভিন্ন অন্য পদকে  বিশেষিত করে তাই ভাব বিশেষণ। ভাব বিশেষণ চার প্রকার। যেমন :

১. ক্রিয়া বিশেষণ : যে  পদ ক্রিয়া সংঘটনের ভাব, কাল বা রূপ নির্দেশ করে তাকে ক্রিয়া বিশেষণ বলে। যেমন :

ক) ক্রিয়া সংগঠনের ভাব : ধীরে ধীরে বায়ু বয়।      

খ) ক্রিয়া সংগঠনের কাল : পরে একবার এসো।

২. বিশেষণীয় বিশেষণ : যে পদ নাম বিশেষণ অথবা ক্রিয়া বিশেষণকে বিশেষিত করে তাকে বিশেষণীয় বিশেষণ বলে। যেমন :

ক) নাম বিশেষণের বিশেষণ : সামান্য একটু দুধ দাও। এ ব্যাপারে সে অতিশয় দুঃখিত।

খ) ক্রিয়া বিশেষণের বিশেষণ : রকেট অতি দ্রুত চলে।

৩. অব্যয়ের বিশেষণ : যে ভাব বিশেষণ অব্যয় পদ অথবা অব্যয় পদের অর্থকে বিশেষিত করে তাকে অব্যয়ের বিশেষণ বলে। যেমন : ধিক্ তারে, শত ধিক্ নির্লজ্জ যে জন।

৪. বাক্যের বিশেষণ : কখনো কখনো কোনো বিশেষণ পদ একটি সম্পূূর্ণ বাক্যকে শেষিত করতে পারে তখন তাকে বাক্যের বিশেষণ বলা হয়। যেমন: দুর্ভাগ্যক্রমে দেশ আবার নানা সমস্যাজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বাস্তবিকই আজ আমাদের কঠিন পরিশ্রমের প্রয়োজন।

বিভিন্নভাবে বিশেষণ গঠন করা যায়। যেমন :

ক) ক্রিয়াজাত : হারানো সম্পত্তি, খাবার পানি, অনাগত দিন

খ) অব্যয়জাত : আচ্ছা মানুষ, উপরি পাওনা, হঠাৎ বড়লোক

গ) সর্বনাম জাত : কবেকার কথা, কোথাকার কে, স্বীয় সম্পত্তি

ঘ) সমাসসিদ্ধ : বেকার, নিয়ম-বিরুদ্ধ, জ্ঞানহারা চৌচালা ঘর

ঙ) বীপ্সামূলক : হাসিহাসি মুখ, কাঁদকাঁদ চেহারা, ডুবুডুবু নৌকা

চ) অনুকার অব্যয়জাত: কনকনে শীত, শনশনে হাওয়া, ধিকিধিকি আগুন, টসটসে ফল, তকতকে মেঝে

ছ) কৃদন্ত : কৃতী সন্তান, জানাশোনা লোক, পায়েচলা পথ, হৃত সম্পত্তি, অতীত কাল

জ) তদ্ধিতান্ত : জাতীয় সম্পদ, নৈতিক বল, মেঠো পথ

ঝ) উপসর্গযুক্ত : নিখুঁত কাজ, অপহৃত সম্পদ, নির্জলা মিথ্যে

ঞ) বিদেশি : নাস্তানাবুদ অবস্থা, লাওয়ারিশ মাল, লাখেরাজ সম্পত্তি, দরপত্তনি তালুক

বিশেষণের অতিশায়নের সংজ্ঞা ও প্রকরণ

বিশেষণ পদ যখন দুই বা ততোধিক বিশেষ্য পদের মধ্যে গুণ, অবস্থা, পরিমাণ প্রভৃতি বিষয়ে তুলনায় একের উৎকর্ষ বা অপকর্ষ বুঝিয়ে থাকে তখন তাকে বিশেষণের অতিশায়ন বলে। যেমন: যমুনা একটি দীর্ঘ নদী, পদ্মা দীর্ঘতর কিন্তু মেঘনা বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী। সূর্য, পৃথিবী ও চন্দ্রের মধ্যে তুলনায় সূর্য বৃহত্তম, পৃথিবী চন্দ্রের চেয়ে বৃহত্তর এবং চন্দ্র পৃথিবী অপেক্ষা ক্ষুদ্রতর।

বিশেষণের অতিশায়ন দুই প্রকার। যেমন : বাংলা শব্দের অতিশায়ন ও তৎসম শব্দের অতিশায়ন

বাংলা শব্দের অতিশায়ন

১. দুয়ের মধ্যে অতিশায়নে

বাংলা শব্দের অতিশায়নে দুয়ের মধ্যে চাইতে, চেয়ে, হইতে, হতে, অপেক্ষা, থেকে ইত্যাদি শব্দ ব্যবহৃত হয়। এসব ক্ষেত্রে দুয়ের মধ্যে তারতম্য বোঝাতে প্রথম বিশেষ্যটি প্রায়ই ষষ্ঠী বিভক্তিযুক্ত হয়ে থাকে এবং মূল বিশেষণের পর কোনো পরিবর্তন সাধিত হয় না। যেমন : গরুর থেকে ঘোড়ার দাম বেশি। বাঘের চেয়ে সিংহ বলবান।

২. বহুর মধ্যে অতিশায়ন

অনেকের মধ্যে একের উৎকর্ষ বা অপকর্ষ বোঝাতে মূল বিশেষণের কোনো পরিবর্তন হয় না। মূল বিশেষণের পূর্বে সবচাইতে, সবচেয়ে, সব থেকে, সর্বাপেক্ষা, সর্বাধিক প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার হয়। যেমন : নবম শ্রেণির ছাত্রদের মধ্যে করিম সবচেয়ে বুদ্ধিমান। ভাইদের মধ্যে বিমলই সবচাইতে বিচক্ষণ। পশুর মধ্যে সিংহ সর্বাপেক্ষা বলবান।

৩. দুটি বস্তুর মধ্যে অতিশায়ন

দুটি বস্তুর মধ্যে অতিশায়নে জোর দিতে হলে মূল বিশেষণের আগে অনেক, অধিক, বেশি, অল্প, কম, অধিকতর প্রভৃতি বিশেষণীয় বিশেষণ যোগ করতে হয়। যেমন : পদ্মফুল গোলাপের চাইতে অনেক সুন্দর। ঘিয়ের চেয়ে দুধ বেশি উপকারী। কমলার চাইতে পাতিলেবু অল্প ছোট।

৪. ষষ্ঠী বিভক্তিযুক্ত অতিশায়ন

কখনো কখনো ষষ্ঠী বিভক্তিযুক্ত শব্দে ষষ্ঠী বিভক্তিই চেয়ে, থেকে প্রভৃতি শব্দের কার্যসাধন করে। যেমন : এ মাটি সোনার বাড়া।

তৎসম শব্দের অতিশায়ন

১. দুয়ের মধ্যে অতিশায়ন

তৎসম শব্দের অতিশায়নে দুয়ের মধ্যে ‘তর’ এবং বহুর মধ্যে ‘তম’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে থাকে। যেমন: গুরু-গুরুতর-গুরুতম। দীর্ঘ-দীর্ঘতর-দীর্ঘতম। কিন্তু ‘তর’ প্রত্যয়যুক্ত বিশেষণটি শ্রুতিকটু হলে ‘তর’ প্রত্যয় যোগ না করে বিশেষণের পূর্বে ‘অধিকতর’ শব্দটি যোগ করতে হয়। যেমন : অশ্ব হস্তী অপেক্ষা অধিকতর সুশ্রী।

২. বহুর মধ্যে অতিশায়ন

বহুর মধ্যে অতিশায়নে তুলনীয় বস্তুর উল্লেখ না করেও ‘তম’ প্রত্যয় যুক্ত হতে পারে। যেমন : মেঘনা বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী। দেশসেবার মহত্তম ব্রতই সৈনিকের দীক্ষা।

৩. দুয়ের মধ্যে তুলনায় অতিশায়ন (ঈয়স-প্রত্যয় ও ইষ্ঠ-প্রত্যয়)

তৎসম শব্দের অতিশায়নে দুয়ের মধ্যে তুলনায় ঈয়স-প্রত্যয় এবং বহুর মধ্যে তুলনায় ইষ্ঠ-প্রত্যয় যুক্ত হয়। বাংলায় সাধারণত ঈয়স-প্রত্যয়ান্ত শব্দগুলো ব্যবহৃত হয় না। যেমন :

মূল   বিশেষণ                    দুয়ের তুলনায় বহুর তুলনায়

লগু   লঘিয়ান                                  লঘিষ্ঠ

অল্প   কনীয়ান (বাংলায় ব্যবহার নাই)    কনিষ্ঠ

বৃদ্ধ   জ্যায়ান                                   জ্যেষ্ঠ

শ্রেয়   শ্রেয়ান                                   শ্রেষ্ঠ

উদাহরণ : তিন ভাইয়ের মধ্যে রহিমই জ্যেষ্ঠ এবং করিম কনিষ্ঠ। সংখ্যাগুলোর লঘিষ্ঠ সাধারণ গুণিতক বের কর।

৪. ঈয়স-প্রত্যয়ান্ত শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ রূপ : ঈয়স-প্রত্যয়ান্ত কোনো কোনো শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ রূপ বাংলায় প্রচলিত আছে। যেমন : ভূয়সী প্রশংসা।

একই পদের বিশেষ্য ও বিশেষণ রূপে প্রয়োগ

বাংলা ভাষায় একই পদ বিশেষ্য ও বিশেষণ রূপে ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন :

১. ভালো

বিশেষণ রূপে- ভালো বাড়ি পাওয়া কঠিন।

বিশেষ্য রূপে- আপন ভালো সবাই চায়।

২. মন্দ

বিশেষণ রূপে- মন্দ কথা বলতে নাই।

বিশেষ্য রূপে- এখানে কী মন্দটা তুমি দেখলে?

৩. পুণ্য

বিশেষণ রূপে- তোমার এ পূণ্য প্রচো সফল হোক।

বিশেষ্য রূপে- পূণ্যে মতি হোক।

৪. নিশীথ

বিশেষণ রূপে- নিশীথ রাতে বাজছে বাঁশি।

বিশেষ্য রূপে- গভীর নিশীথে প্রকৃতি সুপ্ত।

৫. শীত

বিশেষণ রূপে- শীতকালে কুয়াশা পড়ে।

বিশেষ্য রূপে- শীতের সকালে চারদিক কুয়াশায় অন্ধকার।

৬. সত্য

বিশেষণ রূপে- সত্য পথে থেকে সত্য কথা বল।

বিশেষ্য রূপে- এ এক বিরাট সত্য।

অব্যয় পদের সংজ্ঞা ও প্রকরণ

ন ব্যয়=অব্যয়। যার ব্যয় বা পরিবর্তন হয় না অর্থাৎ যা অপরিবর্তনীয় শব্দ তাই অব্যয়। অব্যয় শব্দের সাথে কোনো বিভক্তিচিহ্ন যুক্ত হয় না, সেগুলোর একবচন বা বহুবচন হয় না এবং সেগুলোর স্ত্রী ও পুরুষবাচকতা নির্ণয় করা যায় না।

যে পদ সর্বদা অপরিবর্তনীয় থেকে কখনো বাক্যের শোভা বধরন করে, কখনো একাধিক পদের, বাক্যাংশের বা বাক্যের সংযোগ বা বিয়োগ সম্বন্ধ ঘটায় তাকে অব্যয় পদ বলে।

উৎস বা উৎপত্তি অনুসারে বাংলা ভাষায় তিন প্রকার অব্যয় শব্দ/পদ রয়েছে। যেমন :

১. বাংলা অব্যয় শব্দ : আর, আবার, ও, হ্যাঁ, না ইত্যাদি।

২. তৎসম অব্যয় শব্দ : যদি, যথা, সদা, সহসা, হঠাৎ, অর্থাৎ, দৈবাৎ, বরং, পুনশ্চ, আপাতত, বস্তুর ইত্যাদি। ‘এবং ও ‘সুতরাং’ তৎসম শব্দ হলেও বাংলায় এগুলোর অর্থ পরিবর্তিত হয়েছে। সংস্কৃতে ‘এবং’ শব্দের অর্থ এমন, আর ‘সুতরাং’ অর্থ অত্যন্ত, অবশ্য। কিন্তু=ও (বাংলা), সুতরাং = অতএব (বাংলা)

৩. বিদেশি অব্যয় শব্দ : আলবত, বহুত, খুব, শাবাণ, খাসা, মাইরি, মারহাবা ইত্যাদি।

ব্যবহার অনুসারে অব্যয় প্রধানত চার প্রকার। যেমন :

১. সমুচ্চয়ী অব্যয় (সংযোজক, বিয়োজক, সংকোচক)

২. অনন্বয়ী অব্যয়

৩. অনুসর্গ (বিভক্তিসূচক, বিভক্তিসম)

৪. অনুকার বা ধ্বন্যাত্মক অব্যয়

বিবিধ উপায়ে গঠিত অব্যয় শব্দ

১. একাধিক অব্যয় শব্দযোগে : কদাপি, নতুবা, অতএব, অথবা ইত্যাদি।

২. আনন্দ বা দুঃখ প্রকাশক একই শব্দের দুইবার প্রয়োগে : ছি ছি, ধিক্ ধিক্ বেশ ইত্যাদি।

৩. দুটি ভিন্ন শব্দযোগে : মোটকথা, হয়তো, যেহেতু, নইলে

৪. অনুকার শব্দযোগে : কুহু কুহু, গুন গুন ঘেউ ঘেউ, শন শন, ছল ছল, কন কন ইত্যাদি।

সমুচ্চয়ী অব্যয়

যে অব্যয় পদ একটি বাক্যের সঙ্গে অন্য একটি বাক্যের অথবা বাক্যস্থিত একটি পদের সঙ্গে অন্য একটি পদের সংযোজন, বিয়োজন বা সংকোচন ঘটায় তাকে সমুচ্চয়ী অব্যয় বা সম্বন্ধবাচক অব্যয় বলে।

ক) সংযোজক অব্যয়

১. উচ্চপদ ও সামাজিক মর্যাদা সকলেই চায়। এখানে ‘ও’ অব্যয়টি বাক্যস্থিত দুটি পদের সংযোজন করছে।

২. তিনি সৎ, তাই সকলেই তাঁকে শ্রদ্ধা করে। এখানে ‘তাই’ অব্যয়টি দুটি বাক্যের সংযোজন ঘটাচ্ছে। আর, অধিকন্তু, সুতরাং শব্দগুলোও সংযোজক অব্যয়।

খ) বিয়োজক অব্যয়

১. হাসেম কিংবা কাসেম এর জন্য দায়ী। এখানে ‘কিংবা’ অব্যয়টি দুটি পদের (হাসেম এবং কাসেমের) বিয়োগ সম্বন্ধ  ঘটাচ্ছে।

২. ‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন’। এখানে ‘কিংবা’ অব্যয়টি দুটি বাক্যাংশের বিয়োজক। আমরা চেষ্টা করেছি বটে কিন্তু কৃতকার্য হতে পারিনি। এখানে ‘কিন্তু’ অব্যয় দুটি বাক্যের বিয়োজক। বা, অথবা, নতুবা, না হয়, নয়তো শব্দগুলো বিয়োজক অব্যয়।

গ) সংকোচক অব্যয় : তিনি বিদ্বান অথচ সৎ ব্যক্তি নন। এখানে ‘অথচ’ অব্যয়টি দুটি বাক্যের মধ্যে ভাবের সংকোচ সাধন করেছে। কিন্তু, বরং শব্দগুলোও সংকোচক অব্যয়।

অনুগামী সমুচ্চয়ী অব্যয় : যে, যদি, যদিও, যেন প্রভৃতি কয়েকটি শব্দ সংযোজক অব্যয়ের কাজ করে থাকে। তাই তাদের অনুগামী সমুচ্চয়ী অব্যয় বলে। যেমন :

১. তিনি এত পরিশ্রম করেন যে তার স্বাস্থ্যভঙ্গ হওয়ার আশঙ্কা আছে।

২. আজ যদি (শর্তবাচক) পানি, একবার সেখানে যাব।

৩. এভাবে চেষ্টা করবে যেন কৃতকার্য হতে পার।  

অনন্বয়ী অব্যয়

যে সকল অব্যয় বাক্যের অন্য পদের সঙ্গে কোনো সম্বন্ধ না রেখে স্বাধীনভাবে নানাবিধ ভাব প্রকাশে ব্যবহৃত হয় তাদের অনন্বয়ী অব্যয় বলে। যেমন :

ক) উচ্ছ্বাস প্রকাশে: মরি মরি! কী সুন্দর প্রভাতের রূপ।

খ) স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতি জ্ঞাপনে : হ্যাঁ, আমি যাব। না, আমি যাব না।

গ) সম্মতি প্রকাশে: আমি আজ আলবত যাব। নিশ্চয়ই পারব।

ঘ) অনুমোদনবাচকতায়: আপনি যখন বলছেন, বেশ তো আমি যাব।

ঙ) সমর্থনসূচক জবাবে: আপনি যা জানেন তা তো ঠিকই বটে।

চ) যন্ত্রণা প্রকাশে: উঃ! পায়ে বড্ড লেগেছে। নাঃ! এ ক অসহ্য।

ছ) ঘৃণা বা বিরক্তি প্রকাশে: ছি ছি! তুমি এত নীচ। কী আপদ! লোকটা যে পিছু ছাড়ে না।

জ) সম্বোধনে  : ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।

ঝ) সম্ভাবনায় : সংশয়ে সংকল্প সদা টলে, পাছে লোকে কিছু বলে।

ঞ) বাক্যালংকার অব্যয়: কয়েকটি অব্যয় শব্দ নিরর্থকভাবে ব্যবহৃত হয়ে বাক্যের শোভাবধরন করে,

১. কত না হারানো স্মৃতি জাগে আজও মনে।

২. হায়রে ভাগ্য, হায়রে লজ্জা, কোথায় সভা, কোথায় সজ্জা।

অনুসর্গ অব্যয়

যে সকল অব্যয় শব্দ বিশেষ্য ও সর্বনাম পদের বিভক্তির ন্যায় বসে কারকবাচকতা প্রকাশ করে তাদের অনুসর্গ অব্যয় বলে। যেমন : ওকে দিয়ে এ কাজ হবে না। (দিয়ে অনুসর্গ অব্যয়)। অনুসর্গ অব্যয় ‘পদান্বয়ী অব্যয়’ নামেও পরিচিত।

অনুসর্গ অব্যয় দুই প্রকার। যেমন : বিভক্তিসূচক অনুসর্গ অব্যয় ও বিভক্তিসম অনুসর্গ অব্যয়

অনুকার অব্যয়

যে সকল অব্যয় অব্যক্ত রব, শব্দ বা ধ্বনির অনুকরণে গঠিত হয় তাদের অনুকার বা ধ্বন্যাত্মক অব্যয় বলে। যেমন :

বজ্রের ধ্বনি : কড় কড়, মেঘের গর্জন : গুড় গুড়, বৃষ্টির তুমূল শব্দ : ঝম ঝম, সিংহের গর্জন : গর গর

স্রোতের ধ্বনি : কল কল, ঘোড়ার ডাক : চিহি চিহি, বাতাসের গতি : শন শন, কাকের ডাক : কা কা

শুষ্ক পাতার শব্দ: মর মর, কোকিলের ডাক : কুহু কুহু, নুপূরের আওয়াজ: রুম ঝুম, চুড়ির শব্দ : টুং টাং

অনুভূতিমূলক অব্যয়ও অনুকার অব্যয়ের শ্রেণিভূক্ত। যেমন: ঝাঁ ঝাঁ (প্রখরতাবাচক), খাঁ খাঁ (শূন্যতাবাচক), কচ কচ, কট কট, টল মল, ঝল মল, চক চক, ছম ছম, টন টন, খট খট ইত্যাদি।

অব্যয় বিশেষণ

কতগুলো অব্যয় বাক্যে ব্যবহৃত হলে নামবিশেষণ, ক্রিয়াবিশেষণ ও বিশেষণীয় বিশেষণের অর্থবাচকতা প্রকাশ করে থাকে। এদের অব্যয় বিশেষণ বলা হয়। যেমন:

নামবিশেষণ   : অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ

ভাব বিশেষণ  : আবার যেতে হবে

ক্রিয়াবিশেষণ  : অনত্র চলে যায়

নিত্য সম্বন্ধীয় অব্যয়

কতগুলো যুগ্মশব্দ পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল সেগুলো নিত্য সম্বন্ধীয় অব্যয় রূপে পরিচিত। যেমন : যেমন, তথা, যত-তত, যখন-তখন, যেমন- তেমন, যেরূপ-সেরূপ ইত্যাদি। যথা ধর্ম তথা জয়। যত গর্জে তত বর্ষে না।

ত-প্রত্যয়ান্ত অব্যয় (সংস্কৃত তস্)

ত-প্রত্যয়ান্ত অব্যয় বাংলায় ব্যবহৃত হয়। যেমন : ধর্মত বলছি। দুর্ভাগ্যবশত পরীক্ষায় ফেল করেছি। অন্তত তোমার যাওয়া উচিত। জ্ঞানত মিথ্যা বলিনি।

একই অব্যয় শব্দের বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার

১. আর

পুনরাবৃত্তির অর্থে: ও দিকে আর যাব না।

নির্দেশ অর্থে   : বল, আর কী চাও?

নিরাশায়     : সে দিন কি আর আসবে?

বাক্যালংকারে  : আর কি বাজবে বাঁশি?

২. ও

সংযোগ অর্থে  : করিম ও রহিম দুই ভাই।

সম্ভাবনায়: আজ বৃষ্টি হতেও পারে।

তুলনায় : ওকে বলাও যা, না বলা তা।

স্বীকৃতি জ্ঞাপনে : খেতে যাবে? গেলেও হয়।

হতাশা জ্ঞাপনে : এত চেষ্টাতেও হলো না।

৩. কি/কী

জিজ্ঞাসায়: তুমি কি বাড়ি যাচ্ছ?

বিরক্তি প্রকাশে: কী বিপদ, লোকটা যে পিছু ছাড়ে না।

সাকুল্য অর্থে: কি আমীর কি ফকির, একদিন সকলকেই যেতে হবে।

বিড়ম্বনা প্রকাশে: তোমাকে নিয়ে কী মুশকিলেই না পড়লাম।

৪. না

নিষেধ অর্থে: এখন যেও না।

বিকল্প প্রকাশে  : তিনি যাবেন, না হয় আমি যাব।

আদর প্রকাশে বা অনুরোধে: আর একটি মিষ্টি খাও না খোকা। আর একটা গান গাও না।

সম্ভাবনায়: তিনি না কি ঢাকায় যাবেন।

বিস্ময়ে: কী করেই না দিন কাটাচ্ছ।

তুলনায় : ছেলে তো না, যেন একটা হিটলার।

৫. যেন

উপমায় : মুখ যেন পদ্মফুল।

প্রার্থনায় : খোদা যেন তোমার মঙ্গল করেন।

তুলনায় : ইস্, ঠান্ডা, যেন বরফ।

অনুমানে: লোকটা যেন আমার পরিচিত মনে হলো।

সতকরকরণে: সাবধানে চল, যেন পা পিছলে না পড়।

ব্যঙ্গ প্রকাশে: ছেলে তো নয় যেন ননীর পুতুল।

ক্রিয়াপদের সংজ্ঞা, প্রকরণ ও গঠন

১. কবির বই পড়ছে।

২. তোমরা আগামী বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে।

‘পড়ছে’ ও ‘দেবে’ পদ দুটো দ্বারা কোনো কার্য সম্পাদন করা বোঝাচ্ছে বলে এরা ক্রিয়াপদ।

যে পদের দ্বারা কোনো কার্য সম্পাদন করা বোঝায় তাকে ক্রিয়াপদ বলে।

বাক্যের অন্তর্গত যে পদ দ্বারা কোনো পুরুষ কর্তৃক নির্দিষ্ট কালে কোনো কার্যের সংঘটন বোঝায় তাকে ক্রিয়াপদ বলে। ওপরের প্রথম উদাহরণে নাম পুরুষ ‘কবির’ কর্তৃক বর্তমান কালে ‘পড়া’ কার্যের সংঘটন প্রকাশ করছে। দ্বিতীয় উদাহরণে মধ্যম পুরুষ, ‘তোমরা’ ভবিষ্যত ক্রিয়া সংঘটনের সম্ভাবনা প্রকাশ করছে।

বিবিধ অর্থে ক্রিয়াপদকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যেমন :

১. ভাবপ্রকাশ ক্রিয়া : ভাব প্রকাশের দিক দিয়ে ক্রিয়াপদ ২ প্রকার। যেমন : সমাপিকা ক্রিয়া, অসমাপিকা ক্রিয়া

২. বিবিধ : অন্যান্যভাবে ক্রিয়াপদ ৬ প্রকার। যেমন : অকর্মক, সকর্মক  দ্বিকর্মক, প্রযোজক ক্রিয়া, যৌগিক ক্রিয়া, মিশ্র ক্রিয়া

ক্রিয়াপদের গঠন

ক্রিয়ামূল বা ধাতুর সঙ্গে পুরুষ অনুযায়ী কালসূচক ক্রিয়াবিভক্তি যোগ করে ক্রিয়াপদ গঠন করতে হয়। যেমন: ‘পড়ছে’-পড় ‘ধাতু’+‘ছে’ বিভক্তি।

সকল ক্রিয়াপদের সংজ্ঞা

১. ক্রিয়া    : যে শব্দ দিয়ে কাজ বুঝায় তাকে ক্রিয়া বলে।

২. অনুক্ত ক্রিয়া     : যে বাক্যে ক্রিয়া উহ্য থাকে তাকে অনুক্ত ক্রিয়া বলে।

৩. সমাপিকা ক্রিয়া   : যে ক্রিয়া বাক্যকে সমাপ্ত করে তাকে সমাপিকা ক্রিয়া বলে।

৪. অসমাপিকা ক্রিয়া  : যে ক্রিয়া বাক্যকে সমাপ্ত করতে পারে না তাকে অসমাপিকা ক্রিয়া বলে।

৫. সকর্মক ক্রিয়া    : যে ক্রিয়ার কর্মপদ থাকে তাকে সকর্মক ক্রিয়া বলে।

৬. অকর্মক ক্রিয়া   : যে বাক্যে কোনো কর্মপদ থাকে না তাকে অকর্মক ক্রিয়া বলে।

৭. দ্বিকর্মক ক্রিয়া    : যে ক্রিয়ার দুটি কর্ম থাকে তাকে দ্বিকর্মক ক্রিয়া বলে।

৮. সমধাতুজ/ধাত্বর্থক: যে বাক্যে ক্রিয়া ও কর্মপদ একই ধাতু থেকে তৈরি তাকে সমধাতুজ/ধাত্বর্থক কর্ম বলে।

৯. প্রযোজক ক্রিয়া : যে ক্রিয়া প্রযোজনা করে তাকে প্রযোজক ক্রিয়া বলে।

১০. নামধাতু : বিশেষ্য, বিশেষণ ও ধ্বন্যাত্মক অব্যয়ের পরে আ-প্রত্যয়যোগে গঠিত ধাতুকে নামধাতু বলে।

১১. যৌগিক ক্রিয়া : সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়া দিয়ে গঠিত বিশেষ বা সম্প্রসারিত অর্থ প্রকাশক ক্রিয়াকে যৌগিক ক্রিয়া বলে।

১২. মিশ্রক্রিয়া      : বিশেষ্য, বিশেষণ ও ধ্বন্যাত্মক অব্যয়ের সঙ্গে কর, হ, দে, পা, যা, কাট, গা, ছায়, মার ইত্যাদি ধাতু দিয়ে গঠিত ক্রিয়াকে মিশ্রক্রিয়া বলে।

অনুক্ত ক্রিয়াপদ

ক্রিয়াপদ বাক্যগঠনের অপরিহার্য অঙ্গ। ক্রিয়াপদ ভিন্ন কোনো মনোভাবই সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করা যায় না। তবে কখনো কখনো বাক্যে ক্রিয়াপদ উহ্য বা অনুক্ত থাকতে পারে। যেমন :

ইনি আমার ভাই = ইনি আমার ভাই (হন)।

আজ প্রচণ্ড গরম = আজ প্রচণ্ড গরম (অনুভূত হচ্ছে)

তোমার মা কেমন?= তোমার মা কেমন (আছেন)?

বাক্যে সাধারণত ‘হু’ ও ‘আছ’ ধাতু গঠিত ক্রিয়াপদ উহ্য থাকে।

সমাপিকা ক্রিয়া

যে ক্রিয়াপদ দ্বারা বাক্যের (মনোভাবের) পরিসমাপ্তি জ্ঞাপিত হয় তাকে সমাপিকা ক্রিয়া বলে। যেমন : ছেলেরা খেলা করছে। এ বছর বন্যায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

সমাপিকা ক্রিয়া সকর্মক, অকর্মক ও দ্বিকর্মক হতে পারে। ধাতুর সঙ্গে বর্তমান, অতীত বা ভবিষ্যত কালের বিভক্তি যুক্ত হয়ে সমাপিকা ক্রিয়া গঠিত হয়। যেমন :

*আনোয়ার বই পড়ে। এখানে ক্রিয়া-সকর্মক আর কাল-বর্তমান

*মাসুদ সারাদিন খেলেছিল। এখানে ক্রিয়া-অকর্মক আর কাল-অতীত

*আমি তোমাকে একটি কলম উপহার দেব। এখানে ক্রিয়া-দ্বিকর্মক আর কাল-ভবিষ্যত

অসমাপিকা ক্রিয়া

যে ক্রিয়া দ্বারা বাক্যের পরিসমাপ্তি ঘটে না, বক্তার কথা অসম্পূর্ণ থেকে যায় তাকে অসমাপিকা ক্রিয়া বলে। যেমন : প্রভাতে সূর্য উঠলে ...। আমরা হাত-মুখ ধুয়ে ...। আমরা বিকেলে খেলতে ...। এখানে, ‘উঠলে’ ‘ধুয়ে’ ও ‘খেলতে’ ক্রিয়াপদগুলোর দ্বারা কথা শেষ হয়নি। কথা সম্পূর্ণ হতে আরও শব্দের প্রয়োজন। তাই এর শব্দগুলো অসমাপিকা ক্রিয়া। উপযুক্ত বাক্যগুলো পূর্ণ মনোভাব জ্ঞাপন করলে দাঁড়াবে : প্রভাতে সূর্য উঠলে অন্ধকার দূর হয়। আমরা হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বসলাম। আমরা বিকেলে খেলতে যাই। পূর্ণাঙ্গ বাক্য গঠন করতে হলে সমাপিকা ক্রিয়া অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। সাধারণত ইয়া (পড়িয়া), ইলে (পড়িলে), ইতে (পড়িতে), এ (পড়ে), লে (পড়লে), তে (পড়তে) বিভক্তিযুক্ত ক্রিয়াপদ অসমাপিকা ক্রিয়া।

অসমাপিকা ক্রিয়ার গঠন

ধাতুর সঙ্গে কাল নিরপেক্ষ-ইয়া (য়ে),-ইতে (তে) অথবা ইলে (লে বিভক্তি যুক্ত হয়ে অসমাপিকা ক্রিয়া ক্রিয়া গঠিত হয়। যেমন : ‘দরিদ্র পাইলে ধন হয় গর্বস্ফীত।’ যত্ন করলে রত্ন মেলে। তাকে খুঁজে নিয়ে আসতে চেষ্টা করবে। 

ধাতুর ক্রিয়া ঘটিত বাক্যে একাধিক প্রকার কর্তা (কর্তৃকারক) দেখা যায়। যেমন :

এক কর্তা

বাক্যস্থিত সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার কর্তা এক বা অভিন্ন হতে পারে। যেমন : তুমি চাকরি পেলে আর কি দেশে আসবে? ‘পেলে’ (অসমাপিকা ক্রিয়া) এবং ‘আসবে’ (সমাপিকা ক্রিয়া) উভয় ক্রিয়ার কর্তা এখানে ‘তুমি’।

অসমান কর্তা

বাক্যস্থিত সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার কর্তা এক না হলে সেখানে কর্তাকে অসমান কর্তা বলা হয়। যেমন :

শর্তাধীন কর্তা

এ জাতীয় কর্তাদের ব্যবহার শর্তাধীন হতে পারে। যেমন : তোমরা বাড়ি এলে আমি রওনা হব। এখানে ‘এলে’ অসমাপিকা ক্রিয়ার কর্তা ‘তোমরা’ এবং ‘রওনা হব’ সমাপিকা ক্রিয়ার কর্তা ‘আমি’। তোমাদের বাড়ি আসার ওপর আমার রওনা হওয়া নির্ভরশীল বলে এ জাতীয় বাক্যে কর্তৃপক্ষেও ব্যবহার শর্তাধীন।

নিরপেক্ষ কর্তা

শর্তাধীন না হয়েও সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার ভিন্ন ভিন্ন কর্তৃপদ থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রথম কর্তৃপদটিকে  বলা হয় নিরপেক্ষ কর্তা। যেমন : সূূর্য অস্তমিত হলে যাত্রীদল পথ চলা শুরু করল। এখানে ‘যাত্রীদের’ পথ চলার সঙ্গে ‘সূর্য’ অস্তমিত হওয়ার কোনো শর্ত বা সম্পকর নাই বলে ‘সূর্য’ নিরপেক্ষ কর্তা।

অসমাপিকা ক্রিয়ার ব্যবহার

১. ‘ইলে’>‘লে’ বিভক্তিযুক্ত অসমাপিকা ক্রিয়ার ব্যবহার

ক) কার্যপরম্পরা বোঝাতে : চারটা বাজলে স্কুলের ছুটি হবে।

খ) প্রশ্ন বা বিস্ময় জ্ঞাপনে : একবার মরলে কি কেউ ফেরে?

গ) সম্ভাব্যতা অর্থে : এখন বৃষ্টি হলে ফসলের ক্ষতি হবে।

ঘ) সাপেক্ষতা বোঝাতে : তিনি গেলে কাজ হবে।

ঙ) দার্শনিক সত্য প্রকাশে : সজন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে?

চ) বিধিনির্দেশে : এখানে প্রচারপত্র লাগালে  ফৌজদারিতে সোপর্দ হবে।

ছ) সম্ভাবনার বিকল্পে : আজ গেলেও যা, কাল  গেলেও তা।

জ) পরিণতি বোঝাতে : বৃষ্টিতে ভিজলে সর্দি হবে।

২. ‘ইয়া’>‘এ’ বিভক্তিযুক্ত অসমাপিকা ক্রিয়ার ব্যবহার

ক) অনন্তরতা বা পর্যায় বোঝাতে : হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বস।

খ) হেতু অর্থে : ছেলেটি কুসঙ্গে মিশে নষ্ট হয়ে গেল।

গ) ক্রিয়া বিশেষণ অর্থে : চেঁচিয়ে কথা বলো না।

ঘ) ক্রিয়ার অবিচ্ছিন্নতা বোঝাতে : হৃদয়ের কথা কহিয়া কহিয়া গাহিয়া গান।

ঙ) ভাববাচক বিশেষ্য গঠনে  : সেখানে আর গিয়ে কাজ নাই।

চ) অব্যয় পদেও অনুরূপ : ঢাকা গিয়ে বাড়ি যাব।

৩. ‘ইতে’>‘তে’ বিভক্তিযুক্ত অসমাপিকা ক্রিয়ার ব্যবহার

ক) ইচ্ছা প্রকাশে : এখন আমি যেতে চাই।

খ) উদ্দেশ্য বা নিমিত্ত অর্থে : মেলা দেখতে ঢাকা যাব।

গ) সামর্থ্য বোঝাতে : খোকা এখন হাঁটতে পারে।

ঘ) বিধি বোঝাতে : বাল্যকালে বিদ্যাভ্যাস করতে হয়।

ঙ) দেখা বা জানা অর্থে :  রমলা গাইতে জানে।

চ) আবশ্যকতা বোঝাতে : এখন ট্রেন ধরতে হবে।

ছ) সূচনা বোঝাতে : রানি এখন ইংরেজি পড়তে শিখেছে।

জ) বিশেষণবাচকতায় : লোকটাকে দৌড়াতে  দেখলাম।

ঝ) ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য গঠনে : তোমাকে তো এ গ্রামে থাকতে দেখিনি।

ঞ) অনুসর্গরূপে : কোন দেশেতে তরুলতা সকল দেশের চাইতে শ্যামল।

ট) বিশেষ্যেও সঙ্গে অন্বয় সাধনে : দেখিতে বাসনা মাগো তোমার চরণ।

ঠ) বিশেষণের সঙ্গে অন্বয় সাধনে : পদ্মফুল দেখতে সুন্দর।

৪.  ‘ইতে’>‘তে’ বিভক্তিযুক্ত ক্রিয়ার দ্বিত্ব প্রয়োগ

ক) নিরন্তরতা প্রকাশে : কাটিতে কাটিতে ধান এলো বরষা।

খ) সমকাল বোঝাতে: সেঁউতিতে পদ দেবী রাখিতে রাখিতে। সেঁউতি হইল সোনা দেখিতে দেখিতে।

টীকা : রীতিসিদ্ধ প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমাপিকা ক্রিয়া অনুপস্থিত থেকে অসমাপিকা ক্রিয়ার ব্যবহারে বাক্য গঠিত হতে পারে। যেমন : গরু মেরে জুতা দান।  আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ।

সকর্মক ক্রিয়া

যে ক্রিয়ার কর্মপদ আছে তাই সকর্মক ক্রিয়া। ক্রিয়ার সাথে কী বা কাকে প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায় তাই ক্রিয়ার কর্মপদ। কর্মপদযুক্ত ক্রিয়াই সকর্মক ক্রিয়া। যেমন : বাবা আমাকে একটি কলম কিনে দিয়েছেন।

প্রশ্ন : কী দিয়েছেন? উত্তর : কলম (কর্মপদ)

প্রশ্ন : কাকে দিয়েছেন? উত্তর : আমাকে (কর্মপদ)

‘দিয়েছেন’  ক্রিয়াপদটির কর্ম পদ থাকায় এটি সকর্মক ক্রিয়া।

অকর্মক ক্রিয়া

যে ক্রিয়ার কর্ম নাই, তা অকর্মক ক্রিয়া। যেমন : মেয়েটি হাসে। ‘কী হাসে’ বা ‘কাকে হাসে’ প্রশ্ন করলে কোন উত্তর হয় না। কাজেই ‘হাসে’ ক্রিয়াটি অকর্মক ক্রিয়া।

দ্বিকর্মক ক্রিয়া

যে ক্রিয়ার দুটি কর্মপদ থাকে তাকে দ্বিকর্মক ক্রিয়া বলে। দ্বিকর্মক ক্রিয়ার বস্তুবাচক কর্মপদটিকে মুখ্য বা প্রধান কর্ম এবং ব্যক্তিবাচক কর্মপদটিকে গৌণকর্ম বলে। বাবা আমাকে একটি কলম কিনে দিয়েছেন বাক্যে ‘কলম’ (বস্তু) মুখ্যকর্ম এবং ‘আমাকে’ (ব্যক্তি) গৌণকর্ম।

সমধাতুজ কর্ম

বাক্যের ক্রিয়া ও কর্মপদ একই ধাতু থেকে গঠিত হলে ঐ কর্মপদকে সমধাতুজ কর্ম বা ধাত্বর্থক কর্মপদ বলে। যেমন : আর কত খেলা খেলবে। মূল ‘খেলা’ ধাতু থেকে ক্রিয়াপদ ‘খেলবে’ এবং কর্মপদ ‘খেলা’ উভয়ই গঠিত হয়েছে। তাই ‘খেলা’ পদটি সমধাতুজ বা ধাত্বর্থক কর্ম।

সমধাতুজ কর্মপদ অকর্মক ক্রিয়াকে সকর্মক করে। যেমন :

এমন সুখের মরণ কে মরতে পারে? বেশ এক ঘুম ঘুমিয়েছি। আর মায়াকান্না কেঁদো না গো বাপু।

সকর্মক ক্রিয়ার অকর্মক রূপ

প্রয়োগ বৈশিষ্ট্য সকর্মক ক্রিয়া ও অকর্মক হতে পারে। যেমন :

অকর্মক সকর্মক

আমি চোখে দেখি না। আকাশে চাঁদ দেখি না।

ছেলেটা কানে শোনে না। ছেলেটা কথা শোনে।

আমি রাতে খাব না।  আমি রাতে ভাত খাব না।

অন্ধকারে আমার খুব ভয় করে। বাবাকে আমার খুব ভয় করে।

প্রযোজক ক্রিয়া

যে ক্রিয়া একজনের প্রযোজনা বা চালনায় অন্য কর্তৃক অনুষ্ঠিত হয় সেই ক্রিয়াকে প্রযোজক ক্রিয়া বলে। সংস্কৃত ব্যাকরণে একে ণিজন্ত ক্রিয়া বলা হয়।

প্রযোজক ক্রিয়া : যে ক্রিয়া প্রযোজনা করে তাকে প্রযোজক কর্তা বলে।

প্রযোজ্য কর্তা : যাকে দিয়ে ক্রিয়াটি অনুষ্ঠিত হয় তাকে প্রযোজ্য কর্তা বলে। যেমন :

প্রযোজক কর্তা                   প্রযোজ্য কর্তা  প্রযোজক ক্রিয়া

মা শিশুকে        চাঁদ        দেখাচ্ছেন।

(তুমি)           খোকাকে     কাঁদিও না।

সাপুড়ে           সাপ        খেলায়।

বিশেষ দ্রষ্টব্য বা জ্ঞাতব্য : প্রযোজক ক্রিয়া রূপে ব্যবহৃত হলে অকর্মক প্রযোজক ক্রিয়া সকর্মক হয়।

প্রযোজক ক্রিয়ার গঠন : প্রযোজক ক্রিয়ার ধাতু=মূল ক্রিয়ার দাতু+আ। যেমন: মূল ধাতু হাস্+আ=  হাসা (প্রযোজক ক্রিয়ার ধাতু)। হাসা+চ্ছেন বিভক্তি= হাসাচ্ছেন (প্রযোজক ক্রিয়া)।

নামধাতু ও নামধাতুর ক্রিয়া

বিশেষ্য, বিশেষণ এবং ধ্বন্যাত্মক অব্যয়ের পরে ‘আ’ প্রত্যয়যোগে যেসব ধাতু গঠিত হয় তাদের নামধাতু বলা হয়। নামধাতুর সঙ্গে পুরুষ বা কালসূচক ক্রিয়াবিভক্তি যোগে নামধাতুর ক্রিয়াপদ গঠিত হয়। যেমন:

ক) বেত (বিশেষ্য)+আ (প্রত্যয়)= বেতা: শিক্ষক ছাত্রটিকে বেতাচ্ছেন

খ) বাঁকা (বিশেষণ)+আ (প্রত্যয়)= বাঁকা: কঞ্চিটি বাঁকিয়ে ধর

গ) ধ্বন্যাত্মক অব্যয় : কন কন-দাঁতটি ব্যথায় কনকনাচ্ছে। ফোঁস অজাকারটি ফোঁসাচ্ছে।

আ-প্রত্যয় যুক্ত না হয়েও কয়েকটি নামধাতু বাংলা ভাষায় মৌলিক ধাতুর মতো ব্যবহৃত হয়। যেমন :

ফল   : বাগানে বেশ কিছু লিচু ফলেছে।     

টক   : তরকারি বাসি হলে টকে।   

ছাপা : আমার বন্ধু বইটা ছেপেছে।

যৌগিক ক্রিয়া

একটি সমাপিকা ও একটি অসমাপিকা ক্রিয়া যদি একত্রে একটি বিশেষ বা সম্প্রসারিত অর্থ প্রকাশ করে তাকে যৌগিক ক্রিয়া বলে। যেমন :

ক) তাগিদ দেওয়া অর্থে : ঘটনাটা শুনে রাখ।

খ) নিরন্তরতা অর্থে  : তিনি বলতে লাগলেন।

গ) কার্যসমাপ্তি অর্থে  : ছেলেমেয়েরা শুয়ে পড়ল।

ঘ) আকস্মিকতা অর্থে : সাইরেন বেজে উঠল।

ঙ) অভ্যস্ততা অর্থে   : শিক্ষায় মন সংস্কারমুক্ত হয়ে থাকে।

চ) অনুমোদন অর্থে   : এখন যেতে পার।

যৌগিক ক্রিয়ার গঠন বিধি

অসমাপিকা ক্রিয়ার পরে যা, পড়, দেখ্, লাগ্, ফেল্, আস্, উঠ্, দে, লহ, থাক প্রভৃতি ধাতু থেকে সমাপিকা ক্রিয়া গঠিত হয়ে উভয়ে মিলিতভাবে যৌগিক ক্রিয়া তৈরি করে। এসব যৌগিক ক্রিয়া বিশেষ অর্থ প্রকাশ করে। যেমন :

১. যা- ধাতু

ক) সমাপ্তি অর্থে    : বৃষ্টি থেমে গেল।

খ) অবিরম অর্থে    : গয়ক গেয়ে যাচ্ছেন।

গ) ক্রমশ অর্থে     : চা জুড়িয়ে যাচ্ছে।

ঘ) সম্ভাবনা অর্থে   : এখন যাওয়া যেতে পারে।

২. পড়-ধাতু      

ক) সমাপ্তি অর্থে    : এখন শুয়ে পড়।

খ) ব্যাপ্তি অর্থে     : কথাটা ছড়িয়ে পড়েছে।

গ) আকস্মিকতা অর্থে :    এখনই তুফান এসে পড়বে।

ঘ) ক্রমশ অর্থে     : কেমন যেন মনমরা হয়ে পড়েছি।

৩. দেখ্-ধাতু

ক) মনোযোগ আকর্ষণে: এদিকে চেয়ে দেখ।

খ) পরীক্ষা অর্থে    : লবণটা চেখে দেখ।

গ) ফল সম্ভাবনায়   : সাহেবকে বলে দেখ।

৪. আস্- ধাতু

ক) সম্ভাবনায়      : আজ বিকেলে বৃষ্টি আসতে পারে।

খ) অভ্যস্ততায়      : আমরা এ কাজই করে আসছি।

গ) আসন্ন সমাপ্তি অর্থে : ছুটি ফুরিয়ে আসছে।

৫. দি- ধাতু

ক) অনুমতি অর্থে   :    আমাকে যেতে দাও।

খ) পূর্ণতা অর্থে     :    কাজটা শেষ করে দিলাম।

গ) সাহায্য প্রার্থনায়  : আমাকে অঙ্কটা বুঝিয়ে দাও।

৬. নি- ধাতু

ক) নির্দেশ জ্ঞাপনে   :    এবার কাপড়-চোপড় গুছিয়ে নাও।

খ) পরীক্ষা অর্থে    : কষ্টি পাথরে সোনাটা কষে নাও।

৭. ফেল্- ধাতু    

ক) সম্পূর্ণতা অর্থে   :    সন্দেশগুলো খেয়ে ফেল।

খ) আকস্মিকতা অর্থে :    ছেলেরা হেসে ফেলল।

৮. উঠ্-ধাতু

ক) ক্রমান্বয়তা বোঝাতে: ঋণের বোঝা ভারী হয়ে উঠছে।

খ) অভ্যাস অর্থে     : শুধু শুধু তিনি রেগে ওঠেন।

গ) আকস্মিকতা অর্থে : সে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল।

ঘ) সম্ভাবনা অর্থে    : আমার আর থাকা হয়ে উঠল না।

ঙ. সামর্থ্য অর্থে     : এসব কথা আমার সহ্য হয়ে ওঠে না।

৯. লাগ্-ধাতু

ক) অবিরাম অর্থে   : খোকা কাঁদতে লাগল।

খ) সূচন নির্দেশে    :    এখন কাজে লাগ তো দেখি।

১০. থাক্-ধাতু

ক) নিরন্তরতা অর্থে  :    এবার ভাবতে থাক।

খ) সম্ভবনায়      :    তিনি হয়তো বলে থাকবেন।

গ) সন্দেহ প্রকাশে   :    সেই কাজটা করে থাকবে।

ঘ) নির্দেশে        :    আর সরকার নাই, এবার বসে থাক।

মিশ্র ক্রিয়া

বিশেষ্য, বিশেষণ ও ধ্বন্যাত্মক অব্যয়ের সঙ্গে কর, হ্, দে, পা, যা, কাট্, গা, ছাড়, ধর, মার, প্রভৃতি ধাতুযোগে গঠিত ক্রিয়াপদ বিশেষ বিশেষ অর্থে মিশ্র ক্রিয়া গঠন করে। যেমন :

ক) বিশেষ্যের উত্তর (পরে)  : আমরা তাজমহল দর্শন করলাম। এখন গোল্লায় যাও।

খ) বিশেষণের উত্তর (পরে) : তোমাকে দেখে বিশেষ প্রীত হলাম।

গ) ধ্বন্যাত্মক অব্যয়ের উত্তর (পরে) : মাথা ঝিম ঝিম্ করছে। ঝম্ ঝম্ করে বৃষ্টি পড়ছে।

বাক্য

ভাষার মূল উপকরণ বাক্য এবং বাক্যের মৌলিক উপাদান শব্দ। যে সুবিন্যস্ত পদসমষ্টি দ্বারা কোনো বিষয়ে বক্তার মনোভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয় তাকে বাক্য বলে। কতগুলো পদের সমষ্টিতে বাক্য গঠিত হলেও যে কোনো পদসমষ্টিই বাক্য নয়। বাক্যের বিভিন্ন পদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বা অন্বয় থাকা আবশ্যক। এ ছাড়াও বাক্যের অন্তর্গত বিভিন্ন পদ দ্বারা মিলিতভাবে একটি অখণ্ড ভাব পূর্ণ রূপে প্রকাশিত হওয়া প্রয়োজন তবেই তা বাক্য হবে।

বাক্যের প্রকরণ

অংশ অনুসারে বাক্য দুই প্রকার। যেমন :

উদ্দেশ্য ও বিধেয়

প্রতিটি বাক্যে দুটি অংশ থাকে : উদ্দেশ্য ও বিধেয়

বাক্যের যে অংশে কাউকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলা হয় তাকে উদ্দেশ্য। আর উদ্দেশ্য সম্বন্ধে যা বলা হয় তাকে বিধেয় বলে। যেমন :

খোকা এখন   বই পড়ছে

(উদ্দেশ্য)    (বিধেয়)

বিশেষ্য বা বিশেষ্যস্থানীয় অন্যান্য পদ বা পদসমষ্টিযোগে গঠিত বাক্যাংশও বাক্যের উদ্দেশ্য হতে পারে। যেমন :

সৎ লোকেরাই প্রকৃত সুখী-বিশেষ্যরূপে ব্যবহৃত বিশেষণ

মিথ্যা কথা বলা খুবই অন্যায়-ক্রিয়াজাত বাক্যাংশ

উদ্দেশ্যের প্রকারভেদ

একটিমাত্র পদবিশিষ্ট কর্তৃপদকে সরল উদ্দেশ্য বলে। উদ্দেশ্যের সঙ্গে বিশেষণাদি যুক্ত থাকলে তাকে সম্প্রসারিত উদ্দেশ্য বলে।

উদ্দেশ্যের সম্প্রসারণ : সম্প্রসারণ    উদ্দেশ্য বিধেয়

১. বিশেষণ যোগে-  কুখ্যাত দস্যুদল ধরা পড়েছে

২. সম্বন্ধ যোগে-    হাসিমের     ভাই   এসেছে।

৩. সমার্থক বাক্যাংশ যোগে-  যারা অত্যন্ত পরিশ্রমী  তারাই উন্নতি করে।

৪. অসমাপিকা ক্রিয়াবিশেষণ যোগে-  চাটুকার পরিবৃত হয়েই বড় সাহেব   থাকেন।

৫. বিশেষণ স্থানীয় বাক্যাংশ যোগে- যার কথা তোমরা বলে থাক  তিনি  এসছেন।

বিধেয়ের সম্প্রসারণ :           উদ্দেশ্য         সম্প্রসারণ         বিধেয়

১. ক্রিয়া বিশেষণ যোগে-       ঘোড়া         দ্রুত                  চলে।

২. ক্রিয়া বিশেষণীয় যোগে-    জেট বিমান   অতিশয় দ্রুত       চলে।

৩. কারকাদি যোগে-           ভুবনের        ঘাটে ঘাটে           ভাসিছে।

৪. ক্রিয়া বিশেষণ স্থানীয় বাক্যাংশ যোগে-  তিনি       যে ভাবেই হোক     আসবেন।

৫. বিধে বিশেষণ যোগে-ইনি  আমার বিশেষ অন্তরঙ্গ বন্ধু (হোন)।

গঠন অনুসারে বাক্য তিন প্রকার। যেমন :

সরল বাক্য

যে বাক্যে একটিমাত্র কর্তা (উদ্দেশ্য) এবং একটিমাত্র সমাপিকা ক্রিয়া (বিধেয়) থাকে তাকে সরল বাক্য বলে। যেমন : পুকুরে পদ্মফুল জন্মে। এখানে ‘পদ্মফুল’ উদ্দেশ্য এবং ‘জন্মে।

এরূপ : বৃষ্টি হচ্ছে। তোমরা বাড়ি যাও। খোকা আজ সকালে স্কুলে গিয়েছে। স্নেহময়ী জননী (উদ্দেশ্য) স্বীয় সন্তানকে প্রাণাপেক্ষা ভালোবাসেন (বিধেয়)। বিশ্ববিখ্যাত মহাকবিরা (উদ্দেশ্য) ঐন্দ্রজালিক শক্তিসম্পন্ন লেখনী দ্বারা অমরতার সঙ্গীত রচনা করেন। (বিধেয়)।

মিশ্র বা জটিল বাক্য

যে বাক্যে একটি প্রধান খণ্ডবাক্যের এক বা একাধিক আশ্রিত বাক্য পরস্পর সাপেক্ষ ভাবে ব্যবহৃত হয় তাকে মিশ্রবা জটিল বাক্য বলে। যেমন :

আশ্রিত বাক্য                   প্রধান খণ্ডবাক্য

১. যে পরিশ্রম করে           সেই সুখ লাভ করে।

২. সে যে অপরাধ করেছে   তা মুখ দেখেই বুঝেছি।

আশ্রিত খণ্ডবাক্য তিন প্রকার। যেমন  :

ক) বিশেষ্য স্থানীয় আশ্রিত খণ্ডবাক্য

যে আশ্রিত খণ্ডবাক্য প্রধান খণ্ডবাক্যের যে কোনো পদের আশ্রিত থেকে বিশেষ্যের কাজ করে তাকে বিশেষ্যস্থানীয় আশ্রিত খণ্ডবাক্য বলে। যেমন : আমি মাঠে গিয়ে দেখলাম, খেলা শেষ হয়ে গিয়েছে। (বিশেষ্য স্থানীয় খণ্ডবাক্য ক্রিয়ার কর্মরূপে ব্যবহৃত)

এরূপ : তিনি বাড়ি আছেন কি না, আমি জানি না। ব্যাপারটি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে ফল ভালো হবে না।

খ) বিশেষণ স্থানীয় আশ্রিত খণ্ডবাক্য

যে আশ্রিত খণ্ডবাক্য প্রধান খণ্ডবাক্যের অন্তর্গত কোনো বিশেষ্য বা সর্বনামের দোষ, গুণ ও অবস্থা প্রকাশ করে তাকে বিশেষণ স্থানীয় আশ্রিত খণ্ডবাক্য বলে। যেমন : লেখাপড়া করে যেই, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সেই। (আশ্রিত বাক্যটি ‘সেই’ সর্বনামের অবস্থা প্রকাশ করছে)।

এরূপ : খাঁটি সোনার চাইতে খাঁটি, আমার দেশের মাটি। ধনদান্য পুষ্পে ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা। যে এ সভায় অনুপস্থিত সে বড় দুর্ভাগ্য।

গ) ক্রিয়াবিশেষণ স্থানীয় খণ্ডবাক্য

যে আশ্রিত খণ্ডবাক্য ক্রিয়াপদের স্থান, কাল ও কারণ নির্দেশক অর্থে ব্যবহৃত হয় তাকে ক্রিয়াবিশেষণ স্থানীয় আশ্রিত খণ্ডবাক্য বলে। যেমন : যতই করিবে দান তত যাবে বেড়ে। তুমি আসবে বলে আমি অপেক্ষা করছি। যেখানে আকাশ আর সমুদ্র একাকার হয়ে গেছে,  সেখানেই দিকচক্রবাল।

যৌগিক বাক্য

পরস্পর নিরপেক্ষ দুই বা ততোধিক সরল বা মিশ্রবাক্য মিলিত হয়ে একটি সম্পূর্ণ বাক্য গঠন করলে তাকে যৌগিক বাক্য বলে।

জ্ঞাতব্য : যৌগিক বাক্যের অন্তর্গত নিরপেক্ষ বাক্যগুলো এবং, ও, কিন্তু, অথবা, অথচ, কিংবা, বরং, তথাপি প্রভৃতি অব্যয় যোগে সংযুক্ত বা সমন্বিত থাকে। যেমন : নেতা জনগণকে উৎসাহিত করলেন বটে কিন্তু কোনো পথ দেখাতে পারলেন না। বস্ত্র মলিন কেন, কেহ জিজ্ঞাসা করিলে সে ধোপাকে গালি পাড়ে অথচ ধৌত বস্ত্রে তাহার গৃহ পরিপূর্ণ। উদয়াস্ত পরিশ্রম করব তথাপি অন্যের দ্বারাস্থ হব না।

৩৫তম বিসিএস ২০১৫

১. যেমন কর্ম করবে তেমন ফল পাবে। (সরল)

উত্তর : যেমন কর্ম তেমন ফল।

২. সন্ধ্যা হয়ে এলো কিন্তু ট্রেনের খোঁজ নেই এখনো। (জটিল)

উত্তর : যদিও সন্ধ্যা হয়ে এলো তথাপি ট্রেনের খোঁজ নেই।

৩. পনের মিনিট পর তিনি এলেন। (যৌগিক)

উত্তর : তিনি পনের মিনিট দেরি করলেন কিন্তু এলেন।

৪. পুকুরপাড়ে এখন কেউ নেই। (অস্তিবাচক)

উত্তর : পুকুরপাড় নির্জন।

৫. কোথায়ও কি তিনি আছেন? (নেতিবাচক)

উত্তর : কোথায়ও তিনি নেই।

৬. গোলাপটি অত্যন্ত সুন্দর। (বিস্ময়সূচক)

উত্তর : গোলাপটি কী সুন্দর!

বাক্যের গুণ তিনটি। যেমন :

আকাঙ্ক্ষা

বাক্যের অর্থ পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য এক পদের পর অন্য পদ শোনার যে ইচ্ছা তাই আকাঙ্ক্ষা। যেমন : ‘চন্দ্র পৃথিবীর চারদিকে’-এটুকু বললে বাক্যটি সম্পূর্ণ মনোভাব প্রকাশ করে না, আরও কিছু ইচ্ছা থাকে। বাক্যটি এভাবে পূর্ণাঙ্গ করা যায়; চন্দ্র পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। এখানে আকাঙ্ক্ষার নিবৃত্তি হয়েছে বলে এটি পূর্ণাঙ্গ বাক্য।

আসত্তি

মনোভাব প্রকাশের জন্য বাক্যে শব্দগুলো এমনভাবে পর পর সাজাতে হবে যাতে মনোভাব প্রকাশ বাধাগ্রস্ত না হয়। বাক্যের অর্থসঙ্গতি রক্ষার জন্য সুশৃঙ্খল পদবিন্যাসই আসত্তি। যেমন: কাল বিতরণী হবে উৎসব স্কুলে আমাদের পুরস্কার অনুষ্ঠিত। লেখা হওয়াতে পদ সন্নিবেশ ঠিকভাবে না হওয়ায় শব্দগুলোর অন্তর্নিহিত ভাবটি যথাযথ প্রকাশিত হয়নি। তাই এটি একটি বাক্য হয়নি। মনোভাব পূর্ণ ভাবে প্রকাশ করার জন্য পদগুলোকে নিম্নলিখিতভাবে যথাস্থানে সন্নিবিষ্ট করতে যেমন: কাল আমাদের স্কুলে পুরস্কার বিতরণী উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। বাক্যটি আসত্তিসম্পন্ন।

যোগ্যতা

বাক্যস্থিত পদসমূহের অন্তর্গত এবং ভাগত মিলবন্ধনের নাম যোগ্যতা। যেমন : বর্ষার বৃষ্টিতে প্লাবনের সৃষ্টি হয়। এটি একটি যোগ্যতাসম্পন্ন বাক্য। কারণ বাক্যটিতে পদসমূহের অর্থগত এবং ভাবগত সমন্বয় রয়েছে। কিন্তু ‘বর্ষার রৌদ্র প্লাবনের সৃষ্টি করে।’ বললে বাক্যটি ভাবপ্রকাশের যোগ্যতা হারাবে। কারণ রৌদ্র প্লাবন সৃষ্টি করে না।

শব্দের যোগ্যতার সঙ্গে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো জড়িত থাকে-

ক) রীতিসিদ্ধ অর্থবাচকতা : প্রকৃতি-প্রত্যয়জাত অর্থে শব্দ সর্বদা ব্যবহৃত হয়। যোগ্যতার প্রতি লক্ষ রেখে কতগুলো শব্দ ব্যবহার করতে হয়। যেমন :

১. বাধিত   অনুগৃহীত বা কৃতজ্ঞ  বাধ + ইত   বাধাপ্রাপ্ত

২. তৈল     তিল  জাতীয়  তিল+ষ্ণ    তিলজাত স্নেহ পদার্থ, বিশেষ কোনো শস্যের রস

খ) দুর্বোধ্যতা

অপ্রচলিত ও দুর্বোধ্য শব্দ বাহার করলে বাক্যের যোগ্যতা বিনষ্ট হয়। যেমন : তুমি আমার সঙ্গে প্রপঞ্চ করেছ। (চাতুরী বা মায়া অর্থে কিন্তু বাংলা ‘প্রপঞ্চ’ শব্দটি অপ্রচলিত)।

গ) উপমার ভুল প্রয়োগ

ঠিকভাবে উপমা অলংকার ব্যবহার না করলে যোগ্যতার হানি ঘটে। যেমন : আমার হৃদয়-মন্দিরে আশার বীজ উপ্ত হলো। বীজ ক্ষেত্রে বপন করা হয়, মন্দিরে নয়। কাজেই বাক্যটি হওয়া উচিত : আমার হৃদয়-ক্ষেত্রে আশার বীজ উপ্ত হলো।

ঘ) বাহুলদোষ

প্রয়োজনের অতিরিক্ত শব্দ ব্যবহারে বাহুল্যদোষ বটে এবং এর ফলে শব্দ তার যোগ্যতাগুণ হারিয়ে থাকে। যেমন : দেশের সব আলেমগণই এ ব্যাপারে আমাদের সমর্থন দান করেন। ‘আলেমগণ’ বহু বচনবাচক শব্দ। এর সঙ্গে ‘সব’ শব্দটির অতিরিক্ত ব্যবহার বাহুল্যদোষ সৃষ্টি করেছে।

ঙ) বাগধারার শব্দ পরিবর্তন

বাগধারা ভাষাবিশেষের ঐতিহ্য। এর যথেচ্ছ পরিবর্তন করলে শব্দ তার যোগ্যতা হারায়। যেমন: অরণ্যে রোদন (অর্থ : নিষ্ফল আবেদন)-এর পরিবর্তে যদি বলা হয়-‘বনে ক্রন্দন’ তবে বাগধারাটি তার যোগ্যতা হারাবে।

চ) গুরুচণ্ডালী দোষ

তৎসম শব্দের সঙ্গে দেশীয় শব্দের প্রয়োগ কখনো কখনো গুরুচণ্ডালী দোষ সৃষ্টি করে। এ দোষে দুষ্ট শব্দ তার যোগ্যতা হারায়। ‘গরুর গাড়ি’, ‘শবদাহ’, ‘মড়াপোড়া’ প্রভৃতি স্থলে যথাক্রমে ‘গরুর শকট’, ‘শবপোড়া’, ‘মড়াদাহ’ প্রভৃতির ব্যবহার গুরুচণ্ডালী দোষ সৃষ্টি করে।

প্রত্যয়

ভাষার সমৃদ্ধি শব্দের উপর নির্ভরশীল। যে ভাষায় যত বেশি শব্দ আছে সে ভাষা তত বেশি সমৃদ্ধ। বাংলা ভাষায় শব্দ গঠনের একটি অন্যতম রীতি হলো প্রত্যয়। কিন্তু প্রত্যয়ের নিজের কোনো স্বাধীন অর্থ নেই। কৃৎ ও তদ্ধিত দুধরনের প্রত্যয়ই শব্দ গঠনের সহায়ক। যা পরে যুক্ত হয় তাই প্রত্যয়। সুতরাং যে বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি ধাতু বা প্রাতিপদিকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে তাই প্রত্যয়। যে বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি ধাতু বা শব্দের পরে যুক্ত হয়ে নতুন অর্থবোধক শব্দ গঠন করে তাকে প্রত্যয় বলে। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল−াহ্র মতে, ‘ধাতু বা শব্দের উত্তর ভিন্ন ভিন্ন অর্থে যে বর্ণ বা বর্ণসমূহ যুক্ত হইয়া শব্দ প্রস্তুত হয় তাহাদিগকে প্রত্যয় বলে।’ যেমন :

হাত+ আ= হাতা   মনু+অ=মানব   √চল্+অন্ত=চলন্ত     √কৃ+অক = কারক

এখানে, ‘ আ’, ‘অ’, ‘অন্ত’, আর ‘অক’ প্রত্যয়। ‘হাত’, ‘মনু’ নাম-প্রকৃতি এবং চল্’, ‘কৃ’ ক্রিয়াপ্রকৃতি।

প্রত্যয় প্রধানত দুই প্রকার। যেমন : কৃৎপ্রত্যয় ও তদ্ধিত প্রত্যয়।

প্রত্যয়ের উপাদান বা বিষয়

প্রত্যয়ের মাধ্যমে শব্দগঠনের ক্ষেত্রে ‘প্রকৃতি’ ও ‘প্রাতিপদিক’ এ দুটি উপাদান বা বিষয় সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন।

১. প্রকৃতি : শব্দ বা ধাতুর মূলই হলো প্রকৃতি। অর্থাৎ ‘মৌলিক শব্দের যে অংশকে আর কোনোভাবেই বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয় তাকে বলা হয় প্রকৃতি।’ অথবা ভাষায় যার বিশ্লেষ সম্ভব নয়, এমন মৌলিক শব্দকে প্রকৃতি বলে। শব্দ কিংবা পদ থেকে প্রত্যয় ও বিভক্তি অপসারণ করলে প্রকৃতি অংশ পাওয়া যায়। ‘প্রকৃতি’ কথাটি বোঝানোর জন্য প্রকৃতির আগে √চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। প্রকৃতি চিহ্নটি ব্যবহার করলে ‘প্রকৃতি’ শব্দটি লেখার প্রয়োজন হয় না। যেমন : √পড়+উয়া=পড়–য়া। √নাচ্+উনে= নাচুনে।

প্রকৃতি দুই প্রকার। যেমন:

ক. ক্রিয়াপ্রকৃতি : প্রত্যয়নিষ্পন্ন শব্দের বিশ্লেষণে মৌলিক ভাবদ্যোতক যে অংশ পাওয়া যায় তা যদি অবস্থান, গতি বা অন্য কোনো প্রকারের ক্রিয়া বোঝায় তাকে ক্রিয়াপ্রকৃতি বলে। যেমন: √চল্ (চলন্ত=চল্+অন্ত-প্রত্যয়), √পড়্, √রাখ্, √দৃশ্, √কৃ।

খ. নামপ্রকৃতি বা সংজ্ঞা প্রকৃতি : প্রত্যয়নিষ্পন্ন শব্দের বিশে−ষণে মৌলিক ভাবদ্যোতক যে অংশ পাওয়া যায় তা যদি কোনো দ্রব্য, জাতি, গুণ বা কোনো পদার্থকে বোঝায় তাকে নামপ্রকৃতি বলে। যেমন : মা, চাঁদ, গাছ, হাতল (হাত+অল-প্রত্যয়)।

প্রত্যয়ে প্রাতিপদিক

বিভক্তিহীন নাম শব্দকে প্রাতিপদিক বলে। যেমন : হাত, বই, কলম, মাছ ইত্যাদি।

১. ক্রিয়াবাচক শব্দমূলের ক্ষেত্রে ধাতু চিহ্ন (√) ব্যবহৃত হয়। যেমন :

√চল্+অন্ত=চলন্ত      √পঠ্+অক=পাঠক

২. ‘ধাতু’ ও ‘প্রত্যয়’ উভয়কে একসঙ্গে উচ্চারণ করার সময় ধাতুর অন্ত্যধ্বনি এবং প্রত্যয়ের আদিধ্বনি অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের প্রভাবে সমতা প্রাপ্ত হয়। যেমন :

√কাঁদ্+না= কান্না         √রাঁধ্+না=রান্না

উলি−খিত উদাহরণে ধাতুর অন্ত্যধ্বনি ‘দ্’ ও ‘ধ্’ প্রত্যয়ের আদিধ্বনি ‘ন’-এর সমতা প্রাপ্ত হয়েছে।

প্রত্যয়ে কৃদন্ত পদ

কৃৎপ্রত্যয় সাধিত পদটিকে বলা হয় কৃদন্ত পদ। যেমন : √পড়+উয়া=পড়–য়া  √নাচ্+উনে=নাচুনে

এখানে ‘পড়–য়া’ ও ‘নাচুনে’ কৃদন্ত পদ।

তৎসম বা সংস্কৃত প্রকৃতির সঙ্গেও অনুরূপভাবে কৃৎপ্রত্যয় যোগে কৃদন্তপদ সাধিত হয়। যেমন :

√গম্+অন=গমন       √কৃ+তব্য=কর্তব্য

প্রত্যয়ে গুণ ও বৃদ্ধি

কোনো কোনো ক্ষেত্রে কৃৎপ্রত্যয় যোগ করলে কৃৎপ্রকৃতির আদিস্বর পরিবর্তিত হয়। এ পরিবর্তনকে বলা হয় গুণ ও বৃদ্ধি। যেমন :

১. গুণ :

ক) ‘ই বা ঈ’ স্থলে ‘এ’ হয়। যেমন : চিন্+আ=চেনা   নী+আ=নেওয়া

খ) ‘উ বা ঊ’ স্থলে ‘ও’ হয়। যেমন : ধু+আ=ধোয়া

গ) ‘ঋ’ স্থলে ‘র্অ’ হয়।     যেমন : কৃ+তা=করতা>কর্তা

২. বৃদ্ধি

ক) ‘অ’ স্থলে ‘আ’ হয়। যেমন : পচ্+অ (ণক)= পাচক

খ) ই বা ঈ স্থলে ‘ঐ’ হয়। যেমন : শিশু+অ(ঞ্চ)= শৈশব

গ) উ বা ঊ স্থলে ‘ঔ’ হয়। যেমন : যুব+অন = যৌবন

ঘ) ঋ স্থলে ‘র্আ’ হয়। যেমন : কৃ+ঘ্যণ = কার্য

কৃৎপ্রত্যয়

ধাতুর পরে যে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে তাকে কৃৎপ্রত্যয় বলে। যেমন : √ধর+আ=ধরা √ডুব্+উরি=ডুবুরি √দৃশ্+য=দৃশ্য

কৃৎপ্রত্যয় দুপ্রকার। যেমন :

ক) সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় : সংস্কৃত নিয়মানুযায়ী ঐ ভাষার ধাতুর সঙ্গে যেসব সংস্কৃত প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠিত হয় তাদের সংস্কৃত কৃৎপ্রত্যয় বলে। যেমন : √কৃ+তব্য=কর্তব্য, √দৃশ্+অন =দর্শন ইত্যাদি।

খ) বাংলা কৃৎপ্রত্যয় : সংস্কৃত বা তৎসম ধাতু বিবর্জিত বাংলা ধাতুর সঙ্গে প্রাকৃত ভাষা থেকে আগত যেসব প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠিত হয় তাদের বাংলা কৃৎপ্রত্যয় বলে। যেমন : √ নাচ্+অন=নাচন, √ডুব্+অন্ত=ডুবন্ত ইত্যাদি।

কৃৎপ্রত্যয়ের বিস্তারিত আলোচনা

তোমরা লক্ষ করেছ যে, ক্রিয়ামূলকে বলা হয় ধাতু আর ধাতুর সঙ্গে পুরুষ ও কালবাচক বিভক্তি যোগ করে গঠন করা হয় ক্রিয়াপদ। ধাতুর সঙ্গে যখন কোনো ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি যুক্ত হয়ে বিশেষ্য বা বিশেষণ পদ তৈরি হয় তখন (১) ক্রিয়ামূল বা ধাতুকে বলা হয় ক্রিয়াপ্রকৃতি বা প্রকৃতি আর (২) ক্রিয়াপ্রকৃতির সঙ্গে যে ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি যুক্ত হয় তাকে বলে কৃৎপ্রত্যয়। যেমন : √চল্ (ক্রিয়াপ্রকৃতি)+অন (কৃৎপ্রত্যয়)=চলন (বিশেষ্য পদ)। √চল্ (ক্রিয়াপ্রকৃতি)+অন্ত (কৃৎপ্রত্যয়)=চলন্ত (বিশেষণ পদ)।

কৃৎপ্রত্যয়যোগে বাংলাশব্দ গঠন

(০) শূন্য-প্রত্যয় : কোনো প্রকার প্রত্যয়-চিহ্ন ব্যতিরেকেই কিছু ক্রিয়া-প্রকৃতি বিশেষ্য ও বিশেষণ পদ রূপে বাক্যে ব্যবহৃত হয়।

এরূপ স্থলে (০) শূন্য প্রত্যয় ধরা হয়। যেমন : এ মোকদ্দমায় তোমার জিত্ হবে না, হার-ই হবে। গ্রামে খুব ধর পাকড় চলছে।

অ-প্রত্যয় : কেবল ভাববাচ্যে অ-প্রত্যয় যুক্ত হয়। যেমন :   √ধর+অ=ধর      √মার+অ=মার

আধুনিক বাংলায় অ-প্রত্যয় সর্বত্র উচ্চারিত হয় না। যেমন : √হার+অ=হার     √জিত্+অ=জিত

কোনো কোনো সময় অ-প্রত্যয়যুক্ত কৃদন্ত শব্দের দ্বিত্ব প্রয়োগ হয়। যেমন : (আসন্ন সম্ভাব্যতা অর্থে দ্বিত্বপ্রাপ্ত)

√কাঁদ্+অ=কাঁদকাঁদ (চেহারা)। এরূপ : √পড়+অ=পড়পড়    √মর+অ=মরমর (অবস্থা)

ইত্যাদি কখনো কখনো দ্বিত্বপ্রাপ্ত কৃদন্ত পদে উ-প্রত্যয় হয়। যেমন : √ডুব্+উ=ডুবুডুবু       √উড়+উ=উড়–উড়–

অন্-প্রত্যয় : ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য গঠনে ‘অন’ প্রত্যয়ের ব্যবহার হয়। যেমন : √কাঁদ্+অন=কাঁদন (কান্নার ভাব)।

এরূপ : নাচন, বাড়ন, ঝুলন, দোলন।

বিশেষ নিয়ম

ক) আ-কারান্ত ধাতুর সঙ্গে অন্ স্থলে ‘ওন’ হয়। যেমন : √খা+অন=খাওন   √ছা+অন=ছাওন   √দে+অন=দেওন

খ) আ-কারান্ত প্রযোজক (নিজন্ত) ধাতুর পরে ‘আন’ প্রত্যয় যুক্ত হলে ‘আনো’ হয়। যেমন : √জানা+আন=জানানো।

এরূপ : শোনানো, ভাসানো।

৪. অনা-প্রত্যয়: √দুল্+অনা=দুলনা>দোলনা       √খেল+অনা= খেলনা

৫. অনি, (বিকল্পে) উনি-প্রত্যয় :  √বাঁধ্+অনি = বাঁধনি>বাঁধুনি √আঁট+ অনি= আঁটনি >আঁটুনি

৬. অন্ত-প্রত্যয় : বিশেষণ গঠনে ‘অন্ত’ প্রত্যয় হয়। যেমন: √উড়+অন্ত=উড়ন্ত    √ডুব্+অন্ত=ডুবন্ত

৭. অক-প্রত্যয় : √মুড়+অক=মোড়ক   √ঝল্+অক=ঝলক

৮. আ-প্রত্যয় : বিশেষ্য ও বিশেষণ গঠনে ‘আ’ প্রত্যয় হয়। যেমন : √পড়+আ=পড়া (পড়া বই)

এরূপ : রাঁধ (বিশেষ্য), রাঁধা (বিশেষণ), কেনা, বেচা, ফোটা

৯. আও-প্রত্যয় : ভাববাচক বিশেষ্য গঠনে ‘আও’ প্রত্যয় যুক্ত হয়। যেমন :    √পাকড়+আও=পাকড়াও       √চড়+আও=চড়াও

১১. আন (আনো) প্রত্যয় : বিশেষ্য গঠনে প্রযোজক ধাতু ও কর্মবাচ্যের ধাতুর পরে ‘আন/আনো’ প্রত্যয় হয়। যেমন : √চাল্=আন=চালান/চালানো   √মান্+আন=মানান/মানানো

১২. আনি-প্রত্যয় : বিশেষ্য গঠনে প্রযুক্ত হয়। যেমন :

√জান্+আনি=জানানি     √শুন্+আনি=শুনানি  √উড়+আনি= উড়ানি  √উড়+উনি=উড়িন

১৩. আরি বা বিকল্পে রি/উরি- প্রত্যয় : √ডুব্+উরি=ডুবুরি। এরূপ : ধুনারি।

১৪. আল-প্রত্যয় : √মাত+আল=মাতাল   √মিশ্+আল =মিশাল

১৫. ই-প্রত্যয় : বিশেষ্য গঠনে ‘ই’ প্রত্যয় প্রযুক্ত হয়। যেমন: √ভাজ্+ই= ভাজি   √বেড়+ই=বেড়ি

১৬. ইয়া>ইয়ে-প্রত্যয় : বিশেষণ গঠনে ইয়া/ ইয়ে প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়। যেমন :

√মর+ইয়া=মরিয়া (মরতে প্রস্তুত)     √বল্+ইয়ে=বলিয়ে (বাকপটু)।

এরূপ : নাচিয়ে, পাইয়ে, লিখিয়ে, বাজিয়ে, কইয়ে ইত্যাদি।

১৭. উ-প্রত্যয় : বিশেষ্য ও বিশেষণ গঠনে ‘উ’ প্রত্যয়ের প্রয়োগ হয়। যেমন :

√ডাক্+উ=ডাকু      √ঝাড়+উ=ঝাড়–     √উড়+উ=উড়– (দ্বিত্ব উড়–উড়–)

১৮. ‘উয়া’ বিকল্পে ‘ও’- প্রত্যয় : বিশেষ্য বিশেষণ গঠনে ‘উয়া’ এবং ‘ও’ প্রত্যয় হয়। যেমন :

√পড়+উয়া=পড়–য়া>পড়ো      √উড়+উয়া=উড়–য়া>উড়ো     √উড়+ও=উড়ো (চিঠি)

১৯. তা-প্রত্যয় : বিশেষণ গঠনে ‘তা’ প্রত্যয় হয়। যেমন : √ফির+তা=ফিরতা>ফেরতা   √পড়+তা=পড়তা    √বহ্+তা= বহতা

২০. তি-প্রত্যয় : বিশেষ্য ও বিশেষণ গঠনে ‘তি’ প্রত্যয় হয়। যেমন : √ঘাট্+তি=ঘাটতি    √বাড়+তি=বাড়তি

এরূপ : কাটতি, উঠতি ইত্যাদি।

২১. না-প্রত্যয় : বিশেষ্য গঠনে ‘না’ প্রত্যয় যুক্ত হয়। যেমন: √কাঁদ্+না=কাঁদনা> কান্না, √রাঁধ্+না=রাঁধনা>রান্না। এরূপ: ঝরনা

কৃৎপ্রত্যয়যোগে সংস্কৃতশব্দ গঠন

অনট্-প্রত্যয় : (‘ট’ ইৎ (বিলুপ্ত) হয়, ‘অন’ থাকে)। যেমন :

√নী+অনট্=√নী+অন>নে+অন (গুণসূত্রে)=নয়ন  √শ্রু+ অনট্=√শ্রু+অন(গুণ ও সন্ধির ফলে)=শ্রবণ

এরূপ : স্থান, ভোজন, নর্তন, দর্শন ইত্যাদি।

ক্ত-প্রত্যয় (‘ক্’ ইৎ ‘ত’ থাকে) : √জ্ঞা+ক্ত (জ্ঞা+ত) =জ্ঞাত √খ্যা+ক্ত=খ্যাত।

বিশেষ নিয়ম

ক) ক্ত-প্রত্যয় যুক্ত হলে নিম্নলিখিত ধাতুর অন্ত্যস্বর ‘ই’ কার হয়। যেমন :  √পঠ্+ক্ত +(পঠ্+ই+ত) =পঠিত।

এরূপ : লিখিত, বিদিত, বেষ্টিত, চলিত, পতিত, লুণ্ঠিত, ক্ষুধিত, শিক্ষিত ইত্যাদি।

খ) ক্ত প্রত্যয় যুক্ত হলে, ধাতুর অন্তস্থিত ‘চ’ ও ‘জ’ স্থলে ‘ক’ হয়। যেমন : √সিচ্+ক্ত=(সিক্+ত) সিক্ত। এরূপ : √মুচ্+ক্ত=মুক্ত, √ভুজ্+ক্ত=ভুক্ত।

গ) এ ছাড়া ক্ত প্রত্যয় পরে থাকলে ধাতুর মধ্যে বিভিন্ন রকমের পরিবর্তন হয়। এখানে এরূপ কয়েকটি প্রকৃতি-প্রত্যয়ের উদাহরণ দেওয়া হলো। যেমন :

√গম্+ক্ত=গত  √গ্রন্থ+ক্ত=গ্রথিত  √ চুর+ক্ত=চূর্ণ  √ছিদ্+ক্ত=ছিন্ন  √জন্+ক্ত=জাত   √দা+ক্ত=দত্ত

√দহ্+ক্ত=দগ্ধ  √বচ্+ক্ত+উক্ত     √বপ্+ক্ত=উপ্ত √মুহ্+ক্ত=মুগ্ধ  √যুধ্+ক্ত=যুদ্ধ  √লভ্+ক্ত=লব্ধ

√স্বপ্+ক্ত=সুপ্ত     √সূজ্+ক্ত=সৃষ্ট       √হন্+ক্ত=হত

৩. ক্তি-প্রত্যয় (‘ক’ ইং ‘তি’ থাকে) : √গম্+ক্তি/তি=গতি (এখানে ‘ম’ লোপ হয়েছে)।

ক) ক্তি-প্রত্যয় যোগ করলে কোনো কোনো ধাতুর অন্ত ব্যঞ্জনের লোপ হয়। যেমন :

√মন্+ক্তি=মতি       √রম্+ ক্তি= রতি

খ) কোনো কোনো ধাতুর উপধা অ-কারের বৃদ্ধি হয় অর্থাৎ আ-কার হয়। যেমন :

√শ্রম্+ক্তি=শ্রান্তি (সন্ধিসূত্রে ম>না, √শম্+ক্তি=শান্তি

গ) ‘চ’ এবং ‘জ’ স্থলে ‘ক’ হয়। যেমন:  √বচ্+ক্তি=উক্তি √মুছ+ক্তি =মুক্তি √ভজ্+ক্তি=ভক্তি

ঘ) নিপাতনে সিদ্ধ : √গৈদ+ক্তি=গীতি  √সিধ্+ক্তি=সিদ্ধি    √বুধ্+ক্তি=বুদ্ধি  √শক্+ক্তি=শক্তি

৪. তব্য ও অনীয় প্রত্যয় : কর্ম ও ভাববাচ্যের ধাতুর পরে ক) তথ্য ও খ) অনীয় প্রত্যয় হয়।

ক) তব্য:   √কৃ+তব্য=কর্তব্য     √দা+তব্য=দাতব্য     √পঠ্+তব্য=পঠিতব্য

খ) অনীয় : √কৃ+অনীয়=করণীয়   √রক্+অনীয়=রক্ষণীয়

এরূপ : দর্শনীয়, পানীয়, শ্রবণীয়, পালনীয় ইত্যাদি।

৫. তৃচ্-প্রত্যয় (‘চ’ ইৎ ‘তৃ’ থাকে) : প্রথমা একবচনে ‘তৃ’ স্থলে ‘তা’ হয়।

যেমন : √দা+তৃচ্/তৃ/তা=দাতা   √মা+তৃচ্=মাতা  √ক্রী+তৃচ্=ক্রেতা

বিশেষ নিয়মে : √যুধ্+তৃচ/তা=যোদ্ধা

৬. ণক-প্রত্যয় (‘ণ’ ইৎ ‘অক’ থাকে) : √পঠ্+ণক/অক=পাঠক

মূল স্বরের বৃদ্ধি হয়ে ‘অ’ স্থানে ‘আ’ হয়েছে। যেমন : √নী=ণক=(নৈ+অক=প্রথম স্বরের বৃদ্ধি) নায়ক, √গৈ+ণক=গায়ক, √লিখ্+ণক= লেখক ইত্যাদি

বিশেষ নিয়ম :

ক) ণক-প্রত্যয় পরে থাকলে নিজন্ত ধাতুর ‘ই’ কারের লোপ হয়। যেমন: √পুঁজি+ণক=পুজক

এরূপ : জনক, চালক, স্তাবক

খ) আ-কারান্ত ধাতুর পরে ণক প্রত্যয় হলে ধাতুর শেষে ‘য়’ আসে। যেমন : √দা+ণক=দায়ক   বি-√ধা+ণক=বিধায়ক

৭. ঘ্যণ-প্রত্যয় [ঘ, ণ-ইৎ, য (য-ফলা) থাকে] : কর্ম ও ভাববাচ্যে ঘ্যণ্ হয়। যেমন : √কৃ+ঘ্যণ্=কায্য>কার্য, √ধৃ+ঘ্যণ্=ধায্য। এরূপ : পরিহার্য, বাচ্য, ভোজা, যোগ্য, হাস্য ইত্যাদি। (দ্রষ্টব্য : আধুনিক বাংলা বানানে রেফ+য+য=র্য্য হয় না, র্য হয়।)

৮. য-প্রত্যয় : কর্ম ও ভাববাচ্যে যোগ্যতা ও ঔচিত্য অর্থে ‘ষ’ প্রত্যয় যুক্ত হয়। ‘ষ’ যুক্ত হলে আ-কারান্ত ধাতুর আ-কার স্থলে এ- কারান্ত হয় এবং ‘ষ’ ‘য়’ হয়। যেমন : √দা+য= দা>দে+ষ>য়= দেয়। √হা+ষ=হেয়।

এরূপ : বিধেয়, অজেয়, পরিমেয়, অনুমেয় ইত্যাদি।

৯. ণিন-প্রত্যয় (ণ ইৎ, ইণ্ থাকে, ইন্ ‘ঈ’- কার হয়) : √গ্রহ+ণিন=গ্রাহী, √পা+ণিন=পায়ী। এরূপ : কারী, দ্রোহী, সত্যবাদী, ভাবী, স্থায়ী গামী। কিন্তু ‘দিন’ যুক্ত হলে ‘হন’ ধাতুর স্থলে ‘ঘাত’ হয়। যেমন : আত্ম-√হণ্+ণিন=আত্মবাতী

১০. ইন্ প্রত্যয় (ইন্) =ঈ=কার হয়) : শ্রম্+ইন্=শ্রমী।

১১. অল্-প্রত্যয় (ল ইৎ, অ থাকে) : √জি+অল্=জয়      √ক্ষি+অল্=ক্ষয়

এরূপ : ভয়, নিচয়, বিনয়, ভেদ, বিলয়।

ব্যতিক্রম: √হণ্+অল্=বধ।

কৃদন্ত বিশেষণ গঠনে কতিপয় কৃৎপ্রত্যয়

১. ইষ্ণু-প্রত্যয় : √চল্+ইষ্ণু=চলিষ্ণু। এরূপ : ক্ষয়িষ্ণু, বর্ধিষ্ণু।

২. বর-প্রত্যয় : √ঈশ।+বর=ঈশ্বর √তাস্+বর=ভাস্বর

এরূপ : নশ্বর, স্বাবর।

৩. র-প্রত্যয় : √হিন+স। +র=হিংস্র     √নম্+র=নম্র

৪. উক/উক-প্রত্যয় : √ভু+উক=(ভৌ+উক)=ভাবুক √জাগৃ+উক=(জাগর+ঊক) জাগরূক

৫. শানচ্ - প্রত্যয় (‘শ’ ও ‘চ’ ইৎ ‘আন’ বিকল্পে ‘মান’ থাকে) : √দীপ্+শানচ্=দীপ্যমান।

এরূপ : √চল্+শানচ্= চলমান, √বৃধ্+শানচ্=বধরমান।

৬. ঘঞ- প্রত্যয় [(কৃদন্ত বিশেষ্য গঠনে), ঘৃ ও ঞ ইৎ, ‘অ’ থাকে] :

√বস্+ঘঞ্=বাস √যুজ্+ঘঞ=যোগ   √ক্রুধ্+ ঘঞ্=ক্রোধ √খুদ্+ঘঞ্=খেদ √ভিদ্+ঘঞ্=ভেদ

বিশেষ নিয়ম : √ত্যজ্+ঘঞ্=ত্যাগ  √পচ্+ঘঞ্=পাক  √শুচ্+ ঘঞ্= শোক    

কিন্তু √নন্দি+অন=নন্দন। এক্ষেত্রে আ যোগে ‘নন্দনা’ হয় না।

তদ্ধিত প্রত্যয়ের সংজ্ঞা ও প্রকরণ

শব্দের পরে যে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে তাকে তদ্ধিত প্রত্যয় বলে। যেমন : বাঘ+আ=বাঘা সোনা+আলি =সোনালি সপ্তাহ+ইক=সাপ্তাহিক ইত্যাদি।

শব্দের সঙ্গে (শেষে) যেসব প্রত্যয় যোগে নতুন শব্দ গঠিত হয় তাদের তদ্ধিত প্রত্যয় বলা হয়। যেমন : ১. ছেলেটি বড় লাজুক ২. বড়াই করা ভালো না ৩. ঘরামি ডেকে ঘর ছেয়ে নে

ওপরের ‘লাজুক’, ‘বড়াই’ শব্দগুলো গঠিত হয়েছে এভাবে : লাজুক=লাজ+উক; বড়াই=বড়+আই, ঘরামি=ঘর+আমি। ‘লাজ’ ‘বড়’ ও ‘ঘর’ শব্দগুলোর পরে যথাক্রমে ‘উক’, ‘আই’ ও ‘আমি’ (প্রত্যয়) যোগ করে নতুন শব্দ গঠিত হয়েছে। এখানে ‘লাজ’ ‘বড়’ ও ‘ঘর’ শব্দগুলোর সাথে কোনো শব্দ/ বিভক্তি যুক্ত হয়নি। বিভক্তিহীন নাম শব্দকে বলা হয় প্রাতিপদিক। প্রাতিপদিক তদ্ধিত প্রত্যয়ের প্রকৃতি বলে প্রাতিপদিককে নামপ্রকৃতিও বলা হয়। ধাতু যেমন কৃৎপ্রত্যয়ের প্রকৃতি তেমনি প্রাতিপদিকও তদ্ধিত প্রত্যয়ের প্রকৃতি। প্রত্যয় যুক্ত হলে ধাতুকে বলা হয় ক্রিয়াপ্রকৃতি এবং প্রাতিপদিককে বলা হয় নামপ্রকৃতি। তদ্ধিত প্রত্যয়গুলো বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়।

বাংলা ভাষায় তদ্ধিত প্রত্যয় তিন প্রকার। যেমন :

ক. সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয় : যে তদ্ধিত প্রত্যয় সংস্কৃত বা তৎসম শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে তাকে সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয় বলে। যেমন : মনু+ষ্ণ=মানব; লোক+ষ্ণিক=লৌকিক ইত্যাদি।

খ. বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয় : বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত সংস্কৃত ও বিদেশি প্রত্যয় ছাড়া বাকি সব প্রত্যয়কে বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয় বলে। যেমন : বাঘ+আ=বাঘা; ঘর+আমি=ঘরামি ইত্যাদি।

গ. বিদেশি তদ্ধিত প্রত্যয় : শব্দের শেষে যেসব বিদেশি প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে তাদের বিদেশি তদ্ধিত প্রত্যয় বলে। যেমন: ডাক্তার+খানা=ডাক্তারখানা, ধড়ি+বাজ= ধড়িবাজ।

সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়

ষ্ণ, ষ্ণি, ষ্ণ্য, ষ্ণিক, ইত, ইমন, ইল, ইষ্ট, ঈন, তর, তম, তা, ত্ব, নীন, নীয়, বতুপ্, বিন, র, ল প্রভৃতি সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়যোগে যে সমস্ত শব্দ গঠিত হয় সেগুলো বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হয়। এখানে কতগুলো সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়ের উদাহরণ দেয়া হলো।

যে শব্দের সঙ্গে ষ্ণ (অ)-প্রত্যয় যুক্ত হয়, তার মূল স্বরের বৃদ্ধি হয়। যেমন : নগর+ষ্ণ=নাগর, মধুর+ষ্ণ/য=মাধুর্য।

বৃদ্ধি :

১. ‘অ’ স্থানে আ হয়      ২. ‘ই বা ঈ’ স্থানে ঐ হয়    ৩. ‘উ বা ঊ’ স্থানে ঔ হয়    

৪. ‘ঋ’ স্থানে আর হয় -এসব হওয়াকে বৃদ্ধি বলে

যে শব্দের সঙ্গে ষ্ণ (অ) প্রত্যয় যুক্ত হয়, তার প্রাতিপদিকের অন্ত্যস্বরের উ-কারও ও-কারে পরিণত হয়। ও+অ সন্ধিতে ‘অব’ হয়। যেমন :

গুরু+ষ্ণ=গৌরব   লঘু+ষ্ণ=লাঘব   শিশু+ ষ্ণ+ শৈশব মধু+ষ্ণ=মাধব       মনু+ষ্ণ=মানব

দুটি শব্দের দ্বারা গঠিত সমাসবদ্ধ শব্দের অথবা উপসর্গযুক্ত শব্দের সঙ্গে তদ্ধিত প্রত্যয় যুক্ত হয়ে উপসর্গসহ শব্দের বা শব্দ দুটির মূলস্বরের বৃদ্ধি হয়। যেমন :

পরলোক+ষ্ণিক=পারলৌকিক সুভগ+ষ্ণ্য=সৌভাগ্য পঞ্চভূত+ষ্ণিক=পাঞ্চভৌতিক  সর্বভূমি+ষ্ণ=সার্বভৌম

ব্যাতিক্রম : ‘বর্ষ’ শব্দ পরপদ হলে পূর্বপদের সংখ্যাবাচক শব্দের মূল স্বরের বৃদ্ধি হয় না। যেমন : দ্বিবর্ষ+ ষ্ণিক=দ্বিবার্ষিক। সংখ্যাবাচক শব্দ না থাকলেও নিয়মমতো মূল স্বরের বৃদ্ধি হয়। যেমন : বর্ষ+ষ্ণিক=বার্ষিক

৪. ‘য’ প্রত্যয় যুক্ত হলে প্রাতিপদিকের অস্তে স্থিত অ, আ, ই এবং ঈ-এর লোপ হয়। যেমন :

সম্+য=সাম্য কবি+ য= কাব্য      মধুর+য=মাধুর্য         প্রাচী+য=প্রাচ্য

ব্যতিক্রম : সভা+য=সভ্য (‘সাভ্য’ নয়)।

কয়েকটি সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়ের নিয়ম

১. ইত- প্রত্যয় : উপকরণজাত বিশেষণ গঠনে : কুসুম+ইত= কুসুমিত, তরঙ্গ+ইত=তরঙ্গিত, কণ্টক+ইত=কণ্টকিত

২. ইমন্-প্রত্যয় : বিশেষ্য গঠনে : নীল+ইমন=নলিমা, মহৎ+ইমন=মহিমা

৩. ইল্-প্রত্যয় : উপকরণজাত বিশেষণ গঠনে : পঙ্ক+ইল্=পঙ্কিল, উর্মি+ইল্=উর্মিল, ফেন+ইল্=ফেনিল

৪. ইষ্ঠ-প্রত্যয় : অভিশায়নে : গুরু+ইষ্ঠ=গরিষ্ঠ, লঘু+ইষ্ঠ=লঘিষ্ঠ

৫. ইন্ (ঈ)-প্রত্যয় : সাধারণ বিশেষণ গঠনে : জ্ঞান+ ইন্=জ্ঞানিন্, সুখ+ইন্=সুখিন্, গুণ+ইন্= গুণিন্, মান+ইন্= মানিন্

সমাসে ইন্ প্রত্যয়ান্ত শব্দের পরে তৎসম শব্দ থাকলে ইন্ প্রত্যয়ান্ত শব্দের ন্ লোপ পায়। যেমন : গুণিগণ, সুখিগণ, মানিজন

কর্তৃকারকের একবচনে ইন্ প্রত্যয় ঈ রূপ গ্রহণ করে। যেমন : জ্ঞান+ইন্ (ঈ) -জ্ঞানী, গুণ+ইন্(ঈ) গুণী

৬. তা ও ত্ব-প্রত্যয় : বিশেষ্য গঠনে : বন্ধু+তা=বন্ধুতা, শত্র“+তা=শত্র“তা, বন্ধু+ত্ব=বন্ধুত্ব, গুরু+ ত্ব= গুরুত্ব, ঘন+ত্ব=ঘনত্ব, মহৎ+ত্ব=মহত্ব

৭. তর ও তম-প্রত্যয় : অতিশায়নে : মধুর-মধুরতর, মধুরতম। প্রিয়-প্রিয়তর, প্রিয়তম

৮. নীন (ঈন্)-প্রত্যয় : তৎসম্পর্কিত অর্থে বিশেষণ গঠনে : সর্বজন+নীন=সর্বজনীন, কুল+নীন=কুলীন, নব+নীন= নবীন

৯. নীয় (ঈয়)-প্রত্যয় : বিশেষণ গঠনে : জল+নীয়=জলীয়, বায়ু+নীয়-বায়বীয়, বর্ষ+ নীয়= বর্ষীয়

বিশেষ নিয়মে : পর-পরকীয়, রাজা-রাজকীয়

১০. বতুপ্ (বৎ) এবং মতুপ্ (মৎ) -প্রত্যয় [প্রথমার এক বচনে যথাক্রমে ‘বান্ এবং ‘মান্’ হয়] : বিশেষণ গঠনে : গুণ+বতুপ্=গুণবান, দয়া+বতুপ্=দয়াবান। শ্রী+মতুপ্= শ্রীমান, বুদ্ধি+মতুপ=বুদ্ধিমান

১১. বিন (বী) প্রত্যয় : আছে অর্থে বিশেষণ গঠনে : মেধা+বিন্=মেধাবী, মায়া+বিন্=মায়াবী, তেজঃ+বিন্=তেজস্বী, যশঃ+বিন্=যশস্বী

১২. র-প্রত্যয় : বিশেষ্য গঠনে : মধু+র=মধুর, মুখ+র= মুখর

১৩. ল-প্রত্যয় : বিশেষ্য গঠনে : শীত+ল=শীতল, বৎস+ল= বৎসল

১৪. ষ্ণ (অ) প্রত্যয়

ক) অপত্য অর্থে : মনু+ষ্ণ=মানব, যদু+ষ্ণ=যাদব।

খ) উপাসক অর্থে : শিব+ষ্ণ=শৈব, জিন+ষ্ণ=জৈন। এরূপ : শক্তি-শাক্ত, বৃদ্ধ-বৌদ্ধ, বিষ্ণু-বৈষ্ণব

গ) ভাব অর্থে: শিশু+ষ্ণ=শৈশব, গুরু+ষ্ণ=গৌরব, কিশোর+ ষ্ণ=কৈশোর

ঘ) সম্পকর বোঝাতে : পৃথিবী+ষ্ণ=পার্থিব, দেব+ষ্ণ=দৈব, চিত্র (একটি নক্ষত্রের নাম)+ষ্ণ=চৈত্র

নিপাতনে সিদ্ধ : সূর্য+ষ্ণ=সৌর (সাধারণ নিয়মে সুর+ষ্ণ (অ) =সৌর

১৫. ষ্ণ্য

ক) অপত্যার্থে : মনুঃ+ষ্ণ্য=মনুষ্য, জমদগ্নি+ষ্ণ্য=জামদগ্ন্য।

খ) ভাবার্থে : সুন্দর+ষ্ণ্য=সৌন্দর্য, শূর+ষ্ণ্য=শৌর্ষ। ধীর+ষ্ণ্য=ধৈর্য, কুমার+ষ্ণ্য=কৌমার্য

গ) বিশেষণ গঠনে : পর্বত+ষ্ণ্য=পার্বত্য, বেদ+ষ্ণ্য=বৈদ্য।

১৬. ষ্ণি (ই)-প্রত্যয় : অপত্য অর্থে : রাবণ+ষ্ণি=রাবণি (রাবণের পুত্র), দশরথ+ষ্ণি=দাশরথি

১৭. ষ্ণিক (ইক)-প্রত্যয়

ক) দক্ষ বা বেত্তা অর্থে : সাহিত্য+ষ্ণিক=সাহিতিক, বেদ+ ষ্ণিক=বৈদিক, বিজ্ঞান+ষ্ণিক=বৈজ্ঞানিক

খ) বিষয়ক অর্থে : সমুদ্র+ষ্ণিক=সামুদ্রিক, নগর-নাগরিক, মাস-মাসিক, ধর্ম-ধার্মিক, সমর-সামরিক, সমাজ-সামাজিক

গ) বিশেষণ গঠনে : হেমন্ত+ষ্ণিক=হৈমন্তিক, অকস্মাৎ +ষ্ণিক=আকস্মিক

১৮. ষ্ণেয় (এর-প্রত্যয় : ভগিনী+ষ্ণেয়=বাগিনেয়, অগ্নি+ ষ্ণেয়=আগ্নেয়, বিমাতৃ (বিমাতা) +ষ্ণেয়=বৈমাত্রেয়

বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয়

১. আ- প্রত্যয়

ক) অবজ্ঞার্থে : চোর+আ=চোরা, কেষ্ট+আ=কেষ্টা

খ) বৃহদার্থে : ডিঙি+আ=ডিঙা (সপ্তডিঙা মধুকর)

গ) সদৃশ্য অর্থে : বাঘ+আ=বাঘা, হাত+আ=হাতা। এরূপ : কাল-কালা (চিকন কালা), কান-কানা

ঘ) ‘তাতে আছে’ বা ‘তার আছে’ অর্থে : জল+আ=জলা, গোদ +আ=গোদা। এরূপ : রোগ-রোগা, চাল-চালা, লুন- লুনা>লোনা

ঙ) সমষ্টি অর্থে : বিশ-বিশা, বাইশ-বাইশা (মাসের বাইশা> বাইশে

চ) স্বার্থে : জট+আ=জটা, চোখ-চোখা, চাক- চাকা

ছ) ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য গঠনে : হাজির- হাজিরা, চাষ-চাষা

জ) জাত ও আগত অর্থে : মহিষ, ভইস-ভয়সা (ঘি), দখিন-দখিনা>দখনে (হাওয়া)

২. আই-প্রত্যয়

ক) ভাববাচক বিশেষ্য গঠনে : বড়+আই=বড়াই, চড়া+আই= চড়াই

খ) আদরার্থে : কানু+আই=কানাই, নিম+আই=নিমাই

গ) স্ত্রী বা পুরুষবাচক শব্দের বিপরীত বোঝাতে : বোন+আই =বোনাই, ননদ - নন্দাই, জেঠা-জেঠাই (মা)

ঘ) সমগুণবাচক বিশেষ্য গঠনে : মিঠা+আই=মিঠাই

ঙ) জাত অর্থে : ঢাকা+আই=ঢাকাই (জামদানি), পাবনা-পাবনাই (শাড়ি)

চ) বিশেষণ গঠনে : চোর-চোরাই (মাল), মোগল-মোগলাই (পরোটা)

৩. আমি/আম/আমো/মি-প্রত্যয়

ক) ভাব অর্থে : ইতর+আমি=ইতরামি, পাগল+আমি=পাগলামি, চোর+আমি=চোরামি, বাঁদর+আমি= বাঁদরামি, ফাজিল+আমো= ফাজলামো।

খ) বৃত্তি (জীবিকা) অর্থে : ঠক+আমো =ঠকামো (ঠেকের বৃত্তি বা ভাব), ঘর+আমি=ঘরামি

গ) নিন্দা জ্ঞাপন : জেঠা+আমি=জেঠামি, ছেলে+আমি =ছেলেমি

৪. ই / ঈ- প্রত্যয়

ক) ভাব অর্থে : বাহাদুর+ই=বাহাদুরি, উমেদার- উমেদারি

খ) বৃত্তি বা ব্যবসায় অর্থে : ডাক্তার-ডাক্তারি, মোক্তার-মোক্তারি, পোদ্দার-পোদ্দারি, ব্যাপার-ব্যাপারি, চাষ-চাষি

গ) মালিক অর্থে : জমিদার-জমিদারি, দোকান-দোকানি।

ঘ) জাত, আগত বা সম্বন্ধ বোঝাতে : ভাগলপুর- ভাগলপুরি, মাদ্রাজ- মাদ্রাজি, রেশম-রেশমি, সরকার-সরকারি (সম্বন্ধ বাচক)

৫. ইয়া>এ-প্রত্যয়

ক) তৎকালীনতা বোঝাতে: সেকাল+এ=সেকেলে, একাল+এ=একেলে,ভাদর+ইয়া=ভাদরিয়া>ভাদুরে (কইমাছ)

খ) উপকরণ বোঝাতে : পাথর-পাথরিয়া>পাথুরে, মাটি- মেটে, বালি-বেলে

গ) উপজীবিকা অর্থে : জাল-জালিয়া>জেলে, মোট- মুটে

ঘ) নৈপুণ্য বোঝাতে : খুন-খুনিয়া>খুনে, দেমাক-দেমাকে, না (নৌকা)-নাইয়া>নেয়ে

ঙ) অব্যয়জাত বিশেষণ গঠনে : টনটন-টনটনে (জ্ঞান), কনকন-কনকনে (শীত), গনগন-গনগনে (আগুন), চকচক-চকচকে (জুতা)

৬. উয়া>ও- প্রত্যয়

ক) রোগগ্রস্ত অর্থে : জ্বর+উয়া=জ্বরুয়া>জ্বরো। বাত+উয়া =বাতুয়া>বেতো (ঘোড়া)

খ) যুক্ত অর্থে : টাক -টেকো

গ) সেই উপকরণে নির্মিত অর্থে : খড়-খড়ো (খড়োঘর)

ঘ) জাত অর্থে : ধান-ধেনো।

ঙ) সংশ্লিষ্ট অর্থে : মাঠ-মেঠো, গাঁ-গাঁইয়া>গেঁয়ো

চ) উপজীবিকা অর্থে : দাঁত-দেঁতো (হাসি), ছাঁদ-ছেঁদো (কথা), তেল-তেলো>তেলা (মাথা), কুঁজ- কুঁজো (লোক)

৭. উ-প্রত্যয় : বিশেষণ গঠনে : ঢাল+উ=ঢালু, কল+উ=কল্

ু৮. উক-প্রত্যয় : বিশেষণ গঠনে : লাজ-লাজুক, মিশ-মিশুক, মিথ্যা-মিথ্যুক

৯. আরি/আরী/আরু-প্রত্যয় : বিশেষণ গঠনে : ভিখ-ভিখারি, শাঁখ-শাঁখারি, বোমা-বোমারু

১০. আলি/আলো/আলি/আলী>এল-প্রত্যয় : বিশেষ্য ও বিশেষণ গঠনে : দাঁত-দাঁতাল, লাঠি-লাঠিয়াল>লেঠেল, চতুর-চতুরালি, ঘটক-ঘটকালি, সিঁদ-সিঁদেল, গাঁজা-গেঁজেল

১১. উরিয়া >উড়িয়া/উড়ে/রে-প্রত্যয় : হাট-হাটুরিয়া>হাটুরে, সাপ-সাপুড়িয়া>সাপুড়ে, কাঠ-কাঠুরিয়া>কাঠুরে

১২. উড়-প্রত্যয় : অর্থহীনভাবে : লেজ-লেজুড়।

১৩. উয়া/ওয়া>ও-প্রত্যয় : সম্পর্কিত অর্থে : ঘর+ওয়া = ঘরোয়া, জল উয়া=জলুয়া>জলো (দুধ)

১৪. আটিয়া / টে-প্রত্যয় : বিশেষণ গঠনে : তামা-তামাটিয়া>তামাটে, ঝগড়া-ঝগড়াটে, ভাড়া-ভাড়াটে, রোগা-রোগাটে

১৫. অট>ট-প্রত্যয় : স্বার্থে : ভরা- ভরাট, জমা-জমাট

১৬. লা-প্রত্যয় :

ক) বিশেষণ গঠনে : মেঘ-মেঘলা       খ) স্বার্থে : এক-একলা, আধ-আধলা

বিদেশি তদ্ধিত প্রত্যয়

১. ওয়ালা>আলা (হিন্দি) : বাড়ি-বাড়িওয়ালা (মালিক অর্থে), দিল্লি-দিল্লিওয়ালা (অধিকারী অর্থে), মাছ-মাছওয়ালা (বৃত্তি অর্থে), দুধ-দুধওয়ালা (বৃত্তি অর্থে)

২. ওয়ান>আন (হিন্দি) : গাড়ি-গাড়োয়ান, দার-দারোয়ান

৩. আনা>আনি (হিন্দি) : মুনশি-মুনশিয়ানা, বিবি-বিবিআনা, হিন্দু-হিন্দুয়ানি

৪. পনা (হিন্দি) : পানি-পানসা>পানসে, এক-একসা, কাল (কাল)-কালসা>কালসে

৫. গর>কর (ফারসি) : কারিগর, বাজিকর, সওদাগর

৬. দার (ফারসি) : তাঁবেদার, খবরদার, বুটিদার, দেনাদার, চৌকিদার, পাহারাদার

৭. বাজ (দক্ষ অর্থে-ফারসি) : কলমবাজ, ধড়িবাজ, ধোঁকাবাজ, গলাবাজ+ই=গলাবাজি (বিশেষ্য)

৮. বন্দি (বন্দ্-ফারসি) : জবানবন্দি, সারিবন্দি, নজরবন্দি, কোমরবন্দি

৯. সই (মতো অর্থে): জুতসই, মানানসই, চলনসই, টেকসই

দ্রষ্টব্য : ‘টিপসই’ ও ‘নামসই’ শব্দ দুটোর ‘সই’ প্রত্যয় নয়। এটি ‘সহি’ (অর্থ-স্বাক্ষর) শব্দ থেকে উৎপন্ন

সন্ধি

সন্নিহিত দুটি ধ্বনির মিলনের নাম সন্ধি। যেমন: আশা+অতীত=আশাতীত। হিম+আলয়=হিমালয়। প্রথমটিতে আ+অ =আ এবং দ্বিতীয়টিতে অ+আ =আ হয়েছে। আবার তৎ+মধ্যে=তন্মধ্যে। এখানে ত+ম=ন্ম হয়েছে।

সন্ধির উদ্দেশ্য ও সুবিধা

সন্ধির উদ্দেশ্য (ক) স্বাভাবিক উচ্চারণে সহজপ্রবণতা এবং (খ) ধ্বনিগত মাধুর্য সম্পাদন করা। যেমন : ‘আশা’ ও ‘অতীত’ উচ্চারণে যে আয়াস প্রয়োজন, ‘আশাতীত’ তার চেয়ে অল্প আয়াসে উচ্চারিত হয়। সেরূপ ‘হিম  আলয়’ বলতে যেরূপ শোনা যায়, ‘হিমালয়’ তার চেয়ে সহজে উচ্চারিত এবং শ্রুতিমধুর। তাই যে ক্ষেত্রে আয়াসের লাঘব হয় কিন্তু ধ্বনি-মাধুর্য রক্ষিত হয় না, সেক্ষেত্রে সন্ধি করার নিয়ম নাই। যেমন : কচু+আনা+আলু=কচ্চালালু হয় না। অথবা কচু+আলু+ আদা=কচ্চাল্বাদা হয় না। আমরা প্রথমে খাঁটি বাংলা শব্দের সন্ধি ও পরে তৎসম (সংস্কৃত) শব্দের সন্ধি সম্বন্ধে আলোচনা করব। উল্লেখ্য, তৎসম সন্ধি মূলত বর্ণ সংযোগের নিয়ম।

বাংলা শব্দের স্বরসন্ধি

১. স্বরধ্বনির সঙ্গে স্বরধ্বনি মিলে যে সন্ধি হয় তাকে স্বরসন্ধি বলে।

২. সন্ধিতে দুটি সন্নিহিত স্বরের একটির লোপ হয়। যেমন : ক) অ+এ=এ   (অ লোপ) : শত+এক=শতেক। এরূপ : কতেক।

খ) আ+আ+আ (একটি আ লোপ) : শাখা+আরি=শাঁখারি। এরূপ : রুপা+আলি=রুপালি।

গ) আ+উ=উ  (আ লোপ) : মিথ্যা+উক=মিথ্যুক। এরূপ : হিংসুক, নিন্দুক ইত্যাদি।

ঘ) ই+এ=ই   (এ লোপ): কুড়ি+এক=কুড়িক। এরূপ: ধনিক, গুটিক ইত্যাদি। আশি+এর=আশির।

এরূপ : নদীর (নদী+এর)।

৩. কোনো কোনো স্থলে পাশাপাশি দুটি স্বরের শেষেরটি লোপ পায়। যেমন : যা+ইচ্ছা+তাই= যাচ্ছেতাই এখানে (আ+ই) এর মধ্যে ‘ই’ লোপ পেয়েছে।

বাংলা শব্দের ব্যঞ্জনসন্ধি

স্বরে আর ব্যঞ্জনে, ব্যঞ্জনে আর স্বরে এবং ব্যঞ্জনে আর ব্যঞ্জনে মিলিত হয়ে যে সন্ধি হয় তাকে ব্যঞ্জনসন্ধি বলে। প্রকৃত বাংলা ব্যঞ্জনসন্ধি সমীভবন/Assimilation-এর নিয়মেই হয়ে থাকে। আর তাও মূলত কথারীতিতে সীমাবদ্ধ।

১. প্রথম ধ্বনি অঘোষ এবং পরবর্তী ধ্বনি ঘোষ হলে দুটি মিলে ঘোষধ্বনি দ্বিত্ব হয়। অর্থাৎ সন্ধিতে ঘোষ ধ্বনির পূর্ববর্তী অঘোষ ধ্বনিও ঘোষ হয়। যেমন : ছোট+দা=ছোড়দা।

২. হলন্তর্ (বন্ধ অক্ষরবিশিষ্ট) ধ্বনির পরে অন্য ব্যঞ্জনধ্বনি থাকলের্  লুপ্ত হয়ে পরবর্তী ধ্বনি দ্বিত্ব হয়। যেমন : র্আ+ না=আন্না, চার+টি=চাট্টি, র্ধ+না=ধন্না, দুর+ছাই=দুচ্ছাই ইত্যাদি।

৩. চ-বর্গীয় ধ্বনির আগে যদি ত-বর্গীয় ধ্বনি পাশাপাশি এলে প্রথমটি লুপ্ত হয়ে পরবর্তী ধ্বনিটি দ্বিত্ব হয়। যেমন : নাত+জামাই=নাজ্জামাই (ত+জ্=জ্জ), জাত=বজ্জাত, হাত+ছানি=হাচ্ছানি ইত্যাদি।

৪. ‘প’-এর পরে ‘চ’ এবং ‘স’-এর পরে ‘ত’ এলে চ ও ত এর স্থলে শ হয়। যেমন : পাঁচ+শ=পাঁশ্শ। সাত+শ=সাশ্শ, পাঁচ+ সিকা=পাঁশ্শিকা।

৫. হলন্ত ধ্বনির সাথে স্বরধ্বনি যুক্ত হলে স্বরের লোপ হয় না। যেমন: বোন+আই=বোনাই, চুন+আরি=চুনারি, তিল+এক= তিলেক, বার+এক=বারেক, তিন+এক=তিনেক।

৬. স্বরধ্বনির পরে ব্যঞ্জনধ্বনি এলে স্বরধ্বনিটি লুপ্ত হয়। যেমন : কাঁচা+কলা=কাঁচকলা, নাতি+ বৌ=নাতবৌ, ঘোড়া+দৌড়=ঘোড়দৌড়, ঘোড়া+গাড়ি=ঘোড়গাড়ি ইত্যাদি।

তৎসম সন্ধির সংজ্ঞা ও প্রকরণ

বাংলা ভাষায় বহু সংস্কৃত শব্দ অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। এসব শব্দই তৎসম (তৎ=তার+ সম= সমান)। তার সমান অর্থাৎ সংস্কৃতের সমান। এ শ্রেণির শব্দের সন্ধি সংস্কৃত ভাষার নিয়মেই সম্পাদিত হয়ে এসেছে। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত তৎসম সন্ধি তিন প্রকার : স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধি ও বিসর্গ সন্ধি

তৎসম স্বরসন্ধি

স্বরধ্বনির সঙ্গে স্বরধ্বনির মিলনের নাম স্বরসন্ধি।

১. অ-কার কিংবা আ-কারের পর অ-কার কিংবা আ-কার থাকলে উভয়ে মিলে আ-কার হয়, আ-কার পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনের সঙ্গে যুক্ত হয়। যেমন :

ক) অ+অ=আ নর+অধম=নরাধম। এরূপ : হিমাচল, প্রাণাধিক, হস্তান্তর, হিতাহিত ইত্যাদি।

খ) অ+আ=আ হিম+আলয়=হিমালয়। এরূপ : দেবালয়, রত্নাকর, সিংহাসন ইত্যাদি।

গ) আ+তা=আ যথা+অর্থ=যথার্থ। এরূপ : আশাতীত, কথামৃত, মহার্ঘ ইত্যাদি।

ঘ) আ+আ=আ বিদ্যা+আলয়=বিদ্যালয়। এরূপ : কারাগার, মহাশা, সদানন্দ ইত্যাদি।

২. অ-কার কিংবা আ-কারের পর ই-কার কিংবা ঈ-কার থাকলে উভয়ে মিলে এ-কার হয়; এ-কার পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনের সঙ্গে যুক্ত হয়। যেমন : অ+ই=এ-শুভ+ইচ্ছা=শুভেচ্ছা, আ+ই=এ-যথা+ইষ্ট= যথেষ্ট, অ+ঈ=এ-পরম+ঈশ=পরমেশ, আ+ঈ=এ-মহা+ঈশ=মহেশ। এরূপ : পূর্ণেন্দু, শ্রবণেন্দ্রিয়, স্বেচ্ছা, নরেশ, রমেশ, নরেন্দ্র ইত্যাদি।

৩. অ-কার কিংবা আ-কারের পর উ-কার কিংবা ঊ-কার থাকলে উভয়ে মিলে ও-কার হয়। ও-কার পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনে যুক্ত হয়। যেমন: অ+উ= ও-সূর্য+উদয়= সূর্যোদয়, আ+উ=ও-যথা+উচিত= যতোচিত, অ+উ=ও-গৃহ+ঊর্ধ্ব= গৃহোর্ধ্ব, আ+উ=ও-গঙ্গা+ঊর্মি=গঙ্গোর্মি। এরূপ: নীলোৎপল, চলোর্মি, মহোৎসব, নবোঢ়া, ফলোদয়, যথোপযুক্ত, হিতোপদেশ, পরোপকার, প্রশ্নোত্তর ইত্যাদি।

৪. অ-কার কিংবা আ-কারের পর ঋ-কার থাকলে উভয়ে মিলে ‘অর’ হয় এবং তা রেফ (র্) রূপে পরবর্তী বর্ণের সাথে লেখা হয়। যেমন : অ+ঋ=র্অ-দেব+ঋষি=দেবর্ষি, আ+ঝ=র্অ-মহা+ঋষি = মহর্ষি। এরূপ : অধমর্ণ, উত্তমর্ণ, সপ্তর্ষি, রাজর্ষি ইত্যাদি।

৫. অ-কার কিংবা আ-কারের পর ‘ঋত’-শব্দ থাকলে (অ, আ+ঋ) উভয় মিলে ‘আর’ হয় এবং বানানে পূর্ববর্তী বর্ণে আ ও পরবর্তী বর্ণে রেফ লেখা হয়। যেমন: অ+ঋ=আর-শীত+ঋত=শীতার্ত, আ+ঋ=আর, তৃষ্ণা+ঋত=তৃষ্ণার্ত। এরূপ : ভয়ার্ত, ক্ষুধার্ত ইত্যাদি।

৬. অ-কার কিংবা আ-কারের পর এ-কার কিংবা ঐ-কার থাকলে উভয়ে মিলে ঐ-কার হয়, ঐ-কার পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনের সাথে যুক্ত হয়। যেমন :

অ+এ=ঐ : জন+এক=জনৈক     আ+এ =ঐ : সদা+এব=সদৈব

অ+ঐ =ঐ : মত+ঐক্য=মতৈক্য  আ+ঐ=ঐ : মহা+ঐশ্বর্য=মশ্বৈর্য

এরূপ হিতৈষী, সবৈব, অতুসৈশ্বর্য ইত্যাদি।

৭. অ-কার কিংবা আ-কারের পর ও-কার কিংবা ঔ-কার থাকলে উভয়ে মিলে ঔ-কার হয়; ঔ-কার পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনের সাথে যুক্ত হয় যেমন :

অ+ও= ঔ : উন+ওষধি= বনৌষধি  আ+ও= ঔ : মহা+ওষধি= মহৌষধি

অ+ঔ= ঔ : পরম+ঔষধ= পরমৌষধ আ+ঔ= ঔ : মহা+ঔষধ= মহৌষধ

৮. ই-কার কিংবা ঈ-কারের পর ই-কার কিংবা ঈ-কার থাকলে উভয়ে মিলে দীর্ঘ ঈ-কার হয়। দীর্ঘ ঈ-কার পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনের সাথে যুক্ত হয়। যেমন :

ই+ই=ঈ : অতি+ইত=অতীত       ই+ঈ=ঈ     : পরি+ঈক্ষা=পরীক্ষা

ঈ+ই=ঈ : সতী+ইন্দ্র=সতীন্দ্র       ঈ+ঈ=ঈ: সতী+ঈশ=সতীশ

এরূপ : গিরীন্দ্র, ক্ষিতীশ, মহীন্দ্র, শ্রীশ, পৃদ্বীশ, অতীব, প্রতীক্ষা, প্রতীত, রবীন্দ্র, দিল্লীশ্বও ইত্যাদি।

৯. ই-কার কিংবা ঈ-কারের পর ই ও ঈ ভিন্ন অন্য স্বর থাকলে ই বা ঈ আনে ‘য’ বা য (্য) ফলা হয়। য-ফলা লেখার সময় পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনের সাথে লেখা হয়। মেযন-

ই+অ=য্+অ : অতি+অন্ত=অত্যন্ত    ই+আ=য্+আ : ইতি+আদি=ইত্যাদি

ই+উ=য্+উ : অতি+উক্তি=অত্যুক্তি   ই+উ=য্+উ : প্রতি+উষ=প্রত্যুষ

ঈ+আ=য্+আ : মসী+আধার=মস্যাধার  ই+এ=য্+এ : প্রতি+এক=প্রত্যেক

ঈ+অ=য্+অ : নদী+অম্বু=নদ্যম্বু

এরূপ : প্রত্যহ, অত্যধিক, গত্যন্তর, প্রত্যাশা, প্রত্যাবর্তন, আদ্যন্ত, যদ্যপি, অভ্যুত্থান, অত্যাশ্চর্য, প্রত্যুপকার ইত্যাদি।

১০. উ-কার কিংবা ঊ-কারের পর উ-কার কিংবা ঊ-কার থাকলে উভয়ে মিলে ঊ-কার হয়। ঊ-কার পূর্ববর্তী ব্যঞ্জন ধ্বনির সাথে যুক্ত হয়। যেমন :

উ+উ=ঊ : মরু+উদ্যান=মরূদ্যান    উ+ঊ=ঊ : বহু+উর্ধ্ব=বহূর্ধ্ব

ঊ+উ=ঊ : বধূ+উৎসব=বধূৎসব    ঊ+ঊ=ঊ : ভূ+ঊর্ধ্ব=ভূর্ধ্ব

১১. উ-কার কিংবা ঊ-কারের পর ঊ-কার ও ঊ-কার ভিন্ন অন্য স্বর থাকলে উ বা ঊ স্থানে ব-ফলা হয় এক লেখার সময় ব-ফলা পূর্ববর্তী বর্ণের সাথে লেখা হয়। যেমন :

উ+অ=ব+অ : সু+অল্প=স্বল্প   উ+আ=ব+আ : সু+আগত=স্বাগত

উ+ই=ব+ই : অনু+ইত=অন্বিত উ+ঈ=ব+ঈ : তনু+ঈ=তন্বী

উ+এ=ব+এ : অনু+এষণ=অন্বেষণ

এরূপ : পশ্বধম, পশ্বাচার, অন্বয়, মন্বন্তর ইত্যাদি।

১২. ঋ-কারের পর ঋ ভিন্ন অন্য স্বর থাকলে ‘ঋ’ স্থানে ‘র’ হয় এবং তা র-ফলা রূপে পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনের সঙ্গে যুক্ত হয়। যেমন : পিতৃ+আলয়=পিত্রালয়   , পিতৃ+আদেশ=পিত্রাদেশ

১৩. এ, ঐ, ও, ঔ-কারের পর এ, ঐ স্থানে যথাক্রমে অয়, আয় এবং ও, ঔ স্থানে যথাক্রমে অব্ ও আব্ হয়। যেমন :

এ+অ=অয়+অ : নে+অন=নয়ন।    শে+অন=শয়ন

ঐ+অ=আয়+অ : নৈ+অক=নায়ক    গৈ+অক=গায়ক

ও+অ=অব+অ : পো+অন=পবন    লো+অন=লবণ

ঔ+অ+আব্+অ : পৌ+অক=পাবক   

ও+আ=অব্+আ : গো+আদি=গবাদি

ও+এ=অব্+এ  : গো+এষণা=গবেষণা 

ও+ই=অব্+ই  : পো+ইত্র=পবিত্র

ঔ+ই=আব্+ই  : নৌ+ইক=নাবিক       

ঔ+উ=আব্+উ : ভৌ+উক=ভাবুক

তৎসম নিপাতনে সিদ্ধ স্বরসন্ধি

কতগুলো সন্ধি কোনো নিয়ম অনুসারে হয় না, এদের নিপাতনে সিদ্ধ বলে। যেমন :

কুল+অটা=কুলটা (কুলাটা নয়)  গো+অক্ষ=গবাক্ষ (গবক্ষ নয়)    প্র+ঊঢ়= প্রৌঢ় (প্রোঢ় নয়)

অন্য+অন্য=অন্যান্য          মার্ত+ অণ্ড =মার্তণ্ড

তৎসম ব্যঞ্জনসন্ধি (ব্যঞ্জনধ্বনি+স্বরধ্বনি ও স্বরধ্বনি+ব্যঞ্জনধ্বনি)

স্বরে আর ব্যঞ্জনে, ব্যঞ্জনে আর স্বরে এবং ব্যঞ্জনে আর ব্যঞ্জনের মিলনে যে সন্ধি হয় তাকে ব্যঞ্জনসন্ধি বলে। এদিক থেকে ব্যঞ্জনসন্ধিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন :

১. ব্যঞ্জনধ্বনি+স্বরধ্বনি

ক্, চ্, ট, ত্, প্-এর পরে স্বরধ্বনি থাকলে সেগুলো যথাক্রমে গ, জ্, ড্ (ড়), দ্, ব্ হয়। পরবর্তী স্বরধ্বনিটি পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনধ্বনির সঙ্গে যুক্ত হয়। যেমন :

ক্+অ=গ : দিক্+অন্ত=দিগন্ত       চ্+অ=জ : নিচ্+অন্ত=ণিজন্ত

ট্+আ=ড় : ষট্+আনন=ষড়ানন ত্+অ=দ : তৎ্+অবধি=তদবধি

প্+অ=ব : সুপ্+অন্ত=সুবন্ত

এরূপ : বাগশি, তদন্ত, বাগাড়স্বর, কৃদন্ত, সদানন্দ, সদুপায়, সদুপদেশ, জগদিন্দ্র

২. স্বরধ্বনি +ব্যঞ্জনধ্বনি

স্বরধ্বনির পর ছ থাকলে উক্ত ব্যঞ্জনধ্বনিটি দ্বিত্ব (চ্ছ) হয়। যেমন :

অ+ছ=চ্ছ : এক+ছত্র=একচ্ছত্র      আ +ছ=চ্ছ : কথা+ছলে=কথাচ্ছলে

ই+ছ=চ্ছ : পরি+ছদ=পরিচ্ছদ

এরূপ : মুখচ্ছবি, বিচ্ছেদ, পরিচ্ছেদ, বিচ্ছিন্ন, অঙ্গচ্ছেদ, আলোকচ্ছটা, প্রতিচ্ছবি, প্রচ্ছদ, আচ্ছাদন, বৃক্ষচ্ছায়া, স্বাচ্ছন্দে, অনুচ্ছেদ

তৎসম ব্যঞ্জনসন্ধি (ব্যঞ্জনধ্বনি+ব্যঞ্জনধ্বনি)

ক.

১. ত্ ও দ্-এর পর চ্ ও ছ্ থাকলে ত্ ও দ্ স্থানে চ্ হয়। যেমন :

ত্+চ=চ্চ : সৎ+চিন্তা=সচ্চিন্তা       ত্+ছ=চ্ছ : উৎ+ছেদ=উচ্ছেদ

দ্+চ=চ্চ : বিপদ+চয়=বিপচ্চয়      দ্+ছ=চ্ছ : বিপদ+ছায়া=বিপচ্ছায়া

এরূপ: উচ্চারণ, শরচ্চন্দ্র, সচ্চরিত্র, তচ্ছবি, সচ্চিদানন্দ ইত্যাদি

২. ত্ ও দ্ -এরপর জ্ ও ঝ্ থাকলে ত্ ও দ্-এর স্থানে জ্ হয়। যেমন :

ত্+জ=জ্জ : সৎ+জন=সজ্জন        দ্+জ=জ্জ : বিপদ+জাল=বিপজ্জাল

ত্+ঝ=জ্ঝ : কুৎ+ঝটিকা=কুজ্ঝটিকা

এরূপ : উজ্জ্বল, তজ্জন্য, যাবজ্জীবন, জগজ্জীবন ইত্যাদি

৩. ত্ ও দ্-এরপর শ্ থাকলে ত্ ও দ্-এর স্থলে চ্ এবং শ্-এর স্থলে ছ উচ্চারিত হয়। যেমন :

ত্+শ=চ্+ছ=চ্ছ উৎ+শ্বাস=উচ্ছ্বাস

এরূপ : চলচ্ছক্তি, উচ্ছৃঙ্খল, ইত্যাদি

৪. ত্ ও দ্-এর পর ড্ থাকলে ত্ ও দ্ এর স্থানে ড্ হয়। যেমন : ত্+ড=ড্ড-উৎ+ডীন=উড্ডীন

এরূপ : বৃহড্ঢক্কা

৫. ত্ ও দ্ এর পর হ থাকলে ত্ ও দ্-এর স্থলে দ ও হ-এর স্থলে ধ্ হয়। যেমন :

ত্+হ=দ্+ধ=দ্ধ-উৎ+হার=উদ্ধার। দ্+হ=দ্+ধ=দ্ধ-পদ্+হতি=পদ্ধতি

এরূপ : উদ্ধৃত, উদ্ধত, তদ্ধিত ইত্যাদি।

৬. ত্ ও দ্-এর পর ল্ থাকলে ত্ ও দ্-এর স্থলে ল উচ্চারিত হয়। যেমন :

ত্+ল=ল্ল-উৎ+লাস=উল্লাস। এরূপ : উল্লেখ, উল্লিখিত, উল্লেখ্য, উল্লঙ্ঘন ইত্যাদি

খ.

১. ব্যঞ্জন ধ্বনিসমূহের যে কোনো বর্গের অঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনির পর যে কোনো বর্গের ঘোষ অল্পপ্রাণ ও  ঘোষ মহাপ্রাণ ধ্বনি কিংবা ঘোষ অল্পপ্রাণ তালব্য ধ্বনি, (য>জ), ঘোষ অল্পপ্রাণ ওষ্ঠ্য ধ্বনি (ব), ঘোষ কম্পনজাত দন্তমূলীয় ধ্বনি (র) কিংবা ঘোষ অল্পপ্রাণ ওষ্ঠ্য ব্যঞ্জনধ্বনি (ব) থাকলে প্রথম অঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনি ঘোষ অল্পপ্রাণরূপে উচ্চারিত হয়। যেমন :

ক্+দ=গ্+দ : বাক্+দান=বাগদান         ট্+য=ড্+য : ষট্+যন্ত্র=ষড়যন্ত্র

ত্+ঘ=দ্+ঘ : উৎ+ঘাটন=উদ্ঘাটন        ত্+য=দ্+য : উৎ+যোগ=উদ্যোগ

ত্+ব=দ্+ব : উৎ+বন্ধন=উদ্বন্ধন         ত্+ও=দ্+ও : তৎ+রূপ=তদ্রুপ

এরূপ : দিগি¦জয়, উদ্যম, উদ্গার, উদ্গিরণ, উদ্ভব, বাগ্জাল, বাগ্দেবী ইত্যাদি।

২. ঙ, ঞ, ণ, ন, ম পরে থাকলে পূর্ববর্তী অঘোষ অল্পপ্রাণ স্পর্শধ্বনি সেই বর্গীয় ঘোষ স্পর্শধ্বনি কিংবা নাসিক্য ধ্বনি হয়। যেমন :

ক্+ন=গঙ+ন : দিক্+নির্ণয়=দিগ্নির্ণয় বা দিঙ্নির্ণয়    

ত্+ম=দ/ন+ম : তৎ+মধ্যে=তদ্মধ্যে বা তন্মধ্যে

লক্ষণীয়

এরূপ ক্ষেত্রে সাধারণত নাসিক্য ব্যঞ্জনই বেশি প্রচলিত। যেমন : বাক্+ময়=বাক্সময়, তৎ+ময়=তন্ময়, মৃৎ+ময়=মৃন্ময়, জগৎ+নাথ=জগন্নাথ ইত্যাদি।

এরূপ : উন্নয়ন, উন্নীত, চিন্ময় ইত্যাদি।

৩. ম্-এর পর যে কোনো বর্গীয় ধ্বনি থাকলে ম্ ধ্বনিটি সেই বর্গেও নাসিক্য ধ্বনি হয়। যেমন :

ম্+ক্=ঙ+ক্ : শম্+কা=শঙ্কা       ম্+চ্=ঞ+ছ : সম্+চয়=সঞ্চয়

ম্+ত্=ন্+ত্ : সম্+তাপ=সন্তাপ

এরূপ : কিম্ভূত, সন্দর্শন, কিন্নর, সম্মান, সন্ধান, সন্ন্যাস ইত্যাদি।

বিশেষ জ্ঞাতব্য বা দ্রষ্টব্য : আধুনিক বাংলায় ম্-এর পর কণ্ঠ্য-বর্গীয় ধ্বনি থাকলে ম্ স্থানে প্রায়ই ঙ না হয়ে অনুস্বার হয়। যেমন:

সম্+গত=সংগত         অহম্+ কার=অহংকার           সম্+খয়=সংখ্যা

এরূপ : সংকীর্ণ, সংগীত, সংগঠন, সংঘাত ইত্যাদি।

৪. ম্-এর পর অন্তঃস্থ ধ্বনি য, ও, ল, ব, কিংবা শ, ষ, স, হ থাকলে ম্ স্থলে অনুস্বার হয়। যেমন : সম্+যম=সংযম   সম্+বাদ=সংবাদ  সম্+রক্ষণ=সংরক্ষণ  সম্+লাপ=সংলাপ

সম্+শয়=সংশয়  সম্+সার=সংসার   সম্+হার=সংহার

এরূপ : বারংবার, কিংবা, সংবরণ, সংযোগ, সংযোজন, সংশোধন, সর্বংসহা, স্বয়ংবরা। ব্যতিক্রম : সম্রাট (সম্+রাট)।

৫. চ্ ও জ্-এর পরে নাসিক্য ধ্বনি তালব্য হয়। যেমন :

চ্+ন=চ্+ঞ : যাচ্+না=যা”্ঞা, রাজ্+নী=রাজ্ঞী

জ্+ন=জ্+ঞ : যজ্+ন=যজ্ঞ

৬. দ্ ও ধ্ এর পরে ক, চ, ট, ত, প, খ, ছ, ঠ, থ, ফ থাকলে দ্ ও ধ্ স্থলে অঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনি হয়। যেমন :

দ্>ত্ : তদ্+কাল=তৎকাল    অ্>ত্ : ক্ষুধ্+পিপাসা=ক্ষুৎপিপাসা।

এরূপ : হৃৎকম্প, তৎপর, তত্ত্ব

৭. দ্ কিংবা ধ্-এর পরে স্ থাকলে, দ্ ও ধ্ স্থলে অঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনি হয়। যেমন :

বিপদ্+সংকুল=বিপৎসংকুল। এরূপ : তৎসম

৮. ষ্-এর পরে ত্ বা থ্ থাকলে, যথাক্রমে ত্ ও থ্ স্থানে ট ও ঠ হয়। যেমন : কৃষ্+তি=কৃষ্টি       ষষ্+থ্=ষষ্ঠ

বিশেষ নিয়মে সাধিত সন্ধি

বাংলায় কতগুলো শব্দ ব্যবহৃত হয় যাদের বিশেষ নিয়মে সন্ধি হয়। যেমন :

উৎ+স্থান=উত্থান      সম্+কার=সংস্কার     উৎ+স্থাপন=উত্থাপন     

সম্+কৃত=সংস্কৃত      পরি+কার=পরিষ্কার   

এরূপ : সংস্কৃতি, পরিস্কৃত

তৎসম ব্যঞ্জন নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি

নিয়মহীনভাবে যে সন্ধি হয় তাকে নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি বলে। যেমন : গো+অক্ষ=গোঅক্ষ বা গোবক্ষ বা গোবাক্ষ না হয়ে হবে গবাক্ষ, এখানে ‘ব’ না থাকা শর্তেও ‘ব’ এসেছে। দুভাবে নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধিকে ভাগ করা যায়। যেমন:

নিপাতনে সিদ্ধ স্বরসন্ধি : নিয়মহীনভাবে স্বরে আর স্বরের মিলনে যে সন্ধি হয় তাকে নিপাতনে সিদ্ধ স্বরসন্ধি বলে। যেমন: অন্য+অন্য=অন্যান্য    আইন+অনুসারে =আইনানুসারে।

নিপাতনে সিদ্ধ ব্যঞ্জনসন্ধি : নিয়মহীনভাবে ব্যঞ্জনে আর ব্যঞ্জনের মিলনে যে সন্ধি হয় তাকে নিপাতনে সিদ্ধ ব্যঞ্জনসন্ধি বলে। যেমন: এক+দশ=একাদশ।

কতগুলো সন্ধি নিপাতনে সিদ্ধ হয় :

আ+চর্য=আশ্চর্য গো+পদ=গোষ্পদ

বন্+পতি=বনস্পতি   বৃহৎ+পতি=বৃহস্পতি   তৎ+কর=তস্কর     পর+পর=পরস্পর    

মনস্+ঈষা=মনীষা    ষট্+দশ=ষোড়শ      এক্+দশ=একাদশ     পতৎ+অঞ্জলি=পতঞ্জলি

তৎসম বিসর্গ সন্ধি

সংস্কৃত সন্ধির নিয়মে পদেও অন্তস্থিত র্‘’ ও ‘স্’ অনেক ক্ষেত্রে অঘোষ উষ্মধ্বনি অর্থাৎ ‘হ ধ্বনিরূপে উচ্চারিত হয় এবং তা বিসর্গ রূপে লেখা হয়। র্‘ ও ‘স্’ বিসর্গ ব্যঞ্জন ধ্বনিমালার অন্তর্গত। সে কারণে বিসর্গসন্ধি ব্যঞ্জনসন্ধির অন্তর্গত। বস্তুত বিসর্গ র্‘ ও ‘স’্-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। খাঁটি বাংলা বিসর্গ ধ্বনি হয় না।

তৎসম বিসর্গ সন্ধির প্রকরণ

বিসর্গকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন :

১. র-জাত বিসর্গ : ‘র্’ স্থানে যে বিসর্গ হয় তাকে বলে র-জাত বিসর্গ। যেমন: অন্তর-অন্তঃ, প্রাতর-প্রাতঃ, পুনর-পুনঃ ইত্যাদি।

২. স-জাত বিসর্গ : ‘স্’ স্থানে যে বিসর্গ হয় তাকে বলে স-জাত বিসর্গ। যেমন: নমস্-নমঃ, পুরস-পুরঃ, শিরস্-শিরঃ।

বিসর্গের সাথে অর্থাৎর্  ও স্-এর সাথে স্বরধ্বনির কিংবা ব্যঞ্জনধ্বনির যে সন্ধি হয় তাকে বিসর্গ সন্ধি বলে।

বিসর্গ সন্ধি দুভাবে সাধিত হয়। যেমন : বিসর্গ+স্বর ও বিসর্গ+ব্যঞ্জন

বিসর্গ ও স্বরের সন্ধি

১. অ-ধ্বনির পরস্থিত (অঘোষ উষ্মধ্বনি) বিসর্গের পর ‘অ’ ধ্বনি থাকলে অ+ঃ+অ তিনে মিলে ‘ও’ ধ্বনি/কার হয়। যেমন: ততঃ+অধিক=ততোধিক।

বিসর্গ ও ব্যঞ্জনের সন্ধি

১. অ-কারের পরস্থিত স-জাত বিসর্গের পর ঘোষ অল্পপ্রাণ ও ঘোষ মহাপ্রাণ ব্যঞ্জনধ্বনি, নাসিক্য ধ্বনি কিংবা অন্তস্থ য, অন্তস্থ ব, র, ল, হ থাকলে অ-কার ও স্-জাত বিসর্গ উভয় স্থলে ও-কার হয়। যেমন :

তিরঃ+ধান=তিরোধান   মনঃ+রম=মনোরম   মনঃ+হর=মনোহর   তপঃ+বন=তপোবন

২. অ-কারের পরস্থিত র-জাত বিসর্গের পর উপর্যুক্ত ধ্বনিসমূহের কোনোটি থাকলে বিসর্গ স্থানে ‘র’ হয়। যেমন :

অন্তঃ+গত=অন্তর্গত অন্তঃ+ধান=অন্তর্ধান পুনঃ+আয়=পুনরায়   পুনঃ+উক্ত=পুনরুক্ত  অহঃ+অহ=অহরহ

এরূপ : পুনর্জন্ম, পুনর্বার, প্রাতরুত্থান, অন্তর্ভূক্ত, পুনরপি, অন্তবর্তী

৩. অ ও আ ভিন্ন অন্য স্বরের পরে বিসর্গ থাকলে এবং তার সঙ্গে অ, আ, বর্গীয় ঘোষ অল্পপ্রাণ ও ঘোষ মহাপ্রাণ নাসিক্যধ্বনি কিংবা য, র, ল, ব, হ-এর সন্ধি হলে বিসর্গ স্থানে ‘র’ হয়। যেমন: নিঃ+আকার=নিরাকার      আশীঃ+বাদ=আশীর্বাদ       দুঃ+যোগ=দুর্যোগ

৪. বিসর্গের পর অঘোষ অল্পপ্রাণ কিংবা মহাপ্রাণ তালব্য ব্যঞ্জন থাকলে বিসর্গের স্থলে তালব্য শিশ ধ্বনি হয়, অঘোষ অল্পপ্রাণ কিংবা অঘোষ মহাপ্রাণ মূর্ধন্য ব্যঞ্জন থাকলে বিসর্গ স্থলে মূর্ধন্য শিশ ধ্বনি হয়, অঘোষ অল্পপ্রাণ কিংবা অঘোষ মহাপ্রাণ দন্ত্য ব্যঞ্জনের স্থলে দন্ত্য শিশ ধ্বনি হয়। যেমন :

ঃ+চ / ছ=শ+চ/ছ  : নিঃ+চয়=নিশ্চয়, শিরঃ+ছেদ=শিরচ্ছেদ

ঃ+ট / ঠ=ষ+ট/ঠ  : ধনুঃ+টঙ্কার=ধনুষ্টঙ্কার, নিঃ+ঠুর=নিষ্ঠুর

ঃ+ত / থ=স+ত/থ : দুঃ+তর=দুস্তর, দুঃ+থ=দুস্থ

৫. অঘোষ অল্পপ্রাণ ও অঘোষ মহাপ্রাণ কণ্ঠ্য কিংবা ওষ্ঠ্য ব্যঞ্জন (ক, খ, প, ফ) পরে থাকলে অ বা আ ধ্বনির পরস্থিত বিসর্গ স্থলে অঘোষ দন্ত্য শিশ ধ্বনি (স্) হয় এবং অ বা আ ব্যতীত অন্য স্বরধ্বনির পরস্থিত বিসর্গ স্থলে অঘোষ মূর্ধন্য শিশ্ ধ্বনি হয়। যেমন:

অ-এর পরে বিসর্গ ঃ+ক=স্+ক  : নমঃ+কার=নমস্কার

অ-এর পরে বিসর্গ ঃ+খ=স্+খ  : পদঃ+খলন=পদস্খলন

ই-এর পরে বিসর্গ ঃ+ক=ষ+ক  : নিঃ+কর=নিষ্কর

ঙ-এর পরে বিসর্গ ঃ+= ষ+ক  : দুঃ+কর=দুষ্কর

এরূপ : পুরস্কার, মনস্কামনা, তিরস্কার, চতুষ্পদ, নিষ্ফল, নিষ্পাপ, দুষ্প্রাপ্য, বহিষ্কৃত, দুষ্কৃতি, আবিষ্কার, চতুষ্কোণ।

বিসর্গ লোপ পায় বা পায় না

কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্ধির বিসর্গ লোপ হয় না। যেমন :

প্রাতঃ+কাল=প্রাতঃকাল       মনঃ+কষ্ট=মনঃকষ্ট      শিরঃ+পীড়া+শিরঃপীড়া

যুক্ত ব্যঞ্জন ধ্বনি স্ত, স্থ কিংবা স্প পরে থাকলে পূর্ববর্তী বিসর্গ অবিকৃত থাকে অথবা লোপ পায়। যেমন :

নিঃ+স্তব্ধ=নিঃস্তব্ধ কিংবা নিস্তব্ধ দুঃ+স্থ=দুঃস্থ কিংবা দুস্থ   নিঃ+স্পন্দ=নিঃস্পন্দ কিংবা নিস্পন্দ

বিশেষ বিসর্গ সন্ধি

কয়েকটি বিশেষ বিসর্গ সন্ধির উদাহরণ

বাচঃ+পতি=বাচস্পতি   ভাঃ+কর=ভাস্কর     অহঃ+নিশ=অহর্নিশ    অহঃ+অহ=অহরহ

সমাস

সমাস মানে সংক্ষেপ, মিলন, একাধিক পদের একপদীকরণ। অর্থসম্বন্ধ আছে এমন একাধিক শব্দের এক সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বড় শব্দ গঠনের প্রক্রিয়াকে সমান বলে। যেমন : দেশে সেবা=দেশসেবা, বই ও পুস্তক=বইপুস্তক, নেই পরোয়া যার =বেপরোয়া। বাক্যে শব্দের ব্যবহার সংক্ষেপ করার উদ্দেশ্যে সমাসের সৃষ্টি। সমাস দ্বারা দুই বা ততোধিক শব্দের সমন্বয়ে নতুন অর্থবোধক পদ সৃষ্টি হয়। এটি শব্দ তৈরি ও প্রয়োগের একটি বিশেষ রীতি। সমাসের রীতি সংস্কৃত থেকে বাংলায় এসেছে। তবে খাঁটি বাংলা সমাসের দৃষ্টান্তও প্রচুর পাওয়া যায়। সেগুলোতে সংস্কৃতের নিয়ম খাটে না।

সমাসের বৈশিষ্ট্য

১. পাশাপাশি দুই বা তার অধিক শব্দ থাকতে হবে

২. এসব শব্দের মধ্যে অর্থসংগতি থাকতে হবে

৩. এসব শব্দের মধ্যে বৃহৎ শব্দ তৈরির যোগ্যতা থাকতে হবে

৪. নতুন শব্দ গঠন করার ক্ষমতা থাকতে হবে

৫. একাধিক শব্দকে সংকোচিত করার ক্ষমতা থাকতে হবে

৬. শব্দগুলোর বিভক্তি লোপ পেতে হবে

সমাসের প্রয়োজনীয়তা

বাংলা ব্যাকরণে সমাসের প্রয়োজন অনেক। সমাসের মাধ্যমে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার বৃদ্ধি ছাড়াও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো যায়। যেমন:

১. সমাসের মাধ্যমে অনেক নতুন শব্দ গঠন করা যায়

২. ভাষাকে সহজসরল, সংক্ষিপ্ত, প্রাঞ্জল ও শ্রুতিমধুর করা যায়

৩. অল্পকথায় ব্যাপকভাব প্রকাশ করা যায়

৪. সহজভাবে শব্দ উচ্চারণ করা যায়

৫. বক্তব্যকে সুন্দর, শ্রুতিমধুর, সংক্ষিপ্ত, সহজসরল, অর্থবহ ও তাৎপর্যপূর্ণ করা যায়

৬. বাক্যকে গতিশীল করা যায়।

সমাসের সাথে অন্য নিয়মের পার্থক্য

সন্ধি ও সমাস

১. বর্ণের সাথে বর্ণের মিলনকে সন্ধি বলে। আর শব্দের সাথে শব্দের মিলনকে সমাস বলে।

২. সন্ধি ব্যাকরণের ধ্বনিতত্ত্বে অবস্থিত। আর সমাস ব্যাকরণের রূপতত্ত্বে অবস্থিত।

৩. সন্ধি ৩ প্রকার। যেমন: স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধি ও বিসর্গসন্ধি আর সমাস ৬ প্রকার। যেমন: দ্বন্দ্বসমাস, দ্বিগুসমাস, কর্মধারয়সমাস, তৎপুরুষসমাস, অব্যয়ীভাবসমাস ও বহুব্রীহিসমাস।

৪. সন্ধিতে বিভক্তি লোপ পায় না। আর সমাসে অলুক বাদে অন্য সমাসের বিভক্তি লোপ পায়।

৫. সন্ধিতে বর্ণে বর্ণে মিলন ঘটে। সন্ধিতে শব্দের মিলন বর্ণ ও উচ্চারণভিত্তিক। দুটি বর্ণের মিলন ঘটে। আর সমাসে শব্দে শব্দে বা পদে পদে মিলন ঘটে। সমাসে শব্দের মিলন অর্থভিত্তিক। দুই বা দুয়ের অধিক শব্দের মিলন ঘটে।

৬. সন্ধি অল্প সংখ্যক নতুন শব্দ তৈরি করতে পারে। আর সমাস অনেক নতুন শব্দ তৈরি করতে পারে।

৭. সন্ধির ফলে শব্দের অর্থের পরিবর্তন ঘটে না। আর সমাসের ফলে শব্দের অর্থের পরিবর্তন ঘটে।

৮. সন্ধি শব্দকে গতিশীল করে। সমাস বাক্যকে গতিশীল করে।

৯. সন্ধির নমুনা হলো বিদ্যা+আলয়=বিদ্যালয়, প্রতি+এক=প্রত্যেক, হিম+আলয়=হিমালয় আর সমাসের নমুনা হলো: বিদ্যার জন্য আলয়=বিদ্যালয়, একের পরে এক=প্রত্যেক, হিমের আলয়=হিমালয়।

১০. সন্ধি উচ্চারণকে পরিষ্কার করে। আর সমাস বক্তব্যকে সুন্দর, শ্রুতিমধুর ও সংক্ষিপ্ত করে। 

উপমান, উপমিত ও কর্মধারয় সমাস

১. উপমান ও উপমেয় পদের মধ্যে সাধারণ ধর্ম বা গুণ বজায় থাকলে যে সমাস হয় তাকে উপমান কর্মধারয় সমাস বলে। আর উপমান ও উপমেয় পদের মধ্যে সাধারণ ধর্ম বা গুণ বজায় না থাকলে যে সমাস হয় তাকে উপমিত কর্মধারয় সমাস বলে। আর উপমান ও উপমেয় পদের মধ্যে অভেদ কল্পনা করলে যে সমাস হয় তাকে রূপক কর্মধারয় সমাস বলে। 

২. উপমান বাচক পদ থাকে, সাধারণ ধর্ম বাচক পদ থাকে কিন্তু উপমেয় বাচক পদ থাকে না। উপমেয় বাচক পদ ও উপমান বাচক পদ থাকে কিন্তু সাধারণ ধর্মবাচক পদ থাকে না।   

দুটি শব্দের একটি শব্দ বিশেষ্য, অপরটি বিশেষণ।   দুটি শব্দই বিশেষ্য শব্দ।

দুটি শব্দই বিশেষ্য শব্দ।

সাধারণ ধর্মবাচক শব্দের প্রাধান্য। যেমন: তুষারের ন্যায় ধবল=তুষারধবল

তুষার=উপমান ও বিশেষ্য

ধবল=উপমিত ও বিশেষণ    উপমেয় বাচক শব্দের প্রাধান্য। যেমন:

পুরুষসিংহের ন্যায়=পুরুষসিংহ

পুরুষ=উপমেয় ও বিশেষ্য

সিংহ=উপমান ও বিশেষ্য     উপমেয় শব্দের পূর্বে বসে আর উপমান পরে বসে।

সমস্যমান পদে ন্যায় বসে। যদি তুলনামূলক শব্দ অর্থাৎ ‘মতো/ন্যায়’ থাকে তাহলে শব্দের মাঝে বসে।     সমস্যমান পদে ন্যায় বসে। যদি তুলনামূলক শব্দ অর্থাৎ ‘মতো/ন্যায়’ থাকে তাহলে শব্দের শেষে বসে।  সমস্যমান পদে রূপ বসে।

রূপ শব্দটি দুটি শব্দের মাঝে বসে।

তুষারশ্রুভ্র=তুষারের ন্যায়/মতো শুভ্র   মুখচন্দ্র=মুখ চন্দ্রের ন্যায়/মতো মনমাঝি=মন রূপ মাঝি

বিদ্যাধন=বিদ্যা রূপ ধন

অলুক দ্বন্দ্ব, অলুক তৎপুরুষ ও অলুক বহুব্রীহি

অলুক অর্থ লোপ হয় না এমন। যে সমাসে পূর্বশব্দের বিভক্তি লোপ হয় না তাকে অলুক সমাস বলে। তিনটি সমাসেই অলুকসমাস হয়। যেমন: অলুক দ্বন্দ্ব, অলুক তৎপুরুষ ও অলুক বহুব্রীহি।

যে দ্বন্দ্ব সমাসে সমস্যমান পদের বিভক্তি লোপ পায় না তাকে অলুক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বশব্দের বিভক্তি লোপ পায় না তাকে অলুক তৎপুরুষ সমাস বলে। যে বহুব্রীহি সমাসে পূর্বশব্দের বা পরশব্দের কোনো পরিবর্তন হয় না তাকে অলুক বহুব্রীহি সমাস বলে। দুধেভাতে=দুধে ও ভাতে। হাতেকলমে=হাতে ও কলমে। ঘিয়েভাজা=ঘিয়ে ভাজা। গায়েপড়া=গায়ে পড়া। কানেখাটো= কানে খাটো যে। মাথায়পাগড়ি=মাথায় পাগড়ি যার।

সমাসের উপাদান

সমাসের প্রক্রিয়ায় সমাসবদ্ধ বা সমাসনিষ্পন্ন পদকে সমস্ত পদ বলে। সমস্ত পদ বা সমাসবদ্ধ পদটির অন্তর্গত পদকে সমস্যমান পদ বলে। সমাসযুক্ত পদের প্রথম অংশ বা শব্দকে পূর্বপদ বলে এবং পরবর্তী অংশ বা শব্দকে উত্তরপদ বা পরপদ বলে। সমস্ত পদকে ভেঙে যে বাক্যাংশ করা হয় তাকে সমাসবাক্য, ব্যাসবাক্য বা বিগ্রহবাক্য বলে। যেমন : বিলাতফেরত রাজকুমার সিংহাসনে বসলেন। এখানে বিলাতফেরত, রাজকুমার ও সিংহাসন-তিনটিই সমাসবদ্ধ পদ। এগুলোর গঠন প্রক্রিয়া ও রকম-বিলাত হতে ফেরত, রাজার কুমার, সিংহ চিহ্নিত আসন-এগুলো হলো ব্যাসবাক্য। এসব ব্যাসবাক্যে ‘বিলাত’, ‘ফেরত’, ‘রাজা, ‘কুমার,’ ‘সিংহ’, ‘আসন’ হলো এক একটি সমস্যমান পদ। আর বিলাতফেরত, রাজকুমার ও সিংহাসন সমস্ত পদ। বিলাত, রাজা ও সিংহ হলো পূর্বপদ এবং ফেরত, কুমার ও আসন হলো পরপদ।

১. সমাসজাত শব্দ/সমাসবদ্ধ শব্দ/সমস্ত= শব্দ শব্দে শব্দে তৈরিকৃত শব্দই সমাসজাত শব্দ। সমাসের প্রক্রিয়ায় সমাসবদ্ধ বা সমাস নিষ্পন্ন পদটির নাম সমস্ত পদ।

২. সমস্যমানপদ-সমাসজাত শব্দ বা ব্যাসবাক্যের প্রতিটি পদকে সমস্যমানপদ বলে। সমস্ত পদ বা সমাসবদ্ধ পদটির অন্তর্গত পদগুলোই সমস্যমান পদ।

৩. ব্যাসবাক্য /সমাসবদ্ধ/বিগ্রহবাক্য-সমস্যমানপদকে ব্যাসবাক্য বলে। সমস্ত পদকে ভেঙে যে বাক্যাংশ করা হয় তার নাম সমাসবাক্য, ব্যাসবাক্য বা বিগ্রহবাক্য।

৪. পূর্বপদ-ব্যাসবাক্যে প্রথম শব্দকে পূর্বপদ বলে। সমাসযুক্ত পদের প্রথম অংশ বা শব্দকে বলা হয় পূর্বপদ।

৫. পরপদ/উত্তরপদ-ব্যাসবাক্যে শেষ পদকে পরপদ বা উত্তরপদ বলে। আর পরবর্তী অংশ বা শব্দকে বলা হয় উত্তরপদ বা পরপদ।

৬. বিলাতফেরত রাজকুমার সিংহাসনে বসলেন। এখানে ‘বিলাতফেরত, রাজকুমার ও সিংহাসন’ তিনটিই সমাসবদ্ধ পদ। এগুলোর গঠন প্রক্রিয়া : বিলাত হতে ফেরত, রাজার কুমার, সিংহ চিহ্নিত আসন-এগুলো হলো ব্যাসবাক্য। এসব ব্যাসবাক্যে ‘বিলাত’, ‘ফেরত’, ‘রাজা, ‘কুমার,’ ‘সিংহ’, ‘আসন’ হলো এক একটি সমস্যমান পদ। আর বিলাতফেরত, রাজকুমার ও সিংহাসন সমস্ত পদ। বিলাত, রাজা ও সিংহ হলো পূর্বপদ আর ফেরত, কুমার ও আসন হলো পরপদ।

সমাসের প্রকরণ

সমাস প্রধানত ছয় প্রকার। যেমন : দ্বন্দ্ব, কর্মধারয়, তৎপুরুষ, বহুব্রীহি, দ্বিগু ও অব্যয়ীভাব সমাস। দ্বিগু সমাসকে অনেক ব্যাকরণবিদ কর্মধারয় সমাসের অন্তর্ভূক্ত করেছেন। আবার কেউ কেউ কর্মধারয়কেও তৎপুরুষ সমাসের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করেছেন। এদিক থেকে সমাস মূলত চার প্রকার। যেমন: দ্বন্দ্ব, তৎপুরুষ, বহুব্রীহি, অব্যয়ীভাব সমাস। কিন্তু সাধারণভাবে ছয়টি সমাসেরই আলোচনা করা গেলো। এছাড়া প্রাদিসমাস, নিত্যসমাস, অলুকসমাস ইত্যাদি কয়েকটি অপ্রধান সমাস রয়েছে। সংক্ষেপে সেগুলোও আলোচনা করা হয়েছে।

সকল সমাসের সংজ্ঞা

সমাস : অর্থসম্বন্ধ আছে এমন একাধিক শব্দের এক সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বড় শব্দ গঠনের প্রক্রিয়াকে সমান বলে।

১. দ্বন্দ্ব সমাস : যে সমাসে প্রত্যেকটি সমস্যমান পদের অর্থের প্রাধান্য থাকে তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন:

২. দ্বিগু সমাস : সমাহার (সমষ্টি) বা মিলন অর্থে সংখ্যাবাচক শব্দের সঙ্গে বিশেষ্য পদের যে সমাস হয় তাকে দ্বিগু সমাস বলে। যেমন: মা ও বাবা=মা-বাবা।

৩. কর্মধারয় সমাস : যেখানে বিশেষণ বা বিশেষণভাবাপন্ন পদের সাথে বিশেষ্য বা বিশেষ্যভাবাপন্ন পদের সমাস হয় এবং পরপদের অর্থই প্রধানরূপে প্রতীয়মান হয় তাকে কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন: নীল যে পদ্ম =নীলপদ্ম।

৪. তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদের বিভক্তির লোপে যে সমাস হয় এবং যে সমাসে পরপদের অর্থ প্রধানভাবে বোঝায় তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: মন দিয়ে গড়া =মনগড়া।

৫. বহুব্রীহি সমাস : যে সমাসে সমস্যমান পদগুলোর কোনোটির অর্থ না বুঝিয়ে অন্যকোনো পদকে বোঝায় তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন: মহান আত্মা যার=মহাত্মা।

৬. অব্যয়ীভাব সমাস : পূর্বপদে অব্যয়যোগে নিষ্পন্ন সমাসে যদি অব্যয়েরই অর্থের প্রাধান্য থাকে তবে তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে। যেমন: মরণ পর্যন্ত=আমরণ।

৭. প্রাদি সমাস : প্র, প্রতি, অনু প্রভৃতি অব্যয়ের সঙ্গে যদি কৃৎপ্রত্যয় সাধিত বিশেষ্যের সমাস হয় তবে তাকে বলে প্রাদি সমাস। যেমন: প্র যে বচন =প্রবচন।

৮. নিত্যসমাস : যে সমাসে সমস্যমান পদগুলো নিত্যসমাসবদ্ধ থাকে, ব্যাসবাক্যের দরকার হয় না তাকে নিত্যসমাস বলে। যেমন: অন্য গ্রাম=গ্রামান্তর।

৯. অলুক দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসে কোনো সমস্যমান পদের বিভক্তি লোপ হয় না তাকে অলুক দ্বন্দ্ব বলে। যেমন : দুধে-ভাতে, হাতে-কলমে।

১০. মধ্যপদলোপী কর্মধারয় : যে কর্মধারয় সমাসে ব্যাসবাক্যের মধ্যপদের লোপ হয় তাকে মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন: স্মৃতি রক্ষার্থে সৌধ=স্মৃতিসৌধ।

১১. উপমান কর্মধারয় : সাধারণ ধর্মবাচক পদের সাথে উপমানবাচক পদের যে সমাস হয় তাকে উপমান কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন: তুষারের ন্যায় শুভ্র=তুষারশুভ্র।

১২. উপমিত কর্মধারয় : সাধারণ গুণের উল্লেখ না করে উপমেয় পদের সাথে উপমানের যে সমাস হয় তাকে উপমিত কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন: মুখ চন্দ্রের ন্যায়=মুখচন্দ্র।

১৩. রূপক কর্মধারয় : উপমান ও উপমেয়ের মধ্যে অভিন্নতা কল্পনা করা হলে রূপক কর্মধারয় সমাস হয়। যেমন : মন রূপ মাঝি=মনমাঝি।

১৪. দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদের দ্বিতীয়া বিভক্তি (কে, রে) ইত্যাদি লোপ হয়ে যে সমাস হয় তাকে দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: বিপদকে আপন্ন=বিপদাপন্ন।

১৫. তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদে তৃতীয়া বিভক্তির (দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক ইত্যাদি) লোপে যে সমাস হয় তাকে তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: মধু দিয়ে মাখা=মধুমাখা।

১৬. অলুক তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদের তৃতীয়া বিভক্তি দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক ইত্যাদি লোপ না হলে অলুক তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন: তেলে ভাজা=তেলে ভাজা।

১৭. চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদে চতুর্থী বিভক্তি (কে, জন্য, নিমিত্ত ইত্যাদি) লোপে যে সমাস হয় তাকে চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: মেয়েদের জন্য স্কুল= মেয়েস্কুল।

১৮. পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদে পঞ্চমী বিভক্তি (হতে, থেকে ইত্যাদি) লোপে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: বিলাত থেকে ফেরত =বিলাতফেরত।

১৯. ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদে ষষ্ঠী বিভক্তির (র, এর) লোপ হয়ে যে সমাস হয় তাকে ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: রাজার পুত্র=রাজপুত্র।

২০. অলুক ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস : র/এর-বিভক্তি লোপ না পেয়ে যে সমাস হয় তাকে অলুক ষষ্ঠী সমাস বলে। যেমন: মাটির মানুষ=মাটির মানুষ।

২১. সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদে সপ্তমী বিভক্তি (এ,য়, তে) লোপ হয়ে যে সমাস হয় তাকে সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: গাছে পাকা =গাছপাকা।

২২. নঞ্ তৎপুরুষ সমাস : না বাচক নঞ অব্যয় (না, নেই, নাই, নয়) পূর্বে বসে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে নঞ্ তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: ন আচার =অনাচার।

২৩. উপপদ তৎপুরুষ সমাস : কৃদন্ত পদের সঙ্গে উপপদের যে সমাস হয় তাকে বলে উপপদ তৎপুরুষ সমাস। যেমন: পঙ্কে জন্মে যা=পঙ্কজ।

২৪. অলুক তৎপুরুষ সমাস : যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের দ্বিতীয়াদি বিভক্তি লোপ হয় না তাকে অলুক তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: ঘিয়ে ভাজা=ঘিয়ে ভাজা।

২৫. সমানাধিকরণ বহুব্রীহি : পূর্বপদ বিশেষণ ও পরপদ বিশেষ হলে সমানাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস হয়। যেমন: খোশ মেজাজ যার =খোসমেজাজ।

২৬. ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি : বহুব্রীহি সমাসের পূর্বপদ এবং পরপদ কোনোটিই যদি বিশেষণ না হয় তাকে বলে ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি। যেমন: দুই কান কাটা যার=দু কানকাটা।

২৭. ব্যতিহার বহুব্রীহি : ক্রিয়ার পারস্পরিক অর্থে ব্যতিহার বহুব্রীহি হয়। যেমন: কানে কানে যে কথা=কানাকানি।

২৮. নঞ্ বহুব্রীহি : বিশেষ্য পূর্বপদের আগে নঞ্ (না অর্থবোধক) অব্যয় যোগ করে বহুব্রীহি সমাস করা হলে তাকে নঞ্ বহুব্রীহি বলে। যেমন: নাই জ্ঞান যার=অজ্ঞান।

২৯. মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি : বহুব্রীহি সমাসের ব্যাখ্যার জন্য ব্যবহৃত বাক্যাংশের কোনো অংশ যদি সমস্তপদে লোপ পায় তবে তাকে মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি বলে। যেমন: হাতে খড়ি দেয়া হয় যে অনুষ্ঠানে=হাতেখড়ি।

৩০. প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি : যে বহুব্রীহি সমাসের সমস্তপদে আ, এ, ও ইত্যাদি প্রত্যয় যুক্ত হয় তাকে বলা হয় প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি। যেমন: এক দিকে চোখ যার=একচোখা।

৩১. অলুক বহুব্রীহি : যে বহুব্রীহি সমাসে পূর্ব বা পরপদের কোনো পরিবর্তন হয় না তাকে অলুক বহুব্রীহি বলে। যেমন: মাথায় পাগড়ি যার=মাথায় পাগড়ি।

৩২. সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি : পূর্বপদ সংখ্যাবাচক এবং পরপদ বিশেষ্য হলে এবং সমস্তপদটি বিশেষণ বোঝালে তাকে সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি বলা হয়। যেমন: দশ গজ পরিমাণ যার= দশগজি।

৩৩. নিপাতনে বহুব্রীহি সিদ্ধ : যে সমাস কোনো নিয়মের অধীনে নয় তাকে নিপাতনে বহুব্রীহি সিদ্ধ বলে। যেমন : দু দিকে অপ যার=দ্বীপ। জীবিত থেকেও যে মৃত= জীবন্মৃত।

দ্বন্দ্ব সমাসের সংজ্ঞা

যে সমাসে প্রত্যেকটি সমস্যমান পদের অর্থের প্রাধান্য থাকে তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন :

তাল ও তমাল=তাল-তমাল      দোয়াত ও কলম=দোয়াত-কলম

এখানে তাল ও তমাল এবং দোয়াত ও কলম প্রতিটি পদেরই অর্থের প্রাধান্য সমস্ত পদে রক্ষিত হয়েছে। দ্বন্দ্ব সমাসে পূর্বপদ ও পরপদের সম্বন্ধ বোঝানোর জন্য ব্যাসবাক্যে এবং, ও, আর-এ তিনটি অব্যয় পদ ব্যবহৃত হয়। যেমন : মাতা ও পিতা=মাতাপিতা।

দ্বন্দ্ব সমাসের প্রকরণ

দ্বন্দ্ব সমাস কয়েক প্রকারে সাধিত হয়। যেমন :

১. মিলনার্থক শব্দযোগে: মা-বাপ, মাসি-পিসি, জ্বিন-পরি, চা-বিস্কুট ইত্যাদি।

২. বিরোধার্থক শব্দযোগে : দা-কুমড়া, অহি-নকুল, স্বর্গ-নরক ইত্যাদি।

৩. বিপরীতার্থক শব্দযোগে: আয়-ব্যয়, জমা-খচর, ছোট-বড়, ছেলে-বুড়ো, লাভ-লোকসান ইত্যাদি।

৪. অঙ্গবাচক শব্দযোগে : হাত-পা, নাক-কান, বুক-পিঠ, মাথা-মুন্ডু, নাক-মুখ ইত্যাদি।

৫. সংখ্যাবাচক শব্দযোগে : সাত-পাঁচ, নয়-ছয়, সাত-সতের, উনিশ-বিশ ইত্যাদি।

৬. সমার্থক শব্দযোগে: হাট-বাজার, ঘর-দুয়ার, কল-কারখানা, মোল্লা-মৌলভি, খাতা-পত্র ইত্যাদি।

৭. প্রায় সমার্থক ও সহচর শব্দযোগে: কাপড়-চোপড়,পোকা-মাকড়, দয়া-মায়া, ধূতি-চাদর ইত্যাদি।

৮. দুটি সর্বনামযোগে: যা-তা, যে-সে, যেমন-তেমন,যথা-তথা,তুমি-আমি, এখানে-সেখানে ইত্যাদি।

৯. দুটি ক্রিয়াযোগে : দেখা-শোনা, যাওয়া-আসা, চলা-ফেরা, দেওয়া-থোওয়া ইত্যাদি।

১০. দুটি ক্রিয়া বিশেষণযোগে : ধীরে-সুস্থে, আগে-পাশে, আকারে-ইঙ্গিতে ইত্যাদি।

১১. দুটি বিশেষণযোগে : ভালো-মন্দ, কম-বেশি, আসল-নকল, বাকি-বকেয়া ইত্যাদি।

অলুক দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসে কোনো সমস্যমান পদের বিভক্তি লোপ হয় না তাকে অলুক দ্বন্দ্ব বলে। যেমন : দুধে-ভাতে, জলে-স্থলে, দেশে-বিদেশে, হাতে-কলমে।

*তিন বা বহু পদে দ্বন্দ্ব সমাস হলে তাকে বহুপদী দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন : সাহেব-বিবি-গোলাম, হাত-পা-নাক-মুখ-চোখ ইত্যাদি।

দ্বন্দ্ব সমাসের গাণিতিক গঠন

পূর্বপদ  + ও/আর  + পরপদ   =দ্বন্দ্ব সমাস

বিশেষ্য + ও/আর  + বিশেষ্য    =দ্বন্দ্ব সমাস

সর্বনাম + ও/আর  +সর্বনাম     =দ্বন্দ্ব সমাস

বিশেষণ + ও/আর  + বিশেষণ   =দ্বন্দ্ব সমাস

ক্রিয়া    + ও/আর  + ক্রিয়া     =দ্বন্দ্ব সমাস

ক্রিয়াবিশেষণ  + ও/আর + ক্রিয়াবিশেষণ =দ্বন্দ্ব সমাস

দিগু সমাসের সংজ্ঞা ও ব্যবহার

সমাহার (সমষ্টি) বা মিলন অর্থে সংখ্যাবাচক শব্দের সঙ্গে বিশেষ্য পদের যে সমাস হয় তাকে দ্বিগু সমাস বলে। দ্বিগু সমাসে সমাসনিষ্পন্ন পদটি বিশেষ্য পদ হয়। যেমন :

তিন কালের সমাহার=ত্রিকাল     চৌরাস্তার সমাহার=চৌরাস্তা তিন মাথার সমাহার=তেমাথা

শত অব্দের সমাহার=শতাব্দী     পঞ্চবটের সমাহার=পঞ্চবটী  ত্রি (তিন) পদের সমাহার=ত্রিপদী

এরূপ : অষ্টধাতু, চতুর্ভুজ, চতুরঙ্গা, ত্রিমোহিনী, তেরনদী, পঞ্চভূত, সাতসমুদ্র ইত্যাদি।

দ্বিগু সমাসের গাণিতিক গঠন

সংখ্যা + বিশেষ্য    + র/এর    + সমাহার   =দ্বিগু সমাস

কর্মধারয় সমাসের সংজ্ঞা ও প্রকরণ

যেখানে বিশেষণ বা বিশেষণভাবাপন্ন পদের সাথে বিশেষ্য বা বিশেষ্যভাবাপন্ন পদের সমাস হয় এবং পরপদের অর্থই প্রধানরূপে প্রতীয়মান হয় তাকে কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন : নীল যে পদ্ম=নীলপদ্ম      শান্ত অথচ শিষ্ট=শান্তশিষ্ট      কাঁচা অথচ মিঠা=কাঁচামিঠা

কর্মধারয় সমাস কয়েক প্রকার হতে পারে। যেমন : মধ্যপদলোপী, উপমান, উপমিত ও রূপক কর্মধারয় সমাস।

কর্মধারয় সমাস গঠনের নিয়ম

কর্মধারয় সমাস কয়েক প্রকারে সাধিত হয়। যেমন :

১. দুটি বিশেষণ পদে একটি বিশেষ্যকে যেমন : যে চালাক সেই চতুর=চালাক-চতুর।

২. দুটি বিশেষ্য পদে একই ব্যক্তি বা বস্তুকে বোঝালে। যেমন: যিনি জজ তিনিই সাহেব=জজ সাহেব।

৩. কার্যে পরম্পরা বোঝাতে দুটি কৃদন্ত বিশেষণ পদের কর্মধারয় সমাস হয়। যেমন : আগে ধোয়া পরে মোছা =ধোয়ামোছা।

৪. পূর্বপদে স্ত্রীবাচক বিশেষণ থাকলে কর্মধারয় সমাসে সেটি পুরুষ বাচক হয়। যেমন :

সুন্দরী যে লতা=সুন্দরলতা       মহতী যে কীর্তি=মহাকীর্তি

৫. বিশেষণবাচক মহান বা মহৎ শব্দ পূর্বপদ হলে, ‘মহৎ’ ও ‘মহান’ স্থানে ‘মহা’ হয়। যেমন :

মহৎ যে জ্ঞান=মহাজ্ঞান   মহান যে নবি =মহানবি     মহৎ/মহতী যে কীর্তি=মহাকীর্তি

৬. পূর্বপদে ‘কু’ বিশেষণ থাকলে এবং পরপদের প্রথমে স্বরধনি থাকলে ‘কু’ স্থানে ‘কৎ’ হয়। যেমন

কু যে অর্থ=কদর্থ                  কু যে আচার=কদাচার

৭. পরপদে ‘রাজা’ শব্দ থাকলে কর্মধারয় সমাসে ‘রাজ’ হয়। যেমন : মহান যে রাজা=মহারাজ।

৮. বিশেষণ ও ব