অন্যান্য শ্রেণি ও বিষয়

বি সি এস প্রিলিমিনারি: ভূগোল (বাংলাদেশ ও বিশ্ব), পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা

ধান

ধান (Rice)  Graminae গোত্রের দানাশস্যের উদ্ভিদ Oryza sativa। ধান উষ্ণ জলবায়ুতে, বিশেষত পূর্ব-এশিয়ায় ব্যাপক চাষ হয়। প্রাচীন চীনা ভাষার Ou-liz শব্দটি আরবিতে Oruz ও গ্রীক ভাষায় Oryza হয়ে শেষে Ritz ও Rice হয়েছে। ধান বা ধান্য শব্দের উৎপত্তি অজ্ঞাত। ধানবীজ বা চাল সুপ্রাচীনকাল থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রধান খাদ্য। চীন ও জাপানের রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রায় ১০,০০০ বছর আগে ধানচাষ শুরু হয়েছিল বলে জানা যায়। ব্যাপক অভিযোজন ক্ষমতার দরুন ধান উত্তর কোরিয়া থেকে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া, এমনকি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,৬০০ মিটার উচ্চতায়ও (জুমলা, নেপাল) জন্মায়। আউশ, আমন অথবা বোরো হিসেবে প্রায় সারা বছরই বাংলাদেশে ধানের চাষ হয়।

পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৪০ ভাগের ক্যালরি চাহিদা মিটায় ধান। বাংলাদেশ, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম ও কাম্পুচিয়ার প্রায় ৯০% লোকের প্রধান খাদ্য ভাত।

ধান বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটি সম্পদের প্রতীক। বাংলাদেশ সরকারের খাদ্য বিভাগের নির্ধারিত জনপ্রতি দৈনিক চালের চাহিদার পরিমাণ ৪১০ গ্রাম। ২০০৪-০৫ সালে বাংলাদেশে প্রায় ২৯০ লক্ষ মে টন ধান উৎপন্ন হয়েছিল,  যা প্রয়োজনের তুলনায় ছিল কম। এদেশে হেক্টর প্রতি গড় উৎপাদন ২.৪৩ মে টন। বাংলাদেশে তিনটি মৌসুমে ধান উৎপাদিত হয়। এগুলো হলো আউশ, আমন ও বোরো।উৎপাদনের পরিমাণ বিচারে বোরো শীর্ষে এবং তারপরই রয়েছে আমন ও আউশ। উচ্চফলনশীল জাতের (HYV) ধান মোট জমির প্রায় ৭০% দখল করলেও ফলন মোট উৎপাদনের প্রায় ৮৩%। বোরো ধানের জমির পরিমাণ আমনের চেয়ে কম, তবে উৎপাদনের হিসাবে বোরো আছে প্রথম স্থানে। এদেশে ধানচাষের আওতায় রয়েছে মোট শস্যক্ষেত এলাকার ৭২% জমি। সারাবছরই এখানে ধানচাষ চলে, ফলে গ্রামাঞ্চলের কর্মসংস্থানের শতকরা প্রায় ৭৫ ভাগ ধানচাষ চাষনির্ভর।

বাংলাদেশে ধান চাষ হয় আমন, আউশ ও বোরো হিসেবে। আমন (বোনা ও রোপা) ডিসেম্বর-জানুয়ারি, বোরো মার্চ-মে এবং আউশ জুলাই-আগস্ট মৌসুমে ফলানো হয়। আবার, এসব জাতের মধ্যে রোপা আমন খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং মোট জমির ৪৬% জুড়ে চাষ হয়। অবশিষ্ট ৩৯, ১০ ও ৫% জমিতে হয় যথাক্রমে বোরো, আউশ ও বোনা আমনের চাষ। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র রোপা আমনের চাষ হয়। বোনা আমনের সিংহভাগ ফলে দক্ষিণ ও উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের নিচু জমিতে। প্রতি জেলায়, বিশেষত সেচাঞ্চলে কিছু পরিমাণ বোরো চাষ হয়, অন্যদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে চলে আউশ চাষ।

বাংলাদেশের কৃষি

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশে শতকরা ৭৫ ভাগ লোক গ্রামে বাস করে। বাংলাদেশের গ্রাম এলাকায় ৫৯.৮৪% লোকের এবং শহর এলাকায় ১০.৮১% লোকের কৃষিখামার রয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান ১৯.১% এবং কৃষিখাতের মাধ্যমে ৪৮.১% মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। ধান,পাট,তুলা,আখ,ফুল ও রেশমগুটির চাষসহ বাগান সম্প্রসারণ,মাছ চাষ,সবজি, পশুসম্পদ উন্নয়ন, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি,বীজ উন্নয়ন ও বিতরণ ইত্যাদি বিষয়সমূহ এ দেশের কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহের কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত।

এদেশের কৃষকরা সাধারণত সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে থাকে। বেশিরভাগ কৃষক এখনও ফসল উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে লাঙ্গল,মই এবং গরু ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল। তবে কৃষকদের অনেকেই এখন বিভিন্ন আধুনিক কৃষি-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পূর্বের তুলনায় ফলন বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। ধান ও পাট বাংলাদেশের প্রধান ফসল হলেও গম,চা,আখ,আলু এবং বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি এদেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উৎপাদিত হয়।

উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ মন্ডলীয় নানা ধরনের ফসল চাষের জন্য বাংলাদেশের আবহাওয়া যথেষ্ট অনুকূল। বর্তমানে এদেশে প্রায় ১০০ জাতের ফসল উৎপন্ন হলেও ধানই প্রধান শস্য, ফলে বছরের তিনটি ফসল মৌসুমেই মোট ফসলি জমির (১৩ লক্ষ ৭০ হাজার হেক্টর) প্রায় ৭৭% জুড়ে ধানের চাষ হয়। মোট ধানক্ষেতের ৭৫ শতাংশ জমিতে ফলে উচ্চফলনশীল জাত। অন্যান্য ফসলের মধ্যে আছে গম, পাট, তৈলবীজ, ডাল, তামাক, তুলা, ইক্ষু, ফল ও শাকসবজি।

মংলা বন্দর

মংলা বন্দর  খুলনা শহর থেকে ৪৮ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত বাংলাদেশের দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর। প্রথমে এই বন্দর গড়ে ওঠে চালনা থেকে ১৮ কিলোমিটার উজানে। ১৯৫০ সালের ১১ ডিসেম্বর বন্দরটি বিদেশি জাহাজ নোঙরের জন্য প্রথম উন্মুক্ত হয়। কিন্তু সমুদ্রগামী জাহাজ নোঙরের ক্ষেত্রে মংলা অধিকতর সুবিধাজনক বিধায় ১৯৫৪ সালে বন্দরটি মংলায় স্থানান্তরিত হয়। মংলা বন্দর দীর্ঘদিন ধরে চালনা নামেই পরিচিত হতে থাকে। বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার সেলাবুনিয়া মৌজায় পশুর ও মংলা নদীর সঙ্গমস্থলে এই বন্দরের অবস্থান। পাকিস্তান আমলে একজন বন্দর পরিচালকের ওপর মংলা বন্দরের প্রশাসনিক দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল। এর প্রধান কার্যালয় ছিল খুলনা শহরে। ২৫ ফুট পর্যন্ত ক্লিয়ারেন্সের সমুদ্রগামী জাহাজ এখানে নোঙর করার অনুমতি দেওয়া হতো। ছোট বন্দর হলেও কখনও কখনও প্রায় দুই ডজন সমুদ্রগামী জাহাজ মংলা বন্দরে নোঙর করতে দেখা যায়। সমুদ্রগামী জাহাজ চলাচলের উপযোগী গভীরতা হারিয়ে ফেলায় পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ১৯৮০ সাল থেকে বন্দরটি প্রায়ই বন্ধ করে দেওয়া হতো, এবং প্রতিবারই খননের পর এটি আবার জাহাজ নোঙরের জন্য উন্মুক্ত করা হতো। বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ৪০০টি জাহাজ এই বন্দরে নোঙর করে এবং বন্দরটির মাধ্যমে বছরে গড়ে ৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন পণ্যের আমদানি-রপ্তানি সম্পন্ন হয়। এ বন্দরে রয়েছে ১১টি জেটি, পণ্য বোঝাই ও খালাসের জন্য ৭টি শেড এবং ৮টি ওয়্যারহাউজ। নদীর গভীরে রয়েছে ১২টি ঝুলন্ত বা ভাসমান নোঙরস্থান। মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ হিরণ পয়েন্ট নামক স্থানে নাবিকদের জন্য একটি রেস্ট হাউজ নির্মাণ করেছে।

স্থলবন্দর

স্থলবন্দর  সীমান্তে অবস্থিত আন্তদেশীয় পণ্য ও যাত্রী যাতায়াত এবং বিনিময় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। স্থলবন্দরে শুল্ক, অভিবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা বিধান দপ্তর ছাড়াও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণমূলক দপ্তরসমূহের অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়। এখানে আন্তদেশীয় পণ্য বিনিময় যাত্রী অভিবাসন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ নিমিত্তে পণ্যাগার (ওয়ারহাউজ), যাত্রী ছাউনি, অভ্যর্থনাকেন্দ্র, আমদানি-রপ্তানি দলিলাদি পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থাসহ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো গড়ে ওঠে। স্থলবন্দরে যাতায়াতের নিমিত্তে উভয় দেশের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠা যেমন জরুরি তেমনি আন্তদেশীয় পণ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে বৈধ-অবৈধতা ও আইন সঙ্গতার বিষয়টি যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থা থাকে।

বাংলাদেশের স্থলবন্দরসমূহ বাংলাদেশের সাথে ভারত, নেপাল, ভূটান ও মায়ানমারের স্থল কিংবা নদী দ্বারা সৃষ্ট সীমান্তে অবস্থিত। প্রতিবেশী দেশের অঞ্চল ও পণ্য বিনিময়ে সুযোগ-সুবিধার ভিত্তিতে কিংবা যাত্রী যাতায়াতের গুরুত্বের ভিত্তিতে স্থলবন্দরসমূহে অবকাঠামোগত সুবিধাবলীর ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। বেনাপোল বন্দর দিয়ে অধিক মাত্রায় পণ্য বিনিময় হয়ে থাকে পক্ষান্তরে তামাবিল দিয়ে পণ্যের চাইতে যাত্রী যাতায়াত বেশি হয়। স্থল বন্দরসমূহের অবকাঠামোগত সুবিধা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজনের নিরীক্ষেই গড়ে ওঠে।

বাংলাদেশের স্থল সীমান্তের দৈর্ঘ প্রায় ২৪০০ কিমি যার শতকরা ৯২ ভাগ ভারতের সঙ্গে এবং বাকি ৮ ভাগ মিয়ানমারের সঙ্গে। পুরো সীমান্তে ছোট-বড় ১৮১টি শুল্ক স্টেশন আছে যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন। এই শুল্ক স্টেশনসমূহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত ও নির্বাচিত স্টেশনসমূহে স্থলবন্দর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার দায়িত্ব দিয়ে ২০০১ সালের ২১ নং আইনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে  বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ (বাস্থবক)। এ যাবত ১৩টি স্থলবন্দর নিজস্ব কিংবা বিওটি ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বাস্থবককে। প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে একটি বাণিজ্যবান্ধব সম্পর্ক বিকাশের লক্ষ্যে, স্থলবন্দরসমূহে অধিকতর সেবাধর্মীতা এবং সহজতর পরিচালনা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অত্যাধুনিক ও যুগোপযোগী প্রযুক্তিক সুবিধার সমন্বয় ঘটানোর মাধ্যমে আন্তদেশীয় বাণিজ্যে একটি অনুকূল ভারসাম্য অবস্থান তৈরির মিশন ও ভিশন রয়েছে বাস্থবকের। বাস্থবকের প্রধান কার্যাবলীর মধ্যে রয়েছে স্থলবন্দর পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও সংরক্ষণের নীতি প্রণয়ন, স্থলবন্দরে পণ্য গ্রহণ, সংরক্ষণ ও প্রদানের জন্য অপারেটর নিয়োগ, সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে স্থলবন্দর ব্যবহারকারীদের নিকট থেকে আদায়যোগ্য কর, টোল, রেইট ও ফিমের তফসীল প্রণয়ন এবং স্থলবন্দর প্রতিষ্ঠা ও ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যপূরণকল্পে কারো সঙ্গে কোনো চুক্তি সম্পাদন। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৬টি স্থলবন্দর রয়েছে।

সারণিতে স্থলবন্দরের অবস্থানঃ

স্থলবন্দরের নাম জেলা সম্মুখবর্তী জেলা
বেনাপোল যশোর চবিবশ পরগনা
টেকনাফ কক্সবাজার মংডু (মিয়ানমার)
বাংলাবান্ধা পঞ্চগড় জলপাইগুড়ি
সোনামসজিদ নবাবগঞ্জ মালদহ
হিলি দিনাজপুর পশ্চিম দিনাজপুর
ভোমরা সাতক্ষীরা চবিবশ পরগনা
দর্শনা চুয়াডাঙ্গা নদীয়া
বিরল দিনাজপুর গৌর
বুড়িমারী লালমনিরহাট মেখালজিগঞ্জ
তামাবিল সিলেট শিলং
হালুয়াঘাট ময়মনসিংহ তুরা
আখাউড়া ব্রাহ্মণবাড়ীয়া আগরতলা
বিবিরবাজার কুমিল্লা আগরতলা
নাকুগাঁও শেরপুর ডালু (মেঘালয়)
বিলোনিয়া ফেনী বিলোনিয়া
গোবরাকুড়া ও কড়ইতলী ময়মনসিংহ গাছুয়াপাড়া (মেঘালয়)

নদীবন্দর

নদীবন্দর  নদীর তীরে গড়ে ওঠা স্থান বা স্থাপনা, যেখানে নৌযানে চলাচলকারী যাত্রী ও পণ্য ওঠানামা করা হয়। নদীবহুল দেশ বলে আবহমান কাল থেকেই বাংলাদেশের পরিবহণ ব্যবস্থায় নৌপথ ও নদীবন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের প্রায় সব বড় শহর ও বাণিজ্যকেন্দ্রই গড়ে উঠেছে নদী বন্দরকে কেন্দ্র করে।

বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নদীপথসমূহে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি) নামে দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ২২টি পুর্ণাঙ্গ নদীবন্দর রয়েছে। এগুলি হলো: ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, চাঁদপুর, খুলনা, বাঘাবাড়ী, পটুয়াখালী, নরসিংদী, আরিচা, নগরবাড়ী, দৌলতদিয়া, টঙ্গী, মাওয়া, চর-জান্নাত, আশুগঞ্জ-ভৈরববাজার, ভোলা, বরগুনা, নোয়াপাড়া, মুন্সিগঞ্জ, ছাতক, মেঘনাঘাট ও কক্সবাজার। এ সব বন্দরে যন্ত্রচালিত নৌযান অবতরণ এবং যাত্রী ও পণ্য ওঠানামার সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এছাড়া বিআইডব্লিউটিএ-এর উদ্যোগে আরো ৪৪৮টি ছোটখাটো বন্দরে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ বা উন্নয়ন করা হয়েছে, যেগুলিকে বলা হয় সেকেন্ডারি রিভারাইন স্টেশন। বিআইডব্লিউটিএ-এর হিসেবে এর বাইরেও সারা দেশে আরো অন্তত ৩৭৪টি স্থানে নৌযান থেকে পণ্য ওঠানামা করা হয়, যেগুলিতে ওই সংস্থাটির কোনো রকম স্থাপনা নেই। এছাড়াও আছে আটটি ফেরিঘাট, যেগুলি দিয়ে যাত্রী ও পণ্যবাহী গাড়ি পারাপার করা হয়। সারা দেশের মোট ২৪টি বন্দরে সংস্থাটি পাইলট স্টেশন স্থাপন করেছে। এগুলি হলো: চট্টগ্রাম, রামগতি, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, নাটুয়াপাড়া, মাদারিপুর, কাউখালী, মংলা, খুলনা, আঙটিহারা, মাওয়া, আরিচা, কাউলিয়া, সিরাজগঞ্জ, কাজিপুর, বাহাদুরাবাদ, চিলমারি, দই-খাওয়া, পটুয়াখালী, ভৈরববাজার, লিপসা, পাটুরিয়া ও বৈদ্যেরবাজার।

 

সমুদ্রবন্দর

সমুদ্রবন্দর  জাহাজে পণ্যদ্রব্য ভরাট এবং খালাসের জন্য সমুদ্র তীরবর্তী স্থাপনা। পৃথিবীর ৮০% লোক সমুদ্র তীরবর্তী (১০০ মাইলের ভিতর) অঞ্চলে বসবাস করে। সমুদ্র তীরবর্তী দেশগুলির অর্থনীতির জন্য সমুদ্রবন্দরের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রাচীনকাল থেকে সমুদ্র তীরবর্তী দেশগুলিতে গড়ে উঠেছে সমুদ্রবন্দর। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর গুরুত্বপূর্ণ আমদানি-রপ্তানি অবকাঠামো। দেশের সিংহভাগ (৯০%) আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সম্পাদিত হয় এ দু’বন্দরের মাধ্যমে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরকে দেশের লাইফ লাইন বলা হয়ে থাকে। এ বন্দরের মাধ্যমে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির তিন-চতুর্থাংশ সম্পাদিত হয়। বাকিটুকু হয় মংলা ও কয়েকটি স্থল বন্দরের মাধ্যমে।

চট্টগ্রাম বন্দর  পতেঙ্গার কর্ণফুলি নদীর তীরে অবস্থিত বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। চট্টগ্রাম বন্দর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে ১৮৮৭ সালে। চট্টগ্রাম বন্দর বিশ্বের একমাত্র প্রকৃতিগত বন্দর। নদীর কূলে জেটি নির্মাণ করে পণ্য ওঠানামা করা হয়। কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী এ বন্দর কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং ভারত উপমহাদেশের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।

মংলা বন্দর  ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গোপসাগর হতে ৭০ নটিক্যাল মাইল অভ্যন্তরে এবং খুলনা শহর থেকে ৪৮ কিমি দক্ষিণে এর অবস্থান। পশুর নদীর দীর্ঘ চ্যানেল (গড় গভীরতা ৬.৫ মিটার) দিয়ে মংলা বন্দরে জাহাজ চলাচল করে। এখানে ২০০ মিটার দীর্ঘ ও ৭ মিটার গভীর জাহাজ যাতায়াত করতে পারে। এ বন্দর দিয়ে পাট, চামড়া, তামাক, হিমায়িত মাছ প্রভৃতি রপ্তানি হয় এবং দেশের ৪০% খাদ্যসামগ্রী, সার, কয়লা, কাঠের মন্ড এবং রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি করা হয়।

বাংলাদেশের মহেশখালীর সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে ভারত, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশই তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ‘ডিপ সি-পোর্ট প্রজেক্ট’ নামে তিন পর্বের প্রকল্প বাস্তাবায়িত হবে ২০৫৫ সালের মধ্যে। প্রথম পর্বের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা যায়, ইতিমধ্যে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য প্রথম দফায় ১৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ADP-তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বন্দর নির্মাণে মোট ব্যায়ের ৩০% অর্থের যোগান দেবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং বাকি ৭০% অর্থসংস্থান হবে সরকারি-বেসরকারি অংশগ্রহণে (PPP)। উল্লেখ্য যে, প্রথম পর্বের কাজ শেষ হলে (২০১৯ সাল নাগাদ শেষ হওয়ার কথা) ১১টি জেটি-বার্থের মাধ্যমে বন্দরের বাণিজ্যিক পরিচালনা চালু করা সম্ভব হবে। ২০২০ সালে দ্বিতীয় পর্বের কাজ শুরু হয়ে ২০৩৫-এ বন্দরে যোগ হবে আরো ২৫টি জেটি-বার্থ। তৃতীয় পর্বের কাজ ২০৩৫ সালে শুরু হয়ে শেষ হবে ২০৫৫ সালে। বন্দরের কাজ সম্পূর্ণ শেষ হলে মোট জেটির সংখ্যা দাঁড়াবে ৯৬টিতে। তখন গভীর সমুদ্রবন্দরে সর্বমোট ৯৬টি জাহাজ ভিড়িয়ে বা নোঙর করে একসঙ্গে পণ্য ওঠানামা করা সম্ভব হবে। গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রথম পর্বের কাজ শেষ হলে দেশের অর্থনীতিতে ১.৫% প্রবৃদ্ধি হবে। এ ছাড়া আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ১৮ থেকে ৩০% পরিবহণ ব্যয় কমে যাবে। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে দ্রব্যমূল্যে।

রেলওয়ে

রেলওয়ে  উনিশ শতকে প্রবর্তিত হয়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যাপক বিপ্লবের সূচনা করে। জর্জ স্টিফেনসনের যুগান্তকারী প্রচেষ্টায় ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্বের প্রথম রেলওয়ে ইংল্যান্ডের স্টকটন থেকে ২৬ কিমি দূরবর্তী ডার্লিংটন পর্যন্ত জনসাধারণের জন্য উদ্বোধন করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রেলওয়ের প্রথম উদ্বোধন হয় মোহাওয়াক থেকে হাডসন পর্যন্ত ১৮৩৩ সালে। জার্মানিতে এর প্রথম উদ্বোধন হয় ১৮৩৫ সালে নুরেমবার্গ থেকে ফুর্থ পর্যন্ত, ইতালিতে হয় ১৮৩৯ সালে, ফ্রান্সে ১৮৪৪ সালে, স্পেনে ১৮৪৮ সালে এবং সুইডেনে ১৮৫৬ সালে। রেলওয়ের প্রবর্তনে ইউরোপ ও আমেরিকার তুলনায় ব্রিটিশ শাসনাধীন বাংলাও পিছিয়ে ছিল না।

বর্তমান বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে রেললাইন স্থাপনের কাজ শুরু করার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে ব্রিটিশ আমলেই বিবেচনা করা হয়েছিল। ১৮৫২ সালে কর্নেল জে.পি কেনেডি গঙ্গা নদীর পূর্বতীর ধরে সুন্দরবন হয়ে ঢাকা পর্যন্ত রেললাইন বসানোর প্রস্তাব দেন। কিন্তু এর মধ্যেই ১৮৫৪ সালে ব্রিটিশ সরকার বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) দখল করে। বার্মাকে সরাসরি ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত করার রাজনৈতিক এবং কৌশলগত কারণেই কলকাতা ও বার্মার রাজধানী রেঙ্গুনের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগের প্রশ্নটি প্রকট হয়। ১৮৫৫ সালে বাংলায় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রকৌশল কোরের মেজর অ্যাবার ক্রমবি মাঠ পর্যায়ে জরিপ করে একটি রিপোর্ট পেশ করেন। এতে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে নামে একটি কোম্পানি গঠনের সম্ভাব্যতা উলে­খ করা হয়। পরবর্তী দুই বছরে প্রবীণ রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ার পুর্ডন-এর তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার রূপ নেয়।

১৮৬২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে  কলকাতা থেকে রাণাঘাট পর্যন্ত রেলপথ উদ্বোধন করে। এই লাইনকেই বর্ধিত করে ১৫ নভেম্বর ১৮৬২ সালে দর্শনা থেকে জগতী পর্যন্ত ৫৩.১১ কিমি ব্রডগেজ (১,৬৭৬ মিমি) রেললাইন শাখা উন্মোচন করা হয়। সে সময় কুষ্টিয়া ছিল প্রান্তিক স্টেশন, কিন্তু ১৮৬৭ সালে পদ্মা ভাঙনের কারণে তা স্থানান্তরিত হয় গড়াই নদীর পাড়ে এবং পরবর্তী বছরে আদি কুষ্টিয়া স্টেশন পরিত্যক্ত হয়। কুষ্টিয়া থেকে পদ্মার পাড়ে (পদ্মা ও যমুনার সংযোগস্থলের নিচে) অবস্থিত অভ্যন্তরীণ নদীবন্দর গোয়ালন্দ পর্যন্ত ৭৫ কিমি দীর্ঘ রেললাইন উদ্বোধন করা হয় ১ জানুয়ারি ১৮৭১ সালে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে  স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশের পর এদেশের রেলওয়ের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বাংলাদেশ রেলওয়ে, যা উত্তরাধিকারসূত্রে পায় ২,৮৫৮.৭৩ কিমি রেলপথ ও ৪৬৬টি স্টেশন। স্বাধীনতা যুদ্ধে রেলওয়ে একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে যায়। ফলে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে অনেক বছরে সেগুলি মেরামত করতে হয়। উল্লেখ্য ১৯৫০-এর দশকে সরকার রেলপথের বিস্তার ও পরিবর্ধনের জন্য যে সমীক্ষা চালায়, সে অনুযায়ী ডাবল লাইন ও শাখা রেলপথ তৈরি করার উদ্যোগ গৃহীত হয়।

১৯৯৪ সালে বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমুখী সেতুর কাজ শুরু হয়েছিল। চার লেন সড়কপথ ও এক লেন ডুয়ালগেজ (পাশাপাশি ব্রডগেজ ও মিটারগেজ) রেলপথবিশিষ্ট এই সেতুর উপরে আছে বৈদ্যুতিক সংযোগ, গ্যাস লাইন ও টেলিফোন লাইনের বন্দোবস্ত। ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন সেতু উদ্বোধন করা হয়।

১ জুলাই ২০০০ সালে বাংলাদেশে মোট ২,৭৬৮ কিমি রেললাইন ছিল, তার মধ্যে পশ্চিম জোনে ৯৩৬ কিমি ব্রডগেজ, ৫৫৩ কিমি মিটারগেজ (১৫ কিমি ডুয়েলগেজসহ) এবং পূর্ব জোনে ১,২৭৯ কিমি মিটারগেজ। সমস্ত রেলওয়েতে আছে ৩৯৫টি বড় সেতু, ৩,১৩৯টি ছোট সেতু, ৪৫৫টি স্টেশন, ১,৫২২টি লেভেল ক্রসিং, ৬০,৬৩৩ একর জমি। প্রায় ৯৫% রেললাইন হচ্ছে এক লেনবিশিষ্ট। ব্রডগেজ লাইন ৯০ পাউন্ড রেল এবং মিটারগেজ লাইন ৭৫ পাউন্ড ও ৬০ পাউন্ড রেল দিয়ে সাধারণত তৈরি।

বাংলাদেশের সেতু

সেতুর নাম দৈর্ঘ্য (কিমি) যে নদীতে নির্মিত অবস্থান  
শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত সেতু ৬১০ কীর্তনখোলা বরিশাল  
গাবখান সেতু   গাবখান চ্যানেল ঝালকাঠি  
কর্ণফুলী সেতু   কর্ণফুলী চট্টগ্রাম  
কালুরঘাট সেতু   কর্ণফুলী চট্টগ্রাম  
কাঞ্চন সেতু   শীতলক্ষ্যা নারায়নগঞ্জ  
ক্বীন ব্রীজ   সুরমা সিলেট  
খান জাহান আলী সেতু ১.৩৬ রূপসা খুলনা  
দাড়টানা সেতু   মধুমতি বাগেরহাট  
ধলেশ্বরী সেতু   ধলেশ্বরী মুন্সিগঞ্জ  
পদ্মা সেতু ৬.১৫ পদ্মা মাওয়া  
ফকির মজনু শাহ সেতু     কাপাসিয়া  
বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু        
বাংলাদেশ-জাপান মৈত্রী সেতু        
বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য মৈত্রী সেতু ১.২ মেঘনা আশুগঞ্জ-ভৈরব  
বুড়িগঙ্গা সেতু ৭২৫ বুড়িগঙ্গা উদাহরণ  
বুদ্ধিজীবী সেতু ৭০৯ বুড়িগঙ্গা ঢাকা মোহাম্মদপুর  
যমুনা বহুমুখী সেতু ৪.১৮ যমুনা টাঙ্গাইল-সিরাজগঞ্জ  
মারিখালি সেতু        
মেঘনা সেতু ৯৩০ মেঘনা মুন্সিগঞ্জ  
লালন শাহ সেতু ১.৮ পদ্মা পাবনা-কুষ্টিয়া  
শাহ আমানত সেতু ৯৫০ কর্ণফুলী চট্টগ্রাম  
হাজি শরিয়তুল্লাহ্ সেতু ৪৫০ আড়িয়াল খাঁ মাদারীপুর

ফ্লাইওভার

ফ্লাইওভার বা ওভারপাস  বা উড়ালসেতু হচ্ছে একপ্রকার সেতু, সড়ক, রেলরাস্তা বা এ ধরনের কোনো স্থাপনা, যা কোনো সড়ক বা রেললাইনের ওপর দিয়ে নির্মিত হয়। ওভারপাসের গাঠনিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এক্ষেত্রে নিম্ন ধারণক্ষমতা বিশিষ্ট সড়কের ওপর অপেক্ষাকৃত বেশি ধারণাক্ষমতা বিশিস্ট রাস্তা তৈরি করা হয়। ধারণক্ষমতা নির্ধারিত হয় রাস্তার লেনের সংখ্যা, যাতায়াতকৃত যানবাহনের পরিমাণ প্রভৃতির ওপর ভিত্তি করে।

উত্তর আমেরিকায় প্রচলিত সংজ্ঞানুসারে ‘ফ্লাইওভার’ হচ্ছে অনেক উঁচুতে অবস্থিত ওভারপাস। এগুলো সাধারণ মূল ওভারপাস লেনের ওপরে নির্মাণ করা হয়। এছাড়া কোনো দুইটি রাস্তার মধ্যে ক্রস সংযোগ তৈরি হলে, এবং তাঁর ওপর কোনো সেতু সদৃশ রাস্তা তৈরি হলে সেটাকেও ফ্লাইওভার হিসেবে অভিহিত করা হতে পারে। দ্বিতীয়টি যান প্রকৌশলীদের কাছে গ্রেড সেপারেশন নামে পরিচিত। এছাড়া ফ্লাইওভারগুলোর মধ্যে আন্তসংযোগ তৈরির জন্য বাড়তি রাস্তা যোগ করলে, তাও ফ্লাইওভারের অংশ হিসেবে গণ্য হয়।

১৮৪২ সালে ইংল্যান্ডের নরউড জংশন রেলওয়ে স্টেশনে বিশ্বের প্রথম ফ্লাইওভারটি নির্মিত হয়। এটি নির্মাণ করে লন্ডন অ্যান্ড ক্রয়ডন রেলওয়ে। ব্রাইটন মেইল লাইনের ওপর দিয়ে তাঁদের রেলগাড়ি নিয়ে যাবার জন্য তারা এটি নির্মাণ করে।

বড় বড় ও পুরোনো শহরগুলোতে নতুন রাস্তা তৈরি করা কষ্টসাধ্য, কারণ প্রচুর পরিমাণ স্থাপনা নির্মিত হয়ে যাওয়ায় সেগুলো উচ্ছেদ করা দুষ্কর হয়ে পড়ে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান যানবাহনের সংকুলান করার জন্য বাড়তি রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে ফ্লাইওভার একটি ভালো বিকল্প। এটি মূলত মূল রাস্তার ওপরেই নির্মিত হয়, এবং সংযোগের স্থানগুলোতে ও গ্রাউন্ড লেভেলের পাশে সামান্য পরিমাণ স্থানের প্রয়োজন হয়।

বিমান বাংলাদেশ

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস  বাংলাদেশের জাতীয় এয়ারলাইনস। ১৯৭২ সালে ৪ জানুয়ারি তারিখের রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ১২৬ অনুযায়ী বাংলাদেশ বিমান অধ্যাদেশবলে বাংলাদেশ বিমান কর্পোরেশন নামে একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৭ সালের জুলাই মাসে বিমানকে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত করা হয়, যদিও এর শতভাগ শেয়ারের মালিকানা এখনো বাংলাদেশ সরকারের।

বিমান বাহিনী কর্তৃক প্রদত্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহূত একটি পুরানো ডাকোটা, ডিসি-৩ বিমান নিয়ে এটি সংগঠিত হয়। গঠনের এক মাসের মধ্যে ডিসি-৩ দিয়ে এর অভ্যন্তরীণ সার্ভিস শুরু হয়। কিছুদিনের মধ্যেই বিমানটি একটি পরীক্ষামূলক উড্ডয়নকালে বিধ্বস্ত হলে বিমান বাংলাদেশ দুটি পুরানো এফ-২৭ উড়োজাহাজ ক্রয় করে। এগুলি শীঘ্রই চট্টগ্রাম এবং সিলেটে চলাচল শুরু করে। ব্রিটিশ ক্যালেডোনিয়ান থেকে ভাড়া করা একটি বিমান দিয়ে ১৯৭২ সালে ৪ মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়। ১৯৯৬ সালে কয়েকটি বেসরকারি বিমান সংস্থাকে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি প্রদানের আগে পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে বিমান-ই ছিল একমাত্র বিমান সংস্থা।

কোনরূপ সহায়-সম্বল ছাড়াই যাত্রা শুরু করার পর এক পর্যায়ে বিমান বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের ২৯টি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করতো। তবে উড়োজাহাজ সংকটসহ নানা কারণে বিমান তাদের গন্তব্যসংখ্যা কমাতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে বিমান ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে বিশ্বের ১৮টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে উড্ডয়ন পরিচালনা করে। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরে চারটি গন্তব্যে বিমানের ফ্লাইট চলাচল করে। এগুলি হলো আবুধাবি, বাহরাইন, ব্যাংকক, কলকাতা, দিল্লি, দোহা, দুবাই, ফ্রাঙ্কফুর্ট, হংকং, জেদ্দা, করাচি, কাঠমুন্ডু, কুয়ালালামপুর, কুয়েত, লন্ডন, মাস্কাট, রিয়াদ, রোম এবং সিঙ্গাপুর। দেশের মধ্যে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট চলাচল করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজার বিমান বন্দরে।

বিমানের বর্তমান বহরে চারটি সুপরিসর ডিসি ১০-৩০, দুটি সুপরিসর এয়ারবাস এ-৩১০, একটি বোয়িং ৭৭৭ ও দুটি বোয়িং ৭৩৭ এবং তিনটি এফ-২৮ এক্সিকিউটিভ জেট। এছাড়া এছাড়া আরো চারটি বোয়িং ৭৭৭, চারটি ৭৮৭-৮ এবং দুটি বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ ক্রয়ের জন্য এরই মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এরমধ্যে ৪৬৩ আসন বিশিষ্ট সুপরিসর বোয়িং ৭৭৭ চারটি ২০১৩ সালে, ১৭৭ আসন বিশিষ্ট বোয়িং ৭৩৭ দুটি ২০১৫ সালে এবং ২৯৪ আসনবিশিষ্ট বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার চারটি ২০১৭ সালে বিমানের বহরে যুক্ত হওয়ার কথা।

বাংলাদেশের প্রধান বিমান বন্দর হজরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ঢাকার উত্তর প্রান্তে কুর্মিটোলা (বালুরঘাট) নামক স্থানে অবস্থিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ সরকার কোহিমা এবং বার্মার অন্যান্য রণাঙ্গনমুখী যুদ্ধবিমান চালনার জন্য ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় একটি সামরিক বিমান অবতরণ ঘাঁটি নির্মাণ করে। তেজগাঁও বিমান বন্দরটিই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম বেসামরিক বিমান বন্দর এবং তা পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ঘাঁটি হিসেবেও ব্যবহূত হতো। বাংলাদেশের ভূ-সীমায় ব্রিটিশ নির্মিত সামরিক বিমান অবতরণ ঘাঁটিগুলির বেশ কয়েকটিকে বেসামরিক বিমানবন্দরে রূপান্তর করা হয় এবং বিমান অবতরণের সুবিধা থাকলেও অপর কয়েকটিকে এখনও তা করা হয় নি। যে সকল অবতরণক্ষেত্র এখন পর্যন্ত বেসামরিক বিমান বন্দর হিসেবে রূপান্তরিত হয় নি সেগুলির মধ্যে লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, ফেনী, রাজেন্দ্রপুর, পাহাড় কাঞ্চনপুর এবং রসুলপুর অন্যতম। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন ৩টি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর হচ্ছে হজরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর (ঢাকা), ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর (সিলেট) এবং আমানত শাহ আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর (চট্টগ্রাম)। দেশে অভ্যন্তরীণ বিমান বন্দর রয়েছে ৮টি এবং এগুলির অবস্থান বরিশাল, যশোর, সৈয়দপুর, রাজশাহী, শমসেরনগর (সিলেট), কক্সবাজার, ঈশ্বরদী (বর্তমানে অব্যবহূত) এবং কুমিল্লা। তাছাড়া বগুড়া, বাগেরহাট, টুঙ্গিপাড়া, হাতিয়া, রামগতি, নোয়াখালী প্রভৃতি স্থানে অভ্যন্তরীণ বিমান বন্দর নির্মাণকাজ প্রক্রিয়াধীন আছে। দেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলাতেই হেলিকপ্টার অবতরণের সুবিধা রয়েছে।

সড়ক পরিবহণ

সড়ক পরিবহণ অতীতে বাংলাদেশের বিশাল অংশ জুড়ে নৌপরিবহণ ব্যবস্থার প্রাধান্য থাকার কারণে এখানে সড়ক পরিবহণ খাতে শ্লথগতিতে উন্নয়ন ঘটে। কয়েক দশক আগেও এদেশের অনেক এলাকায় নৌকাই ছিল একমাত্র পরিবহণ।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর সড়ক পরিবহণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ খাত হিসেবে বিকাশ লাভ করে। খুব দ্রুত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির সড়ক, সেতু ও কালভার্টসমূহ পুনর্নির্মাণ করা হয়। পাশাপাশি জাতীয় মহাসড়কগুলিতে বেশ কয়েকটি নতুন সেতু নির্মাণ করা হয়। ফলে সড়ক পরিবহণ ব্যবসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিস্তৃত হতে থাকে। এই খাতে কয়েক হাজার শ্রমিক ও কর্মচারীর কর্মসংস্থান হতে থাকে। সড়ক পরিবহণের উন্নয়ন পরিকল্পনা, যানবাহন চলাচল ব্যবস্থাপনা এবং সড়ক ও মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পায়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) মোটরযানের লাইসেন্স ও যাত্রীবাহী  বাসের রুট পারমিট প্রদান করে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্পোরেশন (বিআরটিসি) রাষ্টী্রয় মালিকানাধীন যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক পরিচালনা করে থাকে। এছাড়া রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড মোটরযানের জ্বালানি হিসেবে কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস (সিএনজি) সরবরাহ করে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত দেশব্যাপী বিস্তৃত সড়ক নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য ২০০১ সালে প্রায় ২০,৮৫৪ কিলোমিটারে উন্নীত হয়। এর মধ্যে ৩,১৪৪ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, ১,৭৪৬ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ১৫,৯৬৪ কিলোমিটার প্রথম শ্রেণির সংযোগ সড়ক। জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলির প্রায় সম্পূর্ণ অংশই পাকা। এছাড়া প্রথম শ্রেণির সংযোগ সড়কগুলির শতকরা ৫০ ভাগ পিচঢালা। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) দেশের সদর উপজেলা, গ্রামগঞ্জ ও উৎপাদন কেন্দ্রগুলিকে ছোট ছোট সংযোগ সড়ক নির্মাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা হিসেবে জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্ত করে। ২০০১ সাল পর্যন্ত এলজিইডি কর্তৃক নির্মিত এ ধরনের সড়কগুলির মোট দৈর্ঘ্য ১,৪৯,১৬৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণির (‘বি’ টাইপ) সংযোগ সড়কগুলির মোট দৈর্ঘ্য ১৪,৩৯৩ কিলোমিটার এবং আর-১, আর-২, ও আর-৩ নামে পরিচিত তিন ধরনের গ্রামীণ সড়কের দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ৩৭,৮২৭ কিলোমিটার, ৪৯,৫৩৮ কিলোমিটার এবং ৪৭,৪০৯ কিলোমিটার।

বাংলাদেশ প্রতিবছর বন্যাকবলিত হয় বলে সড়কগুলি সাধারণত উঁচু বাঁধের উপর নির্মাণ করা হয়। জাতীয় মহাসড়কগুলি যে সকল বাঁধের উপর নির্মিত হয় সেগুলির প্রস্থ ১২.২ মিটার, সড়কের প্রস্থ ৭.৩ মিটার এবং উচ্চতা ১.৮৩ মিটার হয়ে থাকে। আঞ্চলিক মহাসড়কের ক্ষেত্রে এই তিনটি পরিমাপ যথাক্রমে ১০ মিটার, ৫.৫ মিটার এবং ১.৮৩ মিটার হয়ে থাকে। প্রথম (এ) ও দ্বিতীয় (বি) শ্রেণির সংযোগ সড়কগুলির জন্য বাঁধের উপরিতলের প্রস্থ ৭.৩ মিটার, সড়কের প্রস্থ ৩.৬৬ মিটার এবং বাঁধের উচ্চতা ১.৮৩ মিটার হয়ে থাকে। অবশ্য জাতীয় মহাসড়কগুলির দুই-তৃতীয়াংশেরই পরিমাপ এই নির্ধারিত মাপের চেয়ে কম।

১৯৯১-৯২ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৩,৮৪,০০০ রিকশা, ৪৮,২৭২টি ঠেলাগাড়ি, ৭,০২,০০০টি গরুর গাড়ি, ২১,৫৭৮টি বাস ও মিনিবাস, ২,২৭৯টি মাইক্রোবাস, ৩০,৯৯৪টি ট্রাক, ৮,৯২৭টি জিপ, ৩৪,৮১৭টি কার, ২,১৪০টি ট্যাক্সি, ৩০,১৯৪টি অটোরিকশা এবং ১,১৬,৬৮৯টি মোটর সাইকেল ছিল। ১৯৯৯ সাল নাগাদ এসব সংখ্যা গড়ে ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।

সরকারের গণপরিবহণ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থা বিআরটিসি ২০০০ সাল পর্যন্ত একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান ছিল। বিআরটিসির বহরে ছিল ২৭৩টি গাড়ি এবং দৈনিক এ সকল যানবাহনে ৮৪ হাজার যাত্রী যাতায়াত করত। ২০০১ সালে কয়েকটি দ্বিতল বাসসহ বিআরটিসির যাত্রীবাহী গাড়ির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৬১টিতে। এখন এইসব বাহনে দৈনিক তিন লক্ষ যাত্রী পরিবহণ সুবিধা পাচ্ছে। এ বছরে বিআরটিসির পরিবহণ খাত থেকে মুনাফা হয়েছে ১৬৭.০১ মিলিয়ন টাকা। সড়ক ও মহাসড়কগুলির সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন হওয়ায় বিআরটিসির সিটি সার্ভিস বাস এবং বেসরকারি খাতে সিটি সার্ভিস ও আন্তঃজেলা বিলাসবহুল কোচ সার্ভিসের চলাচল উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতকিছুর পরেও অবশ্য মহানগরীগুলিতে পরিবহণ ব্যবস্থায় তেমন উন্নতি ঘটে নি। রাজধানীতে সরকারি-বেসরকারি উভয়খাত মিলিয়ে যাত্রীবাহী বাস চলছে ১,৭০০টি। অথচ যাত্রীদের চাহিদাপূরণে প্রয়োজন কমপক্ষে ৫,০০০টি বাসের প্রয়োজন। ঢাকা নগরীতে চলাচলকারী মোট যানবাহনের সংখ্যা সাড়ে ছয় লক্ষ। এর মধ্যে যন্ত্রচালিত গাড়ির সংখ্যা মাত্র আড়াই লাখ, বাকি ৪ লাখই রিকশা। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকা নগরীর ৬৫ শতাংশ বাসিন্দা কোন ধরনের যানবাহনে চড়ে না, অথচ তাদের হাঁটার জন্য রয়েছে মাত্র ২২০ কিলোমিটার ফুটপাত। বাকি যে সকল নগরবাসী চলাচলের জন্য যানবাহনে চড়ে, তাদের মধ্যে বেশির ভাগ (৩৫%) রিকশায় আরোহণ করে। বাসে চড়ে শতকরা ২৭ ভাগ যাত্রী, বেবি ট্যাক্সি ও টেম্পুতে চড়ে শতকরা ১৫ ভাগ এবং মাত্র ১১ শতাংশ যাত্রী প্রাইভেট কারে যাতায়াত করে। বর্তমানে (২০০১) ঢাকায় চার লেনবিশিষ্ট সড়ক রয়েছে ৪৩৬ কিলোমিটার এবং দুই লেনবিশিষ্ট রাস্তা রয়েছে ১,৪০৮ কিলোমিটার। প্রায় দশ মিলিয়ন জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই নগরীতে মাত্র ৮ শতাংশ এলাকা জুড়ে রয়েছে সড়ক, জনপথ ও অলিগলি। অথচ যে কোন নগরীর সুষ্ঠু সড়ক পরিবহণের জন্য কমপক্ষে ২৫ শতাংশ এলাকা জুড়ে রাস্তা থাকা প্রয়োজন। রাজধানী ঢাকার গণপরিবহণ ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে দশ হাজার মিলিয়ন টাকা ব্যয়ে সরকার এখন ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

বাংলাদেশের সড়কগুলিতে সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে শীর্ষে রয়েছে রিকশা। দেশে রেজিস্টার্ড রিকশার সংখ্যা ৫ লক্ষ ৭০ হাজার। এর মধ্যে ৪ লক্ষ ৭০ হাজারই শহরে চলাচল করে। বাকি এক লক্ষ পল্লী অঞ্চলে চলাচল করে। ঢাকা মহানগরীতে লাইসেন্সকৃত রিকশার সংখ্যা মাত্র ১,২৮,০৮৫, অথচ প্রকৃতপক্ষে নিবন্ধন ছাড়াই এর কয়েকগুণ বেশি রিকশা অবৈধভাবে চলাচল করে। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত বাংলাদেশে মোটরগাড়ি বৃদ্ধির বার্ষিক গড় হার ছিল ১০ শতাংশ যা জনসংখা বৃদ্ধির হারের চেয়ে অনেক বেশি। এই পাঁচ বৎসরে বিআরটিএ ৫০,৩৫০টি ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করে। পরবর্তী পাঁচ বছরে এই সংখ্যা বেড়ে ৮২,৬৮৮-তে দাঁড়ায়। ১৯৯০-৯৫ মেয়াদে বিআরটিএ ৮৬,১৭৪টি মোটরগাড়ির রুট পারমিট প্রদান করে। অথচ ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত যানবাহনের দেওয়া রুট পারমিটের সংখ্যা গড়ে দাঁড়ায় ১,১৫,৭৮৬টিতে। বিআরটিএ ১৯৯০-এর দশকের প্রথম পাঁচ বছরে ৯৬,৬২৩টি এবং পরবর্তী পাঁচ বছরে ১,৬০,৬২৬টি মোটরগাড়ি নিবন্ধন করে। ২০০০ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের সড়কগুলিতে চার লক্ষ ছয় হাজারেরও বেশি বিভিন্ন ধরনের যান্ত্রিক মোটরযান চালু ছিল। এর মধ্যে বাস ও মিনিবাস ২৬,৭০৭টি, মাইক্রোবাস ১২,৫৮০টি, ট্রাক ৪২,৭৫০টি, জিপ ১০,৩৪৬টি, কার ৫৬,৩৭৭টি, ট্যাক্সি ২,৩৭৬টি, অটোরিকশা ও অটো টেম্পু ৮৯,৩১৭টি এবং মোটর সাইকেল ১,৬৫,৪৬০টি। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দেশের প্রায় সকল বড় শহরে বেসরকারি ট্যাক্সি ক্যাব চালু হয়েছে। বিদেশী সহায়তায় স্থানীয় উদ্যোক্তারা ঢাকায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস সার্ভিস চালু করেছে। ভারতের প্রতিবেশী রাজ্যগুলির রাজধানীর সাথে ঢাকার সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ঢাকা থেকে কলকাতা ও আগরতলায় নিয়মিত বিলাসবহুল  কোচ সার্ভিস চলাচল করছে এবং যানবাহনের সংখ্যা আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় অনিবার্যভাবে নগরী ও বড় শহরগুলিতে যানজট সৃষ্টি একটি দৈনন্দিন বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

 

বাংলাদেশের বনাঞ্চল

বাংলাদেশের বনাঞ্চল

বৈশিষ্ট্যসূচক বাহ্যিক চেহারা ও গঠনসহ গাছপালার একককে বনের ধরণ বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়। বনের ধরণের নিরূপকগুলো হচ্ছে জলবায়ু, মৃত্তিকা, উদ্ভিদ এবং অতীতের উন্নয়মূলক কার্যাবলী (জৈবিক হস্তক্ষেপসহ)।পরিবেশগতভাবে বাংলাদেশের বনগুলোকে নানানভাবে ভাগ করা হয়েছে। এর মাঝে রয়েছে ক্রান্তীয় আর্দ্র চিরহরিৎ বন, ক্রান্তীয় প্রায়-চিরহরিৎ বন, ক্রান্তীয় আর্দ্র পর্ণমোচী বন, মিঠাপানির জলাভূমি বন, প্যারাবন বা ম্যানগ্রোভ বন, ও সৃজিত বন।

 

পরিচ্ছেদসমূহ

  • ১ ক্রান্তীয় আর্দ্র চিরহরিৎ বন
  • ২ ক্রান্তীয় প্রায়-চিরহরিৎ বন
  • ৩ ক্রান্তীয় আর্দ্র পর্ণমোচী বন
  • ৪ মিঠাপানির জলাভূমি বন
  • ৫ প্যারাবন বা ম্যানগ্রোভ বন
  • ৬ সৃজিত বন

 

ক্রান্তীয় আর্দ্র চিরহরিৎ বন

এসব বন সাধারণত সিলেট, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী এলাকায় পাওয়া যায়। এছাড়াও দক্ষিণ-পূর্বে কক্সবাজার ও উত্তর-পূর্বে মৌলভীবাজারেও এদের অস্তিত্ব রয়েছে।

সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র নিয়ে চিরহরিৎ উদ্ভিদ এখানে কর্তৃত্ব করে। এসব বৃক্ষ ছাড়াও প্রায়-পর্ণমোচী ও পর্ণমোচী প্রজাতিরও দেখা মিললেও বনের চিরহরিৎ বৈশিষ্ট্য অটুট থাকে।

সর্বোচ্চ চাঁদোয়ার বৃক্ষরা ৪৫ থেকে ৬২ মিটার পর্যন্ত উচ্চতায় বেড়ে উঠতে পারে। আর্দ্রতার কারণে ছায়াযুক্ত আর্দ্র স্থানে পরাশ্রয়ী অর্কিড, ফার্ণ ও ফার্ণসহযোগী, আরোহী লতা, স্থলজ ফার্ণ, মস, অ্যারোয়েড, এবং বেত পাওয়া যায়। গুল্ম, বিরুৎ আর ঘাসের পরিমাণ অপ্রতুল।

এধরণের বনে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০০ প্রজাতির সপুষ্পক উদ্ভিদ পাওয়া গেছে। তার মধ্যে সবচাইতে উপরের চাঁদোয়া প্রধানত কালিগর্জন, ঢালিগর্জন, সিভিট, ধূপ, কামদেব, রক্তন, নারকেলি, টালি, চুন্দুল, ঢাকিজাম দখল করে রাখে। প্রায়-পর্ণমোচী ও পর্ণমোচী বৃক্ষের মধ্যে রয়েছে চম্পা, বনশিমুল, চাপালিশ, মান্দার। এছাড়া চাঁদোয়ার দ্বিতীয় স্তরে অন্যান্যের মধ্যে পাওয়া যায় পিতরাজ, চালমুগরা, ডেফল, নাগেশ্বর, কাও, জাম, গদা, ডুমুর, কড়ই, ধারমারা, তেজভাল, গামার, মদনমাস্তা, আসার, মুজ, ছাতিম, টুন, বুরা, অশোক, বরমালা, ডাকরুম। মাঝে মাঝে ব্যাক্তবীজীর মধ্যে GnetumPodocarpus উদ্ভিদ প্রজাতির দেখা মেলে। বাঁশের প্রজাতির মধ্যে রয়েছে মুলি, ডলু, যতি বা মিত্তিঙ্গা, Dendrocalamus lognispathus, Oxytenanthera nigrosiliata, Teinostachyum griffithii. বন্য কলাগাছও এখানে সাধারণ।

 

ক্রান্তীয় প্রায়-চিরহরিৎ বন

সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী এলাকায় এ ধরণের বন দেখতে পাওয়া যায়। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দিনাজপুরেও এ ধরণের কিছু বন এলাকা রয়েছে। সাধারণত চিরহরিৎ হলেও পর্ণমোচী বৃক্ষরাও এখানে রাজত্ব করে। বেশিরভাগ বনেই জুমচাষ প্রচলিত।

এখন পর্যন্ত এসব বনে প্রায় ৮০০ প্রজাতির সপুষ্পক উদ্ভিদের উপস্থিতি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। চিরহরিৎ বনের তুলনায় এসব বনে লতাগুল্মের ঝোপঝাড়ের পরিমাণ বেশি। সবচাইতে উপরে চাঁদোয়ার উচ্চতা ২৫ থেকে ৫৭ মিটার। উপত্যকা ও আর্দ্র ঢালের সবচেয়ে উপরের স্তরের উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে চাপালিশ, তেলসুর, চুন্দুল, এবং নারকেলি। মধ্যম স্তরের উদ্ভদদের মধ্যে গুটগুটিয়া, টুন, পিতরাজ, নাগেশ্বর, উরিআম, নালিজাম, গদাজাম, পিতজাম, ঢাকিজাম উল্লেখযোগ্য। এছাড়া সবচাইতে নিচের স্তরটিতে দেখা যায় ডেফল ও কেচুয়ান। অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত গরম ও শুষ্ক ঢাল এবং শৈলশিরার উপরের স্তরের উদ্ভিদগুলোর মধ্যে পাওয়া যায় গর্জন, বনশিমুল, শিমুল, শিল কড়ই, চুন্দুল, গুজা বাটনা, কামদেব, বুরা গামারি, বহেরা, এবং মুজ। মধ্যম স্তরের রয়েছে গাব, উদল, এবং শিভাদি আর নিম্নস্তরে দেখা যায় আদালিয়া, বরমালা, গোদা, অশোকা, জলপাই এবং ডারুম। সচরাচর যেসব পর্ণমোচী উদ্ভিদ দেখা যায় সেগুলোর মধ্যে আছে গর্জন, শিমুল, বনশিমুল, বাটনা, চাপালিশ, টুন, কড়ই, এবং জলপাই।

ক্রান্তীয় আর্দ্র চিরহরিৎ বন এবং ক্রান্তীয় প্রায়-চিরহরিৎ বন একসাথে মিলে ৬,৭০,০০০ হেক্টর জমি দখল করে আছে যা দেশের মোট ভূমির ৪.৫৪ শতাংশ এবং মোট জাতীয় বনভূমির ৪৪ শতাংশ। এছাড়াও, দু’ধরনের বনেই রয়েছে বিচিত্র প্রাণীপ্রজাতির আবাস। স্তন্যপায়িদের মধ্যে হাতি, বানর, বন্য শূকর, হরিণ , সাম্বার, এবং ইন্ডিয়ান চিতা উল্লেখযোগ্য। সরিসৃপ হিসেবে এসব বনে বিচরণ রয়েছে শঙ্খচূড়, মনিটর লিজার্ড, এবং বেঙ্গল মনিটর লিজার্ডের।

 

ক্রান্তীয় আর্দ্র পর্ণমোচী বন

বাংলাদেশের ঢাকা, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, রংপুর এবং কুমিল্লাতে এ ধরণের বন বিস্তৃত রয়েছে। এসব বনকে শালবন হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয় যেহেতু শালবৃক্ষই এসব বনে কর্তৃত্ব করে থাকে (প্রায় ৯০ শতাংশ)। যদিও কালের পরিক্রমায় নানা কারণে এসব বন শীর্ণকায় হয়ে গেছে। বনের চাঁদোয়া মোটামুটি ১০ থেকে ২০ মিটার উচ্চতার হয়ে থাকে।

শাল ছাড়াও এসব বনে অন্যান্য উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে পলাশ, হালদু, জারুল বা সিধা, বাজনা, হারগোজা, আজুলি, ভেলা, কড়ই, মেন্দা, কুসুম, উদল, ডেফাজাম, বহেরা, কুর্চি, হরিতকি, পিতরাজ, শেওরা, সোনালু, আসার, আমলকি, এবং আদাগাছ। আরোহী লতাগাছের মধ্যে কাঞ্চনলতা, আনিগোটা, কুমারিলতা, গজপিপল, পানিলতা, Dioscorea প্রজাতি, শতমূলি, এবং গিলার অবস্থান লক্ষ্যণীয়। এছাড়াও ৫০ টি গণের প্রায় ২৫০ প্রজাতির গুল্মের ঝোপঝাড়ও এসব বনে বর্তমান। সানগ্রাস নামে এক প্রকার ঘাস এসব বনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পরাশ্রয়ী উদ্ভিদ, লিগিউম, ইউফ্রোবিয়া এবং কনভলভুলাস উদ্ভিদও এসব স্থানে বিদ্যমান।

সর্বোমোট ১,২০,০০০ হেক্টর জায়গাজুড়ে এসব বন বিস্তৃত যা দেশের মোট ভূমির ০.৮১ শতাংশ এবং মোট বনভূমির ৭.৮ শতাংশ। এসব বনে প্রায় ৩৭.৫ লক্ষ ঘনমিটার কাঠের মজুদ রয়েছে। স্তন্যপায়ীদের মধ্যে খেকশিয়াল, বানর, বনবিড়াল, ইত্যাদি বিদ্যমান। এছাড়া সরীসৃপ হিসেবে মূলত বেঙ্গল মনিটর লিজার্ড, এবং কমন কোবরা উল্লেখযোগ্য।

 

মিঠাপানির জলাভূমি বন

মূলত সিলেটের হাওর অঞ্চলের বেতভূমি ও হিজল-করচ বনে এ ধরণের বৈশিষ্ট্যমূলক বন দেখতে পাওয়া যায়। বর্ষাকালে এসব বন বানের জলে কানায় কানায় ভরে উঠে। এছাড়াও পাহাড়ী বনের নিচু জায়গাগুলোতেও এসব বনের দেখা মেলে।

নানা ধরণের জলসহিষ্ণু গাছ, যেমন, হিজল, করচ, পানিজাম, কদম, কাঞ্জল, ভুবি, অশোকা, বরুন, শতমূলি, ডুমুর, ঢোলকলমি, বুনো গোলাপ, নল, খাগড়া, ইকরা,কাশ, মূর্তা, এবং কচুরিপানা, এখানে সহজলভ্য। নানান পরাশ্রয়ী, ফার্ণ এবং মসও রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।

 

প্যারাবন বা ম্যানগ্রোভ বন

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এ ধরণের বন পরিলক্ষিত হয়। প্রায় ৫২০,০০০ হেক্টর জুড়ে এসব বনের বিস্তৃতি। জোয়ারের পানিতে এই বন নির্দিষ্ট সময় পর পর বিধৌত হয়। এ অঞ্চলের উদ্ভিদদের মাঝে বিশেষ ধরনের অভিযোজন হিসেবে রয়েছে শ্বাসমূল, ঠেসমূল, এবং জরায়ূজ অঙ্কুরোদগম দেখা যায়। এ বনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী। সুন্দরী ছাড়াও এখানে রয়েছে পশুর, গেওয়া, কেওরা, কাঁকড়া, বাইন, ধুন্দুল, আমুর, ডাকুর, ইত্যাদি।

 

সৃজিত বন

এগুলো সাধারণত দুই ধরণেরঃ সৃজিত রাষ্ট্রীয় বন এবং সৃজিত বেসরকারি বন।

১৮৭১ সালে মায়ানমার থেকে সেগুনের বীজ এনে পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় বন সৃজনের উদ্যোগ শুরু হয়। পরবর্তীতে সিলেট এবং চট্টগ্রাম বিভাগেও এই অনুশীলনের প্রসার ঘটে। সেগুন ছাড়াও অন্য যেসব বৃক্ষ সৃজনের উদ্যোগ নেয়া হয় সেগুলো হল গামার, চাপালিশ, গর্জন, মেহগনি, জারুল, টুন, পিংকাডো, এবং জাম। এছাড়াও পরে দ্রুত বর্ধনশীল উদ্ভিদ হিসেবে গামার, কদম, আকাশিয়া, ইউক্যালিপটাস এবং পাইনের চাষ শুরু হয়।

বেসরকারি বন হিসেবে গ্রামীণ বন বনজদ্রব্যের জাতীয় চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর মোট আয়তন প্রায় ২,৭০,০০০ হেক্টর। বসতবাড়িতে অবস্থিত এসব বনে মোট প্রায় ৫ কোটি ৪৭ লক্ষ ঘনমিটার বনজদ্রব্য মজুদ রয়ছে বলে ধারণা করা হয়।

বাংলাদেশের পর্যটন

বাংলাদেশের পর্যটন

বাংলাদেশে পরিচিত অপরিচিত অনেক পর্যটক-আকর্ষক স্থান আছে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যুগে যুগে ভ্রমণকারীরা মুগ্ধ হয়েছেন। এর মধ্যে প্রত্মতাত্বিক নির্দশন, ঐতিহাসিক মসজিদ এবং মিনার, পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত, পাহাড়, অরণ্য ইত্যাদি অন্যতম। এদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি এলাকা বিভিন্ন স্বতন্ত্র্র বৈশিষ্ট্যে বিশেষায়িত । বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত হচ্ছে বাংলাদেশের কক্সবাজার।

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যুগে যুগে ভ্রমণকারীরা মুগ্ধ হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবে এ সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশে পর্যটন শিল্প উন্নয়নের সম্ভাবনা অপরিসীম। নতুন করে কৌশল ঠিক করে সম্ভাবনার সবটুকুকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পর্যটনে মডেল হতে পারে। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশ স্বল্প আয়তনের দেশ হলেও বিদ্যমান পর্যটক আকর্ষণে যে বৈচিত্র্য তা সহজেই পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। পৃথিবীতে পর্যটন শিল্প আজ বৃহত্তম শিল্প হিসেবে স্বীকৃত। পর্যটন শিল্পের বিকাশের ওপর বাংলাদেশের অনেকখানি সামগ্রিক উন্নয়ন নির্ভর করছে।

বাংলাদেশের উল্লেখ যোগ্য স্থান সমূহ

চট্রগ্রাম বিভাগ

পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত

পতেঙ্গা সৈকত বন্দর নগরী চট্রগ্রাম শহর থেকে ১৪ কিমি দক্ষিণে অবস্থিত। এটি কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত। পতেঙ্গা একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। এটি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নৌ একাডেমী এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের সন্নিকটে। রাতের বেলা এখানে নিরাপত্তা বেশ ভালো এবং রাস্তায় পর্যাপ্ত আলো থাকে। স্থানীয় লোকের মতে, এখানে সুস্বাদু ও মুখরোচক খাবার অত্যন্ত সস্তায় পাওয়া যায়। তেমনি একটি জনপ্রিয় খাবার হল,মসলাযুক্ত কাঁকড়া ভাজা, যা সসা ও পিঁয়াজের সালাদ সহকারে পরিবেশন করা হয়। সন্ধাকালে সৈকতে চমৎকার ঠাণ্ডা পরিবেশ বিরাজ করে এবং লকজন এখাঙ্কার মৃদু বাতাস উপভোগ করে। পুরা সৈকত জুড়ে সারিবদ্ধ পাম গাছ আছে। অসংখ্য মাছ ধরার নৌকা এখানে নোঙ্গর করা থাকে। এছাড়া পর্যটকদের জন্য স্পীডবোট পাওয়া যায়। অধিকাংশ পর্যটক পতেঙ্গা সৈকতে আসে সূর্যাস্ত ও সূর্যদ্বয়ের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করার জন্য।

ফয়েজ লেক

ফয়েজ লেক মানব সৃষ্ট একটি খাল যা, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশে অবস্থিত। এটি শহরের উত্তরাংশের পাহাড়ী ঢালের পানি প্রবাহকে বাধের মাধ্যমে আটকিয়ে খালটি ১৯২৪ সালে নির্মাণ করা হয় আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে। রেলওয়ে কলোনির আধিবাসিদের পানির সুবিধা প্রদানের উদ্দেশে। পরে এটির নাম রেলওয়ে প্রকৌশলী মি. ফয় এর নামানুসারে ফয়'জ লেক নামে পরিচিতি পায়। পাহারতলী মুলত চট্রগ্রামের একটি রেল এলাকা, যেখানে কারখানা, শেড আছে। এখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রেলওয়ে কর্মচারী বাস করে। বর্তমানে এখানে, বগি ওয়ার্কশপ, ডিজেল ওয়ার্কশপ,, লোকো শেড, পরীক্ষাগার, ভাণ্ডার, ইলেকট্রিক ওয়ার্কশপ, একটি স্কুল (স্থাপিত- ১৯২৪) অবস্থিত।
এটি রেলওয়ের সম্পত্তি। যাইহোক, বর্তমানে হ্রদটি কনকর্ড গ্রুপের বাবস্থয়াপনায়, চিত্তবিনোদন পার্ক হিসেবে আছে।

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত হচ্ছে কক্সবাজার। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক কক্সবাজারে ভ্রমণে আসছে। কক্সবাজার সৈকতে গেলে দেখা যায় অভাবনীয় দৃশ্য। হাজার হাজার নারী-পুরুষ শিশুর অপূর্ব মিলনমেলা। তাদের আনন্দ উচ্ছ্বাসে মুখরিত সাগর তীর। ভাটার টানে লাল পতাকার সতর্ক সংকেত না মেনে আবেগ আর উচ্ছ্বাসে মেতে সমুদ্রের পানিতে নেমে দুর্ঘটনার শিকারও হচ্ছে অনেক পর্যটক।কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে পানিতে ডুবে প্রাণহানির ঘটনা যাতে আর না ঘটে সে জন্য নেটিং ব্যবস্থার পরিকল্পনা নেয়া হলেও এ পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখেনি। শহরের অভ্যন্তরে ব্যাপকভাবে পাহাড় কাটা, বনাঞ্চল নিধন, সরকারি খাসজমি দখল করে অবৈধ ইমারত গড়ে ওঠার কারণে পর্যটন শহর এখন শ্রীহীন। তবুও কক্সবাজারের টানে পর্যটকরা আসছে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, ইনানিতে পাথরের সৈকত, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, হিমছড়ির ঝরনা, ডুলহাজারা সাফারিপার্কসহ কক্সবাজার জেলার পর্যটন স্পটগুলোতে পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় লেগেই আছে।

সেন্ট মার্টিন্‌স দ্বীপ

সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপ বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত একটি প্রবাল দ্বীপ। প্রচুর নারিকেল পাওয়া যায় বলে স্থানীয়ভাবে একে নারিকেল জিঞ্জিরাও বলা হয়ে থাকে। সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপে বিভিন্ন প্রজাতির প্রবাল,শামুক-ঝিনুক, সামুদ্রিক শৈবাল, গুপ্তজীবী উদ্ভিদ, সামুদ্রিক মাছ, উভচর প্রাণী ও পাখি দেখা যায়। দ্বীপটি বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। এখানে প্রতিদিন তিনটি লঞ্চ বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড (টেকনাফ) হতে আসা যাওয়া করে। এছাড়া টেকনাফ থেকে স্পীডবোটও চলাচল করে।
সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপে বর্তমানে বেশ কয়েকটি ভালো আবাসিক হোটেল রয়েছে। একটি সরকারি ডাকবাংলো আছে। সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভাল।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা

চট্রগ্রাম পার্বত্য জেলার অন্তর্গত রাঙামাটি পার্বত্য জেলা জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা। এখানে পর্যটক আকৃষ্ট অনেক কিছু দেখার আছে। বিশেষত কাপ্তাই হ্রদ যা, কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত বাঁধের দ্বারা সৃষ্ট। এই হ্রদের স্বচ্ছ ও শান্ত পানিতে নৌকা ভ্রমন অত্যন্ত সুখকর । হ্রদের উপর আছে ঝুলন্ত সেতু। জেলার বরকল উপজেলার শুভলং-এর পাহাড়ি ঝর্ণা ইতোমধ্যে পর্যটকদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। ভরা বর্ষামৌসুমে মূল ঝর্ণার জলধারা প্রায় ৩০০ ফুট উঁচু থেকে নিচে আছড়ে পড়ে। এছাড়া, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান উল্লেখযোগ্য ভ্রমন এলাকা।

নিঝুম দ্বীপ

নিঝুম দ্বীপ বাংলাদেশের একটি ছোট্ট দ্বীপ। নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার অর্ন্তগত নিঝুম দ্বীপ। একে 'দ্বীপ' বলা হলেও এটি মূলত একটি 'চর'।

খুলনা বিভাগ

সুন্দরবন

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত জীববৈচিত্র্যে ভরপুর পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। এই বনভূমি গঙ্গা ও রূপসা নদীর মোহনায় অবস্থিত সমুদ্র উপকুল তথা বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিস্তৃত। ২০০ বছর পূর্বে সুন্দরবনের প্রকৃত আয়তন ছিলো প্রায় ১৬,৭০০ বর্গ কিলোমিটার যা কমে এখন ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটারে এসে ঠেকেছে এই সুন্দরবনের ৬,০১৭ হাজার বর্গকিলোমিটার পড়েছে বাংলাদেশ সীমানায়। ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য বলে স্বিকৃতি দেয়ায় সুন্দরবন এখন বিশ্ব মানবতার সম্পদ। ধারনা করা হয় সুন্দরী গাছের নামানুসারেই সুন্দরবনের নাম করন হয়েছে। এই বনে সুন্দরী গাছ ছাড়াও, গেওয়া, কেওড়া, বাইন, পশুর, গড়ান, আমুরসহ ২৪৫ টি শ্রেণী এবং ৩৩৪ প্রজাতির গাছ রয়েছে। পৃথিবীতে মোট ৩টি ম্যানগ্রোভ বনের মধ্যে সুন্দরবন সর্ববৃহৎ। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ও জীব-বৈচিত্র্য দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আবহমান কাল ধরে আর্কষন করে আসছে। বিশেষ করে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, খালের পাড়ে শুয়ে থাকা কুমির এবং বানরের দল পর্যটকদের বেশি আকর্ষণ করে।

 ষাট গম্বুজ মসজিদ

ষাট গম্বুজ মসজিদ বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ। ধারণা করা হয়,১৫শ শতাব্দীতে খান-ই-জাহান এটি নির্মাণ করেছিলেন। এটি বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের একটির মধ্যে অবস্থিত; বাগেরহাট শহরটিকেই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো এই সম্মান প্রদান করে।

মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে বাইরের দিকে প্রায় ১৬০ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ১৪৩ ফুট লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে বাইরের দিকে প্রায় ১০৪ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ৮৮ ফুট চওড়া। দেয়ালগুলো প্রায় ৮•৫ ফুট পুরু।
মসজিদটির নাম ষাট গম্বুজ (৬০ গম্বুজ) মসজিদ হলেও এখানে গম্বুজ মোটেও ৬০টি নয়, গম্বুজ, ১১টি সারিতে মোট ৭৭টি। পূর্ব দেয়ালের মাঝের দরজা ও পশ্চিম দেয়ালের মাঝের মিহরাবের মধ্যবর্তি সারিতে যে সাতটি গম্বুজ সেগুলো দেখতে অনেকটা বাংলাদেশের চৌচালা ঘরের চালের মত। বাকি ৭০টি গম্বুজ আধা গোলাকার।

বরিশাল বিভাগ

কুয়াকাটা

কুয়াকাটা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি সমুদ্র সৈকত ও পর্যটনকেন্দ্র। কুয়াকাটা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত। বরিশাল বিভাগের শেষ মাথায় পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নের সর্ব দক্ষিণে এ সমুদ্রসৈকত। দৈর্ঘ্য ১৮ কিমি এবং প্রস্থ ৩ কিমি।  পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নে কুয়াকাটা অবস্থিত। ঢাকা থেকে সড়কপথে এর দূরত্ব ৩৮০ কিলোমিটার, বরিশাল থেকে ১০৮ কিলোমিটার। পর্যটকদের কাছে কুয়াকাটা "সাগর কন্যা" হিসেবে পরিচিত। কুয়াকাটা দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র সৈকত যেখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়, সব চাইতে ভালোভাবে সূর্যোদয় দেখা যায় সৈকতের গঙ্গামতির বাঁক থেকে আর সূর্যাস্ত দেখা যায় পশ্চিম সৈকত থেকে। প্রাকৃতিক সুন্দর্যের লীলাভূমি কুয়াকাটা। বর্তমানে সমুদ্রের করাল গ্রাসে প্রশস্ততা কিছুটা কমেছে।

ঢাকা বিভাগ

লালবাগের কেল্লা

লালবাগের কেল্লা বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনস্থল। সম্রাট আওরঙ্গজেব তার শাসনামলে লালবাগ কেল্লা নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র যুবরাজ শাহজাদা আজম ১৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দে এই প্রাসাদ দূর্গের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। তৎকালীন লালবাগ কেল্লার নামকরণ করা হয় আওরঙ্গবাদ কেল্লা বা আওরঙ্গবাদ দূর্গ। পরবর্তীতে সুবাদার শায়েস্তা খাঁনের শাসনামলে ১৬৮৪ খিষ্টাব্দে নির্মাণ কাজ অসমাপ্ত রেখে দূর্গটি পরিত্যাক্ত হয়। সে সময়ে নতুন ভাবে আওরঙ্গবাদ কেল্লা বাদ দিয়ে লালবাগ কেল্লা নামকরণ করা হয়। যা বর্তমানে প্রচলিত। বর্তমানে ( প্রেক্ষিত ২০১২ ) বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ব বিভাগ এই কেল্লা এলাকার রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। প্রশস্ত এলাকা নিযে লালবাগ কেল্লা অবস্থিত। কেল্লার চত্বরে তিনটি স্থাপনা রয়েছে-

  • কেন্দ্রস্থলের দরবার হল ও হাম্মাম খানা
  • পরীবিবির সমাধি
  • উত্তর পশ্চিমাংশের শাহী মসজিদ

 

আহসান মঞ্জিল

আহসান মঞ্জিল পুরনো ঢাকার ইসলামপুরে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। এটি পূর্বে ছিল ঢাকার নবাবদের প্রাসাদ। বর্তমানে এটি জাদুঘর হিসাবে ব্যাবহৃত হচ্ছে। এর প্রতিষ্ঠাতা নওয়াব আবদুল গনি। তিনি তার পুত্র খাজা আহসানুল্লাহ-র নামানুসারে এর নামকরণ করেন। এর নির্মাণকাল ১৮৫৯-১৮৭২ সাল। ১৯০৬ সালে এখানে এক অনুষ্ঠিত বৈঠকে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। প্রতিষ্ঠাতাকাল ১৮৭২। আহসান মঞ্জিল কয়েকবার সংস্কার করা হয়েছে। সর্বশেষ সংস্কার করা হয়েছে অতি সম্প্রতি।

 

শহীদ মিনার

শহীদ মিনার ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ। এটি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রস্থলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে অবস্থিত। প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ হয়েছিল অতিদ্রুত এবং নিতান্ত অপরিকল্পিতভাবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ শুরু করে রাত্রির মধ্যে তা সম্পন্ন করে। অবশেষে, বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেবার পরে ১৯৫৭ সালের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কাজ শুরু হয়। এর নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির তত্ত্বাবধানে। শহীদ মিনার এলাকায় বিভিন্ন রকম কর্মকান্ড পরিচালিত হলেও এটি এখনো অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।  ফেব্রুয়ারী ব্যতীত শহীদ মিনার অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকে।

 

জাতীয় সংসদ ভবন

জাতীয় সংসদ ভবন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রধান ভবন। এটি ঢাকার শেরে-বাংলা নগর এলাকায় অবস্থিত। প্রখ্যাত মার্কিন স্থপতি লুই কান এটির মূল স্থপতি।
 

রাজশাহী বিভাগ

সোমপুর বৌদ্ধবিহার

পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার বা সোমপুর বিহার বা সোমপুর মহাবিহার বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার। পালবংশের দ্বিতীয় রাজা শ্রী ধর্মপালদেব অষ্টম শতকের শেষের দিকে বা নবম শতকে এই বিহার তৈরি করছিলেন।১৮৭৯ সালে স্যার কানিংহাম এই বিশাল কীর্তি আবিষ্কার করেন। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়। এটি ৩০০ বছর ধরে বৌদ্ধদের অতি বিখ্যাত ধর্মচর্চা কেন্দ্র ছিল। শুধু উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকেই নয়, চীন, তিব্বত, মায়ানমার ( তদানীন্তন ব্রহ্মদেশ), মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশের বৌদ্ধরা এখানে ধর্মচর্চা ও ধর্মজ্ঞান অর্জন করতে আসতেন। খ্রিষ্টীয় দশম শতকে বিহারের আচার্য ছিলে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান।

 

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর রাজশাহী শহরে স্থাপিত বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর। এটি প্রত্ন সংগ্রহে সমৃদ্ধ। এই প্রত্ন সংগ্রহশালাটি ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থাপিত হয়েছিল। বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এটি পরিচালনা করে থাকে। বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর রাজশাহী মহানগরের কেন্দ্রস্থল হেতেম খাঁ-তে অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর। প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রহের দিক থেকে এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সংগ্রহশালা।

বাঘা মসজিদ

বাঘা মসজিদ রাজশাহী জেলা সদর হতে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বাঘা উপজেলায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। সুলতান নাসিরউদ্দীন নসরাত শাহ ১৫২৩ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। মসজিদটি ১৫২৩-১৫২৪ সালে (৯৩০ হিজরি) হুসেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দিন শাহের পুত্র সুলতান নসরাত শাহ নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় এই মসজিদের সংস্কার করা হয় এবং মসজিদের গম্বুজগুলো ভেঙ্গে গেলে ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদে নতুন করে ছাদ দেয়া হয় ১৮৯৭ সালে।

 

মহাস্থানগড়

মহাস্থানগড় বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রাচীন পুরাকীর্তি। পূর্বে এর নাম ছিল পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর। এটি সোমপুর এক সময় মহাস্থানগড় বাংলার রাজধানী ছিল। এখানে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন সাম্রাজ্যের প্রচুর নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। এর অবস্থান বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায়। বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১০ কি.মি উত্তরে অবস্থিত।

দর্শনীয় স্থান

  • মাজার শরীফ
  • কালীদহ সাগর
  • শীলাদেবীর ঘাট
  • জিউৎকুন্ড
  • বেহুলার বাসর ঘর
  • গোবিন্দ ভিটা
  • জাদুঘর

রংপুর বিভাগ

রামসাগর

রামসাগর দিনাজপুর জেলার তেজপুর গ্রামে অবস্থিত মানবসৃষ্ট দিঘি। এটি বাংলাদেশে মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় দিঘি। তটভূমিসহ রামসাগরের দৈর্ঘ্য ১,০৩১ মিটার ও প্রস্থ ৩৬৪ মিটার। গভীরতা গড়ে প্রায় ১০ মিটার। পাড়ের উচ্চতা ১৩.৫ মিটার। দীঘিটির পশ্চিম পাড়ের মধ্যখানে একটি ঘাট ছিল যার কিছু অবশিষ্ট এখনও রয়েছে। বিভিন্ন আকৃতির বেলেপাথর স্ল্যাব দ্বারা নির্মিত ঘাটটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ছিল যথাক্রমে ৪৫.৮ মিটার এবং ১৮.৩ মিটার। দীঘিটির পাড়গুলো প্রতিটি ১০.৭৫ মিটার উঁচু। ঐতিহাসিকদের মতে, দিনাজপুরের বিখ্যাত রাজা রামনাথ (রাজত্বকাল: ১৭২২-১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ) পলাশীর যুদ্ধের আগে (১৭৫০-১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে) এই রামসাগর দিঘি খনন করেছিলেন।তাঁরই নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় রামসাগর।

সিলেট বিভাগ

জাফলং

জাফলং, বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার অন্তর্গত, একটি এলাকা। জাফলং, সিলেট শহর থেকে ৬২ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে, ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত, এবং এখানে পাহাড় আর নদীর অপূর্ব সম্মিলন বলে এই এলাকা বাংলাদেশের অন্যতম একটি পর্যটনস্থল হিসেবে পরিচিত।
বাংলাদেশের সিলেটের সীমান্তবর্তি এলাকায় জাফলং অবস্থিত। এর অপর পাশে ভারতের ডাওকি অঞ্চল। ডাওকি অঞ্চলের পাহাড় থেকে ডাওকি নদী এই জাফলং দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। মূলত পিয়াইন নদীর অববাহিকায় জাফলং অবস্থিত। সিলেট জেলার জাফলং-তামাবিল-লালখান অঞ্চলে রয়েছে পাহাড়ী উত্তলভঙ্গ। এই উত্তলভঙ্গে পাললিক শিলা প্রকটিত হয়ে আছে, তাই ওখানে বেশ কয়েকবার ভূতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।

 

মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত

মাধবকুণ্ড ইকোপার্ক, বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের অন্তর্গত মৌলভীবাজার জ়েলার বড়লেখা উপজেলার কাঁঠালতলিতে অবস্থিত একটি ইকোপার্ক। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের রেস্টহাউজ ও রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এই ইকোপার্কের অন্যতম আকর্ষণ হলো মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, পরিকুণ্ড জলপ্রপাত, শ্রী শ্রী মাধবেশ্বরের তীর্থস্থান, এবং চা বাগান।
মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ জলপ্রপাত হিসেবে সমধিক পরিচিত। পাথারিয়া পাহাড় (পূর্বনাম: আদম আইল পাহাড়) কঠিন পাথরে গঠিত; এই পাহাড়ের উপর দিয়ে গঙ্গামারা ছড়া বহমান। এই ছড়া মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত হয়ে নিচে পড়ে হয়েছে মাধবছড়া। অর্থাৎ গঙ্গামারা ছড়া হয়ে বয়ে আসা জলধারা [১২ অক্টোবর ১৯৯৯-এর হিসাবমতে] প্রায় ১৬২ ফুট উঁচু থেকে নিচে পড়ে মাধবছড়া হয়ে প্রবহমান। সাধারণত একটি মূল ধারায় পানি সব সময়ই পড়তে থাকে, বর্ষাকাল এলে মূল ধারার পাশেই আরেকটা ছোট ধারা তৈরি হয় এবং ভরা বর্ষায় দুটো ধারাই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় পানির তীব্র তোড়ে। জলের এই বিপুল ধারা পড়তে পড়তে নিচে সৃষ্টি হয়েছে বিরাট কুণ্ডের। এই মাধবছড়ার পানি পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হতে হতে গিয়ে মিশেছে হাকালুকি হাওরে|

 

বাংলাদেশের ভূগোল

বাংলাদেশের ভূগোলঃ  বাংলাদেশের ভূখন্ডগত বিস্তৃতি ১৪৭, ৫৭০ বর্গ কিলোমিটার, যা গ্রীসের চাইতে সামান্য বড়। এর ভৌগোলিক অবস্থান ২০°৩৪´ উ থেকে ২৬°৩৮´ উ অক্ষাংশ এবং ৮৮°০১´ পূ থেকে ৯২°৪১´ পূ দ্রাঘিমাংশে। পূর্ব থেকে পশ্চিমে এর সর্বোচ্চ বিস্তৃতি প্রায় ৪৪০ কিমি এবং উত্তর উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্বে সর্বোচ্চ বিস্তৃতি ৭৬০ কিমি। বাংলাদেশের পশ্চিমে, উত্তরে, পুর্বে ও দক্ষিণ পূর্বে ঘিরে রয়েছে যথাক্রমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং মায়ানমার সীমান্ত। বাংলাদেশের সর্বমোট ভূসীমান্তের দৈর্ঘ্য ২৪০০ কিমি, যার ৯২% সীমান্ত ভারতের সাথে বাকি, ৮% সীমান্ত মায়ানমারের সাথে। দেশটির দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় সীমারেখা। যদিও বাংলাদেশ আয়তনের দিক থেকে একটি ক্ষুদ্র দেশ, এর উপকূলীয় সীমারেখার দৈর্ঘ্য ৪৮৩ কিলোমিটারের অধিক। বাংলাদেশের ভূখন্ডগত সমুদ্রসীমা ১২ নটিক্যাল মাইল (২২.২২ কিমি) এবং উপকূল থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল (৩৭০.৪০ কিমি) পর্যন্ত বিস্তৃত এর অর্থনৈতিক সমুদ্রসীমা। বঙ্গোপসাগর তার ঘূর্ণিঝড়সমূহের জন্য বহুল পরিচিত। এই ঝড় সমুদ্রের পানিকে সমুদ্রতীর হতে দূরবর্তী দ্বীপসমূহের উপকূলীয় এলাকায় আছড়ে ফেলে, কখনও কখনও তা বন্যারও সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের বিশাল এলাকা জুড়েই জলবেষ্টিত বদ্বীপ বনাঞ্চল পরিশোভিত যা,  সুন্দরবন নামে পরিচিত; এটাই পৃথিবী বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল।

বাংলাদেশ ৬টি মূল প্রশাসনিক অঞ্চল সমন্বয়ে গঠিত, যা বিভাগ নামে পরিচিত। এগুলো হলো বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী এবং সিলেট বিভাগ। এসকল বিভাগের অধীনে রয়েছে ৬৪টি জেলা এবং এই ৬৪টি জেলাকে বিভক্ত করা হয়েছে মোট ৪৯৬টি থানা/উপজেলায়। বাংলাদেশের ৯৫ থেকে ১১৯টি  ছিটমহল রয়েছে ভারতের রাষ্ট্রীয় সীমানায়। এসব ছিটমহল এলাকার পরিসীমা ০.৪ হেক্টর থেকে ২০.৭২ বর্গ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।

জনসংখ্যাঃ  গড় জনসংখ্যা ঘনত্বের দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীর প্রথম স্থানে রয়েছে এবং জনসংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীর ৮ম বৃহত্তম দেশ। সর্বমোট জনসংখ্যা ১২ কোটি ৯২ লক্ষ ৫০ হাজার (২০০১) এবং এখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৮৭৬ জন মানুষ বাস করে। জনসংখ্যার লৈঙ্গিক অনুপাত, ১০০:১০৪ (নারী:পুরুষ)। বাৎসরিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৪৮ (২০০১ আদমশুমারি পর্যন্ত) এবং সাত বছর বয়সের উপর জনসংখ্যার সাক্ষরতা হার ৩২.৪০% (২০০১)। বাংলাদেশে চারটি জাতি গোষ্ঠীর মানুষের অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়। এরা হলো দ্রাবিড়, আদি অস্ট্রেলীয়, মঙ্গোলীয় এবং বাঙালি। জনসংখ্যার দ্রাবিড়ীয় জাতির উপাদানের প্রতিনিধিত্ব করছে মূলত ওরাত্তঁগণ। এরা ভারতের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের মানবগোষ্ঠী। বাংলাদেশে এই গোষ্ঠীর মাত্র কয়েক হাজার মানুষ রয়েছেল-যারা দেশের ক্ষুদ্রতম জাতিগোষ্ঠী। সিলেটের চা বাগানের শ্রমিক জনগোষ্ঠীতে খাসিয়ারা রয়েছে যারা আদি অস্ট্রেলীয় জাতি গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। মঙ্গোলীয় জাতিগোষ্ঠীভুক্ত মানুষ শিলং মালভূমির দক্ষিণ অংশে, পার্বত্য চট্টগ্রামে এবং মধুপুর বনাঞ্চলে বসবাস করছে। এদের সংখ্যা ৫,০০,০০০-৬,০০,০০০। চাকমা, ত্রিপুরা, গারো, মুরং এবং মগ বাংলাদেশের মঙ্গোলীয় জাতিগোষ্ঠীর প্রধান জাতিসমূহ। পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৩টি পৃথক জাতি রয়েছে। এরা আবার প্রায় একশত পৃথক উপদলে বিভক্ত। বাঙালি এদেশে বসবাসকারী জাতিসমূহের মধ্যে সর্ববৃহৎ। দেশের সর্বমোট জনসংখ্যার শতকরা ৭৬.৬১ ভাগই বাঙালি (জানুয়ারি, ২০০১)। এই গোষ্ঠীটি অ-উপজাতীয় এবং উৎপত্তিগত দিক থেকে শঙ্কর জাতিগোষ্ঠী। ধর্মের ভিত্তিতে বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৮৮% মুসলিম, ১১% হিন্দু এবং অবশিষ্টদের মধ্যে রয়েছে বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং সর্বপ্রাণবাদীরা।

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সর্বাপেক্ষা কম শহরায়িত এলাকাসমূহের একটি। এখানে শহুরে জনসংখ্যার শতকরা হার ২০ ভাগ যেখানে গ্রামীণ জনসংখ্যার শতকরা হার ৮০ ভাগ। এখানে মহানগরের সংখ্যা মাত্র ৪টি (সিটি কর্পোরেশন) যদিও এখানে শতাধিক বিভিন্ন আকারের শহর এলাকা রয়েছে। ঢাকা দেশের রাজধানী এবং বৃহত্তম মহানগর। এ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ৯৯ লক্ষ। চট্টগ্রাম দেশের বন্দর নগরী, দ্বিতীয় সর্বপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ মহানগর; এর জনসংখ্যা ৩২ লক্ষ। এই মহানগরীতে বেশকিছু শিল্প এলাকা গড়ে উঠেছে। খুলনা দেশের দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থিত বাণিজ্য ও শিল্প কেন্দ্র; মংলা বন্দর এবং দৌলতপুর, খালিশপুরের শিল্প কারখানাগুলো এখানকার জনসংখ্যাকে ১২ লক্ষতে বৃদ্ধি করেছে (১৯৯৫)। দেশের শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রাজশাহী দেশের ৪র্থ বৃহত্তম নগর, জনসংখ্যা ৬ লক্ষ।

ভূপ্রকৃতিঃ বাংলাদেশ তিনটি বৃহৎ নদীপ্রণালী- গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার নিম্নতম প্রবাহ অঞ্চলে অবস্থিত এবং এর ভূখন্ডের প্রায় অর্ধাংশই ১০ মিটার সমোন্নতি রেখার নিচে। যুগপৎভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে উচ্চতা এবং ভূপ্রকৃতির উপর ভিত্তি করে দেশটির ভূমিকে তিনটি প্রধান ভূ-অঞ্চলে বিভক্ত করা যেতে পারে: টারশিয়ারি পাহাড় অঞ্চল (বর্তমান সময় থেকে ৬৬০ লক্ষ থেকে ২০ লক্ষ বৎসর পূর্বে), প্লাইসটোসিন উচ্চভূমি (বর্তমান সময় থেকে ২০ লক্ষ থেকে ১ লক্ষ বৎসর পূর্বে গঠিত) এবং নবীন সমভূমি (এক লক্ষ বৎসর পূর্বে এর গঠন শুরু হয়, বর্তমানে সে গঠন প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল)। বর্ষাকালীন ভারি বৃষ্টিপাত এবং দেশটির অধিকাংশ এলাকার সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে নিম্ন উচ্চতা দেশটিকে প্রতি বৎসর বন্যার মুখোমুখি করে।

কোয়াটারনারি পলল (২০ লক্ষ বৎসর পূর্বে শুরু হয়ে বর্তমান সময় পর্যন্ত সম্প্রসারিত)-এর সঞ্চয় ঘটেছে প্রধানত গঙ্গা (পদ্মা), ব্রহ্মপুত্র (যমুনা) এবং মেঘনা নদী ও তাদের অসংখ্য শাখা-প্রশাখার মাধ্যমে। বাংলাদেশের তিন চতুর্থাংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই পলল ভূমি। দেশের কেন্দ্রীয় উত্তরাঞ্চল এবং পশ্চিমাঞ্চলে বিস্তৃত বিশাল পলল সমভূমির ভূপ্রকৃতি এবং নিষ্কাশন ধরনে সাম্প্রতিক কালে লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটেছে। কোয়াটারনারি পললের সঞ্চয় ভূকাঠামোগত কর্মকান্ডের দ্বারা প্রভাবিত এবং নিয়ন্ত্রিত ছিল। গত ২০০ বৎসরে গঙ্গা ও তিস্তা নদীর পূর্বাভিমুখী গতি পরিবর্তন এবং সাথে সাথে ব্রহ্মপুত্র নদীর পশ্চিমাভিমুখী পরিবর্তন সাম্প্রতিক কালে ভূত্বকের বিরাট এলাকাব্যাপী বিচলন (epeirogenic movement)-এর প্রমাণ। পাহাড় এবং টিলাভূমিগুলির অবস্থান শিলং মালভূমির দক্ষিণ অংশের একটি সংকীর্ণ দীর্ঘ এলাকা জুড়ে। সিলেট জেলার পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলীয় অংশে এবং দেশের দক্ষিণপূর্বের চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকা, ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্য এবং মায়ানমার ইউনিয়নের সাথে সীমান্ত রচনা করেছে।

ভূপ্রকৃতি অনুসারে বাংলাদেশকে পাঁচটি পৃথক অঞ্চলে বিন্যস্ত করা যেতে পারে, যার প্রত্যেকটি অঞ্চলেরই রয়েছে নিজস্ব পৃথক বৈশিষ্ট্যসমূহ। ভূপ্রকৃতির বিস্তারিত ব্যাখ্যায় সমগ্র দেশটিকে ২৪টি উপ-অঞ্চল এবং ৫৪টি একক অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান অঞ্চল এবং উপ-অঞ্চলগুলি হলো: (১) পুরাতন হিমালয় পাদদেশীয় সমভূমি, (২) তিস্তা প্লাবনভূমি, (৩) পুরাতন ব্রহ্মপুত্র প্লাবনভূমি, (৪) ব্রহ্মপুত্র-যমুনা প্লাবনভূমি, (৫) হাওর অববাহিকা, (৬) সুরমা-কুশিয়ারা প্লাবনভূমি, (৭) মেঘনা প্লাবনভূমি- (ক) মধ্য মেঘনা প্লাবনভূমি, (খ) লোয়ার মেঘনা প্লাবনভূমি, (গ) পুরাতন মেঘনা মোহনা প্লাবনভূমি (ঘ) নবীন মেঘনা মোহনা প্লাবনভূমি, (৮) গাঙ্গেয় প্লাবনভূমি, (৯) গাঙ্গেয় জোয়ারভাটা প্লাবনভূমি, (১০) সুন্দরবন, (১১) নিম্নতর আত্রাই অববাহিকা, (১২) আড়িয়াল বিল, (১৩) গোপালগঞ্জ-খুলনা পিট অববাহিকা, (১৪) চট্টগ্রাম উপকূলীয় সমভূমি, (১৫) উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের পাদদেশীয় সমভূমি, (১৬) প্লাইসটোসিন সোপানসমূহ- (ক) বরেন্দ্রভূমি, (খ) মধুপুর গড় (গ) তিপারা পৃষ্ঠ, (১৭) উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি অঞ্চল- (ক) স্বল্প উচ্চতাবিশিষ্ট পাহাড়সারি (ডুপি টিলা ও ডিহিং স্তরসমষ্টি), (খ) পর্বতসারি (সুরমা ও টিপাম স্তরসমষ্টি)।

পাদদেশীয় সমভূমি  পাহাড়ের পাদদেশে ঢালু হয়ে নেমে আসা সমভূমিই পাদদেশীয় সমভূমি, পাহাড় থেকে বয়ে আসা নদী বা স্রোতধারার মাধ্যমে বা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মাধ্যমে পলিকণা এখানে এসে সঞ্চিত হয়। হিমালয় পাদদেশীয় সমভূমির একটি অংশ বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত - দিনাজপুর অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা এর অন্তর্ভুক্ত। এই পাদদেশীয় ভূমি গঠিত হয়েছিল প্লাইসটোসিন যুগের শেষ পর্যায়ে বা হলোসিন যুগের প্রাথমিক পর্যায়ে, তবে এ ভূমি মধুপুর কর্দমের তুলনায় নবীন।

পুরাতন ব্রহ্মপুত্র প্লাবনভূমি  গারো পাহাড়ের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্ত থেকে মেঘনা নদীর নিম্নাভিমুখে মধুপুর গড়ের পূর্বপ্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলটি মূলত প্রশস্ত শৈলশিরা (Ridges) এবং নিম্নভূমি দ্বারা গঠিত। নিম্নভূমি অঞ্চল সাধারণভাবে এক মিটারের অধিক গভীর বন্যা প্লাবিত হয়, কিন্তু তুলনামূলক উচ্চভূমি অঞ্চলে শুধুমাত্র বর্ষা মৌসুমে অগভীর বন্যা দেখা দেয়।

ব্রহ্মপুত্র-যমুনা প্লাবনভূমি  এই যুগ্ম নামটি মূলত বৃহৎ ব্রহ্মপুত্র নদীর ক্ষেত্রে ব্যবহূত হয়, যেহেতু যমুনা নদী খাতটি অপেক্ষাকৃত নতুন এবং এই নতুন গতিপথটি পুরাতন ব্রহ্মপুত্র থেকে স্পষ্টতই পৃথক। ১৭৮৭ সালের পূর্বে ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ পূর্ব দিক থেকে বর্তমান পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ অনুসরণ করত। ঐ বৎসর সম্ভবত একটি মারাত্মক বন্যার প্রভাবে ঝিনাই ও কোনাই নদীর দক্ষিণাভিমুখী গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে প্রশস্ত ও বিনুনি আকৃতির যমুনা নদীখাতের সৃষ্টি করে। ধারণা করা হয়, গতিপথের এই পরিবর্তন সম্পন্ন হয়েছিল ১৮৩০ সালের মধ্যে। দুটি বিশাল প্লাইসটোসিন ভূখন্ড বরেন্দ্রভূমি ও মধুপুর গড়ের ঊন্মেষের ফলে দুটি ভূখন্ডের মধ্যবর্তী অঞ্চল জুড়ে ভূঅবনমনের সৃষ্টি হয় যা একটি ভূ-উপত্যকার সৃষ্টি করে। এইটিই ব্রহ্মপুত্রের নতুন গতিপথ হিসেবে পরিচিত যা যমুনা নামে অভিহিত।

প্রশস্ত উচ্চ গঙ্গা প্লাবনভূমি দেশের পশ্চিম সীমান্তবর্তী গোদাগাড়ি উপজেলার প্রেমতলী থেকে বরেন্দ্রভূমির দক্ষিণ প্রান্ত এবং পূর্বে সুজানগর উপজেলা (পাবনা) পর্যন্ত বিস্তৃত, পূর্বপ্রান্তে গঙ্গা প্লাবনভূমি ঢালু হয়ে যমুনা প্লাবনভূমিতে মিশেছে। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদী তার গতিপথে মেঘনা প্লাবনভূমি গড়ে তুলেছে, যার মধ্যে নিম্ন উচ্চতাবিশিষ্ট উর্বর মেঘনা- শীতলক্ষ্যা দোয়াব অন্তর্ভুক্ত। তিতাস নদী এবং এর শাখা-প্রশাখা মেঘনার দিয়ারা ও চরাঞ্চলসমূহ, বিশেষ করে ভৈরববাজার ও দাউদকান্দির মধ্যে অবস্থিত দিয়ারা ও চরগুলি প্লাবনভূমিকে সমৃদ্ধ করেছে। মেঘনা নদীর বিশাল প্লাবনভূমি প্রাথমিক পর্যায়ে গড়ে উঠেছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের নিম্ন গতিপথ অঞ্চলে। হাওর অববাহিকা মূলত একটি বিশাল শান্ত নিম্নভূমির জলাভূমি, যা পশ্চিমে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র প্লাবনভূমি, উত্তরে মেঘালয় মালভূমির পর্বত পাদদেশীয় অঞ্চল এবং পূর্বে সিলেট সমভূমি দ্বারা পরিবেষ্টিত। পূর্ব-পশ্চিম এবং উত্তর-দক্ষিণ উভয় দিকে এর সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ১১৩ কিলোমিটারের সামান্য বেশি। অসংখ্য বিল এবং বিশাল হাওরবহুল এই পিরিচাকার এলাকার আয়তন ৭.২৫০ বর্গ কিমি। ধারণা করা হয়, বর্তমানের এই পিরিচ-আকার বিশাল জলমগ্ন এলাকা মধুপুর গড়ের ঊন্মেষের ঘটনার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

বদ্বীপ মূলত একটি নদীর অনুপ্রস্থভাবে অতিক্রম করা ধারা-উপধারা বাহিত পলিমাটি সঞ্চিত ভূমি, যা আকৃতিতে কমবেশি ত্রিভুজাকার প্রান্তিক প্লাবনভূমি। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপ পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বদ্বীপ। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, এই বদ্বীপের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৪৬,৬২০ কিমি, যা সমগ্রদেশের মোট এলাকার মোটামুটি এক তৃতীয়াংশের সামান্য কিছু কম (প্রায় ৩২%)। এই এলাকার মধ্যে নদীঅঞ্চল অন্তর্ভুক্ত। গঙ্গা ও পদ্মার উপর দক্ষিণ দিক বরাবর অংকিত কল্পিত রেখার দক্ষিণপূর্বের ফেনী নদীর নিম্নতর গতিপথ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকাটি ভূপ্রকৃতিগতভাবে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র (যমুনা) এবং মেঘনা নদীর বদ্বীপের অন্তর্গত। এই বিশাল বদ্বীপভূমিকে আরও পাঁচটি উপবিভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে, যেমন মৃত প্রায় বদ্বীপ, কেন্দ্রীয় বদ্বীপ অববাহিকা সমূহ, অপরিণত বদ্বীপ, পরিণত বদ্বীপ, এবং সক্রিয় বদ্বীপ। গঙ্গানদী এ পর্যায়ে বদ্বীপটির প্রধান নির্মাতা এবং বদ্বীপটির প্রায় চার পঞ্চমাংশ পলি সঞ্চয়ের উৎস।

প্লাইসটোসিন উচ্চভূমি কুমিল্লা জেলার লালমাই পাহাড় এবং সংলগ্ন পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড় থেকে মোটামুটিভাবে ঢাকা এবং রাজশাহী বিভাগের মধ্য দিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত সম্প্রসারিত। মেঘনা ও যমুনা নদীপ্রণালী প্লাইসটোসিন উচ্চভূমিকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছে, যার ফলে তিনটি উচ্চভূমি খন্ডের উদ্ভব ঘটেছে: বরেন্দ্রভূমি, মধুপুর গড় এবং তিপারা পৃষ্ঠ। প্লাইসটোসিন উচ্চভূমির চূড়ান্ত পশ্চিম সীমা নির্ধারণ করেছে গঙ্গা এবং এর দক্ষিণসীমা নির্ধারণ করেছে যমুনার প্রধান দুটি শাখা বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী। রাজশাহী বিভাগের সর্বউত্তরের প্লাইসটোসিন উচ্চভূমির প্রান্তরেখা হিমালয় পাদদেশীয় ভূমির সাথে মিশেছে এবং ময়মনসিংহ জেলায় এই উচ্চভূমির ঢাল পাললিক সমভূমিতে গিয়ে মিশেছে। বাংলাদেশের ভূখন্ডের ১০% এলাকা জুড়ে বিস্তৃত রয়েছে প্লাইসটোসিন উচ্চভূমি, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর গড় উচ্চতা ১৫ মিটারের উপরে।

পূর্ব এবং উত্তরের সীমান্তবর্তী পার্বত্য অঞ্চল বাংলাদেশের পর্বত এলাকার প্রতিনিধিত্বকারী অঞ্চল, যাকে দুটি প্রধান উপ-অঞ্চলে বিভক্ত করা যায়: ক) পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং খ) শিলং অধিত্যকার পার্বত্য পাদদেশ। পার্বত্য চট্টগ্রাম অর্থাৎ দেশের একমাত্র বিস্তৃত পর্বত এলাকাটি পাহাড়, টিলা, উপত্যকা এবং বনাঞ্চল সমৃদ্ধ। এ এলাকা বাংলাদেশের অন্যান্য অংশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভূপ্রকৃতির। অঞ্চলটি দেশের দক্ষিণপূর্ব অংশে অবস্থিত। দক্ষিণপূর্বে মায়ানমার সীমান্ত, উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত এবং পূর্বে মিজোরাম সীমান্ত দ্বারা পরিবেষ্টিত এই বিস্তৃত পার্বত্য এলাকাটি সাধারণত পাহাড়ের ব্যাপ্তি এবং নদী উপত্যকা অনুদৈর্ঘ্য বরাবর শ্রেণিবদ্ধ। পার্বত্য এলাকার দক্ষিণপূর্ব কোণে অবস্থিত মওদক মুয়াল হলো সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, এর উচ্চতা ১০০৩ মিটার। সমুদ্র উপকূলীয় সমভূমি আংশিক বালুকাময় এবং আংশিক নোনা কাদামাটি দ্বারা গঠিত। ফেনী নদী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত এই উপকূলীয় সমভূমির প্রশস্ততা স্থানভেদে ভিন্ন। প্রশস্ততার পরিসীমা ১ থেকে ১৬ কিমি পর্যন্ত। এ অঞ্চলে রয়েছে সেন্ট মার্টিন দ্বীপসহ কিছু সংখ্যক সামুদ্রিক দ্বীপ। পার্বত্য চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় অংশে সৃষ্টি করা হয়েছে একটি কৃত্রিম হ্রদ যা কাপ্তাই হ্রদ নামে পরিচিত। শুষ্ক মৌসুমে এ হ্রদের বিস্তৃতির আয়তন ৭৬৮ বর্গ কিমি এবং বর্ষা মৌসুমে এর আয়তন দাঁড়ায় ১০৩৬ বর্গ কিমি।

শিলং মালভূমির পাদদেশ এলাকাকে পশ্চিম থেকে পূর্বে তিনটি প্রধান ভূগাঠনিক (tectonic) উপ-একক অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়: গারো পাহাড়, খাসিয়া পাহাড় এবং জৈন্তিয়া পাহাড়, যার প্রায় সবটাই ভারতের ভূখন্ড জুড়ে রয়েছে। এই উচ্চ পাহাড়শ্রেণীর দক্ষিণ প্রান্তের পাদদেশীয় ভূমির পাহাড় ও টিলাময় একটি সংকীর্ণ অথচ দীর্ঘ এলাকাই শুধুমাত্র বাংলাদেশ ভূখন্ডের অন্তর্ভুক্ত।

জলতত্ত্বঃ  গঙ্গা-পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-যমুনা এবং সুরমা-মেঘনা এবং এদের অসংখ্য উপনদী ও শাখানদী বাংলাদেশে নিষ্কাশন প্রণালীর ধমনীর মতো কাজ করছে। কর্ণফুলি, সাঙ্গু, মাতামুহুরি, ফেনী, নাফ নদী এবং তাদের পানি প্রবাহ সরবরাহকারী নদীখাতসমূহ চট্টগ্রাম জেলা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পার্বত্য এলাকার পানি সরাসরি বঙ্গোপসাগরে নিষ্কাশিত করে। পার্বত্য এলাকার সর্ব পশ্চিমাঞ্চল থেকে উৎপন্ন বহুসংখ্যক স্রোতধারা সরাসরি বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। দেশজুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নদনদী বাংলাদেশের অহংকার। এদের মধ্যে গঙ্গা, পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, সুরমা, কর্ণফুলি এবং তিস্তা সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। এদের শাখানদী ও উপনদীর সংখ্যা ৭০০-র মতো। বঙ্গোপসাগর অভিমুখে প্রবাহিত এ সকল নদীর সর্বমোট দৈর্ঘ্য ২৪,১৪০ কিমি। ১২০ কিমি দীর্ঘ কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতটি একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। গঙ্গা,  ব্রহ্মপুত্র-যমুনা এবং মেঘনা এই তিনটি বৃহৎ নদীর মিলিত নিষ্কাশন অববাহিকার আয়তন প্রায় ১ কোটি ৬০ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। নদীগুলি বঙ্গোপসাগরে বয়ে নিয়ে আসে প্রচুর পরিমাণ পলি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা প্রতিদিন ১.২০০.০০০ টন পলি বহন করে আনে। প্রতিবৎসর গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদী প্রণালীর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে বয়ে আনা পলির পরিমাণ প্রায় ২.৪ বিলিয়ন টন।

জলবায়ুঃ  গ্রীষ্মমন্ডলীয় মৌসুমি বায়ু দ্বারা এ দেশের জলবায়ু বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। সমগ্র বৎসরকে স্পষ্টতই চারটি প্রধান ঋতুতে বিভক্ত করা হয়-  ক) প্রাক-বর্ষা মৌসুম, (খ) বর্ষামৌসুম, (গ) বর্ষা উত্তর মৌসুম এবং (ঘ) শুষ্ক মৌসুম (শীতকাল)। প্রাকবর্ষা মৌসুম মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বিস্তৃ্ত। এ সময়ে তাপমাত্রা এবং বাষ্পীভবনের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে, কখনও কখনও প্রচন্ড ঝড়ঝঞ্ঝা বিদ্যুৎসহ ঝড়বৃষ্টি সংঘটিত হয়। উপকূলীয় এলাকায় ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টিতে গ্রীষ্ম মন্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়সমূহ দায়ী। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিস্তৃত কাল বর্ষা মৌসুম। সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা এবং মেঘাচ্ছন্নতা মৌসুমের বৈশিষ্ট্য। বাৎসরিক বৃষ্টিপাতের শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি বৃষ্টিপাত এই সময়ে ঘটে। অক্টোবর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিস্তৃত কাল বর্ষাউত্তর মৌসুম। এ মৌসুম মূলত সূর্যালোকোজ্জ্বল, তপ্ত এবং আর্দ্র, তবে রাত্রিকালে প্রচুর শিশিরপাত ঘটে। এসময়ে আকস্মিক ঝঞ্ঝা বিদ্যুৎসহ ঝড় বৃষ্টি ঘটে থাকে। গ্রীষ্মমন্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়গুলি উপকূলীয় এলাকায় প্রভূত ক্ষতি সাধন করে। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিস্তৃত কাল শুষ্কমৌসুম তুলনামূলকভাবে শীতল, শুষ্ক এবং সূর্যকরোজ্জ্বল। এ সময় সাধারণভাবে স্বল্প শীতকালীন বৃষ্টিপাত ঘটে থাকে, তবে তা অনিশ্চিত (যদিও এ সময়ে বৃষ্টিপাত কৃষিকাজের জন্য উপকারী)।

বৎসর ব্যাপী তাপমাত্রা বিতরণ অনুসারে বাংলাদেশে স্পষ্টতই দুটি পৃথক ঋতু পরিদৃষ্ট হয়, একটি শীতল এবং একটি উষ্ণ মৌসুম। শীতল মৌসুমটি স্থায়ী হয় নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত এবং উষ্ণমৌসুম স্থায়ী হয় মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। ফেব্রুয়ারি একটি প্রান্তবর্তী মাস, পরবর্তী মাসসমূহ মার্চ, এপ্রিল এবং মে-তে উচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করে। সর্বত্রই গড় বাৎসরিক তাপমাত্রা ২৫° সেলসিয়াসের মতো অথচ মাসিক তাপমাত্রার গড় পরিসীমা জানুয়ারিতে ১৮°সে এবং এপ্রিল-মে তে তা ৩০°সে-এ দাঁড়ায়। মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রার ব্যাপ্তিটি ৪০°সে থেকে ৪৩°সে-এর মধ্যে থাকে; উপকূলীয় এলাকার কাছাকাছি এই পরিসীমাটি আরও সংকীর্ণতর। সমগ্র দেশ জুড়ে তাপমাত্রার ক্ষেত্রে ঋতুগত বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। সাধারণত সর্বোচ্চ প্রাক বর্ষা মৌসুম তাপমাত্রা দেশের পশ্চিমাঞ্চলে ঘটে থাকে। উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় শীত মৌসুমের ব্যাপ্তি ৩৫-৪০ দিনের, এসময়ে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৫°সে-এর নিচে থাকে। সর্ব উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে এ শীতমৌসুমের ব্যাপ্তি ১০০ দিনের মতো।

বর্ষা মৌসুমে গড় বৃষ্টিপাত অঞ্চলভেদে ভিন্নতর চিত্র তুলে ধরে। এই সময়ে দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাসমূহ রাজশাহী, বগুড়া, কুষ্টিয়া এবং যশোরে গড় বৃষ্টিপাতের সীমা ৮৯০ মিমি-এর মতো এবং দেশের দক্ষিণ-পূর্ব এবং উত্তর-পূর্ব অংশে এ মাত্রা ২,০৩০ মিমি-এর উপরে। দেশের সর্ব উত্তরপূর্বে শিলং অধিত্যকার পর্বত পাদদেশীয় অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের সর্বোচ্চ মাত্রা ৫০০০ মিমি-এর উপরে। গ্রীষ্মকালীন বৃষ্টি (যা বর্ষা মৌসুম হিসেবে পরিচিত) ছাড়াও ভূমধ্যসাগর থেকে সৃষ্ট শীতকালীন নিম্নচাপ এবং এপ্রিল-মে মাসে সংঘটিত বহুল পরিচিত কালবৈশাখী (বৈশাখের দুর্যোগ, মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য মে-তে সংঘটিত হয়) বাৎসরিক বৃষ্টিপাতে ভূমিকা রাখে। কালবৈশাখীর সময় বৃষ্টিপাতে অঞ্চলগত ভিন্নতা রয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলে এর পরিমাণ ২৫০ মিমি-এর মতো এবং পূর্বাঞ্চলে এ মাত্রা ৬৩৫ মিমি। নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত বিস্তৃত শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৫০ মিমি পর্যন্ত। ডিসেম্বর মাসে এ মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত ঘটে থাকে।

নভেম্বর থেকে মার্চে বৃষ্টিপাত  হ্রাস পেতে থাকে এবং এর পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিস্তৃত মৌসুমে। বাৎসরিক বৃষ্টিপাত পূর্ব থেকে পশ্চিমে হ্রাস পায়। জুন এবং জুলাই-এ সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে নিম্নতম বায়ুমন্ডলীয় চাপ ঘটে থাকে। শীত মৌসুমে প্রধানত উত্তর এবং উত্তরপূর্ব দিক থেকে বাতাস  প্রবাহিত হয়। উত্তর ও কেন্দ্রীয় এলাকায় ঘণ্টায় ১.৬১ থেকে ৩.২২ কিমি গতিতে শান্ত বায়ুপ্রবাহ দেখা দেয় এবং উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় এ মাত্রা ঘণ্টায় ৩.২২ থেকে ৬.৪৪ কিমি।

গ্রীষ্মের প্রাথমিক পর্যায়ে (এপ্রিল-মে) এবং বর্ষামৌসুমের শেষভাগে (সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত) প্রায়শই অতি উচ্চমাত্রার তীব্রতা সম্পন্ন ঝড় সংঘটিত হয়। এই সব ঝড় ঘণ্টায় ১৬০ কিমির ঊর্ধ্বের গতিবেগ সম্পন্ন বাতাস সৃষ্টি করতে পারে; বঙ্গোপসাগরে পানিকে ফুসে উঠতে সাহায্য করে ৬ মিটার পর্যন্ত উচ্চ জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি করে যা প্রচন্ড শক্তি নিয়ে উপকূলীয় এলাকায় ও সমুদ্র থেকে দূরবর্তী দ্বীপসমূহে আছড়ে পড়ে ঐ অঞ্চলকে প্লাবিত করে। এর ফলে জীবন ও সম্পদের প্রভূত ক্ষতি সাধিত হয়। যুগপৎভাবে উষ্ণতম সময়ে অর্থাৎ প্রাকবর্ষা মাসসমূহে মারাত্মক বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড়বৃষ্টি-কালবৈশাখী প্রধানত ঢাকা, ফরিদপুর এবং পাবনা জেলায় সংঘটিত হয়। এ ধরনের বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড়বৃষ্টির বৈশিষ্ট্য হলো বায়ু প্রবাহের দিকের আকস্মিক পরিবর্তন, তাপমাত্রার দ্রুত পতন এবং ১৫০ কিমি/ঘণ্টা পর্যন্ত বাতাসের গতিবেগ। বৃষ্টিপাতের সীমা সামান্য কয়েক মিমি থেকে এ পর্যন্ত সর্বাধিক ৫২৬ মিমি রেকর্ড করা হয়েছে ১৯৮৩ সালের ৩০ এপ্রিল নোয়াখালীতে। শিলাবৃষ্টিও ঘটে থাকে এবং প্রায়শই তা প্রভূত ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে।

ঢাকায় দিনের দৈর্ঘ্য ডিসেম্বরে যেখানে ১০.৭ ঘণ্টা, জুন মাসে তা ১৩.৬ ঘণ্টায় দাঁড়ায়। একইভাবে দিবাভাগে সূর্যালোক থাকে বর্ষা মৌসুমে দিনপ্রতি ৫.৪-৫.৮ ঘণ্টা, শীতমৌসুম এবং প্রাকবর্ষা মৌসুমে তা ৮.৫-৯.১ ঘণ্টায় পৌঁছায়। এক্ষেত্রে বৎসর জুড়ে সময়ভেদে বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। এই চিত্রটি মোটামুটিভাবে সমগ্র দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। বর্ষা মৌসুমে দেশের পূর্ব সীমান্ত এলাকায় অন্যান্য এলাকার তুলনায় দিনপ্রতি প্রায় ১ ঘণ্টা কম সূর্যালোক থাকে এবং শুষ্ক মৌসুমে উপকূলীয় এলাকায় দিনপ্রতি ১ ঘণ্টা অধিক সূর্যালোক থাকে।

বাংলাদেশের নদী

বাংলাদেশের নদীমালা এর গর্ব। এখানে প্রায় ৭০০টি নদী-উপনদী সমন্বয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নদীব্যবস্থা গড়ে ওঠেছে। বাংলাদেশের নদ-নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪,১৪০ কিমি। ছোট ছোট পাহাড়ি ছড়া, অাঁকাবাঁকা মৌসুমি খাড়ি, কর্দমপূর্ণ খালবিল, যথার্থ দৃষ্টিনন্দন নদ-নদী ও এদের উপনদী এবং শাখানদী সমন্বয়ে বাংলাদেশের বিশাল নদীব্যবস্থা গড়ে ওঠেছে। কিছু কিছু স্থানে যেমন, পটুয়াখালী, বরিশাল এবং সুন্দরবন অঞ্চলে নদীনালা এতো বেশি যে সে অঞ্চলে প্রকৃতই নদীজালিকার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের নদীনালাগুলো স্বাভাবিকভাবেই দেশের সর্বত্র সমভাবে বণ্টিত নয়। দেশের উত্তরভাগের উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ক্রমান্বয়ে দক্ষিণভাগের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে নদ-নদীর সংখ্যা এবং আকার দুইই বৃদ্ধি পেতে থাকে। নদীব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের নদীমালাকে চারটি প্রধান নদীব্যবস্থা বা নদী প্রণালীতে বিভক্ত করা যেতে পারে: ১) ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদী প্রণালী ২) গঙ্গা-পদ্মা নদী প্রণালী ৩) সুরমা-মেঘনা নদী প্রণালী এবং ৪) চট্টগ্রাম অঞ্চলের নদ-নদীসমূহ। বাংলাদেশের নদীমালার মধ্যে দৈর্ঘ্যের দিক থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ বিশ্বের ২২তম (২,৮৫০ কিমি) এবং গঙ্গা নদী ৩০তম (২,৫১০ কিমি) স্থানের অধিকারী।

নদীগুলোর এলাকাভিত্তিক একটি তালিকা নিম্নে সংযোজিত হলো:

রংপুর দুধকুমার, রাইডাক, ধরলা, তিস্তা, স্বাতি, বুড়িখোড়া-চিকি, খারভাজা, ঘাগট, যমুনেশ্বরী, আখির, খারখরিয়া, বাসমাই, দেওনাই, চিকি, নীলকুমার, ভরোলা, গদাধর, সনকোশ, নোয়াডিহিং, ডিসাঙ্গ, ডিখু, কালাঙ্গ, কাপিলি, তিতাস-গিরি, ব্রহ্মপুত্র: (২৬টি)।

দিনাজপুর  পাথরাজ, তালমা, পুনর্ভবা, চেপা, টাঙ্গন, ডাহুক, ঘোড়ামারা, যমুনা, কোরাম, আত্রাই, কুলিকা, বড়াল, গর্ভেশ্বরী, যমুনেশ্বরী, জলঢাকা, তোরসা, কল্যাণী, রাইদক: (১৮টি)।

রাজশাহী ফকিরনী-বারানাই, শিব-বারানাই, মহানন্দা, পাগলা, মুসা খান, গঙ্গা, বারানাই, হোজা, গোদারি, গুমানি: (১০টি)।

পাবনা গুর, বগুড়া-ইছামতী, বড়াল, হুরাসাগর, দুর্গাদহ, সুখদহ, বগুড়া (ইউসিয়াম), তালান: (৮টি)।

বগুড়া  করতোয়া, কথাকলি, বাঙ্গালি, তুলসী গঙ্গা, ছোটো যমুনা, নসার, বাদল: (৭টি)।

ঢাকা বংশী, তুরাগ, টঙ্গীখাল, বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা, গাজীখাল, বানার, বালু, লক্ষ্যা, লৌহজং, ফুলদি, ভুবনেশ্বরী, কীর্তিনাশা বা শ্রীপুর (শীতলক্ষ্যা), ইছামতী, মালিক বাদের খাল, গাজাহাটার খাল, ইলশামারী: (১৮টি)।

ময়মনসিংহ ঝিনাই, আইমন, সুতিয়া, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ঘরোটা নদী, সিমাহালি, নরসুন্দর, বোথাই, নিতারী, সোমেশ্বরী, কংশ, গুনাই, কাচামাঠিয়া, পানকুরা, সাইদুল, মোগরা, রাংরা, খারমোরী, মহাদেব, যদুকাটা, ধানু, বোয়ালাই, শিরখালি, চেল্লাখালি, মতিচিক, চালহি, বংশাই, মানস, পুতিয়া, জিনজিরাম, সুবনফিরি, বলেশ্বর, ভোগাই কংসা, কউলাই, ধনু, সিলাই, খারমেনি: (৩৭টি)।

সিলেট  সুরমা, পিয়াইন, সারি গোয়াইন, বাগরা গাঙ, নওয়া গাঙ, শেওলা, ধামালিয়া, মনাই বড়দাল, জুরি, মনু, ধলাই, লাংলা (কারাঙ্গি), খোয়াই, সুতাং, কুশিয়ারা, মাধবপুর, মহাসিং, খাজাঞ্চি, ভট্টখাল, কালনি, জামালপুর, বরাবা, লভা, হরি, বোগাপানি, ইটাখোলা,  ধরিয়ানা, ধোয়াই, যদুকাটা, ধলা-ধলাই গাঙ, গোপলা-লাংলা, মোগাই-চলতি, রক্তি, পৈন্দা, ভেরা, মোহানা, ধনু-বৌলাই: (৩৭টি)।

কুমিল্লা তিতাস, গোমতী, ধনাগোদা, ডাকাতিয়া, দাপলা গাঙ, হাওরা, কাঠালিয়া, সোনাই, তাটনল, বুড়ী, কুলিয়াঝুরি, বাতাকান্দি, মরিচা, আরশি, গোপী, মারজোরা, ঘুঙ্গট, খেরুনদী, বৈজানী, পাগলী, শিরাই, চান্দিনা খাল, কাকড়ি, মালদা, অ্যান্ডারসন খাল, মতলব, উদনন্দি বা উদমধি, কাগনি, হরিমঙ্গল, কুরুলিয়া, জায়দিন্দ, সোনাইমুড়ি, হন্দাচেরা, জাঙ্গালিয়া, দুরদুরিয়া, বুড়ীগঙ্গা বা বিজয়গঙ্গা, কালাডুমুরিয়া, বুড়িগাঙ, বিজয়পুর খাল, চৌদ্দগ্রাম খাল, নলিয়া, বিজলী, ঘুঙ্গর: (৪৪টি)।

নোয়াখালী  মধুখালি খাল, রহমতখালি খাল, মুহুরী, ছোটো ফেনী, সিলোনিয়া, ফেনী, ভুলুয়া, হাতিয়া, আতিয়াবারি খাল, কালির খাল, পাটকাটা খাল, কথাকলি খাল, বাপারাশি খাল, গোয়ালখালি খাল, আত্রা খাল, হুরা খাল, গাহোযাতলি খাল, হালদা, ইছামতী: (১৯টি)।

চট্টগ্রাম  হালদা, কর্ণফুলি, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, বাকখালি, সাতাল খাল, ইছামতী, মুহুরী, কাবলং, রাখিয়াং, সত্তা, শিল্পা, তুইবাং, ককা, শ্রীমা, বোয়ালখালি, মগদাই, ডং খাল, নারায়ণগিরি, চিরিঙ্গা, ইছাখালি, কুরসাই, সিঙ্গুর গঙ্গা, কাপ্তাই, রিগারী খিংর, চাঁদখালি, কুমিরাখালি, চেঙ্গি, মাইনী: (৩০টি)।

কুষ্টিয়া  মাথাভাঙা, গড়াই, জলাঙ্গি, মাগরখালি: (৪টি)।

যশোর  আপার ভৈরব, লোয়ার ভৈরব, চিত্রা, বেগবতী, নবগঙ্গা, চন্দনা, কপোতাক্ষ, বারাসিয়া, খোলপটুয়া এলেংখালি, পানগুবি, কবা, কালীগঙ্গা, কাঠিপাতা, দড়াটানার খাল, মরিছোপ, চাঁদখোনি, পাংগানি, নাইনগত্র সমুদ্র, বড় পাঙ্গা, কুমার, বড় গাংদিয়াদহ, আমলা মদরপুর, ডাকোয়া, মরা গড়াই, বারাসিয়া, পালং, আত্রাই। (২৮টি)।

ফরিদপুর মধুমতী, কুমার, আড়িয়াল খাঁ, আতাই নদী, মাদারিপুর বিল রুট: (৫টি)।

খুলনা  ভদ্রা, আঠারোবাঁকী, আলাইপুর খাল, খোলপটুয়া, শিবসা, রূপসা, বলেশ্বর, গাসিয়াখালি, পশুর, আড়, পাঙ্গানিয়া, ওড়াটমা, ইছামতী, নমুদ সমুদ্র, সোনাগাঙ্গ, ভাঙরা, কুঙ্গা, মালঞ্চ, সাতক্ষীরা, সুতাখালী, রাইমঙ্গল, মারজাত, হরিণভাঙা, মহাভাঙা, গলাঙ্গী, হরিপুর, সোনাই, বুধহাটার গাঙ, ঢাকি, গালঘেমিয়া, উজীরপুর কাটাখাল, গুচিয়াখালি, বদুরগাছা, ডেলুটি, মানস, কয়ারা, আড়-শিবসা, কালিন্দী, মজুদখালি খাল, আকরার খাল, মংলা, সোলা, পায়রা, আন্দ্রনমুখো, মুহুরী, মোদলা, হাড়িয়াভাঙা, গানগুবি, কচা, পাকাশিয়া, মৈয়ার গাং, কাবিপাতা, ঝাঁক, শিয়ালীর খাল, নারায়ণখালী, কদমতলি, বাংরা, শীলা, কলাগাছিয়া, বাঁশতলী, সালখি, শাকবাড়িয়া, আলকি, মানিকদিয়া, চন্দেশ্বর, পানকুশী, বলেশ্বর, বলমার্জার বা মাঞ্জাল, কাগীবাগ, রামপাল: (৭১টি)।

বরিশাল বিষখালি, স্বরূপকাঠী বা সন্ধ্যা, বাবুগঞ্জ, হেমদা, লোহালিয়া, শাহবাজপুর, নয়াভাঙা, রাজগঞ্জ, গণেশপুর, দুবালদিয়া, তোরকি বা তুর্কি, কীর্তনখোলা, ধরমগঞ্জ, ঝিলিনহা, মনকুঠা, মুলতানি, কারখোমা, আলগি, ধুলিয়া, গঙ্গালিয়া, বুড়িশ্বর, কালীগঙ্গা, হরিণঘাটা, পাতুয়া, তেঁতুলিয়া, ধলিয়া, নীলাশী, নবগঙ্গা, ভোলা, পাকাশিয়া, চন্দনা বা পাংশা, জাবনাসবাদ, বলেশ্বর, শশ্মান ঘাট, মৈয়ার গাং, নয়া ভাঙনী, গৌরনদী, কালাবদর, মীরগামারী, কচা বা কোচা, লতা, ইলিশ বা ইলশা, কবাখালি, মধুমতী, আন্ধার মানিক, রাবণাবাদ বা পটুয়া, বুড়া গৌরাঙ্গ, বাকেরগঞ্জ, আমতলা, ধানসিঁড়ি, সুগন্ধা, ঝালকাঠি, চালনা, এলেংখালি, নলবিটি, খরবোরাবাদ, গলাচিপা: (৫৭টি)।

সুন্দরবন অঞ্চল  বলেশ্বর, সুমতি, ছাপড়াখালি, বড় শেওলা, হরিণ চীনা, শরনখোলা, আমবাড়ে, চান্দেশ্বর, কাপা, কালিন্দি, সঠকা, জাভো, মরা পশুর, ডাংমারি, বিলে, ছুতোরখালি, চালো বগি, হরমহল, বেড়ি-আদা, বাকির খাল, আড়-শিবসা, হড্ডা, মহিষে, ছাছোন হোগলা, মজ্জত, শাকবাড়ে-সিঙ্গা, গোলখালি, কুকুমারি, কলাগাছে, ডোমরখালি, হংসরাগ, কাগা, নীলকমল, খেজুরদানা, সেজিখালি, বাইনতলা, বাঙ্গাবালী, দোবেকি, ফিরিঙ্গি, মানদো, কেওড়াসুতী, বন্দো, ধকোলা, লতাবেড়ি, ভেটুইপাড়া, বালুইঝাঁকি, কালিকাবাড়ী, বেকারদোন, আন্ধার মানিক, ঝালে, পাটকোষ্টা, বাসে, গোলভকসা, ধানিবুনে, হরিখালি, মনসার বেড়, পুষ্পকাটি, গঙ্গাসাগর, কালী লাই, বগী চেঁচানে, কুঁড়েখালি, ভূয়ের দনে, কাঠেশ্বর, সোনারুপাখালি, দুধমুখ, লাঠিকারা, তেরকাটি, ধানঘরা, আড়বাসে, দক্ষিণচরা, সাপখালি, কদমতলি, বুড়ের ডাবুর, লক্ষ্মী পশুর, মানকি, আশাশুনি, তালতক্তা, ধ্বজিখালি, মন্ডপতলা, নেতোখালি, ভায়েলা, বাগানবাড়ি, ঝাড়াবাগনা, বগাউড়া, বক্সখালি, চাইলতাবাড়ি, সিঙ্গড়তলি, মাথাভাঙা, নারায়ণতলি, কইখালি, মথুরা, খাসিটানা, আগুনজ্বালা, ফুলঝুরী, মালাবগা, খামুরদানা, উবদে, গুবদে, সোনাইপাঁঠী, ধোনাইর গাঙ, কানাইকাঠি, মরিচঝাঁপি, নেতাই তালপাঁঠী, ধনপতি, রাগাখালি, মুক্ত বাঙাল, আরিজাখালি, দুলোর টেক, যিনগিলি, বিবির মাদে, টেকাখালি, দেউর যাঁদে, চামটা কামটা, কুঞ্চে মাঠে, ব্যয়লা কয়লা, মাদার বাড়ে, বয়ার নালা, হানকে, ধনচের নদী, মূল্যে মেঘনা, বাইলো, বেতমুড়ি, বুড়িগোল্লি, চুনকুড়ি, মায়াদি, ফুলবাড়ি, তালতলি, আংরা কনা, গাড়ার নদী, বাদামতলি, ভুতের গাঙ, বৈকুণ্ঠ হানা, করপুরো, ছায়া হলড়ি, আড়ভাঙা, তালকপাঁঠী, খেজুরে কুড়ূলে, ছোটো শেওলা, কাঁচিকাটা, দাইর গাঙ, বৈকিরী, জালঘাটা, ইলিশমারি, ঝলকি, সাতনলা, মকুরনি, হেলার বেড়, কালিন্দে, শাকভাতে, গোন্দা, পালা, তেরবেঁকী, তালবাড়ে, হেড় মাতলা, ভুড়ভুড়ে, ছদনখালি, ফটকের দনে, ভরকুন্ডে, কেঁদাখালি, নওবেঁকী, কলসের বালি, পানির খাল, কুলতলি, বড়বাড়ে, মুকুলে, মধুখালি, পাশকাটি, গোছবা, ঘাট হারানো, গাবান্দারা, লোকের ছিপি, বাহার নদীপার, বড় মাতলা, পায়রা ঠুনী, কালবেয়ারা, ঢুকুনী, পারশে মারী: (১৭৭টি)।

বাংলাদেশের প্রধান নদনদী

নদীর নাম দৈর্ঘ্য (কিমি) প্রবাহিত এলাকা (বৃহত্তর জেলা) এবং দৈর্ঘ্য (কিমি)
আড়িয়াল খাঁ ১৬০ ফরিদপুর (১০২), বরিশাল (৫৮)
বংশী ২৩৮ ময়মনসিংহ (১৯৮) ঢাকা (৪০)
বেতনা-খোলপটুয়া ১৯১ যশোর (১০৩) খুলনা (৮৮)
ভদ্রা ১৯৩ যশোর (৫৮) খুলনা (১৩৫)
ভৈরব ২৫০ যশোর, খুলনা
ভোগাল-কংস ২২৫ ময়মনসিংহ (২২৫)
ব্রহ্মপুত্র-যমুনা (যমুনা ২০৭) ২৭৬ রংপুর (১৪০) পাবনা (১৩৬)
বুড়িগঙ্গা ২৭ ঢাকা (২৭)
চিত্রা ১৭০ কুষ্টিয়া (১৯) যশোর (১৫১)
ডাকাতিয়া ২০৭ কুমিল্লা (১৮০) নোয়াখালী (২৭)
ধলেশ্বরী ১৬০ ময়মনসিংহ, ঢাকা
ধনু-বৌলাই-ঘোড়াউত্রা ২৩৫ ময়মনসিংহ (১২৬), সিলেট (১০৯)
দোনাই-চরলকাটা-যমুনেশ্বরী-করতোয়া ৪৫০ রংপুর (১৯৩), বগুড়া (১৫৭), পাবনা (১০০)
গঙ্গা-পদ্মা (গঙ্গা ২৫৮, পদ্মা ১২০) ৩৭৪ রাজশাহী (১৪৫), পাবনা (৯৮), ঢাকা এবং ফরিদপুর (১৩৫)
গড়াই-মধুমতি-বলেশ্বর ৩৭১ কুষ্টিয়া (৩৭), ফরিদপুর (৭১), যশোর (৯২), খুলনা (১০৪), বরিশাল (৬৭)
ঘাঘট ২৩৬ রংপুর (২৩৬)
করতোয়া-আত্রাই-গুর-গুমানি-হুরাসাগর ৫৯৭ দিনাজপুর (২৫৯), রাজশাহী (২৫৮), পাবনা (৮০)
কর্ণফুলি ১৮০ পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম
কপোতাক্ষ ২৬০ যশোর (৮০) খুলনা (১৮০)
কুমার ১৬২ যশোর, ফরিদপুর
কুশিয়ারা ২২৮ সিলেট (২২৮)
ছোট ফেনী-ডাকাতিয়া ১৯৫ নোয়াখালী (৯৫), কুমিল্লা (১০০)
লোয়ার মেঘনা ১৬০ চাঁদপুর থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত
মাতামুহুরী ২৮৭ পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম
মাথাভাঙ্গা ১৫৬ রাজশাহী (১৬), কুষ্টিয়া (১৪০)
নবগঙ্গা ২৩০ কুষ্টিয়া (২৬), যশোর (২০৪)
পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ২৭৬ ময়মনসিংহ (২৭৬)
পুনর্ভবা ১৬০ দিনাজপুর (৮০), রাজশাহী (৮০)
রূপসা-পসুর ১৪১ খুলনা (১৪১)
সাঙ্গু ১৭৩ পার্বত্য চট্টগ্রাম (৯৩), চট্টগ্রাম (৮০)
সুরমা-মেঘনা ৬৭০ সিলেট (২৯০), কুমিল্লা (২৩৫), বরিশাল (১৪৫)
তিস্তা   ১১৫

রংপুর (১১৫)                      

খনিজ সম্পদ

দেশের অয়েল ও গ্যাস উইন্ডোর মধ্যে বিদ্যমান টারশিয়ারি বরাইল শিলাদল থেকে উৎপন্ন হয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ তেল। উৎপন্ন হওয়ার পর এ প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল উপরের দিকে বহু কিলোমিটারব্যাপী বিস্তৃত শিলাস্তর ভেদ করে উত্থিত হয়ে নিওজিন ভূবন ও বোকাবিল স্তরসমষ্টির মধ্যস্থিত সুবিধাজনক বেলেপাথর আধারে সঞ্চিত হয়। নুড়িপাথর, কাচবালি, নির্মাণ বালি, পিট ও সৈকত বালি প্রভৃতি খনিজ হলোসিন পললে পাওয়া যায়। দেশের উত্তরাঞ্চলের ক্ষুদ্র পাহাড়সমূহে বিদ্যমান প্লাইসটোসিন পললে পাওয়া যায় চীনামাটি বা কেওলিন। দেশের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে ভূ-পৃষ্ঠের অল্প গভীরতায়ও চীনামাটি ও কাচবালির মজুত আবিষ্কৃত হয়েছে। সীমিত মাত্রার উত্তোলনের মাধ্যমে চুনাপাথর, নির্মাণ বালি, কাচবালি, নুড়িপাথর, চীনামাটি ও সৈকত বালি আহরণ করা হচ্ছে। অন্তর্ভূপৃষ্ঠীয় মজুত থেকে চীনামাটি ও কাচবালি এখনও উত্তোলন করা হয় নি। তবে অন্তর্ভূপৃষ্ঠীয় কয়লা ও কঠিন শিলা উত্তোলনের কাজ এগিয়ে চলেছে।

তেল ও গ্যাস  বাংলাদেশে এ পর্যন্ত বিভিন্ন আকৃতির ২২টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এদের মধ্যে ২০টি গ্যাসক্ষেত্রে পরিমাপকৃত গ্যাসমজুতের পরিমাণ প্রায় ২৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। অধিকাংশ গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাসে কন্ডেনসেটের উপস্থিতি অল্প বা অতি অল্প বিধায় এদেরকে শুষ্ক গ্যাস (dry gas) বলা হয়। অল্প কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাসের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ  কন্ডেনসেট পাওয়া যায় এবং এদেরকে ভেজা গ্যাস (wet gas) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ ভেজা গ্যাসক্ষেত্রসমূহ হচ্ছে: বিয়ানীবাজার (প্রতি মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসে ১৬ ব্যারেল কন্ডেনসেট), জালালাবাদ (প্রতি মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসে ১৫ ব্যারেল কন্ডেনসেট) এবং কৈলাশটিলা (প্রতি মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসে ১৩ ব্যারেল কন্ডেনসেট)। বর্তমানে দেশে ব্যবহূত মোট বাণিজ্যিক জ্বালানির ৭০ ভাগই প্রাকৃতিক গ্যাসের দ্বারা মেটানো হচ্ছে এবং ভবিষ্যত জ্বালানি চাহিদার সিংহভাগ এ খাত থেকেই পূরণ হবে। প্রাকৃতিক গ্যাসের সর্বাধিক ব্যবহার হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতে যার পরিমাণ মোট ব্যবহারের ৪৪ শতাংশ, যার মাধ্যমে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৬৮ শতাংশ পাওয়া যায়। এর পরেই রয়েছে  সার উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার যার পরিমাণ মোট ব্যবহারের ২৮ শতাংশ এবং  শিল্প, গৃহস্থালী, বাণিজ্যিক ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের ব্যবহার ২২ শতাংশ। সরকারি ও বেসরকারি খাতে ১২টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে বর্তমানে গ্যাস উৎপাদন করা হচ্ছে এবং দৈনিক উৎপাদনের পরিমাণ ৯০০ থেকে ৯৩০ মিলিয়ন ঘনফুট।

দেশের একমাত্র খনিজ তেলক্ষেত্রটি আবিষ্কৃত হয় ১৯৮৬ সালে সিলেটের হরিপুরে। এ তেলক্ষেত্রে তেলের মোট মজুতের পরিমাণ প্রায় ১০ মিলিয়ন ব্যারেল যার মধ্যে উত্তোলনযোগ্য মজুতের পরিমাণ প্রায় ৬ মিলিয়ন ব্যারেল। ১৯৮৭ সালের জানুয়ারি মাসে হরিপুর তেলক্ষেত্র থেকে তেল উৎপাদন শুরু হয়। উৎপাদন শুরুর পরবর্তী সাড়ে ছয় বছরে এ তেলক্ষেত্র থেকে ০.৫৬ মিলিয়ন ব্যারেল খনিজ তেল উৎপাদন করা হয়। ১৯৯৪ সালের জুলাই মাস থেকে তেল উৎপাদন স্থগিত হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞগণের মতে, হরিপুর তেলক্ষেত্রটিকে যথার্থভাবে মূল্যায়ন করা হয় নি এবং সঠিক উপায়ে মূল্যায়নকার্য পরিচালনার পর পূর্ণমাত্রায় তেল উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।

কয়লা  ১৯৫৯ সালে ভূ-পৃষ্ঠের অত্যধিক গভীরতায় সর্বপ্রথম কয়লা আবিষ্কৃত হয়।  বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জি.এস.বি)-এর অব্যাহত প্রচেষ্টায় ৪টি কয়লাক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার যৌথ কোম্পানি বি.এইচ.পি-মিনারেলস আরও একটি কয়লাখনি আবিষ্কার করলে দেশে কয়লাখনির মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৫টিতে। আবিষ্কৃত সকল কয়লাখনিই দেশের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। নিচের সারণিতে এ সকল কয়লাখনির বিস্তারিত তথ্য ও কয়লার গুণাগুণ উপস্থাপন করা হয়েছে। আবিষ্কৃত পাঁচটি কয়লাখনির মধ্যে অন্যতম বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি উন্নয়নের কাজ শুরু হয় ১৯৯৬ সালে এবং ২০০১ সালের মে মাসে তা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও খনির নকশাজনিত কিছু পরিবর্তন আনয়নের দরুন তা শেষ হতে আরও কিছু সময় লাগবে। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির উত্তোলনযোগ্য মজুত ৬৪ মিলিয়ন টন এবং বার্ষিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ মিলিয়ন টন। উত্তোলিত কয়লা ব্যবহার করে ৩০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র খনির অদূরে স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

চুনাপাথর  ১৯৬০-এর দশকের প্রথমভাগে দেশের উত্তর-পূর্বভাগে অবস্থিত টাকেরঘাট এলাকায় ইয়োসিনযুগীয় চুনাপাথরের একটি ক্ষুদ্র মজুত থেকে চুনাপাথর আহরণ করে তা একটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরীতে সরবরাহ করা হয়।

প্রকৃতপক্ষে এটিই ছিল দেশের প্রথম খনি যেখান থেকে খনিজ সম্পদ আহরণ করা হয়। একই সময় জিওলজিক্যাল সার্ভে অব পাকিস্তান (জি.এস.পি) জয়পুরহাট জেলায় ভূ-পৃষ্ঠের ৫১৫ থেকে ৫৪১ মিটার গভীরতায় ১০০ মিলিয়ন টন মজুতবিশিষ্ট চুনাপাথরের অন্য আরেকটি খনি আবিষ্কার করে। প্রতিষ্ঠানটি তুলনামূলকভাবে অল্প গভীরতায় চুনাপাথরের মজুত অনুসন্ধানের লক্ষ্যে তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। জি.এস.পি-এর উত্তরসূরী প্রতিষ্ঠান জি.এস.বি ১৯৯০-এর দশকের মধ্যভাগে নওগাঁ জেলার জাহানপুর ও পরানগর এলাকায় যথাক্রমে ভূ-পৃষ্ঠের ৪৯৩ থেকে ৫০৮ মিটার ও ৫৩১ থেকে ৫৪৮ মিটার গভীরতায় চুনাপাথর আবিষ্কার করে। চুনাপাথরের এ মজুত দুটির পুরুত্ব যথাক্রমে ১৬.৭৬ মিটার এবং ১৪.৩২ মিটার।

কঠিন শিলা  নির্মাণ সামগ্রীর সংকটপূর্ণ এ দেশে রয়েছে প্রিক্যাম্ব্রিয়ান যুগীয় গ্রানোডায়োরাইট, কোয়ার্জ ডায়োরাইট, নিস প্রভৃতি কঠিন শিলার বিশাল মজুত। জি.এস.বি দিনাজপুর জেলার মধ্যপাড়া নামক স্থানে ভূ-পৃষ্ঠের ১৩২ মিটার থেকে ১৬০ মিটার গভীরতায় এ সকল কঠিন শিলার মজুত আবিষ্কার করে। এ শিলাসমূহের বিশুদ্ধ অবস্থায় আর.কিউ.ডি (Rock Quality Designation) ৬০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। উত্তর কোরিয়া সরকারের সহায়তায় এ খনির উন্নয়ন কাজ পরিচালিত হচ্ছে। এ খনি থেকে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে ২০০২ সালে এবং বার্ষিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১.৬৫ মিলিয়ন টন।

ধাতব খনিজ  খনিজ মজুত অনুসন্ধান চালিয়ে জি.এস.বি বেশ কটি সম্ভাব্য ধাতব খনিজ বলয় চিহ্নিত করতে সমর্থ হয়েছে। দেশের উত্তরপশ্চিম অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ নমুনা থেকে  চ্যালকোপাইরাইট, বোর্নাইট, চ্যালকোসাইট, কোভেলাইন, গ্যালেনা, স্ফালারাইটের মতো ধাতব খনিজ পাওয়া গেছে।

নির্মাণ কাজের বালি  দেশের বিভিন্ন নদনদীর তলদেশে এ বালি পাওয়া যায়। প্রধাণত মাঝারী থেকে মোটা দানাদার কোয়ার্টজ সমন্বয়ে এ বালি গঠিত। দালান, সেতু, রাস্তা ইত্যাদি নির্মাণে এ বালি ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হয়।

নুড়িপাথর  দেশের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকায় হিমালয়ের পাদদেশ বরাবর নুড়িপাথর পাওয়া যায়। বর্ষাকালে উজান এলাকা থেকে এসব নুড়িপাথর নদী দ্বারা বাহিত হয়ে আসে। নুড়িপাথর মজুতের মোট পরিমাণ প্রায় ১ কোটি কিউবিক মিটার। এ মজুত উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যবহার করা হচ্ছে।

গন্ডশিলা  বাংলাদেশের বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলার গন্ডশিলাসমুহ মূলত পাললিক শিলাজাত। অপরদিকে বৃহত্তর সিলেট জেলার জৈন্তাপুর ও ভোলাগঞ্জ এলাকার গন্ডশিলাসমূহের উৎসশিলা হলো আগ্নেয় বা রূপান্তরশিলা। এ সব অঞ্চল ছাড়াও সংলগ্ন পর্বতমালা থেকে উৎসারিত অসংখ্য পাহাড়ি নদীর তলদেশে ও নদীর কাছাকাছি এলাকায়ও গন্ডশিলা মজুত হয়। সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে এইসব পাহাড়ের অধিকাংশ অবস্থিত। টেকনাফের সমভূমি অঞ্চলের তিনটি স্থানে এবং উখিয়া উপজেলার ইনানীতে গন্ডশিলা সঞ্চিত আছে। টেকনাফ-কক্সবাজার সমুদ্রতীরের ৭টি স্থানে গন্ডশিলার আলাদা আলাদা মজুত রয়েছে।

চীনামাটি  বাংলাদেশে চীনামাটির উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে। ভূ-পৃষ্ঠের উপরে বা ভূ-পৃষ্ঠের সামান্য নিচে নেত্রকোণা জেলার বিজয়পুর (২৫ লক্ষ ৭ হাজার টন), শেরপুর জেলার ভুরুংগা (১৩ হাজার টন) ও চট্টগ্রাম জেলার হাইটগাঁও, কাঞ্চপুর, এলাহাবাদ (১৮ হাজার টন) এবং ভূ-পৃষ্ঠের অভ্যন্তরে দিনাজপুর জেলার মধ্যপাড়ায় (১ কোটি ৫০ লক্ষ টন) চীনামাটির মজুত আবিষ্কৃত হয়েছে। চীনামাটি বলতে মূলত কেয়োলিন কাদা মণিক দিয়ে গঠিত সিরামিক শিল্পে ব্যবহার্য উন্নতমানের কাদাকে বোঝানো হয়ে থাকে।

আফ্রিকা

আফ্রিকা আয়তন ও জনসংখ্যা উভয় বিচারে বিশ্বের ২য় বৃহত্তম মহাদেশ (এশিয়ার পরেই)। পার্শ্ববর্তী দ্বীপগুলোকে গণনায় ধরে মহাদেশটির আয়তন ৩০,২২১,৫৩২ বর্গ কিলোমিটার (১১,৬৬৮,৫৯৮ বর্গমাইল) । এটি বিশ্বের মোট ভূপৃষ্ঠতলের ৬% ও মোট স্থলপৃষ্ঠের ২০.৪% জুড়ে অবস্থিত। এ মহাদেশের ৬১টি রাষ্ট্র কিংবা সমমানের প্রশাসনিক অঞ্চলে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ, অর্থাৎ বিশ্বের জনসংখ্যার ১৪% বসবাস করে। আফ্রিকার প্রায় মাঝখান দিয়ে বিষুবরেখা চলে গেছে। এর বেশির ভাগ অংশই ক্রান্তীয় অঞ্চলে অবস্থিত। মহাদেশটির উত্তরে ভূমধ্যসাগর, উত্তর-পূর্বে সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগর, পূর্বে ভারত মহাসাগর, এবং পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর। উত্তর-পূর্ব কোনায় আফ্রিকা সিনাই উপদ্বীপের মাধ্যমে এশিয়া মহাদেশের সাথে সংযুক্ত।

আফ্রিকা একটি বিচিত্র মহাদেশ। এখানে রয়েছে নিবিড় সবুজ অরণ্য, বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, জনমানবহীন মরুভূমি, সুউচ্চ পর্বত এবং খরস্রোতা নদী। এখানে বহু বিচিত্র জাতির লোকের বাস, যারা শত শত ভাষায় কথা বলে। আফ্রিকার গ্রামাঞ্চলে জীবন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একই রয়ে গেছে, অন্যদিকে অনেক শহরে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া।

আফ্রিকা মানবজাতির আতুড়ঘর। বিজ্ঞানীরা মনে করেন আজ থেকে ৮০ থেকে ৫০ লক্ষ বছর আগে এখানেই আদি মানবেরা এপ-জাতীয় প্রাণী থেকে বিবর্তিত হয়। আজ থেকে ১ লক্ষ ৩০ হাজার থেকে ৯০ হাজার বছর আগে আধুনিক মানুষের উৎপত্তি ঘটে এবং এরা আফ্রিকা থেকে পৃথিবীর অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৫ হাজার বছর আগে উত্তর-পূর্ব আফ্রিকায় বিশ্বের প্রথম মহান সভ্যতাগুলির একটি, মিশরীয় সভ্যতা, জন্মলাভ করে। এরপর আফ্রিকাতে আরও বহু সংস্কৃতি ও রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ও পতন হয়েছে। ৫০০ বছর আগেও সারা আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে সমৃদ্ধ নগর, বাজার, এবং শিক্ষাকেন্দ্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল।

বিগত ৫০০ বছরে ইউরোপীয় বণিক ও ঔপনিবেশিকেরা ক্রমান্বয়ে আফ্রিকার উপর আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে। ইউরোপীয় বণিকেরা লক্ষ লক্ষ আফ্রিকানদের দাস হিসেবে উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের প্ল্যান্টেশনগুলিতে পাঠায়। ইউরোপীয়রা আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদ নিজেদের দেশের কলকারখানায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য নিষ্কাশন করা শুরু করে। ১৯শ শতকের শেষ নাগাদ ইউরোপীয়রা প্রায় সমস্ত আফ্রিকা মহাদেশ দখল করে এবং একে ইউরোপীয় উপনিবেশে পরিণত করে।

কোথাও সহিংস যুদ্ধ, আবার কোথাও বা ধীর সংস্কারের মাধ্যমে প্রায় সমস্ত আফ্রিকা ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকের মধ্যে স্বাধীনতা অর্জন করে। বিশ্ব অর্থনীতিতে উপনিবেশ-পরবর্তী আফ্রিকার অবস্থান দুর্বল। এখানকার যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা অনুন্নত এবং রাষ্ট্রগুলির সীমানা যথেচ্ছভাবে তৈরি। নতুন এই দেশগুলির নাগরিকদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিগত দিক থেকে একতা বলতে তেমন কিছুই ছিল না।

আফ্রিকাতে ৫৩টি রাষ্ট্র আছে। এদের মধ্যে ৪৭টি আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডে এবং ৬টি আশেপাশের দ্বীপগুলিতে অবস্থিত। সাহারা মরুভূমির মাধ্যমে মহাদেশটিকে দুইটি অংশে ভাগ করা হয়। সাহারা বিশ্বের বৃহত্তম মরুভূমি; এটি আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর অংশের প্রায় পুরোটা জুড়ে বিস্তৃত। সাহারার উত্তরে অবস্থিত অঞ্চলকে উত্তর আফ্রিকা বলা হয়। সাহারার দক্ষিণে অবস্থিত আফ্রিকাকে সাহারা-নিম্ন আফ্রিকা বলা হয়। সাহারা-নিম্ন আফ্রিকাকে অনেক সময় কৃষ্ণ আফ্রিকাও বলা হয়। উত্তর আফ্রিকার দেশগুলির মধ্যে আছে আলজেরিয়া মিশর লিবিয়া মরক্কো এবং তিউনিসিয়া। সাহার-নিম্ন আফ্রিকাকে আবার পশ্চিম আফ্রিকা, পূর্ব আফ্রিকা, মধ্য আফ্রিকা এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকা অঞ্চলগুলিতে ভাগ করা হয়। পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলি হল বেনিন, বুর্কিনা ফাসো, ক্যামেরুন, চাদ, আইভরি কোস্ট , ঘানা , গিনি , গিনি-বিসাউ , লাইবেরিয়া , মালি , মৌরিতানিয়া , নাইজার , নাইজেরিয়া , সেনেগাল , সিয়েরা লিওন , গাম্বিয়া  টোগো। পূর্ব আফ্রিকাতে আছে বুরুন্ডি , জিবুতি , ইরিত্রিয়া , ইথিওপিয়া , কেনিয়া , মালাউই , মোজাম্বিক , রুয়ান্ডা , সুদান , সোমালিয়া , তানজানিয়া এবং উগান্ডা। মধ্য আফ্রিকাতে আছে অ্যাঙ্গোলা , মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র , বিষুবীয় গিনি , গাবন, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র , গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র এবং জাম্বিয়া। দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকার দেশগুলির মধ্যে আছে বতসোয়ানা , লেসোথো , নামিবিয়া , দক্ষিণ আফ্রিকা , সোয়াজিল্যান্ড এবং জিম্বাবুয়ে। আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্রগুলির মধ্যে আছে আটলান্টিক মহাসাগরের কেপ ভার্দ এবং সাঁউ তুমি ও প্রিন্সিপি; ভারত মহাসাগরের কোমোরোস , মাদাগাস্কার , মরিশাস এবং সেশেল।

ইউরোপ

ইউরোপ একটি মহাদেশ যা বৃহত্তর ইউরেশিয়া মহাদেশীয় ভূখণ্ডের পশ্চিমের উপদ্বীপটি নিয়ে গঠিত। সাধারণভাবে ইউরাল ও ককেসাস পর্বতমালা, ইউরাল নদী, কাস্পিয়ান এবং কৃষ্ণ সাগর-এর জলবিভাজিকা এবং কৃষ্ণ ও এজিয়ান সাগর সংযোগকারী জলপথ ইউরোপকে এশিয়া মহাদেশ থেকে পৃথক করেছে।

ইউরোপের উত্তরে উত্তর মহাসাগর, পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর দক্ষিণে ভূমধ্যসাগর এবং দক্ষিণ-পূর্বে কৃষ্ণ সাগর ও সংযুক্ত জলপথ রয়েছে। যদিও ইউরোপের সীমানার ধারণা ধ্রুপদী সভ্যতায় পাওয়া যায়, তা বিধিবহির্ভূত; যেহেতু প্রাথমিকভাবে ভূ-প্রাকৃতিক শব্দ "মহাদেশ"-এ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উপাদান অন্তর্ভুক্ত।

ইউরোপ ভূপৃষ্ঠের দ্বারা বিশ্বের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম মহাদেশ; ১,০১,৮০,০০০ বর্গকিলোমিটার (৩৯,৩০,০০০ মা২) বা ভূপৃষ্ঠের ২% এবং তার স্থলভাগের ৬.৮% জুড়ে রয়েছে। ইউরোপের প্রায় ৫০টি দেশের মধ্যে, রাশিয়া মহাদেশের মোট আয়তনের ৪০% ভাগ নিয়ে এ পর্যন্ত আয়তন এবং জনসংখ্যা উভয়দিক থেকেই বৃহত্তম (যদিও দেশটির ভূভাগ ইউরোপ এবং এশিয়া উভয় অঞ্চলে আছে), অন্যদিকে ভ্যাটিকান সিটি আয়তনে ক্ষুদ্রতম। ৭৩৯–৭৪৩ মিলিয়ন জনসংখ্যা বা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১% নিয়ে ইউরোপ এশিয়া এবং আফ্রিকার তৃতীয় সবচেয়ে জনবহুল মহাদেশ। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মুদ্রা ইউরো।

ইউরোপ, বিশেষ করে প্রাচীন গ্রিস, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির জন্মস্থান। এটি ১৫ শতকের শুরু থেকে আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে, বিশেষ করে উপনিবেশবাদ শুরু হবার পর থেকে। ১৬ থেকে ২০ শতকের মধ্যে, ইউরোপীয় দেশগুলির বিভিন্ন সময়ে আমেরিকা, অধিকাংশ আফ্রিকা, ওশেনিয়া, এবং অপ্রতিরোধ্যভাবে অধিকাংশ এশিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। শিল্প বিপ্লব, যা ১৮ শতকের শেষেভাগে গ্রেট ব্রিটেনে শুরু হয়, পশ্চিম ইউরোপ এবং অবশেষে বৃহত্তর বিশ্বে আমূল অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, এবং সামাজিক পরিবর্তন আনে। জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বৃদ্ধি বোঝায়, ১৯০০ সাল দ্বারা, বিশ্বের জনসংখ্যায় ইউরোপের ভাগ ২৫% ছিল।

উভয় বিশ্বযুদ্ধ মূলত ইউরোপকে কেন্দ্র করে হয়, যার ফলে মধ্য ২০ শতকে বৈশ্বিক বিষয়াবলীতে পশ্চিম ইউরোপের আধিপত্যের অবসান ঘটে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের প্রাধান্য বিস্তার করে। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে, ইউরোপ লৌহ পরদা বরাবর পশ্চিমে ন্যাটো ও পূর্বে ওয়ারশ চুক্তি দ্বারা বিভক্ত ছিল। কাউন্সিল অব ইউরোপ এবং পশ্চিম ইউরোপে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউরোপীয় একীকরণে ফলে গঠিত হয়, ১৯৮৯ সালের বিপ্লব ও ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে উভয় সংগঠন পূর্বদিকে বিস্তৃত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আজকাল তার সদস্য দেশগুলোর উপর ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তার করছে। অনেক ইউরোপীয় দেশ নিজেদের মাঝে সীমানা এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ বিলুপ্ত করে।

এশিয়া

এশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে জনবহুল মহাদেশ, প্রাথমিকভাবে পূর্ব ও উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত। এটি ভূপৃষ্ঠের ৮.৭% ও স্থলভাগের ৩০% অংশ জুড়ে অবস্থিত। আনুমানিক ৪৩০ কোটি মানুষ নিয়ে এশিয়াতে বিশ্বের ৬০%-এরও বেশি মানুষ বসবাস করেন। অধিকাংশ বিশ্বের মত, আধুনিক যুগে এশিয়ার বৃদ্ধির হার উচ্চ। উদাহরণস্বরূপ, বিংশ শতাব্দীর সময়, এশিয়ার জনসংখ্যা প্রায় চারগুণ বেড়ে গেছে, বিশ্ব জনসংখ্যার মত।

এশিয়ার সীমানা সাংস্কৃতিকভাবে নির্ধারিত হয়, যেহেতু ইউরোপের সাথে এর কোনো স্পষ্ট ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা নেই, যা এক অবিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডের গঠন যাকে একসঙ্গে ইউরেশিয়া বলা হয়। এশিয়ার সবচেয়ে সাধারণভাবে স্বীকৃত সীমানা হলো সুয়েজ খাল, ইউরাল নদী, এবং ইউরাল পর্বতমালার পূর্বে, এবং ককেশাস পর্বতমালা এবং কাস্পিয়ান ও কৃষ্ণ সাগরের দক্ষিণে। এটা পূর্ব দিকে প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর এবং উত্তরে উত্তর মহাসাগর দ্বারা বেষ্টিত। ইউরাল পর্বতমালা, ইউরাল নদী, কাস্পিয়ান সাগর, কৃষ্ণসাগর এবং ভূমধ্যসাগর দ্বারা এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশ দুটি পরস্পর হতে বিচ্ছিন্ন। এছাড়া লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল এশিয়া মহাদেশকে আফ্রিকা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং উত্তর-পূর্বে অবস্থিত সংকীর্ণ বেরিং প্রণালী একে উত্তর আমেরিকা মহাদেশ থেকে পৃথক করেছে। উল্লেখ্য, বেরিং প্রণালীর একদিকে অবস্থান করছে এশিয়া মহাদেশের অন্তর্গত রাশিয়ার উলেনা এবং অপর পাশে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের অন্তর্গত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা। এই প্রণালীটির সংকীর্ণতম অংশটি মাত্র ৮২ কি•মি• চওড়া, অর্থাৎ বেরিং প্রণালীর এই অংশ হতে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের দূরত্ব মাত্র ৮২ কি•মি•।

এর আকার এবং বৈচিত্র্যের দ্বারা, এশিয়ার ধারণা – একটি নাম ধ্রুপদি সভ্যতায় পাওয়া যায় - আসলে ভৌত ভূগোলের চেয়ে মানবীয় ভূগোলের সাথে আরো বেশি সম্পর্কিত। এশিয়ার অঞ্চল জুড়ে জাতিগোষ্ঠী, সংস্কৃতি, পরিবেশ, অর্থনীতি, ঐতিহাসিক বন্ধন এবং সরকার ব্যবস্থার মাঝে ব্যাপকভাবে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

উত্তর আমেরিকা

উত্তর আমেরিকা পৃথিবীর উত্তর ও পশ্চিম গোলার্ধে অবস্থিত একটি মহাদেশ। একে কখনো কখনো আমেরিকার উত্তর উপমহাদেশও ধরা হয়। মহাদেশটি উত্তরে উত্তর মহাসাগর, পূর্বে আটলান্টিক মহাসাগর, দক্ষিণে ও পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর, এবং দক্ষিণ-পূর্বে দক্ষিণ আমেরিকা এবং ক্যারিবীয়ান সাগর পরিবেষ্টিত।

উত্তর আমেরিকার আয়তন ২৪,৭০৯,০০০ বর্গ কি.মি. (৯,৫৪০,০০০ বর্গ মাইল), যা পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রায় ৪.৮% এবং ভূ-পৃষ্ঠের ১৬.৫%। ২০০৭ সালে এই মহাদেশে প্রাক্কলিত জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫২ কোটি। আয়তনের দিক থেকে উত্তর আমেরিকা এশিয়া ও আফ্রিকার পরে ৩য় বৃহত্তম এবং জনসংখ্যার বিচারে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের পরে ৪র্থ বৃহত্তম মহাদেশ।

নিকটবর্তী ক্যারিবীয় দ্বীপাঞ্চল সহ, ২০১৩ সালের আদমশুমারি অনুসারে, উত্তর আমেরিকার জনসংখ্যা ছিল ৫৬৫ মিলিয়ন, অন্যভাবে বলা যায় পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার শতকরা ৭.৫ ভাগ।

বেরিং ল্যান্ড ব্রিজ অতিক্রম করে সর্বশেষ বরফ যুগের সময়, উত্তর আমেরিকাতে প্রথম মানব বসতি শুরু হয়। তথা-কথিত পালেও-ইন্ডিয়ান যুগের সমাপ্তি হয়, প্রায় ১০,০০০ বছর পূর্বে মেসো-ইন্ডিয়ান যুগের শুরুতে। ক্লাসিকাল যুগ ৬ষ্ঠ শতাব্দী থেকে ১৩তম শতাব্দী পর্যন্ত স্হায়ী হয়েছিল। প্রাক-কলম্বিয়ান যুগের সমাপ্তি ঘটে ইউরোপিয়ানদের আগমনের সাথে সাথে, এজ অব ডিসকভারি এবং আধুনিক যুগের শুরুতে। বর্তমান যুগের সাস্কৃতিক ও জাতিগত বিন্যাসে ইউরোপিয়ান ঔপনিবেশিক, আদিবাসী আমেরিকান, আফ্রিকান দাস এবং তাদের বংশধরদের প্রভাব বিদ্যমান। তন্মধ্যে মহাদেশটির উত্তরাংশে ইউরোপিয়ান প্রভাব এবং দক্ষিনাংশে আদিবাসী আমেরিকান ও আফ্রিকান প্রভাব সুস্পষ্ট। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাবে অধিকাংশ উত্তর আমেরিকানরা মূলত ইংরেজি, স্প্যানিস এবং ফ্রেঞ্চ ভাষায় কথা বলে। তাছাড়া সেখানকার সমাজ এবং রাস্ট্র ব্যবস্থাগুলো সাধারনত পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে প্রতিফলিত করে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ

বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপনা। বাংলাদেশে মাথাপিছু বিদ্যুৎশক্তির ব্যবহার খুবই কম, মাত্র ২২০ কিলোওয়াট ঘণ্টা। দেশের মাত্র ৪৭% মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা ভোগ করে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি/বিউবো) দেশের একমাত্র সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কর্তৃপক্ষ। বিদ্যুৎ বিতরণের জন্য প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা বিপিডিবি নিজে এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (আরইবি)। এছাড়া ঢাকা অঞ্চলের জন্য ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষ (ডিপিডিসি) ও ঢাকা বিদ্যুৎ সরবরাহ কোম্পানি (ডেসকো) এবং খুলনার জন্য আছে খুলনা বিদ্যুৎ সরবরাহ কোম্পানি (কেসকো)। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা। স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ প্রজেক্ট-এর (আইপিপি) অধীনে মন্ত্রণালয় সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন উদ্যোগগুলির উৎপাদন ও বিতরণ কার্যক্রমের উন্নয়নে উদ্যোগ নিয়েছে।

 

স্বাধীনতা লাভের পরপর বাংলাদেশে মোট ১১টি ইউনিটবিশিষ্ট ৭টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ছিল। এগুলি কাপ্তাই, শাহজীবাজার, সিদ্ধিরগঞ্জ, খুলনা, ঠাকুরগাঁও, রাজশাহী এবং বগুড়ায় অবস্থিত। পরবর্তীকালে আশুগঞ্জ, সিলেট, ফেঞ্চুগঞ্জ, ঘোড়াশাল, হরিপুর, রাউজান, বাঘাবাড়ি, ভেড়ামারা, সৈয়দপুর, বরিশাল, রংপুর, ভোলা, চট্টগ্রাম ও শিকলবাহায় সরকারি উদ্যোগে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। তবে নববই দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে সরকার শিল্প-কারখানাগুলিতে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে উৎসাহিত করছে যাতে লোড শেডিং-এর সময়ও কারখানাগুলিতে বিরতিহীন উৎপাদন চলতে পারে। প্রাইভেট পাওয়ার কোম্পানিগুলিকে নির্দিষ্ট শর্তে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এ নীতির সুযোগ নিয়ে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানি বার্জ মাউন্টেড বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছে। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কেন্দ্রগুলি বাঘাবাড়ি, হরিপুর, খুলনা, ময়মনসিংহ ও মেঘনাঘাটে অবস্থিত। ২০০৯ সাল নাগাদ সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত মোট ৪৩টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত ১৮টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ৩৮২৪ মেগাওয়াট এবং বেসরকারি উদ্যোগে স্থাপিত ২৫টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা ২১০৪ মেগাওয়াট। তবে এসব কেন্দ্র থেকে প্রকৃতপক্ষে উৎপাদনক্ষমতার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় না। পিক আওয়ারে সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি থেকে সর্বোচ্চ ৩৩৩১ এবং বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি থেকে ২০৪৫ মেগাওয়াটসহ মোট সর্বোচ্চ ৫৩৭৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়।

বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ধরণ  বর্তমানে বাংলাদেশে পাঁচ ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়ে থাকে। এগুলি হলো: ১. স্টিম টারবাইন, ২. গ্যাস টারবাইন, ৩. কম্বাইন্ড সাইকেল গ্যাস টারবাইন, ৪. হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট বা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ৫. উইন্ড টারবাইন পাওয়ার প্ল্যান্ট।

স্টিম টারবাইন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিতে মূলত প্রাকৃতিক গ্যাসের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্বালানি হিসেবে কয়লা এবং ফারনেস অয়েলও ব্যবহূত হয়ে থাকে। দেশের সবচেয়ে বড় স্টিম টারবাইন বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নরসিংদী জেলার ঘোড়াশালে অবস্থিত। ৫৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি এবং ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ইউনিটের মাধ্যমে এ কেন্দ্রটি সর্বমোট ৯৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম। ঘোড়াশালে দ্বৈত জ্বালানির মাধ্যমে পরিচালিত ২০০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন আরেকটি ইউনিটের নির্মাণকাজ চলছে।

দেশের একমাত্র কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দিনাজপুর জেলার বড় পুকুরিয়ায় অবস্থিত। এ কেন্দ্রে রয়েছে প্রতিটি ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মোট দুটি ইউনিট। একই ক্ষমতার আরেকটি ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ফারনেস অয়েলভিত্তিক পাওয়ার প্ল্যান্ট রয়েছে খুলনা জেলার গোয়ালপাড়ায়। এ কেন্দ্রের দুটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ৬০ ও ১১০ মেগাওয়াট, অর্থাৎ মোট ১৭০ মেগাওয়াট।

বাংলাদেশে ইদানিং দুধরনের গ্যাস টারবাইন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। যথা: পিকিং প্ল্যান্ট এবং বেজ লোড প্ল্যান্ট। এর মধ্যে পিকিং প্ল্যান্টগুলি মূলত ওপেন সাইকেল গ্যাস টারবাইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, আর বেজ লোড প্ল্যান্টগুলি পরিচালিত হয় কম্বাইন্ড সাইকেল গ্যাস টারবাইনের মাধ্যমে। গ্যাস টারবাইন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির মধ্যে হরিপুরে প্রতিটি ৩৩ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি বেজ লোড প্ল্যান্ট ইউনিট এবং সিদ্ধিরগঞ্জে প্রতিটি ১০৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি পিকিং প্ল্যান্ট ইউনিট রয়েছে। কম্বাইন্ড সাইকেল গ্যাস টারবাইন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির মধ্যে মেঘনাঘাট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা ৪৫০ মেগাওয়াট। এছাড়া ফেঞ্চুগঞ্জ, বাঘাবাড়িসহ আরো কয়েকটি ছোটখাটো ইউনিটে কম্বাইন্ড সাইকেল গ্যাস টারবাইন ব্যবহূত হয়।

বাংলাদেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাইয়ে অবস্থিত। ১৯৬২ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে স্থাপিত পাঁচটি ইউনিটের মাধ্যমে এখানে মোট সর্বোচ্চ ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। কেন্দ্রটিতে আরো দুটি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার খুব সামান্য অংশই এ কেন্দ্র মেটাতে সক্ষম।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহূত প্রাথমিক জ্বালানির সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব্ দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিতে তাই জ্বালানি হিসেবে কয়লা, এলএনজি, পরমাণুশক্তি, বায়ুশক্তি এবং সৌরশক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ফেনীর মাতামুহুরিতে দেশের প্রথম বায়ূভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে, যেখানে ২২৫ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন চারটি ইউনিটের মাধ্যমে ০.৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। কুতুবদিয়ায় এ রকম আরেকটি কেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা ২০ কিলোওয়াট।

পাবনার রূপপুরে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ কেন্দ্রে প্রতিটি ১০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ইউনিট স্থাপন করা হবে। কেন্দ্রটি ২০১৭-১৮ সাল নাগাদ চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

 

বিদ্যুৎ ব্যবস্থা  একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক যা বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও সরবরাহ সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ও উপকরণকে সংযুক্ত করে। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় ৫০ হার্টজ ফ্রিকোয়েন্সিতে এবং ১১ কিলোভোল্ট বা ১৫ কিলোভোল্টে যা উচ্চ ভোল্টের সঞ্চালন নেটওয়ার্ক বা গ্রিডে প্রেরণের জন্য ট্রান্সফরমার দিয়ে ১৩২ বা ২৩০ কেভিতে উন্নীত করা হয়। বিভিন্ন ধরনের গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করার জন্য গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ গ্রিড সাব-স্টেশনে ট্রন্সফরমারের মাধ্যমে ৩৩ কেভি, ১১ কেভি এবং ০.৪ কেভিতে নামিয়ে আনা হয়।

২০০৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বিদ্যুৎ গ্রিডে প্রায় ২,৩১৪ সার্কিট কিলোমিটার ২৩০ কেভি লাইন, ৫,৫৩৩ সার্কিট কিলোমিটার ১৩২ কেভি লাইন এবং ১৬৭ সার্কিট কিলোমিটার ৬৬ কেভি সঞ্চালন লাইন অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২৩০ কেভি এবং ৬৬ কেভি লাইনগুলি ১৩২ কেভি নেটওয়ার্কের সাথে যথাক্রমে ২৩০/১৩২ কেভি এবং ১৩২/৬৬ কেভি আন্তঃবাস ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে সংযুক্ত। এ ছাড়া ৮৫টি গ্রিড সাব-স্টেশন আছে যেগুলিতে উচ্চ ভোল্টের সঞ্চালন লাইন থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে লক্ষাধিক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৩১ কেভি, ১১ কেভি এবং ০.৪ কেভি বিতরণ লাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করা হয়।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) গ্রাহকদের নিকট সরবরাহকৃত বিদ্যুতের প্রায় ৭৫% উৎপাদন করে। আর দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলির যৌথ মালিকানাধীন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি যেমন স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী (Independent Power Producer-IPP) এবং ভাড়ায় চালিত বিদ্যুৎ প্লান্টগুলি (Rental Power Plant-RPP) অবশিষ্ট ২৫% ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে বিউবোর কাছে গ্রিডের মাধ্যমে বিক্রয় করে। বিউবো আবার বিভিন্ন বিতরণ সংস্থার কাছে বিদ্যুৎ বিক্রয় করে। অবশ্য কয়েকটি ছোট ছোট IPP পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ৩৩ কেভি বিতরণ নেটওয়ার্কে সরাসরি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। গ্রিড সিস্টেম বা সঞ্চালন লাইনের নেটওয়ার্কটি পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (PGCB) নামক একটি সরকরি কোম্পানির মালিকানা ও পরিচালনাধীন। সারাদেশে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্ব কয়েকটি সরকারি সংস্থা বা কোম্পানির উপরে নিজ নিজ সুনির্দিষ্ট এলাকা ভিত্তিক ন্যাস্ত আছে। এ সমস্ত প্রতিষ্ঠান হল বিউবো, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, ডিপিডিসি, ডেসকো এবং ওজোপডিকো (পশ্চিম অঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি)।

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে পদ্মা ও যমুনা নদী দ্বারা দুটি সুস্পষ্ট অঞ্চলে বিভক্ত। পূর্বাঞ্চলে জলবিদ্যুৎ ও পর্যাপ্ত গ্যাসফিল্ড থাকায় বিদ্যুতের সিংহভাগ এ অঞ্চলে উৎপাদিত হয়। পক্ষান্তরে পশ্চিমাঞ্চলে কয়েকটি জায়গায় কয়লার খনির সন্ধান পাওয়া গেলেও শুধুমাত্র বড়পুকুরিয়া থেকে কয়লা উত্তোলন শুরু হয়েছে। সেখান থেকে আহরিত কয়লা ২৫০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাবিশিষ্ট একটি বিদুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে ব্যবহার করা হচ্ছে। পশ্চিমাঞ্চলে কয়লার পাশাপাশি বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ফার্নেস অয়েল দিয়ে এবং পূর্বাঞ্চল থেকে যমুনা সেতুর নিচ দিয়ে একটি পাইপ লাইনের মাধ্যমে গ্যাস নিয়েও কিছু সীমিত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমাঞ্চল একটি বিদ্যুৎ ঘাটতি এলাকা যাকে পূর্বাঞ্চল থেকে ২৩০ কেভির দুটি পূর্ব-পশ্চিম আন্তঃসংযোগ সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আনতে হয়। এ কারণে সিস্টেমে কোন গোলযোগ হলে ব্ল্যাকআউট পরিহার বা সীমিত করার লক্ষ্যে দুটি অঞ্চলের সিস্টেমকে তাৎক্ষণিকভাবে আলাদা করে পরিচালনা করার সুযোগ নেই বললেই চলে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেক্টরে বেসরকারি এবং বিদেশি উদ্যোগ ও বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বিবিধ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা সত্ত্বেও পুরনো বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলির সময়োচিত ওভারহলিং এবং নতুন নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে অর্থ সংকুলান ও পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা রয়েই গেছে। অথচ প্রতি বৎসরই গ্রাহকদের বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ১০% হারে বেড়ে চলছে। তাছাড়া বর্তমান বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির পুরাতন জরাজীর্ণ দশা, উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাওয়া ও প্রায়ই সমস্যায় পতিত হওয়া এবং কম চাপে গ্যাস সরবরাহের দরুণ বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম হয়। ২০০৯ সালে গ্রীষ্মকালীন একটি দিনে সর্বোচ্চ চাহিদাকালীন সময়ে সচরাচর ৫০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার বিপরীতে পূর্বাঞ্চলে ৩৩০০ মেগাওয়াট এবং পশ্চিমাঞ্চলে ৬০০ মেগাওয়াট মাত্র বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতো। স্পষ্টতই গ্রিড সিস্টেম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটিকে সিস্টেম স্থিতিশীল ও কর্মক্ষম রাখার স্বার্থে ১০০০ মেগাওয়াট এর মত ব্যাপক লোডশেডিং এর আশ্রয় নিতে হয়।

তবে সরকার কর্তৃক প্রতিবেশী দেশসমূহ যেমন নেপাল, ভুটান, মায়ানমার থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির প্রচেষ্টা এবং গ্রিড বহির্ভূত দুর্গম গ্রামাঞ্চলে ক্ষুদ্র পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম গ্রহণের পাশাপাশি আগামী এক দশকের মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলে আরো কয়েকটি কয়লাভিত্তিক এবং একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য আশাব্যাঞ্জক হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়া  একটি দ্বীপ-মহাদেশ। এটি এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্বে ওশেনিয়া অঞ্চলে অবস্থিত। কাছের তাসমানিয়া দ্বীপ নিয়ে এটি কমনওয়েল্‌থ অফ অস্ট্রেলিয়া গঠন করেছে। দেশটির উত্তরে তিমুর সাগর, আরাফুরা সাগর, ও টরেস প্রণালী; পূর্বে প্রবাল সাগর এবং তাসমান সাগর; দক্ষিণে ব্যাস প্রণালী ও ভারত মহাসাগর; পশ্চিমে ভারত মহাসাগর। দেশটি পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৪০০০ কিমি এবং উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৩৭০০ কিমি দীর্ঘ। অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের ক্ষুদ্রতম মহাদেশ, কিন্তু ৬ষ্ঠ বৃহত্তম দেশ। অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরা। সিডনী বৃহত্তম শহর। দুইটি শহরই দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থিত।

গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ বিশ্বের বৃহত্তম প্রবাল প্রাচীর। এটি অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব সীমান্ত ধরে প্রায় ২০১০ কিমি জুড়ে বিস্তৃত। এটি আসলে প্রায় ২৫০০ প্রাচীর ও অনেকগুলি ছোট ছোট দ্বীপের সমষ্টি। কুইন্সল্যান্ডের তীরের কাছে অবস্থিত ফেয়ারফ্যাক্স দ্বীপ গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের অংশ।

অস্ট্রেলিয়া ৬টি অঙ্গরাজ্য নিয়ে গঠিত - নিউ সাউথ ওয়েল্স, কুইন্সল্যান্ড, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া, তাসমানিয়া, ভিক্টোরিয়া, ও পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া। এছাড়াও আছে দুইটি টেরিটরি — অস্ট্রেলীয় রাজধানী টেরিটরি এবং উত্তর টেরিটরি। বহিঃস্থ নির্ভরশীল অঞ্চলের মধ্যে আছে অ্যাশমোর ও কার্টিয়ার দ্বীপপুঞ্জ, অস্ট্রেলীয় অ্যান্টার্কটিকা, ক্রিসমাস দ্বীপ, কোকোস দ্বীপপুঞ্জ, কোরাল সি দ্বীপপুঞ্জ, হার্ড দ্বীপ ও ম্যাকডনাল্ড দ্বীপপুঞ্জ, এবং নরফোক দ্বীপ।

অস্ট্রেলিয়ার প্রথম বসতিস্থাপক ছিল এখানকার আদিবাসী জাতিগুলি। এরা প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ বছর আগে দেশটিতে অভিগমন করে। ১৭শ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত বহির্বিশ্বের কাছে দ্বীপটি অজানা ছিল। ১৭৮৮ সালে দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার পোর্ট জ্যাকসনে প্রথম স্থায়ী উপনিবেশ সৃষ্টি করা হয়; এটি ছিল ব্রিটিশ কয়েদীদের উপনিবেশ। এটিই পরবর্তীতে বড় হয়ে সিডনী শহরে পরিণত হয়। ১৯শ শতক জুড়ে অস্ট্রেলিয়া এক গুচ্ছ ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে কাজ করত। ১৯০১ সালে এগুলি একত্র হয়ে স্বাধীন অস্ট্রেলিয়া গঠন করে।

দক্ষিণ আমেরিকা

দক্ষিণ আমেরিকা পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম মহাদেশ। মহাদেশটির আয়তন ১,৭৮,২০,৯০০ বর্গকিলোমিটার, যা পৃথিবীর মোট স্থলভাগের ১২%। আয়তনের দিকে থেকে এশিয়া, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকার পরেই এর স্থান। বিষুবরেখা ও মকরক্রান্তির দুই পাশ জুড়ে এর বিস্তৃতি। মহাদেশটি উত্তরে পানামা স্থলযোটকের মাধ্যমে মধ্য ও উত্তর আমেরিকার সাথে যুক্ত। উত্তরে ক্যারিবীয় সাগর থেকে দক্ষিণে হর্ন অন্তরীপ পর্যন্ত মহাদেশটির দৈর্ঘ্য ৭,৪০০ কিলোমিটার। আর পূর্ব-পশ্চিমে এর সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য, আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলে অবস্থিত ব্রাজিলের পুন্তা দু সেইক্সাস থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত পেরুর পুন্তা পারিনিয়াস পর্যন্ত, ৫,১৬০ কিলোমিটার।

২০০৬ সালে দক্ষিণ আমেরিকার প্রাক্কলিত জনসংখ্যা ছিল ৩৭ কোটি ৬০ লক্ষ, যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৬%। এই মহাদেশে ১২টি রাষ্ট্র আছে। এদের মধ্যে ১০টি রাষ্ট্র লাতিন: আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, ব্রাজিল, চিলি, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, প্যারাগুয়ে, পেরু, উরুগুয়ে, এবং ভেনেজুয়েলা। দুইটি রাষ্ট্র লাতিন নয়। এই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে গায়ানা যুক্তরাজ্যের এবং সুরিনাম নেদারল্যান্ড্সের প্রাক্তন উপনিবেশ ছিল। ব্রাজিল ছিল পর্তুগালের উপনিবেশ। আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, চিলি, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, প্যারাগুয়ে, পেরু, উরুগুয়ে, এবং ভেনেজুয়েলা এই ৯ টি দেশ ছিল স্পেনের উপনিবেশ। এসব দেশের ভাষাও স্পেনিস। ব্রাজিলের ভাষা পর্তুগিজ, সুরিনামের ভাষা ডাচ এবং গায়ানার ভাষা হচ্ছে ইংরেজি। এছাড়া দক্ষিণ আমেরিকাতে ফ্রেঞ্চ গায়ানা বা গুইয়ান নামে ফ্রান্সের একটি জেলা সমমর্যাদার দেপার্ত্যমঁ রয়েছে। এটি এক সময় ফ্রাঞ্চের উপনিবেশ ছিল। মহাদেশটি থেকে বিরাট দূরত্বে প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত অনেকগুলি প্রশাসনিক অঞ্চল আছে, যেগুলি দক্ষিণ আমেরিকান বিভিন্ন রাষ্ট্রের অংশ। এদের মধ্যে আছে চিলির হুয়ান ফের্নান্দেস দ্বীপপুঞ্জ ও ইস্টার দ্বীপ, এবং ইকুয়েডরের গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ। উপকূলের কাছে অবস্থিত মহাসাগরীয় অঞ্চলগুলির মধ্যে আছে আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত ব্রাজিলের ফের্নান্দু দি নোরোনিয়া দ্বীপপুঞ্জ। দক্ষিণে আছে যুক্তরাজ্যের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ। এই দ্বীপপুঞ্জটিকে আর্জেন্টিনা ইসলাস মালবিনাস নামে ডাকে এবং এগুলিকে নিজেদের বলে দাবী করে। দক্ষিণ আমেরিকার তটরেখা তুলনামূলকভাবে নিয়মিত প্রকৃতির, তবে একেবারে দক্ষিণে ও দক্ষিণ-পশ্চিমে অনেক ফিয়ডের্র উপস্থিতির কারণে তটরেখা অত্যন্ত ভগ্ন।

পরিবেশ ও দুর্যোগ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর

বাংলাদেশ বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়

বাংলাদেশ বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়  গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয়। এর মূল কাজ হচ্ছে পরিবেশ ও বন সংক্রান্ত সরকারের কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা, প্রচারণা, সমন্বয় এবং দেখভাল করা। এই মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের পরিবেশ সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ের দেখভাল করার জন্য প্রতিষ্ঠিত, এবং এই মন্ত্রণালয় জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিল-এর নির্বাহী কমিটির স্থায়ী সদস্য। এই মন্ত্রণালয় জাতিসংঘ পরিবেশ কার্যক্রম (UNEP)-এ অংশগ্রহণকারী। মন্ত্রণালয়ের মূল কাজের মধ্যে রয়েছে পরিবেশ সংরক্ষণ, বন ও পরিবেশের উপাদানসমূহের সমীক্ষা, পরিবেশের অবক্ষয় প্রতিরোধ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বৃক্ষায়ন-বনায়ন এবং অবক্ষিপ্ত অঞ্চলগুলো পূণরুদ্ধার এবং সর্বোপরি পরিবেশের রক্ষণ নিশ্চিত করা।

 

ইতিহাস

১৯৪৭ থেকে ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অঞ্চলভিত্তিক বন বিভাগ ছিল বনরক্ষক-এর অধীনে, এবং পরবর্তিতে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রধান বনরক্ষকের অধীনে ছিল। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেলে সংরক্ষিত ও প্রস্তাবিত সংরক্ষিত বনগুলো বাংলাদেশ বন বিভাগের আওতাধীন হয়ে যায়। ১৯৭১ থেকে ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশ বন বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন ছিল। ১৯৮৭-৮৯ সময়কালে ফরেস্ট্রি ছিল কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি বিভাগ, যা ছিল একজন সেক্রেটারির অধীন। পরিবেশ বিভাগ (DoE) ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে প্রচলিত পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ, ১৯৭৭ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত হয়। অবশেষে ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। একইসাথে বাংলাদেশ বন বিভাগ-কে এই মন্ত্রণালয়ের কারিগরি শাখা হিসেবে এর অধীন করা হয় এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ কার্যকর করতে দায়বদ্ধ হয়।

অন্তর্ভুক্ত সংগঠনসমূহ

বাংলাদেশ বন বিভাগ ও বাংলাদেশ পরিবেশ বিভাগ পরিচালনা ছাড়াও বাংলাদেশ বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন (BFIDC), বাংলাদেশ বন গবেষনা ইন্সটিটিউট (BFRI) এবং বাংলাদেশ জাতীয় হার্বেরিয়াম (BNH) পরিচালনা করে থাকে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে বোটানিক্যাল গার্ডেনও।

উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম

বাংলাদেশ বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকারের বন মন্ত্রণালয়ের সাথে যৌথভাবে সুন্দরবনের উভয় অংশে বাঘ সমীক্ষা পরিচালনা করে।

 

 

খাদ্য মন্ত্রণালয়

খাদ্য মন্ত্রণালয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একটি মন্ত্রণালয়। সকল সময়ে দেশের সকল মানুষের জন্য নির্ভরযোগ্য খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিতকরার উদ্দেশ্যে এই সংস্থাটি গঠিত ও পরিচালিত হয়ে থাকে।

 

ইতিহাস

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে খাদ্য ও বেসামরিক সরবরাহ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তিতে এ মন্ত্রণালয় খাদ্য ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ইত্যাদির অধীনে খাদ্য বিভাগ হিসেবে পরিচালিত হতে থাকে। সর্বশেষ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১২ খ্রিঃ তারিখের ০৪.৪২৩.০২২.০২.০১.০০২. ২০১২.৯৬ নং পত্র সংখ্যা দ্বারা খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়কে পুনর্গঠিত করে (১) খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং (২) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় নামে ২টি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠিত হলে খাদ্য মন্ত্রণালয় স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

লক্ষ্য

দেশের সকল মানুষের জন্য নির্ভরযোগ্য খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

উদ্দেশ্য

  • দেশের খাদ্য নিরাপত্তার উন্নয়ন এবং দরিদ্র জনগণের জন্য খাদ্য সহায়তা প্রদান;
  • নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করণ।
  • খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্য জনগণের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ।

 

স্পারসো

স্পারসো (Space Research and Remote Sensing Organisation-SPARRSO)  মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান। এটি বাংলাদেশ সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, যা দেশের মহাকাশ বিজ্ঞান এবং দূর অনুধাবন প্রযুক্তি গবেষণার সঙ্গে জড়িত। একটি পরিচালনা পরিষদ স্পারসো পরিচালনা করে। মন্ত্রণালয় থেকে নির্বাচিত একজন চেয়ারম্যান এই পরিষদের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পরমাণু শক্তি কেন্দ্র, ঢাকা-র ক্যাম্পাসে ১৯৬৮ সালে একটি অটোমেটিক পিকচার ট্রান্সমিশন-এপিটি (Automatic Picture Transmission-APT) গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশ মহাকাশ প্রযুক্তির জগতে প্রবেশ করে। এই গ্রাউন্ড স্টেশনের মাধ্যমে আবহাওয়া উপগ্রহ থেকে সরাসরি প্রকৃত আবহাওয়া চিত্র লাভ করা হতো। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন-এ মহাকাশ ও বায়ুমন্ডলীয় গবেষণা কেন্দ্র-এসএআরসি (Space and Atmospheric Research Centre-SARC) স্থাপন করা হয় এবং এপিটি গ্রাউন্ড স্টেশনটিকে এর আওতায় নিয়ে আসা হয়। ভূমি সম্পদ প্রযুক্তি উপগ্রহ-ইআরটিএস (Earth Resource Technology Satellite-ERTS) আবির্ভাবের পর ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ ইআরটিএস প্রোগ্রাম নামে একটি কর্মসূচি গ্রহণ করে। ইআরটিএস-কে পরবর্তীতে ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইট হিসেবে নামকরণ করা হলে বাংলাদেশের ইআরটিএস প্রোগ্রামকেও বাংলাদেশ ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইট প্রোগাম-বিএলপি (Bangladesh Landsat Programme-BLP) নামে পুনর্নামকরণ করা হয়। ১৯৮০ সালে এক নির্বাহী আদেশ বলে এসএআরসি এবং বিএলপি উভয়কে একীভূত করে স্পারসো প্রতিষ্ঠা করা হয়।

 

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (সংক্ষেপেঃবিএমডি) বাংলাদেশ সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত একটি সংস্থা, যা দেশে আবহাওয়া বিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনা করে। আবহাওয়া উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাস পদ্ধতির মান-উন্নয়নসহ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য অধিকতর নির্ভুল তথ্য প্রদান এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারসমূহের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা এবং রাডার, উপগ্রহ কেন্দ্র ও কৃষি আবহাওয়া-সংক্রান্ত টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে আধুনিক কৃষি-ব্যবস্থাপনার বিকাশে সহায়তা প্রদান করার উদ্দেশ্যে এ প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে থাকে।

ইতিহাস

১৮৬৭ সালে সর্বপ্রথম দেশের আবহাওয়া কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা সাতক্ষীরায় একটি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তিতে ১৯৪৭ সালে এ সংস্থাটি নাম পরবর্তন করে পাকিস্তান আবহাওয়া সার্ভিস করা হয় এবং সর্বশেষ ১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতার পর এটি বাংলাদেশ আবহাওয়া বিভাগ হয়ে ওঠে।

জলবায়ু

জলবায়ু বলতে নির্দিষ্ট স্থানের দীর্ঘ সময়ের, সাধারণত ২০-৩০ বছরের আবহাওয়ার বিভিন্ন অবস্থার গড়পড়তা হিসাবকে বোঝানো হয়। জলবায়ু সাধারণত বৃহৎ এলাকার নির্ণীত হয়ে থাকে।

নিয়ামক

জলবায়ু কতিপয় বিষয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়ে থাকে, যেগুলোকে জলবায়ুর নিয়ামক বলা হয়ে থাকে। যথা:

অক্ষাংশ

অক্ষাংশ অনুযায়ী সূর্যকীরণ পতনের তারতম্য ঘটে, কোথাও লম্বভাবে পড়ে, অথবা কোথাও তীর্যকভাবে পড়ে। তাই স্থানভেদে উষ্ণতা ও আর্দ্রতার তারতম্য ঘটে। নিরক্ষরেখা বরাবর স্থানসমূহে সূর্যরশ্মি খাড়াভাবে পড়ে বিধায় ঐসকল অঞ্চলে উষ্ণতা বেশি। নিরক্ষরেখা থেকে উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশে তাপমাত্রা ক্রমেই কমতে থাকে। ১ °C অক্ষাংশে উষ্ণতা 0.28 °C হ্রাস পায় বলেই নিরক্ষরেখা থেকে সবচেয়ে দূরবর্তি উত্তর ও দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে বরফ রয়েছে।

উচ্চতা

উচ্চতার বৃদ্ধিতে তাপমাত্রা হ্রাস পায়। প্রতি ১০০০ মিটার উচ্চতায় ৬.8° সেলসিয়াস তাপমাত্রা হ্রাস পায়। এমনকি উচ্চতার তারতম্যে একই অক্ষাংশে অবস্থিত দুই অঞ্চলের তাপমাত্রা দুরকম হয়।

সমুদ্র থেকে দূরত্ব

কোনো স্থান সমুদ্র থেকে কতটা দূরে তার প্রেক্ষিতে বাতাসের আর্দ্রতার মাত্রা নির্ভর করে আর আর্দ্রতার প্রেক্ষিতে জলবায়ুর উষ্ণতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। সমুদ্র নিকটবর্তি এলাকার বায়ুতে গরমকালে আর্দ্রতা ও শীতকালে মৃদু উষ্ণতা বিরাজ করে। এধরণের জলবায়ুকে সমভাবাপন্ন জলবায়ু বলে।

বায়ুপ্রবাহের দিক

সমুদ্র থেকে প্রবাহিত জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু যে অঞ্চল দিয়ে বয়ে যায়, সে অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বেশি হয়। কিন্তু স্থলভাগ থেকে প্রবাহিত শুষ্ক বায়ু আবার উষ্ণতা বাড়ায়।

বৃষ্টিপাত

কোনো স্থানে বৃষ্টিপাত হলে সেখানকার উত্তাপ কমে আবার বৃষ্টিপাতহীন অঞ্চলে উষ্ণতা বেশি থাকে। তাই মরুভূমি এলাকায় জলবায়ু উষ্ণ। তাছাড়া বৃষ্টিপাতের মাত্রার উপর আর্দ্রতার মাত্রাও নির্ভরশীল, যা জলবায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করে।

সমুদ্রস্রোত

শীতল বা উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের কারণে উপকূলবর্তি এলাকার আবহাওয়ায়ও পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। এর উদাহরণ হিসেবে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ পানির প্রবাহ এল নিনোর কথা উল্লেখ করা যায়, যার প্রভাবে উপকূলবর্তি দেশগুলোতে দীর্ঘ খরা পর্যন্ত দেখা দিয়েছে।

পর্বতের অবস্থান

উঁচু পর্বতে বায়ুপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হলে আবহাওয়া ও জলবায়ুগত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, হিমালয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে মৌসুমী জলবায়ু বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়।

বন  ভূমি

গাছের প্রস্বেদন ও বাষ্পীভবনের মাধ্যমে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়। বনভূমির প্রগাঢ়তার কারণে কোনো কোনো স্থানে সূর্যালোক মাটিতে পড়ে না, ফলে ঐসকল এলাকা ঠান্ডা থাকে। তাছাড়া বনভূমি ঝড়, সাইক্লোন, টর্নেডো ইত্যাদির গতিপথে বাধা সৃষ্টি করে বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থার রূপ বদলে দেয়।

ভূমির ঢাল

সূর্যকীরণ উঁচু স্থানের ঢাল বরাবর পড়লে ভূমি উত্তপ্ত হয়ে তাপমাত্রা বাড়ে আবার ঢালের বিপরীত দিকে পড়লে তাপমাত্রা অতোটা বাড়ে না। তাছাড়া ঢাল বরাবর লম্বভাবে সুর্যালোকের পতন, তীর্যকভাবে সূর্যালোক পতনের তুলনায় তুলনামূলক উত্তপ্ত আবহাওয়ার সৃষ্টি করে।

মাটির বিশেষত্ব

বেলেমাটির বিশেষত্ব হলো তা যত দ্রুত গরম হয়, তত দ্রুত ঠান্ডাও হয়। সেই তুলনায় কর্দমযুক্ত পলিমাটি দ্রুত গরমও হয়না, গরম হলে ঠান্ডা হতেও দেরি হয়। তাই কোনো স্থানের মাটির বিশেষত্বের উপর আবহাওয়া ও জলবায়ুর পার্থক্য দেখা দিতে পারে।

শ্রেণীবিভাগ

  • গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ু
    • নিরক্ষীয় জলবায়ু
    • মৌসুমী জলবায়ু
  • নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু
  • হীমমণ্ডলীয় জলবায়ু

বাংলাদেশের পরিবেশ

ব্যতিক্রমধর্মী ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। প্রায় ১৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার এলাকার পানি নেমে আসে পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী দিয়ে। এই পানির মাত্র শতকরা ৮ ভাগ নিষ্কাশন এলাকা বাংলাদেশের অন্তর্গত। অধিকাংশ নিষ্কাশন অববাহিকা প্রতিবেশী দেশসমূহে অবস্থিত। বিশাল প্রবাহসহ নদ-নদীসমূহের গতি বাংলাদেশ ব-দ্বীপে হ্রাস পাওয়ার ফলে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে একটি অত্যন্ত পুরু পাললিক স্তর গঠন করে বাংলাদেশ গড়ে উঠে। নিম্নোক্ত বিষয়গুলি পরিবেশগত দিক থেকে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ করেছে: ১. অসংখ্য নদী, তাদের শাখা-প্রশাখা দ্বারা জালের ন্যায় বিস্তৃত বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপগুলির একটি; ২. অত্যন্ত পুরু পলিস্তর (বিশ্বে সবচেয়ে পুরু) দ্বারা গঠিত দেশটির সাধারণ ভূপৃষ্ঠ অত্যন্ত নিম্ন-উচ্চতাবিশিষ্ট; ৩. বাংলাদেশে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ও দীর্ঘতম বালুময় সৈকত; ৪. বিশ্বের সর্বাধিক ঘনবসতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর অত্যধিক চাপ; ৫. আর্দ্র ও শুষ্ক মৌসুমে (বন্যা ও খরা) ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানির প্রাপ্যতার পরিমাণের মধ্যে ব্যাপক তারতম্য; এবং ৬. বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে পানির প্রবাহের ব্যাপকতা।

বাংলাদেশের উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ দেশটিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পরিবেশগত সমস্যাপ্রবণ করে তুলেছে। এদেশের ভূমি বহুলাংশে নিম্ন-প্লাবনভূমি। ভূমির বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য, ভৌগোলিক অবস্থান, অসংখ্য নদ-নদী ও মৌসুমি জলবায়ু বাংলাদেশকে বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত আশঙ্কাপূর্ণ করে তুলেছে। বন্যা ও খরার চরমমাত্রা বাংলাদেশের বৈশিষ্ট্য। এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেশের টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন অর্জনে বিরাট বাধা হিসেবে কাজ করে।

বাহ্যিক পরিবেশ জলবায়ু-  বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য ঋতুবৈচিত্র্যসহ উষ্ণমন্ডলীয় মৌসুমি জলবায়ু বিরাজমান। বর্ষা মৌসুমে (জুলাই-অক্টোবর) প্রচুর বৃষ্টিপাতের পর আসে শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি), তারপর গরম (মার্চ-জুন)। গ্রীষ্মকালে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৪° সে এবং সর্বনিম্ন ২১° সে। শীতকালে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৯° সে এবং সর্বনিম্ন ১১° সে।

এ অঞ্চলের বৃষ্টিপাতে সময় ও স্থানগত ব্যাপক পার্থক্য দেখা যায়। বার্ষিক বৃষ্টিপাতের ৭০% থেকে ৮০% হয় মৌসুমি ঋতুতে। গ্রীষ্মের পর ভারত মহাসাগর থেকে মৌসুমি উষ্ণ আর্দ্র বায়ু বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং বিশ্বের কিছু এলাকায় সর্বোচ্চ রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত ঘটায়। এসব বৃষ্টিপাত প্রধানত সংঘটিত হয় উঁচু উজান অঞ্চলে, বিশেষ করে ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্যে এবং বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে দেশের সর্ব পশ্চিমে প্রায় ১,১০০ মিমি থেকে উত্তর-পূর্ব পার্শ্বে প্রায় ৫,৭০০ মিমি। হিমালয়ে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২,০০০ থেকে ১৫,০০০ মিমি।

পানি পরিস্থিতি (Hydrology)-  বাংলাদেশের রয়েছে একটি ব্যতিক্রমী জল-ভৌগোলিক অবস্থান। তিনটি বিশাল নদী পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা ভুটান, নেপাল, ভারত, বাংলাদেশ ও চীনের (তিববত) উজান থেকে পানি বয়ে নিয়ে আসে। পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার নিষ্কাশন অববাহিকার মোট আয়তন প্রায় ১৫ লক্ষ বর্গ কিমি যার আনুমানিক ৬২% ভারতে, ১৮% চীনে, ৮% নেপালে, ৮% বাংলাদেশে ও ৪% ভুটানে অবস্থিত। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি প্রবাহিত হয়। এ প্রবাহ কেবল দক্ষিণ আমেরিকার আমাজান নদী ব্যবস্থার পর দ্বিতীয়। প্রশস্ত ও বার্ষিক প্রবাহের মোট পরিমাণ উভয় দিক থেকে পদ্মা-নিম্ন মেঘনা নদী বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম। সম্মিলিত গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী সমুদ্রে পতিত হয়েছে শেষ ১০০ কিমি একক প্রবাহে মিলিত হয়ে যার পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি নদী থেকে আড়াই গুণ বেশি। দক্ষিণ এশীয় বৃষ্টিবহুল এলাকার মোট আয়তন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় অববাহিকার আয়তনের অর্ধেকের চেয়ে কিছুটা কম হলেও এখানে বার্ষিক মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ চার গুণ বেশি।

বাংলাদেশে ২৫০টিরও বেশি বড় নদ-নদী রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান নদ-নদীগুলি ‘পরিবর্তনশীল’ মেঘনা অথবা ‘খুবই পরিবর্তনশীল’ পদ্মা ও যমুনা হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করা যায়। এতে বোঝা যায় যে, বাংলাদেশের উন্নয়নে পানি ও বন্যা প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

বাংলাদেশে তিন ধরনের বন্যা দেখা যায়: ১. আকস্মিক বন্যা হয়ে থাকে উজানে ভারি বৃষ্টিপাত থেকে যা নদীকে প্লাবিত করে। নদীর তীর ভাঙা, জমি বিলীন হওয়া ও ফসলহানি এক্ষেত্রে সাধারণ সমস্যা। ২. মৌসুমি বন্যা সৃষ্টি হয় ভারি অবিরাম বৃষ্টিপাত থেকে আবদ্ধ বা নিম্নমানের নিষ্কাশনসম্পন্ন স্থানে যেখানে পানি চুয়ানো অপেক্ষা বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অধিক। এ ধরনের বন্যা বার্ষিক এবং প্রত্যাশিত ঘটনা যার উপর দেশের কৃষি জমির ক্ষয়পূরণ এবং জলজ পরিবেশের ধান ও পাট চাষের প্রয়োজনীয় পানির জন্য ঐতিহ্যগতভাবে নির্ভর করে। ৩. ঘূর্ণিঝড়জনিত বন্যা বিভিন্ন ধরনের বন্যার মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক। এসব বন্যা ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটাতে পারে এবং প্রধানত উপকূল অঞ্চলে দেখা যায়।

ভূপ্রকৃতি (Physiography)-  বাংলাদেশকে তিনটি প্রধান ভূপ্রাকৃতিক এলাকায় ভাগ করা যায়: টারশিয়ারি পার্বত্য এলাকা (Tertiary hill area), প্লেইসটোসিন সোপান (Pleistocene terraces) ও নবগঠিত সমভূমি (Recent plains)।

টারশিয়ারি পাহাড়সমূহ রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। এসব পাহাড় প্রধানত চুনাপাথর, শেল (shale) ও কাদামাটির তৈরি। এসব পাহাড়ের গড় উচ্চতা ৪৫০ মিটার।

প্লেইসটোসিন সোপান প্রধানত মধুপুর ও বরেন্দ্র অঞ্চল, ভাওয়ালের গড় ও লালমাই-এর পাহাড়ি এলাকা নিয়ে গঠিত। এসব সোপান ২৫,০০০ বছর আগে গঠিত হয়। বরেন্দ্র অঞ্চলের আনুমানিক আয়তন ৯,৩২০ বর্গ কিমি। পার্শ্ববর্তী প্লাবনভূমি থেকে এ অঞ্চলের গড় উচ্চতা ৬ থেকে ১২ মিটার। মধুপুর ও ভাওয়াল ৪,১০৩ বর্গ কিমি এর অধিক এলাকা নিয়ে বিস্তৃত, পার্শ্ববর্তী প্লাবনভূমি থেকে যার গড় উচ্চতা ৩০ মিটার। কুমিল্লা জেলার লালমাই পাহাড়ি এলাকা ৩৪ বর্গ কিমি নিয়ে গঠিত এবং পার্শ্ববর্তী প্লাবনভূমি থেকে গড়ে ১৫ মিটার উঁচুতে অবস্থিত।

নবগঠিত সমভূমি দেশের ১,২৪,২৬৬ বর্গ কিমি (৮৬%) জুড়ে বিস্তৃত। এ সমভূমিকে আরও পাঁচটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়: পাদভূমি, প্লাবন ভূমি, ব-দ্বীপ সমভূমি, জোয়ার প্লাবিত ভূমি (tidal plains) ও উপকূলীয় ভূমি। পাঁচ ধরনের ভূমিকে একটি সাধারণ নাম ‘প্লাবন ভূমি’ দ্বারা সাধারণত প্রকাশ করা হয়।

বন্যা সমভূমির উচ্চতা শূন্য থেকে ১০ মিটার এবং বন্ধুরতা (relief) কম। উত্তর-পূর্ব থেকে উপকূল পর্যন্ত গড় ঢালের মাত্রা প্রতি কিলোমিটারে ২০ সেমি এর কম। ঢাকার দক্ষিণে ঢালের গড় ১.৬ সেমি/কিমি। স্থলভাগের শতকরা প্রায় ৫০ ভাগের উচ্চতা (সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা) ১২ মিটারের কম এবং শতকরা ৭৫ ভাগ ২৯ মিটারের কম।

বাংলাদেশের প্লাবন ভূমি মূলত ব-দ্বীপ আকৃতির পলিঘটিত সমভূমি যা পাললিক ও সামুদ্রিক উপাদান থেকে গড়ে উঠেছে। ভূমির নিম্ন উচ্চতা ও বন্ধুরতার কারণে পানি অত্যন্ত ধীরে গড়ায় এবং নদ-নদীগুলির সর্পিলপথে এঁকেবেঁকে চলার প্রবণতা থাকে। ভাঙাগড়া ও বারবার বন্যা বা বিভিন্ন ধরনের প্লাবন দ্বারা নবগঠিত ভূমি গড়ে উঠছে এবং অনবরত পরিবর্তিত হচ্ছে।

মৃত্তিকাসমূহের ধরন ও বৈশিষ্ট্য-  প্রবাহমান নদীসমূহ দ্বারা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে জমানো পলির পুরু স্তর দিয়ে সাধারণত দেশটি গঠিত। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বছরে ২.৪ বিলিয়ন টন পলি বাহিত হয়। ভূমিরূপ বিভাগসমূহ (physiographic divisions) বিভিন্ন ধরনের মৃত্তিকা দ্বারা গঠিত। টারশিয়ারি পার্বত্য এলাকা গঠিত হয়েছে পাহাড়ি মাটি দ্বারা যা প্রধানত টারশিয়ারি শিলা ও অজমাটবদ্ধ টারশিয়ারি ও প্লেইসটোসিন পলি দ্বারা গঠিত। মৃত্তিকা সাধারণত অম্লীয়, অম্লমানের তারতম্য ৪.০ থেকে ৪.৫। মৃত্তিকার বুনটের কারণে পানির প্রবেশ্যতা (infiltration) তুলনামূলকভাবে কম। উচ্চ-রন্ধ্রতা (high porosity) আর্দ্রতা ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

প্লেইসটোসিন যুগের পলি থেকে গঠিত ‘পুরাতন পাললিক মৃত্তিকা’ দ্বারা প্লেইসটোসিন সোপানসমূহ গঠিত। বন্যা সীমার উপর উঁচুভূমিতে সেগুলি অবস্থিত। তাদের বুনট এঁটেল ধরনের এবং লৌহ ও এলুমিনিয়ামের উপস্থিতির কারণে বর্ণ লালচে থেকে হলুদাভ। এসব মৃত্তিকা দৃঢ়ভাবে জমাটবদ্ধ এবং উচ্চ ফসফেট আবদ্ধ করার ক্ষমতা (phosphate fixing capacity) সম্পন্ন। মৃত্তিকা অম্লীয়, pH ৬ থেকে ৬.৫।

নবগঠিত ভূমি ‘নবগঠিত পলিমাটি’ দ্বারা তৈরি। যেহেতু ভাটি অঞ্চলের মৃত্তিকার বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে উজান অঞ্চলের মৃত্তিকার গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, বিভিন্ন নদীর অববাহিকায় মৃত্তিকার বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা সাধারণভাবে দেখা যায়। গঙ্গা পলিভূমিতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়াম রয়েছে। এতে মুক্ত ক্যালসিয়াম কার্বনেটও রয়েছে। মৃত্তিকার নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের ঘাটতি ও ক্ষারীয়তা রয়েছে।

তিস্তা পলি অঞ্চলের মৃত্তিকা বেলে থেকে বেলে-দোঅাঁশ বুনট বিশিষ্ট, সুষম স্তরবিহীন। এসব মৃত্তিকা প্রতি বছর প্লাবিত হয়, ফলে প্রতি বছর নতুন পলি দ্বারা ক্ষয়পূরণ হয়। pH ৬ থেকে ৬.৫। উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চল সক্রিয় প্লাবনভূমির অংশ, কিন্তু জোয়ারের সময় লবণাক্ত পানি দ্বারা প্লাবিত হয়। এ অঞ্চলের একটি বিরাট অংশ নিয়ে রয়েছে ম্যানগ্রোভ বন যেখানে কতিপয় মৃত্তিকা তাদের স্তরে ব্যাপক পরিমাণ সালফাইড বহন করে। মৃত্তিকা সাধারণত নিরপেক্ষ কিন্তু কিছুটা ক্ষারীয়তা প্রদর্শনের প্রবণতা আছে।

মৃত্তিকার ব্যবহারযোগ্যতা এবং শস্যবিন্যাসের উপর এর প্রভাব-  প্লাবনভূমি মৃত্তিকার কৃষি সম্ভাবনা পানি পরিস্থিতি ও একইভাবে মৃত্তিকার অন্যান্য বৈশিষ্ট্য দ্বারা নির্ধারিত হয়। মৌসুমি বন্যার গভীরতা ও ব্যাপ্তি এবং বন্যায় ফসলহানির আপেক্ষিক আশঙ্কা শস্য বিন্যাসের প্রধান নির্ধারক। মৃত্তিকার উর্বরতার (গৌণ উপাদানের প্রাপ্যতা) ন্যায় মৃত্তিকার ভেদ্যতা ও আর্দ্রতা ধারণ ক্ষমতা সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ প্লাবনভূমি নিম্ন উচ্চতা সম্পন্ন (প্রায় ১ মি), অপেক্ষাকৃত উচ্চ ভূমিতে ভেদ্য দোঅাঁশ মৃত্তিকা এবং নিচু স্থানে অভেদ্য কর্দম রয়েছে। ভূমির উচ্চতার এ পার্থক্য মৌসুমি বন্যার গভীরতা ও ব্যাপ্তির স্থানীয় পার্থক্য নির্ধারণ করে। ভূমির উচ্চতার ক্ষেত্রে ৩০ সেমি এর মতো স্বল্প পার্থক্যও বিভিন্ন ফসল, ফসলের জাত ও প্লাবনের বৈশিষ্ট্য ভেদে মৌসুমি আবর্তের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

টারশিয়ারি মৃত্তিকার কৃষি সম্ভাবনা নিম্ন-নিষ্কাশিত মৃত্তিকায় ও গভীর উচ্চভূমি মৃত্তিকায় মাঝারি ধরনের। অগভীর উচ্চভূমি মৃত্তিকায় এ সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত অনেক কম। ভূমিক্ষয় (যা ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে গুরুতর রূপ ধারণ করে) ও বারবার জুম চাষের (পাহাড়ি অঞ্চলে জঙ্গল পরিষ্কার ও পোড়ানোর মাধ্যমে স্থানান্তর কৃষি) ফলে উর্বরতা হারিয়ে বেলে পাহাড়ি মৃত্তিকার কৃষি সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। এ মৃত্তিকা বৃক্ষফসল বা বন উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।

জীবজ পরিবেশ  বনসম্পদ-  গত তিন দশকে বনজ বৃক্ষের পরিমাণ ব্যাপকহারে হ্রাস পেয়েছে। কৃষিজমির প্রসার এবং বনজ দ্রব্যের বর্ধিত চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাপক বনভূমি অবৈধভাবে ফসলি জমিতে পরিণত করা হয়েছে। যদিও বন সম্পর্কিত হালনাগাদ পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না, হিসাবে দেখা যায়, সত্তরের দশক থেকে বনভূমির পরিমাণ শতকরা ৫০ ভাগেরও অধিক হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭০ সালে মধুপুর অঞ্চলে ২০,০০০ একরেরও অধিক শালবন ছিল; বিশ বছর পর অবশিষ্ট থাকে আনুমানিক ১,০০০ একর। ১৯৯০ সালের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে মাথাপিছু বনের পরিমাণ ০.০২ হেক্টরেরও কম; বিশ্বে জনসংখ্যা অনুপাতে সর্বনিম্ন বনের পরিমাণগুলির একটি।

অবস্থান বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে বনসমূহকে ৩ শ্রেণীতে ভাগ করা যায় ১. পাহাড়ি বন, ১১ লক্ষ ৫০ হাজার একর জুড়ে যার মধ্যে রয়েছে তৈরি করা বন ২,৯৬,৩০০ একর, প্রধানত রাঙ্গামাটি ও সিলেট অঞ্চলে অবস্থিত; ২. ম্যানগ্রোভ বন, ১৪ লক্ষ ৫০ হাজার একর প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ (সুন্দরবন) এবং বন্যা প্রতিরোধের জন্য উপকূল এলাকা ও উপকূলবর্তী দ্বীপসমূহে কৃত্রিমভাবে গড়ে তোলা ২,৫০,০০০ একর ম্যানগ্রোভ বন; এবং ৩. সমতলভূমি শালবন প্রায় ৩ লক্ষ একর জুড়ে গাজীপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলায় বিস্তৃত। বন বিভাগ এসব এলাকায় ৩৬ লক্ষ ১৭ হাজার একর জমি নিয়ন্ত্রণ করছে।

জলাভূমি-  বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ মৌসুমি জলাভূমি রয়েছে। বস্ত্ততপক্ষে দেশের অর্ধেককেই এ ধরনের ভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বহু বছর ধরে পানির নিচে থাকে এ ধরনের জলাভূমির পরিমাণ অনেক কম। বহুবর্ষীয় জলাভূমির মধ্যে রয়েছে মূলত স্থায়ী নদ-নদী ও ঝর্ণা, অগভীর স্বাদুপানির হ্রদ ও জলাশয় (হাওর, বাঁওড় ও বিল), মাছের পুকুর এবং বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ জলাভূমিতে মোহনা পরিবেশ।

জলাভূমি সম্পদ বাংলাদেশের পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বহুবর্ষীয় ও মৌসুমি জলাভূমি উভয় বিপুল সংখ্যক প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। জলাভূমি মৎস্য সম্পদের উপর টিকে আছে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ। বাংলাদেশের জেলেরা ঐতিহ্যগতভাবে গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠী। জলাভূমির অসংখ্য উদ্ভিদ ঔষধ, খাদ্য, পশুখাদ্য ও নির্মাণ সামগ্রী হিসেবে ব্যবহারের জন্য সংগ্রহ করা হয়। মানুষের আগ্রাসন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ স্কীমের ফলে জলাভূমির আবাসস্থল দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রতিনিয়ত হুমকির সম্মুখীন।

জীববৈচিত্র্য-  বাংলাদেশের রয়েছে একটি সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য, বিশেষ করে বন ও জলাভূমি এলাকায়। আনুমানিক ৫,০০০ প্রজাতির সপুষ্পক উদ্ভিদ বাংলাদেশে পাওয়া যায়। এদেশে বাস করছে ২৬৬ ধরনের স্বাদুপানির ও ৪৪২ ধরনের সামুদ্রিক মাছ, ২২ উভচর, ১০৯ অভ্যন্তরীণ ও ১৭ সামুদ্রিক সরীসৃপ, ৩৮৮ স্থায়ী ও ২৪০ পরিযায়ী পাখি, ১১০ অভ্যন্তরীণ ও ৩ সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী। কিছু প্রজাতিকে হুমকির সম্মুখীন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশের জানা মেরুদন্ডী প্রাণীদের মধ্যে ১৩টি সম্প্রতি এদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ মৎস্য প্রজাতিসমূহের মধ্যে ৫৪টি হুমকির সম্মুখীন। বিপন্ন উভচর, অভ্যন্তরীণ সরীসৃপ, স্থায়ী পাখি ও অভ্যন্তরীণ স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রজাতি সংখ্যা যথাক্রমে ৮, ৫৮, ৪১ ও ৪০।

এদেশ থেকে কি পরিমাণ উদ্ভিদ প্রজাতি ইতোমধ্যে অবলুপ্ত হয়েছে তা এখনও বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করা হয় নি। বিপদাপন্ন উদ্ভিদ প্রজাতি শনাক্ত করতে কতিপয় বিচ্ছিন্ন গবেষণা চালানো হয়েছে এবং এতে দেখা যায় প্রায় ১০০ প্রজাতির উদ্ভিদ হুমকির সম্মুখীন।

জীববৈচিত্র্য বিলুপ্ত হওয়ার প্রধান কারণ-  মানুষের হস্তক্ষেপের কারণে প্রাণীর বিচরণ পথ ও জলাভূমি আবাসস্থলের ক্ষতি; কৃষি, বাসস্থান ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মানুষের বনভূমি দখল; জ্বালানি ও নির্মাণের জন্য নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের ফলে বৃক্ষ আচ্ছাদিত ভূমির পরিমাণ হ্রাস; কতিপয় বনজসম্পদ যেমন ভেষজ উদ্ভিদ, বাঁশ ও বেতের অতিরিক্ত আহরণের ফলে রক্ষামূলক বাসস্থান লোপ; অতিরিক্ত বন্যপ্রাণী শিকার; উফশী জাতসমূহের একক চাষ, বা বহুমুখী শস্য চাষ হ্রাস পাওয়ায় কৃষি রাসায়নিক দ্রব্যসমূহের ব্যবহার বৃদ্ধি; ৭. ম্যানগ্রোভ বন উজাড় এবং ৮. জুমচাষ।

আর্থ-সামাজিক পরিবেশ জনসংখ্যা-  বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। প্রতি বছর প্রায় ২% হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি।

১৯৯৫ সালে জনসংখ্যার গড় ঘনত্ব ছিল প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ৮৩৪ জন। দেশকে টিকিয়ে রাখার জন্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও অবশ্যই একটি প্রধান প্রচেষ্টা হবে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা এবং যৌক্তিক ভূমিসম্পদ ব্যবস্থাপনা।

ভূমি ব্যবহার  জনসংখ্যার ঘনত্ব ও কৃষিভিত্তিক জীবিকার প্রভাবে দেশের সীমিত ভূমির ওপর প্রচন্ড চাপ পড়ছে। এমনকি মানুষ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস প্রবণ উপকূলীয় নিম্নভূমিতেও বসবাস ও চাষাবাদ করছে। বাংলাদেশের মোট ভূমির শতকরা ৬৩ ভাগের কিছুটা বেশি কৃষির অধীনে রয়েছে: অধিকাংশ জমি ব্যবহূত হচ্ছে ধান চাষে। বন (সামাজিক ও গ্রাম্য বনসহ) রয়েছে মোট ভূমির প্রায় ২০%। মানুষের বসতবাড়ি রয়েছে ১৬% জুড়ে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বর্ধিত বনজ দ্রব্যের আহরণ এবং বসতবাড়ি ও চাষাবাদের জন্য বনভূমির সরাসরি পরিবর্তনের ফলে বন ও জলাভূমি দ্বিমুখী হুমকির সম্মুখীন। বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি কৃষি উৎপাদনকে ছাড়িয়ে যায়। ফলে বন এলাকা ব্যাপকভাবে দখল করে কৃষি ভূমি সম্প্রসারিত হয়।

আশির দশকে ধানের উচ্চফলনশীল জাতের মতো উন্নত প্রযুক্তির প্রবর্তন প্রচলিত শস্য বিন্যাসকে বদলিয়ে দেয়। এর ফলে অধিক জমি ব্যবহার না করে ফসলের সম্প্রসারণ করা সম্ভব হয়। এই উল্লম্ব সম্প্রসারণ (একই পরিমাণ জমিতে অধিক ফসল ফলানো) প্রায় এর সীমায় পৌঁছেছে। অনুভূমিক সম্প্রসারণ বনাঞ্চলে ও বর্ধিত হারে জলাভূমিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন জলাভূমি চাষাবাদের অধীন চলে আসছে। জলাভূমির পানি সরে গেলে ভূমির উর্বরতা রক্ষাকারী নাজুক বাস্তুসংস্থান বদলে যায়। এর ফলে উৎপাদন হ্রাস পুষিয়ে নেওয়ার জন্য আরও নতুন কৃষি জমির প্রয়োজন হয় বা সারের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হয়।

চিংড়ি চাষীরা ক্রমান্বয়ে দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় কৃষি জমি দখল করেছে। সেখানে অর্থকরী চিংড়ির জন্য জমিতে বাঁধ দিয়ে লবণ-পানির পুকুর তৈরি করা হয়। চিংড়ির পুকুর হিসেবে ব্যবহার করা মাটি এতই লবণাক্ত হয়ে যায় যে সেখানে ফসল ফলানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে অধিক কৃষি জমি বড় বড় চিংড়ির ঘেরে পরিবর্তিত করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

বাংলাদেশের অর্থনীতি

বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি মধ্য আয়ের উন্নয়নশীল এবং স্থিতিশীল অর্থনীতি। এই অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে রয়েছে মধ্যম হারের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, পরিব্যাপ্ত দারিদ্র, আয় বণ্টনে অসমতা, শ্রমশক্তির উল্লেখযোগ্য বেকারত্ব, জ্বালানী, খাদ্যশস্য এবং মূলধনী যন্ত্রপাথরি জন্য আমদানী নির্ভরতা, জাতীয় সঞ্চয়ের নিম্নহার, বৈদেশিক সাহায্যের ওপর ক্রমহ্রাসমান নির্ভরতা এবং কৃষি খাতের সংকোচনের সঙ্গে সঙ্গে পরিষেবাখাতের দ্রুত প্রবৃদ্ধি। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অগ্রগতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশের তৈরি পোষাক শিল্প বিশ্বের বৃহত্তম শিল্পের মধ্যে অন্যতম । ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত পাট ও পাটজাত পণ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এসময় পাট রপ্তানি করে দেশটি অধিকাংশ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করত। কিন্তু পলিপ্রোপিলিন পণ্যের আগমনের ফলে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দ থেকেই পাটজাত দ্রব্যের জনপ্রিয়তা ও বাণিজ্য কমতে থাকে।

বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭০-এর দশকে সর্বোচ্চ ৫৭% প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। তবে এ প্রবৃদ্ধি বেশীদিন টেকেনি। ১৯৮০-এর দশকে এ হার ছিলো ২৯% এবং ১৯৯০-এর দশকে ছিলো ২৪%।

বাংলাদেশ বর্ধিত জনসংখ্যার অভিশাপ সত্ত্বেও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এর মূল কারণ হচ্ছে অভ্যন্তরীন উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ধান উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়। বাংলাদেশের চাষাবাদের জমি সাধারণত ধান ও পাট চাষের জন্য ব্যবহৃত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে গমের চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে ধান উৎপাদনের দিক দিয়ে মোটামুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ। তা সত্ত্বেও মোট জনসংখ্যার ১০% থেকে ১৫% অপুষ্টির ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশের কৃষি মূলত অনিশ্চিত মৌসুমী চক্র, এবং নিয়মিত বন্য ও খরার উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। দেশের যোগাযোগ, পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাত সঠিকভাবে গড়ে না ওঠায় দেশটির উন্নতি ব্যহত হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল খনি রয়েছে এবং কয়লা, খনিজ তেল প্রভৃতির ছোটখাট খনি রয়েছে। বাংলাদেশের শিল্প-কাঠামো দুর্বল হলেও এখানে অদক্ষ শ্রমিকের সংখ্যা অঢেল এবং মজুরিও সস্তা।

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ বিভিন্ন দাতা দেশ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও অধিক বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণ পেয়েছে যার মধ্যে ১৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রধান দাতার মধ্যে রয়েছে বিশ্ব ব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, সৌদি আরব ও পশ্চিম ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহ। তাসত্ত্বেও বাংলাদেশের দারিদ্রের হার এখনও অনেক বেশি। মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক দারিদ্র সীমার নিচে বাস করে এবং ভারত ও চীনের পর বাংলাদেশেই সর্বোচ্চ সংখ্যক দরিদ্র মানুষ বসবাস করে। একই আয়ের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের সামাজিক সেবার মান অনেক কম। বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবেই বিরাট বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে এবং এর অর্থনীতি বর্তমানে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকের পাঠানো রেমিটেন্সের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সবচেয়ে কম পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের কল্যানে রিজার্ভ স্থিতিশীল রয়েছে। বর্তমানের রিজার্ভ প্রায় ৩.১ বিলিয়ন ডলার যা ২০০৬ অর্থবছরের শুরুর দিকে ছিল। ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে সেপ্টেম্বরে রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৬ বিলিয়ন ডলারে।

কৃষিশিক্ষা ও গবেষণা

কৃষিশিক্ষা  কৃষি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা, কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দেশে কৃষিশিক্ষার প্রথম ও মজবুত বুনিয়াদ গড়ে ওঠে ১৯৩৮ সালে তদানীন্তন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী  এ.কে ফজলুল হক কর্তৃক ঢাকার মণিপুর ফার্মে (বর্তমানে শেরে-বাংলা নগর) বেঙ্গল কৃষি ইনস্টিটিউট (Bengal Agricultural Institute) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। Royal Agriculture Commission-এর পরামর্শক্রমে প্রতিষ্ঠিত এ ইনস্টিটিউট ছিল তৎকালে প্রদেশে উচ্চতর কৃষিশিক্ষার একমাত্র প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদেরও মর্যাদা পেয়েছিল।পরবর্তী সময়ে এটি বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউট (Bangladesh Agricultural Institute/BAI), নামে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যায়ের অধিভুক্ত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউট শেরে-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে।

কৃষিশিক্ষা, বিশেষত উচ্চতর কৃষিশিক্ষা বিভিন্ন সময়ে নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউট থেকে দু’পর্যায়ে ডিগ্রি দেওয়া হতো, মৌলিক বিজ্ঞান বিষয়ে দু’বছরের বি.এসসি (কৃষি) এবং ফলিত কৃষি বিজ্ঞান বিষয়ে আরও দু’বছরের বি.এজি ডিগ্রি। পরবর্তীকালে ১৯৪৫ সালে ৩ বছরের বি.এজি ডিগ্রি চালু করা হয় এবং সর্বশেষ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউট চার বছরের বি.এসসি এজি কোর্স চালু করে। নতুন পরিবর্তিত বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধারা বহাল রয়েছে।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে ১৯৫৮ সালের ১৩ ডিসেম্বর তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার কর্তৃক গঠিত জাতীয় শিক্ষা কমিশনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এ কমিশনই সর্বপ্রথম জরুরি ভিত্তিতে পাকিস্তানের দুই অংশে দুটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দেয়। কমিশন কৃষি কলেজে তৎকালীন প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে অভিমত রাখে যে, সরকারি বিভাগের বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির মধ্যে কৃষিশিক্ষার পূর্ণ বিকাশ কখনই সম্ভব নয়, কেননা সকল উচ্চশিক্ষার জন্য অপরিহার্য যে গবেষণার পরিবেশ তা কলেজে বিদ্যমান নেই। বিভিন্ন বিষয় যথাযথ বিবেচনার পর কমিশন এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে, একমাত্র স্বায়ত্তশাসিত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাই কৃষি বিষয়ে শিক্ষাদান ও গবেষণা কার্যক্রমের সর্বোচ্চ বিকাশ নিশ্চিত করতে পারে। সম্প্রসারণ কার্যক্রমের কথা উল্লেখ না করলেও প্রতিবেশী দেশ ভারতের কৃষিশিক্ষা ব্যবস্থায় গবেষণা, শিক্ষা ও সম্প্রসারণ একীকরণের বিষয়টি পর্যালোচনাকালে কমিশন মন্তব্য করে যে, ‘কৃষকদের কাছে ব্যবহার্য ও গ্রহণযোগ্যরূপে পৌঁছাতে না পারলে গবেষণার ফলাফলের মূল্য সামান্যই, আর তাই নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সবগুলি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষামূলক সম্প্রসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। এভাবে কমিশন প্রথমবারের মতো কৃষিক্ষেত্রে গবেষণা, শিক্ষাদান ও সম্প্রসারণ একীভূত করার মতো তাৎপর্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছিল।

পরিশেষে ১৯৬১ সালে ময়মনসিংহে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্তমান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে উচ্চতর কৃষিশিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে। এটির অধ্যাদেশ (১৯৬১) অনুযায়ী কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছিল ‘কৃষি ও কৃষির সকল শাখায় উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা।’ এ অধ্যাদেশের ২ পৃষ্ঠায় ৫ক অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে যে, জ্ঞানের যে কোনো শাখায় বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ও জ্ঞানবিস্তারের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।

তৎকালীন পাকিস্তান খাদ্য ও কৃষি কমিশন শিক্ষা কমিশনের সুপারিশকৃত গবেষণা, শিক্ষা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম একীকরণ সমর্থন করে নি। তারা মতপ্রকাশ করে যে, সম্প্রসারণের সকল কার্যক্রম সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্বারাই পরিচালিত হওয়া উচিত। ফলে বাস্তবে কোনো সম্প্রসারণ কার্যক্রম ছাড়াই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গতানুগতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পথ অনুসরণ করে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত মাত্র দু’বছর সময়ের মধ্যে গৃহীত হয়েছিল। অন্যদিকে ভারত বেশ কয়েক বছরের চিন্তাভাবনার পর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সকল বিষয় স্থির করে এবং বিখ্যাত ল্যান্ড গ্রান্ট কলেজের মডেল অনুসরণে বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রমের সকল পর্যায়ে শিক্ষা, গবেষণা ও সম্প্রসারণকে সমন্বিত করে। অন্যদিকে ভারতীয় শিক্ষা কমিশন (১৯৬৪) সে দেশে প্রতি রাজ্যে অন্ততপক্ষে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দেয়। বাংলাদেশের সঙ্গে অবস্থাগত পার্থক্যের কারণেই ভারতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রাজ্য সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে এবং শুধু জ্ঞানচর্চা ও পান্ডিত্যের ক্ষেত্রে সীমিত না থেকে ক্ষেতখামারের সমস্যা সমাধানে কৃষকদের সহায়তা করতে এগিয়ে আসে। সম্প্রসারণ কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব বিজ্ঞানীদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান কৃষক ও অন্যান্য প্রান্তিকফলভোগীদের কাছে হস্তান্তরে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারে নি। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পুরনো প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বর্ধমান চাহিদা অনুযায়ী গত ২০ বছরে আরও কয়েকটি নতুন ইনস্টিটিউট/কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

১৯৮০ সালে বি.এসসি, এজি ডিগ্রি দানের লক্ষ্যে গাজীপুরের সালনায় বাংলাদেশ কৃষিবিজ্ঞান কলেজ (Bangladesh College of Agricultural Sciences/BCAS) প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি কয়েকবার পুনর্বিন্যস্ত হয়েছে। ১৯৮৩ সালে কৃষির বিভিন্ন শাখায় এম.এসসি, এজি এবং পিএইচ.ডি ডিগ্রি দেওয়ার জন্য এটির নতুন নামকরণ হয় স্নাতকোত্তর কৃষি শিক্ষা ইনস্টিটিউট (Institute of Post Graduate Studies in Agriculture/IPSA)। সর্বশেষ ১৯৯৮ সালে একে  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নামে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উন্নীত করে কৃষির বিভিন্ন বিষয়ে বি.এসসি (কৃষি), এম.এসসি (কৃষি) ও পিএইচ.ডি ডিগ্রি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। এটি এখন কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্থানান্তরিত হয়েছে। ১৯৭৮ সালে পটুয়াখালীর দুমকীতে পটুয়াখালী কৃষি কলেজ এবং ১৯৮৮ সালে দিনাজপুরে হাজী মোহাম্মদ দানেশ কৃষি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন এ দুটি কৃষি কলেজ শুধু ফসলবিদ্যায় বি.এসসি, এজি ডিগ্রি দিয়ে থাকে। বর্তমানে পটুয়াখালী ও দিনাজপুরের কলেজ দুটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পুনর্গঠিত হয়েছে এবং কৃষি একটি অনুষদ হিসেবে থাকছে, আর এইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলি কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্থানান্তরিত হয়েছে।

রাজশাহী ও বগুড়ায় দুটি বেসরকারি কৃষি কলেজ আছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীনে চট্টগ্রামে অবস্থিত একটি College of Forestry বনবিদ্যায় বি.এসসি ডিগ্রি দিয়ে থাকে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের Institute of Forestry and Environment স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেয়। এ ছাড়া পশুচিকিৎসায় ডিগ্রি দানের জন্য দুটি পশুচিকিৎসা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়; একটি সিলেটে, অন্যটি চট্টগ্রামে। ব্যবস্থাপনা কাঠামো, পেশাগত সুযোগ-সুবিধা, স্বায়ত্তশাসন এবং তহবিল যোগানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, কলেজগুলি তা পায় না। শিক্ষাগত বিষয়ে কলেজগুলি অধিভুক্ত ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সরকারি বিভাগ বা ব্যবস্থাপনা বোর্ডের (বেসরকারি কলেজের ক্ষেত্রে) নিয়ন্ত্রণে। এ ধরনের দ্বৈত-নিয়ন্ত্রণ কলেজগুলিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ভোগকৃত পেশাগত সুযোগ, শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান এবং তহবিল যোগানোর সুবিধা থেকে দূরে রেখেছে। বর্তমানে এর দুটো কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (Agricultural Extension Training Institute/AETI) এবং বন ও পশুপালনের মতো কৃষির অন্যান্য উপখাতের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলিও ডিপ্লোমা পর্যায়ের শিক্ষা দিয়ে থাকে।

ছাত্রভর্তি  কৃষির সবগুলি উপখাত মিলিয়ে প্রতি বছর স্নাতক পর্যায়ে প্রায় ১২০০ এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ২০০-২৫০ জন ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ইনস্টিটিউট পিএইচ.ডি পর্যায়ে অধ্যয়নের সুযোগ রয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন ডিপ্লোমা কোর্সে প্রতি বছর কয়েকশ ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়ে থাকে।

পরীক্ষা-পদ্ধতি বিশ্বের অধিকাংশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্স ক্রেডিট পদ্ধতি এবং কঠোর অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন চালু হলেও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজগুলি দীর্ঘদিন বার্ষিক পরীক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ অব্যাহত রেখেছে। বিগত কয়েক বছরে এটি স্বীকৃত হয়েছে যে, সেমিস্টার পদ্ধতি ছাত্র ও শিক্ষক উভয়ের জন্যই ফলপ্রসূ। এ পদ্ধতিতে একজন শিক্ষক যেমন পাঠ্যসূচি বা পাঠ্যপুস্তক তৈরির জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন, তেমনি ছাত্রছাত্রীদেরও সর্বক্ষণ প্রস্ত্তত থাকার জন্য সারাবছর লেখাপড়া করতে হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সেমিস্টার পদ্ধতি প্রবর্তনের জন্য কাজ করছে। ইতিমধ্যেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাফল্যের সঙ্গে সেমিস্টার পদ্ধতি চালু হয়েছে।

অনুষদসমূহ ছয়টি অনুষদ নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় একমাত্র বহু-অনুষদীয় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এগুলি হচ্ছে কৃষিতত্ত্ব, পশুচিকিৎসা, মাৎস্যবিজ্ঞান, পশুপালন, কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি এবং কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিদ্যা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে শুধু কৃষি অনুষদ থাকলেও অদূরভবিষ্যতে আরও নতুন অনুষদ খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষি/বনবিদ্যা/পশুপালন কলেজগুলিতে কয়েকটি বিভাগ নিয়ে শুধু একটি অনুষদ রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন অনুষদ ছাড়াও আছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সিস্টেম নামে একটি গবেষণা ইউনিট এবং Graduate Training Institute (GTI)। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সিস্টেম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম/প্রকল্পে অর্থায়ন, সমন্বয় ও তদারকি করে থাকে আর GTI স্নাতক ডিগ্রিপ্রাপ্ত এবং কৃষি উন্নয়ন কর্মকান্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ দেয়।

ব্যবস্থাপনা কাঠামো এতে রয়েছে সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল, বোর্ড অব স্টাডিজ, উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক কমিটি এবং অন্যান্য বিশেষ কমিটি আর তা মোটামুটি দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়য়ের অনুরূপ। কলেজ/প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিয়ন্ত্রণকারী বিভাগ/মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যস্ত।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে অর্থবরাদ্দ দেয় ও তাদের কার্যক্রম তদারক করে। সীমিত শাসনক্ষমতা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে সংশ্লিষ্ট সব বিষয়েই পরামর্শ দেয়।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ না থাকা বা সুযোগের অপ্রতুলতা থেকে যে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে তা অনুমানক্রমে তৎকালীন পাকিস্তান খাদ্য ও কৃষি কমিশনের পরামর্শ ছিল- ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা অধ্যয়নের জন্য যাতে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির পরীক্ষাগার ও খামারে কাজ করতে পারে সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে একটা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কার্যকরভাবে এ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেছেন।

বাংলাদেশে কৃষি গবেষণা শক্তিশালী করার জন্য গঠিত যৌথ পর্যালোচনা দল (১৯৭৮) নিম্নোক্ত মতামত প্রকাশ করে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে ভারতের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ল্যান্ড গ্রান্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে। এ তুলনা সঠিক নয়, কারণ ভারতে ১৯৫৫ সাল থেকে প্রতিষ্ঠিত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি গড়ে তোলা হয়েছিল কৃষি কলেজ ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের প্রশিক্ষণকে গতানুগতিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা থেকে আলাদা করার জন্য। ভারতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সংশ্লিষ্ট রাজ্যের কৃষি বিভাগের (মন্ত্রণালয়) অধীন। একইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সেসময় পশ্চিম ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ধাঁচে গড়া তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বিকাশমান কৃষির চাহিদা পূরণের উপযুক্ত বিবেচিত না হওয়ায় ল্যান্ড গ্র্যান্ট কলেজগুলি প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসব কলেজ (পরবর্তীকালে ১৮৮৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়) বোর্ড অব রিজেন্টস (Board of Regents)-এর অধীনে ছিল যা নিয়ন্ত্রণ করত বোর্ড অব গভর্নরস, আর সেটা ছিল রাষ্ট্রীয় আইন প্রণেতাদের নিকট দায়বদ্ধ। ভারতের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বা মার্কিন ল্যান্ড গ্রান্ট কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়- কোনোটিই শিক্ষা বিভাগ/মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন নয়।

কৃষি গবেষণা  বাংলাদেশে কৃষি গবেষণা ব্যবস্থার উদ্ভব ও মূল্যায়নের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। ১৮৮০ সালের দুর্ভিক্ষ কমিশনের পরামর্শক্রমে ভারতবর্ষের তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকার ১৯০৬ সালে কৃষি বিভাগ গঠন করে। পরবর্তী সময়ে ১৯০৮ সালে ঢাকা শহরের কয়েক মাইল উত্তরে তেজগাঁয় কৃষি গবেষণাগার গড়ে তোলার সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার পার্শ্ববর্তী ৪০৩ একর জমির উপর একটি পরীক্ষণ কেন্দ্রও প্রতিষ্ঠিত হয়। এ গবেষণা কেন্দ্র ঢাকা-মণিপুর ফার্ম (বর্তমানে শেরে-বাংলা নগর) হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে স্থানীয় পর্যায়ে গবেষণা ও প্রদর্শনী কার্যক্রম চালানোর জন্য বাংলার তৎকালীন প্রত্যেকটি জেলায় জেলা কৃষিখামার প্রতিষ্ঠা করা হয়।

১৯৬২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ফসল, মৃত্তিকা, সার ও উদ্ভিদ সংরক্ষণের ওপর পরিচালিত গবেষণা কার্যক্রম পরস্পর-বিচ্ছিন্ন ছিল। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৬০-৬৫) গ্রহণের মাধ্যমে একক প্রতিষ্ঠানে, পূর্ব পাকিস্তান কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে (East Pakistan Agricultural Research Institute/EPARI) বিচ্ছিন্ন গবেষণা কার্যক্রমকে প্রথমবারের মতো সমন্বিত করা হয়।

পাকিস্তানের ‘দ্বিতীয় রাজধানী’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তদানীন্তন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ষাটের দশকের প্রথম দিকে ঢাকা-ফার্ম অধিগ্রহণ করে। কিন্তু গবেষণা অবকাঠামো স্থানান্তরের জন্য কোনো বিকল্প স্থান বরাদ্ধ না দেওয়ায় ১৯৬০ সালের দিকে এ অঞ্চলে কৃষি গবেষণা এক বাধার সম্মুখীন হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ঢাকার ৩২ কিলোমিটার উত্তরে জয়দেবপুরে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে  বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৭৩ সালে এ নবপ্রতিষ্ঠিত ইনস্টিটিউট কার্যক্রম শুরু করে। দেশে ইতোমধ্যেই ধান, পাট, ইক্ষু, চা, বন, মৃত্তিকা, মৎস্য ও পশুসম্পদের ওপর পৃথক পৃথক ইনস্টিটিউট/গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর (১৯৭৩) এসব ইনস্টিটিউট/কেন্দ্রের অধিকাংশই পুনর্গঠিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

বর্তমানে ১০টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের ফসল, পশুসম্পদ, মৎস্য ও বনবিদ্যার ওপর কাজ করছে। অধিকন্তু বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কয়েকটি কৃষি কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। সবগুলি কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটই স্বাধীনভাবে গড়ে উঠেছিল এবং পরস্পর বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছিল। প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও তাঁর জ্যেষ্ঠ সহকর্মীগণ প্রধানত ওই ইনস্টিটিউটের গবেষণা কার্যক্রম তৈরি করতেন। সাধারণত আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সংযোগের অভাব ছিল এবং সেজন্য ইনস্টিটিউটগুলির গবেষণা কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় পর্যায়ে সামগ্রিক কার্যক্রম গ্রহণ অপিরহার্য হয়ে ওঠে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব অনুধাবন করেই ১৯৭৩ সালে  বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয়। সারা দেশে কৃষি গবেষণার সমন্বয়, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন সহজতর করার জন্য কৃষি গবেষণা পদ্ধতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করার জন্যই বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদের সৃষ্টি। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের ফসল, পশুসম্পদ, মৎস্য ও বনবিদ্যার ওপর গবেষণারত ১০টি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সবগুলিতেই বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদের ভূমিকা সম্প্রসারিত রয়েছে এবং এগুলির সমন্বয়ে বাংলাদেশের জাতীয় কৃষি গবেষণা ব্যবস্থা (National Agricultural Research System/NARS) গঠিত হয়েছে। NARS-এ দেড় হাজারের মতো বিজ্ঞানী কর্মরত আছেন।

NARS–এ কৃষি গবেষণার পরিকল্পনা, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন  পরস্পর-বিচ্ছিন্ন প্রায় ডজন খানেক প্রতিষ্ঠানে দেশের কৃষি গবেষণা ছড়ানো ছিটানো থাকার দুর্বল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ গড়ে তোলা হয়। উপখাতগুলির (বিভিন্ন ফসল, পশুসম্পদ, মৎস্য ও বনবিদ্যা) সমস্যার অগ্রাধিকার নিরূপণ এবং পুরো গবেষণা ব্যবস্থার জনবল, ভৌত ও আর্থিক সম্পদ বরাদ্দের সমন্বয় বিধানে সমর্থ, কৃষি গবেষণার এমন কোনো কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা না থাকায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম গ্রহণ করে। এসব কার্যক্রমের মধ্যে ছিল জাতীয় কৃষি গবেষণা পরিকল্পনা (National Agricultural Research Plan/NARP) প্রণয়ন, চাষাবাদে জরুরি সমস্যাসমূহের ওপর চুক্তিভিত্তিক গবেষণা প্রকল্প প্রস্ত্তত, গবেষণা ব্যবস্থার মানবসম্পদ জরিপ, জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও দলিল প্রস্ত্তত কেন্দ্র (Documentation Centre) প্রতিষ্ঠা।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদের মাধ্যমে বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠির সাহায্যপুষ্ট গবেষণা কার্যক্রমের পরিকল্পনা পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও সমন্বয়ের জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদের মধ্যে ১৯৮১-৮২ সালে কারিগরি সহায়তা সেবা বিভাগ (Technical Support Services Division) নামে একটি বিভাগ গড়ে তোলা হয়। ১৯৮২-৮৩ সালে চুক্তিভিত্তিক গবেষণা কার্যক্রমের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শুরু হয়। এ মূল্যায়নলব্ধ ফলাফল বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সুনাম বৃদ্ধি করে। বস্ত্ততপক্ষে এটিই ছিল বাংলাদেশে কৃষি গবেষণা পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের প্রথম পদক্ষেপ। ১৯৮৩-৮৪ সালে কারিগরি সহায়তা সেবাপ্রদান বিভাগ ‘পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন বিভাগ’ হিসেবে পুনর্গঠিত হয়। এ বিভাগের কার্যক্রম বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সেগুলির শিক্ষাদানমূলক বিভাগ/অনুষদসমূহের সাফল্য মূল্যায়ন পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ প্রথম জাতীয় কৃষি গবেষণা পরিকল্পনা (১৯৭৯-৮৩) প্রণয়ন করে। ১৯৮৩-৮৪ সালে দ্বিতীয় NARP (১৯৮৪-৮৮) প্রণয়নের জন্য আরেকটি কমিটি গঠিত হয়। এ ছাড়া ১৯৮৩-৮৪ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ ‘চুক্তিভিত্তিক গবেষণার জন্য ম্যানুয়াল’ প্রকাশ করে যাতে ছিল প্রকল্প নির্বাচনের রীতি, প্রকল্প পরিকল্পনার ধাপসমূহ, প্রকল্পের গুরুত্ব নির্ধারণ, প্রকল্প পরিবীক্ষণ, প্রতিবেদন তৈরি ও গবেষণালব্ধ ফলাফল মূল্যায়ন ও সদ্ব্যবহার। ১৯৮৪-৮৫ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ ম্যানুয়ালে বর্ণিত নীতিমালার ভিত্তিতে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নকৃত চুক্তিভিত্তিক গবেষণা প্রকল্পসমূহের জন্য অর্ধবার্ষিক পরিবীক্ষণ পদ্ধতি প্রচলন করে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদের একদল বিজ্ঞানী কর্তৃক অতঃপর মাঠপর্যায়ে পরিবীক্ষণের সূচনা ঘটে।

গবেষণা পরিকল্পনা  জাতীয় পর্যায়ে কৃষি গবেষণার পরিকল্পনা প্রণয়নের দায়িত্ব বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ পালন করে থাকে। জাতীয় প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কৃষি গবেষণার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা, জাতীয় কৃষি গবেষণা ব্যবস্থার গবেষণা সামর্থ্য উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা এবং যথাযথ গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর কৌশল পরিকল্পনা প্রণয়ন সবকিছুই বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদের দায়িত্ব। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো জাতীয় কৃষি গবেষণা পরিকল্পনা প্রণয়ন। এ ধরনের পরিকল্পনায় সাধারণত অগ্রাধিকারের পর্যায়িক হালনাগাদের অবকাশসহ পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য গবেষণার ক্ষেত্র নির্ধারিত হয়ে থাকে। জাতীয় কৃষি গবেষণা পরিকল্পনা কৃষি গবেষণার দিকনির্দেশনা দেয় এবং জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় সহায়তা যোগানোর ভিত্তিতে গবেষণার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য, অগ্রাধিকার ও সুযোগ বর্ণনা করে।

কৃষি গবেষণার কৌশলগত পরিকল্পনা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ ২০১০ সাল ও তৎপরবর্তী সময়ে জাতীয় কৃষি গবেষণার জন্য ৬টি ব্যাপক কার্যক্ষেত্রভিত্তিক যে কৌশলগত পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, তাতে আছে ১. উদ্ভিদ উৎপাদন প্রণালী; ২. পশুপালন প্রণালী; ৩. প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রণালী; ৪. কৃষি উৎপাদন সহায়তা প্রণালী; ৫. কৃষিনীতি সহায়তা প্রণালী; এবং ৬. কৃষিতথ্য সহায়তা প্রণালী। বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ পর্যায়িকভাবে কৃষি গবেষণারত জনবলের অবস্থান সম্পর্কে সমীক্ষা চালায় এবং সে ভিত্তিতে কৃষি গবেষণা কর্মীদের জন্য যথাযথ জনবল উন্নয়ন পরিকল্পনা (দীর্ঘ ও স্বল্প উভয় মেয়াদি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম) গ্রহণ করে যাতে দেশে ও বিদেশে প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ থাকে।

গবেষণার জন্য যথাযথ অবকাঠামো গড়ে তোলার চাহিদার বিষয় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ কর্তৃক পরীক্ষিত হয় এবং চালু গবেষণা প্রতিষ্ঠান/কেন্দ্রগুলিকে শক্তিশালী করার এবং চাহিদা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গবেষণা দক্ষতা ও অর্থযোগানের ভিত্তিতে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পদক্ষেপ গৃহীত হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ কর্তৃক নির্ধারিত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ইনস্টিটিউট পর্যায়ে গবেষণা প্রকল্প তৈরি হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদের অর্থায়ন প্রত্যাশী কৃষি গবেষণা প্রকল্পসমূহের জন্য নির্দিষ্ট কয়েকটি মাপকাঠি বিবেচনাধীন থাকে।

গবেষণা পরিকল্পনা গ্রহণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ৯টি অঞ্চলে বিভক্ত হয়েছে। এগুলি ১. রংপুর ও দিনাজপুর; ২. বগুড়া, রাজশাহী ও পাবনা; ৩. কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনা; ৪. বরিশাল, পটুয়াখালী ও ফরিদপুর; ৫. জামালপুর, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ; ৬. কুমিল্লা ও সিলেট; ৭. নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম; ৮. পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং ৯. ঢাকা ও টাঙ্গাইল।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল কোনো অঞ্চলের কৃষি সম্পর্কিত সমস্যার নিরূপণের জন্য NARS ইনস্টিটিউটগুলির সঙ্গে যৌথভাবে আঞ্চলিক কর্মশালা আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এসব কর্মশালায় কৃষির ৪টি উপখাতের সবগুলি শস্য, মৎস্য, বন ও পশুসম্পদ নিয়ে আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের NARS বিজ্ঞানীগণ, কৃষি কারিগরি কমিটির (Agricultural Technical Committee/ATC) সদস্যবর্গ, সম্প্রসারণ কর্মকর্তা এবং নেতৃস্থানীয় কৃষকগণ কর্মশালায় যোগ দেন। কর্মশালায় প্রদর্শনী প্লটসমূহের সমস্যা ও সম্ভাবনা এবং শস্য, মৎস্য, বন ও পশুসম্পদ ক্ষেত্রে বিরাজমান স্থানীয় সমস্যা নিয়ে পর্যালোচনা চলে। এভাবে মাঠপর্যায় থেকে গবেষণাযোগ্য বিষয়গুলি শনাক্ত করা হয়।

চুক্তিভিত্তিক গবেষণা প্রকল্প  চুক্তিভিত্তিক গবেষণা প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত গবেষণার বিষয় একটি অঞ্চলের জন্য হলে ATC তা পরীক্ষা করবে এবং প্রকল্পটি একাধিক অঞ্চলের জন্য হলে এটি National Agriculutural Techinical Coordination Committee/NATCC কর্তৃক পরীক্ষিত হবে। ATC/NATCC-তে পরীক্ষার পর প্রকল্পটি অর্থসংস্থানের জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদে পেশ করতে হবে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ বিভাগীয় পর্যায়ে প্রকল্পটি পর্যালোচনার পর স্ব স্ব বিষয়ে বিশেষজ্ঞের কাছে পর্যালোচনার জন্য পাঠায়। পরে প্রকল্পটি পর্যালোচকের মন্তব্যসহ কারিগরি পরামর্শ কমিটিতে (Technical Advisory Committee/TAC) উপস্থাপন করা হয়। TAC-এ রয়েছেন ১. স্ব স্ব বিষয়ের সদস্য পরিচালক; ২. সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ২-৩ জন বিশেষজ্ঞ সদস্য; ৩. সদস্য-পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) এবং ৪. সদস্য পরিচালক (কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজতত্ত্ব)। TAC-এর সকল সদস্য কোনো সংশোধন ছাড়া বা সংশোধিত আকারে প্রকল্পটি অনুমোদন করলে এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য কার্যনির্বাহি পরিষদে পেশ করা হয়। কার্যনির্বাহি পরিষদের মন্তব্য/পরামর্শের ভিত্তিতে প্রকল্পগুলি সংশোধন করতে হয় এবং চেয়ারম্যান অর্থসংস্থানের জন্য সেটা পেশ করেন।

মূল্যায়ন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ বিভিন্ন পর্যায়ে ইনস্টিটিউটগুলির গবেষণা কার্যক্রমের মূল্যায়ন করে থাকে। ১৯৮৬ সালে পরিকল্পনা কমিশনের অনুরোধে ইক্ষু গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (Sugarcane Research and Training Institute/SRTI) কার্যক্রমের ফলাফল (performance) মূল্যায়ন করা হয়েছিল এবং ওই একই বছরে বিশেষ মুল্যায়ন কমিটির মাধ্যমে USAID/ Winrock International এবং ARP-III (বিশ্ব ব্যাংক) প্রকল্পসমূহের কর্মকান্ডও মূল্যায়ন করা হয়েছিল। এ ছাড়া আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ চুক্তিভিত্তিক গবেষণা প্রকল্পসমূহের বার্ষিক পর্যালোচনা করে থাকে।

জাতীয় কৃষি গবেষণা ব্যবস্থার আওতাভুক্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলি সাধারণভাবে এখনও সম্পূর্ণ দলিলকৃত পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে পারে নি। উদাহরণস্বরূপ NARS-এর সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে বছরে একবার বার্ষিক কার্যক্রম পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে সভায় পরবর্তী বছরের গবেষণা কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা চলে। অন্যসব NARS ইনস্টিটিউটে একই অবস্থা বিরাজমান, ব্যতিক্রম শুধু BRRI যেখানে বার্ষিক পর্যালোচনা সভায় কার্যক্রম ও প্রকল্পসমূহের অপেক্ষাকৃত বিশদ আলোচনা চলে এবং বিজ্ঞানীদের জবাবদিহিতা তুলে ধরা হয় এবং প্রতি তৃতীয় বছরে একবার বহিঃপর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকে। বহিরাগত পর্যালোচকদল BRRI-র গবেষণা কার্যক্রম ও ফলাফল মূল্যায়ন করে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ প্রণীত পরিকল্পনার দিকনির্দেশনা অনুসরণে ইনস্টিটিউটগুলি যথাসময়ে যাতে গবেষণা পরিকল্পনা প্রস্ত্তত করে বর্তমানে তেমন পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। ইনস্টিটিউটগুলি কর্তৃক গৃহীত গবেষণা কার্যক্রম এখন অনেক সুশৃঙ্খল ও প্রয়োগধর্মী।

বিস্তারিত প্র্যাকটিস করুন

সকল ডিজিটাল বই

পঞ্চম শ্রেণি
নবম-দশম শ্রেণি
একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
বাংলা রচনা / ভাবসম্প্রসারণ ...
Essay / Compositions / Paragraph
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রস্তুতি
বি সি এস